তুমি চেয়েছো বলে পর্ব-০১

#তুমি_চেয়েছো_বলে
#নাজনীন_আক্তার

পর্ব-১

“প্রেমে পরা বারণ”- বাক্যটা শুনতে শুনতে বড় হওয়া আমিই কীনা খুব অল্প বয়সে এক সুদর্শন যুবকের প্রেমে পরেছিলাম। তাও যে সে প্রেম নয়। একেবারে ভালোবাসা নামক অনুভূতিতে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মতো ভয়ংকর প্রেম!

তখন আমি নেহাৎই এক কিশোরী! সবেমাত্র ক্লাস এইটে উঠেছি। লম্বা ফ্রক আর বড় সাইজের ওড়না পরা বাদ দিয়ে মায়ের আদেশমতো মাত্র সালোয়ার-কামিজ পরা শুরু করেছি। হঠাৎ হওয়া নিজের নতুন এই পরিবর্তন দেখে অবশ্য বেশ লাগতো আমার। কেমন বড় বড় দেখাতো! নিজেকে আরও বড় দেখাতে তাই সুন্দর করে চুল বেঁধে, চোখে টানা টানা করে কাজল দিয়ে, কপালে কালো টিপ পরে আর পায়ে ঝুমঝুম করা নুপূর পরে সারাদিন এদিকওদিক করে বেড়াতাম। অবশ্য বাড়ির বাইরে কিন্তু যেতে পারতাম না। যত দৌঁড়ঝাপ ছিল সব বাড়িতেই। আমাদের এই খাঁ বাড়ির বিশাল উঠোনটাতেই আমাদের যত উড়ে বেড়ানো!

কারণ আমাদের এই যৌথ পরিবারে তখনও মেয়েদের একা একা চলাফেরায় ভারি নিষেধাজ্ঞা ছিল। বরাবরই নানান নিয়মকানুনেই বড় হয়েছি আমরা। আর তার মধ্যে প্রধান নিয়ম হিসেবে সবসময় শুনে এসেছি, “প্রেমের বিয়ে সুখের হয় না। আর পরিবারের কথায় শেষ কথা।” তাই এটাকেই নীতিকথা হিসেবে আমরা সব ভাইবোন বড় হয়েছি। নিজেদের মনকেও বেঁধে রেখেছিলাম রীতিমতো!

কিন্তু ওইযে শান্তশিষ্ট মেয়ের অবাধ্য কিশোরী মন! তা কী আর কথা শোনে! নাকি কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করে! তাইতো এক সুন্দর দিনের পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলোয়, এক যুবককে দেখে কিশোরী মনেই এক ধাক্কা লেগেছিল! লম্বাটে, সরু চেহারার লোকটাকে দেখে হুট করেই আশপাশটা যেন অন্ধকার হয়ে এসেছিল। এখনও সেসময়ের অনুভূতিটুকু স্পষ্ট মনে পরে আমার। হঠাৎ করেই যেন নিজের সমস্ত শক্তি হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থাটুকুও ছিল না আমার। গলা শুকিয়ে এসেছিল। অদ্ভুতভাবেই আমার শরীর কাঁপতে শুরু করেছিল।

তখনও এ সবটুকু অনুভূতিই আমার অচেনা। অপরিচিত সবকিছুই। তাই সবটা বুঝে উঠতেও সময় লাগছিল। নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। কিন্তু সব না বোঝার মাঝেও একটা বিষয় খুব করে বুঝে নিয়েছিলাম। অদ্ভুতভাবেই কথাটা মনের মধ্যে নাড়া দিয়েছিল। কিশোরী মনই চিৎকার করে বলে উঠেছিল,

“নিস্তার নাই আর! নিস্তার নাই! কোনোভাবেই আর রেহাই নেই তোর বৃষ্টি!”

এই প্রথম দেখাটা অবশ্য আমার নানুবাড়ি হয়েছিল। সেবার আমার এক মামা বিশাল বড় করে এক পারিবারিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। অনেকবছর পর বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলেন তিনি৷ তাই সব আত্মীয়-স্বজনকে একসাথে দেখার আশাতেই এই আয়োজন। সেখানেই আমাদের আত্মীয় হয়ে এই ভদ্রলোক এসেছিলেন।

পরে শুনেছি সৈকত নামের এই ভদ্রলোকের নাকি আসারই কথা ছিল না। তিনি তখন সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন। একমাস হয়তো ক্লাস করেছেন। তারপরই তার নাকি মারাত্মক ডায়রিয়া শুরু হয়েছিল। ক্লাস আর কী করবেন বাথরুম ছেড়েই নড়তে পারেন না! এজন্যই ক্লাস রেখে বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। তারপর একটু সুস্থ হওয়াতেই সবাই মিলে তাকে ধরে বেঁধে এখানে এনেছে। এই নিয়েও তার কত রাগারাগি! তিনি নাকি আসতেই চাননি।

তাইতো আমাদের বাড়িতে এসেই কারও সাথে আর কথা না বলে উঠোনের একপাশে জায়গা নিয়েছিলেন তিনি। একটা চেয়ারে বিকেলে এসে সেই যে বসেছিলেন, তাতেই রাত করে ফেলেছেন। একটুও নড়চড় হয়নি। এরমধ্যে আমার ছটফট করা কিশোরী মন নিয়ে আমি অবশ্য একবার সেদিকে গিয়েছিলামও। আমার এক বড় আপুকে নিয়েই গিয়েছিলাম। রিমি আপু সম্পর্কে আমার খালাতো বোন হন। তার সাথেই দূরে বসে গল্প করছিলাম, আর ফাঁকে ফাঁকে সদ্য কিশোরী মনে জায়গা দেওয়া এক রাগী যুবককে মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম।

কী অস্থিরতা তখন তার মাঝে! একবার এদিক করে বসে তো আরেকবার ওদিক করে। চোখমুখের রেখাও বারেবারে পরিবর্তন হচ্ছে। মাঝেমাঝেই অদ্ভুত বিরক্তি আর রাগের মিশেল তাতে স্পষ্ট ফুটে উঠছে। আমি সতর্ক চোখে সবটাই দেখতে লাগলাম। এরমাঝেই তিনি হঠাৎ আমাদের দিকে দৃষ্টি দিলেন। দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে নিলাম আমি। মনোযোগ দিলাম আপুর কথায়। কিন্তু তিনি আর নজর ঘোরালেন না। বরং কিছুক্ষণ বাদেই আপুকে ডাক দিলেন। আপু তার পূর্ব পরিচিত। তাকে ডেকে পানি আনতে পাঠালেন তিনি।

তখন আমি আর সে শুধু সেই বিশাল উঠোনে। একেতো প্রথম প্রেমে পরা কিশোরী মন! তাও আবার প্রিয় মানুষটির সামনে! গুটিশুটি হয়ে বসে থাকা আমি যেন আরও জড়োসড়ো হয়ে এলাম। হাতের মুঠোয় ওড়নার কিনার মুঠ করে ধরে শক্ত হয়ে বসে রইলাম। কিন্তু নিজের ষষ্ঠইন্দ্রীয় স্পষ্ট জানান দিলো, মানুষটি আমাকে দেখছেন। চোখমুখ কুঁচকে গভীর দৃষ্টিতে দেখছেন। আমি আরও জড়োসড়ো হয়ে বসলাম। হঠাৎ কানে পুনরায় তার ভরাট কণ্ঠ ভেসে আসলো,

“এইযে খুকী, তোমার কি চোখে কোনো সমস্যা আছে? মানে ট্যারা নাকি তুমি?”

তার কথা শুনে এতক্ষণ অদ্ভুত অনুভূতিতে ছেয়ে থাকা মন হঠাৎ চমকে উঠলো। চোখ বড় বড় করে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় তার দিকে তাকালাম। কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। তিনিও একটু চোখ কুঁচকে আবার বলতে শুরু করলেন,

” ট্যারা মানে বোঝোনি, খুকী? ওইযে এক দিকে তাকালে মনে হয় অন্য দিকে তাকাচ্ছো এরকম। এমন সমস্যা থাকলে ডাক্তার দেখাও তো। এটা খুবই চিন্তার বিষয়। পরে কিন্তু বিয়ে হবে না।”

তার কথা শুনে এতক্ষণ আমার মনের মধ্যে উড়াউড়ি করা শত শত প্রজাপতি মুহূর্তেই তাদের নড়াচড়া থামিয়ে দিল। আমি দ্রুত হতাশ চোখে তার দিকে তাকালাম। হায়রে! মানুষটা কীনা আমাকে এমন ভাবছে! শেষমেশ আমার চোখের সমস্যা! আমি ট্যারা! কী কপাল আমার! এই প্রত্যেকটা কথা চিন্তা করার সময় আমার অভিব্যক্তিও মনের কথা অনুযায়ী পরিবর্তন হতে থাকলো। মানুষটা সেটুকুও গভীর চোখে পর্যবেক্ষণ করলেন।

কিন্তু আর কিছু বলার সুযোগ হলো না। ততক্ষণে রিমি আপু পানি নিয়ে চলে এসেছেন। তাকে পানি দেবার পরপরই রিমি আপু আমাকে নিয়ে উঠে গেলেন। আমিও সেখান থেকে চলে যাবার জন্য পা বারিয়েছি। কিছুদূর এগিয়েছিও। কিন্তু অবাধ্য মন আর কথা শুনলো না। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন থেকে এক নজরে প্রেমিক পুরুষের অবয়বটি দেখতে চাইলো।

কিন্তু পেছনে তাকাতেই শরীর অবশ হয়ে এলো আমার। পা থমকে দাঁড়ালো। গ্রামের ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ তীব্রভাবে শরীরে অনুভূত হতে থাকলো। আমি অবশ হয়ে আসা শরীর নিয়েই তার চোখে চোখ রাখলাম। তিনি তখনও এক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছেন। যতক্ষণ আমাকে দেখা গেছে ততক্ষণই গভীর দৃষ্টিতে দেখেছেন। আর আমি! আমারও অবাধ্য চোখ শেষ পর্যন্ত নজর পরিবর্তন করতে পারেনি।ব্যস! এভাবেই শুরু হয়েছিল আমার সেই সর্বনাশা পথের যাত্রা!

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here