হৃদয় এনেছি ভেজা পর্ব -১৪+১৫+১৬

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [১৪]

সাইফ ভ্রু কুচকে চেয়ে আছে রাস্তার দিকে। তার গাড়ির সামনেই একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে রঙিন কাগজে মোড়ানো বড়ো একটি বাক্স। সাইফ কিছুক্ষণ তার ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে জানালার কাচ নামিয়ে সাইফ মাথা বের করে মেয়েটির দিকে তাকালো। কপাল কুচকে বললো,
–“পথ থেকে সরে দাঁড়ান। মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”

জায়গাটা নীরব। সেরকম দোকান-পাঠ বা মানুষজন নেই। একপাশে সারি দিয়ে মোটা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছের পেছনে আবার বড়ো দেয়াল, অনেকটা জুড়ে। গাছের শুকনো পাতা ঝড়ে পরায় পথটা শুকনো পাতায় ভর্তি। দেখতে মন্দ লাগছে না। বরং সুন্দর লাগছে। রাস্তার অপর পাশেও বড়ো দেয়াল। এক দুটো গাছ ছাড়া সেদিকটায় তেমন কিছু নেই। তবে সবমিলিয়ে এই জায়গাটা সুন্দর, স্বচ্ছল!

মেয়েটি সাইফের কাছে এগিয়ে এসে বললো,
–“আপনার মনোযোগ পাইনি কখনো। পাত্তাও সেরকম কাউকে দেন না। এজন্য বাধ্য হয়েই মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়েছি।”

সাইফ কুচকানো কপাল আরও কুচকে বললো,
–“বাই চান্স যদি কোনো এক্সিডেন্ট হয়ে যেত? তখন তার দায়ভার কে নিতো শুনি?”

মেয়েটি একগাল হেসে বলে,
–“অবশ্যই আপনি!”

বলেই কোনো কথা ছাড়াই দরজার সামনে দিয়া হাঁটু গেড়ে বসে পরলো। দিয়াকে হঠাৎ এভাবে মাটিতে বসে পরতে দেখে সাইফের কুচকানো কপাল মসৃণ হলো। চোখ-মুখ জুড়ে ছড়ালো বিস্ময়। দিয়া হাতের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলে,
–“আপনি কী আমার উপহার গ্রহণ করবেন সাইফ?”

সাইফ ‘থ’, হতভম্ভ, বিমূঢ়। এভাবে কেউ কখনো তাকে উপহার সাধেনি। এরকম ঘটনার সম্মুখীন বোধহয় প্রথম হলো। সাইফ গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। সাইফ দিয়ার হাত থেকে উপহারটা নিয়ে বললো,
–“করছেন কী? এভাবে হাঁটু গেড়ে কেন বসলেন?”

দিয়া উত্তর দিলো না। শুধু অধরে তৃপ্তির ফোটালো। সেই হাসির মানে সাইফের বোধগম্য হলো না। সাইফ বললো,
–“এভাবে উপহার কেন দিলেন? উপহার দেওয়ার থাকলে কারো থেকে আমার ঠিকানা নিয়ে পাঠাতে পারতেন!”

দিয়া এবারও হাসলো। হেসে বললো,
–“সরাসরি দেওয়ার ইচ্ছে ছিলো। দিয়েছি। এখন শান্তি। আসি নাহয়! উপহার আবার ফেলে দিবেন না। ভেতরে হয়তো-বা এমন কিছু আছে, যা অমূল্য। দয়া করে আমার অমূল্য সম্পদের হেফাজত করবেন। আমার এটা প্রথম এবং হয়তো শেষ চাওয়া!”

বলেই দিয়া চলে গেলো। সাইফ তখন আগের জায়গাতেই বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। দূর থেকে তরী সবকিছু দেখলো। তবে সাইফের চেহারা অস্পষ্ট ছিলো। এই পথটা তার প্রিয়। ছবি আঁকার জন্যেও বেস্ট। এজন্যে মন ভালো রাখার জন্যে মাঝেমধ্যেই এখানে এসে এক কোণে বসে স্কেচ করে। এই বিষয়টা তরীকে দারুণ উপভোগ করায়। কিন্তু এই পর্যায়ে দিয়াকে হাঁটু গেড়ে বসে সাইফকে উপহার দেওয়ার দৃশ্যটা দেখে ফেলে। আশেপাশের ব্যস্ত অনেকেই দেখেছে। সকলের জন্যে এটা সেরা এবং সুন্দর দৃশ্য লাগলেও তরীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখালো। তরীর এই অবস্থা দেখে নাক কুচকে ফেললো। মিনমিন করে বললো,
–“আস্তাগফিরুল্লাহ্। আজকালকার মেয়েদের লাজ কোথায় গিয়ে পৌঁছিয়েছে মাবুদ!”

তরী সেখানে আর থাকলো না। অর্ধেক স্কেচ ব্যাগে ভরে চলে গেলো। এখানে সিএনজি পাওয়া যায়। নির্দিষ্ট একটি জায়গায় সিএনজি গুলো যায়। তরীদের বাড়ির গলি সেই রাস্তাতেই পরে। এজন্যে তরী সিএনজিতে উঠে বসলো। তরীর পাশের একটি সিট খালি ছিলো। সেখানে একজন লোক বসতে নিচ্ছিলো ওমনি কেউ একজন লোকটির হাত টান দিয়ে ধরে বললো,
–“কী করেন মিয়া! মহিলা আসছে তারে বসতে দেন!”

কন্ঠ চেনা-জানা লাগলো। তরী বিস্ফোরিত চোখে বাইরে তাকালো। সিদাত দাঁড়িয়ে। সত্যি সত্যি-ই একজন মহিলা উঠে বসলো। মহিলার বেশ-ভূষা দেখে মনে হলো ভালো পরিবারের থেকেই এসেছে। সিদাত লোকটিকে ছেড়ে মহিলার উদ্দেশ্যে ঝুঁকতেই তরীর দিকে চোখে গেলো। এবং সে চমকে গেলো। দুজন দুজনের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। সিদাত কয়েক সেকেন্ড তরীর দিকে চেয়ে অধর বাঁকিয়ে হাসলো। আপনমনেই বললো,
–“বাহ! পৃথিবী দেখছি আসলেই গোল!”

তরী শুনলো সিদাতের কথা। কিন্তু স্বভাবসুলভ নীরব রইলো। তবে ফিরোজা খাতুন বুঝলো না সিদাতের কথা। ফিরোজা বললো,
–“কী বললে, বুঝলাম না বাবা!”

সিদাত হাসি বজায় রেখে মৃদু গলায় বললো,
–“কিছু না ছোটো মা। তুমি এই সিএনজি করে আপাতত অনয়ের বাসায় যাও। চাবি তো দিলাম-ই। আমি গাড়ি ঠিক করে আসছি। ঠিক করতে ঘন্টাখানেক লাগবে, এর চাইতে বরং তুমি অনয়ের বাসাতেই চলে যাও। যেতে বেশি সময় লাগবে না। আর তুমি না চিনলেও কোনো সমস্যা নেই। তোমার পাশেরজন চিনিয়ে দিবে!”

বলেই সিদাত তরীর দিকে অদ্ভুত চোখে চেয়ে চলে গেলো। আর কাউকে সিদাত উঠতে দেয় না। সিএনজি ড্রাইভারকে দুজনের জন্যে রিজার্ভ করে দিলো। সিএনজি ড্রাইভার টাকা পেয়ে বিনা-বাক্যে উঠে বসে এবং সিএনজি চালু করে।

–“তুমি কী সিদাতকে চিনো?”

তরী চমকে চাইলো ভদ্র মহিলার দিকে। ফিরোজা খাতুন উৎসুক নজরে চেয়ে আছে তার দিকে। ফিরোজা খাতুন একটি বোরকা এবং হিজাবের ওপর নিকাব পরে আছে। তাই জন্য ওনার মুখ দেখতে পারেনি তরী।

ওনার এহেম প্রশ্নে তরী কন্ঠস্বর যথেষ্ট নরম করে বললো,
–“ওনার বন্ধু আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে!”

ফিরোজা খাতুন বুঝতে পারলো। তরী এর বেশি কিছু বলেনি। ফিরোজা বুঝলো তরী অল্প ভাষী। এই গুণ তার পছন্দ হয়েছে। তাই সে নিজেও আগ বাড়িয়ে কিছু বলেনি। তরী কী মনে করে ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে ফিরোজা খাতুনের দিকে বাড়িয়ে দিলো। বললো,
–“ভাড়াটা আপনি নিন আন্টি।”

ফিরোজা খাতুন ভারী অবাক হলো তরীর কথায়। চোখ বড়ো বড়ো করে অবাক সুরে বললো,
–“ওমা। কিসের ভাড়া আবার?”

তরী কিছুটা বিব্রত সুরে বললো,
–“আপনার ছেলে রিজার্ভের ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। আমি মোটেও নিজের ভাড়া অন্যকারো বহন করাটা পছন্দ করছি না। তাই আপনি এই টাকাটা রাখুন। মনে দুঃখ নিবেন না আন্টি, তবে আমি সত্যি-ই এটা সহ্য করতে পারি না!”

ফিরোজার যেন আজ চমকানোর দিন। মেয়েটার স্বভাব, আচরণ বড়োই ভাবাচ্ছে তাকে। ছোটো মেয়েটার থেকে টাকা নিবে, কেমন দেখাচ্ছে না? তার ওপর বারণও করতে পারছে না। কার খপ্পরে পরলো সে কে জানে। তবে মেয়েটির কন্ঠে বিব্রতবোধ স্পষ্ট ছিলো। হয়তো ফিরোজা স্মার্ট পরিবেশে ওঠা-বসা করায় এই ব্যাপারগুলো হজম করাটা কষ্টকর। তবে ফিরোজা খাতুন দীর্ঘক্ষণ ভেবে টাকাটা নিলো। সঙ্গে সঙ্গেই তরীর চোখ জুড়ে স্বস্তি দেখতে পেলো ফিরোজা। এতে ফিরোজাও স্বস্তি পেলো। ফিরোজা হেসে বললো,

–“তোমাকে আমার ভীষণ মনে ধরেছে। একদিন চায়ের দাওয়াতে চলে এসো আমাদের বাড়ীতে। নিজ হাতে চা বানিয়ে খাওয়াবো!”

তরী হাসলো। বললো,
–“ধন্যবাদ দাওয়াতের জন্য!”

ওরা ত্রিশ মিনিটের মধ্যে-ই পৌঁছালো। তরী অনয়ের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিয়ে নিজেও বাড়িতে চলে আসে। ফুপি সোফায় বসে টিভি দেখছে। কোথাও অগ্নিকান্ড ঘটেছে। সেটারই খবরা-খবর খুব মনোযোগ সহকারে দেখছে। তরী একপলক টিভির দিকে তাকিয়ে ভেতরে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। সকালেই ফুপি শাওনকে বহু হুমকি-ধামকি দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। তরী বলেছিলো শাওন থাকুক, কিন্তু ফুপি শোনেনি। কখন কী কান্ড করে বসে সে নিয়ে ফুপির আবার ভীষণ ভয়। বড়ো ভাইয়ের কানে কিছু গেলে ফুপি তাকে কী উত্তর দিবে? এজন্যে ফুপি আর সাহস করেনি।

সাবিয়াও এখন মাদ্রাসাতে। ফিরতে আরও অনেক সময় বাকি। তরী চিন্তা করলো সাবিয়াকে মাদ্রাসা থেকে তরী-ই নিয়ে আসবে।

————
সাইফ বক্সটা রাতে গিয়ে খুললো। এবং সে দারুণ অবাক হলো। এ যে এলাহি কান্ড।

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [১৫]

সাইফকে উপহারস্বরূপ দেয়া বাক্সে অহরহ কান্ড করেছে দিয়া। পাঞ্জাবি, টুপি, ঘড়ি, পারফিউম সহ আরও নানান জিনিস। আহামরি দামী নয় এগুলো। তবে সাধ্যের মধ্যে। সাইফ সবগুলোয় চমকানো দৃষ্টি ফেলে একে একে সব বের করলো। প্রত্যেকটার ভেতরেই ছোটো বড়ো চিরকুট। সাইফ প্রথমে সেগুলো না পরে বাকি জিনিসপত্র নামাতে লাগলো। কাগজ কিছু সরিয়ে দেখলো একটি কাস্টমাইজড মগ। মগে লেখা,
–“আমায় ভুলিতে আপনায় দিবো না মশাই।”

সাইফ হতভম্ভ। আরও কিছু কাগজপত্র সরিয়ে শেষমেষ শুধু একটা ডায়েরী পেলো। বেগুনী মলাটের ডায়েরী৷ দেখতে অন্যরকম। ডায়েরীটা উলটে পালটে দেখলো সাইফ। ভেতরের পৃষ্ঠা উলটিয়ে লেখা দেখতে পেলো৷ এই পৃষ্ঠাটি মনে হলো আলগা লাগানো হয়েছে। গ্লু এর ছোপ ছোপ দাগ পেজের চারপাশে আংশিক বোঝা যাচ্ছে। সেখানে লেখা,
–“আমার মধ্যবিত্ত প্রেমের দুনিয়ায় স্বাগতম আপনাকে সাইফ।”

সাইফ একে একে পাতা ওল্টালো৷ চোখ-মুখ জুড়ে কৌতুহল।
প্রথম পৃষ্ঠায় একটি তারিখ দেওয়া। বেশ পুরানো। তারিখের পরপর গুটি গুটি লেখা দেখতে পেলো। হ্যান্ডরাইটিং দারুণ। সাইফ পড়তে শুরু করলো।

–“দিনটি সোমবার। উত্তাপময় দুপুর। কলেজ থেকে বাড়ির পথে যাচ্ছিলাম। মাঝ রাস্তায় দেখলাম সামনের রাস্তায় বাইক এক্সিডেন্ট হয়েছে। বাইকার ক্ষতি হয়নি তবে মাঝবয়সী এক মহিলা পায়ে খুব ব্যথা পেয়েছে। লোকজন তখন বাইকারকে মারতে ব্যস্ত। কারো হুঁশ নেই যে মাঝবয়সী মহিলাটির জরুরি হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন। আমি দূর থেকেই এসব দেখে মনে মনে নানা অভিযোগ করছিলাম। কিন্তু ঘটনাস্থলে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়ানোও সম্ভব হলো না। মনে সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে চললাম মহিলাটির দিকে। ততক্ষণে ভার্সিটি পঁড়ুয়া কিছু এসে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হয়। তার মধ্যে একজন ছেলে ছিলো। কেন যেন তার দিকেই আমার চোখ জোড়া আটকে যায়। হৃদপিন্ডের অজানার কারণের ধুকধুক শব্দ অনুভব করছিলাম।

ছেলেরা চার জন মিলে মহিলাকে ধরে ওঠালো। মহিলা কোনো রকমে উঠে দাঁড়ালেও তাদের সাথে হাসপাতালে যাওয়ার জন্যে ভরসা পাচ্ছেন না। বিষয়টি উপলব্ধি করে আমি মহিলার কাছে এগিয়ে গেলাম। আশ্বাস দিলাম এবং জানালাম তার এই মুহূর্তে হাসপাতাল যাওয়া খুব প্রয়োজন। মহিলা আমাকে দেখে রাজি হলো। আমিও কোনো ভয়-ভীতি মনে না রেখে মহিলাকে নিয়ে ছেলেগুলোর সাথে একটি সিএনজিতে বসলাম। দুজন ছেলে আমাদের সাথে ছিলো। মহিলাকে মাঝে বসিয়ে সেই সুপুরুষটি মহিলার অন্য পাশে বসেছিলো। তাড়া দিচ্ছিলো দ্রুত হাসপাতাল পৌঁছানোর জন্যে। না চাইতেও কেমন মুগ্ধ হয়ে রইলাম। কোনো কথা মুখ দিয়ে বেরুলো না।

হাসপাতালে এসে ছেলেটি হাসি-মুখে আমাকে ধন্যবাদ জানালো। আমিও মুচকি হেসেছিলাম। ছেলেটি জানালো তার নাম সাইফ। বড্ড সুন্দর ছিলো তার নাম। আমার কাছে তো নামের মতোই মানুষটাকে দারুণ লেগেছে!”

এটুকুর পর আরও কয়েকটা পেজ খালি। এরপর আরেক পেজ পড়তে শুরু করলো সাইফ।

–“সাইফ সম্পর্কে নানান তথ্য যেন বাতাসে উড়ে আমার কানে পৌঁছাতে লাগলো। কই, তার সাথে পরিচিত হবার আগেও তো কখনো এই নাম বা এই নামের ব্যক্তিকে নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তাহলে যেই আমি তার পরিচয় পেলাম তার পর থেকেই কেন সে লোকমুখে আমার কাছে বারবার ফিরে আসছে? এই সমাজ, চারপাশের মানুষজন কী খুব করে চাইছে, আমার কোনোদিন প্রেমে না পরা মনটা তার কাছে হস্তান্তর করতে? আমি তো চাইছি না, আবার হয়তো চাইছিও। এরকম দ্বিধা-দ্বন্দে আমায় আর কতদিন ভুগতে হবে?”

এরপর আরও দুই পেজ খালি। এরপরের লেখা বোধহয় তার থেকে চার – পাঁচ মাস পরপর। দিয়া আবার লিখেছে,
–“অবশেষে মনে হলো, কোনো না কোনো ভাবে আপনার মাঝে আমি ডুবে গেছি, অতল প্রেমে নিজেকে হারিয়ে গেছি। কিন্তু আমি ততদিনে জেনে গেছি আপনি এমপির বড়ো ছেলে। আপনার মতো বড়ো ঘরের ছেলে আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের জন্যে শুধুই স্বপ্নমাত্র। কিন্তু আমার বুঝ মন কিছু বুঝেনি। সময় নষ্ট করে বোঝাতেও যাইনি। কী লাভ মন এবং মস্তিষ্কের সাথে লড়ে। সত্যিটা মেনেই রোজ আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা এবং কল্পনা-জল্পনা শুরু। জানেন,”

এরপরের পেজগুলো পড়তে গিয়ে সাইফ দেখলো বাকি পেজগুলো অনেকখানি ছেঁড়া। একটি খালি পেজে লেখা,
–“ছেঁড়া পেজের গল্প ওড়িয়ে চলুন মশাই!”

এরপর আর কোনো ডেট লেখা নেই। শুধু কিছু লেখা। লেখাগুলো আগের থেকে স্বচ্ছ হয়েছে মনে হলো। সাইফ আবার পড়তে শুরু করলো।
–“আমি দিয়া আহমেদ। একজন কথাসাহিত্যিক। তবে প্রফেশনালি নই, হবি। হবিটাকে নামের পাশে জুড়ে দিতে ভালোবাসি। এজন্য কথাসাহিত্যিক দিয়া- ই বলতে পারেন। যাইহোক, যেগুলো পড়লেন সেগুলো আমার মনের মাঝের লুকানো কিছু কথা, যা আমি ডায়েরীতে লিখে রাখতাম। মনে হলো আপনার কাছে থেকে এই অমূল্য অনুভূতিগুলো আপনাকে জানানো উচিত। এজন্য যতটুকু জানানোর, জানিয়ে দিলাম। জানেন, বড্ড শান্তি লাগছে মনের ভেতরের এই পাহাড়সম অনুভূতির আংশিক আপনার সাথে শেয়ার করতে পেরে। আমি আপনারই কোনো এক গোপন ভক্ত। যে আপনার কাজকে ভালোবাসে। হয়তো, সাথে আপনাকেও। সবসময় সুখে থাকুন এটাই কামনা। আর ডায়েরী সহ উপহারগুলো ফেলে না দেওয়ার অনুরোধ। টিউশনির টাকা অল্প অল্প করে জমিয়ে এগুলো কিনেছি তো। ফেলে দিয়েছেন শুনলে কষ্ট পাবো!”

সাইফ তখনো স্তব্ধ, বিমূঢ় হয়ে বসে আছে। হাত কাঁপছে তার। সব কিছুতে সাইফ শূন্য নজর বোলালো। ভ্রম থেকে সাইফ সেদিন আর বেরুতে পারলো না। রাতের খাবারও খেলো না। শুধু পানি খেয়েই কোনোরকমে রাতটা পার করলো।

——–
তরী গরম চোখে ডাস্টবিন-টার দিকে চেয়ে আছে। রাগ যেন চোখ দিয়েই ঝড়ছে তার। সিদাত আজও তাকে চিঠি লিখেছে। সাবিয়াকে মাদ্রাসা থেকে আনতে যাচ্ছিলো তরী। ওমনি সদর দরজার সামনে দেখতে পায় সিদাত অনয়ের ফ্ল্যাটের তালা লাগাচ্ছে। সিদাতের পাশেই ছিলো ফিরোজা খাতুন। ফিরোজা তরীকে দেখে মুচকি হেসে বললো,
–“আরে। তুমি! ভালো হলো যাওয়ার পথে তোমার সাথে দেখা হয়ে গেলো। আমি বাড়ীতে যাচ্ছি। ভালো থেকো মা!”

তরী নীরবে হেসে মাথা নাড়ালো। ফিরোজাকে সালাম জানিয়ে সিদাতের পাশ কেটেই তরী চলে আসে। রিকশা ভাড়া মেটানোর জন্যে ব্যাগে হাত দিতেই দেখতে পায় তার ব্যাগে চিঠি। হয়তো সিদাত-ই কৌশলে রেখেছে। তরী বিরক্ত হলো। চিঠিকে এড়িয়ে রিকশা ভাড়া মিটিয়ে মাদ্রাসার কাছাকাছি চলে এলো।

সন্ধ্যার পরপর মাথায় এলো চিঠির কথা। চিঠি সকলের আড়ালে খুলে পড়লো। সিদাত লিখেছে,
–“জানো, নিকাব রাণী? তোমার নাম্বার আমি না চাইতেও পেয়ে গেছি। তবে চিন্তা করো না, তোমাকে ডিস্টার্ব করার মতো ছেলে আমি নই। ফেলে দিয়েছি তোমার নাম্বার। তুমি-ই বলো তো, চিঠির মতো সুন্দর কোনো যোগাযোগ মাধ্যম থাকতে পারে? আমার তো দারুণ লাগে চিঠি লিখতে। মা একবার বলেছিলো, আমার বড়ো খালা এবং খালুর প্রেমের সূচনা এই চিঠির মাধ্যমেই হয়েছিলো। আমার বেলায় নাহয় হোক বন্ধত্বের সূচনা!”

বন্ধু, বন্ধু, বন্ধু! এই দুই অক্ষরের এক শব্দ তরীকে বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। সিদাত যেন অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে ফেলছে। এত অবাধ্য, অবুঝ কেন ছেলেটা? তরী তার সাথে বন্ধুত্ব তো দূর, সামান্য কথা বলতেও চাইছে না সেখানে ছেলেটা যেন উঠে-পরে লেগেছে বন্ধুত্বের জন্যে। এই ছেলে এমন হবে কে জানতো? নাহ! আর চুপ সে থাকতে পারছে না। পারবেও না। এর শেষ তাকেই করতে হবে।

সিদাত পরদিন মায়ের রুম থেকে বেরুতেই বাবা সাঈদকে গম্ভীর মুখে টিভি দেখতে দেখলো। সিদাত নীরবে বাবার দিকে এগিয়ে গেলো। সাঈদ সাহেবের চোখ টিভির দিকে স্থির হলেও সে অজানা চিন্তায় মশগুল। যা সিদাতের বুঝতে বাকি রইলো না। এজন্যে বাবাকে সঙ্গ দিতে বাবার কাছে গিয়ে সর্বপ্রথম সালাম দিলো। হঠাৎ সালামে সাঈদ সাহেব চমকে উঠলো। ছোটো ছেলের দিকে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে নজর ফিরিয়ে সালামের উত্তর দিলো। অতঃপর বললো,
–“এসে বসো!”

সিদাত তাই করলো। নিঃশব্দে বাবার থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে বসলো। সাঈদ সাহেবের মুখপানে চেয়ে সিদাত বললো,
–“ছোটো মাকে বলবো চা বানাতে?”

সাঈদ সাহেব কোণা চোখে চাইলো ছোটো ছেলের দিকে। ফিরোজা খাতুনের কথা শুনলে সাঈদ সাহেবের দৃষ্টি সবসময় কোণা হয়ে যায়। যার কারণ সিদাত ধরতে পারলেও ব্যাপারটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে আয়। সাঈদ সাহেব গলায় এবার রাজ্যের গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বললো,
–“বলতে পারো!”

সিদাত চাপা হাসি দিয়ে কাজের লোককে ডাকলো। কাজের লোক সিদাতের দেওয়া বার্তা নিয়ে ছুটলো রান্নাঘরের দিকে। সিদাত একপলক টিভির দিকে চেয়ে বললো,
–“সাইফ ভাইয়ার জন্যে চিন্তিত আপনি বাবা?”

সাঈদ সাহেব ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। বললো,
–“কাল থেকে অজানা কারণে ঘরবন্দী হয়ে বসে আছে। আমি নিজে গিয়ে ডাকলাম, তাও আশানুরূপ সাড়া দিলো না। শুধু বললো, আমি ঠিকাছি বাবা। ওদিকে আজ-ই নাকি তোমার ফুপি নতুন পাত্রী দেখতে যাবে বলেছিলো, ছেলের অবস্থা দেখে মানা করে দিই। আমি কী ঠিক করেছি?”

সিদাত অবাক হয়ে চাইলো সাঈদ সাহেবের দিকে। কেমন শুকনো হয়ে আছে মুখখানা। মুখ জুড়ে থাকা গাম্ভীর্য সরে গিয়েছে বলে? সিদাত তার বাবার দিকে চেয়ে আলতো হেসে বললো,
–“জি বাবা। একদম ঠিক করেছো। ভাইয়া যেহেতু একা থাকতে চাইছে থাকতে দাও। কাজ করার পাশাপাশি মানসিক শান্তিরও প্রয়োজন হয়। ভাইয়া হয়তো মানসিক শান্তির জন্যেই রুমে একাকী সময় কাটাচ্ছে। তুমি চিন্তা করো না!”

সিদাত থেমে আরও বলতে চাইলো,
“তুমি চিন্তা না করে সুস্থ, সবল থাকো বাবা। তুমি ফিট অবস্থাতেই সুন্দর!”

কিন্তু এই অব্যক্ত কথাগুলো গলা দিয়ে বেরুলো না সিদাতের। বাবার সাথে আজও খোলামেলা কথা বলতে পারে না সে। কেমন যেন অদ্ভুত আড়ষ্টতা গলায় ঝেঁকে বসে আছে। অথচ বাকিদের বেলায় সিদাত তার কথার পটুত্ব প্রকাশ করে অবলিলায়।

তবে বাবাকে আশ্বাস দিলেও মনে মনে সিদাতও কিছুটা চিন্তিত এবং উদ্বীগ্ন। সিদাতের চাইতেও সাইফ বেশি খোলামেলা। এর মাঝে এমন কী হলো যে চঞ্চল সাইফ নিজেকে ঘরবন্দি করে নিলো? গতকাল বিকাল থেকে সাইফের ফোনে ট্রাই করেছে সে। বিকালের দিকে কল ধরতে না পারলেও সিদাতকে সাইফ মেসেজ করে বলেছিলো সে কাজে বাইরে আছে। রাতে বাসায় ফিরে কথা হবে। সিদাত তার শো শেষ করে বাসায় ফেরার পথে ফিরোজার থেকে কল পেয়ে জানতে পারে সাইফ রুমে বন্দি। কেন, বা কী কারণে তা ফিরোজা একদমই বুঝতে পারছে না।

সাইফ চোখ মেলে দেখলো বিছানায় উবুড় হয়ে শুয়ে আছে সে। ঘুমের রেশ নিয়ে কোনোরকমে উঠে বসে সে। রুমের চারিপাশ দেখে মস্তিষ্ক সচল করার চেষ্টা করে সে। মিনিটখানেকের মধ্যে সফলও হয়। আড়মোড়া ভাঙতেই অনুভব করলো পেট খুদায় চু চু শব্দ করছে। এই শব্দ শুনে সাইফ কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। পেটে হাত চেপে মনে করার চেষ্টা করলো শেষবার কখন খেয়েছিলো। এক দলের নেতার বিয়ের অনুষ্ঠান ছিলো গতকাল। হুট করেই গিয়েছে সে। যাওয়ার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিলো না। সেখান থেকে-ই পেটপুরে খেয়ে-দেয়ে বাড়ী ফিরেছিলো সে। এরপর বাড়ি ফিরে সিদাতের অপেক্ষা করতে গিয়ে মনে পরে দিয়ার দেওয়া বক্সের কথা। এরপর সেগুলো পড়ে তার ঘোর থেকে বের হতে প্রায় পুরো রাত-ই লেগে গিয়েছিলো। কতশত চিন্তা-ভাবনায় রাত কেটেছে। কিছু সিদ্ধান্তও নিয়ে সে।

সাইফ দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। দুপুর দেড়টা বেজে গেছে। সাইফ বালিশের নিচ হাতড়ে মোবাইল বের করে চেক দিলো। বেশ কয়েকটা কল এবং মেসেজ জমা হয়েছে। তার মাঝে সিদাতের নাম্বারের দিকেই নজরটা সর্বপ্রথম পরলো। কী মনে করে সাইফ কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো সিদাতের নাম্বারের দিকে। অতঃপর হঠাৎ সিদাতকে কল করে সাইফ সময় বিলম্ব না করে বললো,
–“যেখানেই থাকিস না কেন, তোর হাতে মাত্র দশ মিনিট। দশ মিনিটের মধ্যেই আমার দরজার সামনে এসে দাঁড়াবি!”

বলেই সাইফ খট করে কল কেটে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিলো। দিয়া নামক মেয়েটিকে জুড়ে সাইফের কৌতুহলের অন্ত নেই।

©লাবিবা ওয়াহিদ#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [১৬]

দুই ভাই মিলে এক ভার্সিটিতে এসেছে। দুজনের মুখেই কালো মাস্ক এবং চোখে কালো সানগ্লাস। ভার্সিটিতে অসম্ভব ভীড়। কোনো রকমে ভীড় ঠেলে অডিটোরিয়ামের দিকে ছুটলো দুই ভাই। সিদাত তো ঘেমে-নেয়ে একাকার। এমনিতেই ইদানীং তীব্র গরম, তার ওপর এত ভীড়ের মধ্যে এসেছে। বেশ নাজুক অবস্থা তার। সিদাত সাইফকে আবারও একই প্রশ্ন করলো,
–“হঠাৎ এখানে কেন আনলে ভাইয়া? এখানে কী?”

সাইফ খোলাসা করে কিছু বললো না। শুধু বললো,
–“সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে এসেছি!”

সিদাত অবাক হলো। বললো,
–“তুমি যেই মেয়েকে পছন্দ করেছো তার জন্যে ইতিমধ্যে-ই বাবা প্রস্তাব দিতে গিয়েছে। তাহলে আয়োজন করে এখানে আসার মানে কী?”

সাইফ কিছু বললো না। সিদাত শুধু অবাক-ই রইলো। অডিটোরিয়ামের ভেতরটায় সেরকম ভীড় নেই। বেশির ভাগ মানুষজন বাইরেই অবস্থান করছে। নিজেদের মতো করে চলছে। সাইফ এবং সিদাত এক পাশে দুটি সিট খালি পেলো। সেখানেই গিয়ে বসলো। এখন আবৃত্তির সময়। সাইফ তার মোবাইল নিয়ে রেডি থাকলো। মোবাইলের ক্যামেরা অন করে বললো,
–“তোর ভাবীকে অস্পষ্ট দেখলে জানাইস। আমি ক্যামেরা জুম করে দেখাবো!”

সিদাত সরু কন্ঠে বললো,
–“এই ব্যাপার তাহলে! কিন্তু তোমার ক্যামেরার জুম করার দরকার নেই। আমার চোখের পাওয়ার এখনো ভালো আছে!”

সাইফ হাসলো। কথাটা যে সাইফ মশকরা করে বলেছে সেটাই মনে করলো সিদাত। কিন্তু সাইফ মশকরা করলেও ক্যামেরা অন-ই রাখলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই দিয়া আহমেদ নাম ডাকা হলো। পরমুহূর্তেই নীল শাড়ি পরা এক সুন্দরী কন্যা ধীরপায়ে স্টেজে উঠে এলো। দিয়াকে চোখে পরতেই সাইফ ঝটপট ফটো ক্লিক করলো। যার ফলে দিয়ার বেশ কিছু ছবি পেয়ে যায় সাইফ। অতঃপর নিজেই জুম করে দিয়াকে দেখতে লাগে। দিয়াকে দেখতে গিয়ে তার চোখ আটকে যায়। দিয়া তার সামনের চুল কানে গুজে মাইকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অতঃপর সবার দিকে নজর বুলিয়ে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলো।

সিদাত মুগ্ধ হয়ে যায় দিয়ার কন্ঠের নমনীয়তায়। সিদাত ঘাট বাঁকিয়ে একপলক ভাইয়ের দিকে তাকালো। সাইফের মুখখানা দেখার মতো। চোখ কপালে তুলে চেয়ে আছে মোবাইলের স্ক্রিনে। সিদাত খানিকটা উঁকি দিয়ে দেখলো। অতঃপর যা বোঝার বুঝে নিলো। চাপা হাসলো সিদাত। এর মাঝে কী হলো কে জানে? তরীকে স্মরণে এলো সিদাতের। কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে হাসলো। হয়তো দিয়ার জায়গায় সে তরীকে বসিয়ে ফেলেছে।

—————–
দরজা খুলে নাজমুল সাহেব সাঈদ সাহেবকে দেখে যেন আকাশ থেকে পরলো। নাজমুল সাহেবকে দেখে সাঈদ সাহেব মুচকি হাসলেন। বিনয়ের সাথে সালাম জানালেন। নাজমুল সাহেব তখনো বিস্ময় ভরা চোখে চেয়ে আছে। সাঈদ সাহেবের সালামটা মস্তিষ্কে স্বল্প দেরীতেই টনক নাড়লো। ব্যস্ত সুরে সালামের উত্তর নিয়ে বললো,
–“আপ.. না মানে আপনি? আমার চৌকাঠে?”

নাজমুল সাহেবকে ব্যস্ত হতে দেখে সাঈদ সাহেবের ম্যানেজার তাকে থামালেন। শীতল গলায় বললো,
–“ব্যস্ত হবেন না নাজমুল সাহেব। আমরা কী ভেতরে আসতে পারি?”

নাজমুল সাহেব বোকা হেসে বললো,
–“আরেহ। দেখুন কান্ড। ভেতরে আসুন!”

ম্যানেজার সহ সাঈদ সাহেব ভেতরে প্রবেশ করলেন। নাজমুল সাহেব অতিথিদের তার নিজ হাতে সাজানো লিভিংরুমে নিয়ে বসালেন। অতঃপর ব্যস্ত পায়ে ছুটলেন রান্নাঘরের দিকে। রান্নাঘরে সুফিয়া বেগম রান্না করছে। স্বামীকে দেখে স্বল্প শব্দে শুধালো,
–“কে এসেছে?”

নাজমুল সাহেব তখনো ঘোরের থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। অস্ফুট স্বরে বললো,
–“সাঈদ সাহেব এসেছে!”

সুফিয়া বেহম ছুঁরি দ্বারা ধনিয়াপাতা কাটছিলেন। স্বামীর বলা বাক্য কর্ণগোচর হতেই সুফিয়ার ব্যস্ত হাত থমকালো। সঙ্গে থমকালো সুফিয়ার মস্তিষ্কের ভাবনা। ঘাড় বাঁকিয়ে অবাক চোখে চাইলো। তাকে দেখেও মনে হচ্ছে যেন আকাশ থেকে জমিনে ল্যান্ড করেছেন তিনি। অস্ফুট স্বরে বললো,
–“কী বলছেন?”
–“তোমার কী মনে হয় আমি মশকরা করছি?”

সুফিয়া বেগম দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে বললো,
–“এ নিয়ে কখনো তো মশকরা করেননি। এছাড়া মেয়ের বিয়েও ঠিক করেছেন। এই মুহূর্তে কখনোই এরকম মশকরা করবেন না। তা আমার দৃঢ় বিশ্বাস!”

নাজমুল সাহেব বিরক্ত হলেন স্ত্রীর অযথা কথায়। বিরক্তি চেপে বললো,
–“এসব হিসেব পরেও করা যাবে। ঘরে কী শুকনো খাবার আছে সেসব রেডি করো। আমি যাচ্ছি তাদের কথা শুনতে!”

বলেই নাজমুল সাহেব আবারও ব্যস্ত পায়ে ছুটলো। স্বামীর উদ্বীগ্ন ভাব দেখে সুফিয়ার বুঝতে বাকি নেই, সে আসলেই কোনো রকম মিথ্যে বলছে না। সুফিয়া হাতের কাজ ফেলে চট করে ব্যস্ত হয়ে পরলো অতিথি আপ্যায়নের জন্যে। মেয়ের বিশ্বাস এভাবে ফলে যাবে কে জানতো?

–“আমার কী মনে হয় জানেন স্যার? আপনার টাকা-পয়সা দেখেই মেয়েটা সাইফ বাবাকে বশে এনেছে। নাহয় আপনার মতো সৌখিন মানুষের সাথে এই ছোটো-খাটো ব্যবসা করা পরিবার চলে নাকি? সেই মুরোদ কী তাদের আছে?”

চারপাশ নজর বুলিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বেফাঁস কথাগুলো আওড়ালো ম্যানেজার। ম্যানেজারের এই কথা-বার্তা শুনে সাঈদ সাহেবের ভ্রু অসম্ভব রকম কুচকে যায়। রাগ কোনোরকমে চেপে ধমকে উঠলো ম্যানেজারকে। ম্যানেজার তৎক্ষনাৎ সোজা হয়ে বসলো ভয়ে। সাঈদ সাহেব ক্রোধ চেপে রাখা গলায় বললো,
–“অন্যকে বিবেচনা করার আগে নিজে কোথা থেকে উঠে এসেছো সেটা চিন্তা করো। আমি তোমায় জায়গা না দিলে এরকম বাড়িও তোমার কপালে জুটতো না, এটা মনে রেখো!”

ম্যানেজার সাহেব মুখখানা ছোটো করে বসে রইলো। সাঈদ সাহেবের এই বসে থাকাও সহ্য হলো না। চেঁচিয়ে বললো,
–“উঠে দাঁড়াও। আয়েশ করে বসার কোনো দরকার নেই তোমার!”

ম্যানেজার তাই করলো। বুঝতে পারলো না এইটুকুনি কথায় স্যার এত মনে কেন ধরলো? তবে মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে থেকে পা ধরে এলো। মনে মনে বললো, সেই কমদামী সোফাই ঠিক ছিলো!

নাজমুল সাহেব এসে ম্যানেজারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভারী অবাক সুরে বললো,
–“একি! আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন!”

ম্যানেজার সাহেব আড়চোখে সাঈদ সাহেবের দিকে তাকালো। সাঈদ সাহেবের মুখখানায় তখনো লাল ভাব আছে। অর্থাৎ সে এখনো রেগে। ম্যানেজার সাহস পেলো না বসার। নাজমুল সাহেবও পীড়াপীড়ি শুরু করেছে। এজন্যে সাঈদ সাহেব খুবই ঠান্ডা গলায় বললো,
–“আহা। নাজমুল ভাই যখন বসতে বলছে তো বসো না।”

এবার সাঈদ সাহেবের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ম্যানেজার। বিস্ময় যেন চোখ জোড়া থেক্ব কাটছে না। সাঈদ সাহেন চিবিয়ে চিবিয়ে বসতে ইশারা করলো। ম্যানেজার সঙ্গে সঙ্গে বসে পরলো। আহ্! শান্তি! তাদের বাড়ির সোফাও কী এই দামের হবে? নাকি আরেকটু দামী? কে জানে?

নাজমুল সাহেবও হাসি-মুখে বসলেন। কিছুক্ষণ কুশল বিনিময় করতে করতেই হালকা-পাতলা নাস্তা নিয়ে আসে দিয়ার মা। তার মুখ-জুড়েও সৌজন্যমূলক হাসি। নাস্তা দিয়ে, সালাম জানিয়ে সুফিয়া বেগম ভেতরে চলে গেলো।

নাজমুল সাহেব বিনয়ী হাসি দিয়ে বললো,
–“এই গরীবের ঘরে হঠাৎ এলেন যে? আমরা তো পূর্ব পরিচিত নই ভাইজান!”

সাঈদ সাহেব চায়ের পেয়ালাসহ কাপ হাতে নিয়ে হাসি বজায় রেখে বললো,
–“পরিচিত হতে সময়ের কোনো ধরা-বাধা নেই। এইযে, দিব্যি পরিচিত হয়ে গেলাম। আশা রাখছি এবার থেকে কাছের আত্মীয়ও শীঘ্রই হবেন।”

নাজমুল সাহেব কিছু একটা আঁচ করলেও মুখ-জুড়ে অবুঝ ভাব রাখবেন। না বোঝার ভান ধরে বললো,
–“ঠিক বুঝলাম না আপনার কথা ভাইজান!”

সাঈদ সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। কিছুক্ষণ নীরবও রইলেন। নাজমুল তখনো উৎসুক নজরে চেয়ে আছে সাঈদ সাহেবের দিকে। সাঈদ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
–“আপনার একমাত্র মেয়েকে আমার বড়ো ছেলের বউ করতে চাইছি। আপনার মতামত কী?”

নাজমুল ভারী অবাক হলো। বাইরে-ই দাঁড়িয়ে ছিলো সুফিয়া। সাঈদ সাহেবের কথা-বার্তা কান খাড়া করে শুনছিলেন তিনি। সাঈদ সাহেবের এহেম প্রস্তাবে সুফিয়া বিস্মিত। নিজের কানকেও সে বিশ্বাস করতে পারছে না।

নাজমুল সাহেবের মুখ জুড়েও বিস্ময় ভাব বিরাজমান। সাঈদ সাহেব হাসলেন। নাজমুল সাহেব তার হতভম্ভতা কাটিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। তার আগেই সাঈদ সাহেব বললো,
–“জি। আমি জানি। সব খোঁজ-খবর নিয়েই এসেছি। যার সাথে আমাদের মামণির বিয়ে ঠিক হয়েছিলো তাকে মানা করে দিন। এই মুহূর্তে আমি আমার ছেলে এবং মামণির মনের অবস্থাকেই প্রাধান্য দিচ্ছি।”
নাজমুল সাহেব আরও অবাক। এত খবর সাঈদ সাহেব পেলো কোথা থেকে? সাইফ-ই বা দিয়ার সাথে কবে দেখা করলো? ভারী আশ্চর্য তো!!

——————-
দিয়া বেরিয়ে আসতেই সাইফ এবং সিদাতের মুখোমুখি হলো। সিদাত হেসে সালাম দিলো। দিয়া সিদাতকে চিনতে পেলে বিনয়ের সাথে সালামের উত্তর দিলো। দিয়া মুচকি হেসে সাইফের দিকে তাকিয়ে বললো,
–“২য় বারের সাক্ষাৎ-টা এত দ্রুত হবে জানা ছিলো না!”

সাইফ দিয়ার মুখপানে চাইলো। সিদাত পাশ থেকে হেসে বললো,
–“শুধু দ্রুত নয়। বলুন সুপার ফাস্ট! আপনার বাড়িতে অলরেডি বিয়ের প্রস্তাব চলে গেছে মিস!”

দিয়া হতবাক। মুহূর্তে-ই হাসি মিলিয়ে গেলো। বড়ো বড়ো চোখে দুই ভাইয়ের দিকে চেয়ে বললো,
–“কিন্তু… আমার বিয়ে তো অলরেডি ঠিক হয়ে আছে!”

——————–
এক প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেলো। সিদাতের কোনো দেখা নেই। তরী রোজ সিদাতকে খুঁজছে।
সিদাতকে বকা দেওয়ার জন্যে, তাকে সাবধান করার জন্যে। কিন্তু একি? সিদাতের যে কোনো খোঁজ-খবরই নেই। আগে যখন প্রয়োজন ছিলো না তখন তো দিব্যি যখন তখন দেখা হয়ে যেত। তাহলে এখন প্রয়োজন হওয়ার পরপরই মানুষটা গায়েব? দুনিয়ার অদ্ভুত নিয়ম তো! ওদিকে মঙ্গলবারেই তরীর বাবা-মা ফিরবে। আজকাল এ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত তরী। আত্মীয়-স্বজন ঘনঘন ফোন করছে তরীর বাবা-মায়ের খোঁজ-খবর জানার জন্যে। এতদিন তারা কেউ কল করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা পোষণ করেনি। একমাত্র ফুপি আর মামাটাই একটু আপনজন। আর বাকিরা স্বার্থের বাইরে চেয়েও দেখে না। এই যে, একেকজন বলছে নবীর দেশের খেঁজুর নিয়ে আসতে, জমজম কূপের পানি নিয়ে আসতে। আরও কত কত আবদার! তরী না চাইতেও সকলের চাওয়া গুলো নোট করে নিয়েছে। আর যাইহোক, তার বাবা-মা তাকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার শিক্ষা দেয়নি।

রোজ রাতে বাবা-মাকে তরী লিস্ট বুঝিয়ে দেয়। আর আকবর সাহেবও হাসি-মুখে তা গ্রহণ করে নেয়। অর্থাৎ সকলের আবদার সে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করবে।

আজ ফুপি একটু তার বাড়িতে গিয়েছে। হয়তো-বা সন্ধ্যার মধ্যেই চলে আসবে। দু’বোন বাসায় একা। তরীর মাথায় চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। বাবা-মা আসার দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই যেন তরীর ভেতরকার ভয় ক্রমশ বাড়ছে। তার ভয়টা সিদাতের হুটহাট চিঠি পাঠানোটা নিয়ে। অথচ এই মুহূর্তে-ই সিদাতের দেখা-সাক্ষাৎ নেই। অনয়কে বেশ কয়েকবার দেখেছিলো তরী। কিন্তু সিদাতের কথাটা সে সিদাতকেই বলতে চেয়েছিলো। নিশ্চয়ই এসবের মাঝে তাকে আনা ঠিক হবে না। এরকমটাই আগে ভেবেছিলো তরী। কিন্তু পরিস্থিতি আজ সম্পূর্ণ উলটো। সিদাতকে যেহেতু পাচ্ছে না সেহেতু তরীর কথাগুলো অনয়ের মাধ্যমে-ই সিদাতকে পৌঁছাতে হবে। এজন্য তরী নীরবে কিছুক্ষণ ভাবনায় মত্ত রইলো। পরমুহূর্তে কী ভেবে সাবিয়াকে মোবাইল দিয়ে বসিয়ে রেখে দরজার সামনে গেলো। ভালো করে ওড়না দিয়ে মাথা এবং মুখ পেচিয়ে দরজা খুলে অল্প করে ফাঁক করলো। অনয়ের ফ্ল্যাটে তালা নেই। এর মানে অনয় বাসাতেই আছে।

তরী এক বুক সাহস জুগিয়ে অনয়ের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দরজায় নক করলো। আশেপাশে সতর্ক নজর ফেলতেও ভুললো না। অনয় কিছুক্ষণের মধ্যে দরজা খুলে তরীকে দেখে চমকালো। বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে রইলো তরীর দিকে। নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে। তরী কোনোরকম কুশল বিনিময় ছাড়া সোজা-সাপটা বলতে লাগলো,
–“আপনার বন্ধুকে বলে দিবেন আমাকে অযথা চিঠি দিয়ে বিরক্ত না করতে। আমি এবং আমার পরিবার আধুনিক মানসিকতার নই। উনি যদি নূন্যতম আমার ভালো চেয়ে থাকে তাহলে এই ধরণের অভদ্র কাজ থেকে আপনার বন্ধুকে বিরত থাকতে বলবেন। আসসালামু আলাইকুম।”

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here