আমি ফাইসা গেছি পর্ব -০৩

#আমি_ফাইসা_গেছি(০৩)
মুমতাহিনা জান্নাত মৌ

আপনাদের বাড়ির ছেলে একজন প্রতারক। নাম্বার ওয়ান ধোঁকাবাজ।সে এতোদিন লুকিয়ে লুকিয়ে অন্য মেয়ের সাথে প্রেম করেছে।আর আজ বিয়ে করার জন্য নাচতে নাচতে আপনাদের সাথে পাত্রী দেখতে এসেছে।এই রকম দুই নাম্বার লুচ্চা ছেলেকে আমি কিছুতেই বিয়ে করতে পারবো না।

তোড়ার কথা শুনে কুশানের আবার ১০১ ডিগ্রি জ্বর এসে গেলো।সে যেটা নিয়ে ভয় পাচ্ছিলো ঠিক সেটাই ঘটে গেলো।

এদিকে তোড়ার কথা শুনে কুশানের ১০১ ডিগ্রি জ্বর আসলেও তার পরিবারের প্রতিটা সদস্যের ২০০ ডিগ্রি জ্বর এসে গেলো।এমনিতেই ওয়াশরুমে যেতে যেতে প্রত্যেকের শরীর ভীষণ ভাবে দূর্বল তার মধ্যে তোড়ার এমন উদ্ভট কথা শুনে তারা আরো বেশি দূর্বল হয়ে গেলো।

কিন্তু কুশানের তো এভাবে চুপ থাকা যাবে না।তোড়াকে এখনি না থামালে এই মেয়ে সবকিছু প্রকাশ করে দিবে।তখন তার মানসম্মানের তেরো টা বেজে যাবে।তার পরিবারের প্রতিটা সদস্যের তাকে নিয়ে করা গর্ব মুহুর্তের মধ্যে সাগরের অতল গহবরে তলিয়ে যাবে।তাদের বংশের মানসম্মান একেবারে
ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।কারন তাদের পরিবারের কোনো ছেলে মেয়েই বিয়ের আগে প্রেম করতে পারে না।বিয়ের আগে কেউ প্রেম করলে তাকে বাড়ি থেকে একদম ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া হয়।

সেজন্য কুশান তোড়ার কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,

আমার সোনাপাখি,আমার জানপাখি,আমার টুনটুনি টা।তুমি তো সবসময় এটাই চাইতে যে আমি তোমাকে যাতে বিয়ে করি।তাহলে আজ এমন করতেছো কেনো?প্লিজ আমার নামে আর উল্টাপাল্টা কথা বলো না।রাজি হয়ে যাও বিয়ে করতে আমাকে।তাহলেই ঝামেলা মিটমাট হয়ে যাবে।

তোড়া তখন চিৎকার করে বললো,না আমি রাজি হতে পারবো না।তুমি আমার সাথে প্রতারণা করেছো।তুমি বলেছো তোমার ফ্যামিলি তোমাকে এক্ষুনি বিয়ে করাবে না।কিন্তু তুমি ঠিকই দলবল নিয়ে অন্য কোনো মেয়েকে দেখতে এসেছো?

কুশান তো পড়ে গেলো মহা বিপদে।সে এখন কিভাবে তোড়াকে বুঝায় যে তার দুলাভাই রা তাকে চালাকি করে নিয়ে এসে এখানে।সে জানতো না তারা আজ মেয়ে দেখতে আসবে।তার দুলাভাই রা বলেছে তারা কোনো এক রিলেটিভের বাড়ি যাবে।
কিন্তু যে করেই হোক এখন তোরার মুখ বন্ধ করতেই হবে।তা না হলে এই মেয়ে আজ তার মানসম্মানের তেরো টা বাজিয়েই ছাড়বে।
কিন্তু কিভাবে করবে সেটা?

এদিকে তোড়ার মুখে কুশানের নামে এসব আজগুবি কথা শুনে সবাই কুশানের কাছে এগিয়ে আসলো আর চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলো।
কিন্তু ইরা, মিরা,লিরা চুপ করে থাকতে পারলো না।তারা তিনজন একসাথে বললো,

এ ভাই?এই মেয়ে এসব কি বলছে?একবার বলছে তুই অন্য মেয়ের সাথে প্রেম করিস আবার এখন বলছে তুই ওর সাথে প্রতারণা করেছিস?ব্যাপার কি ভাই?তুই কি এই মেয়েকে আগে থেকে চিনিস নাকি?

কুশান তার বোনদের প্রশ্নের কি উত্তর দেবে সেটাই ভাবতে লাগলো।
এদিকে কুশানকে চুপচাপ থাকা দেখে সবাই ভাবলো সত্যি কুশান এই মেয়েকে আগে থেকেই চিনতো তা না হলে কুশান কোনো রিয়্যাক্ট করছে না কেনো?

কুশান আর কোনো উপাই না দেখে সে তোরার কাছে গিয়ে বললো,

এই মেয়ে তোমার প্রবলেম মাথায় না বিয়েতে?যদি মাথাতে প্রবলেম থাকে তাহলে সেটা বলে দিতে পারো।পাবনা পাগলা গারদে আমি নিজে অভিভাবক সেজে রেখে আসবো।আর যদি বিয়েতে প্রবলেম হয়ে থাকে তাহলে এক কথায় বলে দাও যে তুমি রাজি না বিয়েতে।তাহলেই আমরা ভালোই ভালো চলে যাই।তবুও আমার নামে এসব মিথ্যা বদনাম দিও না।আমি কত টা সহজ সরল আর ভদ্র ছেলে জানো?এই বলে কুশান কামিনী চৌধুরীর কাছে গিয়ে বললো,
আম্মু তুমি কিছু বলছো না কেনো?

কামিনী চৌধুরী সেই কথা শুনে তোরার কাছে গিয়ে বললো,হ্যাঁ।আমাদের কুশান যথেষ্ট ভদ্র ছেলে।

কুশান তখন বললো, শুধু এটুকুই?আমাকে নিয়ে তোমার সেই বিখ্যাত কয়েকটা উক্তি এই মেয়েটাকে শুনিয়ে দাও তো।তাহলেই আমার নামে এসব বদনাম করা অফ করবে।

কামিনী চৌধুরী সেই কথা শুনে তার শাড়ির আঁচল দিয়ে কুশানের মুখমন্ডল মুছিয়ে দিয়ে বললো,

কুশানের মতো ছেলে আজকাল দেখাই যায় না।সে ভুল করেও কোনো মেয়ের দিকে তাকায় না।বরং মেয়েরাই তোকে দেখে শিস দিতে থাকে।তাকে এখনো আমাকেই ঘুম পাড়িয়ে দিতে হয়।মাঝে মাঝে তো আমাদের ঘরেই ঘুমায়,আমার হাতের মাখানো ভাত না খেলে তার পেটই ভরে না।আমার পারমিশন ব্যাতিত সে এক কদমও হাঁটে না।আর হ্যাঁ আমার মাথায় তেল দিয়ে দেওয়া,চুল আঁচড়িয়ে দেওয়া,আমাকে সকাল বেলা হাঁটতে নিয়ে যাওয়া সব কাজ আমার এই ভদ্র আদরের ছেলেটা করে থাকে।এই ছেলে অসভ্য কি করে হতে পারে?এক কথায় আমার ছেলে একদম মা ভক্ত ছেলে।তাই না বাবা?

কুশান তার মায়ের কথা শুনে একদম ভদ্র ছেলেদের মতো ঠোট উল্টিয়ে শান্ত কন্ঠে মাথা নাড়িয়ে বললো হ্যাঁ মা।

তোড়া কুশানের এমন ঢং করা দেখে চিৎকার করে বললো, কুশান?অভিনয় করা বাদ দিবে?। না আমি তোমার সবকিছু ফাঁস করে দিবো?আমার কিন্তু মেজাজ এখন টপে আছে।

কুশান সেই কথা শুনে জারিফ চৌধুরীর কাছে গিয়ে ন্যাকামো কন্ঠে বললো বাবা,
এই কোন মেয়েকে তোমরা দেখতে নিয়ে এসেছো?যে আমার নামে কুৎসা রটানোর চেষ্টা করছে।চলো তো আমরা তাড়াতাড়ি চলে যাই এখান থেকে।চলো বাবা চলো।এই বলে কুশান সবাইকে নিয়ে যেতে ধরলো।কারণ তোরার সামনে থাকলেই কুশানের বিপদ দ্বিগুন গতিতে বাড়তে থাকবে।পরে সে তোরাকে মেনেজ করে নিবে।এখন আগে তার নিজের প্রাণ বাঁচাতে হবে।

কিন্তু জারিফ চৌধুরী বললো,
দাঁড়া দাঁড়া।এতো তাড়াহুড়ো করছিস কেনো?এখনি যাবো নাকি আমরা?এই মেয়ে তোর ব্যাপারে এসব ভুলভাল কথা বলার সাহস পেলো টা কিভাবে?তার বিচার আগে করতে হবে না?

কুশান তার বাবার কথা শুনে আরো বেশি ভয় পেয়ে গেলো।তার বাবা আবার না জানি কেঁচো খুড়তে কেউটো বের করে নিয়ে আসে?

কিন্তু জারিফ চৌধুরী কুশানকে অবাক করে দিয়ে বললো,
আমাকেও একটু তোর সম্পর্কে দুই এক লাইন বলতে দে?আমিও একটু বুঝিয়ে দেয় আমার ছেলে কেমন?

জারিফ চৌধুরী এমনিতেই ভীষণ অসুস্থ বোধ করছেন। তার ইচ্ছা করছে না কথা বলতে।কিন্তু যেখানে তার ছেলের চরিত্র নিয়ে টানাটানি হচ্ছে সেখানে তিনি কি করে চুপ থাকেন?সেজন্য কষ্ট করেই তোরার সামনে গিয়ে আঙুল দেখিয়ে বললেন,

এই মেয়ে মুখ সামলিয়ে কথা বলো।আমার ছেলের নামে কি সব ভুলভাল বকছো?তুমি বোধ হয় জানো না আমার ছেলে কতটা ভদ্র?আর সে করবে এসব ফালতু প্রেম পিরিতি?যে ছেলেকে এখনো আমি গোসল করে দেই,আমার পারমিশন ব্যাতিত যে বাথরুমে পর্যন্ত যায় না,যার জন্য অফিস থেকে ফেরার সময় এখনো চিপস আর চকলেট নিয়ে আসতে হয়ে সেই ছেলে এসব অসভ্য কাজ কি করে করতে পারে?

এদিকে গোলাপ সাহেব আর চামেলি বেগম কুশানের বাবা মার কথা শুনে তো বেঁহুশ হয়ে পড়ে যেতে ধরলেন।এ কোন ছেলের সাথে তারা তাদের মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে?এই ছেলে তো এখনো মায়ের আঁচল আর বাবার লুঙ্গি ধরে ঘুরে বেড়ায়।এই ছেলে বিয়ে করে করবে টা কি?এ ছেলে তো পুরাই ভাদাইমা টাইপের।এই ছেলে কিছুতেই তাদের মেয়েকে কন্ট্রোল করতে পারবে না।

হঠাৎ ইরা মিরা লিরা একসাথে আসলো তোরার সামনে।ইরা এসে বললো,

আচ্ছা এমন নয় তো তুমিই অন্য ছেলের সাথে প্রেম পিরিতি করে বেড়াচ্ছো?

মিরা বললো,
আর সেজন্যই আমার সোনার টুকরো ভাই টাকেও তোমার মতোই ভাবছো?

লিরা তখন বললো,My brother is a piece of diamond.Not a bad girl like you. Do you understand?

তোড়া কুশানের বোনদের কথা শুনে একদম কেঁদে ফেললো।সে ছলছল নয়নে কুশানের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো,
কুশানের বোনরা তাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলছে তবুও কুশান কোনো প্রতিবাদ করছে না?এখনো সে তার অভিনয় চালিয়েই যাচ্ছে।এই ছেলের সাথে সে এতোদিন ধরে প্রেম করছে।যার নিজের কোনো ক্ষমতা নাই গার্লফ্রেন্ডের মানসম্মান রক্ষা করার?

কুশান তার বোনদের মুখে তোড়ার নামে এসব কথা শুনে নিজেও ভীষণ কষ্ট পেলো।সামান্য একটা মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে কতগুলো মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছে তাকে।তার উপর এখন তার ফ্যামিলির লোকজন তোরাকেই গালমন্দ করছে।না তার আর চুপ থাকা চলবে না।সত্য টা তাকে প্রকাশ করতেই হবে।এতে যা হবার হবে।তাকে তো আর মেরে ফেলবে না কেউ।হয় তো দু চারটা চড়ই মারবে সবাই মিলে।এরকম চড়,ঘুষি,খামচি তো সে রোজ রোজই তোরার হাতের খায়।ফ্যামিলির লোকদের হাতের কিল ঘুষি খেলে কি এমন হবে?

কুশান যেই বলতে যাবে সত্য কথা টা ঠিক তখনি গোলাপ সাহেব আর চামেলি বেগম চিৎকার করে বলে উঠলো,

আপনারা কি শুরু করেছেন বলেন তো?আপনারা আমার বাড়িতে এসে আমার মেয়েকেই গালমন্দ করছেন?আপনারা এতো বড় সাহস পেলেন টা কোথায়?আমাদের মেয়েটাকে কি পাগল পাইছেন যে যা মুখে আসছে তাই বলছেন।সবাই দয়া করে চলে যান আমাদের বাড়ি থেকে।এরকম ফ্যামিলিতে আমরা আমাদের মেয়েকে কিছুতেই বিয়ে দিতে পারবো না।আমাদের মেয়ে কিন্তু হাজার টা নয়।একটা মাত্র মেয়ে আমাদের।আর আমাদের মেয়েও কিন্তু কম না।কুটিতে একটা পাওয়া যাবে এমন মেয়ে।আমাদের মেয়েকে অপছন্দ করবে এমন বাপের বেটার এখনো জন্ম হয় নি।আর আমাদের ফ্যামিলির যে সুনাম দশ কদম হেঁটে সবার মুখে শুনে আসুন।

ইরা মিরা লিরা তখন মুখ ভেংচিয়ে বললো, তা তো দেখতেই পেলাম কেমন ফ্যামিলি আপনাদের?শরবত আর একটু নাস্তার আয়োজন করেছেন।সেটাও আবার অস্বাস্থ্যকর ছিলো।যা খেয়ে আবার সবাইকে বার বার বাথরুমে যেতে হয়েছে।আর যে মেয়ের এতো প্রশংসা করছেন সে তো এক নাম্বারের আনস্মার্ট আর অভদ্র।আমাদের পছন্দ হয় নি তাকে।এই চলো চলো সবাই।কার মুখ দেখে যে সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেছি?

ইরা,মিরা লিরার কথা শুনে তোড়া শুধু রাগে ফোসফাস করছে।সে মোটেও অন্য মানুষের কথা হজম করার মেয়ে নয়।কেউ কিছু বললে সে তার উলটো দুই চারটা বেশি কথা শুনিয়ে দেয়।কিন্তু আজ সে কোনো প্রতিবাদ করতে পারছে না।এই দুঃখ কি মেনে নেওয়া যায়?সেজন্য তোড়ার মনে ভীষন জিদ উঠলো।সে ঠিক করলো কুশানকে বিয়ে করে ওদের পরিবারে ঢুকে সবার জীবন সে ত্যানাত্যানা করে ছাড়বে।
আর এই কুশান বেটাকে তো রাম ধোলাই তাকে দিতেই হবে।যে একের পর এক মিথ্যা বলেই যাচ্ছে।কি সুন্দর অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছে।ওই কুশান যদি নাটক করতে পারে তাহলে সে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সিনেমা শুরু করে দিবে এখন।
কিন্তু তার আগে তো তাদের ফ্যামিলিকে এই মিথ্যা অপবাদ থেকে বাঁচাতে হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ।

তোড়া তখন বললো, আপনাদের যখন সন্দেহই হচ্ছে আমাদের খাবার নিয়ে।তাহলে আপনাদের সামনে আমরা সেই খাবার খেয়ে দেখাচ্ছি।

এই বলে তোড়া হঠাৎ ঢকঢক করে এক জগ শরবত খেয়ে নিলো।আর তার বাবা মাকেও খাওয়ালো।তারপর একটু করে নাস্তাও খেলো।
তোড়া তখন বললো,নিন আমরাও এই শরবত আর নাস্তা খেয়ে নিলাম।যদি খাবারে প্রবলেম থেকেই থাকে তাহলে আমাদের সবার অসুবিধা হবে।আর যদি আমাদের কিছু না হয় তাহলে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার কারণে আমরা আপনাদের উপর উলটো মানহানির মামলা করবো।

কুশান তোড়ার শরবত খাওয়া দেখে হা করে তাকিয়ে রইলো।তোড়া এটা করলো টা কি?এইভাবে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার কি দরকার ছিলো?যেখানে সবাই ওয়াশরুমে যেতে যেতে একদম নেতিয়ে পড়েছে সেখানে জেনেবুঝে কি করে তোড়া এই কাজ করলো?

কিন্তু এতোগুলো শরবত খেয়েও তোড়ার কিছুই হলো না।যখন তোড়ার কিছুই হলো না।গোলাপ সাহেব আর চামেলি বেগমও ঠিকঠাকভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন,
তখন তোড়া বললো,
এরপরেও বলবেন আমাদের খাবারে ভেজাল ছিলো?আসলে ভেজাল তো আপনাদের মনে?আপনারা নিজেদের কে নিয়ে খুব বড় কিছু ভাবেন।শুনে রাখুন তোরাও খন্দকার বংশের মেয়ে।
যারা আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলছে আর আমাদের পরিবারের নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে সে পরিবারে বউ হয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই আমার।সেই পরিবারে গিয়ে আমি কখনোই ভালো থাকতে পারবো না।

তোড়ার কথা শুনে জারিফ চৌধুরী এগিয়ে এসে বললেন,মা,তোমার দেখি খুবই সাহস।যে খাবার খেয়ে সবাই শুধু বাথরুমের দিকে দৌঁড়াতে লাগলো তুমি সেই খাবার নির্ভয়ে খেয়ে ফেললে?একবারও ভয় লাগলো না যদি সত্যি সত্যি তোমারও পেট খারাপ হয়ে যেতো?

তোড়া তখন বললো আংকেল আমি জানি আমাদের খাবারে কোনো ভেজাল নাই।আপনারা অযথাই ভুলভাল ভাবছেন আমাদের নিয়ে।সেজন্য নির্ভয়ে খেয়ে ফেললাম।এখন তো প্রমাণ হলো?

ইরা মিরা লিরা তখন নিজেরাই ফুসুরফাসুর করেতে লাগলো।ইরা বললো,
কি রে তাহলে কি আমাদের পেটে আগে থেকেই প্রবলেম ছিলো?এটা কি করে হতে পারে?মিরা তখন বললো কি জানি বুঝতে পারছি না। আমি তো এখানে আসার আগে বাদাম খেয়ে এসেছিলাম।লিরা তখন বললো,আমি তো কিছুই খাই নি।তাহলে আমার কেনো প্রবলেম হলো?
ইরা তখন বললো, মেয়েটা বড্ড চালাক।নিশ্চয় চালাকি করেছে।
অন্যদিকে শাহিন মাহিন তুহিন ও চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলো।তারা তিনজন ইরা মিরা লিরার কাছে গিয়ে বললো,এটা কি ধরনের আজগুবি কথা?সবার একসাথে কি করে পেট খারাপ হতে পারে?যদি এ বাড়ির খাবারে প্রবলেম থাকতোই তাহলে তোরার কিছু হলো না কেনো?
ইরা তখন বললো, এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে ওরা অভ্যস্ত। এজন্য বোধ হয় ওদের কিছু হলো না।

কামিনী হঠাৎ এগিয়ে এসে বললো, সবই বুঝলাম।কিন্তু তুমি কুশানের নামে এসব বদনাম কেনো করলে?আমার ছেলের নামে কেনো এসব ভুলভাল বকলে?

কুশান তার মায়ের প্রশ্ন শুনে মনে মনে বললো, আবার বিপদ?এ যাত্রায় আর তার রক্ষা নাই।কুশান সেজন্য চোখ বন্ধ করে থাকলো।

কিন্তু তোড়া হঠাৎ তার আসল রুপ পালটিয়ে ফেললো।সে ভাবলো তাকে যে করেই হোক এখন সবার মন জয় করতেই হবে।সে হঠাৎ বাঘিনী থেকে এবার ভেঁজা বিড়াল হয়ে গেলো।
তোড়া সেকেন্ডের মধ্যেই তার রুপ পালটিয়ে হঠাৎ সে তার শাড়ির আঁচল মাথায় দিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো,

সরি সবাইকে।আমার আচরনে মন খারাপ করলে ক্ষমা করে দিয়েন প্লিজ।আমি আসলে এতোক্ষণ পাত্রর সাথে অভিনয় করছিলাম।আমি দেখতে চাইছিলাম পাত্রের নামে এসব মিথ্যা অপবাদ দিলে পাত্র কেমন আচরণ করে?আর আপনারা আপনাদের ছেলেকে কত টা বিশ্বাস করেন?

সবাই একসাথে অবাক হয়ে বললো,মানে?

তোড়া তখন কুশানের সামনে গিয়ে তার চোখে চোখ রেখে মায়াবি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
যে ছেলে তার নামে এমন মিথ্যা অভিযোগ শুনেও তার রাগ কে কি সুন্দর কন্ট্রোল রাখতে পারে সে ছেলে কখনো খারাপ হতেই পারে না।আর আপনাদের ছেলের নামে যেসব কথা শুনলাম খুব ভালো লাগলো শুনে।এমন ভদ্র ছেলে আসলেই দেখা যায় না।আর আপনারা তাকে কত ভালোবাসেন?সত্যি আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি।যারা তাদের ছেলেকেই এতো ভালোবাসে না জানি ছেলের বউ কে আরো কত ভালোবাসবেন?

কুশান এতোক্ষন অন্য জগতে ছিলো।
কিন্তু তোড়ার এমন কথা শুনে সেই জগত থেকে ফিরে এলো।আর ভাবতে লাগলো হঠাৎ তোরার মুখে এতো মধু কই থেকে এলো?তোরা নিশ্চয় অন্য কোনো মতলব করছে।

জারিফ চৌধুরী এবার তোড়ার কাছে এগিয়ে এসে বললো,বাহঃ দারুন বুদ্ধিমতি তো তুমি?সত্যি প্রশংসা না করে পারলাম না।তোমার এমন আজেবাজে কথা শুনে আমরা কুশানের সাথে কেমন আচরণ করি আর কুশান কেমন রিয়্যাক্ট করে সেটাই দেখতে চেয়েছিলে তাই না?

তোড়া লক্ষ্ণী মেয়ের মতো বললো হ্যাঁ আংকেল।আপনিও বেশ বুদ্ধিমান।কত সহজে বুঝতে পারলেন আমার টেকনিক।

কামিনী চৌধুরী তোড়ার এমন ন্যাকামি দেখে বললো, তোমার যাচাই করা শেষ হয়ে গেছে?

তোড়া মাথা নাড়িয়ে বললো, হ্যাঁ শাশুমা।যাচাই করে দেখলাম আপনার মতো এমন সুন্দরী শাশুমা পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার।আপনি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি আপনার কথাবার্তাও বেশ ঝাঁঝালো।আমি তো এমনটাই চাই।যে আমার শাশুমা সারাক্ষণ আমাকে শাসনের সাথে আদর করবে।

ইরা,মিরা,লিরা তখন এগিয়ে এসে বললো, এই মেয়ে তুমি আমাদের আম্মুকে শাশুমা বলে ডাকছো কেনো?
তোড়া তখন কুশানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো এই সহজ বিষয় টা বুঝতে পারলেন না ননদিনীরা?

ইরা মিরা লিরা তিনজনই তোরার কথা শুনে অবাক।তাদেরকে তোড়া ননদিনী বললো?

তোড়া তখন বললো, আপনারা তিনবোনও ভীষণ ভালো।আপনাদের মতো এতো ভালো মানুষ এই দুনিয়ায় দেখাই যায় না।কত ভালোবাসেন আপনাদের এই ভাইকে?এই রকম একটা পরিবারে বউ হয়ে যেতে পারলে সত্যি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবো আমি।কি সুন্দর বাবার মতো একজন শশুড়।আহাঃ প্রথম দেখাতেই বুঝতে পেরেছি কত টা ভালো মানুষ তিনি?ওনার মতো সহজ সরল মানুষ মনে হয় এই দুনিয়াতে আর কেউ নাই।

জারিফ চৌধুরী তোড়ার কথা শুনে একদম গদগদ হয়ে গেলো।তিনি তো ধরেই নিলেন তোড়াই তার কুশানের বউ।এই মেয়ে ছাড়া তিনি কিছুতেই অন্য কারো সাথে কুশানের বিয়ে দিবেন না।কি সুন্দর করে তার প্রশংসা করছে।এরকম কদর কেউ করে নি তার।কামিনী তো সারাক্ষণ তার সাথে ঘ্যানঘ্যান করে।তার ভালো দিকটা তো কামিনীর চোখেই পড়ে না।

অন্যদিকে ইরা মিরা লিরা কামিনী চৌধুরীর কানে কানে গিয়ে বললো, মা এই মেয়ে কিন্তু বড্ড চালাক।আমাদের সবাইকে পটানোর চেষ্টা করছে।বাবা কিন্তু ইতোমধ্যে পটেও গেছে।বাবাকে না থামালে তিনি কিন্তু কথা দিয়ে ফেলবেন।

কামিনী চৌধুরী সেই কথা শুনে বললো, মেয়েটা তো দেখতে ভালোই আছে।আর কি সুন্দর করে যুক্তি দিয়ে দিয়ে কথাবার্তা বলছে।বাড়ির বউ এরকম হলে কিন্তু মন্দ হয় না।

ইরা মিরা লিরা তখন বললো, আম্মু তুমিও পটে গিয়েছো?

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here