আরশি পর্ব ২৮+২৯

#আরশি
#Part_28
#Writer_Asfiya_Islam_Jannat

— কথাটা আপনারা কিভাবে নিবেন জানি না কিন্তু অনেকদিন ধরেই আমার মাথায় এই কথাটা ঘুরছিল। আজ সবাই একসাথে আছি বলে তাই কথা না বলে থাকতে পারলাম না। আমি চাই সাদের সাথে আরশির বিয়ে দিতে।

কথাটা সকলের কর্ণধার পর্যন্ত পৌঁছাতেই সকলে স্তম্ভিত হয়ে যাই। সকলেই একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকে। সাদের চেহেরায় এক বিচলিত ভাব ফুটে উঠে। সম্ভবত সে এমনটা আশা করে নি অথবা এই বিষয়টি হতে সে অবগত ছিল। আমি সব শুনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রই। ঘটনাটা বুঝে উঠার চেষ্টা করি। এমন সময় মামা বলে উঠে,

— তা কিভাবে হয় আপা? আপনি তো জানেন এই আরশি একজন সিঙ্গেল মাদার। তার সাত বছর বয়সী এক মেয়ে আছে। তা সব জেনে শুনে আপনি কিভাবে সাদের জন্য আরশিকে চাইছেন?

শোভা আন্টি একটু নরম সুরে বলে,

— কেন চাইতে পারি না? এমন তো নয় সাদ অবিবাহিত আর আমি আমার অবিবাহিত ছেলের জন্য আরশির হাত চাইছি।

— তা না! কিন্তু…

মামা কথাটা বলে আমার দিকে ঘুরে তাকায়। আমি তখনও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মামার সাথে আমার চোখাচোখি হয়। মামা হয়তো বা আমার চোখ পড়তে চাইছিলেন কিন্তু আমার চোখ যে আজ নির্জীব। মামা তা দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। শোভা আন্টির দিকে তার দৃষ্টি স্থির করেন। শোভা আন্টি তা দেখে বলেন,

— আমি বুঝতে পারছি আপনাদের মনোভাব। বিষয়টা আপনাদের কাছে অতি সহজ নয়। সিঙ্গেল মাদার তো আমিও ছিলাম। আমি জানি কেমন হয় লাগে এমন প্রস্তাব আসলে। কিন্তু একটা কথা কি জানেন? এই সমাজে সিঙ্গেল মাদারদের মাথা উঁচু করে বেঁচে চলা খুব কঠিন। কেন না এইটা একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। এইখানে যে কেউ কাউরো পরিচয় জানতে চাইলে তার পরিচয়ের পর বাবার পরিচয় জানতে চায়। সে কি করে না করে এইসব জানতে চায়। একটা ফর্ম ফিলাপের সময়েও বাবার নাম, পরিচয়ের অপশন দুইবার দেওয়া হয়, যেখানে মায়েরটা একবার। এইখানে সর্বদাই বাবার নাম পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। মায়ের না। সাদ নিজেই বাবা ছাড়া বড় হয়েছে। ওকেও ছোট থেকে এমন অনেক পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে। যেখানে ওর বাবার কথা জিজ্ঞেস করা হয়েছে কিন্তু সে কিছু বলতে পারেনি। সে জানে তখন কতটা কষ্ট হয়। আমিও জানি।
তাই আমি চাইছি অহনা যাতে এইসব ফেস না করে। এমন না যে আরশি ওকে একা হাতে বড় করতে পারবে না। সে অবশ্যই পারবে। কিন্তু তাও আমি এই প্রস্তাব রাখছি কারণ আমি আরশি আর অহনাকে নিজের ঘরে তুলতে চাই। দুইজনকে আপন করতে চাই।

মামা সব শুনে বললো,

— আপনার মনোভাব জেনে খুব ভালো লাগলো। অহনা আর আরশির প্রতি ভালবাসা থেকে আমরা অবগত নই। আপনি নিশ্চয়ই দুইজনের ভালো চেয়েই এইসব বলছেন কিন্তু সিদ্ধান্ত তো আর আমার হবে না। যার হবে তাকেই না হয় জিজ্ঞেস করা হোক।

ভাইয়াও তাল মিলিয়ে বলে উঠে,

— হ্যাঁ ঠিক তাই। আর এইখানে আমাদের মতামত তো এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যাদেরকে নিয়ে এই কথা হচ্ছে তাদেরও তো সম্মতি থাকা দরকার।

এই কথার মাঝে ভাবী কিছু বলতে নিয়ে ভাইয়া চোখ গরম করে তার দিকে তাকায়। ভাইয়ার ওমন চাহনি দেখে ভাবী দমে যায়। যা আমার চোখ এড়ায় নি। কিন্তু তাও আমি কোন রিয়েকশন দিলাম না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় আমার আর সাদের দিকে। একবার সবাই সাদের দিকে তাকাচ্ছে তো একবার আমার দিকে। অথচ আমরা দুইজনই চুপ। কাউরো মুখে নেই কোন কথা।

_____________________

ছাদটা কেমন স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। চারদিকে জমে আছে বৃষ্টি পানি। তার উপর ভাসছে স্বচ্ছ নীল আকাশের প্রতিচ্ছবি। বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভেজা মাটির মিষ্টি গন্ধ। আমি চুপটি মেরে সাদের পাশের চেয়ারে বসে আছি। সাদও আজ নিশ্চুপ। পিন পিন নীরবতায় হাহাকার করে উঠছে গাছের পাতাগুলো। সাদের সাথে আমার একান্ত কথা ছিল বিধায় ছাদে আসা। কিন্তু এইখানে এসে যেন দুইজনেই কথা হারিয়ে ফেলেছি। কথার চেয়ে প্রশ্নের ঝুলি ভারী হলেও আপাতত কোন কিছুই মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। কেমন জড়তা কাজ করছে নিজের মধ্যে। অস্বস্তি নামক পোকাটি যেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে কিলবিল করছে। স্বাভাবিক হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছি কিন্তু হতে পারছি না। বার বার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলছি কিন্তু আদৌ তা কাছে আসছে না। শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের পানে তাকিয়ে রই। তপ্ত মস্তিষ্ক যদি এতে একটু স্থির হয় সেই আশায়। বেশ কিছুক্ষণ এইভাবেই থাকলাম। অতঃপর নীরবতা পেরিয়ে সাদকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠি,

— তুমি কি সত্যি এই বিয়ে করতে চাও?

হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে যাওয়ায় সাদ ভড়কে উঠে। সে চঞ্চল দৃষ্টিতে একবার চারপাশে তাকায়। অতঃপর নিজেকে স্থির করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,

— আমি নিজেও এর উত্তর জানি না।

আমি নীরবে সাদের দিকে তাকাই। সাদ আমার দৃষ্টির বক্তব্যটা বুঝতে পেরে বলে,

— বিয়ে করতে চাই কিনা জানি না কেন না তিন্নির জায়গায় অন্য কাউকে দেওয়া সম্ভব না। কোন কালেই না। কিন্তু এইটাও সত্য যে আমি অহনা বাবা হতে চাই। ওর মুখে দুই অক্ষরের সেই মধুর ডাকটি শুনতে চাই। ওকে পৃথিবীর সকল খুশি এনে দিতে চাই। এর জন্য যদি আমায় তোমাকে বিয়ে করতে হয় তাহলে ঠিক তাই।

— কিন্তু আমি চাই না। দ্বিতীয় বারের মত সংসার নামক দায়িত্ব-কর্তব্যের মাঝে পিসে যেতে চাই না। সত্যি বলতে আমার সংসার নামক জিনিসটা থেকেই মনটা উঠে গিয়েছে। ভয় লাগে এখন এইসবকে। দশটা বছর! ভাবতে পারছো তুমি? দশটা বছর ছিলাম এক সংসারে। কত কি না সহ্য করেছি আমি সেই সংসারটা টিকিয়ে রাখতে। নিজের সব আত্নসম্মান,আত্নগ্লানি বিসর্জন দিয়েছিলাম এই সংসারের শিকড়ে আবদ্ধ থাকার জন্য। কিন্তু সর্বশেষ কি হলো? সেই শিকড় আমায় ছাড়তেই হলো।

সাদ অতি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— এই কথাটা আমিও জানতে চাই কেন ছাড়তে হলো তোমার সংসার? এতদিন জিজ্ঞেস করি নি তুমি কষ্ট পাবে বলে কিন্তু আজ যেহেতু কথা উঠেছে সেহেতু আজ তোমার কাহিনী আমি শুনতে চাই।

আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে আমার অতীতের কালো অধ্যায় তুলে ধরতে শুরু করি। একদম গোড়া থেকে। আমি বলছি আর আমার জীবন থেকে সেই কালো অতীতের পাতাগুলো এক এক করে ছিঁড়ে দিচ্ছি। জীবন থেকে মুছে ফেলতে চাইছি সেই কালো অধ্যায়ের পাতাগুলো। ফাহাদের অমানুষিক আচরণের কথাগুলো বলতেও আজও গা ঘিন ঘিন করে উঠেছে। মনের মাঝে ঘৃণাগুলো উপচে পড়ছে। আবার অহনার কথা উঠতেই বিষাদে মনটা বিষিয়ে যাচ্ছে। নিজের মধ্যে ঘৃণা আর বিষাদের এক মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। অসহ্য হয়ে উঠছি ধীরে ধীরে। অবশেষে সেই তিক্ত অতীতের অবসান ঘটে। আমিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠে। স্বাভাবিক কন্ঠেই সাদকে বলি,

— এতকিছুর পর কি আমার সংসারের প্রতি অনিহা আসাটা স্বাভাবিক না? ভয় হওয়া কি স্বাভাবিক না?

সাদ ক্রোধে বলে উঠে,

— একটা মানুষ এতটা জঘন্য কিভাবে হতে পারে? এইটা কি আদৌ মানুষের বাচ্চা? মানে নিজের আপন সন্তানের প্রতি মানুষের কিভাবে টান না থাকে? এতটা কাপুরুষ কিভাবে হতে পারে?

— এই প্রশ্নের উত্তর যে আমারও অজানা।

সাদ বিরবির করে বলে উঠলো,

— রক্ত রক্তকেই টানে।

আমি সাদের কথাটা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করি,

— কিছু বললে?

— না।

— অহ!

এরপর নীরবতা। বেশ কিছুক্ষণ পর সাদ বলে উঠে,

— জানি না তুমি কথাটা কিভাবে নিবে, কিন্তু আমি এখন সত্যি চাই অহনার বাবা হতে। হোক সেটা প্রত্যক্ষভাবে অথবা পরোক্ষভাবে। এখন এর জন্য যদি আমার তোমায় বিয়ে করতে হয় তাহলে আমি রাজি।

— কিন্তু….

সাদ আমায় কথা বলতে না দিয়ে বলে উঠে,

— আগে পুরো কথাটা শুনো। বিয়ে হলেও তুমি তোমার মত থাকবে আর আমি আমার মত। আমি কখনোই তোমার উপর স্ত্রীর অধিকার ফোলাবো না। তোমায় আমাকে নিজের স্বামী হিসাবেও পরিচয় দিতে হবে না। শুধু অহনার বাবা হিসাবে পরিচয় দিলেই হবে। তোমার নামের পাশে আমার নাম বসাতে হবে না। আমি চাই, সবাই তোমাকে তোমার নামেই চিনবে জানবে আমার নামে না। আমি শুধু অহনার বাবার পরিচয় পেতে চাই আর কিছু নয়। ওকে বাবার ভালবাসাটা দিতে চাই। আপন করতে চাই ওকে। অহনাকে যদি কখনো জিজ্ঞেস করা হয় তার বাবা কে তাহলে সে যাতে বাবা হিসাবে আমাকে চিনে, জানে। নাম নাহয় তোমারই থাকলো, মেয়েটা আমারই হলো।

আমি সাদের কথা শুনে স্তম্ভিত। চকিতে তাকিয়ে রই তার দিকে। হঠাৎ নিজের ভিতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করে। বুঝে উঠতে পারি না আমার কি করা উচিৎ? এর মাঝে সাদ আবার বলে উঠে,

— জানি হয়তো ভাবছো আমার এতটা টান কেন অহনার প্রতি? কেন আমি এমন করছি? তা উত্তর কিন্তু তোমার সামনে। তুমি জানোই তিন্নির সাথে অহনার খানিকটা মিল আছে। যা সবচেয়ে বেশি টানে আমাকে তার প্রতি। আমি অহনার মধ্যে আমার মৃত অনাগত সন্তানকে অনুভব করি। যতবারই অহনাকে দেখি তখনই ভাবি আমার মেয়েটা যদি বেঁচে থাকতো সে হয়তো অবিকল অহনার মতই দেখতে হতো। কথাটা ভাবতেই আমার মনের মাঝে প্রশান্তির হাওয়া বয়ে যায়। শান্তি লাগে মনে। প্রতিটা মুহূর্ত আমি অহনার মধ্যে আমি তিন্নি ও আমার অনাগত সন্তান দুইজনকেই খুঁজে পাই। তাই তোমার কাছে আমি ওকে চাইচি। ওর বাবা হওয়ার অধিকার চাইছি। এখন সিদ্ধান্তটা তোমার উপর, তুমি কি দিবে আমায় একটা সুযোগ? দিবে অধিকার অহনার বাবা হওয়ার?
#আরশি
#Part_29
#Writer_Asfiya_Islam_Jannat

চার বছর পর। আষাঢ় মাসের দশ তারিখ আজ। বাইরে শা শা শব্দে বাতাস বইছে। চারদিকে ধুলোবালি মিশে একাকার। সময়টা দুপুর হলেও রাতের ন্যায় অন্ধকার ছেয়ে আছে চারদিকে। হঠাৎ হঠাৎ মেঘ বিকট শব্দ করে গর্জে উঠছে। হয়তো কিছু ক্ষণের মাঝেই নামবে ঢালা বর্ষণের ধারা। তীব্র বাতাসের ধাক্কা সইতে না পেরে পূর্ব দিকের কাঁচের জানালাটা বার বার কেঁপে উঠছে। জানালার ধারেই থাকা একটি চেয়ারে নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছে ফাহাদ। তার দৃষ্টি বাইরের দিকে নিবদ্ধ। প্রকৃতির হাহাকার যেন তার বুকের মাঝেও হচ্ছে। যা মুহূর্তেই তাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যাচ্ছে। তার ডান হাতের মুঠোয় পরে আছে আধখোলা একটি খাম। চিঠিটা সে এর আগেও বহুবার পড়েছে আর প্রতিবারই পড়া শেষে তীব্র যন্ত্রণায় ভুগেছে৷ মাঝে মধ্যে ক্রোধে ফেটে গিয়েছে। ভাঙাচুর করেছে। কখনো কখনো চিৎকার করে কেঁদেছে। আবার শান্তও হয়ে গিয়েছে। অনুশোচিত আর অনুতপ্ত হয়েছে বার বার। যতবারই সে চিঠিটা পড়ছে ততোবারই নিজেকে নিঃস্ব মনে হয়েছে তার। কিন্তু তাও সে চিঠিটা পড়ে। প্রায়ই পড়ে। নিজেকে শাস্তি দেওয়ার জন্য পড়ে। নিজের করা অন্যায় গুলো মনে রাখতে সে বার বার পড়ে। নিজেকে সেই নরকের যন্ত্রণায় শেষ করে দিবে বলে। আজও সেই উদ্দেশ্যেই চিঠিটা বের করা। ফাহাদ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাকালো। ফারদিন কম্বল গায়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। গতরাত থেকেই তার ১০২° জ্বর। ফাহাদ সারারাত ফারদিনিকে জলপট্টি দিয়েছে বলে সকালের দিকে জ্বরটা নেমে ১০০° তে এসেছে। অতঃপর ফারদিনকে সকালের নাস্তা করিয়ে ঔষধ খায়িয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। এখনো সেই ঘুমই ঘুমাচ্ছে সে। একা হাতে ফাহাদ ফারদিনের জন্য যত পারছে ততই করার চেষ্টা করছে। পারলে বেশি করছে। কিন্তু তাও কোথাও না কোথাও একটা কমতি রয়েই যায়। ফাহাদ নিজের দৃষ্টি ফারদিন থেকে সরিয়ে হাতের মুঠোয় থাকার চিঠির দিকে স্থির করে। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস নিয়ে ফাহাদ চিঠিটা বের করে তার ভাঁজ খুলে। পড়তে শুরু করে,

_______________

প্রিয় ফাহাদ,

কেমন আছো? কি প্রশ্নটা বেমানান লাগছে? আমারও লাগছে কিন্তু কি দিয়ে চিঠিটা শুরু করবো বুঝতে পারছিলাম না শুরুটা এইভাবে করলাম। হয়তো এইটাই ভাবছো হঠাৎ তোমায় চিঠি লিখছি কেন? উত্তরটা পাবে। একটু পরই পাবে। তা তুমি তো জানোই আমি একটুও ভালো নেই। একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি। অসুখ তো আছেই সাথেই আছে আমার পাপ। পাপগুলো যেন আমায় ঝাঁকড়ে ধরেছে। অনুতাপ আর অনুশোচনার তপ্ত অনুভূতিতে ভুগছি আমি। মানুষ বলে, ‘মৃত্যু যখন ঘনিয়ে আসে তখন সারাজীবনে করা পাপ ও অন্যায় গুলো চোখের সামনে এসে ভিড় করে।’ আমার বেলাও ব্যতিক্রম হয়নি। জীবনের শেষ সময়ে এসে বুঝতে পারছি আমি, ঠিক কতটা অন্যায় ও পাপ করেছি আমি। এমনকি পদে পদে ঠকিয়েছি আমি তোমাকে। তাই তো আজ আমার এমন করুণ দোষা। ‘এইচ আই ভি’ (HIV) রোগে আক্রান্ত আমি। তুমি তো আমার রোগ সম্পর্কে সবই জানো৷ আর হয়তো ধারণাও করতে পারছো এই রোগ হওয়ার কারণ কি। কিন্তু তাও তুমি কোন প্রশ্ন করোনি। আমাকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার সকল ব্যবস্থা করিয়েছ তুমি। হয়তো এইটাই ছিল আমার প্রতি তোমার ভালবাসা। কিন্তু এই ভালবাসা পাওয়ার যোগ্য কি আমি আদৌ ছিলাম? হয়তো না। আর যার ভাগ্যে মরণ লিখা আছেই তাকে কি আর বাঁচানো সম্ভব? লাস্ট স্টেজে চলে এসেছি আমি। জীবনের আর কিছু সময় বাকি আছে হাতে। তাই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার আগে আমি চাই, তোমায় নিজ থেকে স্পষ্টভাবে সব খুলে বলতে চাই। আমার করা সকল পাপ তোমার সামনে তুলে ধরতে চাই। কি কি অন্যায় করেছি আমি তাও বলে যেতে চাই। সামনাসামনি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু সাহস জোগাতে পারি নি। তাই বাধ্য হয়ে চিঠির সাহায্য নিলাম। হয়তো তুমি আমার মারা যাওয়ার পরে এই চিঠিটা পাবে আবার আগেও পেতে পারো। আর এরপর তোমার রিয়েকশন কেমন হবে তা আমি হয়তো জেনেও জানি না। কথাটা কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। কেন না আমার পাপের যে শেষ নেই। আচ্ছা! তাহলে শুরু থেকেই শুরু করি কেমন।

তুমি জানো কি না জানি না আমার কিন্তু টাকার প্রতি খুব লোভ ছিল। সেই শুরু থেকেই। আমার কাছে জীবনের আরেক নামই ছিল টাকা। লোভ ছিল গাড়ি,বাড়ির, দামী দামী কসমেটিকস আর গহনার। তাই তো যখন উঁচু ঘর থেকে আমার জন্য নিয়ের সম্মন্ধ আসে আমি তোমার ভালবাসাকে দু’পায়ে ঠেলে দিয়ে খুশি খুশি তাতে রাজী হয়ে যাই। বিয়ের আসরে বসে পড়ি। আমার কাছে তুমি সেই শুরু থেকেই খেলনা ছিলে। যার সাথে আমি আমার মত করে খেলেছি। আর তুমি তা বুঝতেও পারো নি। যেমন আমি হঠাৎ হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিলাম তোমার কাছে। কিছু বানোয়াট কাহিনী শুনিয়ে তোমার মন গলিয়েছিলাম। অথচ আমি কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে হারিয়ে গিয়েছিলাম। আমার বিয়েটা কিন্তু আমার মর্জিতেই হয়েছিল অথচ তোমার সামনে উপস্থাপন করেছিলাম যে তোমার আমার প্রেমের খবর বাবা জেনে যায় আর তিনি আমায় জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয় আর বিয়ের পরের দিনই আমাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মোবাইলও আমার পরিবার নিয়ে নেয়। তাই তোমার সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারি নি। হুট করেই তোমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলাম। আর তুমি মানলেও তাই৷

মনে আছে আমি তোমায় কি বলেছিলাম? আমার স্বামী আমাকে অত্যাচার করে, মারে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। আমার সাংসারিক জীবনের পাঁচটা বছর এইসব নির্যাতন সহ্য করতে করতেই কেটেছে। অবশেষে আমি সইতে না পেরে তাকে ডিভোর্স দিয়ে আসি৷ আমি ডিভোর্স দিয়েছি বলে আমার পরিবার আমাকে তাদের বাড়িতে জায়গায় দেয়নি। তাড়িয়ে দিয়েছে। তাই আমি তোমার কাছে এসেছি একটি আশ্রয়স্থল ভিক্ষা চাইতে। কিন্তু আসল কাহিনী যে ভিন্ন ছিল। আমি আমার স্বামীকে ডিভোর্স দেইনি বরং সে আমায় দিয়েছিল। আর এর মূল কারণ কি ছিল তাও বলছি। বিয়ের তিন বছরের মাথায় আমি জুয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে যাই। যার ফলে প্রতি সপ্তাহে আমি লক্ষ্য লক্ষ্য টাকা উড়িয়ে আসতাম। আমার স্বামী নিহিন আমায় মানা করলেও শুনতাম না। বরং চেঁচামেচি করতাম। অবশেষে সে আমায় অনেক কষ্টে এই আসক্তি থেকে বের করিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এরপর আমার পরপুরুষের প্রতি ঝোঁক বেড়ে যায়। বিভিন্ন সোশ্যাল সাইটের মাধ্যমে আমি পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ি। এমনকি রুমডেটও করি। প্রথম এক বছর বেশ ভালোই চলছিল সব। আমি হাসি খুশি ছিলাম বলে নিহিনও খুশি ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ওর আমার প্রতি সন্দেহ জন্ম নেয়। যা তীব্র থেকে তীব্র আকার ধারণ করে ও একটা সময় বুঝে যায় আমি পরকীয়ায় লিপ্ত। সে আমায় সরাসরি এই বিষয় নিয়ে জিজ্ঞেস করলে আমি নাকচ করে দেই৷ এই নিয়ে আমাদের মাঝে বেশ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু কোন পাকাপোক্ত প্রমাণ না থাকায় সে দমে যায়। আর আমিও সেইবারের মত বেঁচে যাই। কিন্তু একদিন নিহিন আমায় একটা ছেলের সাথে হাতে নাতে ধরে। সেদিন আমাদের মধ্যে বেশ কথা-কাটাকাটি হয়। কথায় কথায় সে আমার গায়ে হাত তুলে আর তখন রাগে হিদায়েত জ্ঞান ভুলে যাই। পাশে থাকা কাঁচের গ্লাসটি হাতে নিয়ে ওর মাথায় ফাটিয়ে দেই। এরপর চলে যাই আমার বাবার বাড়ি। অতঃপর কথাটা সকলের মাঝে জানাজানি হতেই আমার পরিবার আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। নিহিনও পুলিশের ভয় দেখিয়ে আমার ডিভোর্সটা আদায় করে নেয়। তখন আমি আমার একটা বান্ধবীর বাসায় উঠি। ওকে সব খুলে বলি। তখন সে আমায় তোমার কথা বলে। তুমি নাকি এখন একজন সরকারি কর্মচারী।ভালো পজিশনেই আছো। টাকা,পয়সা,গাড়ির কোন অভাব নাই। যেমনটা আমি চাচ্ছিলাম ঠিক তেমনই তুমি ছিলে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আমি তোমার কাছেই বেক করবো। আমার বিশ্বাস ছিল তোমাকে ভালবাসার কথা বললে তুমি আমাকে ফিরাবে না। আর হলোও তাই। তোমার কাছে গিয়ে একটু ন্যাকা কান্না করে সেই বানোয়াট কাহিনী শুনাতেই তুমি সকল রাগ অভিমান ভুলে আপন করে নিলে। কিন্তু যখন শুনলাম তুমি বিবাহিত। তোমার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা তখন একটু দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। কিন্তু ওই যে স্বার্থ। নিজের স্বার্থের জন্য আমি ঢুকে পড়ি তোমার জীবনে। হয়ে যাই তৃতীয় পক্ষ।

এরপর থেকেই আমি তোমায় ম্যানিপুলেট করতে থাকি। ব্রেনওয়াশ করি। তোমার স্ত্রী মানে আরশির প্রতি তোমাকে ক্ষেপাতে থাকি। বুঝাতে থাকি আরশি তোমার টাকার জন্য তোমার সাথে আছে। সে তোমার টাকার জন্যই তোমায় বিয়ে করেছে। আর তুমি মানলেও তাই। এইভাবেই তোমার আর আরশির সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না। যা ছিল তা হচ্ছিল নামের সম্পর্ক। তাই আমাকেও এত কষ্ট করতে হয়নি। কিন্তু আমার ভয় ছিল বাচ্চা হলে যদি তুমি ওর প্রতি তোমার মায়া জন্মে যায় বা বাচ্চার কথা ভেবে যদি আমার থেকে দূরে সরে যাও। আমি তোমাকে হারাতে পারতাম না। কেন না আমার জীবন চলাচললের জন্য যে আমায় তোমাকে বড্ড প্রয়োজন ছিল। তাই তো তোমাকে আমার একদম কাছে নিয়ে আসি। আপন করে নেই তোমায়। আর তোমার মনে বিষ ভরতে থাকি আরশি আর ওর মেয়ের প্রতি। অবশ্য এইভাবেও তোমার ধারণা ছিল যে ছেলে মানেই ছিল বংশের প্রদীপ। মেয়ে বংশের বোঝা। তাই হয়তো তোমার কাম্য ছিল ছেলে হবে। মেয়ে সন্তান তুমি চাইতে না। যেহেতু তোমার মেয়ে হয়েছিল তাই তার প্রতি ক্ষোভ এইভাবেই ছিল। আর আমিও সেই সুযোগের সৎ ব্যবহার করি। তোমাকে আমার কাছে আটকে ফেলি। ভুলিয়ে দেই সবকিছু। যেহেতু তুমি আমার ভালবাসায় অন্ধ ছিলে আর আমিও তোমার কাছে ইনোসেন্ট সেজে ছিলাম সেহেতু তোমাকে নিজের বশে আনতে বেশি সময় লাগেনি।

আমি আমাদের সম্পর্ক এইভাবেই বছরের পর বছর আগিয়ে নিয়ে যাই। একসময় ধীরে ধীরে তোমায় আমি বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকি। কেন না তোমার সকল কিছুতে তখন আমি অধিকার ফলাতে পারছিলাম না। তোমার সম্পত্তির মালিক হতে পারছিলাম না। তাই তোমায় বিয়ের কথা বলি। কিন্তু তুমি যে একদম রাজি ছিলে তা না। একটু দ্বিধায় ভুগছিলে। ফ্যামিলির কথা ভেবে একটু দমে যাচ্ছিলে। আর আমি এমন কোন পথ খুঁজছিলাম যা দিয়ে তোমায় একদম চেপে ধরতে পারি। আর কিছুদিনের মধ্যে সেটা পেয়েও গেলাম। যখন আমি জানতে পারি আমি প্রেগন্যান্ট তখনই এই বাচ্চাকে আমি ট্রাম্প কার্ড হিসাবে ইউজ করবো বলে ঠিক করি। আর তোমার আর আরশির ডিভোর্সটা করিয়ে ফেলি।

একটা কথা না বললেই নয়, ফারদিন তোমার সন্তান নয়। সে অন্য কাউরো সন্তান। তোমার সাথে পরকীয়া চলাকালীন আমার আরও একজন ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল। আর তারই সন্তান ছিল ফারদিন। কিন্তু তুমি সেটা বুঝতে পারোনি। যেহেতু আমাদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সেহেতু তুমি বিনাবাক্যেই মেনে নিলে আমার পেটের সন্তানটা তোমার।

আমার কোন কালেই বাচ্চা নেওয়ার প্রতি কোন ইন্টারেস্ট ছিল না। এর আগেও আমি তিন বারের মত এবোর্শান করিয়েছি। কিন্তু সেইবার নিজের সাথে বেঁধে রাখতে বাচ্চাটা আমি নিয়েছিলাম।
ফারদিন হওয়ার পরও আমি ওই ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম। আর সেটাই ছিল আমার ভুল। তুমি জিজ্ঞেস করতে না আমি এতটাকা কোথায় খরচ করি? তাহলে শুনো! আমি ওইসব টাকা ওই ছেলেকেই দিতাম। ওর কাছে আমার এক এমএমএস ছিল যা দিয়ে প্রতিনিয়ত ও আমাকে থ্রেড দিত। আমি বাধ্য হয়ে তার সব কথা মানতাম। যখন যতটাকা চাইতো দিতাম। এইভাবেই চলে কয়েকবছর। অতঃপর দুই বছর আগেই ওর জেল হয়। ড্রাগ ডিলিং এর কেসে ওকে জেলে নেওয়া হয় আর আমি মুক্ত পাই। কিন্তু আদৌ কি আমি মুক্তি পেয়েছিলাম? কিন্তু কথায় আছে না, ‘পাপ তার বাপকেও ছাড়ে না।’ আমার বেলায়ও হলো তাই। সর্বশেষে আমি এমন এক রোগে আক্রান্ত হলাম যার নেই কোন নিরাময়। আমার জীবনের ইতি যে নিশ্চিত। আর এই জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে বুঝতে পারলাম তোমার ভালবাসা। পরিবারের মর্যাদা। বুঝতে পারলাম নিজের ভুল। একেক করে চোখের সামনে ভেসে উঠলো সকল পাপ, অন্যায়। আমি যে আপাদমস্তক পাপের আবরণে ঘেরা। জানি আমার করা পাপগুলোর কোন ক্ষমা হয় না। তাই তোমায়ও বলবো না যে ক্ষমা করে দিও। শুধু একটা অনুরোধ করবো। বলতে গেলে আমার শেষ ইচ্ছা এইটা। আমার ভুলের শাস্তি ফারদিনকে দিও না। ওকে ফেলে দিও না। ছোট থেকে তুমি যেভাবে ওকে আদর,যত্ন করে এসেছ সেভাবেই ওকে বাকিটা জীবন দিয়ে যেও। ওকে আমার বা তোমার মত বানিও না। একজন ভালো মানুষ বানিও। অবশেষে বলতে চাই, ভালো থেক।

ইতি,
জুঁই

________________

চিঠিটা পড়া শেষে ফাহাদ কেমন হাঁসফাঁস করতে থাকে। শরীর তার কাঁপছে৷ রাগে নাকি দুঃখে তা সে নিজেও জানে নি। জুঁই মারা দিয়েছে আজ প্রায় এক বছর হতো চললো। আর এই এক বছরে ফাহাদ কতবারই না এই চিঠিটা পড়েছে। উন্মাদের মত আচরণ করেছে। প্রতিবারই চিঠিটা পড়া শেষে তার চোখে ভেসে উঠতে থাকে সতেরো বছর পুরনো সেই স্মৃতিগুলো। তার জীবনের কাহিনীটুকু। আজও তার ব্যতিক্রম কিছু হয় নি। তার চোখে ভেসে বেড়াচ্ছে জীবনের কাহিনীটুকু।

___________________

সতের বছর আগে। আমি তখন পড়ালেখা শেষ করে বেকার ঘুরচ্ছি আর বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আর সেই সময়েরই আমার প্রেমিকা ছিল জুঁই। আমারই ভার্সিটিতে একদম জুনিয়র ব্যাচ ছিল ও। ভার্সিটির এক ফাংশন থেকেই জুঁই আর আমার পরিচয়। অতঃপর বন্ধুতে তারপর প্রেম। বেশ ভালোই চলছিল আমার আর তার প্রেম। বেশ ভালবাসতাম আমি জুঁইকে। আমি যখন বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক সেইসময় জুঁই হারিয়ে যায়। আমি প্রায় তখন উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম। পাগলের মত খুঁজেছিলাম জুঁইকে। কিন্তু পায় নি। অতঃপর জানতে পারি যে জুঁইয়ের বিয়ের হয়ে গিয়েছে। আমাকে জুঁই ধোঁকা দিয়েছে। কথাটা তখন বিশ্বাস করতে চাই নি কিন্তু যখন বিশ্বাস হলো তখন প্রায় ভেঙ্গে পড়েছিলাম আমি। ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম। যার ফলে আমার সেইবারের বিসিএস পরীক্ষা দেওয়াও হয় উঠেনি। সেই ডিপ্রেশন থেকে বেরিয়ে আসতে আমার বেশ সময় লেগেছিল। কিন্তু একসময় পেরেছিলাম বেরিয়ে আসতে। আর তখন আবার নতুন দমে বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেই এবং ভালো মত পরীক্ষা দেইও। ভাগ্যক্রমে আমার সিলেকশনও হয়ে যায়। ঢাকারই এক ব্যাংকে আমার চাকরি হয়। ভালোই পদেই পেয়েছিলাম আমি। তো চাকরি হওয়ার পরই পরই বাবা-মা বিয়ের জন্য জোর দিতে থাকে। কিন্তু আমার মন মস্তিষ্কে তখন জুঁই ছিল। তার দেওয়া ধোঁকা মনের মাঝে গেঁথে ছিল। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় ঘৃণা। সকল নারী জাতির প্রতি প্রচুর ঘৃণা। তাই ঠিক করেছিলামই বিয়েই করবো না।
কিন্তু বাবা-মা তো আমার কথাই শুনতে নারাজ। অবশেষে তারা এক মেয়ে পছন্দ করে এবং তার সাথেই আমাকে জোর করে বিয়ে করিয়ে দেয়। তখন যে পরিমাণ রাগ হয়েছিল তা বলার বাহিরে। রাগ হচ্ছিল সবার প্রতি। জুঁইয়ের প্রতি আমার রাগ তো ছিলই, সাথে যোগ হয়েছিল বাবা-মা প্রতি রাগ। সেই সাথে রাগ হচ্ছিল আমার বউ হয়ে আসা সেই মেয়েটির উপর। সে কেন আমার বউ হয়ে আসলো? কেন বিয়ে করলো আমায়? নারীদের প্রতি তো ঘৃণা ছিলই সে সাথে যোগ হয় রাগ। আর সেই আবেগেই এসেই আমি প্রথম দিন থেকে আমার বউয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করা শুরু করলাম। অমানবিক আচরণ শুরু করি তার সাথে। বিয়ের দ্বিতীয় দিনের মাথায় আমি আমার বউয়ের নাম জানতে পারি। তার নাম ছিল আরশি। সেইদিন আমি আরশিকে ভালো মত দেখেছিলাম। মুখখানা ছিল তার মায়ায় ভরপুর। কিন্তু সেই মায়া আমাকে গলাতে পারেনি। কেন না অন্য একজনের মধ্যে বিভোর ছিলাম। হোক না সে একজন প্রতারক। ভালবাসা তো একবারই হয় বার বার না।

দিনের পর দিন আমি আরশির সাথে খারাপ ব্যবহার করেই গিয়েছিলাম। কত কি না করেছি। কত কথাই না শুনিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ও হয়তো এইসব সহ্য করতে না পেরে আমায় ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু সে আমায় ছেড়ে যায় নি। বরং সে চুপচাপ সব সহ্য করে গিয়েছিল। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। কিন্তু তাও আমার মায়া হয় নি। কেন হয় নি জানি না। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, মায়ায় তো আমি তার পড়েছিলাম শুধু ভালবাসতে পারি নি।

আরশি যখন অন্তঃসত্ত্বা তখন জুঁই আমার জীবনে আবার ব্যাক করে। তখন জুঁইয়ের প্রতি খুব রাগ হয়েছিল। কিন্তু যখন ওর জীবন কাহিনী শুনি তখন আমি গলে যাই। আপন করে নেই ওকে। ভালবাসতাম বলে তাকে। তাই তো তার এক ইশারায় লিপ্ত হয়ে যাই এক অবৈধ সম্পর্কে। আমার এখনো মনে আছে, যেদিন অহনা জন্ম নেয় সেদিন আমি ছিলাম জুঁইয়ের কাছে। খুব ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ছিলাম আমরা। আর সেই সময় আমার একবারের জন্যও আমার সন্তান বা আমার স্ত্রী এর কথা মনে পড়ে নি। আরশিকে তো আমি শরু থেকেই অবজ্ঞা করেছি কিন্তু সেদিন থেকে অবজ্ঞা করেছি নিজের সন্তানকেও। ভাবতেই অবাক লাগে, নিজের আপন সন্তানকে কিনা আমি দুই দিন পর গিয়ে কোলে নিয়েছিলাম তাও মায়ের জোড়াজুড়িতে। তখন একটা আলাদাই অনুভূতি হয়েছিল আমার মধ্যে। কিন্তু সেই অনুভূতিটার মানে বুঝে উঠার আগেই জুঁইয়ের ফোন এসেছিল আর আমিও পাগলের মত ছুটে গিয়েছিলাম তার কাছে। ধীরে ধীরে আমার বাসায় আসা কমে যায়। খোঁজ নিতাম না আমার সন্তানের। নিতাম না কোন খোঁজ আরশি এর। সন্তান আমার মেয়ে ছিল বলে তার প্রতি আমার এত অনিহা ছিল কিনা জানি না। শুধু জানি তাকে নিজের সন্তান হিসাবে মানতে চাইতাম না। জুঁইয়ের কথাগুলো বেশি থাকতো মাথায়। যার ফলে একসময় আরশি আর নিজের সন্তানকে অসহ্য লাগতে শুরু করে। মনে হতে থাকে সে জুঁই এর জায়গা দখল করে রেখেছে। সে আমাদের মধ্যে তৃতীয় পক্ষ। তাই তো তার প্রতি আমার অত্যাচার বাড়তে থাকে। আর একসময় তা বাড়তে বাড়তে নিজের সকল সীমা পেরিয়ে যায়। কিন্তু তাও আরশি সব মুখ বুঝে সহ্য করে নেয়। আর অবশেষে তাকে ডিভোর্স দিয়ে দেই। ভেবেছিলাম আরশি হয়তো আমায় ভালবাসে তাই আমাকে বোধ হয় ডিভোর্স দিবে না। তাকে ছাড়তে আমার অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। কিন্তু তার কিছুই হয়নি। বরং আরশি আমাকে সহজের ডিভোর্স দিয়ে দেয়। ছেড়ে দেয় আমায়। তখন মনে হয়েছিল সে আমাকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।সে আমাকে মুক্তি দেয় নি বরং আমি তাকে মুক্তি গিয়েছিলাম।
আজ বুঝতে পারছি কতটা পাষাণ মনের মানুষ ছিলাম আমি। কতটা না অত্যাচার করেছি আমি তাকে। কিভাবে পেরেছিলাম নিজের স্ত্রী ও সন্তানের গায়ে হাত তুলতে? কিভাবে? আজ মনে হচ্ছে আমার চেয়ে হয়তো একটা জা*** ও উত্তম।

আরশিকে আমি তার বাবার বাড়ি যেতে দিতাম না তাকে কষ্ট দিব বলে। আদৌ কি তাই ছিল? উঁহু! তা কিন্তু ছিল না। তাকে তার বাবা বাড়ি যেতে দিতাম না কারণ আমার মনে ভয় ছিল আরশি হয়তো হারিয়ে যাবে। কিন্তু আফসোস কথাটা তখন বুঝিনি। বুঝেছি এখন। আরও কত না বলা কথা যে আমি এখন বুঝেছি তার হিসাব নেই। যেমনঃ আমার জীবনে আরশির গুরুত্ব, নিজের সন্তানের গুরুত্ব, বাবা হওয়ার সুখ,রক্তের টান, পরিবার ও সংসারের মর্ম। আজ সে বুঝতে পারছে ভাল তো সে বেসেছিল কিন্তু তা একজন ভুল মানুষকে। অথচ এইসব যদি আগে উপলব্ধি করতে পারতাম তাহলে হয়তো আমার জীবনটা আজ অন্যরকম হতো।

অবশ্য একটা কথা না বললেই নয়, আমার জায়গায় যদি অন্য যে কেউ থাকতো তাহলে সে আরশিকে ভালবাসতে বাধ্য হতো। কেন না সে মেয়েই ছিল এমনই। কিন্তু আমি পারি নি। হয়তো এইটাই আমার ব্যর্থতা।

__________________

ফারদিনের গোঙ্গানির আওয়াজ কানে এসে বারি খেতেই ফাহাদ নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। ইতি মধ্যে ঝড় শুরু হয়ে গিয়েছে৷ তীব্র শব্দে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হিম ভাব ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ফাহাদ চিঠিটা দ্রুত ভাঁজ করে টেবিলের উপর রেখে চলে যায় ফারদিনের কাছে। ফাহাদ মাথায় হাত দিয়ে দেখে জ্বর তার আবার বেড়েছে। সে দ্রুত একটি বাটিতে কাপড় ভিজিয়ে এনে ফারদিনের মাথাত জলপট্টি দিতে থাকে। ফাহাদ এক ধ্যান ফারদিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর ভাবতে থাকে যে,

— নিজের রক্তকে অবজ্ঞা করে এখন অন্যের রক্তকে আগলে রাখছি৷ ভালবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছি। একেই কি নিয়তি বলে? আজ মনে হচ্ছে প্রকৃতি যেন নিজেকে পুনরাবৃত্তি করেছে। যেমন, ফারদিন ছোট থেকে মায়ের ভালবাসা পায়নি আর অবশেষে হয়েছে মা হারা। ঠিক এর উল্টোটাই তো কয়েক বছর আগে হয়েছিল অহনার সাথে। সে যেই আচরণ আরশির সাথে করেছে, ঠিক সেই ব্যবহারই সে জুঁইয়ের কাছ থেকে ফেরত পেয়েছে। সে যা করেছে আরশির সাথে ঠিকই জিনিস হয়েছে তার নিজের সাথেও। সে আরশিকে ঠকিয়েছে আর জুঁই তাকে। কয়েকবছর আগে আরশি যেই জায়গায় ছিল আজ সে নিজেও সেই জায়গায়। বরং তার অবস্থা আরশির থেকেও করুণ। জুঁই নেই। সে তো মারা গিয়েছে আজ প্রায় এক বছর হলো। বাবা-মাও মারা গিয়েছে বছর খানিক হলো। আজ সে নিঃস্ব। পুরোপুরি ভাবে নিঃস্ব। তার আপন বলতে আজ কেউ নি। ঠিকই বলেছিল জুঁই, “পাপ নিজের বাপকেও ছাড়ে না।” যেমন তাকেও ছাড়েনি। আজ সে নিজেও ‘এইচ আই ভি’ রোগে আক্রান্ত। এই রোগের ফাস্ট স্টেজে আছে সে। ভালো থাকার জন্য চিকিৎসা তো সে নিচ্ছে কিন্তু আদৌ কি সে ভালো আছে? তার মনে যে বিন্দু মাত্র শান্তি নেই। মনের ভিতর যে জ্বলছে অনুশোচনার আগুন। তার করা অন্যায় গুলো তাকে ঝাঁকড়ে ধরেছে। পারছে না শান্তি মত বাঁচতে। তিলে তিলে তার আত্না মারা যাচ্ছি। আরশি নিজের প্রতিশোধ না নিলেও প্রকৃতি ঠিকই তার প্রতিশোধ নিয়েছে। আর এইটাই হয়তো প্রকৃতির নিষ্ঠুরতম প্রতিশোধ তার প্রতি।

কথাটা ভেবেই ফাহাদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়। এছাড়া যে তার কিছুই করার নেই।

___________________________

— আম্মি! আম্মি!

অহনার ডাক শুনে আমি কেক ডেকোরেশন করা রেখে দিয়ে পিছনে ঘুরে দাঁড়াই। দেখি অহনা কোমড়ে দুই হাত রেখে রাগী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে তার একটা নেভি ব্লু কালারের টপস আর নিজে জিন্স। কোমর পর্যন্ত থাকা চুলগুলো উঁচু করে ঝুটি করা। সামনে কাটা ছোট ছোট চুল গুলো বেড়িয়ে আসে৷ সে গোল গোল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি মিষ্টি হেসে বলি,

— এ কি মামণি তুমি এখনো তৈরি হও নি? আজ না তোমার ডান্স পারফরম্যান্স?

অহনার প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করে বসে,

— বাবাই কোথায়? কখন আসবে? সে বলেছিল আমায় ৯ টা বাজে চলে আসবে। কিন্তু সে এখনো আসে নি।

আমি ক্রিমের পাইপিং ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে বলি,

— সে যেহেতু তার অহুপরীকে প্রমিস করেছে আজ সে আসবে সেহেতু আজ দুনিয়া উলোট পালোট হয়ে যাক সে আজ আসবেই। হয়তো একটু দেরি হতে পারে কিন্তু সে দেখো ঠিকই আসবে।

অহনা অস্থির ভঙ্গিতে বলে,

— কিন্তু কখন? আমার স্কুল ফাংশন ১১ টা বাজে শুরু হয়ে যাবে তো।

আমি অহনার হাত ধরে রুমের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলি,

— বাবাই এসে পড়বে মামণি। তুমি এ নিয়ে চিন্তা করো না। এখন আমার সাথে আসো আম্মি তোমায় সাজিয়ে দিচ্ছি।

অহনা কিছু না বলে মুখটা ছোট করে চুপচাপ আমার সাথে রুমের দিকে যেতে থাকে। ঠিক এমন সময় বাসার কলিং বেল বেজে উঠে। সাথে সাথে অহনার মুখে খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ে। সে আমার হাত ছেড়ে দ্রুত চলে যায় দরজার পাশে। দরজাটা খুলে সে তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে দেখতে পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে আর উৎফুল্ল সুরে বলে উঠে,

— বাবাই!!

#চলবে

এতদিন গল্প না দেওয়ার জন্য দুঃখিত। গল্প সাজাতে আমার সময় লাগছিল সেই সাথে আমার লিখার প্রতি অনিহা। তাই এই পর্বটা দিতে দেরি হলো। আবারও দুঃখিত।☹️

টানা ৬ ঘন্টা লিখার পর গিয়ে শেষ হয়েছে আজকের গল্পটা। তো সে হিসাবে সকলের কাছে কি একটু গঠনমূলক কমেন্ট আশা করা যায় না? 🙂
#চলবে

গল্পে কিন্তু এখনো শেষ হয়নি পাঠকসমাজ। আভি তো বহাত টুইস্ট বাকি হ্যায়😁

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here