আবর্তন পর্ব ৫

#আবর্তন
#তাজরীন_খন্দকার
#পর্বঃ০৫

সে যদি সব জানেই তাহলে এসব জেনেও বিয়ে করলো কেন? কি চাচ্ছে অরুণ?
না না চন্দ্রার মাথায় কিছু যাচ্ছেনা। এই মূহুর্তে পাল্টা প্রশ্ন করারও সুযোগ নেই।

কেন জানি মনে হচ্ছে রনির সাথে কথা বলাটা খুব দরকার। কিন্তু কীভাবে বলবে? কোনোভাবেই যে সেটা সম্ভব না। এদিকে অরুণ কি করতে চলেছে কে জানে। চন্দ্রা তার ভেতরের যন্ত্রণাটা কোনোভাবেই বুঝাতে পারছেনা। বারবার থেমে যাচ্ছে তার হৃদকম্পন। তার ভুলের মাশুল ঠিক কতটা পেলে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে সে?

সারা রাস্তায় অরুণ তার দিকে আর তাকায়নি। কোনো কথাও হয়নি। বাড়িতে পৌঁছানোর পরে আশেপাশে তাকিয়ে চন্দ্রা বুঝতে পারলো বউ বরণের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি চলছিল। মানে আজকেই অরুণ বিয়ে করবে সেটা এখানে সবাই জানতো৷
বউ নিয়ে কতক্ষণ হৈ-হল্লা চললো, সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত৷ কিন্তু সময় যাওয়ার সাথে সাথে চন্দ্রার ভেতরের ভয়টা আরো তীব্রতর হতে লাগলো। সবার সাথে সাথে এই মূহুর্তে তার মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ঝুলছে , এখানে আজ কোনো সতেজতা নেই। না চাইতেও হাসতে চাওয়া যে কতটা কঠিন সেটা চন্দ্রা খুব করে বুঝতে পারছে। সে জানেনা এই কৃত্রিমতা কতদূর যাবে!

রাত ১ টার দিকে চন্দ্রাকে সজ্জিত বিছানাটায় বসিয়ে সবাই-ই চলে গেলো। একা একা এবার তার ভেতরের ধুকপুক আওয়াজটা সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। হাত-পা কাঁপুনি শত চেষ্টায়ও থামাতে পারছেনা।
আর তার কিছু সময় পরেই দরজায় আওয়াজ হলো, আওয়াজটা শোনার সাথে সাথে চন্দ্রা নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারছিলো না । না না নিজের বিয়ের রাতে এমন খারাপ অনূভুতি সে কল্পনাও করতে পারেনি।
নিজের ভুলটার কথা মনে করে এখন তার অনুশোচনা হচ্ছে। তার সত্যিই এটা উচিত হয়নি। এর জন্য তাকে অরুণ কখনো ক্ষমা করবেনা। তারপর আবার রনির সাথে তার সম্পর্ক আছে সেটাও জানে। কি করে সব স্বাভাবিক হতে পারে, এটা যেন চন্দ্রার কাছে অবাস্তব লাগছে।

ঘোমটার ভেতর থেকে আড়চোখে চন্দ্রা একটু সামনে তাকালো, দেখলো অরুণ এদিকেই এগিয়ে আসছে। তার এগিয়ে আসার সাথে সাথে তার বুকের কম্পনটাও বেড়ে যাচ্ছে। অরুণ একদম তার কাছে এসে হাত বাড়াবে তখনি চন্দ্রা পেছনে সরে গেলো,
কিন্তু তখন অরুণ পাশ থেকে একটা বালিশ টেনে নিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলো। আর বললো,
___তোমাকে স্পর্শ করতে আমার বয়েই গেছে। ভাব দেখাচ্ছে, কতো ঢং তার! এখন ঘুমাও গিয়ে যাও।

চন্দ্রা অরুণের কথায় যেন একটু স্বস্তি খুঁজে পেলো,
তাই বললো,
___ আচ্ছা আমি এখানে ঘুমাচ্ছি আপনিও তাহলে ওখানে ঘুমান।

অরুণ রাগী সুরে বললো,
___ আমি না তুমি নিচে যাও। কত্ত সাহস এই মেয়ের, আমাকে নিচে যেতে বলে!
আচ্ছা সে যাই হোক তোমার সাহসের তো এমনিতেই তুলনা হয়না,এসসব না-ই বা বলি।
তো এখন চুপচাপ নিচে যাও,আর শুনো.. ওই যে দেখছো কাপড়গুলো সবগুলো আমি জাগার আগে আগে ইস্ত্রি করে রাখবে। এইযে এখানে দেখো, এগুলো সবগুলো ধুতে হবে, কাল সকাল সকাল এগুলো সেরে ফেলবে দ্বিতীয়বার যেন বলতে না হয়। তারপর রান্নাবান্না সব তুমি করবে এরপর যা করবে তা হলো ঘর‍ ঝাড়ামোছা,ঘরের সবকিছু পরিষ্কার করা।

চন্দ্রা চেহেরা কালো করে বললো,
___ আচ্ছা আচ্ছা কাজের বুয়া হিসেবে এনেছেন আমাকে? তা আর কি কিছু আছে? থাকলে বলতে থাকেন।

অরুণ একটু ভেবে বললো,
___ হ্যাঁ আছে তো, আমি ফ্রেশ হওয়ার সাথে সাথে এক কাপ চা নিয়ে হাজির থাকবে। তারপর অফিসে যাওয়ার আগে আমি প্রতিদিন যে পরোটা খাই সেটার স্পেশাল ডিমভাজাটা আমার মায়ের কাছ থেকে শিখে নিবে, আমি অফিস থেকে আসার পরে আমার জন্য লেবুজল, এবং আমার পোশাকগুলো ঠিকঠাকভাবে গুছাবে। আরো কাজ আছে সেটা সময়মতো বলে দিবো। যতদিন এই বাড়িতে থাকবে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবো ভেবোনা! কেটে খেতে হবে।

___ আপনার বাড়িতে থাকবে কে? আমি কাল যে যাবো আর কখনো আসবো ভেবেছেন?

___ কাল তুমি কোথাও যাবেনা, এর পরেরদিনও না। মানে এখন থেকে এখানেই তোমাকে থাকতে হবে। আর আমি যা বলি তোমার বাবা তাই মানতে বাধ্য! কারণ বিয়ে যেহেতু আমি করেছি সেহেতু অধিকারটাও আমার এখন।

___ তাহলে পালিয়ে যাবো আমি।

অরুণ মাথা তুলে চন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বললো,
___কোথায়? তোমার ওই রনির কাছে? কিন্তু সে যে চন্দ্রা বলতে কাউকে ভালোবাসে এতক্ষণে সেটা ভুলে গেছে হয়তো।

চন্দ্রা কিছুটা থতমত খেয়ে বললো,
___ রনিকে কি করে চেনেন আপনি? আর তাকে নিয়ে এমন ফালতু কথা বলছেন কেন?

চন্দ্রার কথায় অরুণ হাহাহা করে হেসে উঠলো আর বললো,
___ এই পনেরোদিনে বিয়ে কে ভেঙেছে তা বের করেছি আর কেন ভেঙেছে সেটা বের করবোনা কীভাবে ভাবতে পারলে? তুমি একা নিজেকে চালাক ভাবো? আর রনিকে নিয়ে এমন বলছি কেন জিজ্ঞাসা করছো? আরে যে যেমন তাকে তেমনটাই বলা উচিত।

চন্দ্রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। সত্যিই তার মাথায় যাচ্ছেনা রনিকে অরুণ কীভাবে খুঁজে পেলো। আর কেনোই বা তাকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করছে। তবে আশ্চর্য এক কারণে অরুণকে নিয়ে যতটা নেগেটিভ ভাবনা ছিল সেটা কেটে গেছে৷ যা করছে সেটা তার ভুলের জন্য সত্যিই পাওনা ছিল।
তাই অরুণের এসব কথা তার গায়ে লাগছেনা। এদিকে ফ্লোরে বসে থেকে ঠান্ডায় তার গা হিম হয়ে আসছে। সে অরুণের দিকে তাকিয়ে বললো,
___ কম্বলটা অন্তত দিন, এখানে আমি এভাবে কি করে থাকবো?

চন্দ্রার কথা শুনে অরুণ কম্বলটা টেনে একদম নিচে উপরে জড়িয়ে বললো,
___ এভাবে ঠান্ডার মধ্যেই থাকবে তুমি। আমার থেকে নেওয়ারও কোনো চান্স নেই। এসব তোমার শাস্তি চন্দ্রা। শুভ রাত্রি,

চন্দ্রা কপালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলো। এর মধ্যে দেখলো অরুণ ঘুমিয়ে ডাক ডাকতেছে। তাকে বকতে ইচ্ছে করলেও সেটা করতে ইচ্ছে করছে না। কারণ তার ভাবীর কথাই ঠিক, অরুণ খুব ভালো একটা ছেলে। সত্যি সে ভীষণ ভালো। নাহলে এতকিছু জেনে তাদের দু পরিবারকে সেসবকিছু না জানিয়ে কৌশলে একদিনেই বিয়েটা করলো। এরপর চন্দ্রার উপরে জোরজবরদস্তিমূলক কিছু তো দূরে থাক তাকে একটু স্পর্শও করলোনা৷ চন্দ্রা ভাবছে সত্যিই কি অরুণ তাকে ভালোবাসে? নাকি এই সরলতার পেছনেও কোনো কারণে আছে?
নাহ তাকে নিয়ে ভাবনায় সে পেরে উঠবে না।

এরপর সব চিন্তা রেখে চন্দ্রা আস্তে করে উঠে গেলো এবং সারা রুম খুঁজে একটা পাতলা চাদর পেলো৷ সেটা দিয়েই কোনোরকম গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো। এছাড়া আর কিছুই করার নেই৷

পরেরদিন সকালে চন্দ্রা আগে আগেই উঠে গেলো। দেখলো অরুণ এখনো ঘুমিয়ে আছে। তখন তার মনে হলো রাতে অরুণ কি কি কাজ করতে বলেছিল। প্রথমে মনে হতেই তার চোখেমুখে একটা বিরক্তিভাব চলে আসলো। এরপর কি ভেবে যেন সে তার কাপড়গুলো সুন্দর করে ইস্ত্রি করলো। তখনও অরুণ ঘুমাচ্ছেই৷ সবকিছু গুছিয়ে চন্দ্রা ভাবলো এবার তাকে ফ্রেশ হয়ে একটু সাজুগুজু করা দরকার। শত হোক সে এখন নতুন বউ, একটু পর সবাই তাকে দেখতে চলে আসবে।
পরনের শাড়ীটা বদলে ব্যাগ থেকে খুঁজে সবুজ রঙের একটা শাড়ী বের করলো। তারপর পেছনে তাকিয়ে দেখলো অরুণ এখনো ঘুমাচ্ছে। কিছু না ভেবে সে এখানেই পরিবর্তন করতে লাগলো।

এদিকে অরুণ চোখ খুলেই দেখে তার সামনে চন্দ্রা পেছন ফিরে শাড়ীর আঁচল ঠিক করছে৷ চন্দ্রার পেছনে পিঠের ঠিক মাঝামাঝি একটা কালো তিল একদম তার চোখবিদ্ধ হয়ে আছে৷ অরুণ চোখ কচলে আবার তাকালো৷ ততক্ষণে চন্দ্রা সেটা ঢেকে পরিপূর্ণ তৈরি হয়ে গেছে। অরুণ হুড়মুড় করে উঠে বসলো। অরুণকে এভাবে উঠে যেতে দেখে সে একটু ভয় পেলে গেলো আর বললো,

___আপনি এতক্ষণ সজাগ ছিলেন? ও মাই গড!

অরুণ চোখ ডলতে ডলতে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
___ ওহহো আরো ৫ মিনিট আগে জাগার দরকার ছিল, কিন্তু আমার ঘুম যে এখনি ভাঙলো।

চন্দ্রা কিছুটা লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।

আর তখনি অরুণ রেগে ধমকে বলে উঠলো,
___ এই মেয়ে ওয়াশরুম নেই এখানে? রুমের মধ্যে তোমার পোশাক পর‍তে হবে কেন হ্যাঁ? আমি বুঝি তো সব ৷ কেন এমন করছিলে সেটাও আমি বুঝতে পেরেছি।
মন দিয়ে শুনো, তুমি যদি ভেবে থাকো তোমার এইসব কান্ডকারখানায় অরুণের মন গলাতে পারবে তাহলে ভুল ভাবছো। তোমাকে আমি মাত্র ১৫ দিনের জন্য বিয়ে করেছি বুঝেছো? তুমি বিয়ে ভেঙে দিয়েছিলে, আর আমি এর ঠিক পনেরোদিন পরে তোমাকে বিয়ে করেছি এবং তার ঠিক পনেরোদিন পরে তোমাকে ডিভোর্সও দিয়ে দিবো।
একটা ছেলেকে তুমি জঘন্যভাবে অপমান করেছিলে চন্দ্রা, সেদিন তাকে তার পুরো পরিবার ঘৃণার চক্ষে দেখেছিল, লোকজন ছি ছি করেছিল।
তার প্রতিশোধ না ছেড়ে দিবো কি করে হয়? সেটার অল্প একটু তোমাকে ভুগতেই হবে, সেটা হলো ডিভোর্সি উপাধি! হ্যাঁ একটা ডিভোর্স হওয়া মেয়েকে আমাদের সমাজ কীভাবে দেখে জানোতো? তবে তোমারও আবার বিয়ে হবে সমস্যা নাই, সেটা আরেকজন বউ চলে যাওয়া কোনো ব্যক্তির সাথে, যার সাথে ফ্রী হিসেবে থাকতে পারে এক দুইটা বাচ্চা!

বলেই অরুণ হেসে উঠলো।আর চন্দ্রা মুখে হাত দিয়ে দু পা পিছিয়ে গেলো। না না এসব কি বলছে অরুণ! এটা হতে পারেনা, কখনোই হতে পারেনা। অরুণকে নিয়ে তার মধ্যে ভালো একটা ধারণার উদয় হয়েছিল। কীভাবে সেটা মিথ্যা হতে পারে?

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here