অন্তহীন পর্ব -৩৭+৩৮

#অন্তহীন💜
#পর্ব_৩৭
#স্নিগ্ধা_আফরিন

গাড়ির হর্নের বিরক্তিকর শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে চৈতির। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে রাতের শূন্য গগনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গাড়িতে বসে আছে।আধ ঘন্টার ও বেশি সময় ধরে জ্যামে আটকে আছে।শহরে এত জ্যাম বলার মতন না। গুরুত্বপূর্ণ কাজ গুলো ও এই জ্যামের কারণে নষ্ট হয় অনেক সময়।শহুরে কোলাহল এই জন্যই অপছন্দ চৈতির।মাথা খারাপ করে দেয় একেবারে। চৈতির পাশেই বসে আছে প্রহন। উঁকি দিয়ে চৈতি কে দেখার চেষ্টা করছে।অথচ মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। সেই যে বিকেলে প্রহনের ধমক খেয়ে অভিমান করে কথা বন্ধ করেছে এখনো কথা বলেনি। প্রহন দু চার বার কথা বলছে কিন্তু চৈতি কোনো উত্তর দেয়নি।
দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা হয়েছে বেশ অনেক্ষণ আগেই। মাগরিবের নামাজ শেষ করে হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেড়িয়েছে এক জোড়া দম্পতি। রাস্তার ফুটপাতের দোকান গুলোতে ও লাইটিং করা হয়েছে।লাল নীল সবুজ রঙের মরিচ বাতি গুলো দেখতে অসুন্দর নয়।
প্রহন আলতো করে নিজের হাত টা চৈতির হাতের উপর রাখলো।মিহি গলায় সুধালো,”আইসক্রিম খাবে চৈতি?ভ্যানেলা ফ্লেভার। তোমার পছন্দের।”
চৈতি ঘাড় ঘুরিয়ে একটা বারের জন্য প্রহনের দিকে তাকালো না পর্যন্ত। উত্তরের আশায় চৈতির দিকে চেয়ে আছে প্রহন। কিন্তু চৈতির কোনো সাড়া পেল না।সে আগের মতই জান্লার ফাঁক দিয়ে ব্যস্ত নগরী দেখতে ব্যস্ত।
বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে চৈতির নাকের ডগায়।লাইটের আলোয় চিকচিক করছে।যেন মুক্তার দানা। প্রহনের কোনো উপস্থিতি টের না পেয়ে পাশ ফিরে তাকায় চৈতি।তার পাশের সিট খালি। প্রহন নেই। হঠাৎ তার পাশের জানালার দিক থেকে পরিচিত কন্ঠ থেকে শুনলো,”আমি এইদিকে আছি।”
চমকে তাকায় চৈতি। প্রহন কে দেখে কিছুটা খুশি হলেও প্রকাশ করলো না। প্রহন চৈতির দিকে এক পলক তাকিয়ে বাসে উঠে আসে। চৈতির হাতে একটা আইসক্রিম দিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,”আমি তোমার পাশ থেকে সরে গিয়েছি আরো বেশ কিছুক্ষণ আগে।অথচ তুমি আমার উপস্থিতি উপলব্ধি পর্যন্ত করতে পারলে না চৈতি। তুমি সত্যিই অনেক ছোট।কবে বড় হবে বলো তো?”
“আপনি যে আমার পাশে ছিলেন না তা আমি উপলব্ধি করতে পারেনি কে বলেছে আপনাকে?সব সময় নিজের মনগড়া কথা শুনাবেন না।”কাঠ কাঠ কন্ঠে উত্তর দিলো চৈতি।সব সময় মানুষের একতরফা অভিযোগ গুলো শুনে চুপ করে থাকার মানেই হয় না। হতেই তো পারে তার মনগড়া কথা গুলোর কোনো সত্যতা নেই।নিত্যান্তই তা অহেতুক অভিযোগ।
প্রহন চৈতির কথা শুনে মৃদু হাসলো। নিজের হাতের আইসক্রিমে কামড় বসিয়ে চৈতির উদ্দেশ্যে বললো,”ভেরি গুড চৈতি। ঠিক এমন করেই অহেতুক কথার জবাব দিবে বুঝতে পারলে?”
প্রহনের কথা শুনে চৈতি তাজ্জব বনে গেল।বিস্ময় নিয়ে প্রহনের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো,”এই মানুষটাকে চিনতে এবং সঠিক ভাবে বুঝতে হলে সত্যিই আমাকে অনেক বড় হতে হবে।”

জ্যামে আটকে থাকতে থাকতে শেষ পর্যন্ত রেহাই পেল।জ্যাম ছাড়ার কিছুক্ষণ পর হাসপাতালে এসে পৌঁছায় চৈতি প্রহন। রেদোয়ান চৌধুরী কে আইসিইউ থেকে কেবিনে সিফ্ট করা হয়েছে। আগের চেয়ে অনেক টাই সুস্থ আছেন তিনি। রেদোয়ান চৌধুরীর পাশে মিসেস ইয়াসমিন বসে ছিলেন। চৈতি আর প্রহন কে ভেতরে ঢুকতে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন মিসেস ইয়াসমিন। চৈতির মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।তার কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,”কীরে মা মুখটা এত শুকিয়ে আছে কেন? দুপুরে খাসনি?”
চৈতি শান্ত গলায় বললো,”খেয়েছি তো।”
রেদোয়ান চৌধুরী হাতের ইশারায় চৈতিকে কাছে ডাকলেন। চৈতি এক পলক মিসেস ইয়াসমিন এর দিকে তাকিয়ে রেদোয়ান চৌধুরীর দিকে এগিয়ে গেল।
রেদোয়ান চৌধুরীর বেডের পাশে রাখা টুলে বসে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলো,”কেমন আছেন আব্বু?”
রেদোয়ান চৌধুরী বেশ ধীর কন্ঠে বললেন,”আল্লাহর দয়ায় ভালো আছি মা।”
চৈতি আলতো করে রেদোয়ান চৌধুরীর হাত ধরে অভয় দিয়ে বললো,”আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আল্লাহর ভরসায় আপনি খুব জলদি ভালো হয়ে যাবেন।”
রেদোয়ান চৌধুরী মুচকি হাসেন। তার নিজের মেয়ে বেঁচে থাকলেও হয় তো এমন করে হাত ধরে ভরসা যোগাতো। বাবাকে সুস্থ করে তোলার জন্য অনেক অনেক দোয়া করতো। তার মেয়ে নিয়ে গিয়ে আল্লাহ তাই তাকে আরেকটা মেয়ে দান করেছেন।
মিসেস ইয়াসমিন প্রহনের হাতে একটা প্রেসক্রিপশন দিয়ে বললেন,”ডক্টর এই ঔষধ গুলো নিয়ে আসতে বলে ছিলেন। তুই একটু কষ্ট করে গিয়ে নিয়ে আয় তো বাবা।”
মায়ের হাত থেকে প্রেসক্রিপশন টা নিলো প্রহন। কেবিন থেকে বেরিয়ে যাবার সময় থামলো হঠাৎ। পেছনে ফিরে বললো,‍”কেউ কিছু খাবে নাকি আম্মু?যদি ফুচকা ঝালমুড়ি খেতে চাও তাহলে বলতে পারো। আমি আসার সময় নিয়ে আসবো।”
প্রহনের কথা শুনে মিসেস ইয়াসমিন বললেন,”আমি এই ফুচকা, ঝালমুড়ি খাবো না। চৈতির জন্য নিয়ে আসিস।”

“যার খেতে মন চাইবে সে আমাকে মুখ ফুটে বললেই পারে। আমি নিজ থেকে নিয়ে আসলে তখন যদি না খায় তাহলে শুধু শুধু টাকা এবং খাবার গুলো নষ্ট হবে।”

প্রহনের এমন খোঁচানো কথায় গা পিত্তি জ্বলে গেল চৈতির। সোজা সাপ্টা বললেই তো পারে।এত ত্যারা ব্যাকা করে বলার কি দরকার? চৈতি বেশ ঝাঁজালো গলায় বললো,”খাবো না আমি। আনতে হবে না আমার জন্য।”
চৈতির কথা শুনে প্রহন মৃদু হেসে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। এদের টম অ্যান্ড জেরির কান্ড দেখে মিসেস ইয়াসমিন মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন। চৈতির কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,”তোরা এত ঝগড়া করে কথা বলা বন্ধ করে দিস কেন বল তো? প্রহনের উপর অভিমান হয়েছে কেন আবার?”

মিসেস ইয়াসমিন এর কথা শুনে গাল ফুলালো চৈতি। ঠোঁট ফুলিয়ে অভিযোগ এর স্বরে বললো, “তোমার ছেলে আমাকে শুধু শুধু বকেছে ভালো মা।”

“আচ্ছা এই ব্যাপার। প্রহন আসুক ওকে খুব করে বকে দিবো।”
মিসেস ইয়াসমিন এর কথা শুনে মুচকি হেসে জড়িয়ে ধরে চৈতি।সে জানে মিসেস ইয়াসমিন সত্যি সত্যি প্রহন কে বকে দিবে।বেশ কিছুক্ষণ পর এক হাতে ঔষধ আর অন্য হাতে ফুচকা ঝালমুড়ি নিয়ে কেবিনের ভেতরে যায় প্রহন। প্রহনের হাতে দুটো প্যাকেট দেখে চৈতির বুঝতে অসুবিধা হলো না প্রহন তার জন্য কিছু নিয়ে এসেছে। মুখের হাবভাব গম্ভীর্য করে রাখলেও মনে মনে বেশ খুশি হলো চৈতি।
মায়ের হাতে ঔষধ এর প্যাকেট আর চৈতির হাতে খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল প্রহন।
____________
মেঘলা অপারাহৃ!
অন্তরীক্ষে ঘন কৃষ্ণবর্ণিয় নীরদ বাসা বেঁধেছে। সাময়িক সময়ের জন্য। দুপুরের দিকে হালকা রোদ থাকলেও বিকেল হতে হতে মেঘেদের আড়ালে হারিয়ে গেছে আদিত্য।প্রত্যেক দিনের মতো আজ আর গোধূলির মেহেদীরাঙা আকাশ নেই। পরিবেশ ঝাপসা হয়ে আছে। পড়ন্ত বিকেল নাকি সন্ধ্যা তা বোঝা দায়। চার পাশে চোখ পড়লেই স্পষ্ঠ বুঝা যাচ্ছে যে, প্রকৃতি ঘন বর্ষনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সন্ধ্যার দিকে হয়তো ঝুম বৃষ্টি হতে পারে। জৈষ্ঠের শেষ দিন আজ। বৃষ্টির আশায় বসে আছে শত কৃষক। সাথে এক অবাধ্য কিশোরী।
বৃষ্টি আসবে তার পর ও একটা ভ্যাপসা গরম রয়ে গেছে।মাথার উপর খট খট করে ঘুরছে স্যালিং ফ্যান। রেদোয়ান চৌধুরীর আগের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ আছেন। মাঝখানে কেটে গেল ১৫টা দিন। সপ্তাহ খানেক আগে ঢাকায় ফিরে গেছে প্রহন। চাইলে ও থাকা সম্ভব না।মায়া কাটিয়ে যেতেই হবে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে প্রহনের সাথে ঝগড়ার সময় গুলোই ভাবছিল চৈতি।
রান্না ঘর থেকে ভেসে আসছে হুকুম।
“চৈতি ছাদে কাপড় গুলো রয়ে গেছে। একটু কষ্ট করে নিয়ে আয় তো মা।”

আজকাল কাজ করতে বেশ আলসেমি লাগে চৈতির।এক রাশ বিরক্তি নিয়ে শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ালো।হাত দিয়ে চুলের খোঁপা বেঁধে মাথায় ওড়না দিয়ে চললো ছাদে।ছাদে যেতে ভীষণ আপত্তি তার।সহজে যেতে চায় না।এর সব চেয়ে বড় কারন হলো ইমরান নামের কলেজে পড়ুয়া এক ছেলে। পাশের বাসার নাফিজার বোনের ছেলে। সকাল আর বিকেল এই সময় গুলোতে যেনো তাকে ছাদে থাকতেই হবে।
ছেলেটাকে তেমন একটা ভালো লাগে না চৈতির। কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকে। সোজা সাপ্টা তাকালেও হতো।তা না আড় চোখে এমন করে তাকিয়ে থাকে যেনো গিলে খাবে।
আজো ব্যাতিক্রম হয়নি।ছাদে যেতেই ইমরানের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। সাথে সাথে চোখ ফেরালো চৈতি। প্রহন জানলে চোখ খুলে মার্বেল খেলবে। ছেলেটার হাতে একটা সিগারেট।অথচ এই পনেরো দিনে একটা বার ও ছেলেটাকে দেখে সিগারেট খোর মনে হয়নি। কাপড় গুলো জলদি করে নিয়ে চলে যেতে নেয় চৈতি।পেছন থেকে উচ্চ স্বরে ইমরান ডেকে উঠলো,”এই সুন্দরী এই,”
চৈতি থামলো না।পা বাড়াতেই ইমরান আবারো ডাক দিল,”এই ছোট আপু শুনো,,,”
চৈতি পিছনে ফিরে তাকায়।তা দেখে খুশি হয়ে যায় ইমরান। বেশ উৎকণ্ঠা গলায় বলে,”তোমার মতো দেখতে আমার একটা ভালোবাসার পাখি ছিল। একদম তোমার মতো দেখতে। তোমাকে আমি যেমন করে ডাকলাম তেমন করেই প্রথম ডেকে ছিলাম তাকে। কিন্তু জানো আমার পাখিটা না খাঁচা থেকে পালিয়ে মুক্ত আকাশে পাখা মেলে উড়ছে।”
এত কথা শোনার সময় নাই চৈতির। কিছুক্ষণ পরেই কল করবে প্রহন।যদি জানতে পারে অন্য কোনো ছেলের ডাকে পেছনে ফিরে তাকিয়েছে তাহলে একদম গলা টিপে মেরে ফেলবে।প্রিয় জিনিস হারিয়ে ফেলার ভয়ে সারাক্ষণ থাকে সে।তা খুব ভালো করেই জানে চৈতি। তবে যে যাই বলুক বা করুক সে তো জানে,ভালো সে শুধু প্রহন কেই বাসে।
#অন্তহীন 💜
#পর্ব_৩৮
#স্নিগ্ধা_আফরিন

“এই মেয়ে এই তোমার নাম টা কি?বলে তো যাও।”
স্কুলে যাওয়ার সময় এমন কথা শুনে কনফিউজড হয়ে গেল চৈতি।কাকে কথাটা বলা হয়েছে তা দেখার জন্য পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলো ইমরান নামের ছেলেটা বুকে দুই হাত গুজে চৈতির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসি হাসি ভাব।
চৈতি ইমরান কে দেখে এবার দ্রুত হাঁটতে লাগলো। চৈতি কে এত জলদি হাঁটতে দেখে ইমরান ও দ্রুত পায়ে হেঁটে চৈতির পাশে এসে পড়ে। ইমরান কে পাশে দেখে চৈতি ঘাবড়ে যায়।
“এমন করে পালিয়ে যাচ্ছো কেন মেয়ে?”
চৈতি থামলো।ইমারানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক নিঃশ্বাসে বললো,”দেখুন আমি বিবাহিত। প্রহন চৌধুরীর স্ত্রী চৈতি চৌধুরী।দয়া করে আমাকে এমন বিরক্ত করবেন না। আমার স্বামী জানতে পারলে তখন অযথাই আমাকে ভুল বুঝবে। এবং আমাদের সুন্দর সম্পর্ক টা নষ্ট হবে।”
চৈতি বিবাহিত কথাটা ঠিক হজম হলো না ইমরানের।তার মুখের হাব ভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে চৈতির কথায় সে কতটা অবাক।বিষ্মিত কন্ঠে বললো,”আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না। তুমি আমার সাথে নিশ্চয়ই মজা করছো।এই টুকু একটা মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।বললেই কী আর বিশ্বাস করা যায় নাকি। মোটেও না।”
যে বুঝতে চায় না তাকে বুঝ দিয়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন মনে করে না চৈতি। সোজা সাপ্টা বললো,”আমাকে বিরক্ত করবেন না। আমি আপনার সাথে কথা বলতে বিরক্ত বোধ করি।”
কথাটা বলেই সিএনজি ডেকে উঠে গেল চৈতি। ইমরান অবাক হয়েই চেয়ে রইল সিএনজি টার দিকে।
মুখের উপর যেহেতু বলেই দিয়েছে বিরক্ত হয় এবং বিবাহিত সেহেতু মেয়েটাকে আর বিরক্ত না করাই উচিত। কিন্তু একটু ভালো করে খোঁজ নিয়ে জানতে হবে যে মেয়েটা সত্যিই বিবাহিত কিনা।মনে মনে কথা গুলো বলে নিজের কাজে চলে গেল ইমরান।
__________
বর্ষনময় মধ্যাহ্ন!
প্রকৃতিতে নেমে এসেছে ঘন বর্ষন।সতেজ হচ্ছে গাছের পাতা।পাখিরা মনের সুখে বৃষ্টির পানিতে ভিজছে। গায়ের সুন্দর পালক গুলো বৃষ্টির পানিতে ভিজে কেমন যেন স্যাতঁ স্যাতেঁ হয়ে আছে। বছর খানেক আগেই এমন একটা বর্ষনময় দিনে প্রহনের সাথে ভিজে ছিল চৈতি।আজ আর চাইলেও ভেজা সম্ভব না। পড়ার টেবিলে বসে মুখে কলম রেখে গালে হাত দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। আগামীকাল গনিত পরীক্ষা।অথচ সে প্রহনের সাথে কাটানো মিষ্টি মুহুর্তে ডুবে আছে।ছয় সাত মাসের ও বেশি সময় হয়ে গেল মানুষ টা কে সামনাসামনি দেখা হলো না। ছুঁয়ে দেখা হলো না।
“দুপুর বেলা কেউ পড়তে বসে? অসহ্য!”
চোখে মুখে বিরক্তি। কিছুক্ষণ আগেই ভাত খেয়েছে। কোথায় একটু এমন ঠান্ডা বৃষ্টির মধ্যে একটা শান্তির ঘুম দিবে তা আর হলো না মাধ্যমিক এর পরীক্ষার জন্য। গণিত বই এর বেশির ভাগ সব কিছু রিভিশন করা শেষ। পিথাগোরাস এর উপপাদ্য না হয় রাতে দেখে নিত। কিন্তু মিসেস ইয়াসমিন এর চোখ পাকিয়ে তাকানোতেই হাওয়া হয়ে গেল সব কথা। চুপ করে এসে ভদ্র মেয়ের মত বসতে হলো পড়ার টেবিলে।
রেদোয়ান চৌধুরী এখন যথেষ্ট সময় দেন মিসেস ইয়াসমিন কে। ছুটির দিনে চৈতি আর অর্ধাঙ্গিনী কে নিয়ে পার্কে ঘুরতে যান।মাঝে মাঝে রেস্টুরেন্টে খেতে যান।বই পড়া কমিয়ে মিসেস ইয়াসমিন এর সাথে গল্প করেন। রেদোয়ান চৌধুরীর কাছে আবদার করে ও লাভ নেই। কিছু বললেই বলবে,”গতবার মডেল টেস্ট পরীক্ষায় অংকতে মাত্র ৬২ মার্ক পেয়ে ছিলি।আর এখন ফাইনাল পরীক্ষা হচ্ছে।এ+ না পেলে প্রহন কিন্তু খুব বকবে। তোর পড়ালেখা হবে না দেখে এখনো বাড়ি আসেনি ছেলে টা। মন দিয়ে পড়।”
“অংক কি পড়ার বিষয় নাকি আজব!গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রেদোয়ান চৌধুরীর এই সব কথা শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গেছে চৈতির।এত কিছু ভাবার পর হঠাৎ মন বলে উঠলো,”চৈতি আসলেই তোর একটু ভালো করে অংক গুলো দেখা উচিত।নিয়ম গুলো দেখে নে। ভালো রেজাল্ট না করলে প্রহনের সাথে এই জন্মেও আর দেখা হবে না। খুব বকবে।‍”
বাইরে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বইয়ের উপর চোখ রাখলো।ইতি মধ্যে কখন যে সে পুরো বইয়ে প্রহন চৈতি লিখে ভরিয়ে ফেলেছে খেয়ালই করেনি।

সেদিন সন্ধ্যায় ও ঝুম বৃষ্টি হলো। শীতের দিনে বৃষ্টি।আজব দেশের আজব আবহাওয়া। ফেব্রুয়ারীর শুরু হয়েছে তিন দিন হবে।দেয়ালে টাঙ্গানো কেলেন্ডার টা জানিয়ে দিচ্ছে আজ তেসোরা ফেব্রুয়ারি।কনকনে শীতে কাঁপছে প্রহন। রুমের ভেতর বিন্দু পরিমাণ নেট নেই।থাকবেই বা কি করে শহর ছেড়ে যে পাহাড়ী এলাকায় বদলি হয়েছে। শহরের তুলনায় পাহাড়ি এলাকায় শীতের পরিমাণ টা একটু বেশি। তার উপর বৃষ্টি পরিবেশ টা কে শীতল থেকে অতি শীতল বানিয়ে ফেলেছে।ভিডিও কলের উপাশে গালে হাত রেখে প্রহনের দিকে তাকিয়ে আছে চৈতি।
চোখে মুখে খুশির উজ্জ্বল আলো যেন ঝিকমিক করতেছে।এই মুহূর্তে প্রহনের ইচ্ছা করছে মেয়েটার গাল ধরে টেনে দিয়ে বিরক্ত করতে। আগের সেই পিচ্চি চৈতি এখন অনেক টাই বড় হয়েছে। সুন্দর ও হয়েছে আগের চেয়ে। চোখে কাজল দিলে প্রহন চৈতির চোখের ভেতরেই হারিয়ে যায়।ডুবে মরে ভালোবাসার সিক্ত আবেশে।
এই তো কয়েক দিন আগে, চোখে কাজল দেওয়ার জন্য চৈতি কে কী বকাটাই না দিল।
ডিউটি ও করতে পারে না সব সময় সেই চোখ দুটো যেন ভাসে তার চোখের সামনে।
“আপনার শীত করছে তো। রুমে চলে যান। আর আপনি শীতের কাপড় পড়েননি কেন?”

“রুমে নেট নেই। কোন এক জঙ্গলে আসছি নেট নাই কিছু নাই। তার উপর এত ঠান্ডা বলার মতো না।”

“শীতের কাপড় গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।আর কথা বলতে হবে না।”

চৈতির কথায় প্রহন বললো,”আচ্ছা।”
এতে চৈতি মোটেই খুশী হলো না।
কিছুটা রেগে গিয়ে বললো,”শুধু আচ্ছা?আর কীসের আচ্ছা হ্যা? আমি বললেই আপনাকে লাইন কেটে দিতে হবে? আচ্ছা বলতে হবে?”

চৈতির এহেন কথায় তাজ্জব বনে গেল প্রহন। শুধু আচ্ছা বলাতেই এত রাগ যদি আচ্ছা রাখছি আল্লাহ হাফেজ বলে কল কেটে দিতো তাহলে কী করতো আল্লাহ জানে।
“তুমি নিজেই তো বললা..”

“আমি বললেই যে আপনি আমার কথা শুনেন তা তো জানতাম না।যাই হোক মজা করছি। আপনার শীত করতেছে বুঝতে পারছি আমি।যান রুমে যান।”

এই বার চৈতির কথার উত্তরে প্রহন কিছু বললো না।কারন আবার কখন মুড বদলে যায় বলা যায় না। শুধু মুচকি হাসলো। ওপাশ থেকে চৈতি কল কেটে দিলো। প্রহন চৈতির এইসব কান্ড দেখে মাঝে মাঝে কনফিউজড হয়ে যায় যে, তার বউয়ের মানসিক কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে না তো। হুটহাট মত বদলে ফেলে।
.
.
দেখতে দেখতে চৈতির পরীক্ষার ইতি ঘটলো। পড়ালেখার প্যারা থেকে মুক্তি পেলো বেশ অনেক দিন এর জন্য।
সময় তিন অক্ষরে কঠিন তম একটা শব্দ।কত কিছু যে সহজেই বদলে দেয় এই সময় বলার মতো না। একবার গেলে আর ফিরে আসতে চায় না।ধরে বেঁধে ও রাখা যায় না তিন অক্ষরের শব্দ টাকে।কতটা শক্তিশালী সে।
সামনের মাসেই দুটো মানুষ এর একসাথে পথ চলার দু বছর শেষ হবে। দ্বিতীয় বিবাহ বার্ষিকী নিয়ে বেশ উৎফুল্ল চৈতি।আগে যা জানা ছিল না তার চেয়ে ও বেশি কিছু জানা হয়ে গেছে এই দু’বছরে। দুটো মানুষ বিবাহ নামক বাঁধনে এক হলেও পুর্নতা পায়নি তাদের সম্পর্ক।
পাশের বাসার এক ভদ্রমহিলা এসেছিলেন সেদিন। চৈতি সোফার উপর পা তুলে বসে বসে টিভি দেখছিল আর নুডুলুস খাচ্ছিল।
ভদ্র মহিলার মাথার চুল পাকা ধরেছে। মিসেস ইয়াসমিন কে ডেকে বললেন,”তা কি গো ইয়াসমিন, তোমার নাতি নাতনির মুখ কখন দেখবো আমরা? বিয়ের তো অনেক দিন হলো।”
ভদ্র মহিলার কথা শুনে খাবার গলায় আটকে কাশি উঠে যায় চৈতির। কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে রক্ত বের হবার উপক্রম।
কী সাংঘাতিক মহিলা!
অন্যের নাতি নাতনির মুখ দেখার আশায় যেন দিন কাটাচ্ছে। মিসেস ইয়াসমিন মুচকি হেসে বলেছিলেন,”আমার ছেলের বউ নিজেই তো এখন ও বাচ্চা।সে আবার বাচ্চা সামলাবে কি করে?আর অল্প বয়সে মা হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নেওয়ার কোনো দরকারনেই।সময় হলে আমার নাতি নাতনির মুখ সবাই দেখবে।সাথে আপনি ও আপা।”

চলবে,,,

(আসসালামু আলাইকুম। আমার পরীক্ষা চলছিল। সাথে পারিবারিক কিছু সমস্যার জন্য গল্প দিতে পারিনি। আগামীকাল থেকে নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।আর কয়েক পর্বের মধ্যে ইতি টানবো গল্পের।)
#চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here