এক মুঠো গোলাপ পর্ব ৩৪+৩৫

এক মুঠো গোলাপ
Sinin Tasnim Sara
৩৪-৩৫
৩৪
______
ফেরার পথে ঠিকই সুপ্ত নিদ্রর পাশাপাশি হাঁটছিল। নিধির মনে হলো তাদের আলাদা একটু সময় দেয়া উচিৎ। সে দ্রুত পা চালিয়ে আনজুমানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো ব্যাপারটা। আনজুমান মুচকি একটা হাসি দিয়ে বললেন, আমরা তাহলে রিকশা নিয়ে চলে যাই। কি বলো?
নিধি তার কথায় সম্মতি দিলো।
দু’জনেই একসাথে পা ব্যথার বাহানা বানিয়ে রিকশা ডেকে ফেললো। সুপ্তও চট করে বললো ওরাও রিকশা করে যাবে। আনজুমান তাকে মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, কম বয়সী মেয়ে তুমি হেঁটে আসবা। রিকশা টিকশা কি! হাঁটলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। হেঁটেই আসো সময় নিয়ে।
সুপ্ত কিছুই বুঝতে পারলো না এদের হঠাৎ এমন অদ্ভুত আচরণের মানে। ইউশাকেও দিলো না সাথে।
বেচারি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে নিদ্রর দিকে তাকালো। ওর দিকে তাকালে পুনরায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। নিদ্রও তার দিকে হতাশ ভাবে চেয়ে আছে। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— কি?
নিদ্র হতাশার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মাথা নেড়ে বললো_
— তুমি কিছুই বুঝতে পারোনি?
— কোন ব্যাপারে?
— কিছুনা।
হাল ছেড়ে দিয়ে নিদ্র হাঁটতে শুরু করলো। সব ঘটনা সুপ্তর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে ও দাঁড়িয়েই রইলো। তারপর জোর গলায় বললো,
— আরে কি হয়েছে বলবা তো?
— কিছুনা। আসো তুমি দাঁড়ায় আছো কেন?
— না যাবনা। বলো আগে।
— আসো বলছি।
হাত নেড়ে ডাকলো ও সুপ্তকে।
সুপ্ত এক ছুটে নিদ্রর কাছে চলে গেলো। প্রসঙ্গ পাল্টে নিদ্র ওর একহাত আলতো করে চেপে ধরে মিষ্টি গলায় জানতে চাইলো,
— আজ দেখতে চাও ঐ ফসলে ভরা জমিগুলো?
সুপ্ত মাথা নেড়ে না বোঝালো।
— কিন্তু কেন?
— ইচ্ছে করছে না। চলো না বাসায় যাই?
— আচ্ছা চলো।
হাঁটতে হাঁটতে পুনরায় সুপ্ত প্রশ্ন করলো,
— আমরা ঢাকায় ফিরবো কবে?
— কেন বলোতো?
— আমার তোমাকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।
অনেকটা ফিসফিস করে বললো সুপ্ত। যা নিদ্রর কান অবধি ঠিকই পৌঁছে গেলো। হাসতে গিয়েও হাসলো না নিদ্র। গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
— ধাঁধার কথা মনে আছে?
— আছে আছে। এই ধাঁধা আমার জীবন খেয়ে ফেললো। অসহ্য
রাগ-বিরক্তি একসাথে ঝরে পড়লো সুপ্তর কণ্ঠ থেকে।
ওর বেগতিক অবস্থা দেখে নিদ্র মুখ লুকিয়ে ঠোঁট চেপে হেসেই ফেললো।
বুঝতে পেরে সুপ্ত কান্না কান্না ভাব করে অনুযোগের সুরে বললো,
— হাসো হাসো। আমার থেকে সর্বউপায়ে দূরে থাকতে পারলেই তোমার সুখ,জানি তো। আমারই দোষ। তোমার মত কাঠখোট্টা রাগী মাস্টার মশাই টাইপ লোকের প্রেমে কেন যে হাবুডুবু খাই নিজেই বুঝতে পারিনা। দেউলিয়া বানিয়ে ছেড়েছো আমাকে।
নিদ্রর থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একা একা হাঁটতে লাগলো সুপ্ত।
নিদ্র বহু কষ্টে হাসি আটকে দুঃখী দুঃখী গলায় ওকে ডাকলো। ও তো এলোই না বরং অতি রাগে নিদ্রকে দু চারটে গালি দিয়ে রিকশা ডেকে তাতে উঠে পড়লো। একা একাই যাবে সে। এই অসভ্য দূরে দূরে থাকা স্বামী তার চাইনা হুহ্।
কিছুটা পথ আসার পর মনে হলো ও তো রাস্তা ভুলে গেছে। এখন কি হবে?
নিজের বোকামির জন্য নিজের গালেই কষিয়ে চড় মারতে ইচ্ছে করলো সুপ্তর। মনে মনে ব্যাকুল হয়ে ডাকলো, নিদ্র আমাকে বাঁচাও গো আমি বোধহয় এবার হারিয়েই গেলাম।
________
গতরাতে মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়েছে রাফনিদ। ঘুম যখন ভাঙলো তখন শরীরের অবস্থা ভীষণ খারাপ। সারা গায়ে ব্যথা আর জ্বর। মাথা মনে হচ্ছে ছিঁড়ে পড়ছে। চোখ মেলে রাখাটাও দায়।
বহুকষ্টে ওঠার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। ক্ষীণ স্বরে বারকয়েক ডাকলো তৌহিদকে। কিন্তু এলো না তৌহিদ। তীব্র অসুস্থতায় রাফনিদের রাতের ঝগড়ার কথা মনেই নেই।
মেঝেতেই কতক্ষণ গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকলো ও। শীতের তীব্রতা অবশ্য বেশিক্ষণ ওভাবে পড়ে থাকতে দিলো না।
বিছানার এক কোণ চেপে ধরে কোনো রকমে উঠে দাঁড়ালো।
কম্পিত পায়ে টলতে টলতে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো। দু’হাতে মাথা চেপে ধরে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেললো কয়েকটা। ঝাপসা চোখে আশেপাশে তাকিয়ে ফোনটা খোঁজার চেষ্টা করলো। লাকিলি বালিশের কাছেই খুঁজে পাওয়া গেলো। ম্লানমুখে টেনে নিয়ে সুপ্তর নাম্বারটা ডায়াল করলো।
প্রথম কলে পাওয়া গেলো না। হতাশ হয়ে ফোনটা রেখে দিবে ঐ মুহুর্তে রিংটোন বেজে উঠল। কোনোরকমে রিসিভ করে কানে ঠেকিয়ে শুয়ে পড়লো রাফনিদ।
ওপাশ থেকে সুপ্তর কণ্ঠ ভেসে আসা মাত্র কেবল বলতে পারলো,
“আমার শরীরটা খুব খারাপ রে। কেউ নেই পাশে, তুই একটু আয় না”
______
বোনের অসুস্থতার খবর শুনে অস্থির হয়ে উঠল সুপ্ত। কান্নাকাটি জুড়ে দিলো একদম। এক মুহুর্ত আর থাকতে ইচ্ছে করছে না তার এখানে । নিদ্র বেশ কয়েকবার তৌহিদকে ফোনে ট্রাই করলো কিন্তু বারবার আনরিচেবল দেখাচ্ছিল।
বাধ্য হয়েই ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে হলো।
নিদ্রর নানা মন খারাপ করে বসে রইলেন। আনজুমান সুপ্তর মাথায় হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দিচ্ছিলেন। তিনি সাজেশন দিলেন রাফনিদের কাছে এই মুহুর্তে কাউকে পাঠাতে।
নিদ্র তড়িৎ নুহাকে কল করে পাঠালো রাফনিদের কাছে।
কাপড়চোপড় লাগেজে ভরাই ছিলো, বাকিটা নিতে বেশি লেইট হলো না।
চারটে ভাত খেতে যতখানি সময় যায়। সুপ্ত তবুও খেতেই পারলো না । আনজুমান যে ক লোকমা মুখে তুলে দিতে পারলেন ততটুকুই পেটে গেলো।
ওরা যখন রওয়ানা হয় তখন ইউশা ঘুমে।
নিধি ওকে ঘুম থেকে জাগাতে চাইলো কিন্তু সুপ্তই দিলো না। নিজে ঘরে গিয়ে ইউশার ঘুমন্ত মুখে চুমু খেয়ে নিধিকে বললো, ভাবি ওকে নিয়ে ঢাকায় আসবেন প্লিজ। ভাগ্যটা এত খারাপ বাচ্চাটাকে একটু প্রাণভরে আদরও করতে পারলাম না।
সুপ্তর গলা আর্দ্র শোনালো। নিধি ওর মাথায় হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললো,
— তুমি মন খারাপ করবে না। শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।
নানাকে মলিন মুখে বসে থাকতে দেখে তার পাশে গিয়ে একটু বসলো। হাত ধরে বললো,
— আমাদের জন্য দুআ করবে নানাভাই। ইমার্জেন্সি না হলে এভাবে তাড়াহুড়ো করে যেতাম না। তুমি একটু সুস্থ হয়ে ওঠো, তোমায় ঢাকায় নেয়ার ব্যবস্থা করবো।
ইব্রাহীম সাহেব নাতির মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দিলেন।
সুপ্তও নানা শ্বশুর,নানি শ্বাশুড়ির পা ছুঁয়ে সালাম করলো।
আনজুমান ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ছলছল চোখে বললেন,
— আবার এসো বুবু। সময় নিয়ে এসো। তোমাকে আমার ভারী পছন্দ হয়েছে। শান্তিমত দুটো কথা বলা হলোনা তোমার সাথে।
প্রতুত্তরে সুপ্ত ম্লান হেসে ক্ষমা চাইলো তাদের কাছে।
বললো অবশ্যই সময় নিয়ে আসবে। মন ভরে গল্প করবে তখন।
,
গাড়িতে ওঠার পর পুনরায় সুপ্তর কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেলো। নিদ্র ওর কাঁধে হাত রেখে অভয় দিয়ে বললো,
— কিচ্ছু হবে না রাফনিদের। নুহা আছে তো ওখানে।
সুপ্ত ওর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
— তুমি বুঝতে পারছো না গো আমার বুকের ভেতরটা এখন কেমন করছে! আপু অসুস্থ হলে খুব ভেঙে পড়ে। কাছের কেউই এই মুহুর্তে যে নেই তার পাশে। উফফ ভয়ানক কষ্টে ভেতরটা পুড়ছে আমার।
এই দুঃসময়ে ভাইয়ার কি উচিৎ হয়েছে দূরে যাওয়া?
কোথায় গেল তার ভালোবাসা হু!
কাঁদতে কাঁদতে বললো সুপ্ত। নিদ্র ওর চোখ মুছে দিয়ে মাথাটা বুকে চেপে ধরে বললো,
— নিশ্চয়ই কোনো ঝামেলা হয়েছে সুপ্ত। তৌহিদকে আমি দেখেছি। তোমার আপুকে সে ভীষণ ভালোবাসে। আমরা সবটা না জেনে তো কোনো মন্তব্য করতে পারিনা!
— কেন পারিনা। যা হয় হোক। সে এমন অবস্থায় আমার বোনকে একা ছাড়বে কেন?
এই অপরাধের জন্য তাকে কখনো ক্ষমা করবো না আমি। কক্ষনও না।
এক মুঠো গোলাপ
৩৫
____
তৌহিদের খোঁজ নেই আজ অনেকদিন। সারাদিন বিষণ্ণতা ঘিরে রাখে রাফনিদকে। প্রকাশ করতে চায়না,নিজেকে হাসি খুশি দেখানোর চেষ্টা করে কিন্তু আলটিমেটলি ব্যর্থ হয়। বিষণ্ণতা এমন একটা জিনিস, চাইলেও একে বুকের গহীনে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একবার না একবার আপনজনদের নজরে ধরা দেবে। এটাই নিয়ম।
একা একা বসে থাকতে ভালো লাগছে না রাফনিদের। সুপ্তর সাথে বসে একটু কথাবার্তা বললেও মাইন্ড ডাইভার্ট হতে পারে।
ঘরের লাইট নিভিয়ে সুপ্তর ঘরের দিকে পা বাড়ালো রাফনিদ।
,
দরজাটা ভেতর থেকে লাগানো। দরজায় একটা কাগজ আটকানো, সেটায় বড় বড় করে লেখা “ডোন্ট ডিসটার্ব মি”
লেখাটা দেখে রাফনিদের ভ্রু কুঁচকে গেল। দ্রিমদ্রিম করে দু তিনবার বাড়ি দিয়ে জোর গলায় সুপ্তকে ডাকলো।
মিনিট দুয়েক পর সুপ্তর বিরক্তিমাখা গলা শোনা গেল,
— বারবার নক করছো ক্যানো আপা?
— এ্যাই দরজা বন্ধ করে কি করছিস তুই?
— পড়ছি।
— দরজা খোল আমি ভেতরে আসবো।
— নাহ্। তুমি আসলে গল্প করবা, আমার পড়া হবে না।
— তুই আমাকে এতবড় কথা বলতে পারলি? আমি তোর পড়া নষ্ট করি!
— করো তো। তুমি এসে ঐ এক গল্প করো, আমি গল্পে হারিয়ে যাই আর এদিকে আমার পড়া হারিয়ে যায়।
— এ্যাই বেয়াদব এ্যাই। আমার বাসায় এসে আমাকে কথা শোনানোর সাহস তোর কই থেকে আসে।
— ডিয়ার আপা। ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন আমি কিন্তু তোমার বাসায় থাকতে চাইনি। তুমিই আমায় টেনে রেখে দিয়েছো। নইলে নতুন জামাই, জামাইয়ের সোহাগ ছেড়ে কে বোনের বাসায় পড়ে থাকতে চায়!
— এতবড় অপবাদ। আমি তোকে টেনে রেখে দিয়েছি। এ্যাই বদমাস এক্ষুনি বের হয়ে যা তুই বাড়ি থেকে। আর আপা আপা কি? তখন থেকে দেখছি আপা ডাকছিস। তুই কি নব্বই দশকে চলে গিয়েছিস!
— হ্যাঁ আমি এখন নব্বই দশকের সাদাকালো সময়ে আছি। যেখানে সিলি ম্যাটার নিয়ে ঝগড়া করে হাজবেন্ড ওয়াইফ একে অপরের মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে। ওয়াইফ বুকে পাথর চাপা দিয়ে হাজবেন্ডকে দ্বিতীয় বিয়ের ধন্না দেয়। সন্তান সন্তান করে ভালোবাসাকে দূরে ঠেলে দেয়।
বিচ্ছেদের কষ্টে ভেতর পুড়ে যায় কিন্তু মুখ ফুটে একটাবার বলেনা, ছেড়ে যেও না। আমি তোমাকে ভালোবাসি।
— টিপ্পনী কাটছিস আমাকে হ্যাঁ টিপ্পনী কাটছিস! কে শিখিয়েছে তোকে এসব। ঐ বদরাগী বদমাশ তৌহিদ? ঐ শয়তানটা কোথায় ঘাপটি মেরে আছে রে। আমাকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছিল বদমাশটা। এখন ডিভোর্স পেপার না পাঠিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে ক্যানো? জলদি ওকে সামনে আসতে বল। আর শুনে রাখ আমি ওই বদমাশের কষ্টে জ্বলিও না পুড়িও না হুহ্
রাফনিদ চলে যেতে উদ্যত হবে ঐ মুহুর্তে খট্ শব্দে দরজা খুলে গেল। সুপ্ত দরজার এপাশে কেবল মাথা বের করে বললো,
— আমি তোমাকে টিপ্পনী কাটছি না আপা, সত্যি বলছি। আর তোমার বদমাশ জামাই ঘাপটি মেরে বসে নেই। অভিমানে দূরে সরে আছে। তাকে ডিভোর্সের জন্য নয় ভালোবেসে কাছে টানার জন্য ডাকো।
— আমি ডাকলেই বদমাশটা কেন আসবে?
— কারণটা আমার চাইতে ভালো তুমিই জানো আপা।
— ডাকবো কীভাবে? কোথায় আছে জানি নাকি!
— খোঁজো তাকে। মন দিয়ে খোঁজো। কথায় আছে খুঁজলে স্রষ্টাকেও পাওয়া যায়। সে তো স্রষ্টার সৃষ্টি মানুষ মাত্র!
— মাত্র! মাত্র নয়। সে সবচাইতে অমূল্য, আমার ভালোবাসা।
বিড়বিড় করে বললো রাফনিদ। সুপ্ত হেসে ফেললো। রাফনিদের দিকে আরেকটু ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বললো,
— ভালোবাসাকে ভালোবাসার দৃষ্টি দিয়ে খোঁজো আপা। পেয়ে যাওয়ার পর এমন বাঁধনে আটকাও যাতে কোনোপ্রকার মান অভিমান সম্পর্ককে ছুঁতে না পারে। সন্তানের আশা কখনোই ভালোবাসার উর্ধ্বে হতে পারেনা আপা। বরং সন্তান একটা সেতুবন্ধন, বাবা-মায়ের ভালোবাসা আরো দৃঢ় করার সেতুবন্ধন।
শোনো আপা সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখো। তিনি যখন অমূল্য সম্পদ হিসেবে ভালোবাসা দান করেছেন , একদিন কোলও ভরে দিবেন।
তুমি শুধু ওনার প্রদত্ত উপহারটাকে হেলায় হারিও না।

সুপ্তর কথা শুনে রাফনিদ শব্দ করে কেঁদে উঠল। কাতর স্বরে বললো,
— তুই কি আমাকে সাহায্য করবি?
— উঁহু। ভালোবাসার লড়াই সর্বদা একা লড়তে হয়।
তুমি তাকে কষ্ট দিয়েছ। কষ্ট লাঘবের উপায়ও তুমিই খুঁজবে। তবে আমি এতটুকু বাতলে দিতে পারি। তুমি একা একাই যদি তাকে খুঁজে পাও, এক যুগ পরে হলেও সে সকল অনুরাগ ভুলে তোমায় আপন করে নেবে। তোমার ভালোবাসার পরীক্ষা শুরু মনে করো। হোপলেস হয়ো না, আস্থা রাখো সৃষ্টিকর্তার প্রতি;তোমার ভালোবাসার প্রতি।
অল দ্য বেস্ট।
রাফনিদের চোখের পানি মুছে দিলো সুপ্ত।
_______
অনিমা তার ভাই জামালের সাথে বসে আছে অফিসের কেবিনে। জামাল চিন্তামগ্ন ভাবে বসে। আর অনিমা নতুন অরফানেজের স্টাফ আর বাচ্চাগুলোর নামের লিস্ট দেখছে । ঐসব দেখার ফাঁকে মাঝেমধ্যে ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছে। ভাই যে কোনোকিছু নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছে তা নজর এড়াচ্ছে না অনিমার। বোধহয় আন্দাজ করতে পারছে ব্যাপারটা কি!
বেশকিছুক্ষণ এভাবে কেটে যাওয়ার পর আর চুপচাপ বসলো না অনিমা । ফাইল রেখে ভাইকে সরাসরি প্রশ্ন করলো,
— কি ব্যাপার। কি নিয়ে চিন্তা করছো জামাল ভাই?
জামাল সাহেব মুখ তুলে তাকালেন, প্রশ্নটা হয়তোবা তিনি ভালোভাবে শুনতে পারেননি। অনিমা পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,
— কি হয়েছে তোমার। কি নিয়ে চিন্তা করছো!
— অনিমা বোন আমার, তুই সত্যি করে বল তো। তুই কি সুপ্ত বউমা কে মন থেকে মেনে নিয়েছিস?
— এতদিন বাদে এই প্রশ্ন কেন?
হাসতে হাসতে পাল্টা প্রশ্ন করলো অনিমা। জামাল সাহেব অপ্রস্তুত ভাবে বললেন,
— না মানে..
মানে ওর মামা তোর সাথে যা করেছে। যে ঘটনার কারণে তোর পুরো জীবনটা পাল্টে গেল তার ভাগ্নীকে তুই এত সহজে ছেলের বউ করে আনলি?
— সুপ্ত আসাদের ভাগ্নী। মেয়ে তো নয়। আর জীবন থেকে অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে জামাল ভাই। অতীত আঁকড়ে পড়ে থাকলে মানুষ কখনোই সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। ও আমার সাথে যেটা করেছে সেটা চাইলেও আমি ভুলতে পারবো না কিন্তু সেটাকে কেন্দ্র করে ছেলেমেয়েদের সুখ কেড়ে নেবো তাও তো ঠিক না তাইনা?
— হ্যাঁ তা ঠিক। তবে..
— আর কোনো তবে-কিন্তু;পরন্তু নেই জামাল ভাই।
এতটা বছর তোমাদের সাথে আছি। আমার মাঝে পরিবর্তন কি লক্ষ করছো না? আমি আর আগের অনিমা আছি!
— সেটা বলিনি রে বোন।
— তুমি নিশ্চিতে থাকো। ঐসব মনে রেখে ছেলের জীবন নষ্ট করবো না। ছেলেটা আমার সুখে থাক ওর সুখেই তো আমার সুখ।
মিষ্টি করে হাসলো অনিমা। বোনের হাসি দেখে জামাল সাহেবও কিঞ্চিৎ হাসলেন, যার অর্থ দাঁড়ায় একদম ঠিক বলেছিস তুই।
কিন্তু মনে মনে দ্যোদুল্যমান অবস্থাটা জারি রইলো।
অনিমার কথাটা বিশ্বাস করতে চাইলেও ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না তার কাছে। বোনকে সে ভালোমতোই চেনে। স্বভাব যে তার এক ইঞ্চিও পরিবর্তন হয়নি তা খুব ভালোভাবেই জানে সে। হ্যাঁ পরিবর্তন স্রেফ এতটুকুই হয়েছে, পূর্বে আকাঙ্ক্ষিত জিনিসটি না পেলে সকলের সামনেই তা ধ্বংস করে দিত। কিন্তু এখন তা লোকচক্ষুর আড়ালে করে।
বোন যে কতবড় স্বার্থবাদী এবং ভয়ানক তা তো জামাল সাহেবের চাইতে আর ভালো কেউ জানে না। এর কারণেই তো একসময়…
এ পর্যায়ে চিন্তাটাকে থামিয়ে দিলেন জামাল সাহেব। চেয়ার ঠেলে উঠে বোনের উদ্দেশ্যে বললেন,
— তাহলে তুই থাক। আমি তোর ভাবিকে নিয়ে একটু ডাক্তারের কাছে যাবো কেমন?
অনিমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
জামাল সাহেব বেরিয়ে যাবার পর তার ঠোঁটের কোণে পুরাতন সেই বক্রহাসি ফুটে উঠলো।
টেবিল গ্লোবটা ঘোরাতে ঘোরাতে আপন মনেই বললো,
— এত সহজে তো আমি আমার ব্যর্থতা গুলো ভুলিনা ভাইজান। আমার সাজানো গোছানো জীবন ঠিক যে-ই মুহুর্তে এসে থেমে গিয়েছিল । অনুরূপ সুপ্তর জীবনটাও থেমে যাবে। যে রক্তঅশ্রু প্রতিনিয়ত আমি ঝরিয়েছি সেই অশ্রু সুপ্তর চোখ থেকেও ঝরবে। আফটার অল ঐ বেঈমানের বংশেরই তো সন্তান সে।
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো অনিমার। হাতের গ্লোবটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ছোট্টো কাঁচের টুকরোতে যেন অতীতের ঘটনাগুলো একে একে প্রদর্শিত হচ্ছে। হারিয়ে গেল অনিমা আজ থেকে ত্রিশ বছর আগের ঘটনায়।
১৯৯১ সালের কথা। খুলনা জেলা শহরে থাকতে এলো সুখী এক পরিবার। দুই ছেলে, ছেলের বউ এবং এক মেয়ে নিয়ে বাবা-মায়ের সংসার।
দু ভাইয়ের এক বোন, খুব আদরের সে৷ কোনোকিছুরই অভাব নেই জীবনে। যখন যা চায় তা-ই পেয়ে যায়।
মাত্র এসএসসি পাস করেছে সে। ইচ্ছে নামি-দামি এক কলেজে পড়বে। কিন্তু এখানে তো সে নতুন, কিছুই চেনেনা। তাহলে খোঁজ নেবে কার থেকে?
এরকম চিন্তায় যখন তার দিন কাটছে তখনই পরিচয় হলো এক বড় ভাইয়ের সাথে।
তাদেরই পাশের বাসায় থাকে।
যেমন দেখতে তেমনই তার পরিচিতি। দু তিনবার কথা বলতেই সেই ভাইয়ের প্রতি আকর্ষিত হয়ে যায় সপ্তাদশী মেয়েটা। বুঝে উঠতে পারেনা মনের কথা কীভাবে বলবে। চিঠির মাধ্যমে নাকি সরাসরি!
ভাবতে ভাবতেই দিন গড়ায় কিন্তু সুযোগ আর আসেনা। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে যেকোনো উপায়ে তাদের মিলন করে দিতে।
সৃষ্টিকর্তা হয়তোবা তার কথা শোনেন। একসময় ঠিকই সে সুযোগ পায় মানুষটাকে আপন করার। শেষ অবধি কি আপন করতে পারে?
চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here