অতঃপর প্রেমের গল্প পর্ব ৪৪+৪৫

#অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤️
#লেখিকা- কায়ানাত আফরিন
#পর্ব – ৪৪
আজ শ্রীমঙ্গলে শেষ সকাল আফরার। তাই সকালটাকে নিতান্ত সাধারন মনে হলো না ওর কাছে। ভোরে পূর্ব দিকের বারান্দার দরজাটি খুলতেই এক শীতল হাওয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো ওর রুমটি। অদূরেই নজরে পড়ছে মেঘালয়ের বিশাল বিশাল পাহাড়। অভাবনীয় সুন্দর সে দৃশ্য। আফরা কিছুদিন আগে ঘুরে এসেছিলো সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরের জায়গাটিতে। সেদিন ফারহান ওকে আরও কয়েক জায়গা ঘুরিয়েছিলো, দেখেছিলো বাংলাদেশ থেকে ভারতের মেঘালয়ের সীমান্তবর্তী চমৎকার একটি ঝর্ণা। কি সুন্দর কাটছিলো সেই সময়গুলো, আফরা চোখ বন্ধ করলেই ফারহানের শীতল মুখশ্রী চোখের সামনে অপলকভাবে ভেসে ওঠে বারবার।
আর আজ আফরা একরাশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অদূরে অবস্থানরত সেই পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। নিষ্প্রাণ ওর দৃষ্টি, বুক চিরে বেরিয়ে আসছে বারবার দীর্ঘশ্বাস। এখনও বাংলাদেশ ছেড়ে যায়নি আর এখনি ওর ফারহানের সাথে সেই স্মৃতিগুলো কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তবে এখান থেকে চলে গেলো কি অবস্থা হবে ওর?

আফরা ঘাড় বাকিয়ে একবার মাথা নিচু করে দেখে নিলো ফারহানের ছোটো কুটিরটি। ঝুলন্ত তালাটি অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আফরা এবার তাই চোখে ফিরিয়ে চলে গেলো নিজের রুমে।

______________

গতকাল রাতে অনেককিছু হয়ে গিয়েছে, যার ধারনা আফরা বিন্দুমাত্র করতে পারেনি। এমনকি ওকে সেই অনেক কিছু সম্পর্কে অবগতও হতে দেয়নি কেউ। বিশেষ করে ফাহিম। রাতে হুট করেই ফাহিম বাড়িতে এসে ওর বাবাকে বললো যে ও ভালোবাসে রৌশিনকে। যতদ্রুত সম্ভব ওকে বিয়ে করতে চায়। মিসেস নাবিলার মাথায় এতে যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। ইলার বন্ধু হিসেবে রৌশিনকে ভালোমতই চিনেন উনি৷ তবে কখনও ভাবতে পারেননি যে এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। মিসেস নাবিলা থমথমে গলায় বলে উঠলেন,

‘ পাগল হয়েছিস তুই ফাহিম? রৌশিন আর তোর তো কোনোদিক দিয়েই মিলে না। আর রৌশিনকে কি হিসেবে পছন্দ করলি তুই? এর থেকে আফরা তো হাজার…….’

‘ আফরা কেমন তা আমার এখন ম্যাটার করেনা মা। আফরা আমার জন্য না সেটা আমি ভালোমতই জানি। তুই প্লিজ এ বিষয় নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করবে না। কেননা আমি রৈশিনকে বিয়ে করতে চাই।’

এই প্রথম ফাহিম নিজের অনুগত মায়ের ওপর দিয়ে এভাবে কথা বললো। ওর মনে অজস্র চিন্তার উদ্রেক। মন বারবার চাইছে যে ফারহানের মতো বোকামো যেন ফাহিম না করে। আফরাকে না পাওয়ার পূর্বেই কষ্ট পেয়েছে ফাহিম, তাই রৌশিনের ব্যাপারে সে মোটেও এমন কোনো পদক্ষেপ নিবে না যাতে রৌশিনকে সে হারিয়ে ফেলে। ইলাও মোটামুটি ছিলো বাকশূণ্য। মিঃ ইফাজের এ নিয়ে আপত্তি না থাকলেও মিসেে নাবিলার চরম আপত্তি আছে। থনথমে গলায় তিনি বলে ওঠলেন,

‘ রৌশিনের সাথে তোর কোনো দিক দিয়েই মানায় না ফাহিম। তুই এখানকার নামি দামি হার্ট সার্জন। যেদিকে রৌশিন সবেমাত্র কলেজে পড়ে। শুধু তাই না, সেই সাথে মিডেল ক্লাস ফ্যামিলিরও। দেখ বাবা, আমার কথা ভালোমতো শোন। সমাজ বলেও তো একটা ব্যাপার আছে তাইনা? তোর দাদা জমিদার ছিলো, মৌলভীবাজারের এক প্রান্তে বিশাল সম্পত্তির আমাদের দখলে সেই হিসেবে রৌশিন……’

‘ পুরোনো যুগের মতো কথাবার্তা বলো না মা।আমাদের যেহেতু কম কিছু নেই তবে তুমি রৌশিনের ফ্যামিলি নিয়ে এত ভাবাভাবি করছো কেনো?’

‘ ভাবাভাবি করার কারন আছে ফাহিম……’

মিসেস নাবিলা থামলেন। ছেলের এসব পাগলামি উনার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। বললেন,

‘ আফরার মা’কে কথা দিয়েছিলাম আমি। যে আফরার বিয়ে আমি তোর সাথে দেবো। কিন্ত আফরা এতে বেঁকে বসাতে কথা আর এগোয়নি আফরার মা। কিন্ত এখন যদি উনি কোনোভাবে জানেন যে ছেলে অন্য কাউকে ভালোবাসে ভেবেছিস কি হবে আমার? উনি তো মনে করবেন যে আফরাকে আমরা না বলতে বাধ্য করেছি। তাছাড়া উনি এটাও বলেছিলেন যে আফরা অ্যামেরিকায় গেলে এ নিয়ে উনি কথা বলবেন আফরার সাথে। যদি রাজি হয় তবে তোকে…..’

ফাহিম যেন এবার অবাক না হয়ে পারলো না৷ এই দুই মা যেন দুজনকে বিয়ে করিয়েই শান্তির ঘুম দিয়ে ছাড়বে৷ ফাহিম প্রচন্ড রেগে গেলো এতে। চিৎকার করে বললো,

‘ আমি কি ব্যাবহারের জিনিস মা? বলছি আমি আফরাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক না তবুও তোমরা এসব শুরু করছো কেনো? যেদিকে তাকাই সেদিকেই সবাই ইউজ করে আমায়। এদিকে তুমি, তারপর আফরা, ওদিকে ফা…’

ফারহান নামটি বলার আগেই থেমে গেলো ফাহিম। ইলাও ভয়ে খানিকটা গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে। মি. ইফাজ চুপ ছিলেন এতক্ষণ। তবে ছেলের পাগলামি অতিরিক্ত দেখাতে বলে ওঠলেন,

‘ ফাহিম! শান্ত হও তুমি।’

‘ শান্ত হবো বাবা। তবে কথা দাও, আগামী দু’তিনদিন এর মধ্যেই রৌশিনদের বাড়িতে সম্বন্ধ নিয়ে যাবে তুমি। আমার এসব ধরাবাঁধা জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে। আমি এসব থেকে দূরে থাকতে চাই বাবা।’

সম্মতি জানালেন মি. ইফাজ। রৌশিন মেয়েটা মন্দ নয় ফাহিমের জন্য। তবে আফরার জন্যও মাঝে মাঝে বড্ড খারাপ লাগে ওর৷ ওই মিষ্টি মেয়েটার যদি একটা পথ হয়ে যেতো!

__________

সকালে আফরা সবকিছুই শুনেছে মি. ইফাজের কাছে। দুজনে এবার হাটছে নেলসন টি এস্টেটের আঁকাবাকা কাচা পথে। যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই সবুজ আর সবুজ। মাথার ওপর বিস্তৃত নীল আকাশ। আফরা নীরব মি. ইফাজের কথাগুলো শুনলো আর আশপাশ দেখতে থাকলো। মি.ইফাজ এবার বললেন,

‘ আফরা তোমার কি কোনো কারনে মন খারাপ?’

‘ না আঙ্কেল।’

‘ তবে এত চুপচাপ যে?’

কথা বললো না আফরা। মি. ইফাজ মলিন হাসলেন। বললেন,

‘ তুমি চুপচাপ ধরনের মেয়ে না, তা জানি। তবে,, তোমার মৌনতায় অন্যরকম একটা সৌন্দর্য আছে। একটা কথা আছে, ‘ Sliency is the hidden beauty of every creature’, শুনেছো কখনো?’

‘ না তো!’

‘ আজ শুনে নাও। এরপর শুনতে নাও পারো, কারন এই স্টুপিড বাক্যের আবিস্কারক আমি।’

আফরা হেসে দিলো এ কথা শুনে। এটাই যেন চেয়েছিলেন মি.ইফাজ। বলে ওঠলেন,

‘ তোমায় হাসিখুশিই সুন্দর লাগে মামণি৷ এভাবেই হাসতে থাকো। কারও জন্য নিজের হাসি মুখ থেকে সরিয়ে ফেলো না।’

বলে গম্ভীর হলেন উনি। মিনমনিয়ে বললেন,

‘ খুব শখ ছিলো তোমায় আমার ছেলের স্ত্রী হিসেবে দেখার। হয়তো সেই সৌভাগ্যটা হলো না, আমার ফারহানটাকেও তোমায় দিলে মনে একটা শান্তি পেতাম। ইসস! যদি সত্যি সত্যিই এমন কিছু হয়ে যেতো!’

আফরা নীরবে প্রকাশ করলো অনুভূতির। ফারহানের নামটা শুনলেই ওর মনে চাপা দুঃখ বিরাজ করে। তাই বলে মনে মনে বললো,

‘ এরকম কিছুই হবেনা আঙ্কেল। ফারহান কখনোই আমার হবে না।’‌

______________

বিকেল ঢলেছে পশ্চিম প্রান্তরে। ফুটে ওঠেছে হলুদাভ আভা। দূর দূর চা বাগানের পাতাগুলোও মলিন আলোর প্রতিফলনে মিহিয়ে গিয়েছে। আফরা নিজের লাগেজ নিয়ে রেখে দিলো গাড়ির পেছনের জায়গাটিতে। সময় ঘনিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ত্যাগ করার। যদিও ওর ফ্লাইট রাত তিনটায় তবুও ও মনস্থির করলো সময়টা সিলেট এয়ারপোর্টেই কাটাবে ও। এখানে আরও কিছুক্ষণ থাকলে ফারহানের স্মৃতি ওর দম বন্ধ করে ফেলবে। মিসেস নাবিলা আর মি. ইফাজ মন খারাপ করে আছেন। এই সময়গুলোতে আফরার সাথে খুব ভালো একটা সম্পর্ক হয়ে গিয়েছে উনাদের সবার। বিশেষ করে ইলার৷ সপই সুবাদে ইলা প্রচন্ড কান্নাকান্না চোখে আফরার দিকে তাকিয়ে আছে। রৌশিন আর মারুফও এসেছে বিদায় জানাতে ওকে। আফরা স্মিত হাসলো। ইলাকে বললো,

‘ মন খারাপ কেনো ইলারাণীর?’

‘ তোমায় মিস করবো আপু!’

‘ সেম টু ইউ। এত কিউট রাণীটাকে ছেড়ে অ্যামেরিকায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না তো!’

‘ তাহলে থেকে যাও না প্লিজ! ‘

আফরা হেসে বললো,

‘ সেটা কখনো সম্ভব না ইলা। ভালো থেকো। নিজের যত্ন নিও কেমন? রৌশিন, মারুফ তোমারাও ভালো থেকো! তোমাদেরও মিস করবো অনেক।’

‘ তুমি কি আর এখানে আসবে না আপু?’

চট করে বলে ফেললো রৌশিন। আফরা মাথা নাড়িয়ে বললো ‘না’। ফাহিম ডাকছে গাড়িতে বসার জন্য। ও আফরাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়ে আসবে। আফরা গাড়িতে ওঠার আগে একপলক ফারহানের অপেক্ষায় অন্যত্র তাকালো। আসেনি ফারহান। হয়তো আসবেও না। আফরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সবাইকে আরও একবার বিদায় জানিয়ে উঠে পড়লো গাড়িতে।
.
.
আপনগতিতে গাড়ি চলতে মগ্ন। সূর্য ঢলে যাওয়ার মতো অবস্থা। তার পূর্বেই আকাশে নেমে এসেছে অন্ধকার। ইঙ্গিত দিচ্ছে বর্ষণের। মৃদু বজ্রপাতের কড়াঘাতে পরিবেশটা নিতান্তই স্নিগ্ধ লাগছে। আফরা গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে সেগুলো পরখ করে নিলো। আজ ও সালোয়ার কামিজ পহেছে দ্বিতীয়বার, সবুজ রঙের। যাওয়ার আগে এতটুকু স্মৃতি নিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে জেগেছিলো ওর মনে। চেষ্টা করলো মন ভালো করার। তবে পারলোনা। অস্থির লাগছে ওর মন , মস্তিষ্ক সবকিছু। ফাহিম নীরবে ড্রাইভ করছিলো আফরার ভাবনা এড়িয়ে। ওর মনও আজ ভালো না। ফারহানকে এতবার বোঝানোর পরও ও এলো না দেখে অজান্তেই দুজনের ভাঙা কথনের জন্য মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ফাহিম এবার বললো,

‘ আফরা?’

‘ হুম!’

‘ পুরোনো স্মৃতি সব ভুলে নতুনভাবে সবকিছু শুরু করুন। আপনার এই চুপচাপ দিকটা ভালো লাগছে না আমার?’

‘ এখনও পছন্দ করেন আমায়?’

ফাহিম বিব্রত বোধ করলো এমন প্রশ্নে। আফরার কোনো ভাবান্তর নেই। মলিন হাসি টেনে বলে ওঠলো,

‘ রিল্যাক্স ফাহিম। আমায় নিয়ে এত ভাবতে হবেনা। আমি সামলাতে পারবো নিজেকে। তাছাড়াও এটা আমার পাওনা ছিলো। এভাবে একজনকে কষ্ট দিয়েছিলাম যে!’

আফরা ইঙ্গিতে বললো এরিকের কথা। হয়তো এটাকেই বলে রিভেন্জ অফ নেচার। এরিককে আফরা যতটা না কষ্ট দিয়েছিলো তার থেকে দ্বিগুণ কষ্ট পেয়েছে আফরা। চোখ বন্ধ করে সিটে গা এলিয়ে দিলো ও। বারবার স্মৃতির পাতায় ফারহানের প্রতিচ্ছবিই ভেসে আসছে। বাতাস ছুটে চলছে শো শো করে। সেই শব্দ নাড়িয়ে দিচ্ছে পুরো শ্রীমঙ্গল। এই সময়ে ভাগ্য হয়তো অন্যকিছুই চেয়েছিলো। চেয়েছিলো আফরার ধারনাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে। হঠাৎ ফাহিমের গাড়ির সামনে অন্য একগাড়ি ওভার টেক করাতে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেললো ফাহিম। সামনের সাদা গাড়িটা ঠিক ফাহিমের গাড়ির সামনে এসে থামলো। একটুর জন্যই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে বাঁচা গিয়েছে। নাহলে দুটো গাড়িই সরাসরি খাদে পড়তো। ফাহিম মাথা বের করে কপট রাগ দেখে কিছু বলতে যাবে তখন নেমপ্লেট দেখে থমকে গেলো সে। গাড়ি থেকে তখনই বেরিয়ে এলো ফারহান। আফরা স্তব্ধ হয়ে গেলো হঠাৎ। কেনা ফারহানের পরনে শার্ট অগোছালো, চুলগুলোও কোনোমতে সেঁটে আছে। ওপরের দুটো বোতাম খোলা থাকাতে দেখা যাচ্ছে দৃশ্যমান প্রশস্ত বুকের কিছু অংশ। অস্থির লাগছে ছেলেটাকে। ফারহান সময় বিলম্ব করলো না। গাড়ির দরজা খুলে সরসরি কোলে তুলে নিলো আফরাকে। আফরার জমানো অভিমান যেন এতে আরও প্রগাঢ় হয়ে গেলো। বললো,

‘ ছাড়ুন আমায়। এসব কি ধরনের অসভ্যতা কমরেড ফারহান?’

‘ আজ জীবনের প্রথম কিডন্যাপিং করার অভিঙ্গতা নিচ্ছি। তাই চুপ থাকুন।’

ফারহান এবার আফরাকে নিজের গাড়িতে বসিয়ে সিটবেল্ট বেঁধে দিলো। ফাহিমের কাছ থেকে আফরার ব্যাগ নিয়ে নিলো নিজের গাড়ির পেছনে। এতক্ষণ নির্বিকার ছিলো ফাহিম। কোনোরূপ কোনো কথা বললো না। মুখে ছিলো প্রশান্তির হাসি। অবশেষে ছেলেটার সুবুদ্ধি হয়েছে। আফরা কাতর কনঠে বললো,

‘ আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আপনি? লিভ মি। ফ্লাইট আছে আমার।’

‘ফ্লাইট আপনার রাত তিনটায়। তাই তিনটার আগে এ ব্যাপারে কোনো কথা বলবেন না। আপনার সাথে অনেক হিসাব নিকাশ করতে হবে আমার। তাই আর কয়েকঘন্টা এই কমরেডটাকে সহ্য করতে বাধ্য আপনি আফরা। আফটার অল আপনাকে হাতছাড়া করার মতো বোকামি আমি আর করবো না।’

আফরার সারা শরীরে শিহরণ বয়ে গেলো এমন কথায়। হৃদয়ের কম্পন টের পাচ্ছে খানিকটা। ফারহান আজ অন্যরকম, চোখের দৃষ্টি তার অন্যরকম। কে জানে কি করবে সে!
.
.#অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤️
#লেখিকা- কায়ানাত আফরিন
#পর্ব__৪৫
ঝিরিঝিরি বৃষ্টির জন্য সিক্ত হয়ে ওঠেছে সবকিছু। দূর দূর তাকালেই দেখা যাবে বৃষ্টির পানিকণা আর চা বাগানের অধুষ্যিত অঞ্চলে সবুজের সমারোহ৷ ফারহানের দৃষ্টি নিবদ্ধ পিচঢালাই পথে। কোনোরকম কোনো কথা না বলে গাড়ি এলোমেলো ভাবে ড্রাইভ করতে মগ্ন। আফরার চোখে মুখে চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। ফারহানের কীর্তিকলাপ সব ওর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে ছেলেটাকে এমন পাগলাটে পাগলাটে রূপে দেখে নিঃশ্বাসও আটকে আসছে বারবার। গুছিয়ে প্রশ্ন করার জন্য কিছুতেই স্থির করতে পারলো না আফরা নিজেকে। সন্ধ্যা নেমে যাওয়াতে আকাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছে পুরোটা। আফরা এবার দম নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

‘হ….হয়্যার উই আর গোয়িং ফারহান?’

আফরাকে স্পষ্ট বিচলিত দেখা যাচ্ছে। তাই গুছিয়ে বাংলাতেও কথা স্পষ্ট বলতে পারছে না৷ ফারহান তবুও প্রতিউত্তর দিলো না আফরার কথায়৷ গাড়ি থামালো একটা নির্জন ঘাটের সামনে। আফরা দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো বাহিরে৷ জনমানব কম। একে তো রাত তার ওপর বৃষ্টি থাকাতে ঘাটের সামনে নির্জন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়৷ ঢেউয়ের ধাক্কায় নড়ে ওঠছে অস্পষ্ট নৌকাগুলো৷ সেখানে একজনকে দেখে চমকে ওঠলো আফরা। মানুষটা আর কেউ নয়, ফারহানেরই বিশ্বস্ত লোক শামসু। ঘাটের এক প্রান্তে রেইন কোর্ট আর হাতে টর্চ লাইট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফারহানের গাড়ি থামা মাত্রই শামসু গাড়ির কাছে এগিয়ে আসলো। ফারহানকে বললো,

‘ আপনার কথামতো সব ব্যবস্থা করসি ভাই। কিন্ত এত রাতে আপনের নৌকা লাগবো ক্যান!’

‘ এত প্রশ্ন করার তো প্রয়োজন দেখছি না আমি শামসু!’

শামসু অসন্তুষ্ট হলো এ কথায়। অভিমানি সুরে বলে ওঠলো,

‘ আপনি বদলায়া গেসেন ভাই। আগে আমারে আর সাব্বিররে কোনো কিছু না বইলা আপনি একটা কামও করতেন না৷ আর এখন কোনো কিছুই বলতে চান না। তার ওপর এই প্রথম কাওরে এমনে তুইলা আনসেন আপনি৷ আর যা-ই কন ভাই, আপনার যে কখনও এমন দশা হবে তা আমি কল্পনাও করতে পারিনাই।’

ফারহান স্থিরভাবে গাড়ির ইন্জিন বন্ধ করে বললো,

‘ তোর কথা হয়েছে? তুই যেতে পারিস এখন।’

শামসু আর কিছু বললো না। অদ্ভুত প্রলাপ করতে করতে চলে গেলো স্থান ত্যাগ করে। আফরা এবার সম্পূর্ণ ঘুরে বসলে ফারহানের দিকে। বিচলিত কন্ঠে বললো,

‘ আপনি করছেন টা কি একটু বলবেন আমায়? এতদিন কোনে খবর ছিলো না হুট করে তুলে এই স্ট্রেঞ্জ প্লেসে নিয়ে আসলেন৷ আর ইউ গ’না ম্যাড মি. ফারহান। সে সামথিং! ‘

আফরা অতিষ্ঠ হয়ে যাছে। চাড়া দিয়ে ওঠেছে প্রবল অভিমান৷ ফারহানকে কিছুতেই মাফ করতে পারবে না আফরা। এতদিনের ক্ষোভ, অভিমান কিছুতেই আর যাই হোক, ভুলার মতো নয়। ফারহান তপ্তশ্বাস ছাড়লো। বলে ওঠলো,

‘ এটা রাতারগুল আফরা!’

আফরা শান্ত হয়ে গেলো। মনে পড়ে গেলো সেদিনকার কথা যদিন আফরা রাতারগুল আসার ইচ্ছে পোষণ করেছিলো৷ ফারহান আবার বললো,

‘ আমি, আমি কথা দিয়েছিলাম আপনাকে যে আপনাকে পুরো সিলেট ঘুরে দেখাবো। এর মধ্যেই রাতরগুল টাই বাকি ছিলো। তাই কথা না বাড়িয়ে এখানে নিয়ে এসেছি।’

‘ এজন্যই এতকিছু?’

আফরার সিক্ত কন্ঠ। ফারহান কথা বললো না। কেন যেন এড়িয়ে যেতে চাইলো প্রশ্নটা। তবুও বললো,

‘ আজ আরও একবার এখানকার বৃষ্টি উপভোগ করুন আফরা।’

বলেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো ফারহান। সেই সাথে আফরাও। বৃষ্টি ছুঁয়ে দিচ্ছে ওদের দেহ। ফারহান ঘাটের নৌকায় চড়ে বসলো। আফরাকেও বসালো নৌকাতে। নৌকা চালাবে ১৬-১৭ বছর বয়সী ছোট একটি ছেলে। এখানকার প্রত্যকেটা মানুষ কিছু পারুক আর না পারুক, নৌকা চালানো রপ্ত করেছে কিশোরকালেই। ছেলেটাও তার ব্যাতিক্রম নয়।
.
.
রাতের আকাশে নিরবিচ্ছিন্ন অন্ধকার। আশপাশে টুপটাপ শব্দ শোনা যাচ্ছে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির জন্য। চারিদিকে তাকালেই আঁধার আর জঙ্গল। কেননা রাতারগুল জায়গাটাই এমন। বর্ষাকালে ঘন গাছের আচ্ছাদনের মাঝে দিনে যতটা সুন্দর লাগে, রাতে ততটাই লাগে ভয়ঙ্কর। এখানে তাই এসময়ে সাপ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। নৌকা খুবই সন্তর্পণে এগিয়ে যেতে মগ্ন। তবুও আফরা যেন প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে। একহাত খামচে ধরে আছে ফারহানের। একেতো কেমন যেন অন্ধকার, তার ওপর গাছপালার বাহার। এত রাতে জায়গাটি অনন্য মায়াবী মনে হলেও কেন যেনো নিরাপদ নয়। নৌকা চালানো ছেলেটা এবার ফারহানকে বললো,

‘ আফনের ডর লাগেনা ফারহান ভাই? এই রাইতে আমরা জিন্দেগিতেও ওয়াচ টাওয়ারের ওদিক যাইতে সাহস পাইতাম না৷ আপনার লেগাই ডর পেটে গুইজ্জা যাইতেসি ওহানে৷ এখন যদি সাপে টাপে আইসা কামড় দিলো আফনাগো?’

আফরা ছেলেটার কথা বুঝতে কষ্ট হলেও মাথায় ধরতে সময় নিলো না। তাই আরও সিটিয়ে গেলো উদ্রেকে। শুকনো গলায় বললো,

‘ আমার……আমার রাতারগুলো যাওয়ার দরকার নেই ফারহান। আমায় এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিন। আমি….আমি চলে যেতে চাই!’

‘ আর একটা কথা বলবেন, তাহলে এখানেই ধাক্কা মেরে ফেলে দিবো। বলেছি না আর কয়েক ঘন্টা আমায় সহ্য করতেই হবে? আপনাকে এখানে আমার থেকে দূরে চলে যাওয়ার জন্য নিয়ে আসিনি৷ ‘

ফারহানের কথাগুলো জট পাকিয়ে দিচ্ছে আফরার মাথায়। আসলে মানুষটা কি করতে চাইতে কিছুই ওর মাথায় ঢুকছে না। আফরা চুপ করে বসে রইলো এবার। ও সবসময় এটাই চাইতো যে মানুষটা ওর ওপর নিজের কথা প্রয়োগ করুন। আফসোস সেই সময়টার সাথে ইচ্ছেটাও ফুরিয়ে গেছে। ভাবতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো আফরা।

নৌকাটা এবার ঠিক থামলো ওয়াচ-টাওয়ার এর সামনে। এতক্ষণ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হঠাৎ ঝুম বৃষ্টিতে রূপ নিয়েছে। প্রকৃতি যেন এতক্ষণ এটারই অপেক্ষা করছিলো যে কখন এই পায়রাজোড়া আসবে আর ছড়িয়ে দিবে প্রেমবর্ষণ। ফারহান এবার নৌকা থেকে নেমে গেলো। হাত বাড়ালো আফরার দিকে। মৃদু অন্ধকারে সুঠাম দেহের এই অবয়ব আফরাকে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো টানছে। সেই সাথে চাড়া দিয়ে ওঠেছে প্রবল অভিমান। আফরা হাত ধরলো না। ইঙ্গিত দিচ্ছে ওকে দ্রুত এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ফারহান জোরপূর্বক আফরার হাত টেনে উঠে দাঁড় করালো এবার। এতে আফরা ফারহানের সাথে মিশে যাওয়াতে আফরা যেন চরম অবাক। এই প্রথম নিজ থেকে ওকে কাছে টেনেছে ফারহান৷ মৃদু গলায় তাই আফরা বললো,

‘ আপনি কি আজ ড্রিংক করেছেন কমরেড? এসব আচরণ কিন্তু ভাবিয়ে তুলছে আমায়।’

ফারহান হাসলো। ফিসফিসিয়ে বলে ওঠলো,

‘ আপনার সৌন্দর্যে আমি অলরেডি ড্রাংকড আফরা। এই ক্রেজিনেস এই জনমে আমার কাটবে না।’

আড়ষ্ট কন্ঠে আফরার শরীরে আলাদা এক শিহরণ বয়ে গেলো ক্রমশ। ফারহান নির্বিকার। এদিকে বৃষ্টির গতি বাড়ছে। ফারহান তাই বলে ওঠলো,

‘ ওয়াচ-টাওয়ারে ওঠে রাতারগুলের নিশি রাতের সৌন্দর্য দেখবেন না আফরা?’

আফরা মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় মাথা নাড়ালো। বললো,

‘ দেখবে তো! হয়তো শেষবারের মতো দেখবো৷ আপনার সাথে!’
.
.
.
.
~চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here