আমি কাউকে বলিনি সে নাম পর্ব ২৪+২৫

আমি কাউকে বলিনি সে নাম
তামান্না জেনিফার
পর্ব ২৪+২৫
_________________________
২৪.
রূপার কলেজে ভর্তিটা হয়েই গেলো ৷ জেলা শহরের যে কলেজে একসময় নয়ন পড়েছে এখন থেকে সেটা রূপারও কলেজ ৷ কলেজে ভর্তি করাবার জন্য তাকে নিয়ে এসেছে নয়ন ৷ ক্লাস শুরু হতে এখনও বেশ দেরী ৷ এখানকারই একটা লেডিস হোস্টেলে রূপার থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে ৷ ক্লাস শুরু হলে সে এখানে এসে থাকবে এমনই কথা বলা আছে ৷

ভর্তি করাবার পর তাকে নিয়ে কলেজ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলো নয়ন ৷ কলেজের মাঠটা বিশাল বড় ৷ একপাশে বড় একটা দীঘি ৷ বেশ বড় করে সিড়ি বাঁধানো ৷ ছেলেমেয়েরা সেখানে বসে গল্প করছে ৷ নয়ন সেখানে রূপাকে নিয়ে বসলো ৷

—খুব ইচ্ছা ছিল , একদিন নিজের প্রিয় মানুষটারে নিয়া এইখানে বসবো ৷ আজকে ইচ্ছা পূরণ হলো …

—ও , কলেজে এসে এগুলাই ভাবা হইতো বুঝি !

—আমি আজকে প্রথমবার এখানে বসলাম জানিস ?

—আপনি আবার আমারে তুই বলতাছেন নয়ন ভাই !

—তা তুইও তো মানে তুমিও তো এখনও আপনি আর নয়ন ভাইতেই আটকায়া আছো !

—আমি থাকলে থাকুম , আপনে তুই তুই করবেন না আর !

—আচ্ছা আচ্ছা ! শোন এইখানে কিন্তু আইলাম খাইলাম বলবি না বুচ্ছিস ?

—তাহলে কিভাবে কথা বলবো , এইভাবে ?

—ওমা তুই না মানে তুমি তো দেখি শুদ্ধ ভাষাও বলতে পারো

—আমি সব পারি ৷ খিদা লাগছে নয়ন ভাই ৷

—আচ্ছা চল তোরে ক্যান্টিনে নিয়া যাই ৷ ক্যান্টিনের খিঁচুরি সেই রকম টেস্ট ! মাইন্ড করিস না রূপা , নতুন নতুন প্রেমে পড়ছি তাও আবার চাচতো বইনের সাথে , একটু টাইম তো লাগবোই !

—আচ্ছা টাইম দিলাম ৷ চলেন এইবার খাইতে যাই

ক্যান্টিনে খিঁচুড়ি অর্ডার করে দুজনে বসে আছে ৷ পাশের টেবিলে একটা মেয়ে আর সম্ভবত তার স্বামী বসেছে ৷ নয়ন বারবার মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে ৷ রূপার খুব অস্বস্তি হচ্ছে …একসময় নিজের অস্বস্তি ঢাকতেই বললো “ঐ বিয়াইত্যা হিন্দু বেটিরে এত দেখনের কারণ কী ? ”

রূপার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নয়ন উঠে ঐ মেয়ের কাছে যায় ৷ নয়নকে দেখে মেয়েটা ভয়ে অস্বস্তিতে কেমন যেন কুচকে যায় ৷

—আরে অতসী না ! কেমন আছো তুমি ? স্যার ভালো আছে ?

—জি দাদা ভালো আছি ৷ বাবাও ভালো আছে ৷

—বিয়ে করে ফেলছো !

অতসী জবাব দেয় না ৷ মাথা নিচু করে ফেলে ৷ পাশের লোকটি একটু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে

—আপনার পরিচয় ?

—আদাব ! আমি অতসীর বাবার ছাত্র ৷ উনার কাছেই অংক পড়তাম ৷

—তা , এখানে কী !

—কলেজে আমার চাচাতো বোনকে ভর্তি করাতে এসেছি ৷ অনেকদিন পর অতসীকে দেখে খোঁজ নিতে আসলাম ৷ আচ্ছা আপনারা খান ৷ সরি বিরক্ত করলাম ৷

অতসী এখনও মাথা নিচু করে আছে ৷ লোকটা কী কী যেন বলছে তাকে , বোধহয় ধমকাচ্ছে ৷ নয়নের খারাপ লাগে ৷ বোকা সোকা আদুরে একটা মেয়ে ছিল ৷ উঁচু ডাল থেকে জবা পাড়তে পারতো না , তখন ওদের ডাকতো “ও দাদা , আসেন না , কয়টা ফুল ছিঁড়ে দেন না !” আবার পূজার সময় ওদের জন্য নাড়ু আনতো ৷ পড়ার ফাঁকে ওরা বসে বসে অতসীর দেওয়া নাড়ু চিবাতো ৷ দুই বছরে বোনের মত সম্পর্ক হয়ে গেছিলো ৷ হাশিখুশি মেয়েটার এমন করুণ মুখটা দেখে খুব খারাপ লাগছে নয়নের ….

রূপা গাল ফুলিয়ে বসে আছে ৷ তাকে সবটা বলার পর ও বললো “ওকে তো ভর্তির সময়ই দেখলাম , আমাদের সাথেই ভর্তি হলো ৷” নয়ন আরও অবাক হয় , অতসীর তো ইন্টারমিডিয়ে পাশ করার কথা এতদিনে , না হলেও পরীক্ষার্থী তো হওয়ারই কথা হিসাবে ভুল না হলে ৷ এতদিনে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হচ্ছে কেন !

ভাবনা বেশিদূর আগায় না ৷ রূপা তাড়া দিতে থাকে বাড়ি ফিরবার ৷ বেশি দেরী হলে সন্ধ্যা হয়ে যাবে , আসার সময় চাচী বারবার করে বলে দিয়েছে সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরতে ….

বাসের দুলুনিতে ঘুম এসে যায় রূপার ৷ নয়নের হাতটা শক্ত করে ধরে ওর বামকাঁধটাকে বালিশ বানিয়ে দিব্বি ঘুমিয়ে পড়ে সে ৷ নয়নের ঘুম আসে না … চলন্ত পথে ওর কখনই ঘুম আসে না ৷ বরং মুগ্ধ হয়ে সে রূপার ঘুমিয়ে থাকা মুখটা দেখে ৷ কেমন নিষ্পাপ একটা মুখ , যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ! নয়ন দেখতেই থাকে পলক না ফেলে … জেগে থাকলে এত নিঁখুতভাবে তাকে দেখা সম্ভব হতো না কিছুতেই !

বাড়ি ফিরেই তারা শুনলো নিপা এসেছে ৷ হাতের কাগজপত্রের ফাইলটা কোনমতে চাচীর হাতে গুজে দিয়ে এক দৌড়ে সে চলে যায় ও বাড়ি ৷

—নিপা আপা , ইমন বাবায় কই ?

—তোর দুলাভাই নিয়া হাঁটতাছে মনে হয় ৷

—ও মা ! দুলাভাইও আইছে ?

—হ লগে বাইন্ধা আনছি ৷ পুরুষ মানুষ চোখে চোখে রাখন ভালা , তার উপ্রে নজর দেওনের মানুষ তো ঘরের মধ্যেই …

নিপার কণ্ঠস্বরে বিরক্তি ঝড়ে পড়ছে ৷ রূপা খানিকটা অবাক হয় ৷ সে কার কথা বলছে ? সুমাইয়ার ! সেই মেয়েটা যে নিজের স্বামীকে তার হাতে তুলে দিয়েছিল , যে তার গর্ভাবস্থায় মায়ের মত সেবা করেছিল ! কিছুতেই যেন হিসাব মিলছে না ! কোন ঝামেলা হয়েছে নিশ্চয় ! কিন্তু নিপা আপাকে তো একদমই স্বাভাবিক লাগছে ৷ এই মানুষটাকে তার কেমন যেন অচেনা লাগছে ৷ সে “পরে আসুম আপা” বলে চলে আসে নিজের বাড়িতে ৷

ঢেকির ধাপধুপ শব্দ আসছে ৷ উঠোনে চাঁদের আলো লুটোপুটি খাচ্ছে ৷ চাঁদের আলোতেই চাল কোটা হচ্ছে ৷ মজিদা খালা আর তার ছেলের বউ জয়নব চাল কুটতে এসেছে ৷ রূপা দূর থেকে বসে বসে তিনজন মানুষের ব্যস্ততা ৷ আলেয়া চাচী জয়নব ভাবিকে ডেকে বললেন “ও বউ , একখান গীত গাও দেখি ৷ আইজ খালি পা চলতাছে যে? মুখ বন ক্যান ?”

জয়নব ঢেকিতে পাড় দিতে দিতে সুরেলা কণ্ঠে গেয়ে উঠে

মন বিন্দাইলাম বনে বনে
আরো কান্দন কান্দে গো মায়-ও
বনে বনে আরো কান্দন কান্দে
গো মায়-ও নিরলে বসিয়া….

গীত শুনে নয়নও ঘরের বাইরে বের হয়ে এসেছে ৷ সবার থেকে দূরে বারান্দার চৌকিতে এসে বসেছে ৷ শুধুমাত্র ঢেকির ধাপধুপ শব্দ আর সেই শব্দ চিঁড়ে এক কন্যার তার মাকে মনে করে গাওয়া বেদনাবিধুর গীত ছিটকে বেড়িয়ে আসছে … রূপার চোখে জল এসে যায় ৷ যে মায়ের মুখটাও তার মনে নেই , সেই মায়ের কথা ভেবে তার খুব কান্না পায় …

২৫.

অর্ধেক রাত অব্দি চালের গুড়া করে আবার ভোরের আলোানা ফুঁটতেই চুলার পাড়ে বসেছেন আলেয়া বেগম ৷ জামাই এসেছে , সকালের নাস্তা খাবে এ বাড়িতে ৷ পিঠা পুলির আয়োজনে তাই কমতি রাখছেন না তিনি ৷ রান্নাঘরের খুটখাট আওয়াজে রূপাও এসে বসেছে ৷ হাতে হাতে চাচীর কাজে সাহায্য করছে ৷ একদিকে রূপা পিঠা বানাচ্ছে আরেকদিকে আলেয়া বেগম সেগুলো ভেজে ভেজে চিনির সিরায় ডুবাচ্ছেন ৷ সেগুলো হয়ে গেছে কোড়া নারিকেল গুলো ভেজে ফেললেন দ্রুত ৷ চিনি মেশানো এই নারিকেল ভাজা রূপার খুব পছন্দ ৷ পিঠা বানাতে বানাতে টপাটপ একটু একটু মুখেও দিচ্ছিলো সে ৷

—ওই , তুই কী মানুষ হইবি না হ্যাঁ ! পিঠা নারকোল সব পেটে পাঠাইলে পিঠা কী দিয়া হইবো ?

—সব কই খাইলাম ! মেলা আছে এখনও !

আলেয়া চাচী গজগজ করতে থাকে ৷ রূপার এখন আর খারাপ লাগে না ৷ এই মানুষটা যে তাকে ভালোবাসে তা বোঝার মত বড় সে হয়েছে ৷ আচ্ছা নয়ন ভাইয়ের সাথে তার সম্পর্কের কথা টের পেলে আলেয়া চাচী কী করবে ! নিশ্চয় খুব অশান্তি করবে ! তবে একসময় তার রাগ পড়ে যাবে , তখন তিনি খুশিই হবেন ৷ ভাবতে ভাবতে লজ্জা পেয়ে হাসে রূপা !

—এত আনন্দ কই থেইকা আসে রে ? চুলা ঠেলতূ ঠেলতে জীবন গেলো , আনন্দ পাইলাম না জীবনে !

রূপা উত্তর না দিয়ে আবার হাসে ৷

—কলেজ কেমুন দেখলি ?

—মেলা বড় ! আমগোর দুই বাড়ি যতখানি তার চাইতেও বড় ৷ অনেক সুন্দর ৷ বিরাটএকখান পুকুর আছে , কী সুন্দর শান বান্ধা ঘাট !

—এত বড় জায়গাত একলা একলা থাকতে পারবি ?

—পারুম না ক্যান , তুমি চিন্তা কইরো না চাচী

—যদি হারায়ে যাস !

—নয়ন ভাই কী হারাইছে? আমি হারামু ক্যান !

—এই তোর আক্কেল ! নয়ন আর তুই এক হইলি ! ও বেটাছেলে , ওর জন্যে দুনিয়া বহুত সোজা ৷ ঘর থেইকা বাইর হবার পর বুঝবি , দুনিয়া কেমন কঠিন ৷

—তুমি তো সারাজীবন ঘরেই কাটাইলা ! তুমি কেমনে জানলা চাচী ?

—খালি তক্ক ! এই মাইয়্যার খালি তক্ক ! যা , বহুত তক্ক হইছে , কাচের থালাবাটিডি বাইর কইরা ধুইয়া ফেল ৷

আলেয়া বেগমের কখন যে মন নরম থাকে আর কখন গরম বোঝা বড় দায় !

কাঁচের গ্লাসটা বোধহয় ফাঁটা ছিল , মাজার জন্য ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ঘুরাতেই হাত কেটে একাকার হয়ে গেলো ! রক্ত যেন ফিনকি দিয়ে ঝড়ছে ! রূপা তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে একটা কাপড় হাতে পেচিয়ে আলেয়া বেগমের সামনে গিয়ে বলে “হাত কাইটা গেছে চাচী , বাসনডি ধুইতে পারমু না ”

আলেয়া বেগম আবার রাগ হন ৷ কেউ নাই তাকে সাহায্য করবার , তিনি একাই এই রাবনের গুষ্টির জন্য খেটে মরছেন এই তার চিৎকারের মূলকথা ৷ চিৎকার শুনে নয়ন উঠে আসে ৷ মাকে কিছু বলার আগেই রূপা চোখের ইশারা দিয়ে তাকে কিছু বলতে মানা করে ৷ নয়ন তাই কিছু না বলে চুপচাপ বারান্দার চৌকিতে গিয়ে বসে ৷ কিছুক্ষন পর সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করে তার মা রূপার হাতে মলম লাগিয়ে দিচ্ছে …. এখনও তার মুখ চলছে , কিন্তু রূপা মটিমিটি হাসছে ৷ তাদের সম্পর্কের এই অদ্ভুত মিষ্টি সমীকরণ নয়নের মন ছুঁয়ে যায় ৷

নিপা , ইমরান আর ইমন এসেছে ৷ আলেয়া বেগম সবাইকেই আসতে বলেছিলেন ৷ বাকীরা পরে আসবে জানা গেলো ৷

খাবার টেবিলে ইমরান একাই বসেছে ৷ তার খাবারের তদারকি করছে রূপা আর আলেয়া বেগম ৷ দুজন মানুষের একান্ত আপ্যায়নের পরও নিপাও এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে স্বামীকে , যেন তাদের আপ্যায়নে সে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছে না ৷

—পায়েশ করেন নাই চাচী ?

—পায়েশ তো করা হয় নাই রে মা ৷ আমি এখনই চুলায় বসাইতেছি ৷

—থাক , লাগবো না ! নতুন জামাই পথ্থম বার আইলো , তার জন্যে পায়েশ রানলেন না কোন বিবেচনায় বুঝলাম না ৷

ইমরান নিপাকে থামিয়ে বলে “এত খাওনের পর আবার পায়েশ কোন ফেটে খামু !”

তবুও নিপার বিরক্তি কাটে না ৷ আলেয়া বেগমের মুখটা অপরাধবোধে ছোট হয়ে গেছে !

রূপা অবাক হয়ে বোনের ব্যবহার দেখে ৷ আলেয়া বেগমের নিচু মাথা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারে না সে ৷ মুখ ফসকে বলেই ফেলে

“নয়া জামাইরে মিষ্টি খাওয়ান লাগে শুনছিলাম ৷ মিষ্টি তো আছেই , পায়েশ নাইলে পরেরবার খাইবোনে দুলাভাই ! আর দুলাভাই তো পোলার বাপ হয়া গেছে , অখনও কী নতুন আছেনি !”

নিপা ঠাস করে রূপার গালে একটা চড় লাগায় ৷ তারপর স্বামী সন্তানকে বগলদাবা করে নিজে কিছু না খেয়েই চাচার বাড়ি থেকে চলে যায় ৷

ঘটনার আকষ্মিকতায় সবাই ধাক্কা খেয়েছে ৷ নিপা এরকম ব্যবহার করতে পারে তা কেউ ভাবেনি ৷ আলেয়া বেগম রূপাকে বলে “তক্ক না করলে হইতাছিল না ! মাইয়্যাডা না খায়া গেল গা ! ”

রূপা আলেয়া বেগমের কাঁধে হাত রেখে দৃঢ় গলায় বলে “তোমারে আমার চোখের সামনে কেউ অপমান করবো আর আমি চুপ কইরা থাকুম চাচী ? এই শিক্ষা তো তুমি আমারে দেও নাই ৷ অন্যায় দেখলে চুপ থাকা আমার স্বভাবের ভিত্রে নাই ….”

রূপা প্লেট গুছিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায় ৷

আলেয়া নিঃশব্দে ভেজা চোখে তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাঁকিয়ে থাকে ৷

চলবে ৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here