মুখোশের আড়ালে পর্ব ১৫

#মুখোশের_আড়ালে
#পর্ব_১৫
#Saji_Afroz
.
.
উষ্ণের কথা শুনে পৌষী ঠোঁট জোড়া প্রসস্থ করে বললো-
কে আমি?
-মনেহচ্ছে আপন কেউ । পৌষীকে এতোটা আপন মনে হবার কথা না ।
-কেনো? পৌষী দেখতে খারাপ?
-তা নয় । আমার মনে কেবল একজনেরই নাম আছে । যাকে আঁকড়ে ধরে জীবন পার করতে চেয়েছি । সে যদিও নেই তবুও…
-কি?
-কিছুনা ।
.
আরেকটা সিগারেট ধরালো উষ্ণ ।
পৌষী বললো-
আমাকেই মিস করছিলে তুমি, অস্বীকার করবে?
.
সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে উষ্ণ জবাব দিলো-
হুম করছিলাম । কেননা…
-কি?
-তোমার মাঝে অন্য একজন কে খুঁজে পাচ্ছি আমি ।
-কাকে?
-আছে একজন । কিন্তু তুমি কি করে জানলে আমি এখানে?
-আজকের দিনে তোমাকে এখানেই পাবো । এটা জানতাম!
-আজ কি?
-জানোই তো ।
-আজ তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো ।
-কার সাথে?
-জানো তুমি ।
.
মুচকি হাসলো পৌষী । উষ্ণ বললো-
এতো কিছু কিভাবে জানো তুমি? কে তুমি?
.
হাসতে হাসতেই পৌষী জবাব দিলো-
আমি পৌষী!
-তাকে চিনতে?
-কাকে?
-উফফ… তুমি জানো আমি কি বলতে চাইছি ।
-উহু! আমি জানিনা । তুমি বলো?
.
পৌষী চায় উষ্ণ নিজের মুখে সবটা বলুক । কিন্তু উষ্ণ বলছেনা । বরং পৌষীর পাশ থেকে আরো দূরে সরে এসে সিগারেট টানছে ।
উষ্ণ জানেনা পৌষী কতোটুক জানে এই বিষয়ে । তাই সে নিজের মুখে কিছু বলবেনা, যতোক্ষণ না পৌষী বলছে!
.
.
অফিস শেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলো ফাহাদ । এমন সময় তার ফোন বেজে উঠলো ।
তার এক বন্ধুর ফোন এসেছে ।
-হ্যালো?
-কি অবস্থা ফাহাদ?
-আছি ভালো । তুই?
-ভালো আছি । ভাবীকে রাস্তায় দেখলাম আজ উষ্ণ মাহমুদের সাথে । উষ্ণ মাহমুদ গাড়ি ঠিক করে দিচ্ছিলো ভাবীকে ।
-কোন ভাবী?
-পৌষী ভাবী ।
-ওহ! কবে?
-এই বিকেলের দিকে । কেনো তুই জানিস না?
.
সত্যটা লুকিয়ে ফাহাদ বললো-
জানি । তোর ভাবীর সামনে বই বের হবে । এসব ব্যাপারে কথা বলতে দেখা করেছে ।
-তাই নাকি!
.
কিছুক্ষণ বন্ধুর সাথে কথা বলে ফোনটা রাখলো ফাহাদ ।
পৌষী তাকে না বলে উষ্ণ এর সাথে দেখা করতে গিয়েছে! খুব অবাকই হলো ফাহাদ । তাদের সম্পর্কের একটা নতুন মোড় এসেছে ৷ আর সে বের হতেই পৌষী…
আর ভাবলোনা ফাহাদ । দ্রুত এগিয়ে গেলো বাসার দিকে ।
.
.
বাসায় প্রবেশ করেই ফাহাদ প্রশ্ন করলো পৌষীকে-
তুমি কি আজ বাইরে গিয়েছিলে?
.
পৌষী উত্তর দিলো-
কই নাতো! আপনি বসুন, আমি চা করে আনছি ।
.
পৌষীকে থামিয়ে ফাহাদ বললো-
কেনো মিথ্যে বলছো পৌষী! সত্যটা আমাকে জানালেই হয় । উষ্ণ মাহমুদের সাথে আজ তুমি দেখা করেছো । নিশ্চয় কোনো প্রয়োজনে করেছো । এটা লুকোনোর কি আছে!
.
পৌষী অবাক হয়ে বললো-
কি যা তা বলছেন এসব! আমি উষ্ণ মাহমুদের সাথে দেখা করতে গিয়েছি? উনার সাথে আমার কখনো ভালো করে কথায় হয়নি । দেখা দূরে থাক ।
.
এই কথাটি শুনে ফাহাদের মাথাটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেলো ।
চেঁচিয়ে বলে উঠলো সে-
মুখের উপরে এতো বড় মিথ্যে কথা কিভাবে বলতে পারছো তুমি?
.
পৌষী শান্তস্বরে বললো-
কি হয়েছে আপনার! আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন কোনো কারণে?
-তবে কি করবো!
-আমি করেছি টা কি?
-কি করেছো! হঠাৎ হঠাৎ কবিতা লিখতে শুরু করেছো, মিয়াজ শেখের বাসায় চলে যাচ্ছো, উষ্ণ মাহমুদের সাথে বাইরে দেখা করছো । মানছি তোমার কদর আমি করিনি । কিন্তু এখন তো তোমাকে আমি ভালোবাসি পৌষী । তাহলে কেনো এসব করছো তুমি? আমার এখন মনেহচ্ছে আমার সাথে কোনো গেইম খেলছো তুমি । আমাকে মানসিক রোগী বানিয়ে তুমি উষ্ণের কাছে চলে যেতে চায়ছো ৷ তাইনা?
.
ফাহাদের এতো সব কথা হজম করতে সময় লাগলো পৌষীর । নিজের মেজাজটা খারাপ করলোনা সে । স্বামী-স্ত্রীর মাঝে এমন ছোট বড় অনেক ঝামেলা ঘটে থাকে ৷ একজন রাগ করলে অপরজন কে শান্ত থাকতে হয় । নাহলে পরিস্থিতি আরো বিগড়ে যায় ।
এক গ্লাস পানি নিয়ে ফাহাদের পাশে এসে পৌষী বললো-
পানি খান ।
-আমার রাগে সারা শরীর কাঁপছে আর তুমি আমাকে পানি খেতে বলছো?
-তাই তো বলছি! খান, ভালো লাগবে ।
.
পৌষীর হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে এক নিশ্বাসে পানি পান করলো ফাহাদ । পৌষী তার হাত ধরে টানতে টানতে বললো-
বসেন আমার পাশে ।
.
দুজনে সোফায় বসলো । কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর পৌষী বললো-
আপনি যেসব বলছেন আমার কিছুই মনে নেই । আমি বের করবো বই! এটা কিভাবে সম্ভব বলুন? আর মিয়াজ শেখের বাড়ি আমি চিনিইনা । তাছাড়া উষ্ণ মাহমুদের সাথে আমি কখনোই দেখা করিনি । কেনো বলছেন এসব? কোথাও ভুল হচ্ছে আপনার ।
.
ফাহাদ পৌষীকে শুরু থেকে সবটা বললো । মিয়াজ শেখের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের ছবিও দেখালো । আর দেখালো সেই ডায়েরিটা, যেখানে পৌষী কবিতা লিখেছে । তার ফেবুকে প্রবেশ করে দেখলো, উষ্ণ এর সাথে মেসেজ । সবটা দেখে পৌষী যেনো বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে চলে গেলো । সে কিছুই মনে করতে পারছেনা ।
মেঝেতে বসে পড়লো পৌষী ৷ কান্নায় ভেঙে পড়লো সে । কাঁদতে কাঁদতে বললো-
এসব কি হচ্ছে! আমি সত্যিই কিছু মনে করতে পারছিনা । আমি এসব জানিনা । আমি করিনি ।
.
ফাহাদের হঠাৎ মনে এলো স্যুপ তৈরী, রান্না ও ঘর সাজানোর কথা ।
সেসব পৌষী করেনি এটা তার অজানা নয় । এই বাড়ির চাবিও একটা । যেটা পৌষীর এক্সিডেন্টের সময় তার কাছেই ছিলো ।
পৌষীকে এসবও জানালো ফাহাদ । সবটা শুনতেই তিশানীর কথা মনে এলো পৌষীর ৷ আজ বিকেলে তিশানীকে সাহায্য করবে বলেছিলো সে । এর পরে কি ঘটেছে তার মনে নেই । ঘুম ভাঙতেই বিকেলে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলো বিছানায় । তবে কি তিশানীই তার শরীরে ভর করে এসব করেছে!
.
পৌষীর উদ্দেশ্যে ফাহাদ বললো-
এভাবে কেঁদোনা পৌষী । আমার ভুল হয়েছে । তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে চায়লে আগেই পারতে । আমি তোমাকে অবহেলা করতাম, এই অজুহাতেই তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারতে । আমি যা বলেছি রাগের বসে । প্লিজ পৌষী কেঁদোনা আর ।
.
পৌষী ফোপাঁতে লাগলো । ফাহাদ তার পাশে বসে বললো-
আমার মনে হচ্ছে এই বাড়িটায় কোনো সমস্যা রয়েছে । নাহলে এমন অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটা সম্ভব নয় । আমরা যতো দ্রুত সম্ভব এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো ।
.
পৌষী চোখ মুছতে মুছতে বললো-
হুম চলে যাবো ।
.
.
নিজের বারান্দায় এলো পৌষী । বিড়বিড়িয়ে বললো সে-
আমি জানি তিশানী আপনি আশেপাশে কোথাও আছেন । আমি আপনাকে সাহায্যও করবো বলেছিলাম । কি ভেবেছেন? ঘরের কাজ করে দিলে, ফুল ও কবিতা উপহার দিলে আমি গলে গিয়ে খারাপ কাজ করবো! ছি! আমি একজন বিবাহিতা নারী । আমার শরীরে ভর করে কোনো ছেলেকে ফাঁসাতে রুচিতে বাধলোনা? ওহ তুমি তো ভুত হবে ভুত । তোমার কিসের রুচি! আমি এই বাসা ছেড়ে চলে যাবো । সত্যিই চলে যাবো ।
.
কথাগুলো বলে অনেক হালকা লাগছে পৌষীর । ফাহাদের জায়গায় অন্য কেউ হলে তাকে হয়তো ডিভোর্সই দিতো । যতো দ্রুত সম্ভব এই বাড়িটা থেকে চলে যাওয়াই শ্রেয় ।
.
.
রাত প্রায় দুটো বাজছে ।
পৌষীর কানে নুপুরের রিনিকঝিনিক শব্দ ভেসে আসছে । চোখ জোড়া খুললো পৌষী । চোখ খুলতেই যেনো শব্দটা গায়েব হয়ে গেলো । পাশ ফিরে দেখলো ফাহাদ নেই!
ওয়াশরুম থেকে শব্দ আসছে । ফাহাদ নিশ্চয় ওয়াশরুমে । এই ভেবে শুয়ে পড়লো পৌষী । কিন্তু উপরে চোখ পড়তেই সে চমকে গেলো । তিশানীর দেহ ফ্যানের সাথে ঝুলছে দেখে চিৎকার দিয়ে উঠে পড়লো সে । দৌড়ে ওয়াশরুমের সামনে এসে দরজায় জোরে জোরে আঘাত করে ফাহাদকে ডাকতে লাগলো । কিন্তু ভেতর থেকে ফাহাদ সাড়া দিচ্ছেনা ।
পৌষী বলছে-
ফাহাদ আপনি কথা বলছেন না কেনো? প্লিজ দরজাটা খুলুন ।
.
কোনো সাড়া না পেয়ে ফ্যানের দিকে তাকালো পৌষী ।
এখন সব ফাঁকা । পৌষী ধীরপায়ে এগিয়ে এলো সামনের দিকে । বিছানার ঠিক পাশে এসে ফ্যানের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলো । হঠাৎ ফাহাদের কথা মনে এলো তার । সে কেনো দরজা খুললো না! পেছনে ফিরতেই মেঝের উপরে তিশানীর নিথর দেহটা দেখলো পৌষী । অন্ধকার হলেও সবটা যেনো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে । চোখ বন্ধ অবস্থায় তিশানীর নিথর দেহটা দেখে বুকটা কেঁপে উঠলো পৌষীর । এগিয়ে আসলো সে দেহটার কাছে । ফাঁস দেয়ার কারণে গলায় দাগ হয়ে গিয়েছে । সাদা শরীরে লাল দাগগুলি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে । মনেহচ্ছে রক্ত জমাট বেঁধেছে । নিষ্পাপ চেহেরার মেয়েটির এই করুণ অবস্থা হলো কি করে?
ভাবতে ভাবতেই আবারো সেই নুপুরের শব্দ শুনতে পেলো সে ।
ঘুরে তাকাতেই দেখলো তিশানী হেঁটে যাচ্ছে ।
পৌষী চেঁচিয়ে বললো-
তিশানী যেওনা! আজ আমায় সবটা বলবে তুমি । আমি শুনতে চাই ।
.
কথাটি বলেই তিশানীর পিছু নিতে থাকলো পৌষী ।
.
.
বেশকিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বের হলো ফাহাদ । পেটটা হঠাৎ খারাপ হবার কারণে ওয়াশরুমে সময় লেগেছে তার । কিন্তু বের হতেই পৌষীকে না দেখে তার মনে অজানা এক ভয় এসে ভর করলো । এতো রাতে কোথায় গেলো মেয়েটা!
.
সারাবাড়িতে খুঁজে না পেয়ে ছাদে এসেছে ফাহাদ । রেলিং এর পাশে পৌষীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছুটে এলো তার কাছে । হাঁপাতে হাঁপাতে বললো-
তুমি এতো রাতে এখানে কি করছো পৌষী?
.
পৌষী কোনো জবাব না দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে ।
ফাহাদ তার কাঁধে হাত রেখে বললো-
এই পৌষী?
.
পৌষী গম্ভীর গলায় বললো-
আমি সবটা জেনে গিয়েছি । আপনি এতোটা জঘন্য আমার জানা ছিলোনা ।
.
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here