ল্যাম্পপোস্ট পর্ব -১৩ ও শেষ

#ল্যাম্পপোস্ট (১৩~সমাপ্ত)

কিং ওয়েন অ্যাড এর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। দুদিন আগেই আরাজের মৃ ত্যুদণ্ড ঘোষনা হয়েছে। সংবাদ টা পেয়ে সব থেকে বেশি খুশি হয়েছে বিভা। এমন শ য় তা ন জালিম প্রতারকের শাস্তি হওয়ার দরকার ছিল। আজ ছয় দিন হলো কানাডায় ফিরেছে বিভা আর অ্যাড। আরাজের জন্য ছুটে এসেছিলো বিভা। এটা ভাবতেই এখন গা গুলিয়ে আসে তার। আরাজ এর নাম টা ও বি ষা ক্ত বি ষ মনে হয়। হাডসন ফ্যামিলির প্রতি কৃতঙ্গ বিভা। আজকেই ফ্লাইট। নিজ দেশে ফিরে যাবে সে। খবর পেয়েছে ইফতেখার নাকি স্টোক করে হসপিটালে এডমিট। যদি ও এখন অনেক টাই সুস্থ। তবে হাঁটা চলা করতে পারেন না। আর তার জন্য ই বিভার সমস্ত একাউন্ট ব্লক হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু বিভার পরিবার বলতে শুধুই বাবা তাই বিভার খোঁজ খবর ও চালানো হয় নি এতদিন। বিভাকে দত্তক নিয়েছিলেন ইফতেখার। প্রেমিকা কে হারিয়ে আর বিয়ে করেন নি তিনি। তবে তিন বছর পর খবর আসে প্রেমিকা ও তার হাসবেন্ড এক্সিডেন্টে মা রা গেছে। শুধু বেঁচে আছে বছর খানেক এর বাচ্চা মেয়েটি। আর সেই মেয়েটির দায়িত্ব নিতে চায় না কেউ। তখনি ঠিক করেন বিভা কে নিজের মেয়ে হিসেবে বড় করবেন। বিভার আঠারো বছর পূর্ন হতেই এই কথা গুলো জানতে পারে মেয়েটি। সেদিন প্রচুর কেঁদেছিল সে। ইফতেখারের মতো কাউকে বাবা হিসেবে পেয়ে নিজে কে বড়ো ভাগ্যবতী মনে করে সে।

হাডসন ফ্যামিলির সকল কে বিদায় জানায় বিভা। অ্যাড কোনো এক কাজে দেশের বাহিরে গেছে। যাওয়ার পূর্বে দেখা না হওয়ায় কষ্ট হয় তার। ভিনদেশী বন্ধু কে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। বুকের ভেতর কষ্ট অনুভব হয়। গাড়ি চলতে থাকে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে বিভা। কানাডার দীর্ঘতম রাস্তা পেরিয়ে ককপিট দিয়ে চলে আসে বহু থেকে বহু দূরের দেশ বাংলাদেশে। দীর্ঘ চার মাস পর নিজ দেশে পা রাখল বিভা। চারপাশে তাকিয়ে সমস্ত দুঃখ উবে যায় হুট করেই। সব যে নিজের মানুষ। যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে। ইংরেজি তে কথা বলতে বলতে বাংলা আসতে চায় না মুখ দিয়ে। অভ্যাস হয়ে গেছে কেমন! এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি বুক করে রওনা হয় বাসাতে।

রাজধানীর শাহাজাতপুরে এসে নিজের বাসার কাছে গাড়ি থামাতে বলে বিভা। ভাড়া মিটিয়ে নিজ বাসাতে প্রবেশ করে। ওকে দেখে বাড়ির দুজন পরিচারিকা ছুটে আসে। বিভার দিকে শরবত এর গ্লাস বাড়িয়ে দেয়। ফিক করে হেসে বিভা বলে, “রিতা তোর মাথায় বুদ্ধি হলো না আর। শীতের মাঝে শরবত খাব আমি?”

“তয় আপা কফি বানাই নিয়া আসুম?”

বিভা একটু ভেবে বলে
“আচ্ছা নিয়ে আয়।”

বাবার রুমে এসে দেখে ইফতেখার বেডে শুয়ে আছেন। শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া রুগ্ন বাবা কে দেখে কেঁদে উঠে বিভা। ক্রন্দনরত অবস্থায় বলে
“আম সরি পাপা। আমি তোমাকে ফেলেই চলে গিয়েছিলাম। তখন আমি আসলেই বুঝতে পারি নি কি করছিলাম। খুব খারাপ মেয়ে আমি।”

“ইটস ওকে মামুনি। তুমি যে সুস্থ আছ এটাই আমার কাছে অনেক। ওসব নিয়ে মন খারাপ কোরো না।”

চোখ হাসে বিভার। তবু ইফতেখার কে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। জমিয়ে রাখা সমস্ত কান্না আজ চোখ ফেঁটে বেরিয়ে পরে।

ইফতেখারের সাথে এক সঙ্গে লাঞ্চ করল বিভা। ডাইনিং এ বসে মনে এসে যায় হাডসন ফ্যামিলির কথা। খ্রিষ্টান হলে ও তাদের আচরণ মুগ্ধ করেছে বিভা কে। এডের সাথে কাঁটানো সময় গুলো মনে হতেই মুখে হাসি ফুটে উঠে। মেয়েকে হাসতে দেখে ইফতেখার বলেন
“হঠাৎ হাসছিস কেন মা?”

“এমনি পাপা তুমি খাও তো। ইসস প্লেট ফাঁকা একদম। শুকিয়ে গেছ তুমি।”

ঝমঝমে হাসে ইফতেখার। মেয়ের দিকে স্নেহের দৃষ্টি রেখে বলে
“তুমি এসে গেছ তো, এখন মোটা তাজা হয়ে যাব মামুনি।”

“হুমম খাও এবার।”

হাসি ঠাট্টার মাঝেই লাঞ্চ শেষ করে বিভা। এভাবেই কেঁটে যায় দুই টা মাস। হাডসন ফ্যামিলির সাথে কথা হলে ও অ্যাড এর সাথে কথা হয় নি। সারাক্ষন মন ম রা করে থাকে বিভা।
আজ বিভার তেইশ তম জন্মদিন। ইফতেখারের শরীর ভালো না থাকায় তেমন কোনো আয়োজন করা হয় নি। প্রতি বছর এতিম শিশুদের বাসায় দাওয়াত করে খাওয়ানো হয়। এবার তেমন কিছু ই হলো না। বিভা ঠিক করল এতিম খানায় যাবে। বাচ্চাদের মিষ্টি আর চকলেট বিতরন করবে। বেবি পিংক রঙের কুর্তি পরে রেডি হয়ে নেয় বিভা। সুপার শপ থেকে মিষ্টি আর চকলেট নিয়ে রওনা হয় এতিম খানাতে। এতিম খানায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল কেমন একটা জাঁকজমক ভাব। মনে হচ্ছে কোনো অনুষ্ঠান উদযাপন হচ্ছে। বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে। আশে পাশে চোখ বুলিয়ে কাউন্টারে যায় সে।
“এখানে কি কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে?”

“হ্যাঁ জন্মদিনের জন্য বাচ্চাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

“জন্মাদিন?”

“হ্যাঁ।”

কাউন্টারের লোকটা নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বিশাল মাঠে জড়ো হয় সকলে। আকাশে গ্যাস বেলুন উড়ে যায়। পুরো আকাশে বেলুন দিয়ে হ্যাপি বার্থডে লেখা উঠে। আনমনেই হাসে বিভা। আজ আরো একজনের জন্মদিন। আশে পাশে চোখ বুলায় সে। বাচ্চাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাথায় লাল সাদা মিশ্রনের আরব দের রুমাল বাঁধা লম্বা সাদা পোশাক পরা ছেলেটা সবাই কে খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছে। পেছনের দিকে থাকায় ছেলেটা কে দেখতে পায় না বিভা। আগ্রহ নিয়ে আগায়। কোথা থেকে এক দল আরোবিয়ান পোশাক পরা বাচ্চা ছেলেরা এসে জড়ো হয়। হারিয়ে যায় লম্বা টে ছেলেটি। ব্যস্ত হয় বিভা। ছেলেটা কে দেখার জন্য মন অস্থির হয়ে পড়েছে। চকলেট আর মিষ্টি কাউন্টারে জমা দিয়ে পুরো এতিম খানা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে। কোথাও সেই ছেলেটির দেখা মিলে না। রাত প্রায় আট টা বেজে যায়। শুভ্র পোশাকের ছেলেটির আশায় থাকে বিভা। অথচ পায় না। একদল বাচ্চা এসে বিভা কে ঘেরাও করে। এতটাই চিন্তা মগ্ন যে বিভা বাচ্চা গুলো কে লক্ষ্য করে না। একটা ছেলে এসে বিভার উড়না ধরে টানে। চমকে তাকায় বিভা। খিল খিল করে হাসে ছেলেটা। আশে পাশে এত গুলো বাচ্চা দেখে অপ্রস্তুত হয়ে যায়। একটু হাসার চেষ্টা করে বলে
“কিছু বলবে তোমরা?”

সবাই এক যোগে বলে উঠে
“শুভ জন্মদিন আপু।”

প্রচন্ড অবাক হয় বিভা। বাচ্চা গুলো জানল কি করে আজ তার জন্মদিন? অবাকের সহিত তাকিয়ে থাকে বিভা। বাচ্চা গুলো একটার পর একটা গিফ্ট আর ফুল দিয়ে চলেছে। বিভার অবস্থা আকাশ থেকে পড়ার মতো। গিফ্ট গুলো সাইডে রেখে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে সে। কোথাও কোনো নিশানা খুঁজে পায় না। সে নিজে ও জানে না কার আশা তে ছুটছে। শুধু মনে হচ্ছে একটা অনুভূতি আশেপাশে অবস্থান করছে। রাত দশটার দিকে ভগ্ন হৃদয়ে বিভার মুখটা ছোট হয়ে যায়।নিভৃতে চোখ থেকে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। যাওয়ার জন্য হাঁটা লাগাতেই পেছন থেকে কারো ডাক কানে আসে। থমকে যায় সে। আরোবিয়ান পোশাক পরা ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে। ছুটে যায় বিভা। ছেলেটির কাছে এসে ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে বলে
“কে, কে তুমি?”

পেছন ঘুরে ছেলেটি। বিভার চোখ ছলছল করে উঠে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাড। মুখে হাত দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বিভা। হঠাৎ করেই জড়িয়ে ধরে অ্যাড কে। অ্যাডের চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠে। সে মুসলিম ধর্ম গ্রহন করেছে। নিজের স্বভাব বদলানোর চেষ্টায় আছে। বিভা কে নিজের জীবন হিসেবেই চায় এখন। বিভার থেকে একটু দূরে সরে যায় অ্যাড। পর পর কয়েকবার কিছু একটা উচ্চারণ করে। ভ্রু কুটি করে তাকায় বিভা। পকেট থেকে লাল টকটকে গোলাপ বের করে বিভার দিকে বাড়িয়ে দেয়। চমকে তাকায় বিভা। খাঁটি বাংলা ভাষাতে ছেলেটা বলল
“আমি তোমাকে ভালোবাসি বিইভা। তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?”

পরিশিষ্ট : একটু আগে আল জাবির সাদ অর্থাৎ হাডসন এড এর সাথে তানমীর বিভা এর বিয়ে সম্পূর্ন হয়েছে। ইসলাম গ্রহনের পর অ্যাড এর নাম বদলে আল জাবির সাদ রাখা হয়েছে। হাডসন ফ্যামিলি সাদরে গ্রহন করেছেন বিভা কে। ছেলের ধর্ম ত্যাগে ও কোনো প্রশ্ন করেন নি। বিভার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সাদ। বাংলা ভাষা রপ্ত করতে পারে নি সে। তবে শেখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। খোলা পরিবেশের চারপাশ জুড়ে রয়েছে শুধুই ল্যাম্পপোস্ট। যেগুলো নির্ঘুম হয়ে আমাদের পথ দেখায়। সাদ এগিয়ে গিয়ে ল্যাম্পপোস্ট এর আলো নিভিয়ে দিল। তারপর বিভার হাত দুটো মুঠো বন্দী করে চিৎকার করে বলল
“ভালোবাসি বিইভা। আমার আলোহীন জীবনের আলো হওয়ার জন্য ধন্যবাদ। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা শেষ দিন অবধি যেন এভাবেই চলতে পারি। আমি তোমার জীবনের ল্যাম্পপোস্ট হয়ে আর তুমি আমার জীবনে আলো হয়ে।”

মৃদু হাসে বিভা। সন্তর্পণে মুখ লুকায় সাদের বুকে। সত্যিই ভালোবাসা সুন্দর যদি মানুষটি সঠিক হয়।

~সমাপ্ত~
কলমে~ফাতেমা তুজ নৌশি

আগামীকাল থেকে দারুণ একটা গল্প আসতে চলেছে। এই গল্প আমার লেখা সেরা গল্পের একটি হবে বলে কথা দিতে পারি। পাঠক’রা তৈরি তো এই বৃষ্টির মৌসুমে নব্য প্রেমিক প্রেমিকা যুগলের “বৃষ্টিভেজা আলাপন” এর স্বাক্ষী হতে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here