শত্রু শত্রু খেলা পর্ব -০৯+১০

#শত্রু_শত্রু_খেলা
#পর্ব_৯
#মেঘা_সুবাশ্রী (লেখিকা)

রাঢ়ী, নীল, শ্রাবণের কোনো ভাবাবেগ নেই। ওরা জেনো জানতোই এমন কিছু হবেই। তাই তাদের মুখে শুভ্র কোমল হাসি বিভাসিত হচ্ছে।

লুবনা অথৈজলে ডুবন্ত নাবিকের মত ছটপট করছে। বক্ষস্থলে র*ক্তক্ষরণ হচ্ছে, তার না হওয়া প্রেমিক তাকে এভাবে ছ্যাকা দিল। তার হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। মনে মনে সে সৌরভকে নিয়ে গানও গাইতে শুরু করলো।

“ও পাষাণী কেনো ভালোবাসোনি?
মুছে দিয়ে যাও তুমি চোখের পানি।”
(আসিফ)

পিউর আর ফুচকা খাওয়া হলো না। সে সৌরভকে আর একটা সু্যোগ দিতে এসেছিল। আবার তাকে আপন করতে চেয়েছিল। কিন্তু সৌরভ তাকে সেই সুযোগটাই দিলো না। মনের কষ্ট চে*পে সে উঠে দাঁড়ালো। গটগট পায়ে সেই জায়গা দ্রুত ত্যাগ করলো।

রাঢ়ী মুখ টিপে হেসে যাচ্ছে। যাক তার পরিকল্পনা সফল হয়েছে।

___________________

কিছুদূর যেতেই আচমকা সৌরভ বাইকের ব্রেক কষলো।

প্রিয়ার কোনো হেলদোল নেই সে চুপচাপ বসে আছে। কিন্তু মনের মধ্যে রাগের পারদ থরথর করে বাড়ছে তবে এই জোকারের মতলবটা কি তার জানা দরকার। এভাবে সবার সামনে তাকে উডবি বলার কারণ তাকে বলতে হবে। তার আগে এর পিছু ছাড়ছে না সে।

আচম্বিত সৌরভ বলে উঠল কি ব্যাপার বলো তো? তোমার আজকে কোনো রাগটাগ লাগছে না। আমি তোমাকে বললাম তুমিও চলে আসলে।

প্রিয়া স্মিথ হাসলো। কোনো ভণিতা ছাড়াই বললো,

আমি আপনার উডবি হই না। আপনি বলবেন আর আমি আসবো না তা’কি হয়?

সৌরভ চমকে উঠলো। লাফ দিয়ে বাইক থেকে নামলো। তারপর ধীরে ধীরে প্রিয়ার একদম মুখের সামনে আসলো। চার-পাঁচ ইঞ্চি ব্যবধান শুধু তাদের মধ্যে।

সৌরভের এত কাছে আসা দেখে প্রিয়া আত*কিত হয়ে পড়লো। সৌরভের মতিগতি তার কাছে ভালো ঠেকছে না। এই সার্কাস তার সাথে কি করতে চাইছে?

সৌরভ প্রিয়ার দিকে পূর্ণদৃষ্টি রেখে নেশালো গলায় বলল,

‘মাশাআল্লাহ’

তোমার ঐ দুটি অধর এতো মোহনীয় কেনো প্রিয়ারানী? একদম রক্তজবার ঐ লালচে পাপঁড়ির মতো। ইচ্ছে করছে ঐ অধরে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে। কিন্তু?

প্রিয়া তাজ্জব বনে গেছে সৌরভের এহেন বাক্যে। অস্থির হয়ে ঠোঁটের উপর হাত চে*পে রেখেছে। লজ্জায় আর অস্থিরতায় বার বার শুকনো ঢোক গিললো।

প্রিয়ার এমন অস্থিরতা দেখে সৌরভ শরীর ঝাঁকিয়ে হো হো করে অট্টহাসিতে ফে*টে পড়লো। পুনরায় সে আবার তার কাছে গিয়ে এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

কি ভাবছিলে আমি এটাই বলবো? তারপর বাঁকা হাসি দিয়ে বললো নামো আমার বাইক থেকে। মনে আছে কি বলছিলে আমাকে, আমি পাবলিক টয়লেট তাই না! তোমার পিছনে তাকাও তো একবার প্রিয়ারানী।

প্রিয়া চকিতে মুখ ঘোরালো। বড় বড় অক্ষরে দেয়ালের মধ্যে খোদাই করে লিখা ‘পাবলিক টয়লেট’। প্রিয়া ভেবে পায়না নিছক মজার ছলে বলা কথার জন্য তাকে পাবলিক টয়লেটের সামনে এই জোকার নিয়ে এসেছে। ভাবতেই গা ঘিন ঘিন করছে তার।

সৌরভ বাঁকা হেসে আবার বলে উঠল,

আমাকে পাবলিক টয়লেট বলার শা*স্তি এইটা, বুঝলে! নামো এখন আমার বাইক থেকে। এবার থেকে নেক্সটাইম কিছু বলার আগে দুই হাজারবার ভাব্বে।

প্রিয়ার মেজাজ চটে গেল। এই সার্কাস আসলেই একটা জোকার। এত বড়ো অপমান করলো তাকে। ছিঃ! কিন্তু সেও হার মানার পাত্র নয়। কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে বললো,

আমি নামব না। কি করবেন আপনি? বাইকে উঠানোর সময় মনে ছিলো না তখন।

সৌরভ কুঠিল হাসলো। ঠিক আছে তোমার মর্জি। তারপর প্রিয়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,

আমার দু’হাত তোমার কোমরে রেখে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে তারপর ধীরে-সুস্থে বাইক থেকে তোমাকে নামাবো। তখন আমার বুকে তুমি একদম হরিণ ছানার মত গুটিশুটি মেরে লেপ্টে থাকবে। আমার তপ্ত নিশ্বাস তোমার ঘাড়ে গিয়ে বার বার আঁচড়ে পড়বে। তুমি লজ্জায় বাঁকানো লতার মত নুয়ে পড়বে। চলবে।

প্রিয়া আর কোনো বাক্য বিনিময় না করেই আমতা আমতা করে বললো,

থাক আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না। আমি নিজেই নেমে যাচ্ছি।

সৌরভ আর একমূহুর্তও দেরি করলো না। শুধু যাওয়ার আগে একবার তার দিকে তাকিয়ে বললো গুড গার্ল। সবসময় আমার কথা শুনবে। বাই প্রিয়ারানী।

প্রিয়ার রাগে পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। জোকার এইভাবে তার ব*দলা নিলো। আশেপাশে চোখ বুলালো এখানে তেমন মানুষ নেই। কিছুটা শঙ্কিত সে কিন্তু তার চোখ আটকালো পাবলিক টয়লেটের গায়ে একটা লিখা দেখে,

যৌন সমস্যায় ভুগছেন, কোনো ব্যাপার না আমাদের কাছে আছে স্বপের ঔষধ। নিমিষেই আপনার সমস্যা উধাও হয়ে যাবে। চাইলে আপনারা আমার বাড়ি এসেও চিকিৎসা নিতে পারেন। আপনার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে কাজ করা হবে। নতুবা নিচের নাম্বারে যোগাযোগ করুন। ০১৮৭১**

প্রিয়া লিখাটা দেখে কুটিল হাসলো। তারপর ব্যাগ থেকে মার্কার বের করে খচ খচ করে সৌরভের নাম্বারটা বসিয়ে দিলো পাশে। আগের নাম্বারটা মুছে দিলো। দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সৌরভের নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে আনমনে মিটমিট করে হাসলো।

আহ্! বেচারা আজ থেকে শান্তির ঘুম দিতে পারবে না।
_____________

বাসায় প্রবেশ করতেই মারিয়ার মুখ কেমন হাস্যেজ্জ্বল দেখাচ্ছে। পাশেই আনোয়ারও খুব প্রানোবন্ত। প্রিয়া জিজ্ঞেস করবে ভেবেও জিজ্ঞেস করলো না। তাকে দেখে মারিয়াই বলে উঠল এত দেরি হলো যে আজকে?

প্রিয়া অতি সন্তপর্ণে জবাব দিলো দুপুরবেলায় রিকশা পাইনি তাই দেরি হয়ে গেছে। এজন্য অনেকটা হেটে আসছি আজকে। এখন তো আমার খিদে লাগছে প্রচুর।

যা ফ্রেশ হয়ে আয় আমি ভাত বাড়ছি। আমরাও তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম এতক্ষণ।

প্রিয়া দ্রুত কদম বাড়ায় নিজের রুমের দিকে। কিন্তু রুমে গিয়ে যা দেখে তাতে খুশির চোটে এক চিৎকার দেয়। মারিয়া আর আনোয়ার মিট মিট করে হাসে মেয়ের এমন কান্ডে।

আচমকা চিৎকার শুনে প্রীতি ভয় পেয়ে যায়।বুকে বার কয়েক থু থু দেয়। প্রিয়া দৌড় দিয়ে এসে ঝাপ্টে ধরে প্রীতিকে। দু’জন দুজনকে জড়িয়ে ধরে হু হা করে চিৎকার করতে লাগলো।

প্রীতি শেষে বললো বইন এবার ছাড় দেয় গরম লাগের। প্রিয়া ছাড়লো তবে প্রশ্ন করতে দেরি হলো না। কখন এলি তুই?

প্রীতিও জটপট জবাব দিলো দুপুরেই।

প্রিয়া তো হেব্বি খুশি নিজের সমবয়সী খালাতো বোনকে পেয়ে। প্রীতি প্রিয়াকে তাড়া দিলো জলদি ফ্রেশ হ। তোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে পেটের ক্রিমি মরে গেলো সব।

প্রিয়া হাসতে হাসতে বাথরুমে গেলো।

খাবার খেয়ে সবাই সবার রুমে চলে গেছে। প্রীতি, প্রিয়াও নিজের রুমে বসে আছে। দু’জন অনেকদিন পর একসাথে হয়েছে তাই গল্পের ফোয়ারা শেষই হচ্ছে না।

ঘড়ির কাটায় তখন বিকেল ৫টায়। গল্পে মশগুল হয়ে কখন দুজন ঘুমিয়েছে টেরই পায়নি। মোবাইলের কর্কশ শব্দে প্রিয়ার ঘুম ভেঙে যায়। নিদ্রাঘোরে তখনও বুঝতে পারে না কে কল দিয়েছে? রিসিভ করে কানে দিতেই হুঁশ আসে তার।

ওপাশ থেকে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কান্নার শব্দ আসছে। অস্পষ্ট বেদানার্ত সুরে বলে উঠল আমার সাথে দেখা করতে পারবি?

প্রিয়া আৎকে উঠে লুবনার কান্নাজড়িত কন্ঠস্বর শুনে। তড়িঘড়ি উঠে বসে ভালো করে শোনার জন্য। তারপর জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে লুবনা? কাঁদছিস কেনো?

লুবনা নিরুত্তর থাকে। মুখে বার কয়েক একটা কথায় আওড়ালো,

বাসার বাইরে একটু আসবি। আমি তোদের গ্রেটের সামনেই আছি।

প্রিয়া স্তব্ধ হয়ে গেলো লুবনার কথা শুনে। এই মেয়েটার হঠাৎ হয়েছে টা’ কি? দুপুরেও তো ভালো ছিলো। মুখের কোণে উজ্জ্বল হাসির আভা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু কি এমন হয়েছে যার জন্য মেয়েটা তাকে তলব করছে। ধরফড়িয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ে।

প্রিয়া ত্বরিতগতি নেমে আসে বাসার নিচে।

লুবনাকে উদ্বাস্তুর মত লাগছে। ভীষণ অবলা অসহায়ের মত তাদের বাসার সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সে। প্রিয়া হতবিহ্বল লুবনার এমন দৈন্যদশা দেখে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা ঝর ঝর করে চোখের পানি ছেড়ে দেয়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল লুবনা। কান্নাজড়িত কন্ঠে তার কথা অস্পষ্ট যা বোঝার সাধ্য নেই প্রিয়ার। তবুও অনেক কষ্টে বোঝার চেষ্টা করলো সে লুবনা কি বলতে চাই।

লুবনার বার কয়েক আওড়ানো বুলি শুনে থমকে যাই প্রিয়া।

তোর আর সৌরভের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে কখন? কিন্তু আমি যে সৌরভকে অনেক আগে থেকে পছন্দ করি প্রিয়া।

লুবনা এইটুকু বলে থেমে যায়। কান্নার ফোঁপানো আওয়াজ ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো কথা সে বলতে পারে না। প্রিয়া নিজেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় লুবনার কথা শুনে। কি সান্ত্বনা দেবে তার জানা নাই। লুবনাকে শান্ত করতে বলল,

তুই যে সৌরভকে পছন্দ করিস, সেটা তিনি জানেন?

লুবনা না বলে মাথা দোলায়। তার মানে সৌরভ জানে না। প্রিয়া ভালই মসিবতে ফেসেছে। এই লুবনাকে কিভাবে বুঝাবে মাথায় আসছে না। তখন বললো তোর কাছে সৌরভের নাম্বার আছে।

লুবনা হ্যাঁ বলে মাথা দোলায়। প্রিয়া বলে যা তুই ফোন করে তার সাথে কথা বল। তোর মনের কথা জানা দেখনা কি হয়?

লুবনা ব্যথিত গলায় বলল সৌরভের সাথে তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে এখন কি সে আর আমার সাথে কথা বলবে?

প্রিয়া লুবনাকে জড়িয়ে ধরলো। কানের কাছে ফিস ফিস করে বললো ঐগুলো যাষ্ট মজা করে বলছে। আমার থেকে প্রতি*শোধ নিতে। আমি তাকে পাবলিক টয়লেট বলেছি তাই? আমার আর সৌরভের বিয়ে ঠিক হয়নি। আর না হবে?

প্রিয়ার কথা শুনে মূহুর্তে লুবনার মুখের আদল পরিবর্তন হয়ে গেল। তার চোখে-মুখে তৃপ্তির হাসি, আনন্দিত হয়ে বললো সত্যিই!

প্রিয়া হ্যাঁ বলে মাথা নাড়ালো।

লুবনা আত্মতুষ্টির একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। খুশিতে গদগদ হয়ে বললো ঠিক আছে আমি এখন বাসায় যাই কাল কলেজে দেখা হবে।

লুবনাকে বিদায় জানিয়ে মাত্রই সে বাসায় ঢুকতে যাবে তখন দেখে সৌরভও বাসায় ঢুকছে। প্রিয়াকে দেখে মিষ্টি একটা রহস্যময় হাসি উপহার দিলো।

প্রিয়া বিরসমুখে দাঁড়িয়ে আছে। এই জোকার আজকাল তাকে দেখে এমন করে হাসে কেনো?

চলবে,,,,,,,,,,,

প্রিয়ার মত আমিও চিন্তিত! এই সৌরভ এমন রহস্যময় হাসি কেনো দিলো? কেনো? কেনো?#শত্রু_শত্রু_খেলা
#পর্ব_১০
#মেঘা_সুবাশ্রী (লেখিকা)

প্রকৃতিতে এখন বসন্তকাল হলেও সন্ধ্যোর পর থেকে দমকা হাওয়াসহ ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে বজ্রপাতসহ বিজলিও চমকাচ্ছে। চারদিকে বাতাসের শো শো শব্দের প্রতিধ্বনি হচ্ছে। বৃষ্টির পানির ছিঁটে পড়ার কারণে দরজা জানালা সব বন্ধ করে নিজ কাজে মনোযোগ দিয়ে বসে আছে সৌরভ। পড়ার স্তূপ পড়ে আছে তার সামনে। আজকাল তারও পড়তে ইচ্ছে করে না। কিন্তু না চাইলেও পড়তে হবে তাকে। এটাই তার একাডেমিক জীবনের শেষ পড়া। পূর্ণ মনোযোগের সাথে সে বইয়ের মধ্যে ডুবে আছে।

দৈবাৎ ভো ভো কম্পিত শব্দে তার মোবাইল কেঁপে উঠলো। সৌরভ চমকালো। এই অবেলায় থাকে কল দিলো কে। নাম্বার দেখে ভ্রু কুঁচকালো এই নাম্বার সে চিনে না। প্রথমবার অগ্রাহ্য করলেও শেষে রিসিভ করলো কোনো প্রয়োজনীয় কল ভেবে। কিন্তু মেয়েলী কন্ঠ ভেবে থমকালো। নিজেকে ধাতস্থ করে প্রশ্ন করলো,

কাকে চাই?

অপর পাশের কম্পিত কন্ঠস্বর। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল আমি কি আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি ভাইয়া।

প্রয়োজনীয় হলে বলতে পারেন। অপ্রয়োজনীয় হলে রেখে দিন। আমার অতো সময় নেই আপনার সাথে গল্প করার।

আপনি কাউকে পছন্দ করেন?

মেজাজ চটে গেলো সৌরভের। কোথায় থেকে আসে এই আকাইম্মাগুলা? আমি কাকে পছন্দ করবো আর কাকে করবো না সেটা কি এদেরকে বলতে হবে না’কি? তিরিক্ষি মেজাজে বললো,

হাও রিডিকিউলাস! আমি প্রথমেই বলেছি প্রয়োজনীয় হলে কথা বলুন নয়তো রেখে দেন। আপনার ঐ প্রশ্নের জবাব দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে তো মনে হচ্ছে না। এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এবার ফোন রাখতে পারেন। আর হ্যাঁ, দ্বিতীয়বার কল করবেন তো কথা বলার মতো অবস্থায় আপনি থাকবেন না। মনে থাকে যেনো। ‘ইডিয়ট’

অপর পাশের মেয়েটির অপেক্ষা করলো না। সে নিজেই কল কেটে ফোন বিছানায় ছুড়ে ফেললো। মেজাজ শান্ত করতে বারান্দায় ছুটে গেলো। বৃষ্টির মধ্যে যদি নিজের রাগ পানি হয়ে ধুয়ে যায়।

বারান্দায় বসে বৃষ্টির মধ্যে নিজেকে স্নিগ্ধ করছে। কিন্তু আনমনে এক অপ্রত্যাশিত জিনিস দেখে সে থমকালো।

প্রিয়া বারান্দায় বসে আপনমনে বৃষ্টি বিলাস করছে। তার এলোমেলো খোলা চুলগুলো বাতাসের সাথে উড়ে উড়ে জলকেলি খেলছে। বিজলি চমকানোর ক্ষীয়মান আলোতে মেয়েটার বিমূর্ত প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট বিদ্যমান।

সৌরভের দৃষ্টি এখনো বিমূর্ত প্রিয়ার দিকে নিবদ্ধ। কতক্ষণ সময় পেরিয়েছে সৌরভ নিজেই জানে না। আচমকা তার হুঁশ এলো। সে এভাবে মেয়েটাকে দেখছে কেনো? তার মাথা গেছে নাকি?

কিন্তু প্রিয়ার কোনো হেলদোল নেই। সে বৃষ্টিকন্যা হয়ে বসে আছে চুপটি করে। এই বৃষ্টি দেখলে তার কেমন প্রেম প্রেম পায়। সে জানে না কেনো? কিসের জন্য? তবে অদ্ভুত সব অনূভুতি এসে জমা হয় তার মানসপটে। তাই ছুটে আসে নিজের অজ্ঞাত অনূভুতিকে বুঝার জন্য। নিজের অর্ধভেজা তনু লেপ্টে আছে বারান্দার দেয়ালের সাথে। তার দৃষ্টি নিবন্ধ পাশের বড় আমগাছের দিকে। সেখানে গাছের পাতা থেকে বৃষ্টি পড়ার টুপ টুপ শব্দ আসছে। সে না চাইতেও মনটা সেখানে আটকে আছে।

চৈতন্যহীন প্রিয়ার পাশে যে আরও একজন ব্যক্তি আছে সেই সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত সে। অথচ সেই ব্যক্তির সম্পূর্ণ দৃষ্টি জুড়ে ছিল তার প্রতি একরাশ মুগ্ধতা।

প্রিয়ার অর্ধভেজা শরীর দেখে সৌরভের হুঁশ এলো। সে কর্কশ গলায় চেঁচালো,

এই ভূত্নীই, খুব শখ হচ্ছে বুঝি এই রাতে ভিজে জ্বর বাঁধানোর।

প্রিয়া বিদ্যুৎ চমকানোর মতই চমকে উঠলো। সে সৌরভ থাকলে খুব একটা বারান্দায় আসেনা। তার উপর তার শরীরের অর্ধেক ভিজে লেপ্টে আছে। ছিঃ! কি বিচ্ছিরি লাগছে তাকে। নিজেকে নিজে শ’ খানেক গা*লি দিলো। এত জ্ঞানশূন্য কখন হলো সে। লজ্জায় আর জড়োতায় কাচুমাচু করছিলো। গায়ের ওড়না ঠিক করলো দ্রুতই। প্রতিত্তোরে কি বলবে কোনো কথাই খুঁজে পাচ্ছে না।

সৌরভ নিশব্দে হাসলো। প্রিয়ার এমন লজ্জামাখা মুখ দেখলে মেয়েটাকে কেমন আদুরে আদুরে লাগে তার কাছে। তাই তো মেয়েটাকে সে বার বার লজ্জা দেয়। বৃষ্টিময় তিমির রাতে সৌরভের হাসি-মাখা মুখ প্রিয়ার নজরে এলো না। প্রিয়ার দৃষ্টি নত হয়ে আছে তখন থেকেই। আজকাল যখন তখন সে এই ছেলের সামনে লজ্জায় পড়ে যাই।

সৌরভ এবার কোমল গলায় বললো,

বাসায় চলে যাও। নয়তো ঠান্ডা লেগে পরে জ্বর উঠবে। এভাবে অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজা ঠিক না।

প্রিয়া চলে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হলেই পিছন থেকে সৌরভ ডেকে উঠলো,

প্রিয়া শোনো,

জ্বী, কিছু বলবেন?

সৌরভ কি বলবে এখন। মেয়েটাকে কেনো ডেকেছে সে নিজেই জানে না। আমতা আমতা করতে লাগলো।

তুমি দ্রুত কাপড় চেইঞ্জ করে নাও। পড়াশোনা কি সব ছেড়ে দিয়েছো? যাও পড়তে বসো।

আচ্ছা, বলে মাথা নাড়ায় প্রিয়া। তারপর নৈশব্দে প্রস্থান করে দ্রুত।

সৌরভ দীর্ঘ এক শ্বাস ছাড়ে কি বলতে কি বলেছে সে নিজেই জানে না। তবে তার মনটা স্নিগ্ধ এক সজীবতায় ভরে গেছে। সেও বারান্দার দরজা লাগিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। বিরক্তিকর মনটা এখন বেশ ফুরফুরে আছে।

রাতের গভীরতা ক্রমশ বাড়ছে। বাইরে এখন বৃষ্টি নেই বরং অন্তরীক্ষে শুভ্র এক ফালি চাঁদের কিরণে উজ্জ্বল হয়ে আছে। সৌরভ হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। চোখের কোণে ঘুম আসি আসি করছে। আচানক তার বেহায়া মোবাইল সশব্দে ভো ভো করে কেঁপে উঠলো। সৌরভ প্রচন্ড বিরক্তবোধ করলো। কিন্তু নাম্বার দেখে পুরাই দস্তুর অবাক।

সে জানে না, কখনো দেখেনি এই নাম্বার? কিছু একটা চিন্তা করে কলটা রিসিভ করলো। কিন্তু অপর পাশের পুরুষালি ব্যক্তিটির কথা শুনেই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বুঝার চেষ্টা করছে ব্যক্তিটি চাইছে কি?

ভাই আমারে বাঁচান, আমার অনেক সমস্যা। বিশ্বাস করেন আমি বেশি যৌন সমস্যায় ভুগতেছি। আপনি যেখানে বলবেন আমি আসব? যত টাকা চান আমি দিবো তাও আমারে বাঁচান। যদি বলেন রাতে আপনার বাড়ি আসতে তাও আসবো শুধু আমার সমস্যাটা ভালো করে দেন,,,, বাকিটা বলার আগেই সৌরভ রামধমক দিলো।

মাথা গেছে নাকি আপনার? কোত্থেকে কল দিছেন? কি সব আবোল তাবোল বকতেছেন? আর কিসের সমস্যা দূর করবো আমি, রাখেন তো মিয়া।

সৌরভ ভেবে পাই না এত রাতে তার কাছে কিসের সমস্যার সমাধান চাই। লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লো সে। যদি মাথাটা ঠান্ডা হয় তার।

________________

ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো প্রিয়া প্রীতি। আচমকা প্রত্যুষ এলো তাদের কাছে। প্রিয়া অবাক না হলেও প্রীতি অবাক হলো প্রত্যুষকে দেখে।

প্রত্যুষ বোনের বিছানায় বসে আবদার করলো আপু আজকে আমি তোমাদের সাথে ঘুমায়। প্রিয়া বলার আগেই প্রীতিই বললো ঘুমা, কিসের সমস্যা ঘুমাইলে। তবে শর্ত একটাই হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে পারবি না, সটান হয়ে ঘুমাবি, পারবি?

প্রত্যুষ ভাবলো কিছুক্ষণ। কি বলবে উত্তর গোচ্ছাছিলো। তারপর আচমকা বললো জানো আপু আজকে আমাদের স্কুলে কি হয়েছে?

প্রিয়া ভাইয়ের কান্ড দেখে মনে মনে হাসছে। কিন্তু চোখমুখ শক্ত করে বললো না বললে জানবো কি করে?

প্রত্যুষের ভয় কেটে গেছে। এবার হাসি মুখে বললো জানো আপু, আমাদের ক্লাশের তিয়াশ আছে না সে রাফিদের ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করেছে। তিয়াশকে সবাই এখন চোর বলে ডাকে। তার সাথে কেউ কথা বলে না।

তুই দেখেছিস তিয়াশকে চুরি করতে।

না আপু, আমি তো দেখেনি কিন্তু আয়ানরা বলেছে তিয়াশ একটা চোর। সে সবার ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করে। তার বাবাও একটা চোর। আরও অনেক কথা বলেছে তাকে।

শোন প্রত্যুষ, কখনো কারো কথা শুনে কোনো কিছু বিশ্বাস করবি না। যদি নিজের চোখে না দেখিস। তবে হ্যাঁ’ দেখার পরও ভালো করে যাচাই করবি তুই যা দেখেছিস তা সত্যিই কিনা?

আচ্ছা, আপু।

তুই তিয়াশকে চোর ডাকবি না। কালকে গিয়ে তিয়াশকে সরি বলবি। তারপর ওর থেকে আসল কথা জেনে নিবি। সবাই ওকে কেনো চোর ডাকে।

ঠিক আছে আপু।

এখন তুই উঠ আমাদের মাঝখানে ঘুমাবি। পারবি?

হ্যাঁ, পারবো তো। আপু আমাকে একটা ভূতের গল্প শোনাবে।

ডাইনী বুড়ির শোনালে হবে।

হুম হবে।

প্রিয়া ভাইয়ের মাথায় হাত রেখে আপনমনে গল্প শোনাতে লাগলো। গল্প শুনতে শুনতে প্রত্যুষ ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রীতিও গভীর ঘুমে নিমগ্ন। কিন্তু তার চোখের ঘুম উধাও। অন্তরীক্ষে উদিত তারকারাজির দিকে তার অপলক দৃষ্টি। এক পশলা বৃষ্টির পর অন্তরীক্ষে চাঁদের এমন উজ্জ্বল দীপ্তি সত্যিই অসাধারণ!

___________

এদিকে ঘুম নেই সৌরভের দু’চোখে। কিছুক্ষণ পর পর তার মোবাইল কেঁপে উঠছে। শেষে বাধ্য হয়ে সে মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু সে ভেবে পায় না তার কাছে এরা কিসের সমস্যার সমাধান চাই।

দু’চোখ হাজার চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারলো না। বার বার একটা প্রশ্ন আসছে মনে এরা কারা ভাই? তার নাম্বার কোথায় পেলো?

চলবে,,,,,,,,,

সৌরভকে কারা এত বিরক্ত করছে বলেন তো।
বিশ্বাস করেন সৌরভের মতো আমিও ভীষণ চিন্তিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here