হৃদয়জুড়ে তুমি পর্ব -০২

#হৃদয়জুড়ে_তুমি
#পর্বঃ২
#লেখিকাঃদিশা_মনি

নিজের শাশুড়ি আর বরকে শায়েস্তা করতে শ্বশুর বাড়িতে এসে হাজির হলো সিমা। দরজায় কলিং বেল বাজানোর কিছু সময় পরই মান্নাত বেগম এসে দরজা খুলে দেন। সিমাকে দেখামাত্রই ক্ষেপে যান তিনি। বাজখাই গলায় বলেন,
‘ঠকবাজ মেয়ে। আমি যদি আগে জানতাম আমার স্বামী তোমাকে পছন্দ করেছে ছেলের বউ হিসেবে তাহলে নিজের জীবন দিয়ে হলেও বিয়েটা ঠেকাতাম। আর তুমি কোন সাহসে এই বাড়িতে এসেছ?’

রায়হান খান বলে ওঠেন,
‘আমি ওকে সাহস দিয়েছি এখানে আসার। তুমি আর বেশি কথা না বাড়িয়ে যাও গিয়ে বরণ ডালা এনে মেয়েটাকে বরণ করো।’

ইহানও এরমধ্যে সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। সাথে তার ছোট বোন ইনায়াও এসেছে। ইনায়া নিজের বাবার উদ্দ্যেশ্যে বলে,
‘আব্বু তুমি ভাইয়াকে এভাবে ঠকালে। তোমার থেকে এটা আশা করিনি। আমি নাহয় তোমার ভালো মেয়ে নই, তোমার কোন কথা শুনি না। তাই আমার প্রতি রাগ থাকতেই পারে। কিন্তু ভাইয়া তো তোমার সব কথা শোনে, তোমার ভালো ছেলে। তাহলে তুমি কেন এভাবে ভাইয়ার জীবন নষ্ট করে দিলে?’

রায়হান খান ভীষণই বিরক্ত হন। তার বিরক্ত হওয়াই স্বাভাবিক। পরিবার নাকি মানুষের শান্তির যায়গা। কিন্তু তার পরিবারই তার জীবনে সবথেকে বড় অশান্তির কারণ। মান্নাতকে বিয়ে করেই তার জীবনে এই অশান্তির সূত্রপাত হয়েছে। মান্নাত ছিল জমিদার বাড়ির মেয়ে। কিন্তু তার মানসিকতা অনেক নিচু স্বভাবের। রূপ দিয়েই সবাইকে বিচার করেন তিনি। মেয়েটাও হয়েছে মায়ের মতো। ছেলেটাকে অন্যরকম ভেবেছিলেন কিন্তু এখন দেখছেন ছেলেটাও একইরকম।

রায়হান খান কিছু বলতে যাবেন তার আগেই ইহান বলে,
‘আমি এই বিয়ে মানি না আব্বু। তাই এই মেয়েকেও আমি স্ত্রীর মর্যাদা দিবো না। ভালো এটাই হবে যে, ও এই বাড়ি থেকে এক্ষুনি চলে যাক। আমার লাইফে ওর কোন যায়গা নেই।’

সিমা শাড়ির আচলটা ভালো করে কোমড়ে গুজে নেয়। অতঃপর বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। বাড়ির কাজের মেয়ে জরিনা দাড়িয়ে ছিল সেখানে। সিমা জরিনাকে সাথে নিয়ে বাড়ির ভেতরে যায়। কেউ কিছু বুঝতে পারে না। কিছু সময় পর সিমা বরণ ডালা হাতে করে নিয়ে আসে। সেই বরণ ডালা নিজের শাশুড়ি মান্নাত বেগমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,
‘নিন আমাকে বরণ করে নিন। আপনার ছেলে কিন্তু সব নিয়ম মেনেই আমাকে বিয়ে করেছে। তাই আইনত আমরা এখন স্বামী স্ত্রী। আমার গায়ের রং কালো হলেও মনটা কিন্তু বেশ ভালো। কথা দিচ্ছি আপনার সংসার খুব সুন্দর করে গুছিয়ে রাখব।’

মান্নাত বেগম বরণ ডালা ছু’ড়ে ফেলতে যাবে তখনই সিমা তার হাত ধরে নেয়। মৃদু হাসি দিয়ে বলে,
‘ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের মতো নাটক করবেন না প্লিজ। নাহলে কিন্তু আমি নারী নি*র্যাতন মামলা করে দেব।’

এই কথাটা শুনে মান্নাত বেগম বেশ ভয় পেয়ে যান। তাই তিনি বাধ্য হন সিমাকে বরণ করতে। তবে মনে মনে সংকল্প করে নেন,
‘এই মেয়েকে আজ বরণ করে বাড়িতে তুলছি ঠিকই। কিন্তু যত দ্রুত সম্ভব একে দূরও করব।’

৩.
সিমা বরণ শেষ হলেই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। ইনায়া সিমার উদ্দ্যেশ্যে বলে,
‘তোমার কি লজ্জা নেই? এভাবে জোর করে অধিকার চাইছ। অবশ্য তোমার যা রূপ, জোরজবরদস্তি ছাড়া কারো ঘরে ঠাই পাওয়ার কথাও না।’

সিমার ভীষণ রাগ হলো। তবে সে নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করল। অতঃপর হালকা হেসে বলল,
‘একজনের মতো অন্তত জোর করে অন্যের প্রেমিকের সাথে প্রেম করতে চাইনি।’

ইনায়া আর কিছু বলতে পারল না। কারণ কথাটা যে তাকে উদ্দ্যেশ্য করেই বলা হয়েছে সেটা বুঝতে আর তার বাকি নেই। সিমা ও ইনায়া একই কলেজে পড়েছে। সিমা ইনায়ার এক বছরের সিনিয়র ছিল। সেইসময় ইনায়া সিমার বেস্ট ফ্রেন্ডের প্রেমিকের সাথে সম্পর্কে জড়াতে চেয়েছিল। সেই নিয়ে অনেক কাহিনি হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে নিজের বাবার কানে এসব কথা আসতে দেয়নি ইনায়া। এখন যদি সিমা বলে দেয় সেই ভয় থেকেই ইনায়াকে চুপ হতে হলো।

ইহান সিমার উদ্দ্যেশ্যে বলে,
‘এই বাড়িতে ঢুকেছেন ভালো। কিন্তু আমার রুমে প্রবেশ করার সাহস দেখাবেন না। যাকে আমি স্ত্রী হিসেবেই মানি না তাকে আমার লাইফে আমি আসতে দিতে চাইনা।’

সিমা ইহানকে নিয়ে একপ্রকার উপহাস করেই বলল,
‘কবুল বলে বিয়ে করেছেন আর এখন বলছেন লাইফে যায়গা নেই। আপনাকে কিছু বলার নেই। হোয়াট এভার, আমি নিজের অধিকার বুঝে নিতে জানি তাই আপনার কথা শোনার কোন আগ্রহ আমার নেই।’

ইহান রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করল৷ যেটা দেখে সিমা বলল,
‘আপনার এই রাগ দেখার সময় আমার নেই। আমি একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওমেন। খুব শীঘ্রই ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু করতে চলেছি। তাই আমি এটলিস্ট স্বামীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকব না।’

কথাটা বলে নিজের লাগেজ নিয়ে জরিনার সাথে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছিল সিমা। ইহান চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে,
‘কোথায় যাচ্ছেন আপনি?’

‘আমি নিজের রুমে যাচ্ছি।’

‘ওটা আপনার নয় আমার রুম।’

‘এখন থেকে ওটা আমারও রুম। আপনার সাথে বেশি বকবক করার সময় নেই। আজ তো আমাদের বাসর হবে তখন চলে আসবেন। যত খুশি বকবক করার করিয়েন আমি মনযোগ দিয়ে শুনবো।’

ইহানের রাগ হচ্ছিল প্রচুর। কিন্তু সে কিছু করতেও পারছিল না। মান্নাত বেগম ইহানের কাধে হাত দিয়ে বলে,
‘তুই চিন্তা করিস না ইহান। এই মেয়েকে কিভাবে বিদায় করবো সেটা আমি ভেবে নিয়েছি।’

রায়হান খান পিছন থেকে বলেন,
‘তোমার যত কূটবুদ্ধি আছে সব প্রয়োগ করে দেখতে পারো। কোন লাভ হবে না। সিমাকে তোমরা চেনো না। ও যেমন মেধাবী তেমনই বুদ্ধিমতী। ওকে জব্দ করা অসম্ভব। তোমাদের সবাইকে দশবার বিক্রি করার ক্ষমতা আছে ওর। তাই তোমাদের ভালো এটাতেই হবে যদি তোমরা ওর থেকে সাবধানে থাকো।’

‘তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?’

‘ভয় দেখাচ্ছি না মান্নাত। আমি শুধু সতর্ক করছি। বাকিটা তুমি বুঝে নেও কি করবে।’

৪.
সিমা রুমে এসেই শুয়ে পড়েছে। অনেক ক্লান্ত লাগছে তার। হঠাৎ তার মনে পড়লো আজ তো বাসর উপলক্ষে তাদের ঘর সুন্দর করে সাজানোর কথা। কিন্তু সেরকম কিছু তো সে দেখছে না। সিমা লক্ষ্য করল মেঝেতে বিভিন্ন ফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এটা দেখেই সে বুঝতে পারল হয়তো ইহানই সুসজ্জিত বাসর নষ্ট করেছে।

সিমা ভাবল,
‘সাজানো বাসর নষ্ট করেছেন তো মিস্টার ইহান। এবার দেখুন কিভাবে আমি আজ আপনাকে এই বাসর ঘরে আসতে বাধ্য করি।’

মেঝেতে পড়ে থাকা বিভিন্ন ফুল নিয়ে পুনরায় বাসর ঘর সাজাতে থাকে সিমা। বাসর সাজাতে সাজাতে সিমা ভাবছিল,
‘আমিই বোধহয় ইতিহাসে প্রথম মেয়ে যে নিজের বাসর নিজেই সাজাচ্ছি। হা হা হা।’

ইনায়া ঐ রুমের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল। হঠাৎ কিছু একটা মনে করে রুমে উকি দিতেই দেখতে পায় সিমা বাসর ঘর সাজাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে ইনায়া বলে,
‘নির্লজ্জ মেয়ে। বাসর করার খুব শখ না তোমার। দাড়াও তোমার বাসর করার ইচ্ছা জন্মের মতো ঘুচিয়ে দিচ্ছি।’

ইনায়া সোজা চলে যায় নিজের মা মান্নাতের রুমে। তাকে গিয়ে বলে,
‘আম্মু জানো আমি দেখে এলাম ঐ সিমা না বাসর ঘর সাজাচ্ছে। কি হবে বলো তো?’

মান্নাত বেগম রাগে কটমট করতে করতে বলেন,
‘যা তোর ভাইয়াকে মানে ইহানকে ডেকে নিয়ে আয়। তারপর আমি দেখছি ঐ মেয়ে কি করতে পারে।’

ইনায়া তাই করে। নিজের মায়ের কথামতো নিজের ভাইকে ডাকতে যায়। ইহান এসে তার মাকে বলে,
‘আম্মু আমাকে ডাকছিলে?’

‘হ্যা, তোর সাথে জরুরি কথা আছে। শুনলাম ঐ মেয়ে নাকি বাসর ঘর সাজাচ্ছে। আমি কিন্তু আগেই তোকে সাবধান করেছিলাম তোর আব্বুকে বিশ্বাস করিস না। সেটা তো শুনলি না এখন বোঝ। যাইহোক তুই কিন্তু ঐ মেয়ের সাথে বাসর করবি না। তুই একটা কাজ কর আজ রাতে নিজের কোন এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে থাক। এখানে থাকলে তোর বাবা জোর করে বাসর ঘরে পাঠাতে পারে।’

ইহান রাজি হয়। অতঃপর নিজের এক বন্ধুকে ফোন করে কথা বলে।

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here