সংসার পর্ব ১৭+১৮

#সংসার
#পর্ব_১৭

#লেখিকা_সুরাইয়া_ইসলাম_সানজি।

“কি কি কর করিছিলে মে মেঘ, আমার কথা একবারও ভাবলে না? অন্তত পূর্ণতার কথা একবার ভাবতে। সামান্য ভুলে এত বড় শাস্তি দিতে একবারও তোমার আত্মা কাপল না? আমি আর দুইটা মিনিট পর আসলি কি হতো?”

রুদ্র স্যার হয়তো ভাবছে আমি আত্মহত্যা করছি, কি আজব এতটা সোজা জীবন চাইলেই কি নিয়ে নেওয়া যায়?

৩৩.
আমি কিছু না বলে হাতের ইশারায় ছাদের পাশে পরে থাকা ফোনটা ইশারায় দেখিয়ে দিলাম। স্যার সেদিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। তারপর ফোনটা তুলে আমার হাতে দিলে দেখি নিচে পরে গিয়ে আবার বন্ধ হয়ে গেছে। রুদ্র স্যার বেশ কয়েকবার খোলার চেষ্টা করলেও ফোনটা আর অন হয়না।
আমি আর কিছু না বলে সেখান থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে নিচে রুমে চলে আসলাম। ফোন চার্জে লাগিয়ে পূর্ণতার পাশে শুয়ে রুদ্র স্যারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম কিন্তু সারা দিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পরি।

মাঝ রাতে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমি হুরমুর করে ওঠে বসি। রুদ্র স্যার আমাকে তার কোলের মাঝে নিয়ে বসে আছে আর আমি কোথায় আছি ভাবতেই দেখি রুমের ভিতরের দোলনায় উপর শুয়ে আছি। গত দুই দিনের কথা মনে পরতেই আমি তাড়াতাড়ি করে রুদ্র স্যারের কোল থেকে ওঠে নিতে গেলে রুদ্র স্যার আমাকে পিছন দিক থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

“স্যার প্লিজজজ ছাড়েন, হাতে লাগছে।”

“মেঘ শান্ত হয়ে বসো, আমার সব কথা শুনো তারপর তোমার যা ইচ্ছে শাস্তি দিও। তবুও ইগনোর করো না।”

আমি কোন কথা না বলে চুপচাপ সেখানে বসে থাকি। স্যার আমার গালে হাত দিয়ে বলে-
“মেঘ আমার কথা বিশ্বাস করো আমি তোমাকে জেলাস ফিল করানোর জন্য এসব করলেও এর বাহিরে যে এত বড় সত্যিই লুকিয়ে ছিল আমি জানতাম না। বিশ্বাস করো।”

আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম-
“কোন কোন সত্যির কথা বলছেন আপনি? ওই মেসেজ নাকি ওই ভিডিও না ওই ছবির। কোনটা মিথ্যে আর কোনটা সত্যিই? কেন কেন এমন করলেন আমার সাথে? আমার ভালোবাসায় এক চিমটিও ক্ষাত ও ছিল না তবে কেন এমন করলেন? যে সত্যি আমি বার বার ভুলতে চাই সেই সত্যি কেন আবার সামনে নিয়ে আসেন?”

কথা গুলো বলতে বলতে আমি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠি। আমাকে শান্ত করে রুদ্র স্যার আস্তে তার বুকে জড়িয়ে নেয়। আমি তার শার্টের কলার ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠি।

“মেঘ বিশ্বাস কর, আমি জানতাম না তুমি এত বড় সত্য বুকের মাঝে বয়ে বেড়াচ্ছো। আমি সেদিন রুশার কাছে গিয়ে বলেছিলাম, সেই ছবি আর প্রথম মেসেজটা যেন ও তোমাকে দেয় আর ছদে দাড়িয়ে তোমার শব্দ পেলে যেন ওই কথা গুলো বলে। রুশা প্রথমে সাহায্য করতে না চাইলেও ওকে বলেছিলাম আমি ওর এর পরিবর্তে যে কোন ইচ্ছে পূরণ করব।
আর এই জন্যই আমি ইচ্ছে করে রুমে তোমার ফোনের পাশে আমার ফোনটা রেখে যাই। আমি ভেবেছিলাম তুমি ফোনে ওই সব দেখে ছাদে চলে আসবে। কিছুক্ষণ আমাকে বকবে অভিমান তারপর সবটা বলার পর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যখন তোমাকে ওই ছবি আর মেসেজ দেয় আর উপরে তোমার আসার অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্তু তুমি যখনই ছাদে আসো তখন রুশা জড়িয়ে ধরে আমার ঠোঁটে চুমু দিয়ে দেয়। আমি রুশাকে ছিটকে দূরে সরিয়ে দেই। সাথে সাথে ছাদে তোমাকে খুজে দেখি তুমি ছাদে নেই। আমি ভাবছি তুমি অভিমান করে চলে গেছো। তখনই আমি রুশাকে আমাদের বাসা থেকে চলে যেতে বললে, ও বলে আমি ওয়াদা করেছিলাম ওর একটা ইচ্ছে পূরণ করব তাই ওর ইচ্ছে আমি যেন ওকে ক্ষমা করে দেই। সেই সাথে বাসা থেকে তাড়িয়ে না দেয়। ও এই বিয়ে টায় থাকতে চায়।

ছোট বেলা থেকেই রুশা সব সময় আমাকে ভালোবাসত কিন্তু আমি কখনো ও কে বন্ধু ছাড়া ভাবে নি। হঠাৎ কাছে পাওয়ায় আবেগের বসে কিস করছে ভেবে আমি ওকে আর কিছু বলি নাই। কিন্তু আমি কখনো ভাবেনি এগুলো ওর পূর্ব পরিকল্পিত।

তারপর ছাদ থেকে আমি রুমে এসে ভাবছি তোমাকে সবটা বলে দিব। কিন্তু এসে দেখি তুমি ঘুমিয়ে পরেছো তাই ভাবছি তুমি প্রথম কথা গুলো শুনে চলে এসেছো। রুশা কিস করছে ওটা দেখলে এতক্ষণ শান্ত থাকতে না। তাই আমি অপেক্ষা করছিলাম তুমি কখন আমার থেকে সবটা জানতে চাইবে।
সেদিন চিলেকোঠায় বসে যখন ভিডিওর কথা বললে তখন থেকে সন্দেহ হয় কিসের ভিডিও? তাই তোমার সাথে কথা বলে জানতে চাইতাম কিন্তু তুমি আমাকে ইগনোর করছিলে। তাই সেই ফোনটা খুজি কিন্তু ওটাও কোথাও পাই না। তখন আমার সন্দেহ হইছিলো এর পিছনে নিশ্চয়ই বড় কিছু আছে। আর তাই রুশার কাছে সব কিছু জানতে চাইলে তোমার নামে ওল্টো কথা বললে তখন আমি উপরে তোমার কাছে ছাদে চলে যায়।
ছদে ওঠে তুমি নুইয়ে ফোন তুলছিলে আর আমি ভাবছি তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছো।

তারপর তুমি রুমে এসে ঘুমিয়ে পরলে আমি রুমে গিয়ে ফোনটা চার্জ থেকে খুলে অন করতেই ফোন খুলে যায়। আর সেই মেসেজ দেখতে গিয়ে ভিডিও চোখে পরে সেই সাথে শেষের মেসেজ টা। বিশ্বাস করো আমি এর ব্যাপারে কিছুই জানতাম না।”

আমি সব শুনে হতবম্ভ হয়ে যাই। আমার জানার পিছনে এত বড় একটা সত্যিই লুকিয়ে ছিল। কিন্তু তবুও অভিমান গুলো বড্ড ভারি হয়, এটা ভেবে যে ভিডিও মিথ্যে কিন্তু ছবি তো আর মিথ্যে না।

“কিন্তু ওই ছবি, আপনি আর রুশা ম্যামের।”

রুদ্র এবার হালকা হেসে বলল-
“এত কিছু মিথ্যে হলে ছবি টা আর কি করে সত্যিই হবে? এটা আমাদের প্রথম দিনের ছবি, তুমি তখন ঘুমিয়ে ছিলে কিন্তু আমি ছবিটা নিয়েছিলাম তারপর তোমার জায়গায় ইডিট করে রুশাকে বসিয়ে নিয়েছিলাম। আমি ভাবছিলাম তুমি ছবির সত্যিই টা বুঝতে পারবে কারন ছবিতে তোমার ঘাড়ে তিল আছে কিন্তু রুশার ঘাড়ে কোন তিল নেই। আর তাছাড়া তুমি কিভাবে এসব বুঝবে তুমি তো সন্দেহ করেই কূল পাওনা। ভাবতেই অবাক লাগে এমন একটা মেয়ে কি করে আমার অফিসে একদিন চাকরি পাইছিল?”

এতোক্ষণ অভিমান ভরা থাকলে, শেষের কথা টায় বেশ অপমান লাগলো, আমি না কিছবির সত্যিইটা ধরতে পারি নাই।
আমি কান্না মিশৃত হাসি মাখা গলায় ধমকের সুরে বললাম-
“দেখুন একটু মজা করবেন না। আমি ছবিটা ঠিক ধরেছিলাম কিন্তু ভিডিও টা দেখে সব এলোমেলো হয়ে গেছিলো।”

আমাকে হাসতে দেখে স্যার বলল-
“যাক আমার কুইনটার মুখে হাসি তো ফুটল। ওই সব ভিডিও কথা বাদ দাও আর কখন এসব কথা মুখেও তুলব না। তুমি তো আমার জেলাস হও বা না হও আমারই থাকবে।”

আমি স্যারকে একটু দূরে ধাক্কা দিয়ে সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম-
“আপনি কি রুশা ম্যামের সেই ভিডিওটা সব দেখেছেন?”

স্যার আমার দিক তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল-
“নাহ এখন পর্যন্ত দেখিনি। তবে আমার বউ যদি চায় তবে দেখতে পারি। না মানে আমার বউ টা এত হট থাকতেও যদি অন্য মেয়ের ভিডিও দেখতে হয়। সেটা তোমার কাছে ভালো লাগবে বলো তো?”

আমি স্যারের কথা শুনে সেখান থেকে লজ্জায় চলে আসলাম। লোকটা এমন কেন? সিরিয়াস মুহূর্তেও কি তার লজ্জা দিতে হবে।

আমাকে চলে আসতে দেখে পিছন দিক থেকে জোড়ে চেঁচিয়ে বলল-
“যাও যাও সুন্দরী, কত দূর আর পালাবে রাতে সেই তো আমার কাছেই আসতে হবে।”

সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠে দেখি রুদ্র স্যার আমার কোমড় জড়িয়ে শুয়ে আছে। জানালা থেকে কাচের আলো তার মুখে পরছে। সারা মুখে কমলতা ছড়িয়ে আছে। পাশেই গুটিয়ে পূর্ণতা ঘুমিয়ে আছে। আমি চোখ ভরে তাদের দুজন কে দেখলাম। এমন একটা সংসার প্রত্যেকটি মেয়ের স্বপ্ন। আর আমি না চাইতেই সব পেয়েছি।
এক সময় সব হারিয়ে ছিলাম তার পরিবর্তে আল্লাহ আজ আমাকে সব দিছে।

৩৪.
বেশ কয়েক মাস কেটে যায়। এর মাঝে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। রাইমা আপু মাঝে মাঝে বাসায় এসে কয়েক দিন থেকে চলে যায়। রাকিব ভাইও রাইমা আপুকে চোখের আড়াল হতে দেয় না। আকাশ ভাইয়ের এখানেই চাকরি হওয়ায় জেনি আপুও এখানে চলে এসেছে আর রুদ্রের অফিসে কাজ করছে। মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় এসে তারা দুজনে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে চলে যায়।
কিছু মাস পরেই জেনি আপুর আর আকাশ ভাইয়ার বিয়ে হবে।
আর সেই দিনের পর থেকে রুশা ম্যামকে আর এ বাসায় দেখিনি। আর তারপর থেকেও কখনো রুদ্র স্যারকে স্যার বলে ডাকেনি। বেচারা স্যার যেন না বলি তার জন্য কত কিছু করলো আর পরে নিজেই ফেসে গেল। শাশুড়ি মাও আমাকে আগের থেকে অনেক আপন করে নিয়েছে। আমাকে ছাড়া তার যেমন দিন শুরু হয়না তেমনই রাতও শেষ হয় না। পূর্ণতা এখন আদো আদো গলায় কিছু কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে পারে।

আমি জানালার পাশে দাড়িয়ে আগের সব কথা ভাবছিলাম, তখনই রুদ্র পিছন দিক থেকে এসে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে থুতুনি রেখে বলে-
“কি হলো, আমার বউটার কি মন খারাপ।”

আমি হেসে মাথা ঝাকিয়ে না বলি।
“আমি ভাবছিলাম আগে আমি কেমন ছিলাম আর আজ কেমন। নিজেকে পরিপূর্ণ নারী মনে হয়।”

“উহু এখনো পরিপূর্ণ হওনি তো। এত লজ্জা নিয়ে কি পরিপূর্ণ নারী হওয়া যায়। লজ্জা কমাও আর আমাকে আদর দাও অফিসে দেরী হয়ে যাচ্ছে তো।”

আমি রুদ্রের কথা শুনে তার দিকে তাকিয়ে দেখি অফিসের পোশাক পরে তৈরী হয়ে আছে।

“উমমম আগে বলেন তো, দিন দিন এত ইয়াং হচ্ছেন কেন? নাকি অন্য কোন মতলব আছে। আমাকে দেখুন কেমন মিসেস মিসেস মনে হচ্ছে।”

আমার কথা শুনে রুদ্র একটু ভাব নিয়ে বলল-
“তুমি তো দিন দিন বুড়ি হয়ে যাচ্ছো, আমি এত তারাতারি বুড়া হতে পারব না। জীবনে এখনো কত রোমান্স বাকি আছে।”

আমি তার কথা শুনে বেড থেকে বালিশ তার গায়ের উপর মেরে চলে আসি। আমি চলে আসতেই রুদ্র নিজেকে নিজে বলছে।
“এবার হলো তো রুদ্র তোর, আগেই ভাল ছিল স্যার স্যার বলে ডাকত, কিছু বলার আগে দিয়ে দিত। তা না নিজেই সব কিছু ঠিক করলি কিন্তু লজ্জাটা ভাঙ্গতে পারলি না। এবার এভাবেই অফিসে চলে যা। আদর আর পাওয়া হবে না বালিশের মারই খা।”
,

আজ রাইমা আপু আর রাকিব ভাইয়া আসবে। তাই জেনি আপু আর আকাশ ভাইয়াকেও আসতে বলেছি।
দরজায় বেল বেঝে ওঠায় আমি দরজা খুলে দেখি আকাশ ভাইয়া জেনি আপুকে কোলে করে নিয়ে এসেছে। আর জেনি আপুর হাতে কয়েকটা শপিংয়ের ব্যাগ। আমি জেনি আপু অসুস্থ ভেবে আকাশ ভাইকে বলি-
“ভাইয়া কি হইছে আপুর? অসুস্থ নাকি?”

“আরে মেঘ আমি পাক্কা সুস্থ আছি, বরং এটা পাগল হইছে। শপিংমল থেকে আসার সময় বলছিলাম এতগুলো ব্যাগ আমার কাছে তুই কিছু নে। কিন্তু ও সোজা আমাকে কোলে তুলে নিল।”

“মেঘ তুমি দেখো মাএ তিনটে ব্যাগ সে একা নিতে পারে না তাই নিয়ে রাস্তার মাঝে জগড়া করছিলো আর কিছু লোক ভিডিও করছিল। বাঙ্গালী বলে কথা তাই তাদে ভিডিও গুলোকে আর একটু ভাইরাল করার জন্য কোলে নিয়েই চলে আসলাম।”

আমি ভাইয়ার কথা শুনে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠি। তখনই রুদ্র রুম থেকে আসতে আসতে বলে-
“ভাই রে ভাই কে তুমি। আমি আমার বউকে এমন করে কখনো হাসাতে পারি না আর তুমি কিনা দুটো কথায় হাসিয়ে যাচ্ছো?”

আকাশ ভাইয়া সোজা গিয়ে জেনি আপুকে সোফার উপর ফেলে দেয়।
“আহহ আকাইশ্যা কোমড় টা তো ভেঙ্গে দিলি। একটু রুদ্রকে দেকে শেখতে তো পারিস। ক্লাসের সব ছেলে ভালো ছাএ, যে কিনা ছিল সব মেয়ের ক্রাশ। এত এত সুন্দরী মেয়ে প্রপোজ করছিল কখনো ফিরেও তাকাত না। সে আজ বউ পাগল। আর তুই সব সময় আমার পিছনেই পরে আছিস।”
,

,
রাকিব ভাই হাতে কয়েকটা বাজারের ব্যাগ নিয়ে আসতেই রাইমা আপু তাড়াতাড়ি তার হাত থেকে বাজারের ব্যাগ গুলো নিয়ে নেয়।

তড়িঘড়ি করে ঠান্ডা শরবত নিয়ে তাকে দেয়। তখন আকাশ ভাইয়া বলে-
“দেখ বউ কেমন হতে হয়। আর তুই কিনা কিভাবে আমাকে সব সময় আমাকে খাটাতে হয় সেটাই ভেবে যাস।”

আকাশ ভাইয়ের কথা শুনে রাইমা আপু লজ্জায় গুটিয়ে যায়। আমি মুগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। সবার ভালোবাসায় যদি এমন পূর্ণতা পেত তবে মনে হয় এই পৃথিবীর সব মানুষের হাসিটা প্রকৃত হত

ভালোবাসায় বেশি কিছুর প্রয়োজন নেয়। সবার এক রকম করে ভালোবাসতে পারে না। কেউ প্রকাশ করে ভালোবাসে আবার কেউ অপ্রকাশ্য ভাবে ভালোবেসে। আবার কেউ যতটা প্রকাশ করে তার থেকেও দ্বিগুণ ভালোবাসে।
ভালোবাসার মানুষটির কাছে সব কিছু আসা না করে তার ভিতর যা আছে তা নিয়ে সুখী থাকলে সব সুখ খুজে পাওয়া যায়।

#চলবে,,,,,,

[বিঃ দ্রঃ তিন তিনটা ভালোবাসার জোড়া সংসার। কোনটায় জগড়ায় মাতামাতি, কোনটা ভালোবাসায় আবার কোনটা আবেগে ভরপুর।
কিন্তু যত যাই হোক দিন শেষে তারা প্রত্যেকে এক নৌকার মাঝি। সবাই ভালোবাসায় কাতর।

এই তিন জোড়ার ভিতর কোন চরিএ টা বেশি ভালো লেগেছে?]
#পর্ব_১৮

#লেখিকা_সুরাইয়া_ইসলাম_সানজি।

ভালোবাসায় বেশি কিছুর প্রয়োজন নেয়। সবার এক রকম করে ভালোবাসতে পারে না। কেউ প্রকাশ করে ভালোবাসে আবার কেউ অপ্রকাশ্য ভাবে ভালোবেসে। আবার কেউ যতটা প্রকাশ করে তার থেকেও দ্বিগুণ ভালোবাসে।
ভালোবাসার মানুষটির কাছে সব কিছু আসা না করে তার ভিতর যা আছে তা নিয়ে সুখী থাকলে সব সুখ খুজে পাওয়া যায়।

৩৫.
সবাই টেবিলে খাবার খাচ্ছিলাম। তখন জেনি আপু বলল-
“রুদ্র আমরা বান্দরবান ঘুরতে যাওয়ার প্লান করছি। তোরা যাবি? অনেক দিন থেকে কোথাও যাওয়া হয় নাই রিফ্রেশমেন্টের প্রয়োজন।”

রুদ্র জেনি আপুর কথার উপরে না করে দেয় অফিসে অনেক কাজ আছে বলে। তখন জেনি আপু রাইমা আপুদের উদ্দেশ্য করে বলে-

“তা রাইমা তোমারাও তো হানিমুনে কোথাও যাও নি। চলো আমাদের সাথে কোথাও ঘুরে আসি। তোমাদের হানিমুন হবে আর সাথে আমাদের একটা ট্রুরও হবে। কি রাকিব সাহেব আপনার অফিসে কোন কাজ নেই তো?”

“না আমার অফিসে কোন কাজ নেই। রাইমা চাইলে আমার যেতে সমস্যা নেই। রাইমা তুমি যেতে চাও?”

রাইমা আপু করুণ চোখে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল-
“না না আমরা সবাই যাব আর ভাইয়া যাবে না তা হয় না। ভাইয়া গেলে আমিও যাব।”

সবাই রুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। রুদ্র কি বলে শুনার জন্য। আমি রুদ্রের হাতটা টেবিলের নিচ থেকে চেপে ধরি। যার মানে প্লিজ চলুন না আমিও যেতে চাই। রুদ্র আমার দিকে তাকালে আমি ইশারায় অনুরোধ করে চোখের ইশারা দিয়ে বললাম আমি যেতে চাই।

“আচ্ছা যাব। তবে মাএ তিন দিনের জন্য। তারপরেই ফিরতে হবে। কিন্তু পূর্ণতাকে নিয়ে যাব কি করে?বাবুর ঠান্ডা লাগবে তো।”

“রুদ্র তোর ভাবতে হবে না। আমরা আগেই সব ঠিক করে নিয়েছে। ফুপি আসছে সেই থাকবে পূর্ণতার সাথে। আর তাছাড়া তোরাও তো হানিমুনে কোথাও যাস নি। রিফ্রেশমেন্টও হবে সাথে হানিমুন এক্সটা ফ্রি।”

আমি আকাশ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম-
“তা ভাইয়া আমরা তো সবাই হানিমুনে যাব। কিন্তু আপনারা কেন যাবেন শুনি?”

আকাশ ভাইয়া আমার কথা শুনে বাঁকা হেসে জেনি আপুকে উদ্দেশ্য করে বাম চোঁখ টিপে দিয়ে বলল-

“ভাবিজান আমরাও না হয় হানিমুনটা সেরে ফেলি। বিয়ের পর আর কোন ঝামেলা থাকবে না তাহলে।”

আকাশ ভাইয়ের কথা শুনে জেনি আপু লজ্জায় লাল হয়ে ভাইয়ার পিঠে কয়েক টা কিল বসিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।
,

ফুপির সাথে বাবাও আসছে। নয়ত বাড়িতে বাবা তিন দিন কি করে একা থাকবে। শাশুড়ি মা বার বার অনুরোধ করে আসতে বলায় বাবা এসেছে। শাশুড়ি মা এই তিন দিন আমি থাকব না বলে সময় কাটানোর জন্য ফুপি আর বাবাকে তাদের সাথে থাকতে অনুরোধ করেছে। মানুষ যতই স্মার্ট হোক বৃদ্ধ বয়সে নিজের বয়সের মতো কারো সাথে কথা বলার মত একজন সাথি পেলে সব সময় হাসিখুশি থাকে। নিজেকে উৎসর্গ করে নিজের কথার মাঝে।

আমি পূর্ণতার সব কিছু ফুপিকে বুঝিয়ে দিয়েছি। এতক্ষণ যাওয়ার জন্য বেশ উৎসাহ থাকলেও পূর্ণতাকে ছেড়ে এই তিন দিন থাকতে হবে ভেবে যেতে ইচ্ছে করছেনা। কিন্তু আমি এখন যেতে না চাইলে কারোই আর যাওয়া হবে না ভেবে সব কিছু গোছাতে শুরু করি।

রুদ্র আমার মন খারাপের কারন বুঝতে পেরে বলে-
“মেঘ কোথাও যাওয়ার আগে এত মন খারাপ করতে নেই। পূর্ণতা আর একটু বড় হলে নিয়ে যেতে পারতাম তাছাড়া মোবাইল তো আছেই আমার ওখান থেকে সব সময় পূর্ণতা কে দেখব।”

সত্যিই তো, আমার এতক্ষণ মনেই ছিল না ভিডিও কলে পূর্ণতাকে যখন খুশি দেখতে পারব। মনে পরতেই মুখে হাসি ফোটে ওঠে।

সবাই সবার বাসায় চলে গেছে সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে আসার জন্য। অনেকটা পথ যেতে হবে তাই আমি টপস আর জিন্স পরে নিলাম। এগুলো আগে পরলেও বিয়ের পর শাড়ি ছাড়া আর কিছু পরে হয়নি।

আমাকে এই ড্রেসে দেখে রুদ্র স্যার খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল-
“আমার বউটার দিন দিন এমন সুন্দর হওয়ার কারন কি শুনি?”

“যার বর এত স্মার্ট, তার বউ যদি সুন্দরী না হয় তবে কি মানায়? তাছাড়া হানিমুনে যাচ্ছি বলে কথা।”

রুদ্র পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে চুলে মুখ ডুবিয়ে বলে-
“তা বউটার হানিমুনের যাওয়ার এত তাড়া কেন? হানিমুনের জন্য প্রস্তুত তো? সেখানে গিয়ে লজ্জায় কুঁকরে গেলে কিন্তু চলবে না।”

৩৬.
আমি রুদ্রের কথা শুনে কোন জবাব না দিয়ে মুচকি হাসি দেই। পিছন থেকে রুদ্রকে ছাড়াতে চাইলে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ।

“উমম ডিস্টাপ করো না।”

“উহু ছাড়েন তো, আমার সুরসুরি লাগছে।”

“তুমি তোমার কাজ করলেই তো পার। আমায় বিরক্ত করছো কেন? আমি কি তোমাকে বিরক্ত করছি?

আমি রুদ্রের কথা শুনে অবাক হয়ে যাই। কি বলে ওল্টো আমি নাকি তাকে বিরক্ত করছি ভাবা যায়!
আমি আর কোন কথা না বাড়িয়ে আগের মতো জামা কাপড় গোছাতে শুরু করি।

আমরা সবাই বান্দরবান যাওয়ার উদ্দেশ্যে ডলফিন পরিবহণে ওঠে বসে আছি। কিন্তু আকাশ ভাইয়া আর জেনি আপুর কোন খোঁজ নেই। তাদের সিট ফাঁকা পরে আছে। আমি বার বার এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। বার বার রুদ্র তাদের ফোনে কল দিচ্ছে কিন্তু কোন সাড়া নেই। বাস ছেড়ে দিয়েছে আস্তে আস্তে চলতে শুরু করছে। যতটা আগ্রহ নিয়ে এসে ছিলাম তা এক নিমিষেই শেষ হয়ে যায়।
হঠাৎ বাসের ভিতর লাফিয়ে জেনি আপু আর আকাশ ভাইয়া ওঠি। দুজনের পিঠে দুটো ব্যাগ। মনে হচ্ছে কোন কলেজের স্টুডেন্ট তারা। আমি তাদের দেখে খুশিতে লাফিয়ে ওঠি কিন্তু রুদ্র রাগে চেঁচিয়ে বলে-

“সালা তোদের আসতে এতক্ষণ লাগে? কি করছিস এতক্ষণ ফোন ধরিস নাই কেন?”

রুদ্রের কথা শুনে জেনি আপু বলে ওঠল-
“রুদ্র আর বলিস না। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমি ওর কাছে আমার ব্যাগটা দিয়ে ছিলাম আর এই আকাইশ্যা ব্যাগটা দরজার সামনেই রেখে আসছে। অর্ধেক রাস্তা আসার পর আমার ব্যাগের কথা মনে পরলে বলে ইচ্ছে করে বাসার সামনে রেখে আসছে।তখন আবার ব্যাগ নিতে বাসায় যেতে হয়। বল কেমনডা লাগে?”

জেনি আপুর কথা শেষ হওয়ার আগেই আকাশ ভাইয়া চেঁচিয়ে বলল-
“দেখ রুদ্র এই জেনি ছেনিরে আমারে আকাইশ্যা বলতে নিষেধ কর। ওর জন্য পুরো পাঠক মহল আমাকে আকাইশ্যা নামে ডাকে। হবু বউ বলে তুমি করে না বলুক অন্তত আকাশ বলে তো ডাকতে পারে।”

“রুদ্র, আকাইশ্য আমারে জেনি ছেনি কইলো ক্যান? আমি ওর সাথে এক সিটে বসবো না। ওরে ওঠতে বল নয়তো খরব আছে।”

“হ্যাঁ আমি ও তোর সাথে বসমু না। এই রুদ্র বাস থামাতে বল। আমি পরের বাসে যামু।”

রুদ্র এতক্ষণ তাদের কথায় ‘তুমি বলোনি আমি বুঝিনি’ টাইপ ভাব ধরে থাকলেও এবার চিৎকার করে ধমক দিয়ে বলল-
“এবার আর একটা কথা বললে আমি তোদের দুটো কে বাস থেকে ফেলে দিব। এই মামা বাস থামান। এখনই দুজনে নামবি হেঁটে হেঁটে আসবি। যাহ নাম।”

রুদ্রের ধমক শুনে তারা দুজনে চুপচাপ বাসের সিটে হেলান দিয়ে বসে রইলো। তাও একজন আর একজনকে মিনমিন করে বলছে-
“এসব তোর জন্য হইছে, রুদ্র তোর জন্য খেপছে।”

আমি তাদের জগড়া দেখে মুচকি হাসছি। এই জগড়ার মাঝেও দুজনের ভিতর আলাদা ভালোবাসা জড়িয়ে রয়েছে। হঠাৎ বাস কিছুর সাথে ধাক্কা খাওয়ার উপর থেকে নিচে ছিটকে পরে আবার চলতে শুরু করে। আমি ভয়ে রুদ্রের এক বাহু জড়িয়ে ধরি। আর সে আমাকে তার বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে। হঠাৎ রাকিব ভাইয়ের দিকে চোখ পড়ায় দেখি রাইমা আপু ভয়ে রাকিব ভাইয়ার হাত তার দু হাত দিয়ে মুঠো করে শক্ত করে ধরে আছে। আর রাকিব ভাইয়া অস্তির হয়ে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে বলছে-
“এই নিন পানি খান, ভয় পাবেন না। সব ঠিক আছে।”

রাইমা আপু ভয়ে চোখ বন্ধ করে ছিল। রাকিব ভাইয়ের কথা শুনে চোখ খুলে লম্বা নিশ্বাস নিয়ে ঠকঠক করে পানির বোতল শেষ করে। রাকিব ভাইয়ের এক বাহু জড়িয়ে ধরে কাধে মাথা রেখে চোখ বুঝে শুয়ে পরে।

আমার তাদের দিকে তাকিয়ে নিমিষেই ভয় কেটে যায়। আর মুগ্ধ চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। সৃষ্টি কর্তার এক একজোড়া ভালোবাসার সংসার কতই না মধুর।

#চলবে,,,,,

[পর্বটা ছোট হওয়ার জন্য দুঃখিত। কেউ মন খারাপ করবেন না। পরের পর্ব বড় করে দেওয়ার চেষ্টা করব।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here