লাবণ্যর সংসার পর্ব -১৫

#লাবণ্যর_সংসার
#পর্ব_15
#কৃ_ষ্ণ_ক_লি

—“ ডিভোর্স দেওয়া কি এতোই সোজা! ”

নিবিড় তাচ্ছিল্য করে লাবণ্যকে কথাগুলো বলে। লাবণ্য চটপট উত্তর দিয়ে ফেলে,,

—“ মানুষ চাইলে সবকিছুই খুব সহজেই করে ফেলতে পারে। ”

—“ একটা প্রশ্নের উত্তর দিবে আমায়? ”

—“ বলুন,, কি? ”

—“তুমি যে আমাকে ডিভোর্স দিবে বলছো তা কি শুধুই মেঘলার জন্য! না কি এর পিছনে অন্য কারণ আছে? ”

—“ মানে.. ঠিক কি বলতে চাইছেন আপনি? আমি বুঝতে পারলাম না।”

নিবিড় মৃদু হেসে বলে,,,

—“ মানেটা হল তুমি তোমার প্রাক্তন এর কাছে থাকতে চাও। তোমার অসম্পূর্ণ প্রেম সম্পূর্ণ করতে চাও!”

কথাগুলো লাবণ্যর বুকে তীরের মতো বিঁধলো। শেষ পর্যন্ত এমন কথাও ও কে শুনতে হল! অভ্র বাঁকা চোখে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। লাবণ্য চেঁচিয়ে এক আঙুল উঁচু করে নিবিড়কে বলে উঠে,,

—“ মুখ সামলে কথা বলুন নিবিড় সাহেব। সবাইকে নিজের মতো ভাববেন না। আমি আর যাই করি আপনার মতো কাজ আমি কখনোই করবো না। ”

নিবিড় লাবণ্যর হাতটা শক্ত করে ধরে চড়া মেজাজে বলে উঠে,,

—“ কি আমার মতো কাজ? কি করেছি বল? ”

—“ আপনি জানেন না? ভুলে গেছেন, মনে করিয়ে দিতে হবে! যে পুরুষ স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অন্য.. ”

নিবিড়ের আর রাগ সংবরণ হয় না। লাবণ্যর হাতটা পিছনে মুড়িয়ে ধরে,,

—“ চুপ.. একদম চুপ.. বারবার সেই এক কথা। বলছি তো আমি আবেগের বশে ভুল করে মেঘলা নাম নিয়ে ফেলেছি। তুই সামান্য একটা কথা কেনো মেনে নিতে পারছিস না? ব্যপারটা এমন করছিস মনে হচ্ছে আমি তোকে রেখে মেঘলার সাথে ইন্টিমেট হয়েছি। ”

—“ আমার লাগছে ছাড়ুন। ”

লাবণ্য সশব্দে কেঁদে ফেলে। অভ্র এতোক্ষণ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ওদের কথাগুলো শুনলেও। লাবণ্যর কথায় ওদের কাছে এসে নিবিড়ের কাছ থেকে লাবণ্যকে সরিয়ে নেয়। অভ্র গরম চোখে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,,

—“ ভাই তুই কথাগুলো একটু সমঝে বল। আর তোর কি মনে হয় আমি তোর সংসার ভাঙ্গবো! যার থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিই তার দিকে পুনরায় আর মুখ ফিরাই না। তুই কি আমায় চিনিস না! না কি বিশ্বাস করিস না? তোর স্ত্রী আমার আর প্রাক্তন প্রেমিকা নয় নিবিড় । সেটা তুই অন্তত খুব ভালো করেই জানিস। ও আর আমার কল্পনাতেও নেই। ”

নিবিড় অভ্রের কাঁধে হাত রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,,,

—“ ভাই প্লিজ তুই আমার কথায় কিছু মাইন্ড করিস না। আর কথাগুলো তো আমি তোকে মেনশন করেও বলিনি। সেই জন্যেই তো শুধু মাত্র লাবণ্যর অসম্পূর্ণ প্রেম সম্পূর্ণ করার কথা বলেছি , তোমাদের নয়। দেখ অভ্র আমি টায়ার্ড , আর কতো বোঝাবো বলতো ও কে! ও কেই জিজ্ঞাসা কর না আমি ও কে কতো বুঝিয়েছি। ভিখারীর মতো ওর কাছে ভিক্ষা চাইছি যেনো ও আমাদের কাছে ফিরে আসে। কিন্তু ও বারবার মেঘলার কথা বলেই চলেছে। ও মানতেই রাজী নয়। আসলে ও সংসারটাই করতে চাইছে না। ”

—“ ভাই তুই শান্ত হ। তুই আমার ওপর ভরসা করিস তো। আমি যখন তোকে বলেছি লাবণ্যকে তোর কাছে ফিরিয়ে দিব তখন দিব। আর লাবণ্যর কথাই বা তুই এতো গুরুত্ব দিচ্ছিস কেনো? তুই ওর স্বামী , তুই যখন বলছিস ওর সাথে সংসার করবি তখন তোর কথাই শেষ কথা হবে। প্রয়োজন পড়ে তুই জোর করেই ওর সাথে সংসার করবি। ও তোকে ছেড়ে চলে যাবে বললেই কি তুই ছেড়ে দিবি। ওর ওপর তোর সম্পূর্ণ অধিকার আছে। ”

নিবিড় লাবণ্যর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে উঠে। লাবণ্য নিজের হাতটা ধরে ফুঁপিয়ে উঠছে। অভ্র লাবণ্যর কাছে এসে দাঁড়ায়। লাবণ্য নিজের চোখের পানি মুছে নিয়ে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকে। অভ্র নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে,,

—“ নিবিড় তুই কি আমায় তোর স্ত্রীর সাথে পনেরো মিনিট একা কথা বলার সুযোগ দিবি? কথা দিচ্ছি পনেরো মিনিট পর তুই তোর স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবি দূরে এবং সেটা তোর স্ত্রীর মনের ইচ্ছাতেই।”

নিবিড়ের মুখে হাসি ফুটে উঠে। চোখের কোণে থাকা এক বিন্দুর কণা মুছে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। লাবণ্য কানে বাজতে থাকে অভ্রের বলা কথাগুলো,,
‘ যার থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিই ….. ………… ……. ……ও আর আমার কল্পনাতেও নেই।’
লাবণ্য অভ্রের দিকে তাকিয়ে চোখ বড়ো করে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠে,,,

—“ আমার সাথে কথা বলার অধিকার আপনার নেই। আপনাকে কে বলেছে আমার জীবন নিয়ে কথা বলতে! আমি আমার স্বামীর সাথে সংসার করবো না কি করবো না সেটা একান্ত আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই ভালো হয় আপনি আমার ব্যাপারে নাক না গলান। ”

অভ্র মুচকি হাসি দিয়ে নিজের মনেই বলে নেয় ‘রাগটা এখনও এক আছে। রাগ হলেই তুমি হয়ে যায় আপনি! ’
অভ্র গম্ভীর গলায় বলে উঠে,,,

—“ ব্যপারটা যদি শুধু তোমার হতো আমি কোনোও রকম নাক গলাতাম না। কিন্তু এখানে আমার বন্ধুর জীবন জড়িয়ে আছে। তার ভালো থাকার উপায় জড়িয়ে আছে। ”

লাবণ্য কাঁপা গলায় বলে উঠে,,,

—“ আপনার বন্ধুর ভালো থাকা , ভালো জীবনের জন্য তো তাকে তার প্রিয় মানুষটির হাতে তুলেই দিয়ে এসেছি। যাতে উনি ভালো থাকেন, সুখে থাকেন। ”

—“ তুমি কি নিজের হার স্বীকার করে নিচ্ছো লাবণ্য!”

লাবণ্য ম্লান গলায় বলে উঠে,,,

—“ হার! কিসের হার, হার তো তখন হয় যখন কারুর সাথে প্রতিযোগিতা করা হয় , লড়াই করা হয়! এখানে কে কার সাথে লড়াই করছে! আর প্রতিযোগিতা , তাও আমি কারুর সাথে করছি না। আর কাকে নিয়েই বা করবো! ”

—“ কেনো তোমার স্বামীকে নিয়ে মেঘলার সাথে। তুমি তো মেঘলাকে জিতিয়ে দিচ্ছো লাবণ্য। তুমি না লড়াই করলেও মেঘলা করছে তোমার পিছনে। তুমিই বা কেনো পিছে থাকবে। নিবিড় তোমার স্বামী। মেঘলা কেউ নয়। মেঘলা শুধুমাত্র নিবিড়ের অতীত। তোমায় ভুলিয়ে দিতে হবে। তুমিও মেঘলাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দাও, দেখিয়ে দাও নিবিড় তোমার স্বামী। আর সারাজীবন ও তোমার সাথেই থাকবে।”

লাবণ্য বিচলিত হয়ে উঠে । ওর মন একবার চাইছে হ্যা ও ওর স্বামীর কাছে ফিরে যাবে। কিন্তু মনটা মেঘলার জন্য কষ্ট হচ্ছে। মেঘলার মুখটা ভেসে উঠলেই লাবণ্যর মনটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে।

—“ কিন্তু মেঘলার সাথে যে অন্যায় করা হবে। এমনিতেই পরিবারের ভুল নেওয়া সিদ্ধান্তে ও অনেক কষ্ট পাচ্ছে , উনিও পাচ্ছেন। ”

—“ কিসের অন্যায় লাবণ্য! তোমার স্বামী কি তোমায় নিজের মুখে বলেছে যে ও মেঘলাকে ভালোবাসে। এখনও মেঘলাকেই চায়। ”

অভ্র লাবণ্যর দু বাহু ধরে বলে উঠে ,,,

—“ লাবণ্য নিবিড় যখন নিজে থেকে চাইছে অতীত ভুলে তোমার সাথে সংসার করতে তাহলে তুমিই বা কেনো মেনে নিতে পারছো না। লাবণ্য অতীত ভুলতে যে কি পরিমাণ যন্ত্রণা আর সময় লাগে সেটা নিশ্চয়ই তুমিও বুঝো। যেখানে নিবিড় তো আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আবেগের বশে কি না কি করে ফেলেছে সেই ছোট্ট ভুল নিয়ে তুমি এতো বড়ো সিদ্ধান্ত কেনো নিচ্ছ?
দেখো লাবণ্য জন্ম , মৃত্যু , বিবাহ এইসব কিছুই সৃষ্টিকর্তার হাতে থাকে। এখানে আমরা মানুষরা চাইলেই কিছু করতে পারি না। আর যা করে থাকি তা সৃষ্টিকর্তা মঞ্জুর করেন বলেই তা ঘটে থাকে ।তোমার আমার সম্পর্কটা সৃষ্টিকর্তা মঞ্জুর করেন নি তাই তো আমরা এক হতে পারিনি। এখানে তোমার বাবার কোনও ভূমিকা নেই। ঠিক তেমনই মেঘলা আর নিবিড়ের সম্পর্ক। সৃষ্টিকর্তা তোমায় আর নিবিড়কে এক করতে চেয়েছেন আর তাই তো তোমাদের বিবাহ হয়েছে। নিবিড় নিজের হৃদয়ে তোমায় জায়গা দিতে চেয়েছে। আর তোমার হাতের আংটি তার প্রমাণ। ”

লাবণ্য নিজের আঙুলের আংটিতে দুই আঙুল স্পর্শ করে বুকে ঠেকায়। আসলেই হয়তো অভ্র কথাগুলো ঠিক বলছে।

—“ লাবণ্য ঠান্ডা মাথায় ভাবো একবার। কোনও মেয়েই তার স্বামীর ভাগ অন্য কাউকে দিতে চায়না। তা লাভ ম্যারেজ কিংবা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হোক। স্বার্থপর হও লাবণ্য। তুমি না চাইলে তোমার স্বামী কোনও মেয়েকেই তার মনে আসতে দিতে পারবে না। একমাত্র তুমিই পারবে মেঘলাকে ভুলিয়ে দিতে। তুমি নিজের অধিকার ছেড়ো না লাবণ্য। ”

নিবিড় অভ্রকে জড়িয়ে ধরে একপ্রকার কেঁদেই ফেলে। অভ্র নিবিড়ের পিঠ চাপড়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

—“ শালা তুই কাঁদছিস কেনো। তোর স্ত্রীকে তো আমি ফিরিয়েই দিলাম। এখানে কাঁদার কোনও মানেই হয় না। হ্যাঁ আমি যদি তোর বউরে নিয়া ভেগে যেতাম তখন নয় কাঁদতিস মানাতো। ”

—“ সে তুই আমাকে যাই বল আজ তোর জন্য আমি লাবণ্যকে ফিরে পেয়েছি। তোর জন্যই তো আমার সংসারটা পুনরায় জীবিত হল রে। আমি আজ খুব খুশি। ”

—“ হুম আমি জানি তো। তোকে খুশি করার জন্য আমি সব পারি। আর হ্যা তুই যাতে সারাজীবনের জন্য লাবণ্যকে নিয়ে সুখে সংসার করতে পারিস তার ব্যবস্থাও আমি অতি শ্রীঘ্র করবো। ”

গাড়ির মধ্যে পিনপতন নিরবতা। ড্রাইভ করে চলেছে নিবিড়। মাঝে মাঝে আড়চোখে দেখে যাচ্ছে লাবণ্যকে। হালকা ঠাণ্ডার মধ্যে লাবণ্য গাড়ির কাঁচ নামিয়ে মৃদু বাতাস অনুভব করছে। পানি গুলো অঝোর ধারায় এখনও বয়ে চলেছে লাবণ্যর চোখের কোণ বেয়ে।

চলবে,,,,

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here