অশ্রুমালা পর্ব শেষ

#অশ্রুমালা
#শেষপর্ব (প্রথম খন্ড)
#Arishan_Nur (ছদ্মনাম)

বিছানার এক সাইডে লাল শাড়ি, গহনা, ঘোমটা, নাকফুল সব সাজিয়ে রাখা আছে। বিয়ের সব জিনিস অথৈকে তার বাবা কিনে দিয়েছে। গায়ে হলুদের শাড়ি-গহনা ফয়সালের পরিবার দিবে।

অথৈ শাড়ি টা হাতে নিল। লাল শাড়ির পাড়ে গোল্ডেন কাজ করা। সে খুটে খুটে শাড়িটা দেখছে৷ নেড়েচেড়ে দেখতে বেশ ভালো লাগছে তার। সত্যি বলতে, শাড়িটা তার খুব খুব পছন্দ হয়েছে৷ গায়ে জড়িয়ে দেখতে মন চাচ্ছে কিন্তু ইচ্ছে হচ্ছে না।

অথৈ ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস পড়েছিল,বাঙালী মেয়েদের নাকি বিয়ের সবকিছু তার পছন্দ মতো কিনে দেওয়া হয় কিন্তু জীবনসঙ্গীটাই মন মতো দেওয়া হয় না। লেখাটা যখন পড়েছিল পাত্তা দেয় নি সে। আজকে মনে হচ্ছে তার ক্ষেত্রে কথাটা সত্য!

অথৈ বড় করে একটা শ্বাস নেয়। আজকে থেকে অফিস ছুটি। তিন দিন পর বিয়ে। ভাইয়া এখনো বাসায় আছে। বিয়ের পর যাবে৷ তারা প্রতিদিন একসাথে তিনবেলা খায়, গল্প গুজব করে। বিকেল করে দাবা খেলতে বসে। অথৈ প্রথমে ভেবেছিল বাবা নামক মানুষটার সাথে তার এতোটা মিশতে সংকোচ হবে কিন্তু তার এই ধারণা ভুল প্রমানিত হয়েছে৷ খুব তাড়াতাড়ি বাবার সাথে খাপ খাওয়াতে পেরেছে সে।

এখন বিকেল। তাই ড্রয়িং রুমে গেল অথৈ। ইতার ভাই অর্পণ বসে আছে সোফায়। তাকে আসতে দেখে অপণ মুচকি হেসে বলে, চল এক দান দাবা খেলি।

অথৈ অপর্ণের বিপরীতে বসে বলে, গুটি সাজা।

–ওক্কেই।

অপর্ণ দাবার বোড সাজিয়ে বলে, তুই আগে দান দে।

অথৈ প্রথমে মন্ত্রীর সামনের পিলটা দিল। এই টেকনিক টা বাবা শিখিয়েছে। খেলার শুরুতেই মন্ত্রী আর রাজার সামন থেকে নাকি পিল দিলে সুবিধা হয় খেলতে৷

এভাবে এক দান দুই দান করে খেলা মাঝে চলে আসে । অপর্ণ অথৈকে কাবু করে ফেলেছে৷ অথৈ বরাবর ই উইক খেলায়৷ চাল বুঝে কম। তারপর সে সবসময়ই চায় তার মন্ত্রী যেন সেইভ থাকে। এজন্য খুব মসিবতে পড়ে সে।

এখন সে বিপাকে পড়ে গেছে। কি দান দিবে সে।
সে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। কখন যে আজিজুল সাহেব এসে দাঁড়িয়েছে অথৈ জানেই না।

উনিই বলে উঠে, কালো হাতিটা অপর্ণেরর ঘোড়ার পাশে দাও।

অথৈ বাবার আওয়াজ পেয়ে একবার তার দিকে তাকিয়ে নেয় পরে সেই দান ই দেয়। খেলা শেষ হলো। অপর্ণই জিতেছে৷

অপণ বলল, যাক তোর অবস্থা একটু হলেও ভালো হয়েছে। আগে তো ঘোড়ার দানই চালতে পারবি না।

অথৈ ভেংচি কাটলো। তখনি ফয়সালের কল আসল। সে কল রিসিভ করতেই ফয়সাল জানায় সে অথৈয়ের সাথে দেখা করতে চায়৷

অথৈ অনিচ্ছা সত্ত্বেও রেডি হলো। যাওয়ার আগে আজিজুল সাহেব বললেন, উনি অথৈকে রেস্টুরেন্টে রেখে আসবে। ওদিকে নাকি ওনার কি কাজ আছে।

অথৈ তার বাবার সাথে রিকশা করে রেস্টুরেন্টের দিকে যাচ্ছে। এমন সময় জুনায়েদ ভাই নামে কেউ তাকে কল দিল। আজিজুল সাহেব নামটা দেখে বলে, কে এই ছেলেটা?

অথৈ উত্তর দিল, তার সিনিয়র হয়। অফিসের বস। তাদের অফিসে কেউ স্যার-ম্যাডাম বলে ডাকে না। এজেন্সি জন্য ভাইয়া-আপু ডাকে সবাই।

জুনায়েদ ভাই ফোন দিয়েছে কারন তার ছেলের জন্মদিন তাই দাওয়াত দিল।

কথা শেষ হতেই রেস্টুরেন্টে চলে আসে রিকশা। অথৈ নেমে সোজা রেস্টুরেন্টে চলে যায়। আজকে থেকে আজীবন তাকে অভিনয় করে চলতে হবে। তারই পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছে সে৷ এবং আউটপুট যথেষ্ট ভালো।

সে ভেতরে ঢুকে পড়ে। দেখতে পেল ফয়সাল চেয়ারে বসে ফোন চালাচ্ছে।

অথৈ গিয়ে চেয়ারে বসল। ফয়সাল বলে উঠে, দেরি কেন হলো আসতে?

অথৈয়ের মেজাজটা খারাপ হলো। সে তাও নিজেকে সামলে বলে, হুট করে ডাকলে কেন? কোন দরকার?

ফয়সাল ফোন রেখে কিছুটা ধমকে উঠে বলে, আমার হবু বউকে আমি যখন-তখন ডাকতে পারি। গেট ইট?

অথৈ মাথা নিচু করে ফেলে। প্রতিবাদ করার না আছে ইচ্ছা আর না শক্তি। তারচেয়ে চুপ থাকাই শ্রেয়। তখনি জুনায়েদ ভাই আবারো কল দিল৷ অথৈ ফোন কেটে দিল। আবারো কল হলো। অথৈ আবারো কেটে দেয়। তৃতীয়বার কল আসলে ফয়সাল বলে, ফোনটা আমাকে দাও তো।

অথৈ বিষ্ফরিত চোখে ফয়সালের দিকে তাকিয়ে ফোনটা তার হাতে দিল।ফয়সাল ফোনটা হাতে কল কেটে দেওয়ার পর ফোনটা সজোরে ভেঙে ফেলল। অথৈ ভয় পেয়ে যায়।

ফয়সাল দাতে দাত চেপে বলে,এই লোক তোমাকে কেন কল দিচ্ছে?

অথৈ রক্তবর্ণ চোখে ফয়সালের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি এই প্রশ্ন করে কি বুঝাতে চাচ্ছো?

–এফেয়ার আছে নাকি তোমার এই লোকের সাথে।

–জাস্ট সাট আপ ফয়সাল। তোমার কোন অধিকার নেই আমার সম্পর্কে এমন কোন মন্তব্য করার। তুমি খেয়াল কর নি জুনায়েদ এর পর ভাই লেখা আছে।

ফয়সাল তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, ভাইয়া কখন যে সাইয়া হয় কে জানে? লোকটার সাথে কয়বার ডেটে গেছো?

অথৈ এবার হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। চোখ ফেটে পানি পড়বে পড়বে ভাব। সে নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নিচ্ছে৷ কেদে দিলেই উপহাসের শিকার হতে হবে তাকে।

ফয়সাল হুংকার দিয়ে বলে, তুমি মাঝখানে এক রাতে বাসায় ছিলে না। কোন জানি ফ্রেন্ডের বাসায় ছিলে,,,নেহা নামের কোন ফ্রেন্ড। আমি খোজ নিয়েছি তুমি ওদের বাসায় ছিলে না ওইরাতে। নিশ্চয়ই এই লোকের সাথে কোথাও নাইট স্টে করেছো। তাই না অথৈ? নিজেকে ধোয়া তুলসি পাতা ভেবো না।

অথৈ থমকে গেল। এখন সে কি বলবে?

ফয়সাল উঠে এসে অথৈকে জোর করে দাড় করায় এবং প্রায় চিৎকার করে বলে, কি হলো উত্তর দাও৷ কার সাথে ছিলে সে রাতে? এই লোকের সাথে নাকি অন্যকারো সাথে?

অথৈ আস্তে করে বলে, ফয়সাল এটা পাবলিক প্লেস৷ এখানে কোন সিনক্রিয়েট করবে দয়া করে৷ তোমার সম্মান না থাকলেও আমার সম্মান আছে।

ফয়সাল বাজে করে হেসে বলে, আচ্ছা! তোমার সম্মান আছে। হাসাইলা আমাকে। কাজ তো করো ছোট পোস্টে। তুমি যেই পোস্টে জব করো না সেটা জব সেক্টর না, মেয়েরা ওই সেক্টরে কাজ করেই অফিসের বস সহ ক্লাইন্টদের শরীর দেখিয়ে খুশি করা। আমি বোধহয় এসব বুঝি না।

অথৈ কাঠ গলায় বলে, চুপ করো ফয়সাল। না জেনে একদম কথা বলবে না। এতোই যদি সমস্যা থাকে তাহলে বিয়ে করছো কেন আমাকে?

–সেটাই! কেন করছি বিয়ে তোমাকে? না আছে তোমাদের অঢেল টাকা-পয়সা আর তাছাড়া তুমিও সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস।

–ফয়সাল! (রেগে মেগে চিৎকার করে অথৈ)

অথৈ ভীষণ রেগে গিয়ে বলে, আর একটা বাজে কথা বললে আমি কিন্তু তোমাকে ছাড় দিব না৷

ফয়সাল ও তেড়ে এসে অথৈয়ের হাত শক্ত করে ধরে বলে, তোর সাহস তো কম না আমাকে ধমকাস?

–তুই-তুরাকি করছো কেন তুমি? তোমাকে তোমার বাবা-মা ভদ্রতা শেখায় নি?মেয়েদের সাথে কিভাবে কথা বলতে জানো না তুমি?

ফয়সাল রেগে গিয়ে অথৈয়ের গালে সজোরে থাপ্পড় বসালো। রেস্টুরেন্টের সবাই অবাক এবং হতভম্ব হয়ে অথৈয়ের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।

অথৈয়ের চোখ ফেটে কান্না চলে আসল। সে এক মূহুর্ত সময় না থেমে সোজা বাইরে চলে আসে।

সিড়ির সামনে যেতেই দেখল আজিজুল সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। অথৈ তার বাবাকে দেখে ঘাবড়ে গেল৷ পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে বলে, তুমি এখানে!

–হ্যা। তোকে খুজতে খুজতে এদিকটায় আসলাম। তোর হাতে কোন টাকা দেই নি। ভাবলাম কিছু টাকা দিয়ে যাই৷

অথৈয়ের খুব কান্না পাচ্ছে কিন্তু সে কান্না আটকে রেখে বলে, ওহ। আমিও বের হয়ে এলাম।বাসায় যাব এখন। তোমার না কাজ আছে? যাও কাজে।

–নাহ। কাজটা হবে না।

–ও।

অথৈ সামনে এলোমেলো পা বাড়ালো। বাবা কি দেখে ফেলেছে ফয়সাল তাকে থাপ্পড় মেরেছে? মনে হয় না দেখেছে। বাবা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল আর কাহিনি ঘটেছে রেস্টুরেন্টের ভেতরে৷ দেখার কোন চান্স নেই।

আজিজুল সাহেব রিকশা ঠিক করলেন। দুইজন পাশাপাশি বসে আছে। অথৈ অনেক কষ্টে কান্না চেপে রেখেছে।তাই সে মৃদ্যু কেপে উঠছে।

বাসায় পৌছে অথৈ সোজা তার রুমে চলে যায়। বিছানায় উবু হয়ে শুয়ে হাউমাউ করে কেদে দেয়। মুখে বালিশ চেপে কাদছে সে। যেন কেউ তার কান্নার শব্দ শুনতে না পারে।

কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে সে৷ বেশ কিছুক্ষণ পর তার মা এসে তাকে ডেকে তুলে।

অথৈ ফোলা চোখে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে মা?

–ফয়সাল রা এসেছে। তুই বাইরে আয়।

–ওরা কেন এসেছে?

–তোর বাবা ডেকেছে। আয় মা জলদি আয়।

–আসছি৷

অথৈ মুখে পানি দিয়ে মাথায় হাজারো চিন্তা বহন করে ড্রয়িং রুমে পা বাড়ায়৷

ভাইয়া আর বাবা বসে আছে পাশাপাশি। অপর্ণ অথৈকে নিজের পাশে বসতে বলে। অথৈ তার ভাইয়ার পাশে গিয়ে বসে পড়ে।

তার চোখ ফুলে আছে৷ পরনের জামাও চেঞ্জ করেনি সে। অথৈ ফয়সালের দিকে তাকালো। তাকে দেখে ফয়সাল হাসি দিল যা দেখে অথৈয়ের গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। এই হাসির মধ্যে সৌজন্যতা ছিল না। ছিল উপহাস!

অথৈ মাথা নিচু করে নেয়। মেঘ তাহলে ঠিক বলেছিল! যদিও বা সেদিন মেঘ যা বলেছিল অথৈ বিশ্বাস করে নিয়েছিল। ফয়সালের জায়গায় মেঘ হলে কোন দিন ই তাকে থাপ্পড় মারত না। বরং তার সাথে জুনায়েদ ভাইয়ের ছেলের জন্মদিনে যাওয়ার বায়না ধরত!!!

অথৈয়ের বাবা ফয়সালের বাবা-মাকে উদ্দেশ্য করে বলে,আপনাদেরকে একটা বিশেষ জরুরি কথা বলার জন্য এতো কষ্ট করে ডেকে এনেছি।

ফয়সালের বাবা-মা বলে, জি বলুন।

–এই বিয়েটা হচ্ছে না। দুঃখিত। ক্ষমা করে দিবেন। আমি আমার মেয়ে আপনার ছেলের হাতে তুলে দিতে পারব না।

অথৈ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে মাথা তুলে তার বাবার দিকে হতভম্বের চোখে তাকায়।

অথৈ মা চমকে উঠে বলে,এসব কি বলছো তুমি? মেয়েটার কাল বাদে পড়শু বিয়ে আর তুমি বিয়ে ভেঙে দিচ্ছো? লোকে কি বলবে?

ফয়সাল ও যেন বোকা বনে গেল। সে ভাবেও নি এমন কিছু হবে।

অথৈ কান্না করে দিল খুশিতে। অপর্ণ তার হাত শক্ত করে ধরে নিজের বুকে বোন কে আগলে নিল। তারপর ফিসফিস করে অথৈ কে কানে কানে বলে, বাবা আমাকে সব জানিয়েছে। ফয়সাল তোকে রেস্টুরেন্টে এক গাদা মানুষের সামনে থাপ্পড় মেরেছে– বাবা এই দৃশ্য দেখে ফেলেছেন ভাগ্যক্রমে। ওর সাহস কিভাবে হয় আমার বোনকে থাপ্পড় মারার?ওর হাত আমি কেটে ফেলব।

অথৈ ভাইয়াকে শক্ত জোড়ে করে আকড়ে ধরে।

আজিজুল সাহেব বলে, যেই ছেলে আমার মেয়েকে সম্মান করতে পারে না তার কাছে আমার মেয়ে সুখ পাবে না। যে ছেলে বিয়ের আগে আমার মেয়েকে সবার সামনে থাপ্পড় মারতে দ্বিধাবোধব করে না সে বিয়ের পর আমার মেয়ের কি অবস্থা করতে পারে তা এখনি ভাবলে আমার রক্ত পানি হয়ে যাচ্ছে। আমার মেয়েকে সন্দেহ করে এখনি! তার চরিত্র নিয়ে অপবাদ দিতে এক সেকেন্ড সময় নেয় না তার কাছে আমার মেয়ে ভালো থাকবে না। এই বিয়ে হচ্ছে না৷ আপনারা এখন আসতে পারেন।

ফয়সালের মা মিনমিন সুর তুলে বলেন, ফয়সালের ভুল হয়ে গেছে। ও সুধরে নিবে। আর ভুল হবে না৷

আজিজুল সাহেব কঠিন গলায় বলে, এই ধরনের ছেলেরা কোন দিন ঠিক হয় না। আপনার যান প্লিজ।

অথৈ সবটা এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে।

এরপর যা হলো তা কল্পনাতীত! আজিজুল সাহেব নিজে থেকে অথৈকে বললেন, মেঘকে কল দিতে। সে নিজে মেঘের কাছে ক্ষমা চেয়ে তার মেয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠাবে।

অথৈ কাদতে কাদতে অপর্ণের ফোন দিয়ে মেঘকে কল লাগায়। এ কান্না কিছু ভালো হওয়ার আশায়!

★★★

মেঘ স্টেশনে ছিল। রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে রিশাদের। সেটাই নিজ চোখে দেখে মনের ক্ষত মেটাচ্ছিল। রিশাদ কোন উত্তর ই ঠিকঠাক ভাবে দিচ্ছে না জন্য অফিসার দের কাছে উত্তম-মধ্যম ক্যালানি খাচ্ছে। তাও উত্তর দেয় না৷

মেঘের সামনেই রিশাদের গায়ে ফুটন্ত গরম পানি ঢালা হলো। রিশাদ আর্তনাদে কুকিয়ে উঠে, সব স্বীকার করে নেয়

মেঘ রিশাদের দিকে তাকিয়ে থাকে৷

রিশাদ গড়গড় করে, সব সত্য বলে দেয়। তারপর এক দন্ড চুপ থেকে রিশাদ বড়াই করে বলে, তোরা আমার কিছুই করতে পারবি না। আমি দুইদিনের মধ্যে বের হয়ে যাব দেখে নিস৷

মেঘ বুকের উপর দুই হাত গুটিয়ে নিয়ে বলে, কিভাবে বের হবি?

–টাক ঢাললেই বেইল পেয়ে যাব৷

–সেই টাকাটা কে দিবে?

–আমার কি টাকার অভাব পড়ছে নাকি?

মেঘ হোহো করে হেসে বলে, তুই দেখি কিছুই জানিস না। কেউ কিছু জানায় নি তোকে?।

রিশাদ ভড়কে গিয়ে বলে, কি জানি না আমি?

–তোর , বাড়ি-ঘর, গাড়ি, ব্যাংকব্যালেন্স সব নিলামে উঠছে। সব দুর্নীতি করে কামাইছিস রেইট ফেলছিলাম কালকে ভোরে তোর বাসায়। শালা বাসাটাও দুই নাম্বারি করে বানাইছোস!।

রিশাদ অদ্ভুত ক্রোধ চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে৷

মেঘ শিস বাজাতে বাজাতে বলে, আরো একটা খবর আছে। একদম লেটেস্ট নিউজ। তাহলো শেখ প্রাচুর্য তোর বিসনেস দখল করে নিসে। সো আল্টিমেটলি তুই এখন রাস্তার ফকিরের মতো হতদরিদ্র। তোর দুই টাকাও নাই এখন। বেইল করে ছাড়া পাওয়া তো দূরের কথা। তোর যে অবস্থা করছি না? অন্যান্য রাজনীতিবিদ রা তোর দিকে ঘুরেও তাকাবে না।

রিশাদ ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। তার মাথায় হাত৷

মেঘ বের হয়ে গেল রিমান্ডে রুম থেকে। তখনি ফোন বেজে উঠল। আননোন নাম্বার থেকে কল আসছে দেখে সে প্রথমে রিসিভ করে না। দ্বিতীয়বার কল আসলে সে ফোন ধরতেই অথৈয়ের কান্নার শব্দ পায় তাতেই তার হৃদপিন্ডের স্পন্দন বেড়ে গেল৷ এই কান্নার শব্দটা তার বুককে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে অপরপাশের ব্যক্তি কি তা বুঝতে পারছে?

মেঘ ঘাবড়ে গিয়ে বলে, কি হয়েছে অথৈ?

–মেঘ?

–হু বল।

–আমাকে বিয়ে করবে তুমি?

মেঘ প্রথমে বুঝতে পারেনি কি বলছে অথৈ। সে থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকল।

অথৈ কাদতে কাদতে বলে,জানি আমি অনেক স্বার্থপর। তোমার উচিত এই মূহুর্তে ফোন কেটে দেওয়া এবং আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য হলেও আমাকে বিয়ে না করে অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করে নেওয়া।

মেঘ বলে উঠে, আসছি। আমি আসছি।জাস্ট এক মিনিট সময় দাও।

মেঘ ফোন কাটল না। কল লাইনে রেখেই অথৈয়ের বাসায় পৌছে যায়।

তারপর। তারপর? যা হলো তা সত্যি রুপকথার গল্পের মতোন। সেদিন রাতেই ছোট্ট করে মেঘ-অথৈয়ের বিয়ে হয়ে যায় দশ হাজার দেনমোহর রেখে।

মেঘ গিয়েই আবেগকে কল দেয়। আবেগ তার পরিবার নিয়ে অথৈয়ের বাসায় চলে আসে। মেঘের বাবা-মায়ের জায়গায় ইমতিয়াজ রহমান এবং জাবেদা খাতুন ভূমিকা পালন করেন। ইভানা আর রোদেলা মিলে অথৈকে সাজিয়ে দেয়।

লাল শাড়ি তে একদম টুকটুকে লাল বউ লাগছিল অথৈকে। অথৈয়ের হাসির উজ্জ্বলতার কাছে মেকাপ ভাটা পড়ে গিয়েছিল সেদিন।

অথৈ-মেঘের গায়ে হলুদ ও এরইমাঝে হয়ে যায়।অথৈকে মেহেদী ও পড়ানো হয়। এমন কি বিয়ের পর আয়নায় দুজনের শুভদৃষ্টি করা হয়েছিল। এমন কি বাসর ঘরে ঢোকার আগে টাকা নেওয়া সবই হয়েছিল। বাসর সাজানো হয়েছিল আবেগদের বাসায়।

তারপর কি হলো? নিশ্চয়ই জানতে মন চাচ্ছে? তারপর যা হলো সেটা নির্দ্বিধায় সিন্ডেলার ফেইরিটেলকে ও হার মানাবে।

আইনস্টাইন সময় নিয়ে একটা মতবাদ দিয়েছিলেন তাহল,কোন বোরিং কাজ করার সময় ‘টাইম’খুব আস্তে কাটলেও,যদি সুন্দরী কোন মেয়ের সাথে সময় কাটানো যায় তাহলে সময় খুব দ্রুত কেটে যাবে। আইনস্টাইনের মতবাদ কি আর কোন দিন ভুল হতে পারে? নিশ্চয়ই না! তাই তো সুন্দরী বউকে নিয়ে কিভাবে, কিভাবে, কিভাবে যে সাতটা বছর অতিবাহিত হলো তার হিসাব ডাক্তার সাহেব মেলাতে পারেননা। ডাক্তার জন্য ই হয়তো অংক মিলাতে পারে না। অংকবীদ হলে মিলে যেত সমীকরণ টা। আবেগের মনে হয় এই তো সেদিন ই তো সমুদ্র দুধ ছাড়া কিছুই খেত না। এরপর আস্তে আস্তে সুজি খাওয়া শুরু করল। খিচুড়ি খাওয়া শিখল। দাত গজালো, হাটা শিখল, কথা বলা শিখল। সমুদ্র সবার আগে বাবা ডাক শিখেছিল। সমুদ্র যেদিন বাবা বলে ডাকে সেদিনটার কথা এখনো আবেগের মনে আছে৷ ২৩ শে আগস্ট ছিল তারিখটা। সেদিন সারা দিন আবেগ সমুদ্র কে কোলে নিয়ে ঘুরেছে।কি যে আন্দন পেয়েছিল আবেগ যেদিন সমুদ্র তাকে বাবা বলে ডেকেছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

এরপর হাতে খড়ি, ফাস্ট ডে এট স্কুল এবং সমুদ্রের বড় ভাই হওয়া সব এতো দ্রুত কিভাবে ঘটে গেল?

আবেগ-রোদেলার কোল আলো করে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে রাজকন্যা। যার বয়স এখন সাড়ে পাচ মাস চলছে। আবেগ-সমুদ্র দুইজনেরই খুব আদরের সে।

আবেগ শখ করে নাম রেখেছে পিউ। রোদেলার ইচ্ছা ছিল ‘আ’ দিয়ে কোন নাম রাখবে। কিন্তু আবেগ তার নামের সাথে মিল রেখে

ইচ্ছা করেই মেয়ের নাম রাখে নি। যদি ভবিষ্যতে সমুদ্র কষ্ট পায়? তার নামের প্রথম অক্ষর বাবার নামের প্রথম অক্ষরের সাথে মিলে না তবে ছোট বোনের টা কেন মিলল?এজন্য ই তাদের দুজনের নামের সাথে মিল না রেখে ভিন্ন অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া নাম রাখল।

আবেগ মুচকি হেসে হসপিটাল থেকে বের হলো।
সাত বছরে সে মোটেও বুড়ো হয়ে যায় নি।কিন্তু আচরণে একটা গুরুগম্ভীর ভাব চলে এসেছে।হবেই বা না কেন? দুই বাচ্চার বাপ সে এখন!

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সে পাকিং লটে অপেক্ষা করতে লাগলো। কালো গাড়ি এসে থামল। ডাইভার গেট খুলে দিল। আবেগ মৃদ্যু হেসে গাড়ি তে বসে পড়ে।

আবগ গাড়িতে বসে বলে, সমুদ্র আজকে স্কুল গিয়েছিল?

–না। যায় নি।

–ও।

সমুদ্র স্কুল যেতে চায় না একদমই। সকালে ঘুম থেকে উঠতে চায় না। রোদেলা এক প্রকার যুদ্ধ করে সমুদ্র কে স্কুল পাঠায়। এই গাড়ি টা আবেগের কঠোর পরিশ্রমের ফসল। আবেগের ইচ্ছা ছিল তার ছেলে গাড়ি তে করে স্কুল যাবে। ইচ্ছা পূরণ করেই হাল ছেড়েছে৷ সমুদ্র এখন গাড়িতে করেই স্কুল যায়।

কালো রংয়ের গাড়ি কিনেছে। রোদেলাই কালো রঙের কিনতে বলেছিল। আজো মনে আছে, যেদিন তারা গাড়ি কেনে পুরা পরিবার সহ ঘুরতে গিয়েছিল। আবেগ গাড়ি কেনার আগে ড্রাইভিং শিখে নিয়েছিল। প্রথম দিন মিলে রোদেলা কে নিয়ে ঘুরতে বের হবে বলেই শিখেছিল ড্রাইভিং।। আবেগ শুধুমাত্র রোদেলা কে নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু রোদেলা একা যাবে না। ফুল ফ্যামিলি মিলে যাবে । নাহলে যাবে না। পরে আর কি? সবাই মিলে হাতিরঝিল ঘুরে এসেছিল। ডিনার করে বাসায় ফিরেছিল। আবেগ রোদেলা সামনের সিটে বসেছিল। সেদিনটা আবেগ কোন দিন ভুলবে না৷

বাসার গ্যারেযে গাড়ি এসে থামল। আবেগ গাড়ি থেকে নেমে সিড়ি বেয়ে বাসার সামনে থেমে বেল বাজালো। গেট খুলে দিল রোদেলা।

রোদেলার চেহারায় পাক্কা গিন্নি গিন্নি ভাব চলে এসেছে। আজকে এই ভাবটা একটু বেশিই জোড়ালো হয়ে আছে৷ আবেগকে দেখে সে মুচকি হাসল। আবেগ ও পালটা হেসে প্রশ্ন করে, সমুদ্র কোথায়?

রোদেলা চুল খোপা করতে করতে বলে, তোমার ছেলে বিকেলে বাসায় বসে থাকার বাচ্চা? বাইরে গেছে খেলতে৷

আবেগ ব্যাগ রেখে বলে, বাচ্চা মানুষ বাইরে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি করবেই। তুমি ওকে একদম এজন্য বকবে না আর আমার রাজকন্যা
কোথায়?

–মাত্র উঠলো। খাওয়ালাম।

আবেগ রুমে গিয়ে পিউকে দেখে ডাক দিল, পিউমনি?

ছোট্ট পিউ চোখের নাটা পাকিয়ে বাবাকে খুজতে লাগলো। রোদেলা রুমে এসে বলে, যাও ফ্রেস হয়ে আসো। নাস্তা দিচ্ছি তোমাকে।

–আচ্ছা। আব্বা-আম্মা কই?

–হাটতে গেছেন৷

আবেগ ফ্রেস হয়ে এলে রোদেলা তার হাতে নাস্তার প্লেট দিল। আবেগ প্লেট হাতে না নিয়ে রোদেলার কোমড় জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নেয়। রোদেলা বিরক্ত হয়ে বলে,এসব কি শুরু করলে? কাজ আছে আমার।

আবেগ ফুক দিয়ে রোদেলার চোখের উপরের চুল গুলো সরিয়ে দিল। রোদেলা চোখ বন্ধ করে ফেলে। আবেগ রোদেলার চোখে ঠোঁট হালকা করে ছুইয়ে বলে, এতো ব্যস্ততা দেখাচ্ছো কেন?

রোদেলা অভিমানী গলায় বলে, আমি ব্যস্ততা দেখাই? তোমার আসার কথা ছিল দুপুরে। অথচ আসলে এখন! আর উনি বলেন আমি ব্যস্ততা দেখাই।

আবেগ রোদেলাকে নিজের সাথে মিশে নিয়ে বলে, সর‍্যি একটু লেট হয়ে গেছে।আচ্ছা বাদ দাও আমাকে খাইয়ে দাও।
রোদেলা চোখ বড় করে বলে, আশ্চর্য তোমাকে কেন খাওয়ায় দিতেহবে?

–একশ এক বার দিতে হবে৷ আমি অনেক ক্লান্ত। নিজে থেকে খেতে ইচ্ছা করছে না৷
রোদেলা আবেগের মুখে খাবার ঢুকিয়ে দিল। আবেগ মুচকি হেসে খেতে লাগলো। খেতে খেতে আবেগ বলল, কালকে একটা সেমিনার আছে। গাজীপুরে যেতে হবে। আসতে আসতে রাত হবে।
রোদেলা বলল, আচ্ছা। ঠিক আছে।

কিছুক্ষন পর বেল বেজে উঠল। রোদেলা বলে উঠে, এসে গেছে বাদরটা।
আবেগ হেসে দেয়। রোদেলা আর সমুদ্র কে সমুদ্র বলে ডাকে না। বরং বাদর, বান্দর, দুষ্টু রাজা বলে ডাকে।
সমুদ্র এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। আবেগ সমুদ্রকে চুমু খেল।
রোদেলা এসে বলে, সমুদ্র সোজা বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হও। আমি নাস্তা সাজাচ্ছি।

সমুদ্র মায়ের কথা শুনে ফ্রেস হয়ে এসে বাবার কাছে বসে। আবেগ সমুদ্র আর পিউকে নিজের কাছে বসিয়ে সে মাঝে বসে থাকে। সমুদ্র বাবার ফোন নিয়ে গেম খেলতে লাগে। এদিকে মা এসে তাকে খাইয়ে দিচ্ছে।আবেগ মুগ্ধ নয়নে রোদেলা কে দেখছে৷

রাতে সমুদ্র আবেগকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে গেল। রোদেলা পিউকে খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়ায়। দুই বাচ্চা ঘুমানোর পর আবেগ রোদেলার কাছে এসে তাকে ঝাপ্টে ধরে শুয়ে পড়ে।

পরের দিন, আবেগ গাজীপুরের উদ্দেশ্য রওনা হলো।রোদেলা সমুদ্র কে জোড় করে স্কুলে পাঠায়।

রোদেলা একটা কলেজের ইংরেজির প্রফেসর। রোদেলা সমুদ্রকে স্কুলে রেখে এসে পিউকে নিয়ে থাকে। সমুদ্র ক্লাস ওয়ানে পড়ে। দুই ঘন্টার মধ্যে ছুটি হয়ে যাবে।
রোদেলা কিছুক্ষন পর আবারো সমুদ্র কে আনতে গেল। স্কুল ছুটির পর সমুদ্র বের হয়েই মায়ের কাছে আবদার করে আইসক্রিম খাবে৷
আশেপাশে কোন দোকান নেই। সে ভ্যানগাড়ি থেকে গোলা কিনে দিল। এখান থেকে সমুদ্র আইসক্রিম আগে খায় নি। আজকেই প্রথম খাচ্ছে।লাল রংয়ের গোলা খেতে খেতে বাসায় আসল সমুদ্র আর রোদেলা।

বাসায় আসা থেকেই সমুদ্র বলতে লাগলো, তার খারাপ লাগছে। কেমন যেন লাগছে।

রোদেলা পাত্তা দেয় না। সে বলে উঠে, সকাল ঘুম থেকে উঠেছো জন্য খারাপ লাগছে বাবাই। রেস্ট নাও ঠিক হয়ে যাবে। আমি কলেজ যাচ্ছি। বিকেলে এসে পাস্তা বানিয়ে দিব।ঘুমাও একটু।

সমুদ্র চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল। রোদেলা তার কপালে চুমু খেয়ে চলে যায়।

প্রায় দেড়ঘন্টা পর কলেজে থাকাকালীন রোদেলা বাসা থেকে কল পায়। তার শ্বাশুড়ির কল আসে। সে রিসিভ করতেই ফোনের ওপাশ থেকে জাবেদা খাতুন অস্থির হয়ে বলতে লাগলো, রোদেলা দ্রুত বাসায় আস।সমুদ্র কেমন যেন করছে। মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে৷ আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি তাড়াতাড়ি আসো।

রোদেলার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে কুল-কিনারাহীণ হয়ে যায়। কোন মতো ছুটে বের হয় কলেজ থেকে। হাসপাতালে পৌছাতে তার আধঘন্টার মতো লাগে। এই আধঘন্টা তাকে কি অসহ্য যন্ত্রণা দিয়েছে তা কেবল রোদেলাই জানে। কি হয়েছে তার ছেলের? সকালেই তো ভালো ছিল?

হাসপাতালে পৌছে রোদেলা থমকে গেল। ছোট-খাটো একটা ঝট পেকে আছে। পাশ থেকে কেউ বলছে, আহারে, এতো ছোট বয়সে মারা গেল বাচ্চাটা? না জানি ওর বাবা-মা কিভাবে এই ক্ষতি সামলাবে।

রোদেলার চোখে অজস্র পানি। সে ভীড় ঠেলে সামনে আগাচ্ছে আর বিড়বিড় বলছে, আমার বাবাইয়ের কিছু হয় নি। সমুদ্র ঠিক আছে।

রোদেলা একটা হাসপাতাল ওয়ার্ডে ঢুকল। ওয়ার্ড নং একশ ছয়।

সমুদ্র শুয়ে আছে।তাকে ঘিরেই জটলাটা। সমুদ্রের জামা-কাপড় রক্তে ভেজা। চোখ বন্ধ।ফ্যাকাসে মুখ। নিস্তেজ দেহখানা নিথর হয়ে বেডে পড়ে আছে। রোদেলা এক পা পিছিয়ে যায় এবং ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে।

পেছন কিংবা সামন থেকে চাপা কান্না শুনতে পাচ্ছে রোদেলা । জাবেদা খাতুন বিলাপ করে বলছে, আল্লাহ রে আল্লাহ কি হয়ে গেল?ও আল্লাহ আমাকে উঠায় নাও। আল্লাহ কি হলো! ও আল্লাহ!

রোদেলা কানে হাত দিয়ে বলে, আমার ছেলের কিছু হয় নি। ও ঠিক আছে। আমার বাবাই আমাকে ছেড়ে কোথায় যেতেই পারে না। সমুদ্র একদম ঠিক আছে৷ কিছু হয়নি ওর। ঘুমাচ্ছে ও। কিচ্ছুটি হয় আমার বাবাটার৷ এসব কিছু ভ্রম। আমার দুর্স্বপ্ন! ঘুম ছুটে গেলেই সমুদ্র দৌড়ে আমার বুকে আসবে। আমি আবারো জড়িয়ে নিব আমার বাবাইকে।
#অশ্রুমালা
#শেষপর্ব (শেষ খন্ড)
#Arishan_Nur (ছদ্মনাম)

পিউ ঘুমাচ্ছিল। গভীর ঘুম যাকে বলে আরকি! হুট করে হুহু হীম শীতল হাওয়ায় তার ঘুম ছুটে যায়। সে তড়িৎ গতিতে উঠে বসে এবং চোখ খুলে দেখে তার মাম্মা জানালা খুলে দিয়েছে৷ এবার পিউ বুঝতে পারছে এতো ঠান্ডা লাগার কারন টা কি? সে প্রায় চেচিয়ে ইংরেজি তে বলে,মাম্মা জানাল কেন খুলেছে? বন্ধ করে দাও। ঠান্ডায় থাকা যাচ্ছে না।

তার মাম্মা পেছনে ঘুরে মুচকি হেসে বলে, গুড মর্নিং বেবি।

পিউ মৃদ্যু হেসে বলে, গুড মর্নিং। তারপর চোখ-মুখ কুচকে বলে উঠে, এখন বন্ধ করো জানালা।ঠান্ডায় মরে যাচ্ছি।

–ওকে। ডিয়ার।

বলে তার মা জানালা বন্ধ করে দেয়৷

পিউ হাই তুলতে তুলতে বলে,পাপা কোথায়?

–ঘুমাচ্ছে।

–ও।

পিউয়ের মাম্মা পিউয়ের কাছে গিয়ে তাকে চুমু খেয়ে বলে, ফ্রেস হও৷ আমি ব্রেকফাস্ট দিচ্ছি৷

–সিউর।

মাম্মা যেতেই পিউ উঠে পড়ল। তারপর বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে নিল। পিউয়ের ঘুম থেকে উঠেই নিজেকে আয়নায় দেখা একটা অভ্যাস। অভ্যাসগত ভাবে সে বিশাল বড় আয়নাটার সামনে গিয়ে দাড়ালো। পরনে গেঞ্জি আর পালাজ্জো। চুল চুল কোমড় পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে৷ সম্পূর্ণ সোজা। এবং ব্রাউন কালারের রঙ করা চুলে। পিউ উচু করে চুল ছুটি বাধল। পিউয়ের গাল গুলোও ফোলা ফোলা। হাসলে কেবলমাত্র ডান গালে হালকা টোল পড়ে। খুব নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষন করলে তবেই কেউ ধরতে পারবে হাসলে পিউয়ের গালে টোল পড়ে!

পিউ বেশ কিছুক্ষন ধরে নিজেকে আয়নায় দেখে নিল। তারপর ড্রয়ার থেকে নেইলপালিশ বের করে নখে লাগাতে লাগে। গাড় লাল রঙের নেইলপালিশ। লাল রংটায় পিউকে খুব মানায়। হয়তোবা সে দুধে আলতা গায়ের রঙের অধিকারী বলেই হয়ত!

পিউয়ের ফোন বেজে উঠল। সে ফোন রিসিভ করতেই তার ফ্রেন্ড বলে উঠে, পিউ আজকে তো হলিডে। চল হ্যাং আউট করি।

পিউ খুশি হয়ে গেল এবং বলল, আমার বাসায় আয়।

–নো। বাইরে হাইকিং এ যাবে। চল না প্লিজ।

পিউ গোমড়া মুখে বলে,ইউ নো না পাপ্পা আমাকে বাইরে কোথাও যেতে দেয় না।

–তাইলে কোনো রেস্টুরেন্টে হ্যাং আউট করি?

পিউ আবারক মুখ কালো করে বলে, আমার বাইরের খাবার খাওয়া মানা। বাসার খাবার ছাড়া আমি কখনো কিছু খাই না। জানিস ই তো তুই? পাপ্পা খেতে দেয় না৷

পিউয়ের ফ্রেন্ড ভেংচি কেটে বলে,তুই কিভাবে তোর বাবার ন্যাকামি টলেরেট করিস?

পিউ ধমক দিয়ে বলে, রেসপেক্ট মাই পাপা। হি ইজ মাই লাইফ। এন্ড হি এস দ্যা বেস্ট ফাদার ইন দ্যা ওয়াল্ড।

–ওকে ওকে কুল ডাউন। তুই তো দেখি পাক্কা ব্রাউন গার্ল এটিটিউট পেয়েছিস!

–আর ইউ ডান? রাখলাম। বাই৷

–বাই।

পিউ ফোন রেখে নেইলপালিশ পড়ায় মন দিল।

★★★

আবেগ ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে পড়ে। চোখে ঘুম এখনো লেগেই আছে। কালকে খুব কড়া ঘুম হয়েছে তাই ফ্রেস লাগছে। আবেগ বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো এবং বাথরুমে গেল। ফ্রেস হয়ে এসে দেখল টেবিলে কফি দেওয়া। সে কফির মগ হাতে তুলে নিল। পাশেই একটা নিউজ পেপার পড়ে আছে। The New York times লেখা। সে পেপারে চোখ বুলালো। তারপর জানালার ধারে গিয়ে দাড়িয়ে পর্দা সরিয়ে দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে সে সমুদ্রকে দেখতে পেল। তার মনটাই ভালো হয়ে গেল। সমুদ্র দূরেই আছে কিন্তু তাকে দেখা যাচ্ছে৷ আবেগ মুচকি হেসে কফি খেতে খেতে সমুদ্র কে দেখতে লাগলো।

বলা জরুরিঃ এই সমুদ্র তার ছেলে সমুদ্র নয়। বরং প্রকৃতির উপহার সমুদ্র! যেই সমুদ্র কোন দিন কাউকে রেখে চলে যায় না। সবসময়ই একই জায়গায় জোয়ার-ভাটা দিয়ে যায়। স্রোতের তালে তালে বয়েই যাওয়ার তার কাজ! সেই সমুদ্র কে দেখছে সে!!!

আবগ রেডি হয়েই আছে৷ এখন হসপিটালে যাওয়ার পালা। সে রুম থেকে বের হলে একজন স্টাফ তার সামনে আসে এবং তাকে গুড মর্নিং উইশ করে।

আবেগ মৃদ্য হেসে করে, গুড মর্নিং না স্মিথ। অনলি মর্নিং!

–সর‍্যি স্যার।

–ইটস ওকে। আজকে কয়টা ওটি আছে?

–চারটা।

–ওকে। ব্রেকফাস্ট করব না। ডিরেক হসপিটালে যাব৷

স্মিথ ইংরেজিতে বলে, ম্যাম, ব্রেকফাস্ট করতে বলেছেন।

আবেগ এমন ভাবে স্মিথের দিকে তাকালো যে স্মিথ আর কিছু বলল না ভয়ে। স্মিথ ভয়ে কাচুমাচু হয়ে আবেগের পিছনে হাটতে লাগলো।

আবেগ বাসা ছেড়ে বের হতেই শীত অনুভব করে৷ দ্রুত একটা কালো গাড়ি এসে তার সামনে থামল। আবেগ কালো গাড়ি টা দেখেই চোখ বন্ধ করে ফেলে।

স্মিথ গেট খুলে দেয়। সে গাড়ি তে বসে পড়ে। গাড়ি শোশো করে চলতে থাকে। আবেগের চোখ বন্ধ ছিল। সে চোখ খুলে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। বাইরে খুব সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। চারিদিকে স্লো ফলে ছেয়ে গেছে। সূর্যের আলো বরফ কণায় পড়ে তা মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করছে। রোদেলার ভাষায় যাকে বলা হয়, Shining like pearls!

রাস্তা থেকে স্নো সরানো হয়েছে৷ কিন্তু গাছে, বাড়ির ছাদে স্নো পড়েই আছে। সূর্য এর উত্তাপ নেই বললেই চলে। মৃদ্যু মিস্টি আলোটাই চারিদিকে ছেয়ে গিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক বাসার সামনে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয়ে গেছে। কাল বাদে পড়শু ক্রিসমাস। স্নোনোম্যান ও বানানো হয়েছে রাস্তার ধারে। বাচ্চারা এই শীতেও স্নো নিয়ে খেলতে বের হয়েছে। বাচ্চারা ও পারে! তার সমুদ্রও তো কি পাজি ছিল! একবার তো ক্রিকেট খেলতে গিয়ে দোতলার মজিদ সাহেবের জানালার কাচ ভেঙে ফেলেছিল রোদেলার কি রাগ! বাসায় নাকি ঢুকতে দিবে না ছেলে কে!

আবেগ স্নো দেখতে দেখতে হাসপাতালের যাচ্ছে আর মনে মনে বলে,

A day is incomplete without You!!
As i sit on the black Car!!
The black Car remains me about You!!!
I looked at You but didn’t find You!!!

—Nur

আবেগের চোখের কোনেও পানি চিকচিক করছে। সে চোখের পানি মুছে নিল।

হাসপাতাল যেতেই ওটি শুরু করে দিল আবেগ। তার কোন দিকে তাকানোর দরকার নেই। কিংবা প্রয়োজন বোধ ও করে না।

★★★

আজ আয়নার বিয়ে। সে খুব খুশি আজকে। এই দিনটার জন্য সে অনেক অপেক্ষা করেছে। অবশেষে সে তার ভালোবাসার মানুষকে পেতে যাচ্ছে হালাল ভাবে। আয়না আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখতে লাগলো। গ্রামের লোকেরা বলে, বিয়ের দিন নাকি বিয়ের কনেকে চান্দের চেয়েও সুন্দর লাগে!কথাটা বুঝি সত্যি।

আয়না মুচকি হাসল৷ এই আয়নায় যেই প্রতিবিম্ব টা সে দেখছে, এই মেয়েটা কি সে নিজে? নাকি অন্য কেউ? এতো সুন্দর সে!

এখন প্রশ্ন হলো আয়না কে? আয়না হলো মেঘ আর অথৈয়ের একমাত্র কন্যা।

দেখতে দেখতে সময় এক বছর দুই বছর থেকে পাড়ি দিয়ে বহু বছরকে ফেলে এসেছে। দেখতে দেখতে বিশ বছর কেটে গেছে।

মেঘ এসে তার মেয়ের পাশে বসল। মেয়েটাকে দেখে তার মন ভরে উঠল। ইশ! তার মেয়েটা এতো সুন্দর? কি সুন্দর তার মেয়েটার হাসি! কি মায়াবী লাগছে তার মেয়েটাকে। মনে হচ্ছে জগতের সব মায়া তার মেয়ের উপর উপচে পড়েছে আজকে।

মেঘ তার মেয়েকে ছাড়া কিভাবে থাকবে? মেয়ে ছাড়া যে মেঘ কিছুই বুঝে না। মেয়েটা তার কলিজার টুকরো।

বিকেলে বিয়ে। এখন ফটোসেশন হবে। আয়না তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আব্বু গেলাম।

মেঘ মুচকি হেসে যাওয়ার সম্মতি দিল। আয়না ভারী শাড়ি আর ঘোমটার তাল সামলিয়ে পা ফেলে চলে গেল।

মেঘ হতাশার শ্বাস ফেলে। তখনি অথৈ রুমে এসে বলে, কি হলো? এভাবে বসে থাকলে চলবে,? কতো কাজ পড়ে আছে? গেস্ট আসা শুরু করে দিয়েছে। সবাই খুজছে তোমাকে। যাও সবার সাথে গিয়ে কথা বল।

অথৈ প্রথমে মেঘকে খেয়াল করেনি। পরবর্তীতে যখন তার দিকে তাকালো তখন বিচলিত হয়ে গেল এবং বলল, একি! কাদছো তুমি?

মেঘ মাথা নিচু করে বলে, মেয়েটাকে ছাড়া কিভাবে থাকব আমি?অফিস থেকে এসে এখন থেকে কেউ আর আমাকে জড়িয়ে ধরবে না। অথৈ, আয়না কে ছাড়া আমরা কিভাবে থাকব?

অথৈ মেঘের পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, শান্ত হও তো। মেয়ে মানুষ একদিন না একদিন বাবার কাছ থেকে চলে যাবেই৷

মেঘ হতাশ হয়ে বলে, এই সমাজব্যবস্থা ভাল না। চল না আমরা গারোদের সমাজব্যবস্থা ফলো করি। তাহলে আমার মেয়ে আমার কাছে থাকবে।

অথৈ মুচকি হাসল। সে জানে মেঘ আর রাজকন্যা কে কতোটা ভালোবাসে। মেয়ে বলতে পাগল!

মেঘ আর অথৈ বাইরে বের হলো। ছেলেপক্ষ থেকে গেস্ট আসা শুরু করে দিয়েছে মেঘ গিয়ে গিয়ে কথা বলছে সবার সাথে। আর আয়নার দিকে তাকাচ্ছে। আয়না স্টেজে দাড়িয়ে হাসি হাসি মুখে বিভিন্ন ধরনের পোস দিয়ে ছবি তুলছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে আয়না অনেক খুশি। কি রকম সেলফিশ তার মেয়েটা? সে এদিকে কষ্টে মারা যাচ্ছে আর তার মেয়ে কিনা হেসেই চলেছে। আয়নার কি বাবাকে রেখে চলে যেতে কষ্ট হচ্ছে না? এতো শক্ত তার মেয়ে? নাকি অপরপ্রান্তের ব্যক্তির ভালোবাসার শক্তি অনেক?

★★★

ইমতিয়াজ রহমান গেটের সাথে ঝুলানো বড় তালাটার সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করে তালা খুললেন। তালায় জং ধরে যাচ্ছে। সাতদিন পর পর এসে তিনি তালায় তেল মেখে যান। কিন্তু তাতেও লাভ হচ্ছে না। আজকেই একটা তালা কিনে এনে এই জং ধরা তালা সরাতে হবে।

এই চিন্তা মাথায় আসতেই সে নিজে থেকে বলে উঠে, আজকে তো হবে না। মেঘের মেয়ের বিয়ে আজকে। মেঘ দুপুরের পর পর গাড়ি পাঠাবে। সেখানে উপস্থিত থাকার কড়া আদেশ জারি করা হয়েছে৷ ইমতিয়াজ রহমান বাসার ভেতরে ঢুকে আশেপাশে তাকালেন। সাতদিনেই ময়লা জমে গেছে। সে বুঝে পায় না ময়লা জমে কোন দিক দিয়ে? সব জানালা তো বন্ধ করে দিয়েই যান তিনি। নাকি ভুলে জালানা খুলে চলে যান তিনি? কি জানি? বয়স বাড়ার সাথে সাথে এখন সে অনেককিছু ই ভুলে যান। ইমতিয়াজ রহমান সোফায় দিয়ে রাখা চাদরটা সরালেন। সেখানে চুপচাপ কিছুক্ষন বসে থেকে উঠে দাড়ালেন। তারপর নিজের রুমের দিকে হাটা ধরেন৷ এই বাসার আনাচে-কানাচেতে তার চেনা। এই বাসাটাই তো কতো সুমধুর স্মৃতির নিরব সাক্ষী আবার কতো কাল রাতের ও নিশ্চুপ দর্শক!

নিজের রুমে আসলেন তিনি। রুমটা ফাকা। কেবল খাটটা আছে। এই রুমের মালকিন ও আর নেই। জাবেদা খাতুন বছর দুয়েক আগেই বার্ধক্যের ভার সইতে না পেরে না ফেরার দেশে পারি জমান। ইমতিয়াজ রহমান ও আর কয়েকদিনের অতিথি। বয়স বেড়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ দিন ই সে অসুস্থ ই থাকে। শুধু শুক্রবার করে তাদের বাসায় আসে কিছুক্ষন সময় কাটায়। তারপর জুম্মার নামাজে যান। নামাজ থেকে ফিরে মেয়ের বাসায় যান। এখন এই শেষ বয়সে মেয়ের কাছেই থাকেন।

ইভানা এখন একজন ডাক্তার। দুই বাচ্চার জননী। আর ইভানার স্বামী হলো শৌখিন। শৌখিন আপাতত ব্যবসা করে। একজন উদ্যোক্তা সে। বেশ ভালোই সফল। কিছুদিন ধরে ডেলিভারি এজেন্সি খুলেছে যেটাতে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছে।

যেদিন ইভানা তার কাছে এসে বলেছিল,সে একটা ছেলেকে ভালোবাসে কিন্তু ওর ভালো চাকরি নাই। সেদিন চাইলেই ইমতিয়াজ রহমান মেয়েকে অন্য কোথায় বিয়ে দিতে পারতেন। কিংবা ডাক্তার ছেলের সাথে ইভানার বিয়ে দিতে পারতেন কিন্তু দেন নি। মেয়েটার ইচ্ছার প্রধান্য দিয়েছিলেন। আজকে তার মেয়েকে দেখলে মনে হয় সিদ্ধান্ত টা ঠিক ছিল। শৌখিন মেয়ে জামাই হিসেবে খুব ভালো। তার খুব যত্ন নেয়। আজকে ছেলেটার নিজের একটা ফ্লাট আছে। গাড়ি আছে। ছেলেটা তার বাসার সব রুমে বিশাল এলএডি টিভি লাগিয়েছে৷ এটা নাকি ওর শখ। ইমতিয়াজ রহমান এমন শখ দেখে বড়ই বিষ্মিত হন!

সে হতাশ হয়ে রোদেলাদের রুমে এলেন। রুমটা নির্জীব হয়ে আছে। রুমের ফাক-ফোকরে ময়লা জমে আছে। রোদেলা ময়লা নোংরা একদম পছন্দ করত না। সবসময়ই তার রুম ঝকঝকে থাকত। ইমতিয়াজ রহমানের চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। সে দ্রুত বের হয়ে এলেন। এই রুমে আসলে তার হাসপাস লাগে। গুমটে অনুভব হিয়। হাহাকার জন্মে। পাচ মিনিটের বেশি থাকতে পারেন না এই রুম্ব।

সে মসজিদে চলে গেলেন। এখন বেশিরভাগ সময় যিকির করেই কাটান তিনি।

নামাজ শেষে ইভানার পুরা পরিবার সহ মেঘের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলো। মেঘ তাদের কে আসতে দেখেই রিসিভ করতে গেল।

আয়না স্টেজ থেকে নেমে ইমতিয়াজ রহমান কে সালাম দিল। ইমতিয়াজ রহমান আয়নার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, খুব সুখী হও মা।

–দোয়া করবে দাদু।

–তোদের জন্যই সবসময় দোয়া করি। তোরা ভালো থাক এটাই দিন-রাত দোয়া করি৷

আয়না স্মিত হাসল। তখনি অথৈ মোবাইল হাতে নিয়ে বলে, এই তোর নেহা আন্টি। কথা বল।

আয়না মোবাইল হাতে নিয়ে নেহাকে হ্যালো বলল।

নেহা ফোনের স্ক্রিনের ওপারে থেকে চেচিয়ে বলে,ও আল্লাহ! ইউ আর লুকিং লাইক এন এঞ্জেল।

আয়না আবারো হাসল এবং মৃদ্যু গলায় বলে, পিউ কোথায়?

নেহা মোবাইল পিউয়ের হাতে দিয়ে দিল। পিউ উৎসাহের সাথে বলে, লাল শাড়ি?

আয়না মাথা নাড়িয়ে বলে, হুম। লালা শাড়ি লালা জমিন!

পিউ অদ্ভুত নয়নে আয়নার দিকে তাকিয়ে নেহাকে উদ্দেশ্য করে বলে, মাম্মা সি এস দ্য মোস্ট প্রিটিয়েস্ট ব্রাইড আই এভের স।

–ইনডিড সি ইস। (এক গাল হেসে নেহা)

সাত সমুদ্র তের নদী দূরে থেকেও নেহা আর পিউ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হওয়া আয়নার বিয়েতে এটেন্ড করল। মোবাইল স্ক্রিন থেকে তারা দেখল,লাজুক বধুকে! লালা টুকটুকে বউ টা কিভাবে লজ্জা পেয়ে কবুল বলেই বাবার বুকে ঝাপ্টে পড়ে কাদা শুরু করে দিল।

★★★

নেহা যে কিনা গল্পের প্রথমেই যাকে রোদেলা প্রতিস্থাপন করেছিল। আর আজকে গল্পের শেষ পাতায় রোদেলাকে পুনরায় প্রতিস্থাপন করল নেহা৷

আবেগ একবার নেহাকে বলেছিল,বন্ধন ভেঙেই নতুন বন্ধন গড়া হয়। এটা যদি রসায়ন হয় তবে রসায়নে আরো একটা মজার ব্যাপার আছে। তাহলো, প্রতিস্থাপন।

কোন অধিক সক্রিয় মৌল বা যৌগসমুহ অপর কোন কম সক্রিয় মৌল বা যৌগকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। যেমন, জিংকের সাথে সালফিউরিক এসিড বিক্রিয়া করলে জিংক সালফেট আর হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে। তেমনি সেও বুঝি রোদেলাকে প্রতিস্থাপন করেছে।

আয়নার বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে নেহা তার রুমে গেল। আবেগ ঘুমাচ্ছে। গভীর ঘুম। মেডিসিন খেয়ে ঘুমাচ্ছে। নেহা আবেগের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

শেখ নেহা বর্তমানে আবেগের দ্বিতীয় স্ত্রী। নেহা আল্লাহর কাছে পরের জনমে আবেগকে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ এই জনমেই তার হাতে আবেগকে তুলে দিলেন। নেহাও বেশ আগলে রেখেছে। পিউকে কোন দিন সামান্য কিছুর অভাব পেতে দেয় নি। আসলে পিউ জানেই না নেহা তার নিজের মা না। পিউকে রোদেলা আর সমুদ্র সম্পর্কে কিছু জানায় নি আবেগ। নেহাও জানাতে ইচ্ছুক না। পিউকে নিজের চেয়েও ভালোবাসে নেহা।

নেহার বাবা তার সম্পদ নেহার নামে করে দিয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে আজকে নেহা একটা হসপিটালের মালিক। তাও আবার ওয়াশিংটনের মতো জায়গায় তার নিজের হাসপাতাল। সেই হাসপাতালেই জব করে আমেরিকার একজন নামকরা কার্ডিওলজিস্ট। নামটা অবশ্যই ইশরাক রহমান। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আবেগ নিজের কর্মক্ষেত্রে অনেক সফল হয়েছে। নেহার আগে থেকেই রেড পাসপোর্ট ছিল। নেহার জন্মই এই আমেরিকায় হয়েছে। তাই নিজ দেশে ব্যবসা দাড় করাতে তার সমস্যা হয় নি।বাবার সাথে কথা হয় নেহার। প্রাচুর্যের সাথেও কথা হয়েছিল। আবেগের সাথে বিয়ের পর পর প্রাচুর্য কল করে শুধু এতোটুকুই বলেছে, তোর ভালোবাসা ই খাটি। হারিয়ে ও ফিরে পেলি৷ সেদিন একটা প্রশান্তি বয়ে যায় নেহারর গা জুড়ে৷

প্রাচুর্য তার বিসনেস পাটনার কে বিয়ে করেছে। সুখেই আছে।

এখন রাত। নেহা আবেগের দিকে তাকিয়ে আছে। সে নিজেও জানে না এই লোকটাকে সে এতোটা কেন ভালোবাসে? কারনটা আজো অজানা তার কাছে। নেহা আবেগের দিকে তাকিয়ে থেকেই ঘুমিয়ে পড়ল।

ভোরের দিকে আবেগের ঘুম ভেঙে যায়। সে উঠে বসতেই নেহাকে দেখতে পেল। এতে কিছুটা মন খারাপ হয় আবেগের৷

এখনো সে মাঝে মাঝে আশা করে ঘুম থেকে উঠে রোদেলার চেহারা টা দেখতে পাবে৷ আবেগ বিছানা ছেড়ে উঠে একটা ওভার কোট গায়ে জড়িয়ে ড্রয়ার খুলে একটা ডায়েরি বের করল।তারপর হাটা ধরল।

এতো এতো শীতের মধ্যে ও আবগ হেটে হেটে সামনে যাচ্ছে৷ বাসা থেকে সমুদ্র টাকে।যতোটা কাছে মনে হয়। হাটা ধরলে বোঝা যায়, নাহ সি বীচ টা বেশ দূরেই আছে।

আবেগ সি বীচের সামনে এসে থামল। হাপিয়ে গেছে সে। গাড়ি নিয়ে আসা দরকার ছিল৷

আবেগ অতীতের দিনে হারিয়ে গেল৷

গাজীপুরের সেমিনারে প্রচুর বিজি সে। ফোন ধরার ও সময় নাই। ফোনে চার্জ ও নাই তার।রোগীর ও তাদের স্বজনদের ভীড়ে অস্থির সবাই। একাধারে সেবা দিতে ব্যস্ত তারা।

হুট করে খবর আসল একটা বাচ্চাকে ট্রাক মেরে দিয়েছে। অবস্থা খুবই আশাঙ্গাজনক।
ডাক্তার বলতে সে ছাড়া কেউ নেই। দুজন নার্স আছে।

ঠিক সেই সময় টায় আবেগ সমুদ্রের মৃতুর সংবাদ পায়। সে বিশ্বাস ই করতে পারছিলনা। ফোনের ওপাশ থেকে ইভানা একাধারে কেদেই চলছিল। আবেগের নিশ্বাস আটকে যাচ্ছিল। কোন ক্রমেই শ্বাস নেওয়া যাচ্ছিল না তার পক্ষে। ছুটে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল কিন্তু যখন সমুদ্রের বয়সী বাচ্চার বাবা তার পা ধরে অনুরোধ করল তার ছেলেকে বাচানোর জন্য।

তখন আবেগ নিরুপায় হয়ে যায়। বুকে পাথর দিয়ে বাচ্চাটার চিকিৎসা করে তারা। সারাটা সময় সে কাদতে কাদতে কাজ করে। নার্স দুজন তাকে সান্ত্বনা দিয়েই যাচ্ছিল।

বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে আসে। আবেগ এখনো বিশ্বাস করতে পারেনি সমুদ্র আর নেই। সে ভেবেই নিয়েছে ইভানা মজা করছে।

কিন্তু বাসার সেই দমবন্ধকর পরিবেশ তার গলা চেপে ধরছিল বারেবারে। বাড়িটা আগরবাতির গন্ধে ছেয় গেছে। চারিদিকে হাহাকার। কান্না। আর্তনাদ। মওলানারা কুরআন তেলায়ত করছেন।

আবেগ হেটে হেটে সোজা রুমে যায়। গেট খুলতেই অন্ধকার রুম আবিষ্কার করে। লাইট অন করতেই বিধ্বস্ত রোদেলার চেহারা দেখে আবেগের বুক কেপে উঠে।

রোদেলা সমুদ্রের একটা গেঞ্জি জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে কি কি যেন বলছিল। চুল গুলো এলোমেলো। একদিনেই চোখে কালি পড়ে গেছে।

রোদেলা আবেগকে দেখেই হুহু করে কেদে দেয়।আবেহ হাটু গেড়ে বসে পড়ে আর আস্তে করে বলে, আমার ছেলে কোথায়?

রোদেলা আবেগের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলে, কে তোমার ছেলে? তোমার কোন ছেলে আদৌও ছিল না। তোমার শুধু একটাই মেয়ে। তোমার কোন ছেলে নাই।

–এসব কি বলছো রোদেলা? সমুদ্র কোথায়? আমার ছেলে কই?

–খবরদার ওকে নিজের ছেলে বলবে না। ও শুধু আমার ছেলে। আর আজকে আমার বাবাইটা আমাকে রেখে অনেক দূরে চলে গেছে। আর কোন দিন ফিরবে না।

–স,,,সমুদ্র কোথায়?

রোদেলা রাগী চোখেই উত্তর দিল, দাফন করা শেষ। আর এখন এসেছো? যাও টাকা কামাও। আর কোন দিন সমুদ্র কে নিজের ছেলে বলে দাবী করবে না। মানুষ ঠিকই বলে, সৎ বাবা কোনদিন নিজের বাবা হতে পারেনা৷

আবেগ চিতকার করে, রোদেলা বলে উঠে।

রোদেলা দ্বিগুন জোড়ে চিল্লিয়ে।বলে, আজকে সমুদ্রের জায়গায় পিউ হলে।তুমি মৃতুর খবর পেয়ে ছুটে আসতে।

আবেগ ঘাবড়ে গিয়ে বলে, ভুলেও পিউয়ের মৃত্যের কথা মুখে নিবে না৷

রোদেলা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, হ্যা৷ পিউয়ের কিছু হলে তোমার কষ্ট হবে। আর আমার ছেলেটাকে শেষ বারের জন্য ও দেখার সময় তোমার নাই।

রোদেলা সমুদ্রের গেঞ্জিটা বুকে চেপে কেপে দিল। আবেগ ও কাদছে।

রোদেলা চেচিয়ে বলে,খবরদার মিথ্যা কান্না করবে না।

আবেগ বিষ্ফরিত চোখে রোদেলার দিকে তাকায়। আজকে রোদেলার চোখে মায়া নেই। বরং ক্ষোপ আছে৷ কি করে রোদেলা কে সে বুঝায় আরেকটা সমুদ্র কে সে হারাত্ব চায় নি। য়ার যেই কষ্ট না হচ্ছে সেটা অন্য আরেকজন কে দিতে চায় নি৷ কিভাবে একটা মাকে সে এটা বুঝাবে। আদৌ বোঝানো সম্ভব না!

আবেগ আসার আগেই রোদেলার নির্দেশে সমুদ্র কে কবর দেওয়া হয়। এর পরের দিন গুলো আরো ভয়ংকর ছিল। রোদেলা আবেগকে দেখতে পারত না। দেখলেই চিৎকার-চেচামেচি করত।জিনিস ভেঙে চুরমার করত। দিনের বেশিরভাগ সময় সমুদ্রের খেলনাগুলোর সাথে কথা বলে একা একা হাসত-কাদত। এসব দেখে রোদেলা কে সাইক্রিয়েটিস্ট দেখানো হয়৷

ডাক্তারের আদেশে রোদেলাকে গ্রামে পাঠানো হয়। ডাক্তার বললেন, রোদেলা অনেক বড় একটা শক পেয়েছে৷ কিছু দিন অন্যখানে থাকলে ঠিক হয়ে যাবে।

আবেগ গ্রাম থেকে ফেরার সময় রোদেলাকে রিকশায় বলেছিল, নেক্সট বার আরো সময় হাতে নিয়ে আসবে। কথাটা কিভাবে যেন সত্য হলো রোদেলার ক্ষেত্র। প্রায় চারমাস গ্রামে ছিল রোদেলা। কোন উন্নতি তো হয় নি। বরং দিন দিন অবনতি হতে থাকে রোদেলার। ডাক্তারের দেওয়া ঔষধেও কাজ হয় নি। উপায় না পেয়ে সমুদ্র মারা যাওয়ার চার মাস পর আবারো ঢাকা আনা হয়। রোদেলা আবেগকে দেখতে পারত না। তাই আবেগ মেঘের সাথে থাকা শুরু করে।

এমন না যে আবেগের কষ্ট হয় না। কিভাবে যে সেইদিন গুলো আবেগ পার করেছে তা কেবল আবেগই জানে। পিউকেও কোল নিত না রোদেলা। শেষের দিকে পিউকে চিনতে পারেনি রোদেলা।

শেষের দিকে কেন বলা হলো? কারন,,,,,,

ঢাকা আসার এক মাসের মাথায় রোদেলা হার্ট এটাক করে।

হাসপাতালে নেওয়া হয়। ডাক্তার চিকিৎসা ও করে। আবেগের হাসপাতালেই এডমিট হয় রোদেলা। জ্ঞান ও ফিরে রোদেলার।

আবেগ অনেক সাহস জুটিয়ে রোদেলার কাছে যায়। ভেবেছিল রোদেলা তাকে দেখে রিয়্যাক্ট করবে। কিন্তু নাহ, হসপিটাল বেডে শুয়ে থাকা নিস্তেজ রোদেলা আবেগকে দেখে তার পাশে বসতে বলে।

আবেগ রোদেলার পাশে ধপ করে বসে পড়ে। সেদিন প্রায় পাচ মাস পর রোদেলা স্বাভাবিক ভাবে কথা বলেছিল।

রোদেলা আবেগের হাত ধরে বলে, তোমাকে খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তাই না? মাফ করে দিও।

আবেগ নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে হাউমাউ করে কেদে দেয়।

রোদেলা তার আরো শক্ত হাত চেপে ধরে বলে, আমি চলে গেলে তুমি পিউয়ের জন্য একটা সুন্দর দেখে মা খুজে এনো।

–চুপ কর রোদেলা। তোমার কিছু ই হবে না।

–ওয়াদা কর আনবে একটা সুন্দরী বউ নিজের জন্য।

আবেগ কান্না করতে থাকে৷

রোদেলা একপ্রকার জোর করে আবেগকে দ্বারা ওয়াদা করায়। কিন্তু আবেগ ও কম না সে বলেছিল পিউয়ের জন্য মা আনবে।

একটু পর রোদেলা আবেগকে জিজ্ঞেস করে, একটা ধাধা ধরি?

–কি?

–আমি এমন একজন যে কিনা মানুষের মধ্যে ও থাকি আবার প্রকৃতির মধ্যে ও থাকি বল তো আমি কে?

–পারি না। (কান্না করতে করতে)

–আচ্ছা আরেকটা ক্লু দিই।মানুষের কাছে যখন থাকি তখন খুব মূল্যবান আর প্রকৃতির কাছে তেমন একটা দামী না। এবার বল তো আমি কে?

–পারব না।

রোদেলা হতাশ হয়ে বলে, আচ্ছা বল তো! Since there is no help, come let us kiss and part এর মানে কি?

–জানি না৷

রোদেলা মুচকি হেসে বলে, আমিও জানি না। হুমায়ুন স্যার কেন লিখে দেন নি এর মানে কি? তবে জানো আমার কাছে মনে হয়, Since there is no help,come let us kiss and part এর মানে মৃত্যু। বিচ্ছেদ। শোন? তোমার নতুন বউকেও জিজ্ঞেস করবে এই লাইনের মানে কি? আমার কেন যেন মনে হয় সে পারবে না।

–আচ্ছা। ঘুমানোর চেষ্টা কর তো।

–আমাকে ক্ষমা কিরে দিও। তুমি সমুদ্র কে খুব ভালোবাস তাই না?

–চুপ করে রেস্ট নাও।

–আচ্ছা। আমার খারাপ লাগছে।

এর পর? এরপর আর কোন দিন রোদেলা চোখ খোলে নি। আবেগের সাথে কথা বলার চারঘন্টা পর রোদেলা মার যায়।

আবেগ কেন যেন খুব ইজিলি রোদেলার মৃত্যুটা মেনে নেয়। রোদেলা যেদিন মারা গেল সেদিন আবেগ রুমে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।

ময়নার মা এসে চা দিয়ে যায়। সেই চাও সে খেয়েছিল। কি জঘন্য স্বাদ!!

জাবেদা খাতুন কাদছিল তখনো। সেই কান্নার আওয়াজ আবেগের বিরক্ত লাগে!

এরপর পিউয়ের যখন এক বছর আবেগ ওয়াশিংটনে স্কলারশিপ পায়৷ এক মূহুর্ত দেরি না করে মেয়েকে নিয়ে চলে যায়৷

রোদেলা কে সমুদ্রের কবরের সাথেই কবর দেওয়া হয়।

ওয়াশিংটন এসে বেকায়দায় পড়ে যায় আবেগ। ছোট্ট বাচ্চা সামলিয়ে মেডিকেল যাওয়া-আসা খুব ভোগান্তি তে পড়ে আবেগ। এদিকে নিজেও অসুস্থ থাকত। সারারাত কাদত সে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটাও দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক মতো খেত না। আগে মা আর ইভানা খেয়াল রাখলেও, ওয়াশিংটন যাওয়ার পর সে একা ঠিক ভাবে পিউয়ের যত্ন নিতে পারত না।

কি অসহনীয় দিন ছিল! হাহাকার ছাড়া কিছুই না!

হুট করে হসপিটালে একদিন নেহার সাথে দেখা। নেহা তাকে দেখেই থমকে যায়। আবেগ পালিয়ে বাচতে চেয়েছিল নেহার কাছ থেকে কিন্তু পারেনি । নেহার জেদের সাথে পারেনি। তার মেয়েটাও নেহার কাছে খুব খুশি থাকত। রোদেলা কে দেওয়া ওয়াদার কথা ভেবে নেহাকে বিয়ে করে নেয় সে।

আবেগ বুঝে পায় না নেহাই যদি তার ভাগ্যে ছিল তাহলে রোদেলা কেন এলো তার জীবনে? মায়া বাড়াতে?

আবেগ সমুদ্রের ধারে হাটছে। হাতে ডায়েরি টা শক্ত করে ধরা। তাদের বিয়ের পচিশ বছর আগেই পূর্ণ হয়ে গেছে। সে প্রতিদিন একবার করে রোদেলার লিখে যাওয়া চিঠিটা পড়ে৷
এটাকে।চিঠি বলা যায়।
ডায়েরি তে লিখা থাকলেও লেখার স্টাইল চিঠির মত।

সেখানে গুটি গুটি সুন্দর অক্ষরে লেখা,

প্রিয় ডা.ইমোশন,

কেমন আছো? নিশ্চয়ই ভালো কিংনা ভালো না। এইকথা টা এইজন্য বললাম কারন আমি জানি এই লেখাগুলো তুমি বহুবার পড়বে৷ অনেকবার যখন পড়বে,তাই প্রতিদিন তো আর মন ভালো থাকবেনা।এইজন্য বললাম কোন দিন ভালো থাকবে আর কোন দিন দুঃখী। জানো আবেগ, আমার কেন যেন মনে হয়, আমার কপালে সুখ জুটবে না। আমি এত সুখের ভাগীদার হতে পারব না। আমি সমুদ্রের বিয়ে দেখে যেতে পারব না। যদি সমুদ্রের বিয়ে হয় না! তাহলে ধুমধাম করে দিও। ওর পছন্দের মেয়ের সাথে। ও যেন হলুদে নীল পাঞ্জাবি পড়ে।

পুশ্চৎঃ আমি যদি কোন দিন হারিয়ে যাই আমাকে খুজবে না। কেবল দুই ফোটা অশ্রু বির্সজন দিও। জানো ডাক্তার সাহেব? কারো হাসি হওয়ার চেয়ে কান্না হওয়া বেশি সৌভাগ্যের!

ইতি অশ্রুমালা।

আবেগের লেখাটা মুখস্ত। সে চিঠিটা পড়ল। তারপর চোখের পানি মুছে আস্তে করে বলে,

তোমার জন্য দুফোটা অশ্রু জল বরাদ্দ হই, অশ্রুমালা!

সে হেটে হেটে বাসায় ফিরছে। ফোনে সো করছে আজকে নেহার জন্মদিন। ক্রিসমাস ইভেতে নেহার বার্থডে। চারপাশে ঝিকঝিক আলো ক্রিসমাস বলে।খ্রিস্টান দের মতে, এই বড়দিনে সান্টারক্লোস আসে৷

বাস্তবে সবার জীবনেই একটা করে সান্টারক্লোস আছে। আফসোস তার টা সে হারিয়ে ফেলেছে না সে হারিয়ে ফেলেনি। হারিয়ে গেছে৷

সমুদ্রের মৃত্যুটা ছিল দুর্ঘটনা। সে রাস্তার ধারের কেনা গোলা আইসক্রিম খেয়েছিল। আইসক্রিমে বিষাক্ত পর্দাথ ছিল। পরবর্তীতে তদন্ত করে জানা যায়, আইসক্রিমের বরফ একটা রাসায়নিক ফ্যাক্টরির কাছের পানির কল থেকে বানানো হয়েছে।কোন ভাবে রাসায়নিক ফ্যাক্টরির বিষাক্ত পর্দাথ কোন ভাবে সেই পানির সাথে মিশে গিয়েছিল। সেই পানি দিয়ে বরফ বানানো হয় আর সেই বরফ দিয়ে বানানো গোলা আইসক্রিম সমুদ্র খেয়েছিল। সেদিন সমুদ্র সহ আরো ছয়টা বাচ্চা মারা যায়। সবকিছুই প্রকৃতির ইচ্ছা অনুসারে হয়েছে। কারো হাত নাই এতে।

ভোর হয়ে গেছে। বাসায় ঢুকতে ই নেহার চিন্তিত মুখটা দেখল আবেগ।। মেয়েটা নির্স্বার্থ ভাবে তার জন্য সব ত্যাগ করেছে।

আবেগ নেহার কাছে গিয়ে বলে, শুভ জন্মদিন নেহা।

নেহা হা হয়ে যায়। খুব ক মদিন আবেগ নিজ থেকে তার সাথে কথা বলেছে। আজকে কি সূর্য উত্তর দিকে উঠেছে?

আবেগ ফিসফিস করে বলে, বল তো! Since there is no help, come let us kiss and part এর মানে কি?

নেহা কিছুটা ভেবে জবাব দেয়, যদি সব দিক থেকেই তুমি অসহায় হয়ে পড়ো তাহলে কোন কিছু না ভেবে একবার আমাকে জড়িয়ে ধরো সব ঠিক হয়ে যাবে।

একই লাইন কিন্তু এর অর্থ দুইজনের কাছে পুরোই ভিন্ন। এই জায়গায় ই একজন কবির সাফল্য। যখন তার কবিতা পড়ে একেক জন একেক মতামত দিবে।

নেহা আবেগের হাত ধরে বলে, আবেগ আই লাভ ইউ!

এই কথা প্রতিদিন ই নেহা তাকে বলে কিন্তু আজকে কি যেন হলো আবেগের? সে নেহাকে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কাদতে লাগলো। কিসের কান্না এটা?

পিউ সিড়ি থেকে তার বাবা-মা কে এভাবে দেখে খুব খুশি হয়। সে দৌড়ে এসে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে।

পিউ মনে মনে বলে, আই এম সো হ্যাপি টুডে!

Why life is so peaceful???

★★৬
Once a wise man said, What is life?
A mathmathesian replied life is like logarithm!

লগারিদমে একটা সুত্র আছে যখন ভিত্তি আর ঘাত মিলে যাবে অংক শেষ। মান উত্তর ১ আসবে। তেমনি যখনি দুটো মনের মিলন ঘটবে অংক শেষ। মান ১আসবে।

ওয়াইজ ম্যান গনিতবীদকে বলল, মেনে নিলাম এই ব্যখাটা! দুটি মনের মিলন মানে যদি অংকের ভাষায় লগের ঘাত আর ভিত্তি সেইম হয় তাহলে অবশ্যই অংক শেষ! তাহলে সুখ জিনিস ট কখন আসবে?

গনিতবীদ হেসে উত্তর দিল, ওই যে লগারিদমের ভিত্তি আর ঘাতকে এক বানানোর জন্য যে কয়েকটা লাইন লিখতে হয় সেটাই সুখ আর শেষ লাইনে যখন দুটোই মিলে যাবে অংক শেষ। গল্প ও শেষ।

The End.

[ অশ্রুমালা গল্পটা পড়ে যদি কেউ দুফোটা অশ্রু আমাকে উপহার ই না দেন তাহলে আমি লেখক হিসেবে ব্যর্থ! রোদেলার হসপিটাল বেডে শুয়ে থেকে বলা ধাধাটার উত্তর কি কেউ বের করতে পারবেন? উত্তর টা রোদেলার দেওয়া চিঠিটায় লুকিয়ে আছে। দেখি কে পারে ধাধাটা? অশ্রুমালা সিজন টু কোন দিন ই আসবে না। তবে সমুদ্র-আয়নাকে নিয়ে একটা প্রেমের গল্প লেখার ইচ্ছা আছে। ধন্যবাদ সবাইকে গল্পটা পড়ার জন্য। আল্লাহ হাফেজ। সবাই ভালো থাকবেন।]
চলবে।

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here