অভিমান পর্ব ১০

#অভিমান❤️
#মুমুর্ষিরা_শাহরীন
পর্ব-১০
অনেক আশাহত হয়ে এলোমেলো চুলে ঘামে ভিজে নেয়ে একাকার হয়ে বাড়ি ফিরে রাহান। চোখগুলো ফোলা ফোলা। মাথার চুল এলোমেলোম চোখ দুটি টকটকে লাল। বিধ্বস্ত লাগছে তাকে দেখতে এখন। নিজের ঘরে ঢুকেই প্রথমে দেখা হলো তেথির সাথে। রাহানের দৃষ্টি গরম সাথে বিরক্তি ভরপুর। রাহান তেথিকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় কালো কাবার্ড টা থেকে নিজের জামা কাপড় বের করতে। তেথি ছলছল নয়নে রাহানের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,

‘রাহান….’

রাহান তাকালো তেথির দিকে। তেথির ব্যাথাতুর নয়ন দেখে তার খারাপ লাগলো। রাহান জানে তেথির মনে ওকে নিয়ে ভাবনা শুধু বন্ধুত্ব পর্যন্তই থেমে নেই এর শাখা-প্রশাখা গিয়ে ঠেকেছে ভালোবাসা অবধি। রাহান বুঝতে পারে সব। ওতোটা অবুঝ ও না। কিন্তু কি করবে? মেয়েটাকে কষ্ট দিতেও ইচ্ছে করে না। আবার মেয়েটাকে গ্রহণ করাও তার পক্ষে দুষ্কর। তেথি কিছু বলতে চায় রাহান তাকে থামিয়ে দিয়ে নিজে নিষ্প্রান নিষ্ঠুর গলায় বলল,

‘দেখো তেথি, আমি জানি না কি হচ্ছে আমার চারিপাশে বা কি ঘটতে চলেছে। কিন্তু আমি তোমাকে নিজের বন্ধুর চাইতে বেশি কিছু কল্পনাও করি না।’

তেথির ক্যাটস আই দুটোয় পানি স্বচ্ছ কাচের ন্যায় প্রকাশ পেলো। খানিকটা অভিমানে মুখ বেশ থমথমে হয়ে গেলো। ভাঙা গলায় বলল,

‘রাহান….তুমি কিছু নাই বা ভাবলে কিন্তু আমি তো ভাবি। আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমাদের সম্পর্কে আমার ভালোবাসাই যথেষ্ট রাহান। তুমি শুধু আমাকে গ্রহন করো।’

রাহানের কেমন যেনো লাগে। অস্বস্থিতে বুক ধরফর করে। মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে হঠাৎ। ক্লান্ত শরীরের সাথে সাথে মনটাও ক্লান্ত। কথা বলতে ইচ্ছে করে না। তবুও রাহান এগিয়ে গেলো তেথির দিকে। দু’হাতের মাঝে তেথির মুখটা ধরলো। তেথি চোখ বন্ধ করে। তার চোখ থেকে দু ফোটা পানি গড়িয়ে পরে গাল বেয়ে। রাহান তা যত্ন করে মুছে দিয়ে অতিনিষ্ঠুর হয়ে ঘোর লাগা গলায় বলল,

“আমি ঝুমকোকে ভালোবাসি তেথি। আমার জীবনে একমাত্র এবং শুধুমাত্র তারই বিচরন। একনিষ্ঠ অনুধ্যান কল্পনামূলক ভাবে সব ভাবলে চলে না তেথি। বাস্তব বুঝতে হবে তোমায়। একতরফাভাবে আবেগ হয়, ভালোলাগা হয়, ভালোবাসা হয় কিন্তু প্রেম হয় না, বিয়ে হয় না।”

তেথি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে রাহানের দিকে। তার শরীর হঠাৎই রাগে কাপতে থাকে। রাহানকে সে সত্যি ভালোবেসেছিলো। আর সেই ছেলে কিনা তেথির মুখ আদর করে ধরে এখন বলছে ঝুমকোকে ভালোবাসে? কি জানি কি হলো তেথি রাহানকে ঠাস করে একটা চর মেরে বসলো। রাহান তেথিকে ছেড়ে দিলো। নিজের গালে ডান হাতটা আপনা আপনি চলে গেলো।

তেথির চোখ থেকে তখনও পরছে বৃষ্টির বর্ষন। বিদেশী কালচারে বড় হয়েও তার মধ্যে বাঙালি মেয়ে জাতির মতোই ইমোশনাল ভাব। আবেগে আবেগে বিবেক ভুলতে বসে মাঝেমধ্যেই। তেথি মুখ চেপে কেঁদে বলে উঠলো, ‘ভালো থেকো রাহান। সুখী হও ভালোবাসা সাথে নিয়ে।’

তেথি চলে যেতে গিয়েও আবার ঘুরে আসে। রাহানের কানের নিচ দিয়ে হাত দিয়ে ওর দু’গালে চুমু দেয়। রাহান তখন অবধি স্তব্ধ। তেথি যেই রাহানের ঠোঁটে চুমু দিতে যাবে রাহান বিদ্যুৎ এর গতিতে সরে আসে। তেজি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তেথির দিকে। তেথি একটু হাসে। বলে, ‘ওহ স্যরি। গেলাম। ‘

দরজার কাছে যাওয়ায় পর তেথি ঘুরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

‘আমি চলে যাচ্ছি রাহান কাল পরসু। আর বোধ হয় কখনো আমাদের দেখা হবে না। ভালো থেকো তোমার ভালোবাসা নিয়ে। শুধু একটাই আপসোস। কে সেই ভাগ্যবতী যার জন্য রাহান আদমান এতো পাগল? মেয়েটা সত্যি খুব লাকী। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে। পারলে তোমাদের বিয়েতে আমাকে ইনভাইট করো। ভালো থেকো সুইটহার্ট। ‘

তেথি চলে যেতেই রাহান মন্ত্রমুগ্ধের মতো গিয়ে বিছানায় বসলো। সবকিছু কত তাড়াতাড়ি ঘটছে। কেমন চোখের পলকে সব সম্পর্ক ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। রাহানের মনে হচ্ছে তার কষ্ট হচ্ছে একই সাথে আবার বুকটা হালকা হালকাও লাগছে। মনে হচ্ছে একটা ঝামেলা মিটলো আবার খারাপ লাগছে এই ভেবে যে, দীর্ঘ তিনবছর তেথির সাথে তার খুব ভালো বন্ধুসুলভ সম্পর্ক ছিলো। সেই সম্পর্ক আজ ভেঙে গেলো।

জাহিদা রহমান রাহানের মায়ের নাম। তিনি তেথিকে চিনেন এই কিছুদিন হলো মাত্র। তেথির হুটহাট এই বাড়িতে আসা যাওয়া তিনি একদমি ভালো চোখে দেখেন না তার উপর আজ আবার কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যেতে দেখেছেন। তিনি রাহানের কাছে বসে ভ্রু কুটি করে প্রশ্ন করলেন,

‘মেয়েটার সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক ছিলো রাহান?’

রাহান কেনো যেনো আকস্মিক ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। চারিদিকের এতো এতো প্রশ্ন এতো ঝামেলার মধ্যে রাহানের মন চাইছে এক ছুটে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে। অসহ্য মন অসহায়ের মতো ছটফটিয়ে ঘুরছে। মায়ের উপর চড়ে গিয়ে উঁচু গলায় রাহান বলল,

‘আবোল তাবোল বকছো কেনো মা? ভালো কথা থাকলে সেটা বলো।’
‘এটা কি ভালো কথা নয়?’
‘না নয়। তুমি খুব ভালো মতো জানো আমি ঝুমকোকে ভালোবাসি।’

রাহানের গলায় অনেক রাগ প্রকাশ পেলো। জাহিদা রহমানের মুখ কালো হয়ে গেলো কথাটা শুনে। তিনি চান ছেলেকে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করাবেন। কিন্তু হায় কপাল! জাহিদা বেগম ছেলের মাথায় হাত রেখে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললেন,

‘কি বলছিস তুই এসব? তুই তো ওকে আর ভালোবাসিস না। তিনবছর আগেই তো সব চুকেপুকে বিদেশ চলে গেলি।’

❝ভালোবাসা কখনো নিঃশেষ হয়ে যায় না মা। এটা অনেকটা নবায়নযোগ্য সম্পদের মতো। হাজার ভালোবাসলেও ভালোবাসা ফুরায় না, উলটে বাড়ে। শুধু কিছু কিছু সময় বিশাল অভিমানের নিচে চাপা পরে যায়।❞

জাহিদা রহমান কেমন যেনো রুদ্ধশ্বাস গলায় বললেন, ‘তুমি…তার মানে এখনো ভালোবাসো মেয়েটাকে?তুমি তার জন্যই ফিরে এসেছো?’
‘হুম।’
‘তাহলে চলে কেনো গিয়েছিলে?’
‘ভুল বুঝে মা। অভিমান করে।’
‘এখন অভিমান ভেঙে গেলো?’
‘হুম ভাঙলো তো। ভালোবাসার কাছে অভিমান যে ফিকে মা।’

জাহিদা রহমান এই মুহুর্তে কল্পনা করলেন, ‘ইশ এই অভিমান টা যদি সারাজীবন বহাল থাকতো।’

‘আমি তো শুনেছি সেই মেয়ে মদ পান করে। ক্লাবে ঘুরাফেরা করে।’
‘সে তো আমারই জন্য তাই না?’

জাহিদা রহমান ছেলেকে একবার পরখ করে নিয়ে শুধু বললেন, ‘হুম’

ছেলেকে ভালো রাখতে চান তিনি। তাই সবসময় ছেলের না তে না করেন হ্যা তে হ্যা বলেন। কিন্তু তাই বলে নিজের ইচ্ছে তো বিসর্জন দিবেন না। যে কোনো ভাবেই হোক নিজের ইচ্ছে হাসিল করবেন।

_________________________________

নিয়নের পর বলতে গেলে প্রাপ্তি ঝুমকোর সবচেয়ে ভালো বান্ধবী। সেই বান্ধবী এখন অবধি জানে না রাহান-ঝুমকোর প্রেম কাহিনী। তার ভাষায়, সে শুধু জানে ঝুমকো ছেকা খেয়েছে। কিন্তু সেইদিন শপিং মলের সামনে ঝুমকোকে একটা ছেলের সাথে কথা বলতে দেখে প্রাপ্তির ভ্রু বেকে যায়। জহুরি দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে সবকিছু ভালো মতো পর্যবেক্ষণ করে। এরপর আজ ছুটে এসেছে ঝুমকোর বাড়ি। এসেই ঝুমকোকে ঝাপটে ধরেছে। কিন্তু ঝুমকো সবকিছু মানতেই নারাজ। সে কোনোকিছুই শিকার করছে না। এদিকে প্রাপ্তিও নাছোড়বান্দা। সে বারবার ময়না পাখির মতো একি বুলি আওড়াচ্ছে,

‘বল ছেলেটা কে ছিলো? এটাই কি সেই ছেলে? যে ছেকা দিয়েছিল তোকে। তোদের কথাবার্তা দূর থেকে একটু একটু শুনে তো তাই মনে হলো আমার। কি যেনো কামড়া-কামড়ির কথা বলছিলি তোরা।’

ঝুমকো বাঁকা চোখে তাকায়। প্রাপ্তি দমে গিয়ে নরম কন্ঠে বলল, ‘বল না দোস্ত। আমি না তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। ‘
‘কবে বলেছিলাম?’
‘তার মানে আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড না?’ প্রাপ্তির চোখ কপালে। ঝুমকো বিরক্তিতে চু শব্দ করে। প্রাপ্তি আবার হাসি হাসি মুখ করে ঝুমকোকে জড়িয়ে ধরে বলল,

‘আচ্ছা যাহ। আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড নাই বা হলাম।কিন্তু তুই তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। এখন বল না?’
‘কি বলবো?’
‘এটাই কি তোর সেই প্রেমিক?’
‘হুম’
‘হঠাৎ এতোদিন পর কই থেকে উদয় হইলো?’
‘জানি না।’
‘দোস্ত তোদের প্রেমের কাহিনী টা কি? কি হইছিলো আসলে?’
‘আমি নিজেও জানি না।’
‘বাল মার্কা কথাবার্তা বলো কেনো? তোমার আশিক ব্রেকাপ করছে আর তুমি জানো না?’

ঝুমকো বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ভাষা খারাপ করবি না। আমি কিছুই জানি না।’
‘বল না দোস্ত।’
‘ওয়েল, ওর সাথে আমার দু বছরের ও বেশি সময়ের সম্পর্ক ছিলো। এরপর একদিন আমি ভারসিটিতে তখন আমার ফোনে মেসেজ আসলো যেটাতে লিখা ছিলো, ওর কাছে মনে হচ্ছে এখন সময় সম্পর্কটা ভাঙার। ব্যস, এইটুকুই। এর বেশি কিছু জানি না। কেনো সে এমন করলো? আমার কি দোষ? কি করেছি আমি কিছুই জানি না। এরপর তিনবছর পর সে এখন ফিরে এসেছে। আমাকেও ফিরিয়ে নিতে চায়।’

ঝুমকো বড় করে একটা শ্বাস টানলো। প্রাপ্তি অবাক হলো মনে হয়। তারপরেও নিজের অবাকতা দমিয়ে বলল, ‘প্যাচ আপ করে নে তাহলে তুই।’
‘ইম্পসিবল।’
‘কেনো তুই তো এখনো উনাকে ভালোবাসিস তবে সব ঠিক করতে সমস্যা কোথায়?’
‘সমস্যা আছে দোস্ত?’
‘কি সমস্যা।’

ঝুমকো একটু থেমে অসহায় গলায় বলল, ‘ও আমাকে ঠকিয়েছে। হি চিটেড উইথ মি। তাছাড়া ও একটা গুন্ডা।’
‘হোয়াট?’
‘হুম’
‘তুই আগে জানতিস না? জেনে রিলেশনে জড়াস নি?’

ঝুমকো মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘জানতাম। সব ই জানতাম।’

প্রাপ্তি এবার ক্ষেপে যায়। বলল, ‘কিছুই তো বুঝলাম না। ঠিক মতো বলবি না কি? সব যদি জানিস ই তাহলে এখন ভাব ধরেছিস কেনো? উনার কাছে ফিরে যা। আচ্ছা তোদের প্রেমের কাহিনী টা ক। কীভাবে কি শুরু হইছে?’

ঝুমকো নির্লিপ্ততা চাহনি নিয়ে জানালা গলে বাইরে তাকায়। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। জানালা ছাড়িয়ে বৃষ্টির ছিটায় মেঝে পানি পানি হয়ে যাচ্ছে। ঝুমকো উঠে জানালা লাগিয়ে দেয়। ঝাপসা কাচের থাই গ্লাস টা এড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে নিবুত ভাবনায় বিভর হয়ে যায়। পাড়ি জমায় অতীতে। যেখানে ছিলো প্রতিটি কোণা ভালোবাসা দিয়ে কানায় কানায় ভরপুর। যেখানে ভালোবাসার ঝুম বৃষ্টি ভিজিয়ে দিয়ে যেতো ঝুমকো আর রাহানকে।

চলবে ❤️

সাইলেন্ট রিডাররা দয়া করে রেসপন্স করুন। কোনো কারনে আইডির রিচ এবং বিভিন্ন গ্রুপে গল্পের রেসপন্স একদম কমে গেছে। আমি লেখার মন মানসিকতা হারিয়ে ফেলছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here