শালুক ফুলের লাজ নাই পর্ব -৭+৮

#শালুক_ফুকের_লাজ_নাই(০৭)

আফিফা বসে আছে আজাদ সাহেবের সামনে। আজাদ সাহেবের চেহারা রক্তিম হয়ে আছে।যেকোনো সময় মেয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন এরকম একটা ভাব তার মধ্যে স্পষ্ট।
ধ্রুব বড় চাচার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। একটু দূরেই আদনান বসে রাগে ফুঁসছে।

আফিফা বারবার চোখ মুছছে।আজাদ সাহেব ধমকে বললেন,”তুই এখন কি চাস আমাকে সেটা বল?আমি তোকে দরকার হলে টুকরো টুকরো করে কে/টে নদীতে ভাসিয়ে দিবো মনে রাখিস,তবুও তোর বিয়ে হবে আমার পছন্দের ছেলের সাথে। ”

আফিফা কোনো কথা বলতে পারলো না। শালুক দূরে দাঁড়িয়ে কাঁপছে ভয়ে।সবার থমথমে মুখ দেখে শালুকের আরো ভয় করছে।

আফিফা জবাব দিলো না।

আদনান চিৎকার করে বললো, “ধরে কষে একটা থাপ্পড় দেন আব্বা।দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।বেয়াদব হইছে।”

আফিফা চট করে জবাব দিলো, “তোমার মতো বেয়াদব তো হই নি।বড়লোক মেয়ে বিয়ে করার জন্য তুমি যেভাবে নিজের ভালোবাসার মানুষকে অস্বীকার করেছো তেমন তো করি নি।”

আদনান চমকে উঠে আশার দিকে তাকালো। ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে আশা মিটিমিটি হাসছে। আশা কি কিছু বুঝতে পেরেছে?
আদনান সতর্ক হলো। আফিফাকে বিগড়ানো যাবে না।সব ফাঁস করে দিলে সোনার হরিণ হাতছাড়া হয়ে যাবে তার।

আজাদ সাহেব আফিফার মুখ উপরের দিকে তুলে ধরে নরম স্বরে বললেন, “দেখ মা,যদি এমন হতো যে জহির ও তোকে পছন্দ করে তাহলে না হয় একটা ব্যাপার ছিলো আমরা ভাবতাম বিষয়টি নিয়ে। জহির আমাকে বলে দিয়েছে ইতোমধ্যে সে প্রয়োজন হলে বাড়ি থেকে চলে যাবে।তাহলে তুই বল,এই মুহূর্তে আর তোর কি করার আছে? ”

আফিফা জবাব দিলো না। সে নিজেও জানে তার কিছু করার নেই।তবুও একটা চান্স পেতে চেয়েছে। জহির ভাইকে জানাতে চেয়েছে নিজের মনের কথা। জহির ভাই রাজি থাকলে এক হিসেব আর না থাকলে অন্য হিসেব।

অশ্রু টলটলে চোখে ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে আফিফা বললো, “আমার আর কিছু বলার নেই ধ্রুব।আমি তবুও এখন নিজেকে বুঝাতে পারবো এই বলে যে আমি তো আমার মনের কথা জানিয়েছি জহির ভাইকে।সে আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আজ যদি এই কথাটা না বলতাম সারাজীবন আমার আফসোস থেকে যেতো এই ভেবে যে কেনো একবার সাহস করে সবাইকে জানালাম না।”

ধ্রুব কি করবে বুঝতে পারলো না। নয়নার ভীষণ খারাপ লাগলো আফিফার জন্য।মায়ের রুমে গিয়ে দেখে জহির বসে বসে নখ কাটছে।নয়নাকে দেখে হেসে বললো, “নিধি কেমন কামড় দেওয়া শিখেছে দেখেছিস তুই?দেখ না আমার নাকের কি অবস্থা করেছে পাজিটা”

নয়না ভাইয়ের সামনে বসে বললো, “আফিফা ভীষণ কাঁদছে। ”

জহির হেসে বললো, “সে তো আমি নিজেও দেখেছি আমার বোনকে কাঁদতে। তাতে কি?আমার বোনের কান্না দেখে কি ওদের মন গলেছে?
আদনান যে এরকম একটা বিট্রে করলো, কেউ কি একবার একটা কথা বলেছে ওরা?
তাহলে আফিফা কাঁদলে আমার কি?এমন তো না যে আমি ওকে মাঝপথে ছেড়ে দিচ্ছি বা ওকে ঠকাচ্ছি।আমি এসবে জড়িত ছিলামই না কখনো। তাহলে আমার মাথাব্যথা কিসের?”
নয়না ভাইয়ের হাত চেপে ধরে বললো, “তুই এতো কঠোর কেনো ভাই?”

জহির হেসে ফেললো বোনের কথা শুনে। তারপর বললো, “আমার মনে যে কি পরিমাণ মায়া তুই ভাবতে ও পারবি না। একদিন বুঝবি সেটা। ”

মেহমান এলো দুপুরের দিকে।দুই সিএনজি করে মোট ১০ জন,বাইকে করে এসেছে ৪ জন।
শালুক একেবারে জবরদস্ত একটা সাজ দিয়েছে। যেনো আজকে বিয়ে হচ্ছে কারো।ধ্রুব একটা সাদা শার্ট আর লুঙ্গি পরেই নিচের দিকে যেতে নিতেই শালুকের সাথে দেখা হয়ে গেলো তার।
মুহুর্তেই মেজাজ বিগড়ে গেলো তার।যেনো শালুক নয় একটা ক্লাউন দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। তবুও রক্ষা মাথায় হিজাব থাকায় একটু ভদ্র লাগছে তাকে।
কোনো কথা না বলে ধ্রুব চলে গেলো। পলক ও এসেছে সবার সাথে, ধ্রুব গিয়ে বন্ধুর সাথে হ্যান্ডশেক করলো।

সবাইকে সোফায় বসতে বলে নিজে গিয়ে ট্রে তে করে সবার জন্য শরবত নিয়ে এলো।
আদনান আশার হাত ধরে নেমে এলো নিচে।শালুকের ভীষণ রাগ হলো এতো আদিখ্যেতা দেখে।মেহমানদের সাথে শাপলার বয়সী দুটো মেয়ে এসেছে। ওরা পুরো বাড়ি ঘুরে দেখছে।মধ্যবয়সী তিনজন মহিলা উঠে গিয়ে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখলো,তারপর ফিসফিস করে কানাকানি করে নিজেদের মতো উপরের দিকে গেলো।

শালুকের কেমন যেনো লজ্জা-লজ্জা লাগছে হঠাৎ করে। মহিলা ৩ জনকে উপরের দিকে আসতে দেখে শালুক সরে গেলো। তারপর বের হলো মেয়ে দুটো কে দেখে ওদের সাথে ভাব করতে।
শালুকের এরকম সাজ দেখে মেয়ে দুটো হেসে ফেললো। একজন অন্যজনকে ফিসফিস করে কিছু বললো।
শুনতে না পেলেও শালুক বুঝতে পারলো ওকে নিয়েই কিছু বলছে ওরা।হঠাৎ করেই শালুকের মন খারাপ হয়ে গেলো। ওরা কি শালুকের সাজ নিয়ে কথা বলছে?

রুমে ঢুকে শালুক দরজা বন্ধ করে দিলো। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখলো।
কিছু বুঝতে না পেরে সব মেকাপ তুলে ফেললো রাগ করে। তারপর গায়ের টকটকে লাল জামাটা চেঞ্জ করে একটা হলুদ রঙের সুতি থ্রিপিস পরে নিয়ে,সাদা হিজাব পরে নিলো।

আফিফাকে সাথে নিয়ে আফিফার দাদী মেহমানদের সামনে গেলো।শাপলা, শালুক, ধ্রুবর বোন দিবা আসতে নিতেই ধ্রুব ধমক দিয়ে তিনজনকে উপরে পাঠিয়ে দিলো। সব নাশতা টেবিলে এনে ধ্রুব উপরে গেলো। তারপর তিনজনকে ধমক দিয়ে বললো, “বিয়ে হবে আফিফার,তোদের লজ্জা করে না ধেইধেই করে যে সেজেগুজে ওদিকে যাচ্ছিস?
দেখে মনে হয় যেনো তোদের দেখতে আসছে পাত্রপক্ষ। ”

শালুক মুখ বাঁকিয়ে বললো, “আমি কি সেজেছি না-কি! ”

ধ্রুব ভালো করে তাকিয়ে বললো, “একবার তো একেবারে জংলীদের মতো সেজেছিস।হঠাৎ করে সুবুদ্ধি হয়েছে দেখে না হয় সব তুলে ফেলেছিস।এটা কি হিজাব পরেছিস তুই?হিজাবে এতো দাগ কেনো কলমের?এই তোর কি খাতা নেই,হিজাবে এতো আঁকিবুঁকি করে রেখেছিস কেনো?”

শালুক মাথা নিচু করে বললো, “আমি তো হিজাব পরি না,অন্য হিজাব বেশি নেই।এটা আমার স্কুল ড্রেসের সাথের হিজাব।”

ধ্রুব বিড়বিড় করে বললো, “খবরদার,পায়ের গোড়ালির নিচ দিয়ে ভেঙে দিবো যদি তিনজন কে দেখি ওখানে এতো মানুষের সামনে গিয়ে ঢং করতে।”

ধ্রুব চলে যেতেই শাপলার কলিজা মোচড় দিয়ে উঠলো। আহা,এতো যত্ন করা মানুষটা কি না তার হবে না!সে না-কি অন্য কাউকে ভালোবাসে!

শাপলা বিছানার উপর ধপ করে বসে পড়লো। তার কিছুই ভালো লাগছে না এখন।আফিফা আপার এসব দেখার পর শাপলা তওবা করেছে একশো বার।জীবনেও কাউকে বলবে না সে যে ধ্রুব ভাইকে পছন্দ করে।

কিছুক্ষণ পর মেহমানরা খাবার খেলো।আদনান আশা ও বসলো তাদের সাথে খেতে।আজাদ সাহেব দুই ভাইকে নিয়ে, বাবাকে নিয়ে বসেছে,খেতে খেতে বিভিন্ন কথা বলছে সবাই।ধ্রুব রান্নাঘর আর ডাইনিং টেবিলে দৌড়াদৌড়ি করছে খাবারের প্লেট বাটি হাতে নিয়ে। সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে,এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে।
আদিবা বেগম নিজের ছেলের উপর ভীষণ রাগ হলেন।

খাবার পর পাত্রপক্ষ জানালো তাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে,মেয়েপক্ষ গিয়ে তাদের বাড়িঘর দেখে আসুক আগামীকাল।মেয়েপক্ষের যদি সব পছন্দ হয় তারপর তারা এসে বিয়ের কথা পাকা করে যাবে।

আদিবা বেগম স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

মেহমান যেতেই আদিবা বেগম আদনানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন যেনো। ছেলেকে ধমকে বললেন,”বে-আক্কেলের মতো যে খেতে বসে গেলি তুই,একবার এটা মাথায় ছিলো না মেহমানদের খাবার এগিয়ে যুগিয়ে দিতে হবে?ধ্রুব ছেলেটা একা একা সব করলো আর তুই নাচতে নাচতে খেতে বসে গেলি!
আক্কেল কি তোর হবে না কোনোদিন? ”

আদনান লজ্জা পেলো কিছুটা। কিন্তু কিছু বললো না।কিছু বললে মা এখন অনেক কথা শুনিয়ে দিবে। আশার সামনে প্রেস্টিজ রক্ষা করা এখন দরকার।

আশা বললো,”তোমাদের এই ব্যাপারটা খুব সুন্দর। আমি খুব এনজয় করেছি।আদনান,আমাদের বিয়ের সময় ও কি এরকম দেখাদেখি হবে?আমাকে ও কি আফিফার মতো করে সেজে আসতে হবে?”

ধ্রুব হেসে বললো, “না আশা,তোমার এসব লাগবে না।তোমার আর ভাইয়ার বিয়ের কথা তো সবাই জানেই।শুধু একটা ডেইট ফিক্সড করা হবে,তারপর কবুল বলে তুমি চলে আসবে আমাদের বাড়িতে।”

আশা ধ্রুবর দিকে তাকালো। শ্যামলা বর্ণের,লম্বা গড়নের,এক মাথা ঝাঁকড়া চুলের এই ছেলেটাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে লুঙ্গিতে।
আদনানকে আশা লুঙ্গি পরতে দেখে নি কখনো। আদনান মনে প্রাণে পশ্চিমা সংস্কৃতি ধারণ করে পশ্চিমাদের মতো হতে চায়।ওর মধ্যে কোনো স্বকীয়তা নেই।

আশা আদনানকে বললো, “তুমি একবার লুঙ্গি পরিও তো,কেমন লাগে তোমাকে দেখবো।”

আদনান হেসে বললো, “পাগল হয়েছ তুমি আশা?আমি আর লুঙ্গি! ইম্পসিবল!
কিছুদিন পর আমেরিকান মেয়ে বিয়ে করে আমেরিকান হয়ে যাবো। আমি না-কি এখন লুঙ্গি পরবো?”
আশা কিছুক্ষণ ধ্রুবর দিকে থাকলো।

ধ্রুব নিজের মতো করে কথা বলছে দাদা দাদীর সাথে। তারপর বের হয়ে বাজারের দিকে গেলো।

শালুক সন্ধ্যা বেলায় বই নিয়ে বসলো। ইংরেজি একটা প্যারাগ্রাফ মুখস্থ করতে গিয়ে আধাঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে গেলো। আধাঘণ্টার চেষ্টার মধ্যে শালুক দুই পেইজ ভর্তি করে ফেললো হাবিজাবি আঁকিবুঁকি করে। তারপর শালুক অনুধাবন করতে পারলো, সে যে আসলে এক লাইন ও মুখস্থ করতে পারে নি।
বিরক্ত হয়ে শালুক উঠে গেলো বই রেখে।আধা ঘন্টা পড়ে ও যদি এক লাইন মুখস্থ করা না যায় তবে সেই দায়ভার কি শালুকের?কিছুতেই না।বরং যারা এই প্যারাগ্রাফ লিখেছে তাদের। তারা স্টুডেন্টদের উপযোগী করে লিখতে আরে নি বলে নিজেকে বুঝ দিয়ে শালুক আনন্দ চিত্তে শাপলার রুমে গেলো।

শাপলার রুমে গিয়ে দেখলো আফিফা,শাপলা,আশা,দিবা বসে আছে। আশাকে দেখে শালুক কিছুটা বিরক্ত হলো। কিন্তু তা প্রকাশ করলো না। আফিফার কান্না দেখে শালুকের মন খারাপ হয়ে গেলো।

সবাই মিলে আফিফাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।

ধ্রুব এলো আটটার দিকে। ততক্ষণে আফিফার কান্না থেমেছে। হাতে করে নিয়ে এলো চারটি শপিং ব্যাগ।

শালুকের রুমে গিয়ে দেখে রুম খালি।তারপর শাপলার রুমে উঁকি দিলো।শাপলা,শালুক,আফিফা,দিবা,আশা সবাই বসে আছে গোল হয়ে। গলা খাঁকারি দিয়ে ধ্রুব ভেতরে এলো।তারপর ব্যাগগুলো সবার মাঝখানে রেখে আবার চলে গেলো।
দিবা হুমড়ি খেয়ে পড়লো ব্যাগের উপর।
ভেতরে দুটো করে শপিং ব্যাগ।ব্যাগের উপর সবার নাম লিখা আছে। শাপলা খুলে দেখলো ৬ টা হিজাব।

শালুক বিরক্ত হলো আশার জন্য ও হিজাব এনেছে দেখে।শাপলা,শালুক,আশা,আফিফা,দিবা,নয়না সবার জন্য হিজাব এনেছে ধ্রুব।

শালুক নিজের হিজাব রুমে রাখতে এসে টেবিলের উপর একটা নীল কাগজ দেখতে পেলো। উৎসাহী হয়ে সেটা খুলতেই দেখলো ভেতরে লিখা,”ধ্রুবর ঘরের দেয়ালে,আশার টিশার্টে কে এসব লিখেছে তা আর কেউ না জানলেও আমি কিন্তু জানি।ধরা পড়ে গেলে শালুক।”

শালুকের বুক কেঁপে উঠলো এটা পড়ে।কে লিখাছে এটা?
না,এই হাতের লিখা তো তার অচেনা।বোকা শালুক বুঝলো না তার মতো অন্য কেউ বাম হাতে লিখতে পারে।
তড়িঘড়ি করে কাগজটা ছিঁড়ে ফেললো।

ধ্রুব শালুকের রুমে এসে বললো, “তোর টিচার ঠিক করে এসেছি। আগামীকাল বিকেল থেকে তোকে পড়াতে আসবে।”

শালুক মুষ্টি বদ্ধ করে হাত পিছনে নিয়ে বললো, “ঠিক আছে।”

ধ্রুব চেয়ার টেনে বসে বললো, “জানিস আজকে কি হয়েছে,আমার কেশবতীর কথা বলেছি না তোকে,ওর জন্য হিজাব কিনতে গিয়েছি মূলত। তারপর মনে হলো বাসায় ওরা আছে তাই সবার জন্য কিনলাম।”

শালুক মাথা নেড়ে বললো বুঝেছি।

ধ্রুব কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, “কি হয়েছে তোর?এরকম স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?হাতে কি পিছনে? ”

শালুক চমকে উঠে সব জানালা দিয়ে ফেলে দিলো। টেবিলের উপর ছোট একটা কাগজের টুকরো পড়ে গেলো তড়িঘড়িতে।
ধ্রুব খুলে দেখলো লিখা আছে “গেলে শালুক।”

শালুকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কি এটা?লাভ লেটার?”

শালুক ঘামতে লাগলো। কি জবাব দিবে শালুক?ধ্রুব ভাই যদি জানতে পারে তবে কি শালুককে আস্ত রাখবে?
মনে মনে ইয়া নাফসি জপতে লাগলো শালুক।

ধ্রুব মনে মনে বললো, “একটা বোকা ফুলের জন্য কখনো উতলা হবো,তা কে ভেবেছে কবে?”
#শালুক_ফুলের_লাজ_নাই(০৮)

নিস্তব্ধ রাত,আফিফা ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে। আকাশে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে একটু পর পর।আফিফার কলিজা ছিড়ে যাবার মতো ব্যথা হচ্ছে। একে-তো সে জহিরকে ভীষণ ভালোবাসে,তার উপর আজকে দেখতে আসা পাত্রকে আফিফার একটুও পছন্দ হয় নি। কেমন কেমন যেনো লেগেছে লোকটাকে।শেয়ালের মতো ধূর্ত যেনো।
এতো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে কি একটা নতুন জীবন শুরু করা যায়?
আফিফা তো এরকম চায় নি।জহির ভাইয়ের মতো শান্তশিষ্ট, নরম মনের একজন মানুষকে চেয়েছে সে।যেই জহির ভাই ছোট বেলায় খেলার সময় মারামারি হলে চুপচাপ এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকতো। সবাই যখন খেলতো জহির ভাই তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতো এক কোণে।ধ্রুব ভাই সবসময় তাকে টেনে খেলতে নিয়ে যেতো। সেই মুহুর্তে জহির ভাই লাজুক ভঙ্গিতে হাসতো।খাবার টেবিলে সবার হাজার আবদারের ভীড়ে জহির ভাই থাকতো নিরব।যাই দেওয়া হতো বিনা বাক্যব্যয়ে খেয়ে উঠে যেতো। আফিফার মনে পড়ে আজ অবদি কোনোদিন জহির ভাই মুখ ফুটে কিছু খেতে চায় নি।

হয়তো লজ্জা পেতো ভীষণ, মামাদের বাসায় থাকছে এই চক্ষুলজ্জায় জহির ভাই কখনো কারো দিকে তাকিয়ে কথা বলে নি।আদনান ভাই সবসময় ধ্রুব ভাই, জহির ভাইয়ের সাথে লেগে যেতো ঝগড়া।
সবসময় আফিফা দেখেছে ধ্রুব ভাইকে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে জহির ভাইয়ের পাশে।মুখচোরা জহির ভাই কেমন বিনীত ভঙ্গিতে চুপ হয়ে থাকতো।
আফিফার কিশোরী মন তো জহির ভাইয়ের এই লাজুকলতা, নিরবতা,মুচকি হাসি এসব দেখেই দ্রবীভূত হয়ে গেছে সেই কবে!ভালোবাসা কি অতো হিসেবনিকেশ করে হয় না-কি?

আফিফার রুমের দরজায় টোকা পড়লো। চোখ মুছে দরজা খুলতেই দেখে তার মা আদিবা বেগম দাঁড়িয়ে আছে। আফিফা জিজ্ঞেস করার আগেই তিনি বললেন,”আজকে তোর সাথে ঘুমাবো।বিয়ে হয়ে গেলে তো মা মেয়ে আর একসাথে শুয়ে গল্প করার সুযোগ পাবো না।তাই চলে এলাম তোর রুমে।”

আফিফা হেসে উঠলো। আফফা জানে মায়ের ভয় আফিফা ভুলভাল কোনো কান্ড করে বসে কি-না তা নিয়ে।এজন্য পাহারা দিতে এসেছেন তিনি আফিফাকে।

আদিবা বেগম মেয়ের হাত ধরতেই আফিফা কেঁদে উঠলো। মেয়ের এই বুক ভাঙ্গা কান্না দেখে আদিবা বেগমের ও বুক কেঁপে উঠলো। ভুল করছেন না তো তিনি!
মেয়েকে একটা সুখী জীবন দিতেই তো এই সম্বন্ধে রাজি হয়েছেন।ছেলের অনেক টাকা পয়সা আছে। সব তো ঠিক আছে। তবে মেয়ের এই কান্না কিসের?

কি করবেন কিছু বুঝতে পারছেন না।একবার কি জহির কে বলে দেখবেন?
জহির ছেলেটা তো খারাপ নয়।সবদিক দিয়েই ভালো। নিজেদের হাতের উপর বড় হওয়া ছেলে।
পরমুহূর্তে মনে পড়লো নিজের কৃতকর্মের কথা।
লিলি কি আফিফাকে ছেলের বউ করতে রাজি হবে?তিনি তো রাজি হন নি।আদনান বিদেশ যেতেই তিনি ও তো মত বদলে ফেলেছেন।

আদিবা বেগমের মাথা কাজ করছে না।মেয়েকে নিয়ে শুয়ে পড়লেন।ঘুমাতে ঘুমাতে টের পেলেন মেয়ে অন্যদিকে ফিরে কান্না করছে।বোবা কান্নার ফলে কেঁপে উঠছে সারা শরীর তার।

জহির বসে আছে তার রুমের বারান্দায়। নিচতলায় মায়ের রুমের পরের রুমটাই জহিরের।বাহিরে শুক্লপক্ষের চাঁদ উঠেছে। রুপোলী আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। জহিরের ভীষণ মন খারাপ লাগছে।
এরকম চাঁদনি রাত হলেই জহিরের মন খারাপ হয়ে থাকে।জহিরের বাবা নাজিমুদ্দিন এরকম এক চাঁদনি রাতেই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন পরকালে।

স্পষ্ট মনে আছে সব জহিরের।জহিরের তখন ১২ বছর বয়স,নয়নার ১০ আর জাবির ৭ বছরের।
জহির সেদিন ও জানালার পাশে বসে পড়ছিলো। বিজ্ঞান বই নিয়ে পড়তে বসেছে জহির।সেই সময় শুনতে পেলো বাবা নয়নাকে ব্যাকুল হয়ে ডাকছে।জহির ও ছুটে গেলো। তিনদিন ধরেই তার জ্বর ছিলো।নয়নার দুই হাত বুকে চেপে ধরে রেখেছিলেন বাবা।জহির আর জাবির যেতেই জহিরকে বললেন,”ভাই বোইনেরে দেইখা রাইখো বাবা।আমার যদি কিছু হইয়া যায় মনে রাইখো তুমি সবার মাথায় ছাতা হইয়া থাকন লাগবো।তুমি রোইদে পুড়বা,বৃষ্টিতে ভিজবা।তবে মা আর ভাই বোইনেরে যেনো রোইদ বৃষ্টি ছুঁইতে না পারে।তাগো যেনো কষ্ট না হয়। আমার নয়না মা’র মাথার উপরে তোমার বটগাছের লাহান থাকন লাগবো বাবা।মরনের সময় পর্যন্ত মনে রাইখো আমার জীবনের সবচেয়ে আপন,আমার আদরের দুলালি,আমার কলিজার টুকরা তোমার বোইন আছিলো,তারে খুশি রাখতে পারলে মরনের পরেও আমার কোনো কষ্ট থাকবো না।”

নিজের অজান্তেই জহিরের দুই চোখ ভিজে গেলো। কই,সে তো পারলো না বাবার কথা রাখতে।নিজের বোনের আহাজারি জহির নিজ কানে শুনেছে,পাগলের মতো হয়ে যেতে দেখেছে বোনকে।তবুও বড় মামীর মনের পাথর গলে নি।
অথচ সবাই জানতো আদনান আর নয়নার ভালোবাসার কথা। এবং ওদের বিয়ে হবে এটা ও বড়রা সবাই ভেবে রেখেছিলো। আদিবা বেগম নিজেও তো এসব নিয়ে কতো হাসি-তামাশা করতেন নয়নার সাথে।সব ভুলে গেলেন তিনি আদনান বিদেশের মাটিতে পা দেওয়ার সাথে সাথে।

আজও জহিরের ভীষণ ব্যর্থ মনে হয় নিজেকে এই কথা মনে পড়লেই।
রুমের খোলা দরজা দিয়ে কারো প্রবেশ হয়েছে টের পেতেই জহির বারান্দা থেকে রুমে এলো।
আফিফা দাড়িয়ে আছে রুমের মাঝখানে। আফিফাকে দেখে জহির কিছুটা অবাক হলো। সেসব বুঝতে না দিয়ে হেসে বললো, “কিরে,এতো রাতে তুই?কিছু লাগবে?কোনো সমস্যা হয়েছে কারো?”

আফিফা ছুটে এসে জহিরকে জড়িয়ে ধরলো। জহিরের বুকে মাথা গুঁজে কেঁদে উঠলো।
এক ঝটকায় জহির নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আফিফার থেকে দূরে সরে দাড়ালো। তারপর বললো, “মাঝরাতে আমার রুমে এসে এসব কি করছিস তুই?পাগল হয়েছিস?বের হ আমার রুম থেকে।”

আফিফা ফ্লোরে বসে পড়ে বললো, “কেনো জহির ভাই,কেনো তাড়িয়ে দিচ্ছো আমাকে?আমার কি দোষ বলো?একবার আমাকে ভালোবাসলে কি ক্ষতি হয় তোমার? আমি ভিখারির মতো তোমার কাছে একটু ভালোবাসা ভিক্ষা চাই জহির ভাই। ”

জহির কঠোর স্বরে বললো, “দেখ আফিফা,আমার এই ব্যাপারে কখনো কোনো আগ্রহ ছিলো না।তোকে আমি কখনো সেভাবে দেখি নি।তাছাড়া আমার ও তো মন আছে।আমার মন ও তো তোকে চাইতে হবে।আমার মন এরকম কিছু চায় না।তুই আমার মামাতো বোন আছিস,সেটাই থাক।আমার ব্যাপারটা একবার বুঝতে চেষ্টা কর,আমার মনের বিরুদ্ধে তো আমি তোকে ভালোবাসতে পারি না।”

আফিফা এগিয়ে যেতে নিলো জহিরের দিকে।জহির আরো দুই পা পিছিয়ে গিয়ে বললো, “খবরদার আফিফা,কাছে আসবি না।এসব নিয়ে যদি এতো বাড়াবাড়ি করিস তোরা,তবে ভালো হবে না।তোর প্রতি আমার এক ফোঁটা ইন্টারেস্ট ও নেই।আমি আমার এক ফ্রেন্ডকে ভালোবাসি। আশা করি, এর পর তোর আর বলার কিছু থাকবে না।যা আমার রুম থেকে।কেউ দেখলে ব্যাপারটা খারাপ দেখাবে।”

আফিফা কেঁদে বললো, “যাবো না।আমি এখানেই থাকবো।এই ফ্লোরে মাথা ঠুকে মরে যাবো। ”

রুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে আদিবা বেগম সব শুনলেন।মেয়েকে বিছানা ছাড়তে দেখে তিনি পিছু নিয়েছেন। মেয়েকে বাঁধা দেন নি তিনি।
রুমে এসে আফিফার হাত ধরে ফ্লোর থেকে তুললেন।বিনাবাক্য ব্যয়ে আফিফা মায়ের সাথে চলে গেলো।

ব্যাগ গুছিয়ে নিলো জহির সেই মুহুর্তেই।বাড়িতে থাকলে আফিফা কখন কোন পাগলামি করে বসে কে জানে!
এরচেয়ে ভালো চলে যাবে হোস্টেলে।ফজরের নামাজের পরেই জহির মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।

যাবার আগে নয়না একবার বললো, “একবার ভেবে দেখ আফিফাকে নিয়ে ভাই।”

জহির হেসে বললো, “মনের থেকে তো একটা ফিলিংস থাকতে হবে নয়না।সেটা আমার নেই আফিফার জন্য।বড় মামীর উপর রাগ হচ্ছে পরের ব্যাপার। জোর করে কি কিছু হয়।”

সকাল বেলা শালুক মুখ অন্ধকার করে ব্যাগ গুছিয়ে নিলো স্কুলে যাওয়ার জন্য। কিছুক্ষণ মা বাবার সাথে ঘ্যানঘ্যান করেছে আফিফার শ্বশুর বাড়ি দেখতে যাবার জন্য সবার সাথে। বাবা যেই একটু নরম হলো,সম্মতি দিতে যাবেন সেই মুহুর্তে যমের মতো হাজির হলো ধ্রুব ভাই।
কড়া গলায় শালুককে জিজ্ঞেস করলো, “লাস্ট কবে স্কুলে গিয়েছিস?”

শালুক জবাব দিতে পারলো না। স্কুলে টানা কয়েকদিন ধরে যাওয়া হয় না।

ফয়েজ আহমেদ সেই কথা শুনতেই বললেন,”না না,তোর এক্সাম সামনে। এখন স্কুলে যেতে হবে।তোর ওখানে যাওয়া চলবে না।বিয়ে হলে যাওয়ার অনেক সুযোগ হবে।এখন তুই স্কুলে যা।”

সেই থেকে শালুকের মন খারাপ। শালুক স্কুলে যাবার সময় দেখলো আশা একটা হিজাব পরে নিচে এসেছে। ধবধবে ফর্সা আশার গায়ের রঙ।বাবা আমেরিকান হওয়ায় আশা বাবার গায়ের রঙ পেয়েছে। তেমনই লাল চুল।দেখলেই বুঝা যায় তাকে খাঁটি বিদেশিনী।
আশাকে দেখে মুখ বাঁকিয়ে শালুক চলে গেলো।

একটা জাম কালার হিজাবে আশাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।আদনান আশাকে দেখে অবাক হলো। আশার এই লুকটা আদনানের অজানা।

আশা হাসতে হাসতে বললো, “জানো,ধ্রুব কাল রাতে আমাদের সবার জন্য গিফট এনেছে। আমার তো খুবই ভালো লেগেছে। ফার্স্ট টাইম আমি এই হিজাব ট্রাই করেছি।শাপলা আমাকে পরিয়ে দিয়েছে।সুন্দর লাগছে না?”
আদনান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। তারপর বললো, “তোমাকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে আশা।”

আশা মুচকি হেসে বললো, “তুমি তো কখনো আমাকে কিছুই গিফট দাও না।আমেরিকা থাকতে ও দাও নি কখনো, দেশেও দাও নি অথচ ধ্রুব কি সুন্দর সবার সাথে আমার জন্য ও মনে করে গিফট এনেছে। থ্যাংক ইউ ধ্রুব।”

ধ্রুব বসে বসে পাউরুটিতে জেলী মাখিয়ে খাচ্ছিলো। আশার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ওয়েলকাম বলে আবার ও খাবারে মনোযোগ দিলো।আদনানের মুড অফ হয়ে গেলো হঠাৎ করেই।
আশা কি ধ্রুবর প্রতি ইমপ্রেস হচ্ছে?
ধ্রুব কি আশাকে ইমপ্রেস করার একটা সুক্ষ্ম চাল চালছে না-কি!
সোনার হরিন হাতছাড়া হয়ে যাবে না তো ধ্রুবর জন্য?

তিক্ততায় ভরে গেলো আদনানের মন।আশার সামনে বারবার নিজের ইমেজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা করতেই হবে আদনানকে। ভেবে নিয়ে আদনান ঠিক করলো,আশাকে একা পেতে হবে, একা টাইম স্পেন্ড করে আশার মন অন্যদিকে ডাইভার্ট করতে হবে।

একটা কাপে চা ঢালতে ঢালতে আদনান বললো,”দারুণ একটা মুভি দেখবো আশা।তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।দুজন মিলে পুরো মুভিটা এনজয় করবো।”

আশা বললো, “না চলো ঘুরে আসি বাহিরে থেকে।”

আদনান বিরক্ত হলো। বাহিরে গেলে কি আশাকে একান্তভাবে পাওয়া যাবে?গাধী মেয়ে ওর প্ল্যান বানচাল করতে চাচ্ছে!

আদনান মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো,”আজকে না আশা,আমার হাঁটুতে একটু ব্যথা করছে। হাঁটতে পারবো না আমি।”

ধ্রুব বের হতে যেতেই আশা জিজ্ঞেস করলো, “কোথায় যাচ্ছো ধ্রুব?”

ধ্রুব জবাব দিলো, “বাহিরে যাচ্ছি, একটু ঘুরে আসি।”

আশা চা শেষ না করে দাঁড়িয়ে আদনানকে বললো, “তুমি তাহলে রেস্ট নাও,মুভি এনজয় করো।তুমি তো হাঁটতে পারবে না।আমি ধ্রুবর সাথে ঘুরে আসি।”

ধ্রুব বের হয়েছে শালুকের স্কুলে যাবার উদ্দেশ্যে, স্কুলের টিচারদের সাথে দেখা করবে আর সেই সাথে শালুককে একটু কড়াকড়ি দেওয়ার জন্য ও বলে আসবে।

আশাকে ধ্রুব বললো, “আমার তো একটু কাজ আছে আশা।আমাদের স্কুলে যেতে হবে,অনেকদিন হলো স্যারেদের সাথে দেখা করি না।”

আশা আগ্রহী হয়ে বললো, “আমার কোনো সমস্যা নেই।আমি ইন্টারেস্টেড তোমাদের স্কুলটা দেখতে।আদনানের কাছে তোমাদের স্কুলের অনেক গল্প শুনেছি। তোমরা সবাই না-কি অনেক ব্রিলিয়ান্ট ছিলে।”

আদনান কিছু বলার আগেই আশা বের হয়ে গেলো ধ্রুবর সাথে।চাইলেও আদনান যেতে পারলো না। গেলে তার মিথ্যে ধরা পড়ে যাবে যে!

একটা খয়েরী রঙের টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে ধ্রুব হাঁটতে লাগলো। আশা কিছুটা পিছন থেকে ধ্রুব কে লক্ষ্য করছে।ধ্রুবর চলাফেরা,কথাবার্তা সবকিছুতে কেমন একটা পুরুষালী ভাব আছে।
সেই তুলনায় আদনানকে আশার ন্যাকা মনে হয়। পুরুষ মানুষ হবে সিংহের ন্যায়,সারাক্ষণ কেনো সে বিড়ালের মতো চলবে!
আদনানকে ব্যাপারটা বলে ও আশা বুঝাতে পারে নি।

আশা থমকে দাঁড়ালো হঠাৎ করে। সে কি ধ্রুবর উপর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে?
এরকম তো কতো ছেলেকেই আশা দেখেছে।আশার তো এরকম কতোগুলো বয়ফ্রেন্ড আছে আমেরিকায়।কই তাদের কারো প্রতি তো আশা এভাবে ইমপ্রেস হয় নি।
তবে ধ্রুবকে নিয়ে আশা ভাবছে কেনো?ধ্রুবর সবকিছু আশার এতো ভালো লাগছে কেনো?

শেষ ক্লাসের স্যার এসে শালুককে বললো, “ধ্রুব এসেছে আজ স্কুলে।ছেলেটা ভীষণ ট্যালেন্ট। তোমার ফ্যামিলির সবাই তো আমাদের হাতেই মানুষ, সবাই তো মেধাবী শালুক,তুমি এমন কেনো পড়ালেখায়? ধ্রুব হেডস্যারসহ আমরা যতোজন তোমার ক্লাস নেই সবাইকে বিশেষ ভাবে বলে গেছে তোমাকে যাতে একটু কড়াকড়ি দেওয়া হয় পড়াশোনার জন্য। ”

শালুক দাঁত কিড়মিড়িয়ে মনে মনে বললো, “তোর মাথায় ১০০ টা কাক হা/গু মুতু করুক তারছিঁড়া ধ্রুব।আজকে যদি তোকে একটা কঠিন শাস্তি না দিছি তবে দেখিস।”

বিকেলে শালুকের টিচার এলো শালুককে পড়াতে।শালুকের মনে হলো কেউ যেনো ওর কলিজাটা কে/টে ফালাফালা করে দিচ্ছে।শালুকের রুমে গিয়ে ধ্রুব পলক কে বসতে বললো। তারপর শালুক ভোঁতা মুখ করে নিজের চেয়ার টেনে পড়তে বসলো।

পলক কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বললো, “তোমার সিলেবাস দাও আমাকে।সিলেবাসের কতোটুকু শেষ করেছো তুমি আগে সেটা দেখাও।”

শালুক সিলেবাস বের করে দিলো। ঝকঝকে তকতকে সিলেবাস দেখে পলক শালুকের দিকে তাকালো। তারপর বললো, “সিলেবাস তো একেবারে নতুন দেখছি,মনে হচ্ছে আজকেই ছাপা হয়েছে। তুমি কি এর আগে কখনো সিলেবাস ছুঁয়ে ও দেখো নি?”

শালুক বিরক্ত হয়ে বললো, “এসব ছোঁয়াছুঁয়ির মধ্যে শালুক নেই বুঝলেন স্যার।সিলেবাস ধরে কি করবো আমি?
আমি আজীবন এদিকে সেদিক তাকিয়ে এক্সাম দিয়ে পাশ করে এসেছি। এসব মেহেনত করা আমার পক্ষে সম্ভব না।”

পলক হতভম্ব হলো শালুকের এরকম জবাব শুনে।শালুক ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে বললো, “আপনার সাথে একটা ডিল করি স্যার।যেই এক ঘন্টা আপনি আমাকে পড়ানোর কথা,সেই এক ঘন্টা আপনি এসে আপনার মতো সময় কাটাবেন।ফোন টিপেন,চ্যাটিং করেন,কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনেন।কোনো সমস্যা নেই।আমি ও আমার মতো বসে খাতায় আঁকিবুঁকি করি।আপনার ও শান্তি আমার ও শান্তি।কেউ জানবে না কিছু।আমি এমনিতেও পরীক্ষায় খারাপ করবো এটা আমাদের বাসার সবাই জানে।আমাদের ছোট্ট যে নিধি আছে সেও জানে এটা।মতির মা আছে না,সেও আমাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ বানী করে রেখেছে।তাই আপনার বদনাম হবার কোনো চান্স নাই।
মাস শেষে আপনি বেতন পেয়ে যাবেন।এরকম সুযোগ কি আর আসবে স্যার?
এরকম অপরচুনিটি আপনাকে আর কেউ দিবে না।বলেন রাজি কি-না? ”

পলক ঘামতে শুরু করলো শালুকের কথা শুনে। এরকম স্টুডেন্ট কেউ কখনো পেয়েছে কি-না পলকের জানা নেই।

চলবে……
রাজিয়া রহমান
চলবে……
রাজিয়া রহমান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here