অঙ্গনে হৃদরঙ্গন পর্ব ১৮

“অঙ্গনে হৃদরঙ্গন”
পর্ব- ১৮
(নূর নাফিসা)
.
.
গত সপ্তাহে তিনটা কাজ একসাথে নিয়েছে হাতে। আর তাই সপ্তাহের পুরোটা সময়ই কাজের পেছনে ছুটতে দেখা গেছে তাকে। সকালে নাস্তা করে বের হয়, দুপুরে আশেপাশে থাকলে বাড়ি ফিরে। আর নাহয় রাতে তার দেখা পাওয়া যায়। ক্লান্ত বেশে ফিরে ঘুমে পাড়ি জমায়। ইচ্ছে হলে খাবার খায়, না হলে খায়ও না। খাওয়াদাওয়া গোসলের অনিয়মে হালকা সর্দি-জ্বরও বাধিয়ে ফেলেছে৷ আজ একটা কাজ সম্পন্ন হয়েছে। টাকা পাওয়ার পর মনে হলো শ্রাবণকে কিছু পোশাক কিনে দেওয়া দরকার। ওই পুরনো পোশাকগুলো অনেকদিন যাবত পরছে সে। তাই শেষ বিকেলে চলে গেলো শপিংমলে। কিন্তু কেনার মতো কোনো পোশাকই পছন্দ হলো না তার। চোখ আটকেছে একটা লাল শাড়ির দিকে। শ্রাবণ লাল টুকটুকে শাড়ি পছন্দ করে। প্রায়ই বিয়েতে নেওয়া শাড়িটা পড়তে দেখা যায়। তাই এটা নিয়ে নিলো। আর কোনো পোশাক কেনা হলো না। ভাবলো পরবর্তীতে শ্রাবণকে নাহয় সাথে নিয়ে আসবে, নিজে পছন্দ করে কিনে নিবে। বাড়ি ফেরার পথে আরও কিছু জিলাপি কিনে নিলো৷ খুব মজা করে জিলাপি খেতে দেখা যায় তাকে। আর তাই জিলাপি দেখলেই শ্রাবণকে মনে পড়ে তার। সন্ধ্যায় বাড়ি এসে দেখলো শ্রাবণ ঘর মুছে দিচ্ছে। সাদাফ বললো,
“এসময় কেন একাজ?”
“বিকেলের বাতাসে ঘর ভরে গেছে ধুলায়। পা ফেলা যাচ্ছে না। তাই মুছে দিচ্ছি।”
“ধরো এগুলো।”
শ্রাবণ হাত মুছে প্যাকেটগুলো নিয়ে খাটের কোণে রাখলো। কি এনেছে তা দেখার জন্য ঝটপট কাজ শেষ করে নিলো। ওদিকে সাদাফ হাতমুখ ধুয়ে এসেছে ঘরে। শ্রাবণ তেলের পিঠা বানিয়েছিলো, খেতে দিলো সাদাফকে। আর প্যাকেট খুলে নিজে খেতে লাগলো জিলাপি৷ শাড়িটা বের করে বললো,
“এটা কার?”
“তোমার।”
“আবার লাল শাড়ি কেন?”
“লাল শাড়িতে তোমাকে ভালোই দেখায়। তাই আরেকটা নিয়ে এলাম।”
শ্রাবণ লজ্জা পেয়ে মিষ্টি হাসলো। শাড়িটা কয়েকবার নেড়েচেড়ে দেখলো। ইচ্ছে করছিলো এখনই পরে ফেলুক। সাদাফ বলেছে যে লাল শাড়িতে ভালো দেখায়! কিন্তু পরবে কি না রেখে দিবে দোটানায় দুলতে লাগলো সে। প্যাকেটে শাড়ি রেখে দিয়েও সাদাফের দিকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
“এখন পরবো?”
সাদাফ তেলের পিঠা খাওয়ায় মনযোগ দিয়ে বললো,
“ইচ্ছে হলে পরো। নিষেধ করলো কে!”
“তাহলে কি বেড়াতে নিয়ে যাবেন?”
সাদাফ পিঠা থেকে চোখ সরিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। শ্রাবণ কি অপরাধ করে ফেললো বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে, ভেবে পাচ্ছে না। সাদাফ আবার পিঠার দিকে তাকিয়ে খেতে খেতে বললো,
“হালিম খেতে যাবে? খাসির মাংসের মজার হালিম পাওয়া যায় সন্ধ্যায়।”
শ্রাবণ উৎফুল্ল হয়ে বললো,
“চলুন না তাহলে যাই। আজ আর ভাত রান্না করবো না।”
“যাও, রেডি হও।”
তারা সন্ধ্যায় বেরিয়ে গেলো হালিম খেতে। আসলেই খুব মজার হালিম। শ্রাবণ বেশ উপভোগ করেছে। সাথে ছিলো নান রুটি। পেট পরিপূর্ণ করে ফিরেছে বাড়ি। তেলের পিঠা, জিলাপি সবই অবশিষ্ট রয়ে গেছে। সকালের নাস্তা হয়ে যাবে তাতে। কিন্তু সাদাফ ঢাকার বাইরে যাবে, দুপুরে ফিরবে না। তাকে নিশ্চয়ই সকালে তেলের পিঠা খায়িয়ে বিদায় করবে না। এমনিতেই দুদিন যাবত কাশি লক্ষ্য করা যায়। এখন গরম খাবার খাওয়া প্রয়োজন। তাই সকাল সকাল উঠে রান্না সেড়ে নিয়েছে শ্রাবণ। সাদাফ দশটার দিকে নাস্তা করে বেরিয়ে গেছে। সারাদিন বাড়িতে একা শ্রাবণ। বিকেলে ঘরে তালা দিয়ে কুরআন পড়তে গেছে দোতলায়। ফিরেছেও একটু দেরি করে। কারণ, জানে সাদাফ রাতের আগে ফিরবে না। একা একা ঘরে থাকতে কি আর ভালো লাগে সারাক্ষণ! মাগরিবের আজান পর্যন্ত বসে গল্প করছিলো মহিলার সাথে। টুকটাক কাজও করে দিচ্ছিলো কথার ফাঁকে ফাঁকে। শ্রাবণ আম্মা বলে সম্বোধন করে তাকে। মহিলার সন্তান নেই। স্বামী থেকেও পাশে নেই। অন্যত্র সংসার গড়ে নিয়েছে তিনি নিঃসন্তান থাকায়৷ অবশ্য তিনিই বলেছিলেন বিয়ে করে নিতে৷ কিন্তু সতীনের সাথে সংসার জমাতে পারেননি। তাই ভাড়াটিয়া হয়ে অন্য বাসায় চলে এসেছেন নিজেই। নিজেকে পরিচালনা করেছেন দ্বীনের পথে। স্বামী মাঝে মাঝে টাকা পাঠায়। অবহেলা করে না তাকে। টাকা নেয়, সেই টাকায় থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করে। কুরআন শিক্ষা দিয়ে নিজেরও কিছু আয় হয়। এতেই বেশ ভালো আছেন তিনি। মাঝে মাঝে সুখদুঃখ বিনিময় করে শ্রাবণের সাথে৷ শ্রাবণ নিশ্চুপ শুনে, সমবেদনা প্রকাশ করে।
মাগরিবের আজান পড়লে সে বিদায় নিয়ে চলে এলো। নিচতলায় এসে দেখলো ঘরের সামনে এক অপরিচিত লোক পায়চারি করছে। শ্রাবণ এগিয়ে আসতেই লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করলো,
“এই ঘরের লোক বাড়ি নাই?”
“কেন, কি দরকার?”
“ভাইজানের সাথে একটু দেখা করা দরকার।”
“ভাইজান বাড়িতে নাই। কাল সকালে আসবেন দেখা করতে।”
“গেছে কই?”
“ঢাকার বাইরে গেছে কাজে।”
“ফিরবো কখন?”
“ফিরতে ফিরতে রাত হবে। কাল সকালে আসবেন।”
“আচ্ছা।”
লোকটা চলে গেলো। শ্রাবণ তালা খুলে ঘরে এসে লাইট জ্বালিয়ে দিলো। ওযু করে এসে দরজা লাগিয়ে নামাজে দাঁড়ালো। নামাজ আদায় করে প্যাকেটের অবশিষ্ট জিলাপি খেতে লাগলো। দিনের রান্না করা তরিতরকারি আছে, সাদাফের জন্য কিছু ভাত রান্না করলেই হবে এখন। এছাড়া আর তার কোনো কাজ নেই। এমন সময় দরজায় নক করলে শ্রাবণ ভাবলো সাদাফ ফিরে এসেছে। “আসছি” বলে সে জিলাপির প্যাকেটটা মুচড়ে রেখে এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। দরজা খুলতেই সাথে সাথেই কেউ মুখ চেপে ধরে তাকে ভেতরে ঠেলে নিয়ে এলো। পিছু পিছু আরও কয়েকজন হুড়হুড় করে ঢুকে পড়লো ঘরে। লোকটা শ্রাবণের মুখ জোরে চেপে ধরে বললো,
“একটা শব্দ করবি, গলা কেটে দিবো।”
বলেই সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো তাকে। খাটের পাশে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়লো শ্রাবণ। মাথায় লেগেছে বেশ! ব্যাথা যেন ঝিমঝিম করে উঠলো। ব্যাথা ও ভয়ে শ্রাবণ বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। চাইলেও তার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। এরা কারা, তাদের কাউকেই চিনতে পারছে না। তাছাড়া সকলেরই মুখ কাপড়ে বাঁধা। তল্লাশি করছে পুরো ঘর। আসবাবপত্র সব লণ্ডভণ্ড করে ফেলছে। চিৎকার করে যে কারো কাছে সাহায্য চাইবে, আশেপাশে আওয়াজ দিবে সেই শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে সে। আলমারি থেকে তারা টাকাপয়সা সহ সকল পোটলা পুটলি অস্ত্র নিয়ে নিয়েছে নিজেদের দখলে। শ্রাবণ বেশ বুঝতে পারছে তখন আসা লোকটা এদেরই লোক হবে। খোঁজ নিতে এসেছিলো সাদাফ বাড়িতে আছে কি-না! মুহুর্তেই সব উল্টেপাল্টে নিয়ে গেলো তাদের প্রত্যাশিত সামগ্রী। সেই এক কোণে বসে কিছুই করতে পারলো না শ্রাবণ। স্তব্ধতা ঘিরে ধরেছিলো তাকে। শব্দযোগে কান্না করতেও সময় লেগেছে তার। লোকজন চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর কান্না বেরিয়ে এসেছে ভেতর থেকে। মাথার যন্ত্রণায় মনে হচ্ছে মরে যাচ্ছে সে!
সাদাফ ঘরে ফিরে বিস্মিত! বিছানাপত্র লণ্ডভণ্ড, আলমারি সম্পূর্ণ খোলা, চেয়ার উল্টে পড়ে আছে, এক কোণে বসে শ্রাবণ কাঁদছে! তার কপাল ফেটে রক্ত ঝড়ছে! শ্রাবণ তাকে দেখে কান্না আরও বাড়িয়ে উঠে এলো তার কাছে। সাদাফ তাকে ধরে চোখেমুখে হাত বুলিয়ে বললো,
“এসব কি অবস্থা! কে করলো এসব? কি হয়েছে বলো?”
“চিনি না। এতোগুলো লোক এসে সব নিয়ে গেছে। ডাকাতের মতো মুখে কাপড় বেঁধে এসেছে।”
কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো শ্রাবণ। যদিও তার মুখের কথা অস্পষ্ট ছিলো, সাদাফ বুঝে নিয়েছে সব। মাথায় তার আগুন জ্বলে উঠেছে, চোখ হয়ে এসেছে রক্তিম। সে নিশ্চিত এসব হায়দারের কাজ। তার অনুপস্থিতিতে হায়দার লোক পাঠিয়ে এসব করেছে। যেদিন থেকে হায়দারের সাথে ঝামেলা হলো, সেদিন থেকেই সে সুযোগ খুঁজছে মালপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার। তাকে তো খুন করতেও দ্বিধা বোধ করবে না এবার সাদাফ। কিন্তু এখন তার কি করণীয় বুঝতে পারছে না। হায়দারের কাছে তো অবশ্যই যাবে। কিন্তু এই মেয়েটাকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে তো যাওয়া যাচ্ছে না। সাদাফ কপালে ওড়না চেপে ধরে বললো,
“কখন এসেছিলো তারা?”
“একটু আগে। আমি মাগরিবের নামাজ পড়ে উঠেছি মাত্র। তার পরপরই। আজানের আগে একজন এসে খোঁজ করে গেছে আপনার। আমি বলে দিয়েছিলাম আপনি বাসায় নেই, কাল যেন আসে দেখা করতে।”
সাদাফের সর্বাঙ্গে যেন রক্ত নয়, আগুন বইছে। কাছে পেলেই যেন ছারখার করে দিতো তাদের। সে শ্রাবণকে পর্যবেক্ষণ করে বললো,
“আরও কোথাও ব্যাথা পেয়েছো?”
শ্রাবণ দুদিকে মাথা নাড়লে সে বললো,
“চলো।”
তাকে সাথে নিয়ে ডিসপেনসারিতে এলো সাদাফ। ডাক্তার তার ট্রিটমেন্ট করছে, কিন্তু সাদাফের মাথায় ঘুরছে ঘটে যাওয়া কর্মকাণ্ড। কিছুক্ষণ আগে হলে এখন নিশ্চয়ই মালামাল নিয়ে হায়দারের বাড়িতে আছে। সেখানে গেলে নিশ্চয়ই হাতেনাতে ধরা যাবে। সে ভাবনা থেকে ফিরে শ্রাবণকে বললো,
“তুমি একা বাড়ি যেতে পারবে না? আর নাহয় থাকো এখানে। আমি আসছি।”
“কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
“আসছি৷ বসো এখানে। আমি এসে নিয়ে যাবো তোমাকে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here