অশ্রুমালা পর্ব ৭+৮

#অশ্রুমালা
Part–7
#Arishan_Nur (ছদ্মনাম)

চাই না মেয়ে তুমি অন্য কারও হও
পাবেনা কেউ তোমাকে তুমি অন্য
কারো নও
চাইনা মেয়ে তুমি অন্য কারও হও
পাবেনা কেউ তোমাকে তুমি অন্য
কারো নও
তুমি তো আমারই যানোনা হো ও ও ও
এ হৃদয় তোমারই ও ও ও
তোমাকে ছাড়া আমি,
বুঝি না কোন কিছু যে আর
পৃথিবী যেনে যাক
তুমি শুধু আমার!

আবেগ পরম আবেশে চোখ বুঝে গান গাচ্ছে আর লুকিয়ে লুকিয়ে রোদেলা মুগ্ধ নয়নে তাকে দেখেই যাচ্ছে। রোদেলার মনে হচ্ছে গানটা আবেগ তার জন্যই গাচ্ছে। তাকে ডেডিকেট করেই গাওয়া হচ্ছে এই গান। আবেগের কন্ঠে গানটা শুনে রোদেলার সদ্য প্রেমে পড়া হৃদয় বারবার বলে উঠে, আবেগ বুঝি তাকে ছাড়া কিছু বুঝে না৷ সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চায় সে রোদেলাকে ভালোবাসে। আবেগের মুখ থেকে “তুমি তো আমারই যানোনা হো ও ও ও ” লাইন টা শোনা মাত্র রোদেলার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। বুকের ভেতর রঙিন পাখি ডানা ঝাপ্টাতে লাগলো সেই সাথে দুচোখ জুড়ে লাল-নীল-সবুজ স্বপ্নেরা উড়াউড়ি শুরু করে দিয়েছে। রোদেলার মনে জমা সব স্বপ্নের শুরু ও আবেগ দিয়ে, সমাপ্ত ও আবেগের মাধ্যমে! এমন কি মাঝের সেতু ও তো আবেগ!

সময়টা রোদেলার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পরের কাহিনি। সে ফার্মগেটে রেটিনায় কোচিং করার জন্য আবেগদের বাসায় উঠেছে। ফার্মগেটে সব ভর্তি কোচিংয়ের মূল ব্যাঞ্চ তাই রোদেলাকে ফার্মগেটের রেটিনায় ভর্তি করানো হলো। রোদেলার বাসা মিরপুর। রেটিনায় সে টানা তিন দিন ক্লাস করার সিডিউল নেয় এজন্য সপ্তাহের তিন দিন আবেগদের বাসায় থাকত আর সপ্তাহের অন্যান্য দিন নিজের বাসায় পড়াশোনা করত।

রোদেলা গতকালকে মামার বাসায় এসেছে৷ কালকে বিকেলের পর এসেছে। তার বাবা এসে রেখে গেছেন। কালকে আসা থেকে রোদেলা আবেগকে এক ঝলক দেখার জন্য ছটফট করছে কিন্তু সাহেবের দেখা মিললে তো! হবু ডাক্তার সাহেব তো তার রুমে পড়া নিয়ে ব্যস্ত। কারো সাথে সাক্ষাৎ করার টাইম নেই তার। আগামীকাল নাকি আবেগের প্রফ। এমনটাই শুনল রোদেলা মামীর কাছ থেকে।

তাই তো মনের ছটফটানি নিয়ে সারা সন্ধ্যা পার করে দিল রোদেলা। মনে তীব্র আশা ছিল রাতে খাওয়ার টেবিলে দেখা হবে তাদের কিন্তু তার আশার আলোকে অন্ধকার করে দিয়ে আবেগ খেতে বের হলো না কারন তার নাকি পড়া শেষ হয় নি এখনো বাকি আছে। বাকি পড়া সে তার রুমে খেতে খেতেই পড়বে।

খাওয়ার টেবিলে মামী বললেন, ছেলেটা আমার সেই বিকাল পাচটায় পড়তে বসছে আর এখন সাড়ে দশটা বাজে! দেখো তো এখনো ওর নাকি পড়াই শেষ হয় নি।

রোদেলা হালকা হেসে দিল।

মামী তাকে উদ্দেশ্য করে বলে, মেডিকেলে কিন্তু অনেক পড়া। সারাদিন বইয়ে মুখ গুজে বসে থাকতে হবে রে রোদেলা! আবেগকেই দেখ, দিন নাই রাত নাই, খালি পড়া আর ক্লাস! প্রতিদিন ই ক্লাস টেস্ট হ্যান-ত্যান। জানো না তো! আবেগ যেদিন এটোপসি ক্লাস করে এসেছিল বেচারা আমার ছেলেটা রাতে ভাত খাইতেই পারে নি। যেই শার্ট পড়ে লাশঘরে ঢুকছে ওই টা আর কোন দিন পড়ে নি ও।

রোদেলা ছোট করে ও বলে প্লেটের ভাত নাড়াচাড়া করতে লাগলো। তার খেতে অস্বস্তি লাগছে। আজকে মেন্যুতে গরুর কলিজা। রোদেলা গরুর কলিজা খায় না। কেমন যেন লাগে তার । তাই খেতে পারে না। খিদাও পেয়েছে বেশ।

রোদেলার মনে হয়,অন্য কোথায় বেড়াতে গেলে খিদা বেশি লাগে৷

রোদেলা খাচ্ছে না দেখে মামা জিজ্ঞেস করল, কি রে? খাচ্ছিস না কেন? তরকারি ভালো লাগে নি?

তখনি ইভানা হুট করে বলে দিল, আল্লাহ! রোদেলা আপু তো কলিজা খায় না৷

মামা চিন্তিত মুখ নিয়ে বলে, আগে বলবি না? এই ময়নার মা জলদি একটা ডিম ভাজো তো।

রোদেলা ইতস্তত করে বলে মামা, লাগবে না। ঝোল দিয়ে খেয়ে নিব।

–আরে কেন? এখনি ভাজা হয়ে যাবে। ময়নার মা একটু জলদি করো।

ময়নার মা৷ রান্না ঘর থেকে বের হয়ে এসে বলে, জি ভাজতে দিসি তা পিয়াজ-মরিচ দিব ডিম ভাজিতে?

রোদেলা বলল, হ্যা দিয়েন৷

ময়নার মা বলে, আচ্ছা। আবেগ বাবা আবার ডিম ভাজিতে পিয়াজ-মরিচ খায় না তো তাই জিজ্ঞেস করলাম।

মামা বলে উঠে, আবেগের তো গরুর কলিজা খুব পছন্দ। খেয়েছে ও?

মামী জবাব দিল। হ্যা।

রোদেলা একথা শুনে মৃদ্যু হাসল।

পরের দিন ঘুম থেকে উঠার আগেই আবেগ চলে যায় প্রফ দিতে।

রোদেলা নিজেও কোচিংয়ে যায়। বিকেলে এসে ফ্রেস হয়ে হাতে এক কাপ চা নিয়ে ছাদে উঠে যায় এবং তখনি আবেগের কন্ঠে এই গান শুনে তার মন-মেজাজ মূহুর্তের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। সব ক্লান্তি চুকে যায়৷ মনে কেবল ভালোবাসার রঙ উড়াউড়ি করতে লাগে। সেই অনুভূতির কথা হয়তো লিখে প্রকাশ করা যাবেনা।

হুট করে বাবুর আওয়াজে অতীতের এক মধুর বিশেষ স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এলো রোদেলা। এতোক্ষন ধরে সে ভাবনার জগতে বিরাজ করছিল এখন বর্তমানে এসে পৌছালো।

সে দ্রুত বাবুর কাছে ছুটে যায় আর বাবুকে কোলে তুলে নেয়। সাথে সাথে বাবু কান্না থামিয়ে দেয়।

★★★

নেহা এখনো রেস্টুরেন্টেই বসে আছে৷ উঠার কোন নাম-গন্ধ নাই। সে অনবরত কেদেই যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টের মানুষ বারবার তার দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু কিছু বলছে না। সবাই শুধু দেখেই যাচ্ছে৷

কিছুক্ষন পর রেস্টুরেন্টে অথৈ ঢুকে হন্ন হয়ে নেহাকে খুজতে লাগলো।

অথৈয়ের চোখ কর্ণারের টেবিলে গিয়ে ঠেকল। সে দেখল নেহা চেয়ারে বসে কেদেই যাচ্ছে। তাকে দেখে অথৈয়ের কষ্ট হতে লাগে। সে বড় বড় পা ফেলে নেহার কাছে গেল এবং নেহার কাধে হাত রাখল।

কাধে হাত রাখা সত্ত্বেও নেহার মনে কোন ভাবান্তর হলো না। তাই অথৈ নেহাকে তার দিকে ঘুরিয়ে নেয় এবং নেহাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, কান্না থামা আর আবেগ ভাই কই?

একথা শুনে নেহা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, কোথায় আবার? বউয়ের কাছে গেছে৷

অথৈ ভ্রু কুচকে বলে, তোকে এই অবস্থায় রেখে চলে গেল?

নেহা কান্না থামিয়ে বলে, কেন যাবে না? কে হই আমি ওর? যে সাথে থাকবে? কেউ হই না।

–আচ্ছা, আচ্ছা। এগজ্যাক্টলী কি কি বলেছে ভাইয়া তোকে?

নেহা অসহায় গলায় বলে, কি আর বলবে? জাস্ট বলেছে মুভ অন করতে।

অথৈ হা হয়ে গেল। সে আবেগের কাছ থেকে এটা মোটেও আশা করে নি। আবেগকে সে যথেষ্ট সম্মান করে। অথৈ ভাবতেও পারেনি আবেগ এভাবে নেহাকে ডিচ করবে! সে আহত গলায় বলে, মুভ অন মানে?

নেহা দাতে দাত চেপে বলে, ওকে ভুলে যেতে বলেছে।

–হুয়াট! আর রোদেলা,,, অথৈ এইটুকু বলতেই

নেহা রাগী স্বরে চেচিয়ে বলে, খবরদার ওই মেয়ের নাম আমার সামনে নিবি না! সি ইজ এ বিচ! আমার সব কেড়ে নিল। দেখিস রোদেলা কোন দিন সুখী হবেনা। কোন দিন ও না,,,,,,,,কেদে দিয়ে বলে নেহা।

নেহার কথা শুনে অথৈয়ের কষ্ট হতে লাগে। কারন রোদেলাও তার বেস্টফ্রেন্ড। সে শুধু বলল, এভাবে বলিস না রে!

–কেন বলব না? কারো সুখ কেড়ে নিয়ে কেউ সুখী হয় না।

–দেখ! এখানে ওর কি করার ছিল।

নেহা কেদে দিল এবং বলল, ওর হাতেই সব ছিল৷ কেন ও আমার আবেগকে বিয়ে করল? হুয়াই? আই ওয়ান্ট মাই আন্সার! রোদেলা কে প্রতিটা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। অনেক বোঝাপোড়া বাকি ওর সাথে!

অথৈ বলে উঠে, চল বাসাই যাই।

নেহা বলে উঠে, চল।

নেহা গাড়ি সঙ্গে এনেছিল। অথৈ তাকে গাড়ি তে বসিয়ে দিল। নেহার গাড়ি চলা শুরু করলে অথৈ মনে মনে বলে।,পাচ বছর ধরে রিলেশন করার পর এখন কিভাবে আবেগ ভাই নেহাকে এভাবে চিট করে? আর কোন মুখেই বা বলে মুভ অন করতে! এরপর সে আবারো বলে উঠে, আমি তো ভুলেই গিয়েছি আবেগ ভাই কার বন্ধু। দুই বন্ধুর মধ্যে মিল না থাকলে বন্ধু হলো কিভাবে? তাই কাজ-কর্মে তো সাদৃশ্য থাকবেই!

★★★
আবেগ তার এক পরিচিত ভাইয়ের মাধ্যমে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে একটা গরু কিনল।আজকে রাতে গরুটাকে গ্যারেজে রাখবে। কালকে সকালের মধ্যে ই কুরবানি দিবে৷ মওলানা আর কশাইয়ের সাথে কথা বলে ফেলেছে।

আবেগের ঘরে ফিরতে রাত হয়ে গেল। সে এসে কোন দিকে না তাকিয়েই রমে ঢুকে ফ্রেস হয়ে শুয়ে পড়ে। শোয়ার আগে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নেয় রোদেলা আছে কিনা। কিন্তু নাহ সেই সময় রোদেলা রুমে উপস্থিত ছিল না। আবেগ চোখ বন্ধ করে ফেলে। বড্ড ক্লান্ত সে।

এদিকে রোদেলা বাবুকে নিয়ে ইভানার রুমে বসে আছে। একা একা বসে থাকতে ভালো লাগছিল না দেখে ইভানার রুমে এসে বসে আছে সে। ইভানার সাথে গল্প-গুজব করার জন্য আবেগ যে ঘরে এসেছে তা বুঝতে পারেনি সে। কেবল সাড়ে আটটা বাজে। এই বাসায় দশটার আগে কেউ ডিনার করে না।

আরো বেশ কিছুক্ষন পর রোদেলা কি মনে করে বাবুকে ইভানার কাছে রেখে তার রুমের দিকে পা বাড়ালো। রুমে ঢুকতেই আবেগের গায়ের গন্ধ ভেসে উঠে তার নাকে। সে চোখ বুলিয়ে দেখে আবেগ বিছানায় শুয়ে আছে৷ মনে হয় ঘুমাচ্ছে। রোদেলা রুমে ঢুকতেই গরুর হ্যাম্বা হ্যাম্বা শব্দ শুনতে পেল।

রোদেলা অবাকের শেষ পর্যায়ে চলে যায়। এখন তো কুরবানির ঈদ না। ঢাকা শহরে কুরবানির ঈদ ছাড়া গরু-ছাগলের ডাক শোনা যায় না।

সে আবেগের কাছে গিয়ে আবেগকে ডাকতে লাগে।

আবেগের ঘুম মাত্র লেগে এসেছিল।আর তখনি রোদেলার আওয়াজ শুনে সে বিরক্ত হয়ে পড়ল। মন-মেজাজ কিছু টা খারাপ করে চোখ খুলল। চোখের খোলার আগে সে ঠিক করে নেয় রোদেলা কে চরম কিছু কঠিন কথা বলবে। কিন্তু চোখ খোলার পর চোখের সামনে রোদেলাকে দেখে সে আর কিছু বলতে পারল না। রোদেলা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। রোদেলার চোখে উপচে পড়া মায়া! এই মায়ার অতলে যে কেউ ডুবে যায়!

সেজন্য আবেগ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।আবেগের মতে যেখানে মায়া আছে সেখানেই আগুন লুকিয়ে থাকে! মায়াকে নাগাল পেলেই আগুনে পুড়বে। তাই তো মায়া থেকে দূরে থাকতে চায় কিন্তু চাইলেই কি আর পারা যায়। বারবার মায়ায় জড়াতে হচ্ছে। আগুনে পুড়তে হচ্ছে।
ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়!

আবেগ রাগ করার ভান করে বলে, চেচাচ্ছো কেন?

রোদেলা মুখ কাচুমাচু করে বলে, গরু।

আবেগ এবার সত্যি সত্যি রেগে গিয়ে বলে, কিহ? তুমি আমাকে গরু বললা? হাউ ডেয়ার ইউ? আমি সোরোয়ার্দী মেডিকেল থেকে ডাক্তারি পাশ করছি আর আমাকে গরু বলছো? (কর্কশ কন্ঠে)

রোদেলা হন্তদন্ত করে বলে, না তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে আমি তোমাকে কেন গরু বলব? আমি তো বলতে চাচ্ছিলাম গরুর ডাক কোথা থেকে আসছে।

আবেগ বিরক্ত হয়ে গেল এবং বলল, কোথাও থেকে আসছে না। এই ফালতু কথা বলার জন্য আমার ঘুম নষ্ট করলে?

বলে আবেগ আবারো শুয়ে পড়ে যেই না চোখ বন্ধ করল ওমনি গরু ডেকে উঠে। আর রোদেলাও এক প্রকার চিল্লিয়ে বলে, এই যে গরু ভ্যাবাচ্ছে । শুনতে পেয়েছো?

আবেগ আরেক দফা বিরক্ত হয়ে বলে উঠে, গরুর ভ্যাবানির না শুনলেও তোমার ভ্যাবানির শব্দ স্পষ্ট শুনেছি।

একথা শুনে রোদেলা মুখ কালো করে বলে,কোথা থেকে আসছে শব্দ?

–নিচ থেকে। গরু কিনে এনেছি। কালকে আকিকা করা হবে। সকাল দশটার আগেই কুরবানি হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

আবেগের জবাব শুনে আর কিছু বললো না রোদেলা। চুপচাপ থাকলো। সে রাতে আর আবেগ উঠে নি। এক ঘুমে রাত পার। কিন্তু রোদেলার ঘুম হয় নি।

আবেগের প্রতি রোদেলার পুরোনো অনুভূতিদ্বয় পুরনায় মনের মধ্যে দোলা দিয়ে যাচ্ছে।

রোদেলা কোথায় যেন পড়েছিল, আমরা নাকি কারো ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়ি! তার ক্ষেত্রে ও বুঝি তাই হচ্ছে!

পুরোনো সব জিনিসের মূল্য কমে যায় কদর শেষ হয়ে যায়। কিন্তু পুরোনো অনুভূতির মূল্য দিন দিন আরো বেড়ে যায়!

রোদেলা আবেগের দিকে তাকালো। তার মনের মধ্যে জলোচ্ছ্বাস বয়ে যেতে লাগলো।

পরের দিন পরিকল্পনা মাফিক দশটার মধ্যে কুরবানী হয়ে যায়। মওলানা এসে দোয়া পড়ে আকিকা করে । নাম আবেগ যা ঠিক করেছে সেটাই রাখা হলো।

নামটা রোদেলার বেশ মনে ধরেছে।” সমুদ্র” খুবই সুন্দর নাম। এই নামটা বুঝি কোন দিন পুরোনো হবে না। রোদেলা খুব করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করল তার ছেলেটার মন ও যেন সমুদ্রের মতো সুবিশাল হয়।

কুরবানির মাংস সমান তিন ভাগ করা হলো। এক ভাগ গরীবদের জন্য, আরেক ভাগ আত্মীয়ের জন্য আর শেষ ভাগ তাদের জন্য। সব বিতরনের পর কয়েক কেজি মাংস ময়নার মা রান্না করার জন্য বসিয়ে দিল। আত্মীয় তেমন কেউ আসেনি। হাতে গোনা কয়েকজন আত্মীয় এসেছে। যারা এসেছে তাদের সাথে আবেগ আর রোদেলার রক্তের সম্পর্ক।

সমুদ্রের চুল কামানো হলো।

সব কাজ শেষ করে বাসায় ঢুকতেই আবেগের কানে আসল, তার মা ড্রয়িং রুমে বসে তার চাচীর সাথে দুঃখ প্রকাশ করে বলছে, এই দিন ও দেখা লাগলো! আমার ছেলে অন্য বংশের ছেলের আকিকা দিচ্ছে। কি কপাল আমার।

আবেগ ঘরে ঢুকতেই তার মা চুপ হয়ে গেলেন। আবেগ পালটা জবাব না দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়।

এদিকে রোদেলা সমুদ্রকে খাইয়ে মাত্র উঠলো তাতেই তার ফোনে কল আসে৷

সে ফোন হাতে নিয়ে দেখে আননোন নাম্বার থেকে কল আসছে।

রোদেলা রিসিভ করে সালাম দিয়ে বলে, হ্যালো?।

অপর প্রান্তের লোক চুপ। রোদেলা আবারো বলে, কে বলছেন?

ওপাশ থেকে ভরাট কন্ঠে বলে, কেমন আছো জানেমন!

রোদেলা এই কন্ঠ শুনে অস্ফুটস্বরে বলে উঠে, রি,,,,,রি,,রিশা,,,দ!
#অশ্রুমালা
Part–8
#Arishan_Nur (ছদ্মনাম)

রোদেলা দরদর করে ঘামতে লাগল। আশেপাশে সব অন্ধকার দেখতে লাগলো। মাথার মধ্যে চিনচিন ব্যথা করা শুরু করলো তার। বড় বড় ঢোক গিলতে লাগলো সে। প্রচুর তৃষ্ণা পেতে লাগলো তার। রিশাদ তাকে কল দিয়েছে৷ এটা যেন আজরাইল দেখার চেয়েও ভয়ংকর তার কাছে! কিন্তু কেন? এতো কিছুর পর ও কি চাই তার?

রোদেলা ভয় পেতে শুরু করে৷ ওপাশ থেকে রিশাদের ভয়েস আবারো পেল। রিশাদের কন্ঠ শুনতেই রোদেলার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। চোখ-মুখ রক্তশুন্য হতে লাগলো।

রোদেলার মুখ দিয়ে কোন শব্দ ই বের হতে চাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কেউ তার গলা চেপে ধরে রেখেছে৷

রিশাদ বলে উঠে, কি গো সুন্দরী! কি করছো? কেমন আছো? আমার কথা মনে আছে? আমি তোমার স্বামী!

রোদেলা অনেক কষ্টে বলে উঠে, আমার স্বামী আবেগ। আমার হাসবেন্ড আবেগ তুমি না। আর কি চাই?

রিশাদ হোহো করে শয়তানী হেসে বলে, তোমাকে চাই গো!

–জাস্ট সাট আপ।

–আমি তোমাকে নিতে আসছি। আমার ছেলেটাকে কত দিন ধরে দেখি না!

রোদেলা মনে সাহস জুগিয়ে বলে উঠে, কে তোর ছেলে? সমুদ্র শুধু মাত্র আমার ছেলে।

ওপাশ থেকে রিশাদ বলে, বাহ! সমুদ্র নামটা তো দারুণ! তবে তোমার আর আমার নাম থেকে মিলিয়ে রাখলে বেটার হত। আফটার ওল, বাবা-মায়ের অংশ ই সন্তান!

–খবরদার সকুদ্রকে নিজের ছেলে বলবে না৷

–কেন বলবো না? আমার রক্ত বইছে আমার ছেলের গায়ে! অস্বীকার তো করা যাবে না।

রোদেলা কঠিন গলায় বলে, এখন তোর ছেলে? আগে তো মেরে ফেলতে চাইতি। এখন কোন সাহসে বলিস আমার ছেলে তোর ছেলে হয়?

–কি করব বল? পিতৃত্ব বোধ জেগে উঠছে। হাহাহা।

–জানোয়ার তুই একটা! ভুলে ও আমার ছেলের দিকে নজর দিবি না। ও শুধু আমার ছেলে। মনে রাখিস, জন্ম দিলেই পিতা হওয়া যায় না৷

একথা শুনে রিশাদ বলে উঠে, একটু ভুল বললে জানেমন! জন্ম আমি দিই নি তো তুমি দিয়েছো। আমি জাস্ট স্পার্ম সাপ্লাই দিয়েছি।

রোদেলা এটুকু শুনে ফোনের লাইন কেটে দিল।

ফোন কেটে দিয়েই সে ধপাস করে বিছানায় বসে কান্না করতে লাগলো। কি হচ্ছে তার সাথে? রিশাদ কেন আবার ঝামেলা করছে। রিশাদ যেন কোন ঝামেলা করতে না পারে সেজন্য ই তো আবেগকে বিয়ে করেছে। ডিভোর্স এর পর ও রিশাদ রোদেলাকে হ্যারেস করছিল। বারবার ফোর্স করছিল যেন রোদেলা আবারো ফিরে আসে তার কাছে। কিন্তু ডিভোর্স তো হয়ে গেছে ততোদিনে!

কিন্তু এই ডিভোর্স নাকি রিশাদ মানে না। তাই তার বউকে ফেরত নিয়ে যেতে চায়। যেহুতু রিশাদ ক্ষমতাসীন তাই রিশাদ তিন দিন আগে রোদেলাদের বাসায় হামলা করে৷ ভাগ্যিস কোন ক্ষতি করতে পারেনি রিশাদ তাদের। পাড়ার সব ছেলে-পুরুষ আর প্রতিবেশী রা এসে রোদেলা আর তার মা-বাবা কে বাচিয়ে দিয়েছিল। রিশাদ হাতে-গোনা দশটা ছেলে আনছিল আর রোদেলাদের এলাকার অনেক মানুষ এক জোট হয়ে সেদিন রক্ষা করেছিল রোদেলাকে। এতো মানুষ দেখে ঘাবড়ে যায় রিশাদ তাই তো সুরসুর করে পালিয়ে যায়। সেদিন রাতেই মামা সিদ্ধান্ত নেন যেন রোদেলার বিয়ে আবেগের সাথে হবে। আর তার পর দিন ই বিয়ে হয়ে গেল। রোদেলা নিজেও খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল রিশাদের এমন আক্রমণে। সে আর কোন ভাবেই রিশাদের কাছে ফিরতে চায় না। মরে গেলেও না। আর সমুদ্রের সুরক্ষার জন্য হলে বাধ্য হয়ে স্বার্থপরের মতো আবেগকে বিয়ে করে নিজের মাথার উপর একটা ঢাল বানিয়ে নিল। একটা বিবাহিত মেয়েকে তো আর রিশাদ হ্যারেস করতে পারবে না। রোদেলার মা-বাবা রোদেলার বিয়ে দিয়েই গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। ওখানে রোদেলাদের সব আত্মীয় স্বজনরা থাকে। গ্রামে রোদেলার বাবা অনেক সম্ভ্রান্ত ঘরের লোক তাই সেইভ থাকবে গ্রামে। রোদেলাকে রিশাদের মতো পিচাশের জন্য বাচানোর জন্য ই তার মামা তথা ইমতিয়াজ রহমান তার ছেলের সাথে রোদেলার বিয়ে দিয়ে দেন এবং রোদেলার মা-বাবা কে গ্রামে পাঠিয়ে দেন।

রোদেলা জানে সে খুব স্বার্থপরের মতো কাজ করে ফেলেছে। আবেগ আর নেহার মধ্যে চলে এসেছে৷ কিন্তু কি করবে? মায়েরা তো স্বার্থপর ই হয়! সন্তানের সুরক্ষা আর সুখ ছাড়া কিছু বুঝি না।

রিশাদের এমন আক্রমণে রোদেলা খুব ভয় পেয়ে গেছে কারন রিশাদের এভাবে হামলা করার একমাত্র কারন হলো সমুদ্র। রিশাদ কোন কালেই চাইত না রোদেলার বাচ্চা ভূমিষ্ট হোক। যখন থেকে তারা বাবু হওয়ার খবর পেয়েছে রিশাদের অত্যাচার বেড়ে যায়। রিশাদ অনেক চেষ্টা করেছিল রোদেলাকে এবার্শন করানোর কিন্তু রোদেলা তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল৷ সে কিছুতেই তার বাচ্চাকে মারবে না। চারমাস প্রেগ্ন্যাসি অবস্থায় সে তার বাবার বাসা চলে আসে। তাই তো বাচ্চাটাকে রক্ষা করতে পেরেছিল রোদেলা।

কাহিনি যদি এখানেই শেষ হতো তাও মানা যেত কিন্তু এরপর রিশাদ যা করেছিল সেটা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে তা সম্ভব কিনা জানে না রোদেলা।

রোদেলার প্রেগ্ন্যাসির লাস্ট উইক চলছিল। এক সপ্তাহ পর ডেলিভারি ডেট। সেদিন বিকেলে রিশাদ হুট করে রোদেলার বাসায় চলে আসে। তখনো রোদেলা আর রিশাদের ডিভোর্স হয় নি। প্রেগ্ন্যাসি অবস্থায় নাকি ডিভোর্স বা বিয়ে হয় না তাই ডিভোর্স স্থগিত ছিল।

যেদিন বিকেলে রিশাদ আসে ওই দিন রোদেলা বাসায় একা ছিল। রোদেলার মা-বাবা একটু বাইরে গিয়েছিল। হয়তোবা রিশাদ তাদের উপর নজরদারি রাখত তাই রোদেলার বাবা-মায়ের অনুপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। তাই তো রিশাদ বাসায় ঢুকে রোদেলার পেট বরাবর লাথি মারে। তার একটাই কথা — বাচ্চা চাই না। এই বাচ্চাকে নাকি সে কিছুতেই পৃথিবীতে আসতে দিবে না।

অথচ আজকে কি বলছে পিতৃত্ববোধ আসছে তার মধ্যে!

ওই দিন রোদেলা মরতে মরতে বাচছে। আল্লাহ বুঝি আবেগকে উছিলা করে পাঠিয়েছিল রোদেলা কে বাচানোর জন্য।

রিশাদ রোদেলার পেটে লাথি মারলে রোদেলা সেই ব্যথা সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যায়। হয়তো ব্লিডিং শুরু হয়ে গিয়েছিল ততোক্ষনে ।

এরপর আর রোদেলার কিছু মনে নেই। বাকিটা মায়ের মুখে শুনেছিল রোদেলা। আবেগ নাকি তাকে দেখতে এসেছিল আর ভেতরে ঢুকে রোদেলাকে এভাবে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে এবং তারপর দ্রুত হাসপাতালে এডমিট করায়,,,,,,,

চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here