এক মুঠো গোলাপ পর্ব ১৮+১৯

এক মুঠো গোলাপ
sinin tasnim sara
১৮-১৯
১৮
____
(নিদ্র)
এলোমেলো পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে নিদ্র। উসকোখুসকো চুল, অবিন্যস্ত বসন;মলিন মুখ আর টকটকে লাল চোখে কি ভয়ানক দেখতে লাগছে তাকে। নিজের সর্বস্ব পুশ করে শরীরটাকে টেনে নিয়ে দাঁড় করালো আ্যাপার্টমেন্টের সামনে।
কম্পিত হাতটা বাড়িয়ে দু’বার কলিংবেলে প্রেস করতেই “খট্” করে ছিটকিনি খোলার শব্দ পাওয়া গেলো।
দরজার মুখে বিধস্ত অবস্থায় ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেলেন অনিমা। কণ্ঠে একরাশ উদ্বেগ ফুটিয়ে প্রশ্ন করলেন_
— বাবা কি হয়েছে তোর?
নিদ্র কোনো জবাব না দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো ৷ ল্যাপটপের ব্যাগটা কোনো রকমে বিছানায় ছুঁড়ে মেরে কি যেন খুঁজতে শুরু করলো। পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেও কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা না পেয়ে চিৎকার করে উঠলো_
— আমাকে না বলে আমার পারসোনাল জিনিসে হাত দেয়ার সাহস হয় কি করে?
অনিমা চৌকাঠে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলেন। নিদ্রকে ভায়োলেন্ট হতে দেখে ছুটে আসলেন ঘরের ভেতর।
— বাবা কি হয়েছে তোর? আমাকে বল, রেগে যাচ্ছিস কেন এভাবে?
— আমার ডায়েরি কোথায় মা?
— ডায়েরি!
— হ্যাঁ ডায়েরি । ওখানে আমার অর্পিতার ছবি আছে। অর্পিতার শেষ স্মৃতি ।
— শেষ স্মৃতি?
বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন অনিমা।
অশ্রুসিক্ত নয়নে নিদ্র কিছু উত্তর দিবে তার পূর্বেই সেলফোন বেজে ওঠে।
প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে এক হাতে চোখ মুছে রিসিভ করে।
— ওকে দেশে নিয়ে আসা হয়েছে তাওসিফ?
–…..
— আমিও যাবো রাজশাহী ।
–….
— আমি কিচ্ছু শুনতে চাইনা।
–….
— তুই আমারও টিকেট কাটবি।
–….
— ওকে ফাইন। নিজের ব্যবস্থা নিজেই করতে পারবো আমি।
ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ছুঁড়ে মারলো নিদ্র। তৎক্ষণাৎ ওটা দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো।
অনিমা আরো ঘাবড়ে গেলেন। ছুটে এসে ছেলের ডান বাহু টেনে ধরে ধমকের সুরে প্রশ্ন করলেন_
— পাগলামি করছিস কেন? কি হয়েছে বলবি!
— এখন শুনে কি করবা তুমি হ্যাঁহ? এখন শুনে কি করবা।
পাল্টা চিৎকার দিলো নিদ্র। অনিমা ভীষণ কষ্ট পেলেন ছেলের আচরণে।
এদিকে ওদের চিল্লাচিল্লি শুনে ঘর ছেড়ে ছুটে এলো নুহা।
অনিমাকে নিদ্রর সামনে থেকে টেনে নিয়ে এলো বাইরে এবং বেরুবার পূর্বে কড়া ভাবে বললো_
— অমানুষের মত আচরণ বন্ধ কর নিদ্র।
নিদ্র প্রতুত্তরে জল ছলছল নয়নে প্রশ্ন করলো_
— অমানুষ বানিয়েছিস তোরাই। আচরণ সইতে এখন কষ্ট হয় কেন?
,
ড্রয়িংরুমে অনিমা কে বসিয়ে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে এলো নুহা। অনিমার হাতে দিয়ে নরম সুরে বললো_
–ফুপি পানিটা খাও।
অনিমা পানির বোতল হাতে না নিয়ে আর্দ্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো_
— অর্পিতার কি হয়েছে তুই কি কিছু জানিস?
এ কথা শুনে নুহা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। হাঁটু মুড়ে বসে বিষণ্ণ হয়ে বলে_
— অর্পিতা কাল ভোরের দিকে মারা গেছে।
— কিইহ্
বজ্রাহত দৃষ্টিতে তাকায় অনিমা, নুহার দিকে।
নুহা মাথা নেড়ে হুম বলে।
অনিমা সোফায় স্থির হয়ে বসে এবার। যন্ত্রের মত জিজ্ঞেস করে_
— কীভাবে মরে গেলো?
— ব্রেইন টিউমার হয়েছিল। অপারেশনের পর তা ক্যান্সারে রূপ নেয়। বেশ কয়েকদিন যাবৎ অসুস্থ পড়ে ছিলো। গতকাল বাঁচা মরার লড়াইয়ে হেরে গেলো।
— নিদ্র এজন্য পাগলামি করছে?
— হুম। তাওসিফ একটু আগেই জানালো ওকে।
— নিদ্রকে কোনো ভাবেই রাজশাহীতে যেতে দেয়া যাবেনা নুহা। অর্পিতার বাপ-ভাই ওরে মেরেই ফেলবে। তুই আটকা আমার ছেলেটাকে।
— কীভাবে আটকাবো ফুপি? কোন মুখে?
আমরা যা করেছি..
— চুপ। একটা কথাও না। আমি যা করেছি আমার ছেলের ভালোর জন্য। খবরদার এসব কাউকে বলবি না৷ কেউ কখনোই যেন জানতে না পারে অর্পিতার সাথে নিদ্রর বিচ্ছেদের পেছনে আমার হাত রয়েছে।
চোখ গরম করে এক প্রকার শাঁসাল অনিমা, নুহাকে।
পুনরায় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিদ্রর রুমের দিকে পা বাড়ালো নুহা। তাদের চক্রান্তের কারণেই একটা সুন্দর সম্পর্ক জঘন্যভাবে ভেঙে গিয়েছিল। এই অপরাধবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে নুহাকে, প্রতিনিয়ত।
কে জানে কবে এর থেকে মুক্তি মিলবে!

_____
পরদিন সকালবেলা,
অনিমা আর নুহা যখন পারেনি তখন তাওসিফ আর সিহান কে ডেকে পাঠিয়েছে নিদ্রকে সামলাতে। তাওসিফ আর সিহান, নিদ্রর ছোটোবেলাকার বন্ধু । ওদের তিনজনার মাঝে হৃদ্যতার সম্পর্ক। এক বন্ধু আরেক বন্ধুর প্রাণ।
,
বিছানা থেকে কিছুটা দূরে নতজানু হয়ে বসে আছে নিদ্র। ফোলা ফোলা চোখ দুটো বেয়ে অবিরাম অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ছে। প্রাণের বন্ধুর এমন ভগ্ন দশা সহ্য করতে পারছে না সিহান-তাওসিফ। গায়ের জ্যাকেটটা খুলে ছুঁড়ে মারলো সিহান সোফায়। ঘরের দরজা টা বন্ধ করে এসে নিদ্রর পাশে বসলো। গম্ভীর কণ্ঠে বললো_
— নিদ্র আর এক ফোঁটা পানি যদি পড়েছে তোর চোখ থেকে, আল্লাহর কসম আমি চড়িয়ে গালটা ফাটায় দিবো তোর।
সিহানের কথায় হেলদোল হলো না নিদ্রর।
— নিদ্র। আজকে সুপ্তর সাথে কথা বলেছিস?
সুপ্তর নাম শোনামাত্র চোখ তুলে তাকালো নিদ্র। মাথা নেড়ে মৃদু শব্দে উত্তর দিলো_
— উঁহু ।
— তোর কি মনে হচ্ছে না অর্পিতার জন্য কান্নাকাটি করা এখন বৃথা। অর্পিতা তোর পাস্ট। তাছাড়াও ও এখন আমাদের মাঝে নেই। তাই ওকে কিংবা তোদের কালো অতীত টাকে মনে করে দুঃখবিলাস করার কোনো মানেই হয়না।
— আমার এই অশ্রু অপরাধবোধের। মায়ের ন্যাচার জানা সত্বেও তার সাথে অর্পিতার যোগাযোগ করানো এবং আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারটা উন্মোচন করাটা আমার জীবনের চরম ভুল ছিল। ওকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম সুন্দর একটা জীবনের যেখানে তিল পরিমাণও দুঃখ ঠাঁই পাবেনা কিন্তু..
মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত অশ্রুই ঝরলো ওর চোখ দিয়ে। তোরা কি মনে করিস আমি ওর কোনো খোঁজ খবরই রাখিনি?
আমি খুব ভালো করেই জানি ও ম্যারেড লাইফে হ্যাপি ছিলো না। ওর হাজবেন্ড ওকে কুত্তার মত পেটাতো।
ও এসব প্রেশার সইতে না পেরে অসুস্থ হয়ে যায়।
ওর অসুস্থতার পেছনে আমারই হাত। আমার ফ্যামিলির কারণেই তো…
মা কি মনে করেছে তাদের ক্রাইম গুলো আমি জানি না? তবুও মুখ বুঁজে কাপুরুষের মত পড়ে আছি কারণ সে আমার জন্মদাত্রী মা।
— নিদ্র ডোন্ট মাইন্ড একটা কথা বলি। অর্পিতার সাথে তোর সম্পর্ক টা আর পাঁচটা সম্পর্কের মত স্বাভাবিক ছিলো না। আমরা আবেগের বশে চিন্তা করে তখন তোকে সাপোর্ট করলেও পরে চিন্তা করে বুঝতে পেরেছি, তোরা এক হলে অনেক সইতে হতো তোদের। হিন্দু-মুসলিম বিয়েটা আমাদের সমাজ ঠিক আ্যাক্সেপ্ট করতে পারেনা। তোদের বিয়ের পর না জানি কত বিপদের সম্মুখীন হতে হতো!
— অর্পির সাথে যা হয়েছে তা অন্যায় সিহান।
— আমরা জানি নিদ। এটাকে নিয়তি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।
হুট করে নীরবতা নেমে আসলো ওদের মাঝে।

বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ দুই বন্ধুর কথোপকথন শুনে তাওসিফ উঠে এসে ওদের পাশে বসলো। নিদ্রর কাঁধে হাত দিয়ে প্রশ্ন করলো_
— সুপ্তকে ভালোবাসিস?
চোখের পানিটা মুছে নিদ্র বিরক্তি মাখা গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো_
— সুপ্ত আসছে কোথা থেকে এখানে?
— আসছে কারণ ও তোর লাইফের সবচাইতে ইম্পর্ট্যান্ট একজন মানুষ।
অর্পিতার সাথে যা হয়েছে তা যাতে সুপ্তর সাথে না হয়। তোকেই ওকে প্রোটেক্ট করতে হবে আ্যান্ড তোদের সম্পর্কটাকেও প্রোটেক্ট করতে হবে।
এবার যাতে কেউ সুযোগ না পায় তোদের আলাদা করতে এজন্য তোকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কখনো যেন ওর ফীল না হয় তুই ওকে ভালোবাসিস না। নিদ্র ও কিন্তু তোর জন্য পাগল। ও তোকে এত বেশীই ভালোবাসে, তুই আইডিয়া করতে পারবি না। কাল থেকে তোর ফোন অফ, ও যে কতবার আমায় নক করেছে তার ঠিক নেই।
তোকে ছাড়া মেয়েটা স্রেফ মরে যাবে বুঝলি?
সময় থাকতেই ওকে আপন করে নে।
অতীত নিয়ে দুঃখবিলাস না করে বর্তমান নিয়ে ভাব আর ভবিষ্যত সিকিওর করে নে।
রইলো বাকি অর্পিতাকে শেষবার দেখার কথা?
ওর অন্তিম ক্রিয়া হয়ে গিয়েছে। মনে কর মৃত্যুর মাধ্যমে তোদের কালিমা লেপ্টানো অতীতটাকে মাটিচাপা দিয়ে দিলো সে নিজ হাতে।
তুইও মনের গোপন কুঠুরি তে ওর ভাগের ভালোবাসাটা বন্দী করে রাখ। এখন সবটা সুপ্তর অধিকার।
নিদ্র, আমাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘ ষোলো বছরের। আমি তোর শিরা উপশিরা সম্পর্কে অবগত।
সুপ্ত তোর অক্সিজেনের মত। ও ছাড়া এতটা দিন তো জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে ছিলি। ও আসার পর আমরা পুরানো নিদ্রকে ফিরে পেয়েছি। তোর
বাউণ্ডুলে জীবনটাকে কি সুন্দর সাজিয়ে দিয়েছে মেয়েটা ।
শোন
চকচকে রৌদ্রজ্বল আকাশেরও এক কোণে কালো মেঘ থাকে। এটা চিরন্তন। জীবনে সুখ দুঃখ, হতাশা থাকবেই বাট ভেঙে পড়া যাবে না।
শত কষ্টের মাঝেও হাসতে পারা টা সহজ না। তুই এতটাদিন তো ভেঙে পড়িস নি। আজ হঠাৎ দূর্বল হলি কেন?
যেসব স্মৃতি তোকে দূর্বল করে দেয় ওগুলো একদম ভুলে যাওয়াই শ্রেয়।
কি হয়েছে, কে কি করেছে সব ভুলে যা।
এই নে ফোন, সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ তোকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
সুপ্তর নম্বর ডায়াল করে নিদ্রর হাতে জোর করে ফোনটা ধরিয়ে দিলো তাওসিফ।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রিসিভ হলো কলটা। ওপাশ থেকে সুপ্তর ভাঙা কণ্ঠ ভেসে আসলো_
— ভাইয়া আমার নিদ্রর কোনো খোঁজ পেয়েছেন?
সুপ্তর কণ্ঠ শোনামাত্র নিদ্রর বুক জুড়ে এক অদ্ভুত শীতল হাওয়া বয়ে গেলো।
ফোন কানে নিয়ে ও বিড়বিড় করে বললো_
“আমার এক মুঠো গোলাপ। ভালো আছো?”

এক মুঠো গোলাপ
১৯
_____
(দু’মাস পর)

বোর্ড এক্সাম শেষ হয়েছে তিনদিন আগে। দেখতে দেখতে এইচএসসিও কমপ্লিট হলো আমার।
শুনলাম এর মাঝে নিদ্র রংপুরে আসবে। অফিশিয়াল কাজে ইন্ডিয়া গিয়েছিলো গত সপ্তাহে। বিরাট বড় প্রজেক্ট ছিলো। সাকসেসফুল হওয়ায় একটা লং টাইম ছুটি পেয়েছে।
আমাদের দেখা নেই অনেকদিন । জিদ করলাম এবার আমাকে টাইম দিতেই হবে । জীবনে প্রথমবার সে আমার কথা শুনছে মনে হয়। সবসময় তো হুকুমজারি করতেই পছন্দ করে।
এমনিতেও আমি ওর ওপরে রেগে আছি। উমম রাগ নয় এটাকে অনুরাগ বলা যায়।
নিদ্র আর অর্পিতা আপুর সম্পর্কটা বেশ গভীর ছিলো। তাদের কতশত স্মৃতি, কাছে আসার গল্প ডায়েরিবন্দী করা আছে।
পড়তে পড়তেই জেলাস ফীল করেছি আমি। নিদ্র আমাকে কখনো কাছে টানে নি। না নিজে থেকে হাগ করেছে, আর না কিস।
আমিই সবসময় ওকে জড়িয়ে ধরতাম তাও আবার জোর করে।
আগের গার্লফ্রেন্ড এর সাথে কত কত স্মৃতি জমিয়েছে আর আমাকে ধমকের ওপরেই রাখে।
…..
— সুপ্ত কি করছিস?
চুলে টাওয়াল পেঁচাতে পেঁচাতে সুপ্তর ঘরের দিকে আসছে রাফনিদ। বড় আপুর কণ্ঠ শুনে শোয়া থেকে উঠে বসলো সুপ্ত।
— কিছু করিনা।
— শোন তোর ভাইয়া আসছে আজ। ওকে একটু কল কর তো।
— আমি কেন কল করবো। তোমার বর তুমি কল করবা।
— আমার ওর সাথে ঝগড়া চলছে। আমি কল করতে পারবো না। তুই কর।
— আবার ঝগড়া! তুমি এত ঝগড়ুটে কেন আপু? সাধাসিধা ভাইয়া টাকে সবসময় বকাঝকা করো।
— এ্যাই চোপ। এসেছে ভাইয়ার চামচা। সে অপরাধ করে এজন্য বকা খায়।
— ভাইয়া আর অপরাধ! আমি বিশ্বাসই করিনা।
— উমমহ্। বিশ্বাস করে না। উনি মনে হয় দুধে ধোয়া তুলসীপাতা! বেশি তর্ক না করে যেটা করতে বলেছি করো।
— নাও আমার ফোনটা, তুমি ফোন করো।
— আমি বলেছি না তোকে করতে?
চোখ পাকিয়ে ধমক দিলো আপু। আমি মুখ ফুলিয়ে ভাইয়াকে কল করলাম। প্রথমবার রিসিভ হলো না।
আপুকে বললাম_
— ভাইয়া কল রিসিভ করে না। ব্যস্ত মনে হয়।
— এত কিসের ব্যস্ততা তার? আবার কল দে। বারবার দিবি, দেখি কতক্ষণ না রিসিভ করে থাকতে পারে।
বোনের হুকুম, না মেনে যাই কোথায়।
আপুকে পাশে বসিয়ে অনবরত কল করতে থাকলাম ভাইয়াকে।
আরো পাঁচ সাতবার কল দেবার পর একবার রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে ভাইয়ার ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো_
— কি ব্যাপার শালিকা এতবার কল?
আমি কি বলবো খুঁজে পেলাম না। কিছু না ভেবেই বললাম_
— ভাইয়া, আপু আপনার সাথে কথা বলতে চায়।
আমার কথা শুনে আপুর চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। ভাইয়াও ফোনের ওপাশ থেকে বিস্ময়ে মৃদু চিৎকার দিলেন_
— আ্যাঁহ?
আমি আপুর দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বললাম_
— হ্যাঁ। দাঁড়ান দিচ্ছি।
আপুর দিকে ফোন বাড়িয়ে দিতেই সে সটান দাঁড়িয়ে গেলো। আমার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে কল ডিসকানেক্ট করে দিলো, এরপর বাহুতে দুম করে একটা কিল বসিয়ে বললো_
— একটা কাজও ঠিকঠাক পারেনা। তোর কাছে আসাই আমার ঘাট হয়েছে।
ফোন ফেরত দিয়ে ধপ ধপ পা ফেলে চলে গেলো সে। আমি বোকার মত বসে রইলাম। আপুর এত রাগ কেন?
আর ভাইয়ার সাথে কি এমন হয়েছে যে কথা বলাই বন্ধ ।
অদ্ভুত!
_____
সন্ধ্যের একটু পর নিদ্র রংপুরে নামলো। এবার অফিসের গাড়ি করেই সে এসেছে । সুপ্তকে অবশ্য বলেনি আজই রংপুরে নামবে, জাস্ট বলেছে এর মাঝে একদিন আসবে । এখন তো এসেই পড়েছে। দারুণ সারপ্রাইজ দেয়া যাবে মেয়েটাকে।
নিদ্রর গাড়িটা যখন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছে তখন বারান্দায় বসে ছিলেন নুহাশ।
গাড়িটা যে তার একমাত্র ছেলে নিদ্রর, তা চিনতে সমস্যা হলো না নুহাশের।
অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো তার। তড়িঘড়ি করে ভেতরে গিয়ে কাজের ছেলে আবদুল কে আদেশ করলো নিচে গিয়ে নিদ্রের লাগেজ গুলো নিয়ে আসতে।
মিসেস নুহাশ তখন রান্নাঘরে পাকোড়া ভাজছিলেন। উনি কেবল গলা বাড়িয়ে প্রশ্ন করলেন_
— এত উত্তেজনা কিসের?
— আরে আমার ছেলে এসেছে। এতদিন বাদে ছেলেটাকে দেখবো । কি আনন্দ ।
এক্সাইটমেন্ট চেপেই রাখতে পারছেন না যেন নুহাশ সাহেব।
মিসেস নুহাশ স্বামীর কথায় মৃদু হেসে নিজের কাজে মনোযোগ দিলো।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সাহেবের এই হাসি হাসি মুখটায় বিষাদের ছায়া নামবে। বহু কষ্টে কান্না চেপে ঘরের কোণে বসে রইবেন তিনি।
প্রতিবারই এমন হয়।
মাঝেমধ্যে মনে হয় বাবা ছেলের মধ্যে বিরাট দেয়ালটা তৈরি হয়েছে তারই কারণে।
নুহাশ সাহেব তাকে বিয়ে না করলে হয়তোবা সব স্বাভাবিক থাকতো।
কিন্তু ঐ সময়টাতে যে একটা সাপোর্টের খুব প্রয়োজন ছিলো মানুষটার। ভালোবাসার খাতিরেই তো তাকে একা ছাড়তে পারেনি।
একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে চোখের কোলে আসা জলটুকু মুছে নিলেন মিসেস নুহাশ।
,
প্রফুল্লচিত্তে নিদ্রর লাগেজগুলো টেনে নিয়ে আসছে আবদুল। এত করে বলার পরেও সে নিদ্রকে একটা লাগেজও ধরতে দিলো না।
আবদুলের পেছন পেছন ফোন চাপতে চাপতে দোতলায় উঠে এলো নিদ্র।
চৌকাঠেই নুহাশ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে । বাবা-র দিকে এক পলক তাকিয়ে আবদুল কে ডাকলো নিদ্র_
— আবদুল ভাই , বড় চাচাদের ফ্ল্যাটে লাগেজ গুলো নিয়ে যান।
নিদ্রর কথা শুনে থেমে গেলো আবদুল । নুহাশ সাহেবের দিকে তাকালে দেখতে পেলো, বেচারার চেহারার হাসিখুশি ভাবটা উঠে গিয়ে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ন্যায় একরাশ অন্ধকার জায়গা করে নিয়েছে ।
খুব খারাপ লাগলো আবদুলের। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে লাগেজ নিয়ে ওপরের সিঁড়িতে পা রাখলো।
নুহাশ সাহেবও মাথা নিচু করে চোখের পানি আড়াল করে ফেললেন।
নিদ্র আর ওপরে না গিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লো, একটু শান্তি দরকার তার।
______
ব্যালকনিতে বসে গভীর মনযোগে ফেইসবুকিং করছিলাম এমন সময় নিদ্রর নম্বর থেকে কল । সাধারণত এরকম টাইমে ও কল করে না, খানিক অবাকই লাগলো।
ব্যালকনির থাইটা টেনে দিয়ে কল রিসিভ করলাম।
— তুমি এই অসময়ে?
— নিচে আসো, আমি তোমার বাসার সামনে।
— হোয়াট? আর ইউ জোকিং!
— নো , আ’ম নট। ব্যালকনিতে আছো না? মাথা বাড়িয়ে দেখো, আমি গলির মোড়ের চায়ের দোকানটার সামনে।
আমি মাথা বাড়িয়ে দেখলাম ও সত্যি সত্যি চায়ের দোকানের বেঞ্চটার ওপরে বসে।
চোখ বড় বড় করে মৃদু একটা চিৎকার দিলাম,
— আই কান্ট বিলিভ।
— বিলিভ হবে, নিচে নেমে আসো।
— এক্ষুনি আসছি, এক মিনিট দাঁড়াও।
ওকে আর কিছু বলতে না দিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে আসলাম।
ভাগ্যিস বাসায় বাপি ছাড়া আর কেউ নেই। মা-আপু দু’জনেই শপিংয়ে গিয়েছে। বাপিও নিজের রুমে ঘুম।
এই সুযোগ টাই কাজে লাগালাম।
,
রাস্তায় বেশ গাড়িঘোড়া চলছে। এমতাবস্থায় তো ওকে জড়িয়ে ধরা সম্ভব নয়, কিন্তু আমার মনও মানছে না।
বাসার গলিতে দাঁড়িয়ে ওকে হাতের ইশারায় এদিকটায় আসতে বললাম।
ও মৃদু হেসে এপারে আসতেই, ওর হাত টেনে আড়ালে নিয়ে এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।
ও দু হাতে আমার কোমর জড়িয়ে হাসতে হাসতে শুধালো_
— আমার শুভ্র গোলাপটা কেমন আছে?
— এতদিন মুষড়ে পড়েছিলো। আজ তোমার ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পেলো যেন।
ওর গলায় মুখ গুঁজে উত্তর দিলাম।
ও আমার গালে একটা চুমু খেয়ে বললো_
— আমাকে বাসায় নিয়ে যাবে না?
— হুমমহ??
আমি চকিতে তাকালাম ওর দিকে।
ও ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো_
— কি?
— তুমি আমার বাসায় যাবা?
— হ্যাঁ যাবো । চলো।
কোমরে হাত রেখে স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো ও। আমি যেন আজ ঝটকার ওপর ঝটকা খাচ্ছি ।
— নিদ্র বাসায় বাপি আছে।
— আরো ভালো, শ্বশুর মশাই কে সালাম দিয়ে আসবো।
ওর মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না মজা করছে। আমি এবার একটু ভয় পেয়ে গেলাম। বাপি জানলে জুতোপেটা করে বাড়ি ছাড়া করবেন আমাকে।
— কি হলো? আমার ডেয়ারিংবাজ বউটা ভয় পেয়ে গেলো বুঝি!
— আমি বিলিভই করতে পারছি না তুমি আমার বাসায় যেতে চাইছো।
— চলো বিলিভ করাই।
ও আমার কোমর ছেড়ে দিয়ে হাত চেপে ধরলো। তারপর আমার বাসার দিকে পা বাড়ালো। ওর এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে আমি বিস্ময়ে হতবাক।
আমার বিস্ময় ভাব কাটলো যখন গেইটের সামনে উপস্থিত হলাম।
ত্রস্তে হাত ছাড়িয়ে চোখ বড় বড় করে চারিদিক পর্যবেক্ষণ করে নিলাম, কেউ দেখছে কি না!
ভাগ্যিস অন্যান্য বাসার মানুষজন কেউ ব্যালকনিতে নেই। গলাটা যথাসম্ভব খাদে নামিয়ে নিদ্রকে ধমক দিলাম_
— এভাবে টেনে নিয়ে আসে? পাছে কেউ দেখে নিলে!
— তখন তো আরো ভালো। প্রেমে বদনাম হয়ে বিয়ে করে ফেলবো একদম।
— তুমি পাগল হয়ে গিয়েছো আজ।
— ঠিক কথা। এখন গেইট খোলো, আমি খুলতে গেলে শব্দ করবো কিন্তু।
— নিদ্র তুমি সত্যিই আমার বাসায় যাবা?
— অফকোর্স। কতখানি জার্নি করে এসেছি জানো? এক মুহুর্ত বিছানায় গা দিতে পারিনি,ছুটে এসেছি তোমার সাথে দেখা করবো বলে।
এ কথা শুনে আমি সরু চোখে ওর পানে তাকালাম।
আবছা আলো-অন্ধকারেই মনে হলো, নিদ্রর চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ।
মনটা গলে গেলো। সব চিন্তা বাদ দিয়ে গেইট খুলে ওকে নিয়ে বাসায় প্রবেশ করলাম ।
খুব লুকিয়ে চুরিয়ে দোতলা অবধি নিয়ে আসার পর চিন্তায় পড়ে গেলাম ভেতরে কীভাবে ঢুকবো?
বাপি যদি জেগে থাকেন!
ওকে ফিসফিসিয়ে বললাম_
— তুমি এখানেই দাঁড়াও আমি ভেতরে গিয়ে দেখি বাপি উঠলো কি না!
ও মাথা নেড়ে সায় দিলো।
ওকে দরজার আড়ালে রেখে পা টিপে টিপে ভেতরে চলে গেলাম।
বাপির রুমের সামনে এসে উঁকি দিতেই দেখি বিছানায় কাত হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বাপি।
যাক ভাগ্য সহায় আছে।
এক মুহুর্ত দেরি না করে নিদ্রকে ইশারা করলাম ভেতরে আসতে।
ও বিশ্ব জয়ের হাসি দিয়ে আয়েশ করে ঢুকলো।
অমন রাজার চাল দেখে সুপ্ত মনে মনে টিপ্পনী কাটলো, “উমহ্ হাঁটার সিস্টেম দেখো। ধরা খেলে ঝাঁটার বাড়ি খেতে হবে সেই খেয়াল জনাবের নেই”
ও আগেও আমায় পড়াতে এসেছে বাসায় তাই আমাকে আর নতুন করে রুম চেনাতে হলো না। একা একাই আমার রুমে চলে গেলো।
আমি দরজা ভালোমতো আটকে নিজের রুমে গিয়ে দেখি বিছানায় লম্বা করে শুয়ে পড়েছে সাহেব।
আমাকে দেখতেই আহ্লাদী স্বরে বললো_
— সুপ্ত শিয়রে বসে আমার মাথাটা টিপে দাও তো।
— আমি?
— অফকোর্স তুমি। তোমার নামই তো সুপ্ত।
— উমমহ আমি তোমার মাথা টিপে দিতে পারবো না, তুমি ফ্রেশ হয়ে শোও।
— উহুম। আমি ফ্রেশ ট্রেশ হতে পারবো না, আমার পা চলছে না। ঘুম পাচ্ছে। আসো তো।
— পারবো না আমি।
— সুপ্ত। তুমি না আসলে কিন্তু আমি তোমায় ধমক দিবো। ধমকে তোমার বাপি জেগে যাবে।
তখন কিন্তু আমাকে দোষারোপ করতে পারবা না।
— তুমি কি আমায় ভয় দেখাচ্ছো?
— তোমার যদি তা-ই মনে হয় তাহলে তা-ইইই।
ভাবলেশহীন ভাবে উত্তর করলো ও।
এই ছেলের আচরণে যা পরিবর্তন এসেছে, বলা যায় না কি থেকে কি করে ফেলে। না পেরে আমি দরজা লক করে ওর শিয়রে গিয়ে বসলাম।
বসামাত্র সাহেব উপুড় হয়ে আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো আর দু হাতে কোমর জড়িয়ে নিলো।
ওর তপ্ত নিঃশ্বাস আমার জামা ভেদ করে পেটে আছড়ে পড়ছিল । অজানা শিহরণে আমার শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো।
ও হয়তোবা বুঝতে পেরেছিল । মাথা তুলে ভ্রু কুঁচকে বললো_
— কি হলো মাথা টিপ দাও? আগে চুলগুলো টেনে দাও।
আমি কম্পিত কণ্ঠে বললাম_
— দিচ্ছি।
আলতোভাবে ওর চুলে হাত বোলাতে শুরু করলাম আমি। ও চোখ বন্ধ করে মুখ গুঁজে পড়ে রইলো আমার কোলে।
বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর ও উঠে গিয়ে পাশে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো। আমার হাত ধরে হেঁচকা টানে বুকে ফেলে শক্ত করে চেপে ধরে বললো_
— আমি ঘুমোবো। তুমি পাহারা দাও কেউ যেন না আসে।
— তা নাহয় দিলাম বাট আমাকে এভাবে চেপে ধরলা কেন?
— আমার ইচ্ছে ।
ভাবলেশহীন জবাব দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো ও।
আমি পুনরায় অবাক, বিস্মিত এবং হতভম্ব হয়ে ওর মুখপানে তাকিয়ে থাকলাম।
অজান্তে আমার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো_
— তুমি অনেক চেইঞ্জ হয়ে গিয়েছো নিদ্র।
— নতুনভাবে শুরু করছি। এমন নিদ্রকেই অভ্যেস করে নাও।
চোখ বন্ধ রেখেই উত্তর দিলো ও।
আমি জানিনা কেন হুট করে আমার চোখের কোল ভিজে উঠতে শুরু করলো। আমি শুরু থেকে এমন নিদ্রকেই চাইছিলাম। এতটা দিন মনে হয়েছে সম্পর্কে আমি একাই রয়েছি, নিদ্রর দিকটা মৌন।
আজ মনে হচ্ছে নাহ্, আমরা দু’জনেই সম্পর্কে আছি।
আমার জীবনের সবচাইতে বড় প্রাপ্তি বুঝি এটাই।
আমি নিদ্রর চিবুকে ঠোঁট চেপে কেঁদে ফেললাম।
ও আমাকে পরম যত্নে আগলে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো_
— স্যরি ফর এভ্রিথিং আ্যন্ড আই রিয়্যালি লাভ ইউ। চলো আজ থেকে সব নতুন ভাবে শুরু করি।
আমি ওর চোখে চোখ রেখে আর্দ্র কণ্ঠে বললাম_
— তুমি সত্যিই নিদ্র তো!
— সন্দেহ আছে?
চোখ খুলে,ঠোঁট কামড়ে প্রশ্ন করলো ও।
আমি মাথা নেড়ে বললাম_
— বিরাট সন্দেহ।
— তাহলে আগের ফর্মে ফিরে যাই?
— নাহহ্।
ঠোঁট উল্টে মৃদু চিৎকার দিলাম আমি। ও এক গাল হেসে বললো_
“পাগল একটা”

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here