আকাশী পর্ব ২৩

“আকাশী”
পর্ব ২৩.

আকাশী যে কমবয়সী ছেলেটির পাশে বসে আছে, সে দেখতে কিছুটা মোটাসোটা, কালচে বর্ণের। কিছুদূরে রোকসানা ছেলেটির মায়ের সাথে কথা বলছেন। তিনি কথা বললেও নজর আকাশীর দিকেই রেখেছেন। মহিলাটি তার মাঝে কী খুঁজছেন সে বুঝে উঠতে পারছে না। আসার পর থেকে একটিবারের জন্যও চোখ সরাননি। চাহনিটা মায়ার নয়, কিসের যেন খোঁজে আছে। রোকসানা ইশারা করায় আকাশী মাথা থেকে এসব খেয়াল ছেড়ে ছেলেটির কথায় মনোনিবেশ করল। সে ইন্টারমিডিয়েটের পর আর পড়াশোনা করেনি। এরপর দুবাইয়ে চলে যায়, ওখানে ড্রাইভিং করে। আকাশী বিয়ের পর পড়তে চাওয়ার কথা বলায় ছেলেটি কিছুটা সঙ্কোচ বোধ করল। আকাশীর ভেতরের এতক্ষণের মিষ্ট ভাবটা নিমিষেই কেটে গেছে। সে আসার সময় তেমন একটা দুঃখিত ছিল না। কারণ সে তখনও বর্তমানকে মেনে নিতে পারছিল না। সবই ঠিক হবে, সবই ঠিক হবে এমন একটা পজিটিভ থিংকিং তাকে আবৃত করে রাখায় এতক্ষণ সে কল্পনার বাইরে হাঁটছিল। এখন অনুভূত হচ্ছে, একটি ছেলে তাকে পরখ করছে। তার মা আরও বেশি। সত্যিই কি সে এইদিনের জন্য এতদিন কষ্ট করে এসেছে? শেষে এসে যদি এমনই একটা অশিক্ষিত পরিবারে বিয়ে করতে হয় তবে সে এসএসসির পর পড়াশোনা শেষ করে কেন দেয়নি? অন্তত এই মহিলাটির তেতো নজরটা সওয়া যেত। কোনো শিক্ষিত পরিবারে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রশ্নই উঠে না। এজন্য সে কখনও চায়নি তার রাজকুমার কোনো গ্রামীণ নীচু মানসিকতার লোক হোক। হোক সে মাত্র এইচএসসি পাস, আকাশী নির্দ্বিধায় তাকে মেনে নেবে।
সে ভাবনাগুলোকে বেশিক্ষণ স্থায়ী না রেখে কথা বলে গেল। কারণ স্থায়ী রাখলে তার ভেতরের ক্ষোভটা আর উহ্য থাকবে না। সে সমবয়সী সহপাঠীদের মতো করে কথা বলে যায়। একবারও মন মানতে চাইছে না যে, তাকে বিয়ে করার জন্য কেউ দেখতে এসেছে। রেস্টুরেন্টে কথাবার্তা শেষে সে চলে যাওয়ার সময় ছেলেটির মা তাকে ডাকল। রীতিমতো লোকদের বিদায় দেওয়ার সময় জড়িয়ে ধরার প্রথানুযায়ী আকাশী জড়িয়ে ধরতে এগিয়ে যায়। যেই সে গেল আকাশী আবিষ্কার করল, মহিলাটি তার উচ্চতা তাঁর জায়ের সাথে মাপছেন আর ওকে তিনি জড়িয়ে ধরতে আসতে বলেননি। ওর বুক ছিঁড়ে অভ্যন্তরে কেবল একটা ধ্বনিই গুঞ্জন করতে লাগল, “সো চিপ”। আকাশী আরেক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে পেছনে না ফিরে দ্রুতপদে চলে গেল। রাগটা সে কাউকে বুঝতে দেয়নি। সে রাগে অভিমানে অপমানে জ্বলে-পুড়ে গাড়িতে বসল।
রোকসানা বললেন, ছেলেটি মন্দ নয়।
আকাশী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মুখে নিকাব থাকায় তিনি তার রাগ দেখলেন না। তাকালে দেখতে পেতেন, তার রাগ পানিতে পরিণত হয়ে চোখে ভিড় জমিয়েছে। আর ওই রাগকে সে ফেলতে না দিয়ে অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল।
‘কিন্তু সে আমাকে পড়াতে চায় না।’
‘বিয়ের পর পড়াশোনা করতে দেয়, এমন ছেলে নেই। বিয়ের পর মেয়েদের পড়াশোনা হয়ই না।’ রোকসানা চুপ করে গেলেন।
আকাশীর গা ঘিনঘিন করতে লাগল। নিজেকে আজ খুব তুচ্ছ লাগছে। সে কখনও আফসোস করেনি। ভালো-মন্দ সবকিছুকেই অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু তার আজ বড় আপসোস হচ্ছে তার বাবা না থাকায়। মৃত্যু স্বাভাবিক একটা বিষয়। তার জন্য বাবাকে কখনও দোষারোপ করেনি। কিন্তু আজ ভাগ্যকে করছে। কারণ সে বাবাকে দূর করে দিয়েছে। তিনি থাকলে না এই দিন থাকত, না এই বাজে অভিজ্ঞতা।
দু’একদিন আকাশী মরার মতো পড়েছিল। তার দুঃখকে সে উপরে প্রকাশ পেতে দেয়নি। এরই মাঝে রহিম তার মাকে বহুবার কল করেছে। মা তাকে বললেন, ‘এই ছেলেটির বাড়িঘর ঠিক নেই।’ এই সম্বন্ধ ভেঙে দেওয়াতে তো আকাশীর মনের শান্তি ফিরে আসবে না। যে অপমানটা হয়েছে, যে খারাপ স্মৃতি অভিজ্ঞতার পাতায় আবদ্ধ হয়েছে তা মিটে তো যাবে না। আজীবন খচখচ করতে থাকবে। সে জানে, বাড়িঘরের কথা কেবল দেখানো একটি ফ্যাক্ট। আসল কথা হচ্ছে, ছেলেটির ইনকাম কম। মা কোনো মেয়ের স্বামীর টাকা পাননি। কিন্তু এবার সংকটে পড়ায় আকাশীর কাছে কিছু আশা রাখছেন। তাছাড়া রোকসানার এতোটুকু স্পর্ধা হয়েছে যে, তিনি সম্পদের চেয়ে ছোট কাউকে নির্বাচন করতে পারবেন না। বড় একটি বাড়ি, সামনে বড় একটি উঠান, পাশের ক্ষেতের ছোট একটি অংশ আজ তাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের আকার দিয়েছে। অন্দরমহলে তারা নিম্নবিত্ত হলেও অন্তত পাত্রপক্ষকে তাদের মতো উপর থেকে মধ্যবিত্ত হতে হবে। নইলে আজমের করে যাওয়া কাজের মূল্য কী রয়ে গেল। এজন্য রোকসানার মন রহিমের দিকে তেমন একটা না ঝোঁকায় তিনি ছেলেটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু ছেলেটিও ছাড়ার পাত্র নয়। আকাশীর মতো রূপে-গুণে বেড়ে ওঠা মেয়ে খুব কম সাধারণ লোকের ভাগ্যে জুটে। সে উচ্চ খান্দানে যাওয়ার মতো মেয়ে। তার মতো ছেলের কাছে তাকে দেখাতে নিয়ে গেছে, তাকে বিয়েও দিতে পারবে ভেবে ছেলেটি লালসা কমাচ্ছে না। মায়ের ফোন ধরার সুযোগ আকাশীর তেমন নেই। নইলে সেদিন তার মায়ের করা অপমানের এবং তাঁর আকাশীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা নজরের শিকার হওয়ার ব্যপারটির সে এমনভাবে শোধ নিত, ছেলেটি কখনও মেয়ে দেখার ভুল ভুলেও করত না।
আকাশীর হাতে আবারও দুটো বিভাগে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার টাকা জোগালো। মাকে সে পরীক্ষার কথা আর পেড়ে দেখছে না। সে নিশ্চিত, তিনি তাকে পরীক্ষা দিতেই দেবেন না। রহিমের বাতাস কিছুদিন পর দূর হয়ে গেল। আকাশী নিশ্চিন্তে আগের মতো প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। মা হয়তো আরও কিছুদিন পাত্র দেখবেন না। ততদিন পর্যন্ত কিছু তো আশা করা যায়। তার এই আশাকে চুরমার করে দিয়ে রহিমের সাথে দেখা করার দুই সপ্তাহ পর আবারও একটি সম্বন্ধ এলো। এবারেরটি বড়। ছেলেটির বাড়িগাড়ি সবই আছে। এরশাদও রহিমের মতো বিদেশে থাকে। বয়স ত্রিশ পার হয়েছে। এখনও বিদেশেই। প্রথমে তার পরিবারই মেয়ে পছন্দ করতে চাওয়ার আশায় আকাশীদের তাদের বাসায় যেতে বলেছে। সে রোকসানাকে বুঝাল। কিন্তু তিনি তার একটি কথারই কর্ণপাত করছেন না। হঠাৎই মায়ের মাঝের এই পরিবর্তন ওকে অন্ধ করে দিয়েছে। মা তার সাথে এমনভাবে আচরণ করছেন, যেন তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে পারলেই রক্ষা, এতে টাকাও পাওয়া যাবে।
সে ভাবল, ভবিষ্যৎ সৃষ্টিকর্তার হাতে। কিন্তু ভাগ্যকে তো পাল্টানো যায়। তার কিছু পদক্ষেপ হয়তো তার ভাগ্য পাল্টিয়ে দিতে পারে। সে কঠিন হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। ছেলেটির বাড়ি যাওয়ার আগের রাতটা সে নির্ঘুম কাটায়। ওখানে যাওয়ার আগে তাকে সাজতে দেখে রোকসানা পুলকিত হলেন। ভাবেন, তাহলে অবশেষে সে নিজেকে বিয়ের জন্য মানিয়ে নিয়েছে। তারা ওখানে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর রোকসানার মুখ ম্লান হয়ে গেল। আকাশীকে বিদঘুটে কালচে দেখাচ্ছে। তিনি জানেনই না, সে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সব এক্সপায়ার্ড ক্রিম দিয়ে এসেছে, যা কিছুক্ষণ বাদে মুখকে তেলতেলে করে দিয়ে কালো করে দেয়। তার মুখ অসম্ভব ফোলাও দেখাচ্ছে, যেন দুইরাত ঘুমায়নি। সে নিজেকে হাসিখুশি রাখতে না পারায় তার নতুন এই রূপ আরও টগবগিয়ে ফুটে উঠছে। কথাবার্তা শেষে রোকসানা গম্ভীরচিত্তে ফিরে এলেন। কিন্তু পরদিন তিনি ফোন কলের আশায় হাসিখুশিতে ছিলেন। সেদিন কোনো কল এলো না। তিনি আরও চিন্তায় পড়তে লাগলেন। এর পরদিনও ওপার থেকে কোনো সম্মতি না আসায় অগত্যা তিনি এরশাদকে ফোন দিয়ে বললেন, আপনার কাছে তো মেয়ের ছবি তুলে পাঠিয়েছিলাম। আপনি পছন্দও করেছিলেন। তবে আপনার পরিবার থেকে কোনো মত আসছে না কেন?’
এরশাদ বুঝায়, তার পছন্দ হলেও পরিবারের লোকের পছন্দ হয়নি। সে নিজের মত হিসেবে বলেছে, ছবি অনেকসময় বাস্তবকে পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না। তাই আমি আমার পরিবারের মতকেই গ্রাহ্য করি। রোকসানার মাথার ওপর বাজ পড়ে। পরবর্তীতে তিনি দিনের পর দিন আকাশীকে নানাদিক থেকে হেয় করে কথা বলতে ছাড়েননি। সে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। অবশেষে আরও দুটো সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর দেখল হাতে আরও পনেরো দিন সময় আছে। আপাতত মা বিয়ের কথা তুলছেন না। হয়তো দুইবারে যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।
আকাশী মনের ভাঙা টুকরোকে একদিকে রেখে পরীক্ষার জন্য পড়তে শুরু করল। কিন্তু সে কোচিং করেনি। প্রশ্ন কেমন আসবে তাও জানে না। কিন্তু পরীক্ষা দিতে হবেই। সবাই দিচ্ছে। অন্তত অভিজ্ঞতার জন্য দিতেই হবে। পরবর্তীতে আকাশী কিছুটা সহায়তা পায়। এইচএসসিতে ফেল করা তার এক সহপাঠী কোচিং করা এক বিভাগের নোটগুলো পতাকে দেয়। মায়ের কিছু টাকায় সে একটি প্রশ্নব্যাংক কিনতে পারে। হাতের নাগালের এগুলো দিয়েই সে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এই প্রস্তুতি দিয়ে আরও কিছু দিক-নির্দেশনা নিয়ে সে চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে পরীক্ষা দিতে বেরিয়ে পড়ে।
পথ অনেক লম্বা। ওখানে আগে কখনও যায়নি। সে খোঁজ নিয়ে দুই নাম্বার দিয়ে যেতে লাগল। গাড়ি অর্ধেকে পুলিশ থামিয়ে দেয়। এরপর সে হাঁটা ধরে। হাতে গোনা আরও কয়েকজন ছিল। আকাশী তাদের সাথে যোগ দেয়। কিন্তু কারো গন্তব্যই বিজন্যাস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ভবনে নয়। একেকজনের ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু তাদের সাথে কিছুদূর পর্যন্ত যাওয়া যাবে। তাদের সাথে সে বহুদূর এগিয়ে গেল। কারো কারো দিকনির্দেশনায় সে কাঙ্ক্ষিত ভবনটি খুঁজতে লাগল। একসময় সে ভবনটি পেরুনোর পর আবারও দিকনির্দেশনা পেয়ে ফিরে এসে পেয়ে যায়। ভবনের সামনে অগণিত ছাত্রছাত্রীর আনাগোনা। আশেপাশে সবাই বসে কিংবা দাঁড়িয়ে রিভিশন দিচ্ছে। সে মনে মনে হাসল। সে কিনা প্রথম মেয়ে, যে সামান্য প্রিপারেশন নিয়েই অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য এতদূর এসেছে। তখন মনটা বলল, লাইফ এতটাও খারাপ নয়। যতগুলো উইকন্যাস আছে সবগুলোকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়। সে ভেবে দেখে, আবারও তার ভালোবাসা সংগ্রাম তাকে জড়িয়ে ধরেছে। এতদূর সে লড়ে এসেছে। কীভাবে? এর আগের মাস তো সে এমন অবস্থায় কেটেছিল, যেন সে চিরকালের জন্য আলোর দেখা পাবে না।
ওর মাথায় এলো, মা এখন আর আগের মতো মরিয়া হয়ে থাকছেন না। প্রশান্তিতে আছেন। এমনকি প্রশ্নব্যাংক কেনার জন্য টাকাও দিয়েছেন। এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? তার মনে পড়ল, কয়েকদিন আগে বেশ কয়বার মা ব্যাংকে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে একবার যাওয়া এক চাচির কাছে সে জানতে পায়, তিনি ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গিয়েছেন। ব্যাংকে তো আকাশীর ডিপিএস ব্যতীত কিছুই নেই। তবে কি মা সেই টাকাগুলোই কিস্তিতে দিয়ে দিয়েছেন? ভেবে তার মোটেও খারাপ লাগল না। নিজের সম্পদে কখনও তার লালসা ছিল না। মা টাকাগুলো নিতেই পারেন। যদি কিস্তি শেষ হয়ে যায়, তবে সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে। আকাশীর মুখে দীপ্তি খেলছে। আজ অনেকদিন পর মনে একটা প্রশান্তি বিরাজ করছে। অনেকদিন এর জন্য সে হাহাকার করেছিল।
আকাশী পরপর দুটো বিভাগে পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফেরে। একটি নিয়ে আশা থাকলেও অন্যটি নিয়ে কোনো আশা নেই। কারণ ওই বিভাগের জন্য তার পর্যাপ্ত বই ছিল না। নোটগুলোও ওই বিভাগের ছিল না। সে একটিতেই ওয়েটিং-এ এসেছে। কিন্তু তা অকার্যকর। তবে এরচেয়েও দামি কিছু সে পেয়েছে। একরাশ অভিজ্ঞতা। এক বিভাগের পরীক্ষার পর সে সারারাত গাছের নিচে কাটিয়েছে। বিরিয়ানি কিনে খেয়ে শুয়েছে গাছের নিচেই। ওখানেই সে পড়াশোনা করে পরদিন অন্য বিভাগের পরীক্ষা দিয়েছে। তাছাড়া এতদূর ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা দেওয়ার মজাই ভিন্ন।
এতদিন মনে যে ক্লেশ জমেছিল তাতে অভিজ্ঞতাটা ভর করায় একপ্রকার চাপাই পড়েছে। এরশাদের বাড়িতে যাওয়ার সময় সে যে কাণ্ডটি করে রোকসানাকে শাস্তি দিয়েছে, তা তিনি আজমের করে যাওয়া আকাশীর ডিপিএস-এর টাকা তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তুলে ফেললেন। ক্ষতি করায় সে ক্ষতিসাধনটা মেনেও নিয়েছে। সে এতদিন ডিপিএস’এর সম্বন্ধে তেমন জানতই না। মাকে সে জিজ্ঞেস করল, ‘কত টাকা ছিল?’
‘এক লাখ মতো। এখন পঞ্চাশ হাজার আছে।’
‘এগুলো আগে বের করেননি কেন?’
‘আগে টেনশনে এতই ডুবেছিলাম যে… যে, ওই টাকার কথা মাথায় আসেনি। আর এলেও ওটা তোর টাকা হওয়ায় বের করিনি। শত অস্বীকার করলেও তুই মেয়ে হওয়ায় তোর সবকিছুতে অধিকার আছে। ওই অধিকারে তোকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। তা তো হতে দিলি না। আমাকে আমার কর্তব্য পালন করতে দিলি না বিধায় তোর টাকাই নিয়ে নিয়েছি। এখন তোর যাই ইচ্ছা হয় তাই কর। আমি আগের মতো নাক গলাতে যাব না। এখন আমি মুক্ত। তোকে যা জোর করেছিলাম, সবই অসহায় হওয়ায়। তুই নিজেকে সেদিন কালো বানিয়ে ব্যাংক থেকে টাকাগুলো বের করতে বাধ্য করেছিস। এখন খাওয়ার টেনশন ব্যতীত আর কিছু নেই। তোর বাকি টাকায় আমার কোনো ইচ্ছা নেই।’
‘তাহলে কি আমি ওখান থেকে টাকা নিয়ে অনার্সে ভর্তি হতে পারব?’
রোকসানার নির্লিপ্ততাকে সে সায় ধরে নিলো। বিগত সময়ের দুঃখ যেন নিমিষেই গুছে গেছে। বাকি টাকাতে মায়ের সম্ভবত কোনো ইন্টারেস্ট নেই। কিস্তি চুকানোর পর রোকসানার প্রসন্নতায় তাই প্রকাশ পায়। তাহলে সে বাকি টাকা দিয়ে নিজের জন্য কিছু একটা করতে পারবে। সে কখনও কারো জন্য কিছু করতে পারেনি। কিন্তু তার জন্য যারা যা কিছু করে এসেছে সে তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। বাবা অন্যান্য কোনো বোনের জন্য ডিপিএস নেননি। তার জন্যই রেখে গেছেন, কোন লক্ষণে আকাশীর আজকের এই বিপত্তির কথা ভেবে। সে এখন চাইলে অনিকের চার হাজার টাকাও ফিরিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু দেবে না। ওই টাকা সে উপহার হিসেবে দিয়েছে। তাছাড়া যাদের কাছে টাকা বেয়ে পড়ে, তাদের টাকা দিয়ে আরেকজনের নিষ্ঠ হলে ওইজনের পূর্ণ অধিকার আছে ওই টাকায়। আকাশী খুশিমনে অনার্সে অ্যাডমিশন নেয়।
(চলবে…)
লেখা: ফারিয়া কাউছার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here