অন্তরালে ভালবাসা পর্ব ১৭+১৮

#অন্তরালে_ভালবাসা
১৭
#প্রজ্ঞা_জামান_দৃঢ়তা_হঠাৎ_বৃষ্টি

আরিশার কাছে গিয়ে রাফিন বলে আমরাও অনেক প্রশ্নের উত্তর চাই দিতে পারবি তুই?

—পারবো,কি জানতে চাস বল?
—-রাফিন বলে আগে তোর প্রশ্নগুলো শুনি?
—-আরিশা বলে, ‘তুই আমাকে বিয়ের আসরে একা ফেলে চলে গিয়েছিলি কেনো?
—–রাফিনের চোখ মুখ কেমন একটা হয়ে গেলো, চোয়াল শক্ত করে বলে,’আমি চলে গেছি তাই বলে তুই আমারই বন্ধুকে বিয়ে করে নিবি?

—–আরিশা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,’তুই কি বুঝবি একটা মেয়ের বিয়ের দিন বর না আসার যন্ত্রনা কেমন, সমাজের কাছে সেই মেয়েটার কেমন নাজেহাল অবস্থা হয়। ছেলেদের ঘাড়ে তো কোনকালেই কোন দোষ পড়েনি।সব দোষ মেয়েদের।
পুরুষ জুয়া মদ খায়, আর তার ফলে মার খেয়ে পড়ে থাকতে হয় মেয়েদের।পুরুষ জুয়া খেলে সর্বোচ্চ হারায়,তার বিনিময়ে নারীর ভাগ্য জুটে অনাহার আর না খেতে পারার যন্ত্রনা। পুরুষ কাজ করতে চায় না,তার ফলে নারীদের ভাগ্যে জুটে দারিদ্র্যতা।পুরুষ যুদ্ধ করে মারা যায়,তার ফলে নারীকে সারাজীবনের মত সাদা শাড়ি পড়ে বাড়ি বাড়ি কাজ করে মানুষ করতে হয় সন্তানদের।
ঠিম তেমনি তুই বিয়ের আসরে আমাকে ফেলে চলে গেলি,আর তার ফলশ্রুতিতে আমাকে শুনতে হলো হাজারটা কথা।আমাকে সবাই বলে আমার নাকি খুঁত আছে তাই তুই আমাকে ছেড়ে গেছিস।তুই জানিস আমি কতটা অপমানিত হয়েছি?অবশ্যই জানবিই বা কিভাবে তুই তো পুরুষ তোর গায়ে তো আঁচড় ও পড়েনি,তুই এসব বুঝবি না।আরিশার চোখে মুখে যেনো আগুন ঝরছে ফর্সা গাল দুটোয় গোলাপী আভা কাজ করছে।

রাফিন আরিশার কাছে গিয়ে বলে,আমি সব ঠিক করে দিবো আরিশা,তুই আমাকে ক্ষমা করে দেয়?রাফিনের গলার স্বরে কিছু একটা ছিলো যা আগে আরিশা রাফিনের উপর রাগ করলে রাফিন এই সুরেই কথা বলে আরিশার মান ভাঙাতো।

আরিশার পুরনো কথা মনে হতেই কষ্ট হতে লাগলো, তাই সবাইকে এড়িয়ে ছুটে চলে গেলো তার রুমে।

অহিন শুধু এতোক্ষন নিরব দর্শকের মত চেয়ে দেখছিলো বন্ধুদের দিকে।সাজেদা বেগম কি যেনো বলতে চেয়েছিলেন রাফিনকে কিন্তু অহিন ইশারায় বারন করে দেয়। সাজেদা বেগম রাগ করে চলে যান সেখান থেকে।রাফিন অহিনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘যা অহিন ফ্রেশ হয়ে নেয়। সারারাত ঘুমাসনি মনে হয় চোখমুখ কেমন হয়ে আছে।অহিন কিছু একটা বলতে গেলেই রাফিন বলে এখন না দোস্ত পরে আগে ফ্রেশ হয়ে নেয় প্লিজ।

রাফিনের অনুরোধের কন্ঠ শুনে অহিন আর কিছু বলতে পারলো না।চলে গেলো তার ঘরে।রাফিন অহিনের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে হাসে এক রহস্যময়ী হাসি!

রাফিন চলে যায় নিজের রুমে,রাফিন এখানে আছে বাধ্য হয়ে সাজেদা বেগম অনুরোধ করেছেন তাই।রাফিনের বাবা বোন এর মধ্যে কয়েকবার এসে দেখা করে গেছে রাফিনের সাথে।রাফিনকে বাড়ি যেতে বলেছেন,’সাজেদা বেগমের অনুরোধ রাখার জন্য তিনি ছেলেকে রেখে যান।
আরিশা রুমে ঢুকে ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ার ছেড়ে তার নিচে বসে কাঁদতে থাকে।কেনো এমন হয় মানুষ চায় এক আর হয় আরেক। রাফিন সেদিন যদি চলে না যেতো আজ আরিশার মনে এতো দোটানা কাজ করতো না।সুখে শান্তিতে সংসার করতো সে।কিন্তু জানিনা এই কয়দিনে কি হয়ে গেলো আরিশার মনে কিসের যেনো অস্থিরতা তৈরি হলো, যা অস্পষ্ট তার কাছে।
অহিন রুমে এসে আরিশাকে না পেয়ে ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ পেয়ে আরিশাকে ডাকে,’আরু এই আরু,আরু,প্লিজ দরজা খোল,আরু, এই আরু?
অহিন জোরে ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়,দরজাটার ছিটকিনি মনে হয় দাড় করানো ছিলো।

অহিন ভেতরে ঢুকে দেখে আরিশা শাওয়ারের নিচে বসে কান্না করছে। আরিশা হাঁটু বুকের সাথে জড়িয়ে বসে কান্না করছে,অহিন নিজেও শাওয়ারের নিচে বসে যায়, আরিশার দুই কাঁধে হাত দিয়ে ঝাকড়া দিয়ে বলে,’এই আরু তোর কি হয়েছে?
তুই কাঁদতেছিস কেনো? আজ তোর সুখের দিন তুই কোথায় খুশী হবি তা না, তুই কাঁদছিস!সত্যি করে বল তোর কি হয়েছে?অহিন আবার ঝাকুনি দিয়ে বলে।শাওয়ারের পানি পড়তে আছে,আরিশার কপালের সামনে কিছু চুল লেপ্টে ধরে আছে।আরিশার কান্নার গতি কমে আসছে,আরিশা মিটমিট চোখে তাকিয়ে আছে অহিনের দিকে,মনে হচ্ছে আরিশা নিজে কি করছে সেটা সে নিজেই জানে না।এতোক্ষনে অহিন খেয়াল করলো আরিশার পরনে ব্লাউজ আর পেটিকোট শুধু, শাড়িটা পাশে খোলা অবস্থায় পড়ে আছে।অহিনের কিছুটা অস্বস্তি হতে লাগলো আর কিছুটা লজ্জা।

আরিশাকে দেখে মনে হচ্ছে সে হুসে নেই,তাই অহিন বলে আমি টাওয়াল দিচ্ছি তুই চেঞ্জ করে আয়।আরিশা চুপ করে ঠায় বসে থাকে।কিছু বলেও না, বসা থেকে উঠে ও না।অহিন বুঝে যায় আরিশা উঠবে না।
তাই অহিন দুহাতে ধরে আরিশাকে দাড় করিয়ে দেয়,এতোক্ষনে অহিন নিজেও ভিজে যায়,মাথা বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে।দাড়িয়ে যেয়ে আরিশা বুজতে পারলো তার শরীর অনাবৃত, তাই এবার তার চোখে মুখে লজ্জা নেমে এলো। অহিন আরিশার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,’এই নেয় টাওয়াল?তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে আয়।
অহিন চলে আসতে নিলে আরিশা বলে আমি চেঞ্জ করবো না।আরিশার কন্ঠে মনে হলো মাদকতা মিশে ছিলো, অহিনের প্রতিটি শিরা উপশিরায় এক শীতল স্রোত বেয়ে নামলো।আরিশার এহেন কাজের কোন অর্থ খুজে পায় না অহিন,অবাক চোখে তাকায় আরিশার দিকে, তার অনাবৃত ফর্সা ভেজা শরীর যেনো এবার অহিনের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠে। অহিন একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।মনে মনে ভাবে আর কত জ্বালাবি তুই আরু,তুই সবসময় আমার ধৈর্যের পরিক্ষা নিতে থাকিস!তোর কি একটু ও ভয় করে না,আমি কোন সাধু সন্ন্যাসী নই যে নিজেকে সবসময় দমিয়ে রাখবো! কিন্তু তুই সবসময় আমার সামনে এক একটা কান্ড করিস যে নিজেকে মানাতে আমার তপস্যা করতে হয়। আর তোর কাছে আমার সাধু সন্ন্যাসী হয়ে থাকতে হয়।আরিশার চোখের জল হয়তো তখনও পড়ছিলো কিন্তু ঝরনার পানিতে তা ধুয়ে গেলো, কিন্তু একটু পর পর আরিশার হেচকি উঠায় এটা স্পষ্ট যে আরিশা তখনও কাঁদছে।
অহিন আর কিছু না ভেবে টাওয়াল দিয়ে আরিশার চুল মুছে দিতে থাকে, আরিশার মুখ মুছে দেয়,শাওয়ারের টেপ বন্ধ করে দেয়।আরিশার হাতে একটা শাড়ি দিয়ে বলে তাড়াতাড়ি পরে বেরিয়ে আয়, এই কথা বলে অহিন বের হয়ে আসে,তার মনে প্রানে এক আগুন তাকে দগ্ধ করছে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত!

———————————————————————————-

আরিশা দাড়িয়ে আছে বাসার ছাদে,আজ আরিশার রুমে ঘুমায়নি অহিন,রাফিন চলে এসেছে এখন স্বামী স্ত্রী খেলা খেলে কি লাভ, তাই অহিন বলেছে আজ থেকে আলাদা রুমে থাকবে তারা।রাত ১২টা আরিশার ঘুম আসছিলো না।তাই সে ছাদে উঠে আসে,চারদিকে সুনসান নিরবতা! ল্যাম্পপোষ্টের হলুদ আলো সেজেছে রাতের শহর, গভীর রাতের চাঁদটা দেখতে খুব সুন্দর লাগে।ঝলমলে তারাগুলো যেনো মিটিমিটিয়ে হাসছে আরিশার দিকে তাকিয়ে,কিন্তু আজ আরিশার মন খুব খারাপ তাই আকশের সুন্দর চাঁদটাও তার কাছে ভালো লাগছে না।
তার এখন সবচেয়ে খুশী হওয়ার কথা কিন্তু সে কেনো খুশী হতে পারছে না,এসব ভাবনায় তার মাথা ফেটে যেতে চাচ্ছে।
হঠাৎ কারো স্পর্শ পেয়ে আরিশা চমকে উঠে, কেউ আরিশার দুচোখ চেপে ধরে আছে।আরিশা বলে,প্লিজ অহিন ছাড় আমাকে।বলার সাথে সাথেই সেই আগুন্তুক চোখ ছেড়ে দেয়।আরিশা বুঝতে পারে এ অহিন নয় রাফিন।আরিশা বলে ওহ রাফিন তুই?

—-রাফিন গম্ভীর স্বরে বলে,তুই কি অন্যকাউকে আশা করছিলি?
—– রাফিনের স্বর আরিশার কাছে কেমন একটা ঠেকলো।আরিশা একটু দূরে সরে দাড়ালো।
——-আরিশা বলে,’ঘুমাসনি?
—– তুই আমার চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছিস আরিশা,কত রাত ঘুমাইনি জানিস তুই?রাফিন কথা বলতে বলতে আরিশার একদম কাছে চলে আসে।আরিশার মুখ রাফিন দুহাতে আজলা করে ধরে আরিশার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,’আমি ঘুমাতে চাই আরিশা শান্তির ঘুম ঘুমাতে চাই তোর বুকে।আমাকে ঘুমাতে দিবি তোর বুকে।এতো গুলো নিদ্রাহীন রাতের সব ঘুম আমি সুধে আসলে উসুল করতে চাই।রাফিনের নিঃশ্বাস আরিশার মুখে পড়ছে,এই মুহুর্তে আরিশার উচিত একজন বাধ্য প্রেমিকার মত রাফিনের বুকে ঝাপিয়ে পড়া, অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে আরিশার মন সায় দিচ্ছে না।কোন এক জড়তা এসে ঝেকে বসেছে আরিশার মনে।আরিশার কেমন যেনো অস্বস্তি হচ্ছে।

—–রাফিন বলে, তুই জানিস আরিশা তোকে ছেড়ে থাকতে আমার কতটা কষ্ট হয়েছে,আমি জানি তুই আমার উপর অভিমান করে আছিস।আমি চাইলেও তোর জীবনে ঘটে যাওয়া অতীতটাকে পাল্টাতে পারবো না।কিন্তু বিশ্বাস কর আমি তোকে আমার ভালবাসা দিয়ে সব ভুলিয়ে দিবো। তোকে একটা সুখের দুনিয়া উপহার দিবো।আমি শুধু তোর ভালবাসা চাই আরিশা।
আরিশা চাচ্ছে রাফিনের আকুলতা দেখে কিছু একটা বলতে কিন্তু তার মুখ দিয়ে যেনো কোন স্বরই বের হচ্ছে না।রাফিন আরিশাকে জড়িয়ে ধরে। আরিশা দুহাত আলগা করে দাড়িয়ে থাকে।কোন এক বাধা তাকে রাফিনকে জড়িয়ে ধরতে দিচ্ছে না।এতোদিন সে এই মুহুর্তগুলোর অপেক্ষা করে এসেছে,অথচ আজ সব তার সামনে হচ্ছে কিন্তু তার মন সাত দিচ্ছে না!এমনও হতে পারে?

অন্যদিকে ছাদের দরজার সামনে দুটো চোখ তাকিয়ে আছে আরিশা রাফিনের দিকে।সে আর কেউ না অহিন!আরিশাকে রুমে না দেখে খুজতে খুজতে ছাদে এসেছে, আর এখানে এসে দেখছে দুজন ভালবাসার মানুষ একে অন্যকে ভালবাসায় আবদ্ধ করে আছে।না চাইতেইও অহিনের দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ে।এটাতো হওয়ারই ছিলো তারপর ও কেনো সে মেনে নিতে পারছে না!এতোটা কষ্ট কেনো হচ্ছে?
ভালবাসার ভাগ কাউকে দেয়া যায় না, সেই জন্যই কি?কি জানি! হয়তো হ্যাঁ! নয়তো না!
#অন্তরালে_ভালবাসা
১৮
#প্রজ্ঞা_জামান_দৃঢ়তা

রাফিনের বাবা এসেছেন আজ অহিনদের বাড়ি, রাফিন আর আরিশার বিয়ের বিষয়ে কথা বলবে বলে,এদিকে আরিশার বাবা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আরিশা যদি অহিনকে ছেড়ে রাফিনকে বিয়ে করে তাহলে তিনি আরিশাকে মেয়ে বলে স্বীকার করবেন না।যে ছেলে বিয়ের দিন একটা মেয়েকে ফেলে চলে যেতে পারে সে আর যাই হোক ভালো স্বামী কখনও হতেই পারে না।তাই আরিশার বাবা আশরাফ আহম্মদ জানান আরিশা যদি এমন ভুল কাজ করে তাহলে, আরিশা যেনো ভুলে যায় তার পরিবার আছে মা বাবা আছে।আরিশা একমাত্র মেয়ে হওয়ায় আরিশাকে সবসময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশী ভালবাসা দিয়েছে তার পরিবার।তাই আরিশা জীবনে কোন ভুল করুক তা কেউই চায় না।

রাফিনের বাবা শফিক রহমান, সাজেদা বেগম, অহিন, রাফিন বসে আছে অহিনদের বাড়ির ড্রয়িং রুমে। আলোচনার মূখ্য বিষয় বিয়ে,আরিশা আর রাফিনে।অহিন বলে,’আমি সবকিছুর আয়োজন করবো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের বিয়েটা আপনারা দিয়ে দেন।আরিশার বাবা আরিশাকে অনেক ভালবসে তিনি ঠিক আসবেন, রাগ করে থাকতেই পারেন না তিনি।শফিক সাহেব বলেন,’তোমার কথাই যেনো সত্যি হয়।ওরা অনেক ভালো থাকবে এর বেশী আমার কিছুই চাওয়ার নেই।অহিন খেয়াল করলো তার মা কেমন যেনো চুপচাপ হয়ে আছে,একদম কিছুই বলছেন না।অহিন ভয় পেয়েছিলো যদি তার মা আরিশা আর রাফিনের বিয়ের কথা শুনে চুড়ান্ত রকমের রাগ করবেন।কিন্তু অহিনকে অবাক করে দিয়ে তিনি কিছুই বলছেন না।রাগ ও দেখাচ্ছেন না।বিষয়টা একটু বেশীই সহজ বলে মনে হচ্ছে।

আসলেই সবটা এতো সহজ?নাকি এর ভেতরে আরও চরম কোন সত্যি লুকিয়ে আছে যা সবার ভাবনার বাইরে?
প্রশ্ন রয়েই যায়?

—– অহিন বলে, ‘রাফিন কবে বিয়ে করতে চাস বল?আই মিন ডেট কবে ফিক্সড করবো?

—– রাফিন,’কিছুক্ষন শান্ত দৃষ্টি দিয়ে অহিনের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে বলে,’তুই যেদিন বলবি সেদিন অহিন।

——আমি কি চাইবো রাফিন,বিয়ে তোর তুই যেদিন বলবি সেদিনই হবে।

—–রাফিন বলে আমি আরিশার সাথে কথা বলে দেখি।

—-আরিশাকে ডাকা হলে, আরিশা এসে চুপচাপ বসে অহিনের পাশে,এই বিষয়টা কারো নজর এড়ায়নি যে আরিশা রাফিনের পাশে না বসে অহিনের কাছে বসেছে।আরিশা সাজেদা বেগমকে বলে,’আমাকে কেনো ডেকেছো আন্টি?

——অহিন উত্তর দেয়,তোর আর রাফিনের বিয়ের দিন ফিক্সড করছি আমরা,তুই কি চাস কবে ডেট ফিক্সড করলে ভালো হয়?

———আরিশা কিছুক্ষণ ভাবে সে কি বলবে এই মুহুর্তে। কাল রাতে রাফিন যেভাবে তার কাছে ভুল স্বীকার করেছে তাতে সত্যি কিছু বলার থাকে না।তাছাড়া আরিশার আর রাফিনের সম্পর্ক অনেক দিনের তাই এখন সবাই সেটাই চাইছে, রাফিন আর আরিশা দুজনে প্রথম দিকে যা চেয়েছিলো।তারপর ও আরিশার মনে কিসের যেনো একটা দোটানা কাজ করছে,তার তো এখন বলা উচিত খুব কাছের ডেটে তাদের বিয়ে দেয়ার জন্য,কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কোন এক বাধা আরিশাকে তা বলতে দিচ্ছে না।সেটা কেনো আরিশার কাছে আজও স্পষ্ট! আরিশার অস্থির লাগে এসব ভাবতে গেলে তাই আরিশা ঝামেলা এড়াতে বলে,’তোমরা যেদিন ঠিক করবে সেদিন।কথাটি বলেই আরিশা উঠে চলে যায়।

——-আরিশার কথাটা শুনে অহিনের বুকের ভেতরটায় কেমন একটা ব্যাথা বারবার খোচা দিচ্ছে।অহিন জানে আরিশা রাফিনকে ভালবাসে তাদের বিয়ে হবে এটাও খুব স্বাভাবিক বিষয়, তারপর ও আরিশার এই কথাটি যেনো অহিনের পুরো পৃথিবোটাকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। মনে হয় সময় যেনো থমকে গেছে।

——আরিশা উঠে চলে গেছে এই বিষয়টা রাফিনের কাছে সহজ মনে হয় না।কেমন যেনো একটা লাগে!

—–রাফিন কিছু একটা ভেবে বলে আমি আরিশার সাথে কথা বলে নেই আগে,এক মাস পর বিয়ের ডেট ফিক্সড কর অহিন।

—–রাফিনের কথা মন আগামী মাসের ২০তারিখে রাফিন, আরিশার বিয়ের দিন ফিক্সড হয়।
রাফিন বাড়ি চলে যাবে বলে ঠিক করে।কারণ বিয়ের আগে বর বউ এক বাড়ি থাকবে বিষয়টাও যেনো কেমন। মানুষ ভালো চোখে নিবে না।সাজেদা বেগম ও এই কথার সাথে একমত হোন।
ঠিক হয় আরিশা এই বাড়িতেই থাকবে,যেহেতু আরিশার বাবা এই বিয়ে মেনে নিবেন না সেহেতু এই বাড়িই হবে কনে বাড়ি। এই বাড়ি থেকেই কনে বিদায় হবে।

অহিন ও একমত হয়।শফিক রহমান ও একমত হয় এই বিষয়ে।
রাফিন চলে যাওয়ার আগে আরিশার সাথে দেখা করতে যায়,আরিশা তখন তার রুমের বারান্দায় হেলান দিয়ে আকাশপানে তাকিয়ে আছে,রাফিন আরিশাকে আলতো করে ডাকে আরিশা”এই আরিশা”

——আরিশা পেছনে না তাকিয়ে বলে,’বল রাফিন কি বলবি?
—-আমি চলে যাচ্ছি আমাদের বাসায়,তোকে একেবারে বউ করে নিয়ে যাবো তাই।

—-আরিশা চুপ।
—–আমাদের এতোদিনের সম্পর্ক স্বপ্ন সব পূর্নতা পেতে চলেছে আরিশা,তুই দেখিস আমরা অনেক ভালো থাকবো।হ্যাপিয়েস্ট কাপল হবো আমরা,রাফিনের চোখে মুখে খুশীর ঝলক দেখা যাচ্ছে।

——আরিশা বলে, কেনো তুই সেদিন চলে গয়েছিলি রাফিন?কেনো আমায় এতো কঠিন মুহুর্তে ফেকে গেলি?অহিনের বউ হতে বাধ্য করলি?
এখন সমাজের মানুষ আমাকে কি বলবে?তারা বলবে আমি খুব খারাপ আর বাজে একটা মেয়ে,যে কি না প্রথমে এক বন্ধুকে বিয়ে করেছে,পরে অন্যজনকে করেছে।তারা আমাকে কি উপাধি দিবে বল রাফিন?

——-রাফিনের এসব প্রশ্নের জবাবে আসলে কিছুই বলার থাকে না।আরিশা যা বলছে তার একটি কথাও মিথ্যে নয়।সত্যি তো আমাদের সমাজ বড্ড খারাপ। এখানে নারীদের ছোট একটা দ্রব্য মনে করে,কিছু না জেনেই তাদের সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করে।
রাফিন, ‘বলে তুই চিন্তা করিস না আরিশা,আমি কোনদিন তোকে এমন কোন পরিস্থিতিতে পড়তে দিবো না,যেখানে তোকে ছোট হতে হয়।আমি সবসময় তোর ভালো চেয়ে এসেছি, আর আজও তাই চাই।আমি তোকে সর্বোচ্চ সুখী করবো এই আমি তোকে কথা দিলাম।রাফিন আরিশা রেলিংয়ের উপর রাখা হাতের উপর নিজের হাত দিয়ে আরিশার দিকে তাকিয়ে অভয় দেয় আরিশাকে।

রাফিন চলে যেতে নিলে,আরিশা বলে,তুই কিন্তু আমাকে এখনও বললি না,তুই সেদিন কেনো চলে গিয়েছিলি?

রাফিনের মুখটায় মুহুর্তে রাজ্যের বিষন্নতা নেমে আসে।
রাফিন নরম হেসে, বলে জানাবো সব জানাবো, তবে এখন নয় আমাদের বিয়ের দিন।তুই সব জানবি।

রাফিন চলে গেলে আরিশা চুপচাপ অনেক কিছু ভাবে সে মনে করছে বিয়ের পর হয়তো তার মনের এই দোটানা চলে যাবে।আচ্ছা অহিন কি কখনও তাদের বিয়েটাকে সিরিয়াসলি নিয়েছে?কখনও আমাকে তার বউ ভেবেছে?আমি কি কখনও অহিনের মনে বউ নামক শব্দটার জায়গা নিতে পেরেছি?এসব ভাবতে ভাবেতেই দিন যায় আরিশার।

অন্যদিকে অহিন রাফিন চলে যাওয়ার পর, মায়ের কাছে যায়।সাজেদা বেগম অহিনকে দেখে বলে কি চাই আমার রুমে?
—–অহিন সোজা গিয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে,বলে’,মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও,অনেকদিন তুমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও না।

—–সাজেদা বেগম কাঠ কাঠ গলায় বলেন,’তুই যা আমার সামনে থেকে।তোর মত এতো দয়ালু ছেলের আমার দরকার নাই।যে কি না নিজের বিয়ে করা বউকে অন্যের হাতে তুলে দেয়।সাজেদা বেগম আঁচলে মুখ লুকায়।

——কজন এমন পারে মা?তোমার ছেলে এমন একটা কাজ করছে তার কত সাহস বলোতো? যে কি না,তার প্রথম ভালবাসার মানুষকে বউ হিসেবে পেয়েও তার উপর কোন জোর খাটায়নি।সবসময় সম্মান করে গেছে।আরিশার ভালবসা পাওয়ার জন্য তাকে হেল্প করেছে।তাহলে তুমি কেনো কাঁদছো মা?

—– তোর মত এতো সাহসী ছেলে যেনো কারো না হয়।যে কি না অনায়াসে নিজের ভালবাসা বিলিয়ে দেয়।আমি চাইনা আমার ছেলে এতো ভালো হোক।আমি চাই না,চাই না আমি।সাজেদা বেগম রাগী স্বরে বলে।

—-অহিন বলে,’মা জোর করে কাউকে আটকে রাখার নাম ভালবাসা না,ভালবাসার মানুষের ভালো থাকাই ভালবাসা,প্রতিটি মানুষের উচিত ভালবাসার আগে ত্যাগ করতে শেখা।যে যত ত্যাগ করতে পারে তার কাছে ভালবাসা ততই মধুর হয়।ভালবাসা কোন পন্য নয় যে, আমি চাইলেই আরিশা আমাকে দিয়ে দেবে,আরিশার মনে যদি আমার জন্য ভালবাসা না থাকে তাহলে কেনো আমি তাকে ধরে রাখবো মা?বাঙালি মেয়েরা সবসময় মানিয়ে নিতে খুব দক্ষ হয়ে থাকে,তারা সময়ের সাথে সাথে মনের মাঝে কাউকে ভালবেসে,পরিবারের কথা ভেবে অন্যএকজনকে বিয়ে করে সুখী থাকার অভিনয় করে,প্রকৃত অর্থে তারা কি আদৌ সুখে থাকে?যার সাথে প্রতিটি দিন প্রতিটি রাত কাটায়,সে কি ভালবাসা নাকি অভ্যস্ততা! তুমি খোঁজ নিয়ে দেখো অধিকাংশ মেয়েই ভাল না বেসে শুধু মানিয়ে নেয়।আর মনের গোপনে রেখে দেয় সেই ভালবাসার মানুষকে।কিন্তু আমি তা কোনদিনই কেউ জানতে পারে না।আমি কারো ভালবাসা জোর করে আদায় করতে শিখি নি,সে শিক্ষা তুমি আমাকে দাও নি।বাবা যদি বেঁচে থাকতেন তিনি ও হয়তো এটাই চাইতেন মা।

—–সাজেদা বেগম বেগম বলেন,একসাথে থাকতে থাকতে ভালবাসা হয়ে যায় বাবা,আর আমি কুয়াকাটা থেকে ফেরার পর আরিশার চোখে তোর জন্য ভালবাসা দেখেছি তুই প্লিজ আরিশাকে রাফিনের হতে দিস না।

—–মা আরু যদি আমাকে ভালবাসতো তাহলে আমি নিশ্চয়ই আরুকে নিজের করে রাখতাম,এতে যদি পুরো পৃথিবীর সাথে আমার যুদ্ধ করতে হয় তাহলে ও।কিন্তু আমি এখন তা করতে পারি না,কারণ আরু শুধু রাফিনের,আমার না মা।তাই আমি চাইবো তুমি মন থেকে আমার আরুর জন্য দোয়া করো, ওহহো আমার নয় রাফিনের আরিশার জন্য।
সাজেদা বেগমের কোল ভেসে যাচ্ছে অহিনের চোখের জলে।এই চোখের জলই এবার থেকে অহিনের দিন রাতের সঙ্গী। এতেই অভ্যস্ত অহিন!

ভালবাসাতে পুড়ে পুড়ে খাটি হয় পোড়ামন। জ্বলে যাক হৃদয়, পুড়ে যাক মন,শুধু মনের গভীরে থেকে যাক প্রেম”!

চলবে,,,,
চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here