অন্তরিক্ষ প্রণয় পর্ব -০১

–ইশ! কতোটা পুড়ে গেলো। ফোস্কা না পড়লেই হয় হাতে। উফ প্রণয়ি! তুমি একটু দেখে চা ঢালবে না! কতোটা পুড়ে গেছে দেখলে! লাল হয়ে গেছে পুরোটা।

প্রিয়তার হাতে বরফ লাগাতে লাগাতে আকাশ বলে এগুলো। এর বিনিময়ে প্রিয়তা অশ্রুসিক্ত চোখে খিলখিল করে হাসে বলে,

–পুড়ে গেলে তুমি আছো না! তোমার ভালোবাসা আমাকে সারিয়ে তুলবে। তোমার ভালোবাসার জন্য হাত পুড়ে যাওয়াটাও কোনো কষ্টের না। শুধু তুমি সবসময় আমার সাথে থাকবে! পাশে থাকবে আমার। কোনোদিনও ছেড়ে যাবে না কিন্তু! তাহলে আমি মরে যাবো বা পাগল হয়ে যাবো। কথা দাও আমাকে!

আকাশ নিজের ওষ্ঠদ্বয় দিয়ে তার প্রণয়ির কপালে প্রণয়ের স্পর্শ দিয়ে বলে,
–যাবো না কখনো। ছাড়বো না তোমাকে। সবসময় আগলে রাখব নিজের হৃদ মাঝারে। সারাজীবন তোমার সাথে থাকবো। কথা দিলামা প্রণয়ি।

আকাশ কথা দিলে প্রিয়তা আবারে খিলখিল করে হেসে উঠে। যা দেখে আকাশ প্রিয়তার পুড়ে যাওয়া হাতে চুমু দিয়ে বলে,
–পাগলি একটা!
_______________________________________________

কথাগুলো মস্তিষ্কে এসে ধাক্কা দিলে নিজের দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠে প্রিয়তা। এরপর মাটি থেকে নিজের পুতুলটা তুলে নিয়ে দৌড় দেয় কোনো এক দিকে আর বলতে থাকে,

–সব মিথ্যে! সব সব সব মিথ্যে। কেউ ভালোবাসে না আমাকে। কেউ না! সবাই প্রতারক। সবাই মিথ্যেবাদী। সবাই ঠকায়। থাকবো না আমি এখানে। চলে যাবো সবার থেকে দূরে।

এগুলো চিৎকার করে কান্না করে বলছে প্রিয়তা। প্রিয়তার পিছন পিছন নার্সরা ছুটছে। মেয়েটা বেশি হাইপার হয়ে গেলে নিজের ক্ষতি করতে চায় আর তখন ওকে ঘুমের ইনজেকশন দিতে হয়।

★★প্রিয়তা একজন মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী। আজ তিন বছর ধরে সে পাবনা মানসিক হাসপাতালে আছে। বয়স বেশি হবে না। প্যাশেন্ট হিস্ট্রিতে এখন ওর বয়স ২৫ বছর। বড় ধরনের মানসিক আঘাত পেয়ে সে মানসিক ভারসাম্য হারায়।

তিন বছর আগে,,
পাবনা মেডিকেল কলেজের এক ছাত্র প্রিয়তাকে এক বাস স্ট্যান্ডে পায়। সেখানে ওকে কিছু বাজে লোক হেনস্থা করছিল তখন প্রিয়তাকে। মানসিকভাবে অসুস্থ প্রিয়তা তখন নিজেকে বাঁচানোর জন্য হাত দিয়ে বাজে লোক গুলোকে দূরে যেতে বলছিল আর কান্না করছিল। আশেপাশের পথচারীরা কেউ দেখেও এগিয়ে আসেনা কারন তারা তিন-চার দিন ধরে মেয়েটাকে রাস্তায় পরে থাকতে দেখছে আর দোকান থেকে খাবার চুরি করে খেতে দেখেছে। দোকান থেকে খাবার চুরি করে খাওয়ার দায়ে ওকে দোকানি ধাওয়া করেছে পর্যন্ত।

“অভুক্ত কেউ যদি ক্ষিদের জ্বালায় চুরি করে তো এতো দোষ অভুক্ত চোরের না। দোষ এই সমাজের। অতিরিক্ত কষ্ট বা ক্ষুদা না লাগলে তো কেউ চুরি করেনা। তবে হ্যাঁ! কিছু মানুষ আছে যাদের চুরি করা স্বভাব। চুরির স্বভাবের কারনে তারা শত উত্তম-মাধ্যম খেয়েও সেই পথ থেকে ফিরে না।”

পাবনা মেডিকেলের তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নিয়ন। তৃতীয় বর্ষের একটা ট্রাম পরিক্ষা দিয়ে ঢাকা গিয়েছিল। গাবতলি বাসস্টপ থেকে পাবনা যাওয়ার জন্য বাসে উঠবে তাই টিকিট কাটতে সময়ের আগে এসেছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে রাত ৮.৩০ তে পাবনা যাবার বাস ছাড়বে আর গাবতলি আসতে কম করে হলেও তিন ঘন্টা লাগবে। সন্ধ্যা ৬ টায় গাবতলি স্টেশনে এসে টিকিট কাটবে তখন নিয়নের নজর অদূরে উষ্কখুষ্ক চুলের মেয়ের উপর। মেয়েটিকে দুই-তিনটা ছেলে ডিস্টার্ব করছিল আর মেয়েটা বারবার ওদের হাত থেকে বাঁচার জন্য দূরে যাচ্ছে।

পোশাক দেখে নিয়নের কাছে মেয়েটিকে ভালো ঘরের মনে হয় তাই সে সেদিকে এগিয়ে যায়। কাছে গেলে শুনতে পায় লোক গুলো বলছে,

–কি সুন্দরী? আমাদের আজ সুযোগ দেও! রাস্তায় আর কদিন থাকবা? আমাদের সাথে চলো, রানীর হালে রাখবো। খাবারের জন্য চুরি করতে হবে না। কেউ মারবেও না। আদরে ভরিয়ে রাখবো তোমাকে। যাবে নাকি আমাদের সাথে? চলো সুন্দরী!

এগুলো বলছে আর গায়ে হাত দিচ্ছিলো। মানসিক ভাবে অসুস্থ হলেও প্রিয়তার তখন পুরুষ মানুষের প্রতি বিশ্বাস উঠে গেছে বলতে। তারউপর যদি বারবার শরীরে হাত দিয়ে কথা বলে তো বিশ্বাস কাস্মিনকালেও আসবে না।
নিয়নের এসব দেখে রাগ উঠে বিধায় সে সবাইকে চিল্লিয়ে লোক জড়ো করে। তিন মানুষরূপী জানোয়ার তখন সটকে পরতে নিয়েও পারেনি।

বাস স্ট্যান্ড যেহেতু তাই ওসময় অনেক দূরপাল্লার বাসের যাত্রী ছিল। এতো মানুষ দেখে প্রিয়তার মনে তখন ভয় ধরে যায় তাই সে ভীত হরিণির মতো কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ভয়ে, এই বুঝি ওকে আবার মারলো! নিয়ন তখনো বুঝেনি যে মেয়েটা মানসিক ভারসাম্যহীন।

সকলের উদ্দেশ্যে নিয়ন বখাটে তিনজনের কাজ গুলো বলার পর বখাটে গুলোকে কয়েকটা মার দিলে তারা পালিয়ে যায়। নিয়ন প্রিয়তার কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু প্রিয়তা একটা কথাও বলেনি আর বারবার দূরে সরে যাচ্ছে।

আস্তে আস্তে ভীর কমে গেলে নিয়ন কাছের এক দোকান থেকে রুটি ও কলা কিনে আনে প্রিয়তার জন্য। চোখ-মুখ শুকিয়ে আছে প্রিয়তার। নিয়ন তখনো মেয়েটার নাম জানে না। তাই নিয়ন প্রিয়তাকে খাবার এনে বলে,

–এই নিন মিস, খাবার গুলো খেয়ে নিন। চোখ-মুখ শুকিয়ে আছে আপনার।

প্রিয়তা খাবার দেখে খপ করে নিয়ে নেয় আর খেতে থাকে। নিয়নের মায়া হয় এটা দেখে। তখন নিয়নের ফোনে তার ব্যাচমেট তাসফিয়া রাত্রির কল আসে। রাত্রিও নিয়নের সাথে যাবে। রাত্রি বাসস্টপে এসে নিয়নকে না পেয়েই কল করে। নিয়ন কোথায় আছে সেটা নিয়ন রাত্রিকে বলে তারপর রাত্রি সেখানে আসে।

রাত্রি এলে নিয়ন পুরো ঘটনাটা বলে। রাত্রি তখন প্রিয়তার কাছে গিয়ে বসে। তারপর খাওয়ারত প্রিয়তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

–তোমার নাম কি আপু? কোথায় থাকো?

প্রিয়তা মুখে খাবার নিয়েই হাসি দেয় তারপর আবার খেতে থাকে। রাত্রি নিয়নের দিকে তাকায়। রাত্রি নিয়নের কাছে গিয়ে বলে,

–নিয়ন শোন, মেয়েটাকে দেখে সুস্থ মনে হচ্ছে না। কোনো সুস্থ মেয়ে এমন করবে না। তুই যে বললি তখন, মেয়েটা আত্নরক্ষার জন্য কান্না করছিল আর হাত দিয়ে দূরে যেতে বলছিল। মেয়েটা মনে হয় কথা বলতে পারে না। আর কথা বলতে না পারলেও ইশারাতে তো বলবে! মানসিক সমস্যা আছে মনে হয়।

রাত্রির বলাতে নিয়নও ভাবে এটাই। রাত্রি দেখে মেয়েটার খাওয়া শেষ তাই সে প্রিয়তাকে পানি দেয় আর ইশারায় জিজ্ঞাসা করে,

–কি হয়েছে?

রাত্রিকে দেখে প্রিয়তা পানি খায় তারপর কান্না করে দেয়। কান্না দেকে রাত্রির খারাপ লাগে তাই সে প্রিয়তাকে জড়িয়ে নেয়। কিছুক্ষণ কান্না করার পর যখন প্রিয়তা ফুপাচ্ছে তখন আবারো রাত্রি ওর নাম জিজ্ঞাস করলে প্রিয়তা মাটিতে দাগ কেটে লেখে,

“প্রণয়ি”

রাত্রিরা ভাবে এটাই ওর নাম তারপর রাত্রি বলে,
–তুমি কানে শুনতে পাও?

প্রিয়তা ঘার হেলায়। তাই রাত্রি খুশি হয়ে বলে,
–তোমার বাড়ি কই? পরিবার? এখানে কেনো তুমি?

প্রিয়তা তখন মাথা চুলকে মনে করার চেষ্টা করছে। তারপর মাথা হালকা ব্যাথা করলে নিজের চুল নিজে খামচে ধরে অস্থির হয়ে উঠে। রাত্রি এ অবস্থা দেখে বুঝেই যায় যে মেয়েটা মানসিক রোগী। প্রিয়তাকে শান্ত করতে রাত্রি বলে,

–আচ্ছা প্রণয়ি। তোমাকে কিছু মনে করতে হবে না। তুমি যাবে আমাদের সাথে? তোমাকে ডাক্তার দেখাবো আমরা।

ডাক্তারের কথা শুনে প্রিয়তা ভয় পেয়ে যায়। সে ভয়ে খানিকটা সরে যায়। তা দেখে নিয়ন ও রাত্রি একে অপরের দিকে তাকায়। নিয়ন রাত্রিকে ইশারায় থামতে বলে নিজে প্রিয়তার কাছে বসে তারপর বলে,

–ওখানে অনেক বন্ধু পাবে তুমি। সবাই গল্প করবে তোমার সাথে, খেলবেও। বাজে লোকেরা তোমাকে ডিস্টার্ব করবে না। সবাই তোমাকে ভালোবাসবে। কেউ বকবে না মারবেও না। যাবে আমাদের সাথে?

প্রিয়তা নিষ্পাপ চাহনিতে তাকিয়ে আছে। এরপর রাত্রিও প্রিয়তাকে ভরসা দেয় তারপর প্রিয়তা রাজী হয়। নিয়ন ও রাত্রির মুখে হাসি ফুটে। নিয়ন বাস কাউন্টারে গিয়ে তিনটা টিকিট কাটে পাবনা যাওয়ার জন্য “পাবনা এক্সপ্রেস” এ। রাত্রি নিজের ব্যাগ থেকে চিড়ুনি বের করে প্রিয়তার মাথা আঁচড়িয়ে দেয়। মুখটাও পানি দিয়ে ধুয়ে মুছে দেয়।

রাত ১১.৩০ এ গাবতলি থেকে বাস ছাড়ে। প্রিয়তা ততোক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে। রাত দশটার দিকে প্রিয়তার আবার ক্ষুদা লেগেছিল তখন প্রিয়তার সাথে ওরাও রাতের খাবার খেয়ে নেয় এক হোটেল থেকে তারপর রাত্রি ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেয় প্রিয়তাকে। বাসে উঠার সময় চোখে মুখে পানি দেওয়ায় একটু উঠেছিল। পুরো জার্নিতে ঘুমিয়েই যায় প্রিয়তা।

পাবনাতে ওরা সকালে এসে নামে। এরপর পাবনা মেডিকেলে যায়। রাত্রি প্রিয়তাকে অনেক কষ্টে হল সুপারকে ম্যানেজ করে নিজের হোস্টেল রুমে নিয়ে গিয়ে ফ্রেশ করায়। নিয়নও ফ্রেশ হয়ে আসে নিজের হোস্টেল থেকে এরপর ওরা দুজনে প্রিয়তাকে ডাক্তার দেখায়। এরপর থেকেই প্রিয়তা পাবনা মানসিক হাসপাতালে আছে।

______সেদিন ডাক্তার দেখানোর পর ডাক্তার বলেছিল,
“প্রণয়ি ওরফে প্রিয়তা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়েছে কোনো আঘাতে। সাথে কিছু টেস্ট করতে দিয়েছে। সেগুলো করলে বাকি সমস্যা বুঝা যাবে।”

নিয়ন ও রাত্রি স্টুডেন্ট পড়িয়ে নিজেদের জমানো টাকা থেকে প্রিয়তার চেকআপ গুলো করিয়েছিল।

সেদিন সন্ধ্যাতে রিপোর্ট দেখে ওরা কিছুটা জেনেছিল। রিপোর্টে লিখা…

চলবে ইনশাআল্লাহ,

#অন্তরিক্ষ_প্রণয়
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথি
#সূচনা_পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here