হবে কি আমার পর্ব -২১

#হবে-কি-আমার(২)
#writer_Ruhi-mondal
#পর্ব_21

আজ সকালটা রোদ্দুরে তপ্ত কিন্তু সেই ছোট্ট পাখিটি দেখা পাওয়া যাচ্ছে রেলিং এ! আজ বৃষ্টি হচ্ছে না তবুও সে ব্যালকনির রেলিং এ বসে আসছে অনুদের রুমের দিকে তাকিয়ে। আর অনু একটা চেয়ার নিয়ে বসে পাখিটিকে দেখে চলেছে। সেই দিনের মত মুখের হাসিটুকু আজ যেন ওর নেই। অরিন্দম আজ দুদিন পর অফিস গিয়েছে অনু তাকে এই দুইদিন কিছুতেই বাড়ির বাইরে যেতে দেয়নি, কিন্তু এভাবে আর কতদিন তাই সে অনু ঘুম ওঠার আগেই বেরিয়ে পড়েছে। এই নিয়ে অনুর একটু বেশি মন খারাপ হয়ে আছে। অরিন্দম তাকে একটু বলে গেল কি হত? সে তো আজ থেকে অফিসে যেতে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তাও কেন বললো না?

তনুশ্রী অফিস জয়েন করেছে! মৃন্ময় সে অরিন্দম সবাই এক জায়গায় কাজ করে। কলি কয়েকদিন ছুটির পর আজ অফিসে এসেছে, এসেই সে আগের মতো মেতে উঠেছে আড্ডা দিতে,সে আর অরিন্দম পাশাপাশি ডেস্কে বসে তনুশ্রী মৃন্ময় তাদের পিছনে। কাজ করার ফাঁকে কলি একবার করে অরিন্দমের সাথে কথা বলে চলেছে, অরিন্দমের মন ভালো নেই অনুকে না বলে আসায় এখন যেন কেমন লাগছে তার, লাঞ্চ ব্রেকে আর ও একবার অনু কে ফোন করবে ভেবে রাখল সে, মেয়েটাকে না বল আজকে চলে এসেছে নিশ্চিত সে মারাক্তক রেগে আছে তাই-তো এত বার করে কল দেওয়াতে কল রিসিভ করছে না অনু! অরিন্দম সেটা ভেবেই হাসলো মেয়েটা যতটা তাকে ভালোবাসে ততটাই তার উপর সামান্য ব্যাপারেই রেগে যায়।

কলি হাসি মুখে দু মগ কফি এনে একটা নিজের হাতে নিয়ে অপরটা অরিন্দমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
__”অরি কফি খাও! আজ তো তুমি লাঞ্চ করতে চাইছ না,তাই এই কফি দিয়েই পেট ভরে ফেলো!”

অরিন্দম মুচকি হেসে কফি মগ হাতে নিয়ে বলল,
__’থ্যাংকস!’

অনু কে খাওয়ার জন্য রান্নার মাসি ডেকে গিয়েছে কিন্তু অনু খাবে না বলে দিয়েছে। মুখ ফুলিয়ে সে খাটের ওপর বসে আছে। সে বেশ কিছুক্ষণ কাঠের পুতুলের মত বসে থাকার পর ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল অরিন্দমের বেশ কয়েকটা মিসকল। তবুও অনু কল ব্যাক করল না বরং তনুশ্রী কে ভিডিও কল করে অরিন্দমের খোঁজ খবর নেবে ভেবে নিল অতঃপর সে তনুশ্রীকে ভিডিও কল করলো 10 সেকেন্ড পর তনুশ্রীর হাসিমাখা মুখটা দেখতে পেল অনু,ক্ষনেই মনে ভালো লাগার প্রশান্তি হাওয়া বয়ে গেল দিদিকে দেখে। এখন শান্তি লাগছে তার, তনুশ্রী হাসিমুখে বলল,
___”কি রে এখন ফোন করলি যে? দুপুরে খেয়ে ভাতঘুম দিস নি কেন?”
অনু ঢোক গিললো সে যে কিছু খাইনি সকাল থেকে, সেটা যদি দিদি জানতে পারলে এখনই তার কাছে ছুটে আসবে। তাই সে মিথ্যা বলল,
___’ঘুমাবো এইতো এবার! তোর কথা মনে পড়ছিল তাই ভিডিও কল দিলাম। তা বল কেমন কাজ চলছে সব?’

___’সব ঠিকঠাক আছে, তুই বল তোর মুখটা শুকনো লাগছে কেন, শরীর খারাপ লাগছে?
__’আমার কিছু হয়নি আমি…পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই অনু পিছনে অরিন্দম কে দেখতে পেল তাকে দেখে চোখটা খুশিতে চিকচিক করে উঠতে গেলেও ক্ষনেই তা নিভে যায়… কারণ অরিন্দমের পাশে কলি’কে দেখতে পায় এবং শুধু দেখতে পেলে ঠিক ছিল কলি তখন অরিন্দমের হাতে কফির মগটা ধরে কি যেন বলছে তা দেখে অনুর মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো সে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল তাদের দিকে! অরিন্দম কলির সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। তনুশ্রী ফোন সামনে রেখে মৃন্ময় কে তখন কিছু একটা বলছিল সাইড হয়ে! কলিকে দেখে রাগের বশে অনু ফোন কেটে দিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ে আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আজ অরিন্দম ফিরলে তাকে জন্মের মত কফি খাওয়াবে সে!

___
কলিংবেল বেজে চলেছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে অরিন্দম ক্লান্ত শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, মন শরীর দুটোই দুর্বল হয়ে আছে। আজ সারাদিন অনুর সাথে কথা হয়নি তার আর পেটে কফি ছাড়া কিছুই পড়েনি! একটু অনুকে দুচোখ ভরে দেখে তারপর সে কিছু খাবে, এটা নিশ্চিত তার উপর রেগে আছে অনু, এসব ভাবতে ভাবতেই দরজা খুলে গেল। অরিন্দম হাসি মুখে অনুর দিকে তাকাল, অনু তাকে দেখে রোজ মিষ্টি এক হাসি উপহার দিত কিন্তু আজ মুখটা তার মলিন, অরিন্দম তা দেখে এক পা এগিয়ে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগে অনু কাটকাট গলায় বলল,
__’কফি খাবেন?’

অরিন্দমের ভ্রু কুঁচকে গেল সে সবেমাত্র এসেছে এবং সারাদিন তার সাথে দেখা হয়নি! কথা হয়নি! কোথায় একটু আলিঙ্গন করবে তা না হঠাৎ এমন কফি খাওয়ার কথা জিজ্ঞাসা করছে কেন? অরিন্দম কিছু বলতে যাবে অনু কিচেনের দিকে যেতে যেতে বলল,
__’আপনাকে কেন জিজ্ঞাসা করছি আপনি তো কফি খেতে খুব ভালোবাসেন। তাই না? আপনি রুমে যান, আমি কফি নিয়ে আসছি।

অরিন্দম বোকার মত কিছুক্ষণ অনুর যাওয়ার পানে তাকিয়ে কিছু না বুঝে হতাশার নিঃশ্বাস ত্যাগ করল, অতঃপর সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল।

ফ্রেশ হয়ে খাটে বসতে অনু কফির মগ এনে তার সামনে ধরে বলল,
__”নিন খান!”

অরিন্দম কফির মগ টা নিয়ে পাশের ডেস্কের ওপর রাখল,অনু সেটা হাতে তুলে আবার বলল,
__’রাখছেন কেন? খান!’
অরিন্দম চরম অবাক হল সে আসার পর থেকে কফি নিয়ে পড়ে আছে কেন মেয়েটা? অরিন্দম অনুর হাত ধরতে যাবে সে এক ঝটকায় সরে যায়, অরিন্দম হতভম্ব হলো এমন বিহেভিয়ারের মানে কি? অরিন্দম উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
___”এমন করছ কেন বউ,কি হয়েছে তোমার?’
অনু উওর দিল না পুনরায় একই কথা বলল..
অরিন্দম বিরক্তিবোধ করে বলল,
__’কিছু না খেয়ে শুধু কফি কেন খাব? সেই থেকে কফি খাওয়ার কথা কেন বলে যাচ্ছ আমি একবারও বলেছি কফি খাবো?’
অনু রুম থেকে বেরিয়ে গেল এক মিনিটের মধ্যে বিস্কেট এনে রাখলো। অরিন্দম অবাক! তার কোন কথা যেন অনু শুনছেই না আচ্ছাই মেয়ের পাল্লায় পড়েছে তো সে, এদিকে ক্ষুধা ও পেয়েছে আর না খেয়ে থাকতে পারছে না, অরিন্দম খাটে বসলো একটা বিস্কেট হাতে নিয়ে খেতে গিয়েও অনু খেয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করতে নিলে অনু ব্যালকনিতে চলে যায়। অরিন্দম ভাবলো যদি তার ওপর রাগ করে থাকত তাহলে অনু তার সাথে কথাই বলত না। কিন্তু কথা বলছে, তার মানে কোনো এক কারণে তার মুড অফ। অরিন্দম কিছু না বুঝে খেতে শুরু করলো,অনু ব্যালকনি থেকে তাকে দেখে আর ও রাগ ক্ষোভ জন্ম নিল, তাকে ছাড়া একা কি-ভাবে খেতে পারে অরিন্দম!কই এতদিন তাকে ছাড়া খাইনি আজ কেন একা খাবো? অনু নিজের নিয়ন্ত্রন হারালো সে এগিয়ে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে রাখা জিনিষ পত্র ফ্লোরে ছুড়ে ফেলল অরিন্দম কিংকর্তব্যবিমূঢ় বড়বড় চোখে অনুর কাজ দেখতে লাগল। কি হচ্ছে তার মাথায় ঢুকছেনা অনু হঠাৎ করে কেন এতটা ভায়োলেন্ট হয়ে গেল? তনুশ্রী তো বলেছিল অনু প্রচন্ড বেগে রেগে গেলেই এতটা ভায়োলেন্ট হয় কিন্তু… অনু এবার শব্দ করে কাঁদতে লাগলো অরিন্দম ভড়কালো দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে তাকে দুহাতে অনেক কষ্টে জড়িয়ে ধরলো,অনু ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো, অরিন্দম কিছু না বুঝেই তাড়াতাড়ি করে বলল,
___”আ’ম সরি আ’ম সরি! এমন ভুল আর হবে না!”
অনু ঢোঁক গিলে বলল,
___”আপনি কেন ওই কলির সাথে এখন ও কথা বলেন? ও নিশ্চয়ই আজ ও আপনাকে জড়িয়ে ধরে ছিল?
অরিন্দম এতক্ষণ পর বুঝলো অনু এতটা হাইপার হওয়ার কারণ, অনু তাকে আগে নিষেধ করেছিল যেন কলি বলে মেয়েটা তার আশে পাশে না থাকে আর ও কথা দিয়েছিল থাকবে না। কিন্তু আজ এই বিষয়ে কিভাবে জানল সে নিজেই বুঝতে পারছে না। তবুও সে তাকে আশ্বস্ত করতে বলল,

__”না এমন কিছুই হয়নি তুমি ভুল ভাবছ ও তো জাস্ট কফি..অনু অরিন্দমের বুকে খামচি দিল, অরিন্দম ব্যস্ত স্বরে বলল…. ওকে ওকে ফাইন ওর সাথে আর কথা বলব না। প্লিজ প্যানিক করো না। আই প্রমিস আর কখনো কফিও খাব না।

অনু শুনলো না কাঁদতে কাঁদতে বুকে কিল মারতে লাগলো,সে নিজের জিনিষ সেটা খেলনা হক কিনবা মানুষ অন্য কারোর সাথে সহ্য করতে পারে না! অরিন্দম এবিষয়ে আগে থেকেই অবগত তাই সে কামলি নেওয়ার চেষ্টা করছে,সে অনুকে কোলে তুলে নিল,অনু কান্না এখনও কমেনি সে কেঁদে চলেছে অরিন্দম তাকে নিয়ে ছাদে দোলনায় গিয়ে বসলো,অনু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, অরিন্দম তা দেখে দু’হাতে অনুর দুগালে হাত রেখে বলল,
___”কাঁদে না! আর এমন হবে না বলছি তো!
অনুর কান্না কমলো তবুও এখন কেঁপে উঠছে অরিন্দম তার কপালে অধর ছুঁয়ে দিল। অধৈর্য্য হয়ে অধর ছুঁয়ে বলল,
___”কাঁদতে না করছি তো, আমার ভালো লাগে না এমন কাঁদতে দেখতে তোমায়!”
অনু আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে,সে অরিন্দমের বুকে কপাল ঠেকিয়ে বলল,
__”আপনি খুব পঁচা!”
অরিন্দম হেসে ফেললো,সে অনুর মাথায় হাত বুলাতে লাগলো! ক্ষীণ প্রহর অতিক্রম হতে অনু ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
__”আমি সকাল থেকে খাইনি!”

অরিন্দমের চলমান হাত থেমে গেল। মেয়েটা সকাল থেকে খাইনি শুনে বুকটা ধ্বক করে উঠলো তার। উদগ্রীব কন্ঠ বলল,
__”খাওনি কেন এখন?”
__”আপনি না বলে চলে গেলেন কেন?”
অরিন্দম একমুহুর্ত দেরি করল না তাকে নিয়ে নিচে এলো। ব্যাস্ত হাতে খাবার প্লেটে সাজিয়ে অনুর মুখের সামনে ধরলো অনু কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছোট বাচ্চাদের মত খেতে লাগল।
___
রুমে এসে অনু খাটে বসে আছে অরিন্দম ড্রয়ার থেকে মেডিসিনের বক্স বার করতেই, অনু ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল! সে এবার ধরা পড়বে ভেবেই কাঁথা টেনে শুয়ে পড়লো! অরিন্দম বক্স খুলে দেখল অনু গত এক সপ্তাহ মেডিসিন নিচ্ছে না,তা দেখে অরিন্দমের নিজের ওপর রাগ হল এগুলো তার রেস্পন্সিবিলিটি। সে অনুর পরিবার কে কথা দিয়েছে তাকে সুস্থ করে তুলবে আর সে সেখান থেকেই বেড়িয়ে যাচ্ছে, অরিন্দম ঔষুধের পাতা থেকে দুটো ঔষধ নিয়ে অনুর কাছে গেল, কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে মলিন কন্ঠে বলল,
___’বউ উঠে এই দুটো মেডিসিন খেয়ে নাও।’
অনু চমকালো, অরিন্দম এত শান্ত ভাবে তাকে কেন বলছে? সে তো ভেবেছিল অরিন্দম তাকে বকা দেবে,অনু ইচ্ছা করে ওষুধ নেয় না। তার কোনো কালেই এটা ভালো লাগে না আর তাছাড়া সে তো সুস্থ তাহলে তাকে সবাই এত জোর করে অসুস্থ করে কেন? অনু উঠে বসলো অরিন্দম তার সামনে জলের গ্লাস এগিয়ে দিতে অনু কিছু বলতে গিয়েও বললো না বিনাবাক্যে খেয়ে নিল। জিজ্ঞাসা করল,
__”আপনি কি আমার ওপর রেগে আছে?”
অরিন্দম পাশে বসে বলল,
__”রেগে থাকব কেনো?”
__’ওই যে…’
___’কি?’
__’কিছু না।’
অরিন্দম শুলো,অনু সুড়সুড় করে তার বক্ষবন্ধনী হলো, অরিন্দম মলিন হেসে তার কপালে অধর ছুঁয়ে দুচোখের পাতা এক করলো।
__
গভীর রাত অনু হাত পা ছড়িয়ে অরিন্দমের ওপর রেখে প্রশান্তির ঘুম দিচ্ছে। কিন্তু অরিন্দমের চোখে ঘুম নেই,অনুর এতটা প্যানিক হয়ে যাওয়ায় তার ঘুম উড়ে গিয়েছে,সে অনুর এমন বিহেভিয়ার সম্পর্কে আগে থেকেই জানা ছিল, তাকে বিয়ের দিন অলকা দেবী আর অনুরাগ এক ভয়ঙ্কর সত্যি বলেছিল, অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তা শুনে কিন্তু সে অনু কে ভালোবাসে,তাকে সব রুপেই সব অবস্থাতেই পাশে চাই। অরিন্দম কথা ও দিয়েছে অনুর ট্রিটমেন্টে সে কোনো রকম গাফিলতি করবে না। কিন্তু এ’কদিনে সে একটু অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া মেডিসিন গুলো দেওয়া হচ্ছে না। তাই এই অ্যাটাক।

অরিন্দম অনুর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালো,কত মায়া, কত আবেগ জড়িয়ে আছে এই মেয়েটার সাথে তার, তাকে একটু কষ্ট ও অরিন্দম দিতে চায় না। অরিন্দম অনুকে বালিশে শোয়াল,নিজে অনুর পেটের কাছে মাথা রেখে জোড়ালো কণ্ঠে বলল,
__”তোমাকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব আমার আর আমি তা পূরণ করবো বউ, তোমাকে একটু ও কষ্ট পেতে দেবো না। আই প্রমিস একটু ও কষ্ট পেতে দেবো না। ভালোবাসি বউ, খুব ভালোবাসি।”

#চলবে

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here