হৃদপিন্ড ২ পর্ব ২৯+৩০+৩১

#হৃৎপিণ্ড_২
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#পর্ব_১৬
#জান্নাতুল_নাঈমা
_____________________
খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে একজোড়া মানব-মানবী। জোৎস্নার রাত্রিতে প্রকৃতির সকল স্নিগ্ধ হাওয়া ছুঁয়ে দিচ্ছে ওদের। থেমে থেমে দমকা হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগতেই শাড়ির আঁচলখানা পতাকার ন্যায় উড়ছে৷ চুল গুলোও শাড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেঁকে যাচ্ছে। ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে ওরা৷ ইমন তার বলিষ্ঠ দেহখানা নিয়ে একদম সোজা হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার দূর আকাশে দৃশ্যমান উপগ্রহ এবং নক্ষত্র গুলোর দিকেই স্থির৷ ওষ্ঠকোণে রয়েছে মৃদ্যু হাসি। তার পাশেই চাঞ্চল্যকর নিঃশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে মুসকান৷ তার দৃষ্টিজোড়া একবার ইমনের দৃষ্টি’কে অনুসরণ করে হাজারো নক্ষত্র’কে গোনার পরিকল্পনা করছে তো আরেকবার আড়চোখে দীর্ঘ সময় নিয়ে উৎসুক অনুভূতি’তে লেপ্টে থাকছে। কেবল মাত্র ইমনের থেকে একটি, দু’টো বাক্য শুনার অপেক্ষায়।

সকল নিরবতা’কে ছিন্ন করে আকাশে মেলে রাখা দৃষ্টিজোড়া পাশের নারী’টির দিকে স্থির করলো ইমন। ছোট করে শ্বাস নিতে নিতে নড়েচড়ে দাঁড়ালো মুসকান। ইমন মুচকি হেসে মুসকানের একটি হাত নিজের হাতের মুঠোতে বন্দি করে ছাদের মাঝ বরাবর নিয়ে দাঁড় করালো। তারপর মৃদু স্বরে বললো,

“ক্লোজ ইউর আই’স ”

এলোমেলো নিঃশ্বাসের বেগে ক্লান্ত দৃষ্টি মেললো মুসকান৷ ইমন তার প্রগাঢ় দৃষ্টি দ্বারা আদেশ সূচক ইশারা করলো। ইমনের যেনো তার প্রগাঢ় দৃষ্টিজোড়া দিয়ে সম্মোহন করে ফেললো মুসকান’কে। এক পলকের নিমিষেই দৃষ্টিজোড়া আবদ্ধ করে ফেললো মুসকান৷ তৎক্ষনাৎ তার হাতটি ছেড়ে দিলো ইমন। বললো,

” খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কখনো দৃষ্টি মেলে দীর্ঘ সময় পাড় করা উচিত কখনো বা দৃষ্টি বদ্ধ রেখে। এতে কি হয় জানো, আমাদের মন ঠিক আকাশের মতোই বিশাল আকার ধারণ করে। আর আমি চাই আমার অর্ধাঙ্গিনীর মন’টা ঠিক ঐ আকাশের বিশালতায় ভরে ওঠুক। ”

নিঃশ্বাসের চঞ্চলতা অনেকটাই কমে এলো মুসকানের। কেবল মাত্র অনুভব করলো জোৎস্নার রাতে আস্ত এক আকাশে নিচে সে দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল ঐ আকাশে দৃশ্যমান চাঁদটি শুধু প্রকৃতিতেই তার কিরণ ছড়াচ্ছে না। বরং তার অন্তঃকরণও উজ্জীবিত করছে। খোলা আকাশের নিচে প্রিয়জনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আবদ্ধ দৃষ্টিতে প্রকৃতি’কে অনুভব করার ভাগ্য কি সবার হয়? তার হয়েছে তাহলে কি সে ভাগ্যবতী নয়? ইমন চৌধুরী’কে সে পাবে আর ভাগ্যবতী হবে না তাই কখনো হয়? ইমন চৌধুরী আস্ত এক সৌভাগ্য!

মুসকান যখন ঘোরের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে ইমন তখন বাঁকা হেসে শীতল কন্ঠে ডাকলো,

“মুসকান”

“হুমহ”

মুসকানের সাড়া পেয়ে ইমনের ওষ্ঠকোণে হাসিটা প্রশস্ত হলো। তার প্ল্যান সাকসেসফুল। পেরেছে সে তার মুগ্ধময়ীকে সম্মোহন করতে। অত্যন্ত ধীর গতিতে এক হাঁটু মেঝেতে গেড়ে বসলো ইমন। পকেট থেকে অতিকৌশলে একটি লাল গোলাপ বের করে মুসকানের সম্মুখে ধরলো। গোলাপের সুগন্ধে মুসকানের ঘোরটা আরো তীব্র হলো। চোখ বুজে অবস্থা’তেই সামনের গোলাপটি নিজের হাতে নিয়ে নিলো। ইমন মৃদুহাস্যে এবার আবদার করলো,

“I want to be drunk with the intense touch of your wet lips (তোমার সিক্ত ওষ্ঠজোড়ার প্রগাঢ় স্পর্শে মাতাল হতে চাই) প্লিজ গিভ মি এ্যা কিস ”

আবদ্ধ দৃষ্টিজোড়া তবুও মেললো না মুসকান শুধু নিঃশ্বাস প্রশ্বাস গুলো আন্দোলন শুরু করলো কেবল মাত্র তার ব্যক্তিগত মানুষটির আবদারে। ইমন সেকেন্ড টাইম আবারো আবদার করে বসলো। তৎক্ষনাৎ ঝড়ের বেগে বদ্ধ দৃষ্টিতেই মাথা নিচু করে ওষ্ঠজোড়া ছুঁইয়ে দিলো ইমনের কপালে। চোখ বুজে ফেললো ইমন তার নাক গিয়ে ঠেকলো মুসকানের গলায়। লম্বা এক শ্বাস নিতেই ছিঁটকে সরে গেলো মুসকান। হতভম্ব হয়ে কেবল চোখের পলক ফেলতে শুরু করলো। হৃদস্পন্দনের গতি এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে নিঃশ্বাসের তাড়নায়ই শরীরে ঘাম ছেড়ে দিয়েছে। ইমন মুসকানের অমন অবস্থা দেখে নিঃশ্বব্দে ওঠে দাঁড়ালো। এক পা দু’পা করে একদম মুসকানের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আচমকাই জড়িয়ে ধরলো ওকে। বুকের সঙ্গে একদম লেপ্টে নিয়ে ভারী নিঃশ্বাসের ভীরে শুধু একটি বাক্যই উচ্চারণ করলো,

” আমাদের অল্প দূরত্বে আজীবন পাশে থাকার গল্প আজ থেকেই শুরু আর আমার মুগ্ধময়ীর স্ট্রাগলও। ইটস লাভ স্ট্রাগল”
.
আর মাত্র পনেরো দিন বাকি বিয়ের,চৌদ্দ দিন বাকি গায়ে মেহেন্দির তেরো দিন বাকি গায়ে হলুদের। বিয়ের কার্ড পনেরো আগেই প্রস্তুত করা হয়েছে। কার্ডগুলো যথা যথা স্থানে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছে দিহান এবং মুরাদের ওপর। দু’বাড়িতে কাছের আত্নীয় স্বজন দু’একজন অলরেডি এসেই পড়েছে। ইমনের একটিমাত্রই ফুপু এবং তার ছেলেমেয়েরা এসে হাজির। দাদার তরফের আপন বলতে এই ফুপু আর ভাই, বোনরাই রয়েছে। নানার তরফের লোকজন এখনো এসে সারেনি। তবে বাড়িতে বিয়ে বিয়ে আমেজ এসেছে বেশ। গতকাল রাতে ফুপু আয়েশা এবং তার ছেলে মেয়ে অভ্র, আলিয়া এসেছে। সকাল থেকে তারা মুসকানকে সরাসরি দেখার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে গেছে। ইমন প্রথমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো সায়রীর সাথে ওদের মুরাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু পরোক্ষণেই কি যেনো ভেবে সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করে ফেললো। মুরাদ রিমিকে নিয়ে ডক্টরের কাছে গেছে তাই দিহানকে বললো মুসকানকে নিয়ে তাদের ওখানে আসতে। এ ক’দিন চৌধুরী বাড়িতে দিহানের প্রবেশ নিষেধ ছিলো হুট করে কোন এক উছুলায় বাড়িতে ঢুকতে পারবে জেনেই আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার ন্যায় খুশি হলো দিহান। মুসকানকে ফোন করে রেডি হতে বলে সে নিজেও রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লো।
.
ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে আছে মুসকান তাকে ঘিরে রয়েছে ইমনের ফুপু আয়েশা এবং আলিয়া। পাশেই দিহান আর অভ্রও বসে আছে। আলিয়া মুসকানের সমবয়সী হলেও অভ্র বয়সে চার বছরের সিনিয়র। সম্পর্কে দেবর হলেও বয়সে এতো পিচ্চি মেয়ের সাথে আর ফাজলামো করলো না অভ্র। সে দিহানের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত। ইরাবতী সকলকেই হালকা নাস্তা পানি দিলো। আলিয়া মুসকানের সাথে বেশ ভাব জমিয়েছে। কথার প্রসঙ্গে বিয়ের কেনাকাটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠতেই আলিয়া লাফিয়ে ওঠলো সে মুসকানের সঙ্গে শপিংয়ে যাবে। তখনি নিচে এলো ইমন সে সহজ গলায় বললো,

“ওর সব শপিং কমপ্লিট তোরা যদি শপিংয়ে যেতে চাস যেতে পারিস বাট ওকে নিয়ে না। ”

“কেন ভাইয়া আমরা শপিং করবো টাংগাইল শহর ঘুরে দেখবো প্লাস রেষ্টুরেন্টে গিয়ে একটু খানি খাওয়া-দাওয়াও করবো। ”

ইমন আবার না বলবে তার পূর্বেই ইরাবতী এসে বললো,

“না আলিয়া বিয়ের আগে কনের এতো ঘুরাঘুরি ভালো নয়। তাছাড়া মুসুকে তো জানো না বারো মাসে তেরো রোগে ভুগে এই মেয়ে। যা গরম পড়েছে কাঠফাটা রোদে বাইরে ঘুরাঘুরি না করাই ভালো। ”

প্রসন্ন হেসে বাইরের দিকে হাঁটা ধরলো ইমন। দিহানকে ইশারা করলো সাথে যেতে কিন্তু দিহান এক চুলও নড়লো না। শুধু চারদিকে অস্থির চিত্তে নজর দৃষ্টি ঘোরাতে থাকলো। এদিকে আলিয়া মুখ ভার করে মুসকানকে বললো,

“তাহলে চলো ভাইয়ের আনাগুলোই দেখি দু’জন মিলে সব। তুমি কি দেখেছো আগে? ”

মুসকান মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো আলিয়া উৎসুক হয়ে বললো তাহলে চলো আমরা গিয়ে সব দেখি। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত আয়েশার মুসকানকে খুবই পছন্দ হয়েছে। একদম শান্তশিষ্ট মায়াবী চেহারার অধিকারিনী মেয়েটাকে দেখে অপছন্দ করার জো নেই৷ সবচেয়ে বড়ো কথা এই মেয়েকে নিজেদের নতোই গড়ে নেওয়া যাবে। এসব কথাই ইরাবতী’কে বলছিলো সে। অভ্র নিজের মতো ফোনে ব্যস্ত। মুসকান আলিয়ার পিছু পিছু যাচ্ছিলো তখনি দিহান ওকে টেক্সট করলো। “musu tor sayori apu kon room e ase joldi janabi” মুসকান সাথে সাথে বড়ো বড়ো করে পিছন দিক ঘুরলো। দিহান দু’হাত জোরের ভঙ্গিতে ঠোঁট নাড়িয়ে বোঝালো, “প্লিজ বোন আমার একটু হেল্প কর ” বড্ড মায়া হলো মুসকানের। সেই কতো বছর যাবৎ এদের দু’জনের ভালোবাসা দেখে অভ্যস্ত সে। সব সময় একজন আরেকজনের সঙ্গে চুম্বকের মতো আঁটকে থাকতো। দু’জন, দুজনের জন্য কতোই না পাগলামি করতো। সারাক্ষণ ঝগরা অতঃপর কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে না পারা। এদের রিলেশনশিপ টা তো ঠিক টম এন্ড জেরির মতো। হয়তো ছোট ছোট ঝগরাটাই এক পর্যায়ে বিশাল আকার ধারণ করেছে। তাই বলে কি আলাদা হয়ে যাবে নাকি? কোন না কোনভাবে এদের তো এক হতেই হবে। দীর্ঘশ্বাস একটি শ্বাস ছেড়ে মুসকান সিদ্ধান্ত নিলো আজ দু’জনকে একসাথে করবেই। যেহেতু দিহান এক পা এগিয়েই আছে সেহেতু তার কাজটা খুব কঠিন হবে না৷
.
আলিয়া মুসকানের সব জিনিসপত্র ইমনের কাবার্ড থেকে বের করে এলোমেলো করে রেখেই বেরিয়ে গেছে। তার কোন এক বন্ধু ফোন করেছে জরুরি ফোন। এটিই বলেছে। তাই বিছানায় ছড়ানো ছিটানো সব জিনিসপত্র মুসকান গোছাতে শুরু করলো। তখনি রুমে ঢুকলো সায়রী বললো,

“একি অবস্থা এগুলো অগোছালো কে করলো? ”

“আপু আলিয়া আমাকে দেখাচ্ছিলো সেগুলোই গুছাচ্ছি এখন। ”

“ওহ দাঁড়া আমি হেল্প করি একা পারবিনা। ”

মুচকি হেসে মুসকান বললো,

“একাও পারবে শুধু সময় বেশি লাগবে তা তোমাকে কি পানিশমেন্ট দেওয়া যায় বলোতো? ”

“গলা টিপে মেরে ফেল পারলে। ”

মুসকান এক পলক সায়রীকে দেখে নিয়ে আবারপ কাজে মনোযোগ দিলো। হাতে হাতে দু’জন পুরোটাই গুছিয়ে অস্থির হয়ে এক সঙ্গেই বিছানায় বসে পড়লো। তারপর ও আলাপ সে আলাপ করতে কারতে এক পর্যায় দিহানকে ম্যাসেজ করে ইমনের রুমে আসতে বললো। এবং সিওর করলো এ রুমেই সায়রী রয়েছে। সায়রী রিমির শারীরিক অবস্থার কথা খোঁজ নিচ্ছিলো মুসকান শুধু হুম হা করছিলো। ঠিক তখনি দিহানের ম্যাসেজ এলো – musu ami romer baire asi tui kisu akta bahana dea ber ho.
তৎক্ষনাৎ মুসকান সায়রী’কে বললো,

“আপু একটু বসো নিচে আমার একটা দরকারি জিনিস ফেলে এসেছি এখনি আসছি জাষ্ট দুমিনিট। ”

মুসকান ত্বরিত গতিতে বেরিয়ে যেতেই দিহান ঝটপট রুমে ঢুকে দরজা লক করে দিলো। সায়রী আঁতকে ওঠলো। চট করে ওঠে দাঁড়িয়ে এক চিৎকার করে বললো,

“তুই… ”

দিহান তৎক্ষনাৎ ছুটে এসে ওর মুখ চেপে ধরলো বললো,

“চুপ চুপ কোন কথা নয়। ”

“উমহ ছাড় ছুঁবিনা তুই আমাকে। ইমনননন। ”

আরেক চিৎকার দিতেই দিহান আবারো ওর মুখ চেপে জড়িয়ে ধরলো। দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেলো। দিহান যতোই বলে চুপ করতে শান্ত হতে সায়রী ততোই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। এক পর্যায়ে দু’জনই ধপাস করে বিছানায় পড়ে গেলো। ব্যাপারটা দিহান এমন ভাবে হ্যান্ডেল করলো যে সায়রী পড়লো নিচে আর সে তার উপরে। তারপর ইচ্ছেকৃত নিজের সমস্ত ভার সায়রীর ওপর ছেড়ে দিয়ে এক হাতে মুখ চেপে ধরলো। ব্যস্ত গলায় বললো,

“আমাকে ছাড়া এ’কটা দিন তুই কিভাবে থাকলি এতো বড়ো বেইমানি! ”

এবার শান্ত হলো সায়রী অশ্রুসিক্ত রক্তিম চোখে স্থির হয়ে চেয়ে রইলো। দিহান অনুরোধের সুরে বললো,

“বাড়ি চল ভুল হয়ে গেছে আমার তুই আমাদের সম্পর্কের চেয়েও একটা বাচ্চা’কে ইম্পরট্যান্ট দিচ্ছিলি। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা আমাদের ভালোবাসা’কে অপমান করা। তাছাড়া যেখানে আমার কোন সমস্যা হচ্ছিল না যেখানে আমি তোর কোন সমস্যা আছে কিনা জানতে বিন্দু আগ্রহও পাইনি সেখানে তুই নিজেকে নিজেই সন্দেহ করে বসলি? নিজেকে করেছিস সেটা মেনে নিলাম কিন্তু আমাকে! তুইও আমায় সন্দেহ করতে পারিস তা আমি সেদিন প্রথম জানতে পারলাম। বুঝলাম আমার থেকেও বাচ্চা টা ইমপরট্যান্ট আর বাচ্চা দিতে না পারলে তুই আমাকে ছাড়তেও প্রস্তুত৷ বাড়ি চল সায়ু… তারপর আমি ডক্টর দেখাবো তোর তো সমস্যা নেই যদি আমার সমস্যা থাকে তখন না হয় আমরা আলাদা হয়ে যাবো। একটা অক্ষম ছেলের সঙ্গে তোকে জোর পূর্বক থাকতে হবে না। ”

রুমের সামনে মুসকানকে দেখে সন্দেহ দৃষ্টিতে চেয়ে এগুতে লাগলো ইমন। দরজা বন্ধ আর মুসকান তার সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে? তারপরই দিহানের কথা মাথায় এলো। পায়ের স্পিড বাড়িয়ে একদম মুসকানের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো ইমন। হকচকিয়ে গেলো মুসকান। এক ঢোক গিয়ে ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে আবার ইমনের দিকে তাকালো। ইমন ভ্রু কুঁচকে বললো,

” ভিতরে কি চলে? ”

মুসকান আমতা আমতা করে বললো,

“দিহু ভাইয়া সায়রী আপুর সাথে বোধহয় সব মিটমাট করছে। ”

“সায়রীর ইচ্ছেয় রুমে ঢুকেছে? ”

“না ”

“তাহলে? ”

মুসকান পুরো কথা বলতেই সজোরে এক ধমক দিলো ইমন। কেঁপে ওঠলো মুসকান চোখ দু’টো টলমল হয়ে গেলো। ইমন চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“বেশি পাকনা হয়ে গেছো এতো পাকনামি করতে বলছিলাম আমি? ”

কথাটা বলেই দরজায় বেশ জোরে শব্দ করলো ইমন। মুসকানের চোয়াল বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করলো। অভিমানে বুক ভারী হয়ে গেলো তার। ডেকে ডেকে বাড়িতে এনে এভাবে ধমক! #হৃৎপিণ্ড_২
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#পর্ব_১৭
#জান্নাতুল_নাঈমা
_____________________
ইমনের ধমক খেয়ে মুখ গোমরা করে নিচে চলে গেছে মুসকান। এদিকে সায়রী দরজা খুলে ইমনের দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,

“তোর বাসা আমার কোন সেফটিই নেই দেখছি এমন হলে নিজের সেফটির জন্য ডিফারেন্ট কিছু ভাবতে হবে আমাকে। ”

কথাগুলো বলেই হনহনিয়ে নিচে চলে গেলো সায়রী। ইমন ক্রোধে ফেটে পড়ে ভিতরে ঢুকে দিহানকে কিছু বলতে উদ্যত হবে তার পূর্বেই দিহান ডান হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ‘ওমাগো ওরে বাবারে খেয়ে ফেলছে আমারে!’ বলতে বলতে ইমনের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। দিহানের অমন মর্মান্তিক অবস্থা দেখে পেট চেপে হাসি এলো ইমনের। তবুও হাসলো না সে। নিজের এটিটিওড বজায় রেখে ক্রোধান্বিত স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“কেউ যদি ভেবে থাকে এখানে কারো বউ রয়েছে তাহলে ভুল। এখানে কারো বউ নেই, আমি কারো বউকে যত্ন করে এ বাড়িতে জায়গা দেইনি। ”

“ভাই আগে আমার হাতের ব্যবস্থা কর পরে বউয়ের খোঁজ দিস। ”

বলেই ব্যথায় আহ উহ করতে থাকলো। ইমন চাপা হেসে নিচু স্বরে বললো,’নিচে চল’। যতোই হোক বন্ধু তো… তাই বন্ধুত্বের টানে দিহানকে নিচে নিয়ে ব্যান্ডেজ করে মেডিসিন দিলো। ডানহাতে ব্যান্ডেজ করে সোফায় তব্দা খাওয়া অবস্থায় বসে রইলো দিহান। তার ঠিক সম্মুখে সিঙ্গেল সোফায় বসে আছে ইমন৷ মুখে তার দুষ্টু হাসি। মিটি মিটি হাসছে আর ফোন চাপছে সে। দিহান ওর হাসি দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে বললো,

“শালা ওরে কি তোর বাসায় কিছু খাইতে দেস নাই? একবারে আমার রক্ত,মাংস সব চুষে নিছে! ”

“না খাওয়াই রেখে দিছি যাতে তোর মতো উদ্ভট প্রাণী’কে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে হজম করতে সুবিধা হয়!”

বিরবির করে সমানে ইমনকে বকতে লাগলো দিহান। ইরাবতী আর আয়েশা সবার জন্য খাবার বাড়ছিলো তখন। একে একে ড্রয়িং রুমে সবাই এসে উপস্থিত হলো৷ তখনি আলিয়া মুসকান আর সায়রীর কথা স্মরণ করলো। ইরাবতী জানালো মুসকান সায়রীর সাথে রান্না ঘরে রয়েছে। ওদের আলাপের মাঝেই সায়রী আর মুসকান বেরিয়ে এলো। দিহান চোখ মুখ কুঁচকে বসে রইলো৷ সায়রী ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে ইরাবতীকে বললো,

“আন্টি মুসুকে একটু পরই মুরাদ নিতে আসবে ওকে বসিয়ে দেই? ”

ইরাবতী সম্মতি দেওয়ার পাশাপাশি সকলকেই বসতে বললো। সাথে সাথেই ইমন ওঠে দাঁড়ালো। মুসকানের দিকে আড়চোখে এক পলক তাকিয়েই যা বোঝার বোঝা হয়ে গেলো তার। বাঁকা হেসে গটগট করে উপরে ওঠে গেলো সে। দিহানের হাতে ব্যান্ডেজ তাই সে হালকা পাতলা নাস্তা করে চলে গেলো। যেহেতু মুরাদ আসছে সেহেতু তার ছুটি তবে যাওয়ার আগে বেশ কয়েকবার সায়রীর এট্যানশন পাওয়ার চেষ্টা করেছে লাভ হয়নি। শেষে ব্যর্থ প্রেমিক সেজে ফিরে গেছে সে৷ দিহান চলে যাওয়ায় সায়রী যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সমস্ত দুঃশ্চিন্তা দূরে ঠেলে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো সে। খেতে বসে সকলেই টুকটাক কথাবার্তা বলছে কিন্তু মুসকান একদম নিশ্চুপ। তেমন খাচ্ছেও না সে। শুধু হাত দিয়ে খাবারগুলো নাড়াচাড়া করছে। সকলে ভাবছে সে লজ্জা পাচ্ছে কদিন পর এটা তার শ্বশুর বাড়ি হবে তাই কিছুটা জড়তা কাজ করছে। কিন্তু ভিতরের খবর একজন ব্যাতিত আর কারো বোধগম্য হয়নি।
.
পোশাক পাল্টে ফ্রেশ হয়ে নিচে এলো ইমন৷ ততোক্ষণে অনেকেরই খাওয়া হয়ে গেছে বাকি শুধু আলিয়া আর মুসকান। মুসকান খেতে পারছে না নিজের বাড়ি বা বলে খাবার নষ্ট করে ওঠে যেতেও পারছে না৷ এদিকে আলিয়া খাচ্ছে কম বকবক করছে বেশি। এই বিয়ে নিয়ে গল্প করছে তো এই তার স্কুল,কলেজ জীবনের কাহিনী শেয়ার করছে। কখনো বা জানতে চাচ্ছে মুসকান ইমনের লাভ স্টোরির স্টার্টিং টা কিভাবে হয়েছিলো। মুসকান তো কিছু বলতেই পারছেনা। শুধু জোর পূর্বক মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করছে। এমন মোমেন্টে চেয়ার টেনে মুসকানের সম্মুখে বসলো ইমন। ইরাবতী তাকে খাবার বেড়ে দিয়ে আবার আয়েশার সাথে আলাপে ব্যস্ত হলো। ইমন বসেই আলিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“গল্প করার সময় কি চলে যাচ্ছে খাওয়ার সময় এতো কিসের কথা? পাঁচ মিনিটে ওঠবি। ”

আলিয়া দাঁত কেলিয়ে হেসে মুখ ভরে খাবার তুললো। এদিকে মুসকানের হার্টবিট সমানতালে ধুপধুপ আওয়াজ করে যাচ্ছে। তার গলা দিয়ে একটি দানাও নামছে না। তারওপর গম্ভীর রাগি ইমন চৌধুরী এ মূহুর্তে তার সামনে শুভ্র, শীতল রূপে বসে আছে। সদ্যই গোসল সেরেছে ইমন হালকা আকাশী রঙের টিশার্ট আর কালো রঙের ট্রাউজার পরে আছে সে। ঠিক যেনো আস্ত এক শুভ্রনীল আলাশ সম্মুখে বসা রয়েছে মুসকানের। এক ঢোক গিলে চোরা চোখে আর একবার ইমনকে দেখে নিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো৷ বলাবাহুল্য মুসকানের পরনেও আকাশী রঙের গাউন প্লাস সাদা রঙের ওড়না দিয়ে মাথায় ঘোমটা দেওয়া। খাওয়া শেষ করে আলিয়া যখন ওঠে পড়বে ঠিক তখনি চিল্লিয়ে ওঠে বললো,

“এ বাবা তোমরা দু’জন ম্যাচিং ড্রেসে প্ল্যান করে পরেছো নিশ্চয়ই? ”

পরোক্ষণেই ইমনের দিকে তাকিয়ে চুপসে গেলো আলিয়া হিহিহি করে বললো,

“ওহ না প্ল্যান না কিন্তু তুমি ভাবি’কে দেখে ম্যাচিং করে পরেছো তাইনা? ”

বলতে বলতে দাঁত কেলিয়ে হেসে সোফায় গিয়ে সায়রীর পাশে বসলো সে। এদিকে ইমন মুখের বিরক্তি ভাবটা কমিয়ে আলিয়ার থেকে মুসকানের দিকে তাকালো। খাবার খেতে খেতে বললো,

“কি ব্যাপার প্লেট থেকে কিছুই তো কমছে না সমস্যা কি? ভালোয় ভালোয় দশমিনিটে সব শেষ করবে। নো এক্সকিউজ। ”

মেজাজ এবার বেশ চটে গেলো মুসকানের। কিন্তু একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না। শুধু ফুঁসতে ফুঁসতে প্লেটের সব খাবার মুখে তুলে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করলো। এভাবে পরপর কয়েকবার মুখে দিতেই গলায় খাবার আঁটকে কাশতে শুরু করলো। এক পর্যায় পর দিকে বমি করে ডায়নিং টেবিল ভাসিয়ে দিলো। ইমন হতভম্ব হয়ে দ্রুত গ্লাসে পানি ভরে মুসকানের পাশে দাঁড়ালো। একহাত মাথায় চেপে ধরে অপর হাতে মুখের কাছে পানি দিলো। ইরাবতী, সায়রী সহ সকলেই ওদের কাছে এসে হতভম্ব হয়ে গেলো। সায়রী মুসকানকে ধরে নিয়ে বেসিনের কাছে গেলো। ইরাবতী ছেলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি’তে তাকিয়ে বললো,

“কি করে হলো এসব? ”

“কি করে আর হবে আমার তো সব দিকেই বিপদ! এই মেয়েটা নিজের প্রতি একটুও কেয়ারিং না। আর অন্য কেউ তার কেয়ার করতে আসলেও সহ্য হয় না। সমস্ত কেয়ারকে ঠিক এভাবেই ভাসিয়ে দেয়। ”

শেষ কথাটুকু ডায়নিং টেবিলের বমির দিকে ইশারা করে বললো ইমন। তারপর জগ হাতে নিয়ে পুরো জগের পানিটুকু বমির জায়গায় ঢেলে দিয়ে পারুল কে চিল্লিয়ে ডেকে বললো সব পরিষ্কার করতে। আর ইরাবতী’কে বললো,

“অন্তত এক গ্লাস জুস খাওয়াতে পারবে মা? ”

ছেলের অসহায়ত্ব দেখে অবাক না হয়ে পারলো না ইরাবতী। ইমন যে ঠিক কতোটা চিন্তিত কতোটা সিরিয়াস মুসকানকে নিয়ে এ মূহুর্তে ইমনের মুখ দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে। মন থেকে কাউকে ভালো বাসলেই এই অনুভূতি হয় না বরং মন থেকে কাউকে নিজের অনুভব করলেই এমন অনুভূতি সম্ভব। এই যে মুসকান ঠিকভাবে খাওয়া দাওয়া করে না খাবারে প্রতি তার এতো অনীহা। নিজের শরীরে প্রতি একটু যত্নশীল নয়। এতে তার কোন চিন্তা নেই অথচ মরিয়ম আক্তারের পর ইমনই এতোটা চিন্তিত। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইরাবতী বললো,

” কি বলি বলতো? না খেয়ে খেয়ে পেটে পিত্তি পড়ে গেছে পাকস্থলী মনে হয় চুপসে গেছে। ওর মা তো কম চেষ্টা করেনা ভাই আর কতোই করবে এ বাড়ি আসুক সব ঠিক হয়ে যাবে। এতো চিন্তা করিস না। ”

কথাগুলো বলেই ইরাবতী মুসকানের কাছে গেলো। ইমনেরও আর খাওয়া হলো না। চাপা একটি শ্বাস ছেড়ে উপরে চলে গেলো সে। প্রায় বিশ মিনিট পর একটু স্বাভাবিক হলো মুসকান। মুরাদও এসেছে। মুরাদের সঙ্গে ইমন উপরে মিটিং বসিয়েছে। মিটিংয়ের মেইন বিষয় ‘তোর বোনের সমস্যা কি?’
প্রতুত্তরে মুরাদ উত্তর দিয়েছে, ‘মূলত আমার বোনের কোন সমস্যা ছিলো না কিন্তু আমার বন্ধু তার জীবনটা সমস্যাময় করে দিছে!’

ইমন দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

“ফাইজলামি করস? দুনিয়ায় কি আর কোন মেয়ে নাই? ”

“সত্যি আছে? থাকলে কি আর দ্যা গ্রেট ইমন চৌধুরী আমার বোনের জন্য দিওয়ানা হয়? ”

কথাটা বলেই বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে বসলো মুরাদ। ইমন ব্যার্থ হয়ে বললো,

“আসলে কাকি মা দুনিয়াতে দুইটা তেজপাতা এনেছে। আর দূর্ভাগ্যবশত দুইটাই আমার জীবন তেজপাতা করে ছাড়ছে!”

অট্রস্বরে হেসে ওঠলো মুরাদ বললো,

“ক’দিন পরতো পুরো অধিকার, পুরো দায়িত্ব পাচ্ছিস এইকটা দিন ধৈর্য ধর তারপর যেভাবে পারবি সব তোর মতো করে তৈরী করে নিস। তোর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা আছে আমার সেই ভরসা থেকেই বলছি মুসুর ব্যাপারে তোর ইচ্ছা তোর সিদ্ধান্তই শেষ। ”

“ভেবে বলছিস? ”

“তবে রাগটা একটু কমিয়ে ”

হেসে ফেললো ইমন বিরবির করে আবার একটু বকেও দিলো। মুরাদ বললো,

“বোনটা একটু বেশিই অভিমানী। ”

“অতিরিক্ত পাকনাও বটে। ”

কথাটি বলেই দুপুরের ঘটনা খুলে বললো ইমন। মুরাদ সব শুনে বললো,

“দোষ তো দিহানের তুই ওরে ধমক দিছোস ক্যান?”

ইমন গভীর এক শ্বাস ছেড়ে বললো,

“হুম নিজের সংসারের বারোটা বাজিয়ে আমার সংসারে গ্যানজাম শুরু করছে। ”

মুরাদের সঙ্গে টুকটাক প্রয়োজনীয় কথা বলে দিহান সায়রীর সমস্যা মিটানোর উপায় বের করে মিটিংয়ের সমাপ্তি ঘটালো দুজন। তারপর মুসকানকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো মুরাদ। ইমন ওদের গেট অবদি এগিয়ে দিয়ে মুরাদের সামনেই মুসকান’কে বললো,

“কিছু কাজ আছে সেরেই রাত ন’টা কল করবো। ”

মুসকান চুপচাপ মুরাদের বাইকে ওঠে বসলো। ইমন নির্নিমেষ চোখে চেয়েই রইলো তবুও মুসকান ইমনের দিকে তাকালো না। তাই ইমন একদম পিছনে গিয়ে মুরাদকে বললো ‘সাবধানে যাইস ‘কথাটি বলেই পিছন থেকে মুসকানের হাত চেপে ধরলো। মুরাদ বললো, ‘চিন্তা করিস না পৌঁছে কল দিব’

ইমনের শক্ত হাতের বাঁধন ছাড়াতে হাত মোচড়াতে গিয়েও থেমে গেলো মুসকান। অভিমানী চোখে ইমনের দিকে তাকালো। টলমল সে দৃষ্টি দেখে ইমন ফিসফিস করে বললো,

” আমার বউকে আমি প্রয়োজনে একশটা ধমক দিব এতে মুরাদের বোনের কি? ”

মুখো ভঙ্গি স্বাভাবিক হয়ে এলো অনেকটা। মুখশ্রী’তে কিছুটা লালিমা দেখতে পেয়েই স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে হাত ছেড়ে দিলো ইমন। মুরাদকে বললো,

“টান দে। ”
___________________
দেখতে দেখতে কেটে গেলো বারোটা দিন। দিন গুলো দুজন ব্যাতিত অনেকের কাছে চোখের পলকেই কেটে গেলো। দু’বাড়িতে আত্মীয় স্বজনে ভরে ওঠেছে। গত দু’দিন ধরে ইমনের সঙ্গে তেমন কথা হয়নি মুসকানের। এর আগের দিনগুলোতে রাত এগারোটা অবদি দু’জন ফোন আলাপ করেছে। কিন্তু গত দু’দিনে এক মিনিটের ওপরে কোন কথাই হয়নি দুজনের। ইমন ফ্রি সময় পার করলেও মুসকান সারাদিন বিজি থাকে রাতে বোনদের সাথে ঘুমানোর ফলে ইমনের সঙ্গে কথাও বলতে পারেনা। এই অমানবিক অত্যাচার সইতে না পেরে অকুলান প্রায় হয়ে গেছে মুসকান৷ ইমনও কম অস্থিরতায় ভুগছে না। আগামীকাল মেহেদী অনুষ্ঠান। সকলে মিলে প্ল্যান করছে কে কোন ড্রেস পরবে। কে কোন মেহেদী পরবে মুসকান’কে কে মেহেদী পরিয়ে দেবে? পার্লার থেকে লোক আনবে নাকি নিজেরাই? এসব নিয়েই আলোচনা করছে মুসকানের মামাতো, খালাতো ভাইবোনরা। এমন সময় রিমির ফোনে কল এলো ইমনের। সে জানালো ইমনের ফ্রেন্ড রিক্তার নিজস্ব পার্লার রয়েছে সেখান থেকেই লোক আসবে এবং অনুষ্ঠানের সব কটা দিনই তারা সাজাবে মুসকানকে।
কথাটা শুনে রিমি ভীষণ খুশি হলো। ফোন কানে রাখা অবস্থায়ই সবাইকে জানালো ইমনের কথাটা। সবাই তো হৈচৈ করে ওঠলো। সে হৈচৈ এর শব্দে ইমন কেশে ওঠলো তারপর রিমিকে বললো,

“এবার খুশি হয়ে সবাই মিলে আধঘন্টার মাঝে মুরাদের একমাত্র বোনকে রেডি করে বাড়ির সামনে পাঠিয়ে দাও তো। নয়তো এই খুশি বেশিক্ষণ টিকবে না। ”

“সন্ধ্যা না হয়ে গেছে এই সন্ধ্যেবেলা কেন ভাইয়া?”

“আহ রিমি কোন প্রশ্ন করোনা জলদি পাঠিয়ে দাও ওয়েট করছি আমি। ”

“শাড়ি পড়াবো ভাইয়া? ”

“না না তাহলে আধঘন্টার জায়গায় চারঘন্টা চলে যাবে। আমার ওকে আধঘন্টা পরই প্রয়োজন। ”
#হৃৎপিণ্ড_২
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#পর্ব_১৮
#জান্নাতুল_নাঈমা
_____________________
সন্ধ্যাবেলা, চারদিকে আবছা অন্ধকারে ছেঁয়ে গেছে। মেইন রাস্তা বাদ রেখে গ্রামের দিকের জনশূন্য রাস্তাটায় মনের সুখে ড্রাইভ করছে ইমন৷ তার পাশের সিটে বসে আছে মুসকান। একহাত উঁচিয়ে ইমনের কানে ফোন ধরে আছে৷ ইমন কথা বলছে তার বন্ধু রিক্তার সাথে পাশাপাশি ড্রাইভ করছে। মুসকান যে প্রশ্ন করবে তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেটুকুনিও করতে পারছে না। গাড়িতে ওঠে বসার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ভিতরে আলো জ্বালিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে মুসকানের সিট বেল্ট লাগিয়ে দিলো। তারপর ফোন করলো রিক্তাকে আর মুসকানকে ইশারা করে বললো ফোনটা কানে ধরতে৷ অবাক চোখে তাকিয়ে ফোন কানে ধরলো মুসকান। কিন্তু এতেই ইমনের শান্তি হলো না। আবার তাকিয়ে ইশারায় বোঝালো তার দিকে তাকিয়ে থাকতে অর্থাৎ সে ড্রাইভ করবে আর ফোনে কথা বলবে আর মুসকান তার কানে ফোন ধরে থাকবে। পাশাপাশি তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে তার সুদর্শন চেহেরাখানা দেখবে। প্রায় পনেরো মিনিট এভাবে চলার পর হাত ব্যথায় মুসকান বিরক্ত হয়ে অন্যহাত দিয়ে ফোন ধরলো। এতে ইমনের দিকে একটু চেপেও বসতে হলো। ইমন মুচকি হেসে আবারো কথায় মনোযোগ দিলো। মুসকান যখন আবারো ফোন অন্যহাতে বদল করবে তৎক্ষণাৎ ইমন রিক্তার উদ্দেশ্যে বললো,

“এই এখন রাখি আমার বউয়ের হাত ব্যথা হয়ে গেছে রাতে কল দেবো। ”

ওপাশে কি বললো তেমন বোঝা গেলো না ইমন মুসকান’কে ফোন কাটতে বললো। মুসকান তাই করে নম্র গলায় প্রশ্ন করলো,

“আমরা কোথায় যাচ্ছি? ”

ইমন লম্বা এক শ্বাস ছেড়ে মাথা দুলিয়ে বললো,

“সারপ্রাইজ। ”

মুসকান এক পলক ইমনের দিকে উৎসুক দৃষ্টি’তে তাকিয়ে নতমুখে ইমনের ফোন চাপতে শুরু করলো। ফার্স্ট গ্যালারি’তে ঢুকলো সেখানে ইমন সহ তার বন্ধু-বান্ধবদের অগণিত ছবি চোখে পড়লো। অথচ তার একটা ছবিও নজরে পড়লো না। বেশ সময় নিয়ে গ্যালারির হাজার দুয়েক ছবি দেখে শেষ করলো। তবুও নিজের একটা পিকচারও পেলো না। রাগে,দুঃখে আড়চোখে একবার তাকালো ইমনের দিকে। সে মনের সুখে ড্রাইভ করছে। তার সে সুখ দেখে আরো গা জ্বলে গেলো মুসকানের তাই অভিমানে ছলছল দৃষ্টিতে ফোন ফেরত দিলো। ইমন তার দিকে না তাকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো,

“শুধু গ্যালারি দেখলেই চলবে ম্যাম? প্রাইভেট মানুষ প্রাইভেট অ্যাপে ঢুকুন। আমার প্রাইভেট জিনিস কি আর পাবলিক প্লেসে পাওয়া যাবে নাকি? ”

কথাটি শেষ করেই মুসকানের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপ মেরে ঠোঁট কামড়ে হাসলো ইমন৷ হৃৎপিণ্ড কেঁপে ওঠলো মুসকানের। লজ্জায় লাল হয়ে গেলো তার গাল দু’টো। মাথা নিচু করে নিজের নিঃশ্বাসের বেগ আঁটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলো। যেনো ইমন শুনতে না পারে তার বিক্ষিপ্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ গুলো। তবুও সে ধরা পড়েই গেলো। ইমন ওষ্ঠকোণে তৃপ্তিময় হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে ড্রাইভ করে যাচ্ছে। প্রায় দু’ঘন্টার জার্নি শেষে গাড়ির ব্রেক কষলো ইমন৷ মুসকান তখন ডুবে আছে ইমনের লোমহীন কখনো আবার লোমশভরা উন্মুক্ত বুকখানায়। জার্মানি’তে থাকাকালীন তার যতো রূপ সবই দেখতে পেলো মুসকান। কয়েকটা পিকে সুইমিংপুলে পা ডুবানো অবস্থায় ছিলো ইমন তার পাশে ছিলো বেশ কিছু বিকিনি পরিহিত বিদেশি নারী। যা দেখে কান্না পেয়ে যাচ্ছে মুসকানের। মনে ভিতর শুধু কয়েকটি প্রশ্ন খুঁত খুঁত করছে ঐ মেয়েগুলো ইমনের পাশে কেন ছিলো? ইমন কি ঐ মেয়ে গুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলো? অমন অবস্থায় ইমন সাদা চামড়ার ঐ মহিলাদের দেখেছে ভাবতেই মরে যেতে ইচ্ছে করছে তার। দুচোখ ভর্তি অশ্রুকণা গুলো কেবল পড়ার অপেক্ষা।

গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে নজর বুলিয়ে মুসকানের পাশে চলে গেলো ইমন৷ ডোর খুলে মুসকানকে নামতে বললো। অভিমানে মুসকান ফোনটা ইমনের দিকে এগিয়ে দিয়ে মাথা নিচু করে নেমে দাঁড়ালো। ইমন তাকে কোথায় নিয়ে এসেছে জানেনা। শহর থেকে দূরের কোন জায়গায় তা বেশ নিশ্চিত করতে পারলো। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি ভাবে যেমন অসংখ্য গাছপালা রয়েছে, তেমনি দুধারে বিস্তর জায়গা জুরে রয়েছে অথৈজল। দু’একটা গাড়ি চলাচলের ফলে রাস্তাটা ঠিকভাবে পরোখ করে নিলো মুসকান। তারপর তাকালো পশ্চিম পাশের বিস্ময়কর এক দৃশ্যের দিকে। রাস্তার পাড়ের পরেই বিস্তর জায়গায় পানি আর পানি। দেখে বোঝায় যাচ্ছে আবাদি কিছু জমি এবং খালবিল ভরে পানি এসেছে। সে পানির ওপরই ছাতার মতো সিস্টেম করে ছাউনি ঘর তোলা হয়েছে। সে ঘরে যাওয়ার জন্য বাঁশ এবং কাঠ দিয়ে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে গ্রাম্য ভাষায় এটাকে শাকুও বলা যেতে পারে। তবে সরলরেখার থেকে কিছুটা ভিন্ন শাকু যা মুসকান সিঁড়ি হিসেবেই চিহ্নিত করলো। সিঁড়ির দুপাশে ল্যামপোস্টের মতোন থেকে থেকে দূরে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছাউনির চারপাশে দেয়াল নেই। মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালে চারপাশের শুধু পানি আর পানি দেখা যাবে। এমন মনোরম পরিবেশে মুগ্ধ না হয়ে পারলো না মুসকান।

অক্টোবর মাস চলছে, ঋতুতে শরৎকাল। অথচ আবহাওয়ায় এখনো বর্ষাকালের ভাব রয়েছে। যার ফলস্বরূপ চারদিকে থৈথৈ পানি বাড়ছে বই কমছে না। প্রকৃতির এমন আবহাওয়াতেই মুসকানকে নিয়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ব্যবস্থা করেছে ইমন। শহরে পরিবেশে নয় বরং গ্রাম্য পরিবেশে। আজ সে মুসকানকে থৈথৈ জলের মধ্যেখানে প্রকৃতি’কে নব্যরূপে উপভোগ করাবে। গাড়ি লক করে মুসকানের পাশে এসে ওর হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে এগোতে থাকলো ইমন৷ যখন সিঁড়ি দিয়ে যাচ্ছিলো কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ইমনের হাত শক্ত করে চেপে ধরলো মুসকান। ইমনও আস্থার সাথে তাকে ধরে একদম ভিতরে নিয়ে গিয়ে মাঝবরাবর থাকা গোল টেবিলের সামনের চেয়ারটায় বসতে বললো। মুসকান বসে নিচের দিকে তাকিয়ে লক্ষ করলো মেঝে পুরোটাই কাঠ দ্বারা তৈরি। চারদিক থেকে শীতল হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিতে থাকলো ওকে। কি স্নিগ্ধ অনুভূতি! ইমন ততোক্ষণে ছাউনির একপাশে দু’জন অল্প বয়সী ছেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলে ফিরে এলো। কিছু সময়ের মাঝেই ছেলে গুলো সমস্ত লাইট অফ করে ফোনের ফ্ল্যায় অন করে বেরিয়ে গেলো। মুসকান ধড়ফড়িয়ে ওঠে অন্ধকারেই ইমনের পিঠ খামচে ধরলো। চমকে ওঠে ইমন দ্রুত ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে মুসকানের দিকে ধরলো। বললো,

“আরে আরে আছি আমি এতো ভয় কিসের? ”

মুসকান কোন কথা না বলে ইমনের বাহু চেপে ধরলো। ইমন অমনি তাকে বসালো চেয়ারে। কিন্তু মুসকান তাকে ছাড়লো না ইমন বলার পরও ছাড়লো না। বাধ্য হয়ে ইমন ফোন টেবিলের এক কোণায় রেখে একহাতে চেয়ার টেনে একদম মুসকানের পাশে বসলো। একহাতে অতি সন্তর্পণে মুসকানকে জড়িয়ে ধরে অপর হাতে ফ্ল্যাশ অফ করে দিলো। সাথে সাথে ভয়ে মুসকান ‘নানাভাই ‘ বলে ইমনকে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে দিলো। ভয়ে ভয়ে ধমকে বললো,

“এমন করছো কেন অন্ধকারে ভয় লাগে আমার জানোনা ”

এ যেনো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির আগমণ ঘটলো ইমনের বক্ষঃস্থলে। কিন্তু সারপ্রাইজ তো এখনো বাকিই রইলো। এতো কাঠখড় পোহিয়ে এমন একটি সারপ্রাইজের ব্যবস্থা করলো আর তা কিনা নষ্ট হবে! ইমন মুসকানকে আরেকটু গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,

“এমন করলে সারপ্রাইজ দেবো কি করে আমি আছিতো এখানেই এতো ভয় কিসের? ”

মুসকান আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ইমনকে। কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো,

“তুমি ওদের সব লাইট অন করতে বলো নয়তো আমি ছাড়বোনা। ”

“তাহলে তো লাইট অন করার প্রশ্নই ওঠে না। ”

“না তুমি এমন করবেনা আমার ভয় লাগছে। ”

“আমি এটাই করবো ”

কথাটি বলেই আচমকাই মুসকানের কানের নিচে গভীরভাবে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো ইমন। শিউরে ওঠে ইমনের শার্ট খামচে ধরলো মুসকান। নিঃশ্বাস ভারী করে অস্ফুট স্বরে বললো,

“প্লিজ এমন করোনা। ”

মৃদু হেসে ইমন মুসকানের মাথায় হাত বুলিয়ে চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে খানিকটা উঁচিয়ে ধরে ওঠে দাঁড়ালো। মুসকান তার দুপা ফেললো ইমনের পায়ের ওপরে। দুহাতে বুক জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। নিঃশ্বাসে তার তীব্র অস্থিরতা। ইমন একহাতে মুসকানকে সামলে অপরহাতে পকেট থেকে লাইটার বের করলো। তারপর টেবিলের ওপর থাকা সাদা পাতলা আস্তরণ টা ওঠিয়ে নিচে ফেলে দিয়ে মাঝ বরাবর রাখা মোমগুলো জ্বালালো। তারপর মুসকানকে বললো চোখ খুলে তাকাতে। মুসকান সেভাবেই চোখ খুলে তাকালো। তারপর আচমকাই বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে গেলো তার তারপর অন্যমনস্ক হয়ে ইমনকে ছেড়েও দিলো। ইমন মুচকি হেসে চেয়ারগুলো ঠিক করে বসলো তারপর মুসকানকে ইশারা করলো বসতে। এক ঢোক গিলে মুসকান আবারো ইমনকে ঘেষে বসলো তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে বললো,

“এসব আমার জন্য!”

“না আমার বন্ধুর একমাত্র বোন কলিজার টুকরা আমার একমাত্র বউ এণ্ড হৃৎপিণ্ডের জন্য কাস্টমাইজড চকলোট উইথ হার্ট শেপ। ”

দু’হাত গালে লাগিয়ে অবাক হয়ে বললো,

“হায় আল্লাহ এতোগুলা আমি খাবো কি করে সব আমার জন্য! ”

“আমার কি আরো দু’চারটা বউ আছে নাকি? ”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here