আড়ালে অনুভবে পর্ব ৩৩ ও শেষ পর্ব

#আড়ালে_অনুভবে
#সাদিয়া_আফরিন_প্রতিভা
#পর্বঃ৩৩ (অন্তিম পর্ব)

“মাম্মাম মাম্মাম,বাবা..”

নদীর কথায় চোখ পিটপিট করে তাকালো প্রভা।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ৭:৩০ বাজে।ধীরেধীরে পাশে ঘুড়ে দেখে নদী ফোন নয়ে কিছু দেখছে আর ভ্রু কুচকে আছে।

প্রভা:কি হয়েছে মাম্মাম?এতো তাড়াতারি উঠলে কেনো?

নদী:আমাল তো ঘুম আসছিলোনা মাম্মাম।

প্রভা:আচ্ছা ঠিক আছে এবার বলো,কি দেখছো?

নদী:(ফোন এর একটা ছবি দেখায়) মাম্মাম এখানে বাবা তোমাল পেটে পাপ্পি দিচ্ছে তেনো? আল এখানে তোমাল পেট এমন বড় হয়ে আছে কেনো?

নদীর কথা শুনে প্রভা হো হো করে হেসে দিলো। ছবিটা সেই ঘটনার আগের দিন রাতের। প্রভা কিছুতেই ঘুমোতে পারছিলোনা তাই নিরব ওর সঙ্গে গল্প করছিলো।তখন ই ওর পেট জড়িয়ে ধরে সেখানে চুমু খায় আর একটা সেলফি তোলে।

প্রভা:কারণ তখন তো আমার পেটে আরেকজন ছিলো।

নদী:আলেকজন!কে ছিলো?

প্রভা:এই আমার নদী মামনি।ও ছিলো।আর বাবা তো তখন তোমাকেই আদর করছিলো।আমাকে না।

নদী:তাই মাম্মাম?বাবা আমাকে এত্তগুলো আদল কলতো?

প্রভা:হ্যা মা, বাবা তোমায় অনেক আদর করতো।

নদী:বাবা খুব পচা মাম্মাম।বাবা এখন আমায় আদল কলেনা কেনো?

প্রভা:এভাবে বলতে নেই সোনা।বাবা ঠিক ফিরে আসবে আর তোমায় খুব আদর করবে।

নদী:তুমি সবসময় এমন বলো কিন্তু বাবা তো কখনো আসে না।তুমি আমায় মুথ্যে কথা বলো, বাবা কখনোই আসবে না।

প্রভা:নদীইইই.. (ধমকের সূরে বলে)
নদী এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।তা দেখে পেওভার বুকের মাঝে মোচর দিয়ে ওঠে।এই তিন বছরে কখনো ওকে বকা দেয়নি প্রভা।আর এইটুকু বাচ্চা কি ই বা বোঝে!

প্রভা:সরি মাম্মাম,তুমি কেদোনা প্লিজ।মাম্মাম তোমায় আর কখনো বকা দেবে না।এবারের মতো ক্ষমা করে দাও।(ছলোছলো চোখে বলে)

নদী এবার কান্না থামিয়ে নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে প্রভার চোখের জল মুছিয়ে দেয়।

নদী:তুমি কেদোনা মাম্মাম।আমি আর কখনো এমন বলবো না,বাবা সুস্থ হলেই চলে আসবে তুমি দেখো।তুমি কাদলে আমার একটুও ভালো লাগে না।আমার খুব কষ্ট হয়।

প্রভা এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না।পরিচিত কথাটি মেয়ের মুখে শুনে অবাক হয়ে যায় সে।মেয়েকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেদে ওঠে।

কি?কিছু বুঝতে পারছেন না তাইতো?ঠিক আছে বুঝিয়ে বলছি।
সেদিন ঐ ঘটনার পর সুপ্তির খুব টেনশন হয় তাই দ্রুত অঙ্কিত কে নিয়ে এখানে চলে আসে।আর এসে ওদের এই অবস্থায় দেখে আতকে ওঠে তারা।
দ্রুত হসপিটাল এ নিয়ে যাওয়া হয় ওদের।দুজনকে একসঙ্গে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ভাগ্যক্রমে প্রভা এবং তার মেয়েটি বেচে যায় কারণ আঘাতটা পিঠের দিকে লেগেছিলো।পেটে লাগলে হয়তো তাদের বাচানো যেতো না।তবুও প্রভার অনেক রিস্ক ছিলো।এক সপ্তাহ আই সি ইউ তে থাকতে হয়েছিলো।
কিন্তু নিরব এর জ্ঞান ফেরেনি।যেহেতু ওর ব্রেইন এ আগেও অনেক ক্রিটিকাল অপারেশন হয়েছে আর সেই জায়গাতেই খুব ভারি জিনিস দাড়া আঘাত লাগায় ডক্টর রা কিছু করতে পারেনি। ওর ব্রেইন ৮০%কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
ডক্টর রা জানিয়ে দিয়েছিলো তাদের হাতে আর কিছুই নেই,বাকিটা আল্লাহর হাতে।
প্রভাকে বেডে দেওয়ার পর পাশে ওর মেয়েকে দেখে চোখ আটকে যায় তার।একদম নিরব এর কার্বন কপি।দেখলে যে কেউ বলে দেবে এটা নিরব এর মেয়ে।মেয়েকে বুকে আকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে প্রভা।
নিরবের কথা জিজ্ঞেস করায় উজ্জ্বল ওকে সবটা বলে।ঐ অবস্থাতে প্রভার পক্ষে কিছু করা সম্ভব ছিলো না তাই হসপিটাল এর কেবিন এ থেকেই বাকিদের বলে নিরব কে বিদেশে ট্রিটমেন্ট এর জন্য নিয়ে যেতে বলে।
সবাই ও ওর কথা অনুযায়ী সেই কাজ ই করে। সেখানে ডক্টর রা যথাসাধ্য ট্রিটমেন্ট চালিয়ে যায় এবং এখনো চালিয়ে যাচ্ছে।
তারাও একই কথা বলেছে,মিরাক্কেল ছাড়া নিরব এর সুস্থ হওয়া ইম্পসিবল।তবে ওনারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।
প্রভা সুস্থ হওয়ার পর ও আর বিদেশে যায়নি। কারণ নিরবকে এই অবস্থায় দেখলে ও সজ্য করতে পারবে না।শুধু একটুখানি আশা নিয়েই বেচে আছে,নিরব ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে।

পরবর্তিতে জানা যায় সেদিনের সকল ঘটনার মূলে আছে আশরাফ।কাব্য এবং মৌমিতা কে ধরতে পারলেও আশরাফ কে পুলিশ ধরতে পারেনি।সেদিনের প্রভাকে কল করে ডাকা এই সবটাই আশরাফ এর প্লান।সার্ভেন্ট দের ও টাকা দিয়ে হাতে করে নেয়।
কিছুদিন পর অবশ্য পুলিশ ওকেও ধরে ফেলে এবং ফাসি দেওয়া হয় ওকে।

এবার আসি বর্তমান এ—–
রাত প্রায় ১২ টা।নদী কিছুক্ষন আগেই ঘুমিয়েছে।
প্রভা ওর মাথায় চুমু খেয়ে উঠে বারান্দায় চলে যায়।দেখে আজ আকাশে পূর্ণ চাঁদ উঠেছে।মুচকি হেসে ভিতরে চলে আসে প্রভা।কাবার্ড থেকে একটি শাড়ি বের করে পরে নেয় সে।তারপর আবারো বারান্দায় গিয়ে চেয়ারে বসে পরে।

প্রভা:জানোতো নিরব?তোমার মেয়ে একদম তোমার মতোই হয়েছে।তুমি তো এটাই চেয়েছিলে তাই না?তোমার ইচ্ছে কিন্তু আমি পূরণ করেছি। তোমার কথা অনুযায়ী নদী রেখেছি আমাদের মেয়ের নাম।
আমি আজও কাদিনা নিরব।চোখ থেলে অশ্রু ঝড়তে চাইলেও আমি তা আটকে রাখি।কেনো জানো?তুমি যে আমার চোখের জল সজ্য করতে পারো না!
আমি আজও প্রতি পূর্নিমায় শাড়ি পরে বারান্দায় বসে চন্দ্রবিলাশ করি।কেনো জানো?কারণ তুমি যে বলেছিলে প্রতি পূর্ণিমার দিন আমি শাড়ি পরবো।তোমার কাধে মাথা রেখে সারারাত গল্প করবো।হয়তোবা এখন তুমি পাশে নেই।তবে তাতে কি?আমিতো অনুভব করি তুমি আমার সঙ্গেই আছো।
এই তিন তিনটে বছরে প্রতিটা মুহূর্তে তোমায় আড়ালে অনুভব করে গেছি আমি।আমি সারাজীবন ও তোমায় একইভাবে অনুভব করে কাটিয়ে দিতে পারবো।তবে আমি তো জানি,তুমি ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে।আমার বিশ্বাস মিথ্যে হতে পারেনা নিরব।পারেনা…..
~~হাজার পূর্ণতা পেয়েও যে,
অসমাপ্ত রয়ে গেলো সপ্ন🥀
তবুও যে প্রতি মুহূর্তে,
দেখি শত নতুন সপ্ন
আজ পাশে নেই তুমি,
তবে তাতে কি?
তুমি নাহয় আমার~
আড়ালে অনুভবে ই থেকো🌼🥀

কেটে গেছে আরো এক সপ্তাহ।একইভাবে দিন চলছে।সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে প্রায়।প্রভা আজ আর হসপিটাল এ যায়নি,মেয়েকেই সময় দিচ্ছে।
হঠাত করেই ফোন টা বেজে ওঠে।

নদী:মাম্মাম তোমাল ফোন।

প্রভা:কে ফোন করেছে সোনা?

নদী:জানিনা,তুমি দেখো।

প্রভা দেখে একটা বিদেশি নম্বর।বুক কেপে ওঠে ওর।কাপা কাপা হাতে ফোন টা রিসিভ করে।আর যা শুনলো তাতে ওর হাত থেকে ফোন টা পরে যায়।

পাচ বছর পর—–
প্রভা:নদী জেদ করিস না মা।খেয়ে নে প্লিজ।স্কুল বাস চলে আসবে।

নদী:না না না আমি খাবোনা।তুমি আগে আমায় বাকি কাহিনী বলো।

নিরব:আরে ও যখন শুনতে চাচ্ছে তখন বলেই দাও না দিয়াপাখি। (দড়জা থেকে ভিতরে ঢুকে বললো।কোলে তার তিন বছরের ছেলে সাগর।হ্যা এটা প্রভা আর নিরবের ছেলে)

প্রভা:বাপ মেয়ে দুটোই সমান।

নদী:না বললে খাচ্ছি না আমি।

প্রভা আবারো অতীতে ডুব দিলো।

সেদিন ফোন রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গেই একজন বলে নিরবের জ্ঞান ফিরেছে।আর ও বারবার দিয়াকে খুজছে।
আর কিছু শোনার আগেই হাত থেকে ফোন টা পরে যায়।চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরতে থাকে। ওর বিশ্বাস মিথ্যে হয়নি।
কিছুক্ষন পর নিজেকে শান্ত করে আবার ফোন দেয় সেই নম্বরে।ওনারা বলে নিরবের এর জন্য বেশি হাইপার হওয়া ঠিক নয়।তাই তারা ভিডিও কল এর সাজেশন দেয়।প্রভা তাদের কথা অনুযায়ি ভিডিপ কল করে ঠিক ই কিন্তু এখন নিরব এর সামনে সে ঠিক থাকতে পারবে না তাই ফোন টা নদীকে দিয়ে দেয়।নিজে কিছুটা দূড়ে দারিয়ে থাকে।

বর্তমান–
নদী:তারপর?আমি কি বললাম বাবা কে?

প্রভা আবারো বলতে লাগলো,

তোকে দেখা মাত্রই তোর বাবা কিছুক্ষন এর জন্য থমকে যায় কারণ তোদের চেহারা দেখেই বুঝে নেওয়া যায় এরা বাবা মেয়ে।নিরবতা ভেঙে নিরব বলে,
নিরব:ক কে তুমি?

নদী:আমি?আমি নাদিয়া আহমেদ নদী,মাম্মাম সাদিয়া আফরিন প্রতিভা আর বাবা সৈকত আহমেদ নিরব।তুমি আমাল বাবা তাই না বাবা? (হাসিমুখে বলে)

আরেকদফা চমকে যায় নিরব।আমি শুধু দূড় থেকে দেখছিলাম বাবা মেয়ের আলাপ।

নিরব:আরেকবার ব বলো।কি বললে আমায়?

নদী:তুমি আমার বাবা তাইনা?মাম্মাম আমায় বলেছে তুমি ই আমার বাবা।বাবা তুমি সুস্থ হয়ে গেছো তাই না?এবার তুমিও আমাদের কাছে চলে আসবে।ইয়েএএএ..

নদী:আমি এটা বলেছলাম?

প্রভা:হ্যা মাতাজি এটাই বলেছিলেন।এইরে দেখেছো স্কুল বাস চলে এসেছে।তাড়াতারি যাও।

নদী:এখন যাচ্ছি বাকিটা পরে শুনবো।

বলেই ব্যাগ নিয়ে দৌড়।
এতক্ষণে সাগর নিরবের কোলে থেকে ঘুমিয়ে গেছে।নিরব এবার ওকে এনে বিছানায় শুইয়ে দেয়।তারপর প্রভার দিকে তাকিয়ে বলে,

নিরব:আর তারপর কি হলো?

প্রভা:তার দু দিন পর ই তুমি দেশে ফিরে এলে। সব বাধা বিপত্তি পেড়িয়ে সুখে আলো দেখলাম সবাই।

নিরব:তারপর?

প্রভা:তার দু বছর পর পৃথিবীতে আসে সাগড়।

নিরব:তারপর?

প্রভা:(নিরবের কাধে মাথা রাখে) আর তারপর অবশেষে আমাদের আড়ালে অনুভবের সমাপ্তি ঘটে।

নিরব:ভালোবাসি দিয়াপাখি।

প্রভা:ভালোবাসি মিঃ চঞ্চল❣️

#সমাপ্ত

[অবশেষে ইতি টানলাম❣️এই গল্পটা আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি আমি ওর মাধ্যমে।
অনেকের হয়তো ভালো লেগেছে আবার অনেকের খারাপ লেগেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here