অবহেলিত স্ত্রীর প্রতিশোধ পর্ব-২+৩

#অবহেলিত_স্ত্রীর_প্রতিশোধ
পর্ব_০২
লেখক~ 𝐒𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐨𝐟 𝐘𝐞𝐚𝐬𝐢𝐧 𝐍𝐞𝐞𝐥

দুপুরের আলোটা তখনও পুরোপুরি নেমে আসেনি। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন মানুষের মুখে যে অন্ধকার জমে উঠেছিল, তা দিনের আলোকেও ম্লান করে দিচ্ছিল। মিস্টার ইয়াসিন আবারও চাবি ঘুরালেন। ধাতব শব্দটা যেন তাদের আত্মবিশ্বাসের ভেতরেই আঘাত করল। দরজা খুলল না।

রেসমিকা বিরক্ত হয়ে বলল, “চাবি ঠিক আছে তো? তুমি কি ভুল দরজা খোলার চেষ্টা করছ?”

রহিমা বেগম ঠোঁট চেপে বললেন, “এটা নাটক। ভেতরে ঢুকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু দরজা কোনো নাটকের অংশ ছিল না। দরজা ছিল বাস্তবতার কঠিন সীমারেখা।

তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তারক্ষী একবার দরজার তালার দিকে তাকাল, তারপর নোটিশের দিকে।

তার মুখে কোনো আবেগ ছিল না, শুধু কাজের নির্লিপ্ততা।
রহিমা বেগম ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।

নোটিশটা ছুঁয়ে দেখলেন। কাগজটা সাধারণ হলেও তার ভেতরের কথাগুলো ছিল অস্বাভাবিক ভারী।

তিনি পড়তে শুরু করলেন। প্রতিটি শব্দ যেন তার আত্মবিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছিল।

“এই সম্পত্তি আইনগতভাবে হস্তান্তরিত এবং নতুন মালিকের নির্দেশ ছাড়া প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।”

তিনি থেমে গেলেন। চোখ ছোট হয়ে এলো। যেন তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।

মিস্টার ইয়াসিন পিছন থেকে বললেন, “এটা কীভাবে সম্ভব?” তার কণ্ঠে এবার প্রথমবারের মতো অস্থিরতা।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি গাড়ি এসে থামল।
একজন আইনজীবী নামলেন। হাতে ফাইল। চোখে শান্ত দৃঢ়তা। তিনি দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

তাদের দিকে না তাকিয়ে বললেন, “আপনারা কি মিস্টার ইয়াসিন এবং পরিবার?” ইয়াসিন মাথা নাড়লেন।

আইনজীবী ফাইল খুললেন।

“এই সম্পত্তি এখন আইনগতভাবে রুপালীর নামে। এবং গত সাত দিন আগে তিনি একটি পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি সক্রিয় করেছেন, যার মাধ্যমে পূর্বের সকল ব্যবহারাধিকার বাতিল করা হয়েছে।”

রহিমা বেগমের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“অসম্ভব,” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “এই বাড়ি তো…”
আইনজীবী তাকে থামিয়ে দিলেন না।

শুধু শান্তভাবে বললেন, “আপনারা এখানে আর প্রবেশ করতে পারবেন না।” নীরবতা নেমে এলো।

নীরবতা কখনো কখনো চিৎকারের চেয়েও বেশি ভয়ংকর।
রেসমিকা প্রথমে হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসি খুব দ্রুত মিলিয়ে গেল। কারণ এটি কোনো ভুল বোঝাবুঝি ছিল না।

এটি ছিল সিদ্ধান্ত।

এদিকে, শহরের অন্য প্রান্তে হাসপাতালের কক্ষে রুপালী জানালার পাশে বসে ছিল। তার কোলে নবজাতক।

শিশুটির নিঃশ্বাস ছিল হালকা, কিন্তু তার ভেতরে ছিল এক নতুন শক্তির জন্ম।
তার ফোনে একের পর এক নোটিফিকেশন আসছিল।

ব্যাংক স্টেটমেন্ট। আইনি নথি। সম্পত্তি পরিবর্তনের নিশ্চিত বার্তা। সে শান্ত ছিল। অদ্ভুতভাবে শান্ত।

তার বান্ধবী সুমাইয়া পাশে বসে বলল, “তুই সত্যিই সব বদলে দিলি?”লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল।

রুপালী জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমি কিছু বদলাইনি। আমি শুধু সত্যটা প্রকাশ করেছি।”

সুমাইয়া কিছু বলল না। কারণ সত্য কখনো চিৎকার করে আসে না। সত্য আসে নীরবে, সময়মতো।
সেদিন সন্ধ্যায় ইয়াসিন বাড়ির সামনে বসে ছিল।

প্রথমবার তার মনে প্রশ্ন এল—সে কোথায় ভুল করেছিল?
তার মা বলেছিলেন, এটা সামান্য নাটক।

সে বিশ্বাস করেছিল। তার বোন হাসছিল। সে হাসি যোগ করেছিল। কিন্তু সে একবারও ভেবে দেখেনি, যাকে সে অবহেলা করছে, সে কতটা নিঃশব্দে নিজের পৃথিবী গড়ে তুলছে। রাত নামার সাথে সাথে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হয়ে গেল। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগে নতুন নাম।

পানি সংযোগে নতুন অনুমোদন। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সীমিত প্রবেশাধিকার।

সবকিছু ধীরে ধীরে তাদের হাত থেকে সরে যাচ্ছিল।
রহিমা বেগম প্রথমবারের মতো চুপ হয়ে গেলেন।

তিনি জীবনে বহু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, বহু মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, কিন্তু এই নীরব পরিবর্তন তাকে থামিয়ে দিল।

রেসমিকা ফিসফিস করে বলল, “ও আমাদের সাথে এটা করতে পারে না।
কিন্তু বাস্তবতা কোনো অনুমতি নিয়ে আসে না।

রুপালী তখন শিশুটিকে কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “যে মানুষ আমাকে দরজার বাইরে রেখে গিয়েছিল, সে কখনোই বোঝেনি… দরজা শুধু ভাঙা যায় না, বদলানোও যায়।”

তার চোখে কোনো রাগ ছিল না।
ছিল শুধু শেষ হয়ে যাওয়া সহনশীলতার শান্ত সমাপ্তি।

রাত গভীর হতে থাকল। আর শহরের অন্য প্রান্তে একটি পরিবার প্রথমবার বুঝতে পারল তারা যেটাকে অবহেলা ভেবেছিল, সেটাই ছিল তাদের পুরো আশ্রয়।

চলবে..?

#অবহেলিত_স্ত্রীর_প্রতিশোধ
পর্ব_০৩
লেখক~ 𝐒𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐨𝐟 𝐘𝐞𝐚𝐬𝐢𝐧 𝐍𝐞𝐞𝐥

রাত তখন ধীরে ধীরে আরও ভারী হয়ে নামছিল। শহরের আকাশে যে আলোটা একটু আগে পর্যন্ত ছিল, সেটাও যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল, রেখে যাচ্ছিল এক অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা, যেটা মানুষের ভেতরের ভাঙনকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। বাড়ির সামনে বসে থাকা মিস্টার ইয়াসিন আর তার পরিবার তখন আর আগের মতো আত্মবিশ্বাসী ছিল না। তাদের চোখে ছিল প্রশ্ন, অবিশ্বাস আর এমন এক আতঙ্ক, যেটা তারা জীবনে কখনো অনুভব করেনি।

যে দরজাটাকে তারা এত সহজভাবে নিজের অধিকার ভেবেছিল, সেই দরজাই এখন তাদের সামনে এক অচেনা সীমানার মতো দাঁড়িয়ে আছে।

রহিমা বেগম একবার সামনে এগিয়ে গেলেন। তাঁর মুখ শক্ত, কিন্তু চোখে ভাঙা আত্মসম্মানের ছায়া।

তিনি বললেন, “এটা কোনো ভুল হতে পারে না। এই বাড়ি… এই সব তো আমাদেরই ছিল।”

তার কণ্ঠে প্রথমবারের মতো অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়েছিল। যে নারী সারাজীবন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নির্দেশ দিয়েছেন, নিয়ন্ত্রণ করেছেন, সেই নারী এখন নিজের কথার উপরই বিশ্বাস রাখতে পারছেন না।

আইনজীবী তখনও শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার হাতে থাকা ফাইলটা যেন শুধু কাগজ না, বরং একটি সম্পূর্ণ বাস্তবতার প্রমাণ। তিনি বললেন, “কাগজপত্র অনুযায়ী এই সম্পত্তি এখন সম্পূর্ণভাবে রুপালীর নামে। এবং তার নির্দেশ ছাড়া এখানে কোনো ধরনের প্রবেশাধিকার বৈধ নয়।”

রেসমিকা হঠাৎ করেই চিৎকার করে উঠল, “এটা কীভাবে সম্ভব? ও তো আমাদের সাথে ছিল! আমাদের সাথে খেত, আমাদের সাথে থাকত!”লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল।
তার কণ্ঠে বিস্ময়ের চেয়ে বেশি ছিল অপমান।

ইয়াসিন তখনও চুপ করে ছিল। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল, সে কখন এতটা দূরে সরে গেল যে সে বুঝতেই পারল না।

ঠিক সেই সময় বাড়ির ভেতর থেকে এক নিরাপত্তারক্ষী দরজার ছোট স্পিকারের মাধ্যমে বলল, “আপনাদের অনুরোধ করা হচ্ছে স্থান ত্যাগ করার জন্য।”

এই কথাটা ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু তার প্রভাব ছিল অস্বাভাবিক গভীর। কারণ এটা ছিল সেই বাড়ি, যেটাকে তারা নিজেদের বলেই মনে করত।

রহিমা বেগম ধীরে ধীরে পিছিয়ে এলেন। তাঁর মুখে এবার আর কোনো দৃঢ়তা ছিল না। শুধু একটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়া অহংকার। ঠিক সেই মুহূর্তে শহরের অন্য প্রান্তে, হাসপাতালের কক্ষে রুপালী জানালার পাশে বসে ছিল।

তার কোলে নবজাতক ঘুমাচ্ছিল। শিশুটির মুখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি, যেন সে পৃথিবীর জটিলতা কিছুই জানে না।

রুপালীর চোখ জানালার বাইরে। শহরের আলো ঝলমল করছিল, কিন্তু তার ভেতরের জগৎ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

তার ফোনে বার্তা আসছিল। ব্যাংকের নোটিফিকেশন। আইনজীবীর আপডেট। বাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিবর্তনের রিপোর্ট। সবকিছু ঠিকঠাক কাজ করছে।

তার বান্ধবী সুমাইয়া পাশে বসে বলল, “তুই কি সত্যিই ওদের বাড়ি থেকে বের করে দিলি?”

রুপালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “আমি কাউকে বের করে দিইনি। আমি শুধু আমার জীবনটা আবার নিজের নামে ফিরিয়ে নিয়েছি।”

এই কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না। ছিল না কোনো বিজয়ের উল্লাস। ছিল শুধু এক দীর্ঘ ক্লান্তির শেষে পাওয়া শান্তি। এদিকে বাড়ির সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছিল।

ইয়াসিন এখন ফোনে কারও সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু লাইন ব্যস্ত। নেটওয়ার্ক কাজ করছে না ঠিকমতো।

যেন পুরো পরিস্থিতিটাই তাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে।
রেসমিকা হাঁটাহাঁটি করছে, বারবার বলছে, “এটা ঠিক হচ্ছে না… এটা হতে পারে না…”
কিন্তু বাস্তবতা কোনো কথায় থেমে থাকে না।

রহিমা বেগম হঠাৎ বসে পড়লেন গাড়ির সিটে। তার হাত কাঁপছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আমি ওকে ছোট করে দেখেছিলাম…”
এই প্রথমবার তার কণ্ঠে অনুশোচনা শোনা গেল।

ইয়াসিন তার দিকে তাকাল। কিন্তু কিছু বলল না।
কারণ তার ভেতরেও এখন আর কোনো যুক্তি ছিল না।
পরদিন সকালে পরিস্থিতি আরও বদলে গেল।

বাড়ির লক পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন মালিকানার সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

আইনগতভাবে এখন আর তাদের এখানে কোনো অবস্থান নেই। রুপালী হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল সেই দিনই।

সে ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠল। শিশুটিকে বুকের কাছে আগলে ধরল। তার চোখে কোনো অস্থিরতা ছিল না।

ছিল এক স্থিরতা, যেটা অনেক ভাঙনের পর জন্ম নেয়।
গাড়ি যখন বাড়ির দিকে এগোচ্ছিল, তখন তার ফোনে শেষ একটি বার্তা এল। ইয়াসিনের নাম থেকে।

“আমরা কি একবার কথা বলতে পারি?”
রুপালী বার্তাটা পড়ল। তার আঙুল কিছুক্ষণ থেমে রইল।

তারপর সে ফোনটা বন্ধ করে দিল। কারণ কিছু কথার উত্তর কথায় হয় না। কিছু সিদ্ধান্ত একবার নেওয়া হলে, তা আর আলোচনার বিষয় থাকে না।
বাড়ির সামনে পৌঁছে সে গাড়ি থেকে নামল।

সেই একই বাড়ি, যেটা একসময় ছিল হাসি, স্বপ্ন আর ভাঙনের সাক্ষী। কিন্তু এবার দৃশ্যটা আলাদা।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো এবার ভিতরে নয়, বাইরে। রহিমা বেগম দূর থেকে তাকালেন।

তার চোখে এক অচেনা ভয়।
রুপালী ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক ধরনের নীরব শক্তি।

দরজা খুলে গেল। ভেতরের আলো বাইরে এসে পড়ল।
সে থেমে গেল এক মুহূর্ত। তারপর খুব শান্তভাবে বলল, “এই বাড়ি এখন আমার।” এই কথাটা কোনো চিৎকার ছিল না।

ছিল না কোনো প্রতিশোধের ঘোষণা। এটা ছিল শুধু বাস্তবতার স্বীকৃতি। রহিমা বেগম কিছু বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।

ইয়াসিন এগিয়ে এল একটু। তার চোখে প্রথমবার অনুরোধ।
“রুপালী…” কিন্তু সে থামিয়ে দিল। একটি হাত উঠিয়ে, খুব শান্তভাবে। তার চোখে কোনো ঘৃণা ছিল না।

ছিল শুধু সমাপ্তি।
সে বলল, “আমি যেদিন প্রসব বেদনায় কাঁপছিলাম, সেদিন তোমরা দরজা বন্ধ করে চলে গিয়েছিলে।”

তার কণ্ঠে কোনো কম্পন ছিল না।

“আজ আমি সেই দরজাটা খুলেছি… শুধু এটা বোঝানোর জন্য যে, কিছু দরজা আর কখনো আগের মতো থাকে না।”
নীরবতা নেমে এলো। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল।
এই নীরবতা আর আগের মতো ভাঙা নয়। এটা ছিল চূড়ান্ত।

#চলবে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here