এখনো ভালোবাসি পর্ব ২৮+২৯+৩০+৩১

“এখনো ভালোবাসি”
|ইয়াসমিন তানিয়া|
|পর্ব-২৮|

দিনেশ ও তিতির একটা জুয়েলারি দোকানে এসেছে।তিতির বুঝতে পাড়ছে না দিনেশ ওকে কেনো এখানে নিয়ে এসেছে।আর এখন নিজের জিদ আর ইগোর কারণে কিছু জিঙ্গেসও করতে পাড়ছে না দিনেশকে।দিনেশ যখন কিছু আংটি দেখতে ব্যস্ত তখন তিতির চোখ পড়ে কিছু চুড়ির উপর।ডিজাইন গুলো সিম্পল তবে অনেকটা ইউনিক।তিতির বরাবর চুড়ির প্রতি একটু দূর্বলতা কাজ করে।কিন্তু তিতির এটাও জানে এতো দামি জিনিস আপাততো ও এফোর্ড করতে পাড়বে না।তাই জিনিসটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে আবার রেখে দিয়ে দিনেশের সামনে দাঁড়ালো।দিনেশ আর চোখে এতোক্ষণ সবই দেখছিলো,তবুও কিছু বললো না।হঠাৎ তিতির হাতটা ধরে একটা আংটি পড়িয়ে দিলো।
–“তিতির বিস্মিত হয়ে,স্যার এটা কি করলেন।”
আমি আবার কি করলাম।
–“আংটি আমাকে কেনো পড়ালেন।মানে কি এসবের।”

আরে রিলেক্স এতো হাইপার হবার কিছু নেই।আমি জাস্ট চেক করছিলাম,আংটিটা লোরিনের হাতে কেমন লাগবে।তুমিতো দেখছি তিলকে তাল বানিয়ে দিচ্ছো।নিজেকে এতো ইম্পোর্টেন ভাবার কিছুই নেই বুঝলে।

–“তিতির রাগে যেনো লালনীল হয়ে গেলো দিনেশের মুখে লোরিনের নামটি শুনে।দিনেশের চুলগুলো ছিঁড়ে শাক রেধে পাড়া প্রতিবেশিদের খাওয়াতে পাড়লে মনটা একটু শান্তি হতো এই মুহুর্তে।আঙ্গুল থেকে আংটিটি খুলার জন্য জোড় করতে লাগলো।কিন্তু আংটি আটকে গেছে,বেরই হচ্ছে না।তিতির খুব বিরক্ত লাগলো,ঢুকার সময় তো খুব ভালো করেই ডুকে গেলো,অথচ এখন কি হলো।
‘কি হলো আংটিটা খুলো।তোমার জন্য আমারও লেট হচ্ছে।’
–“দেখতে পারছেন না খুলছে না এটা।কি করবো”।
‘খুলছে না! মানে কি?একটু আগে দেখি কতো সুন্দর করে হুরহুর করে ঢুকে গেছে।এখন কি হলো।’

–“জানি না আমি”।

‘জানি না বললে তো হবে না তাইনা,এটাতো উনাদের ফিরত দিতে হবে।দিনেশ দোকানের লোককে উদ্দেশ্য করে বললো,আংটিটা বের করতে সাহায্য করুন তো একটু।ম্যাডামের হাতে এটা আটকে গেছে।আর আপসে যদি বের না হয় তাহলে আঙ্গুল কেটে বের করুন।তবুও বের করুন।’

–“তিতির আতঙ্কিত হয়ে দিনেশের দিকে তাকালো,বলে কি এই লোক একটা আংটির জন্য এখন আমার আঙ্গুল কেটে ফেলতে হবে।কি সব আবলতাবল বলছেন স্যার।একটা সামান্য আংটির….তিতিরকে শেষ করতে দিলো না দিনেশ।”
‘আরে সামান্য মানে কি?’পাঁচ লাখ টাকা এর দাম।পাঁচলাখ তোমার কাছে সামান্য মনে হলে দিয়ে দেও।এতে তোমার আঙ্গুলও বেঁচে যাবে আর আংটিও ফ্রি পেয়ে যাবে।
–“তাই বলে কি এভাবে।তিতির পাড়ে না কেঁদে দিবে।একটু ভেবে,”আচ্ছা আর কোনও পায় নেই।”
দোকানদারকে জিঙ্গেস করলো তিতির।”

‘আছে ম্যাম,আমরা আংটিটি কেটে ফেলতে পাড়ি।’

–“ও তাই নাকি তাহলে তাই করুন।”

কিন্তু এরপর আংটির মূল্য আপনাকে দিতে হবে।তখন এটা আমাদের কোনও কাজে লাগবে না।এটা অনেকটা এন্টিক পিস।
–“কিন্তু আমি কিভাবে,তিতির এবার সত্যিই চিৎকার করে কাঁদতে মন চাইছে।ও বুঝে গেছে ও ফেঁসে গেছে।আর এই কাজটি যে দিনেশের তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”
‘দিনেশ তিতির হাতটি টেনে নিয়ে আংটি টি ঘুড়াতে লাগলো সাবধানে।মুখে বাকা হাসি দিয়ে তিতিরের কাছে কিছু শর্ত দিলো।যদি তিতির শর্তে রাজি থাকে তাহলে দিনেশ তিতিরকে সাহায্য করতে পারে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে।”
–“তিতির অসহায় মুখে দিনেশের দিকে তাকিয়ে রইলো।কি আশ্চর্য বিপদে নিজে ফেলে,আবার নিজেই শর্ত রাখে উদ্ধার করার জন্য।দুনিয়াটা আসলেই ধ্বংশ হয়ে গেছে।এখানে ভালো মানুষের জায়গা নাই।”

‘দিনেশ তিতিরকে চুড়ির কর্ণারে নিয়ে গিয়ে তিতির পছন্দ করা চুড়িদুটো হাতে নিয়ে নিজেই পড়িয়ে দিলো।আমার প্রথম শর্ত এগুলো তুমি আর খুলতে পাড়বে না।যতো কিছুই হোক।
“দিনেশের শর্ত শুনে তিতির বিস্মিত হয়ে দিনেশের দিকে তাকিয়ে রইলো।এ আবার কেমন শর্ত।”
আর দ্বিতীয় শর্ত হলো তোমাকে আমার সাথে আমাদের নেক্সট প্রজেক্ট এর মিটিং এর জন্য লন্ডনে যেতে হবে।এখানে না বলার তোমার কোনও চান্স নেই,কারন তুমি আমার পি.এ।আমি যেখানে তুমিও সেখানে।তবুও বললাম তোমাকে।
–“কিন্তু আমি কিভাবে,মানে এতো দূর।বাড়ীতে পারমিশন দিবে না আমায়।”
‘যদি আমি কথা বলি তোমার বাবা-মার সাথে তাহলে কি হবে।’
–“হয়তো।”
ওকে আমি কথা বলে নিবো, তুমি বাড়ী গিয়ে প্যাকিং শুরু করে দেও।ইশারায় দোকানের একজন কর্মচারীকে ডেকে তিতির আঙ্গুলের আংটিটি কেটে ফেলতে বললো।ক্ষতিপূরণ যা হবে ও মিটিয়ে দিবে বললো।

এটা ছিলো আজ সকালে তিতির এটিটিউড এর জবাব দিনেশের পক্ষ থেকে।দিনেশ তিতিকে বুঝাতে চেয়েছিলো,যতই হাওয়ায় উড়ো,বেলা শেষে আমার নীড়েই তোমার স্থান।আমি ছাড়া তোমাকে উদ্ধার করতে কেউ আসবে না।এবার একবার লন্ডনে চলো আমার সাথে,তোমাকে যদি ঘোলা পানি না খেয়ে ছাড়ি আমার নামও দিনেশ না।
……………………………………………
অতিত
সেদিন প্রিয়ু সব জানার পর ভার্সিটি থেকে বের হয়ে গিয়েছিলো একাই।আয়নের প্রতি অভিমানটা যেনো আবার জমা হলো প্রিয়ুর মনে।ওর আবার পালিয়ে যেতে মন চাইছে সব কিছু ছেড়ে।তবে এবার এতো দূরে যে আয়ন ওর ছায়াও দেখতে না পায়।এসব ভাবতে ভাবতেই প্রিয়ু এলোমেলো পা ফেলে হেটে চলছিলো,কিন্তু কোথায় যাচ্ছে জানে না।তখনই রাস্তায় পড়ে থাকা একটা ইটের সাথে পা লেগে প্রিয়ু পড়ে যেতে নেয়।কিন্তু ঠিক সময় নিজেকে সামলিয়ে ফেলে তবে যা ক্ষতি হবার হয়ে যায়।প্রিয়ু পায়ে প্রচণ্ড ব্যাথা পেয়ে নক উঠে যায়।আর পা থেকে রক্তও বের হতে থাকে।

–“ঠিক সেই সময় রোহান ওদিক দিয়ে গাড়ী নিয়ে যাচ্ছিলো।ওর গানের একটা অডিশন ছিলো আজ।রাস্তার সাইডে প্রিয়ুকে পা ধরে বসে থাকতে দেখে দ্রুতো গাড়ী থামায়।সামনে গিয়ে দেখে সত্যিই এটা প্রিয়ু।প্রিয়ুর পা থেকে ব্লিডিং হচ্ছে দেখে রোহান তার পকেট থেকে রুমালটা বের করেই প্রিয়ুর পায়ের আঙ্গুলে চেপে ধরে বলে,”কিভাবে হলো।তুমি কি দেখে হাটতে পারো না।দেখছো কতো রক্ত বের হচ্ছে এখন।”

রেহানকে দেখেই প্রিয়ুর মেঝাঝটা যেনো আরো একটু বিগ্রে গেলো।আয়ন হোক বা রোহান সব এক।এরা শুধু ধোকা দিতে যানে।আর পাড়ে মন নিয়ে খেলা করতে।প্রিয়ু চট করে রুমালটা খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।রোহানকে না দেখার ভান করেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো।

–“রোহান বুঝতে পাড়ছে কিছু একটা হয়েছে,যা প্রিয়ুর উদাসীন মুখটা দেখেই বুঝা যাচ্ছে।তা না হলে প্রিয়ু এখানে একা,এই রাস্তায় কি করে।যতোটুকু জানে প্রিয়ুর সাথে একজন গার্ড থাকার কথা।রোহানও অগচরে প্রিয়ুর অনেক খোঁজ খবর নিয়ে রেখেছে।রোহান ভাবলো প্রিয়ুকে এখন আটকানো দরকার।
তাই পিছন থেকেই প্রিয়ুকে উদ্দেশ্য করে বললো,”আমি জানি আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি প্রিয়ু,কিন্তু এক সময় আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম।
“প্রিয়ু থেমে যায়।কিন্তু পিছনে তাকায় না।”

–“তাই রোহান গিয়ে প্রিয়ুর সামনে দাঁড়ায়।আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি সত্যি কিন্তু কখনো তোমার ক্ষতি চাইনি।এটা তুমিও জানো।কখনো নিজের সীমাও অতিক্রম করেনি।শুধু একটা ভুল করেছি।যা শুধরানোর সুযোগই পাইনি।আমরা আগের কিছু ঠিক করতে পাড়বো না জানি,তবে বর্তমানে নিজেদের স্বাভাবিক করতে আমরা কি অতিতটা ভুলতে পারিনা।অতিতে কি ছিলাম ভুলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক টাই মনে রাখি কেবল।তাহলে দুজনেরই চলতে সুবিধা হবে।”

প্রিয়ু রোহানের বাড়ীর ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে।প্রিয়ু সব কিছু ভুলে রোহানকে একবার সুযোগ দিলো।বন্ধুত্বের হাতটি গ্রহণ করে নিলো।আয়নকে মাপ করতে পাড়লে রোহান কেনো নয়।আয়নতো বারবার আঘাত করেছে সেই তুলনায় রোহানতো কিছুই করেনি।রোহান প্রিয়ুকে নিয়ে হসপিটালে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু প্রিয়ু যেতে রাজি হয়নি কারণ,রোহান একজন সেলিব্রেটি,আর প্রিয়ুকেও কেউ চিনতে পাড়লে,মিডিয়া ব্যাপারটা আরো তেলমশলা মিক্সড করে পরিবেশ করবে।এতে পরিস্থিতি আরো বাজে হবে।কিন্তু প্রিয়ু এটাও বুঝতে পাড়ছে ওর রোহানের বাসায় আসা হয়তো উচিত হয়নি।আয়ন জানতে পাড়লে না জানি কি করবে।

–“প্রিয়ু সোফায় বসে বসে যখন চিন্তায় মগ্ন, তখনই ঘরের মেন দরজা খুলে ভেতরে কেউ প্রবেশ করলো।প্রিয়ু মাথাটা তুলে তাকিয়ে দেখে সামনে আয়ন দাঁড়িয়ে আছে।চোখমুখ রাগে কেমন রক্তবর্ণ হয়ে আছে।প্রিয়ু জানতো এমনই হবে,কিন্তু আয়ন যে স্বশরীরে এখানেই টপকে পড়বে,তা ভাবতে পাড়েনি।তাও আবার এতো তারাতারি।প্রিয়ুর মাথায়ই আসছে না আয়ন জানলো কি করে প্রিয়ু যে এখানে।আয়ন কিছু না বলে,প্রিয়ুর হাতটি ধরে টান দিয়ে দাঁড় করাতে নিলে,প্রিয়ু ব্যাথায় আআ করে শব্দ করে উঠে।আয়ন কিছু বলার আগেই,রোহান হন্তদন্ত হয়ে বালকানি থেকে রুমে এসেই জিঙ্গেস করতে যাবে কি হয়েছে,কিন্তু আয়নকে এখানে দেখে থেমে যায়”।
–প্রিয়ুর ব্যথিত মুখটা দেখেই আয়ন বুঝতে পারে কোনও একটা সমস্যা হয়েছে।তাই সব চিন্তা বাদ দিয়ে,আয়ন প্রিয়ুর পায়ের সামনে বসে পড়ে। আর প্রিয়ুর ডান পায়ে কিছুক্ষণ আগে করা ব্যান্ডিজটা খুলে ফেলে।রোহান আয়নের এহেম কান্ডে অবাক না হয়ে পাড়ছে না,তাই বারবার মানাও করেছে।কিন্তু আয়ন শুনলো না।বরং কি হয়েছে নিজের চোখে দেখে,
প্রিয়ুকে প্রশ্ন করে কিভাবে হলো।প্রিয়ু মুখটা অন্যদিকে ঘুড়িয়েই বললো,পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছি।আয়ন নিজেকে কন্ট্রোল করতে মুখ দিয়ে একটু জোড়েই শ্বাস ছাড়ে।ওর এখন মন চাইছে প্রিয়ুকে ঠাশ ঠাশ করে কয়েকটা লাগিয়ে দিতে।কিন্তু আয়ন তা পাড়বে না।এই মেয়েটিকে মেরে নিজেও যে শান্তি পায় না।তাই আয়ন আবার দাঁড়িয়ে প্রিয়ুকে সাবধানে উঠানোর চেষ্টা করলো।”কিন্তু রোহান এসে বাধা দেয়।”
–“আয়ন যেনো এবার লাগামবিহীন পাগলা ঘোড়ার মতো ক্ষেপে গেলো।যাকে কন্ট্রোল করা খুবই মুশকিল।যে কেবল নিজের দাপটেই চলে,কেউ তাকে কন্ট্রোল করুক একদম পছন্দ না তার।”
তাই আয়ন গিয়ে সোজা রোহানের কলার চেপে ধরলো,দাঁতেদাঁত চেপে বলতে লাগলো,লিসেন মিস্টার রোহান।আমি আগেও বলেছি প্রিয়ুর থেকে দূরে থাকো।ওর আশেপাশে জাতে তোমায় না দেখি।আই প্রমেজ তুমি আবার আমাদের জীবনে নাক গলালে,না তোমার নাক থাকবে না তুমি।
–“রোহান ভয় না পেলেও প্রিয়ু ভয় পেয়ে যায়,কারণ রোহান ঠিক করে আয়নকে চিনে না।কিন্তু প্রিয়ুতো জানে।যেখানে প্রিয়ুর কথা উঠে সেখানে এই লোক হিংস্র পশুর মতো ব্যবহার করে।প্রিয়ু দাঁড়াতে পাড়ছে না,তাই বসেই আয়নের শার্টটি খামচে ধরে নিজের দিকে টানতে লাগলো।”আয়ন প্লিজ রোহানকে ছাড়ুন।ওর কোনও দোষ নেই।আমি নিজেই এখানে এসেছি।”
কথাটি বলে প্রিয়ু কতোটা ভুল করেছে তা এখন বুঝতে পাড়ছে।রোহানকে ছেড়ে আয়ন প্রিয়ুর দিকে এমন ভাবে তাকালো মনে হয় এখনই প্রিয়ুকে তুলে আছাড় মারবে আয়ন।
–“ভয়ে প্রিয়ু মাথাটা নিচু করে ইনিয়েবিনিয়ে বলতে লাগলো,আ ম মি ব্যাথা পে য়ে রাস্তায় বসেছিলাম।রোহান কেবল আমাকে সাহায্য করেছে।”
“হসপিটালে না নিয়ে গিয়ে তোকে নিজের বাসায় কেনো এনেছে।আয়ন কিছুটা চিৎকার করে।”
–“আয়নের চিৎকারে প্রিয়ু কেঁপে উঠলো,শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে আবার বললো,রোহান একজন সেলিব্রেটি।ওর সাথে আমাকে দেখলে আর কেউ সেলফি তুলে ফেললে,সেটা ভাইরাল হতে সময় লাগতো না।তাই…প্রিয়ু আর কিছু বলার আগেই আয়ন ওর উপর ঝুকে ওর বাহু দুটো ধরে বললো,”আর যদি তোদের দুজনকে একসাথে এই বাড়ীতে কেউ দেখতে পাড়তো বা জানতো তখন কি টাইটেল দিতো জানিস।আমি মুখে উচ্চারণ করতে পাড়বো না।কারণ আমি কিছু বললেই তো খারাপ।আর তুই তো আবার দুই লাইন বেশি বুঝিছ,তাহলে বুঝে নে।কথায় আছে না ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়।কিন্তু তুই! তুই তো ওয়ান পিস।সেধে সেধে নিজের বিপদ নিজেই টেনে আনিস।একবার নিজের এমএমেস বানিয়ে শখ মিটেনি তাই না,তাইতো এখানে ফিল্ম বানাতে এসেছিস।”
–“আয়নের আবার সেই বেসামাল কথা।প্রিয়ুর রাগটা যেনো আরো বাড়িয়ে দিলো।প্রিয়ু নিজের মনের মাঝে যখনই আয়নকে নিয়ে একটু সুপ্ত আশায় বুক বাধে,তখনই আয়ন আবার যেনে সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে আগের মতো করে দেয়।প্রিয়ু আর নিজেকে সামলাতে পাড়লো না,রাগের চোটে আয়নকে নিজের থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো।আর চিৎকার করে বলতে লাগলো,”হে করতে এসেছি।কোনও সমস্যা।”

আয়ন দাঁতেদাঁত চেপে কথাটা জাস্ট হজম করলো,এই মুহুর্তে রোহানের সামনে আর কোনও সিনক্রিয়েট করতে চায়না ও।বাকি কথা সব পড়ে হবে।তাই নিজেকে কন্ট্রোল করে হঠাৎ ই প্রিয়ুকে কোলে তুলে নিয়ে হাটা ধরলো।

“রোহান বাধা দিতে চাইলে,আয়নের গার্ডরা রোহানকে আটকে ফেলে।”

–আয়ন আর চোখে একবার রোহানের দিকে তাকিয়ে রবিনকে ওর্ডার দিলো,”রবিন মিস্টার রোহান যদি আর এক পা ও সামনে বাড়ায় তাহলে এমন ডুশ দিবে যাতে জীবনেও আর কারো সামনে হিরোগীরি দেখাতে না আসে।আর আমার অগলেবগলে জাতে উনাকে না দেখি ভালো করে বুঝিয়ে দিবে।রবিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।

–“প্রিয়ু মোটেও প্রস্তুত ছিলো না আয়ন কোনও কতাবার্তা ছাড়াই এমন আচানক ওকে কোলে তুলে নিবে।কিন্তু এখন রোহানের প্রতি আয়নের মাত্রারিক্ত রুড বিহেভিয়ার প্রিয়ুর সহ্য হলো না।তাই আয়নের বাহুডোর থেকে নামার চেষ্টা করতে লাগলো।কিন্তু কি লাভ হলো।আয়নের শক্ত হাতের বাধন ছেড়ে বের হওয়া এতো সহয না।রাগে কিছুক্ষণ চেঁচামিচিও করলো আয়নের সাথে।কিন্তু আয়নের নিরব ভূমিকা প্রিয়ুকে জানিয়ে দিলো,আয়নের কর্ণপথে এসব ডুকছে না।প্রিয়ু খুব ভালো করেই বুঝতে পাড়লো এই লোক জীবনেও ভালো হবার না।ঘাড় ত্যাাড়া লোক একটা।শুধু নিজেরটা বুঝে।বাকি দুনিয়া যাক জাহান্নামে।”এখনো ভালোবাসি”
|ইয়াসমিন তানিয়া|
|পর-২৯|

আয়ন প্রিয়ুকে সেই বাড়ীতে নিয়ে এলো,যেখানে ওদের বিয়ে হয়েছিলো।প্রিয়ু কিছুতেই নূর ভিলায় যেতে রাজি না,আয়ন বুঝতে পাড়ছে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে,তা না হলে প্রিয়ু এমন আচরণ করার কথা না।তাছাড়া কি কারণে প্রিয়ু গার্ড থেকে লুকিয়ে ভার্সিটির পিছন গেট দিয়ে বের হয়েছে তাও তো জানতে হবে।কিন্তু আয়ন চায়না বাড়ীতে কেউ কিছু জানুক।ওদের ঝগরা,মান-অভিমান কাউকে জানাতে আগ্রহ না আয়ন।

–“প্রিয়ুকে বিছানায় বসিয়ে দিয়েই আয়ন ফ্রাস্টেড বক্সটা নিয়ে এলো।প্রিয়ুর পায়ের কাছে বসে,পাটা ধরতে নিলেই প্রিয়ু পাটা সরিয়ে ফেলতে নেয়।আয়ন শক্ত হাতে পাটা ধরে ফেলে,ক্ষতো স্থানটা পরিষ্কার করে,ব্যান্ডেজ করে দেয় নিজ হাতে।প্রিয়ুকে তখনো মুখ ভার করে বসে থাকতে দেখে আয়নও প্রিয়ুর পাশে বসে প্রিয়ুকে নিজের দিকে ঘুড়ানোর চেষ্টা করে বললো,কি হয়েছে সোনা।এতো রাগ কেনো।আমি কি কিছু করেছি।”

–প্রিয়ু আয়নের দিকে ছলছল চোখে তাকালো এবার।প্রিয়ুর চোখে জল দেখে আয়ন ব্যস্ত ভঙ্গিতে প্রিয়ুকে জিঙ্গেস করলো কি হয়েছে সোনা বল,আমায়।কাঁদছিস কেনো।বল কি হয়েছে,প্রিয়ুর মুখটি ধরে।

–“প্রিয়ু চোখের জলটা মুছে ব্যাগ থেকে নিজের ফোনটা বের করে আয়নের সামনে ছবিগুলো তুলে ধরলো।
আয়ন ছবিগুলো দেখে, “এসব কে পাঠিয়েছে তোকে।”
‘-সেটা পরে জানলেও হবে,আগে বলো সত্য কিনা।’
–“তোর কি মনে হয়।”

আমার কি মনে হয় তুমি আজ জিঙ্গেস করছো।এমনি কিছু ছবি আর ভিডিও দেখে একদিন তুমি আমার উপর আঙ্গুল তুলেছিলে।মনে আছে।আজ দুবছর পর ঘটনা আবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।বলো,আমি কি রিয়েকশন করবো।তুমি কি আসা করো আমার কাছে।সেদিন তুমি আমার কোনও কথা শুনোনি।আজ তুমি কি বলবে।

–আয়ন চুপ থেকে প্রিয়ুর কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিলো এতোক্ষণ ,প্রিয়ুর বলা শেষ হলেই আয়ন মুখ খুলে,”আমি জানি সেদিন আমার ভুল হয়েছে।আমি তোকে ভালোবাসতাম।তাই হঠাৎ করে আসা এসব আমি মেনে নিতে পাড়িনি প্রিয়ু।আমি আগেও বলেছি এসব।আমার ভেতরে প্রচণ্ড ঝড় উঠছিলো,যা সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছিলো।আর আমি আমার সেই ঝড়কে থামাতে তোকে আঘাত করি।বিশ্বাস কর যা করেছি ভালোবাসার আঘাত সহ্য করতে না পেরে করেছি।আমার মনে হয়েছিলো তুই আমাকে ধোকা দিয়েছিস,বিশ্বাসঘাতকতা করেছিস।আর তুই ও তখন ছবিগুলোর সত্যতা জানিয়েছিলি,তাই আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।কিন্তু আজকের এসব ছবিগুলো সব মিথ্যা।আমি তোর কসম করে বলছি প্রিয়ু।তোকে ছাড়া আমার কখনো কোনও মেয়ের প্রতি কিঞ্চিত পরিমান ইন্টেরেস্ট আসেনি।বিশ্বাস কর সোনা।

“–ঠিক আছে আমি মানলাম।তোমার সব কথা আমি বিশ্বাসও করলাম।এখন এটা বলো,তুমি আমার সাথে এতোবড় নাটক কিভাবে করলে।ভালোবাসো আমায় তাই না,তাহলে রুচিতে বাদলো না কেনো এসব করতে।”

“কি করেছি আমি।আয়ন কিছুটা অবাক হয়।”

–“ও তুমি স্বীকার করবে না,তাই তো।তোমার তো আবার প্রমাণ দরকার।ওয়েট!প্রিয়ু ওর ফোনে আজ সকালে আসা অডিওটি ওন করলো।
অডিওটি শুনে আয়ন বুঝে গেছে,কেউ খুব চালাকির সাথে এসব করছে,এখান থেকে বের হবার পথ খোলা রাখেনি।কিন্তু আয়নের টেনশন হচ্ছে ও ওর অবুঝ বউকে কিভাবে বুঝাবে এসব কেনো করছে।বুঝালেও কি বুঝবে।আয়ন একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে প্রিয়ুর সামনে হাটু গেড়ে বসে, প্রিয়ুর হাত দুটো নিজের মুঠোতে নিলো।প্রিয়ুর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পাড়লো, প্রিয়ু আয়নের উত্তরের আশা করছে।আয়নও আজ আর কোনও ভনিতা ছাড়া সব স্বীকার করে নিলো।”
–হ্যা আমি মানছি,আমি এসব প্লানিং করে করেছি।আরভিনের সেদিন কিছু হয়নি।আমি ডাক্তারকে বলে তোকে মিথ্যা বলিয়েছিলাম।যাতে তুই আমার কাছে আসতে বাধ্য হোস।আমি জানতাম এই শহরে আমি ছাড়া তোর কোনও গতি নেই,তাই বিপদে পড়লে তুই সবার আগে আমাকেই স্মরণ করবি।বলতে পাড়িস এটা আমার বিশ্বাস ছিলো।আর তাই হয়েছিলো। তুই নিজ থেকে আমার কাছে এসেছিলি।

“প্রিয়ু আয়নের কথাগুলো শুনে চোখের জলগুলো আর ধরে রাখতে পাড়লো না,এবার ছেড়েই দিলো।আয়নের হাতের মাঝে রাখা নিজের হাতটিও ছুটিয়ে নিতে চাইলো।কিন্তু আয়ন আরো শক্ত করে ধরে ফেললো,তাই প্রিয়ু নিরাশ হয়ে আয়ন থেকে ছুটার আশাও ছেড়ে দিলো।”

–“আয়নের কথা শেষ হয়নি এখনো তাই আবারও বলা শুরু করলো,”তুই দুবছর আমার থেকে দূরে ছিলি।এই দুবছরে আমার ভেতরে কষ্টের সাথে একটা চাপা রাগও জন্ম হয়েছিলো।জেদ হতে লাগলো তোকে নিজের কাছে নিয়ে আসার,তবে সোজা ভাবে না।একটু বাকা ভাবে,যাতে তুই বুঝতে পারিস আমি কতোটা কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন তোকে অন্য কারো সাথে কল্পনা করে।তুই সেদিন যখন বলেছিলি তোর অন্য ছেলেদের সাথে গভীর সম্পর্ক ছিলো।তাই তোকে বুঝাতে চেয়েছিলাম গভীর সম্পর্ক কাকে বলে।আর মনে একটা আশাও ছিলো এরপর তুই চাইলোও আমার কাছ থেকে দূরে যেতে পাড়বি না।আমি তোর যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে দিতে ছেয়েছিলাম।তোকে এভাবে নিজের আপন করে।”

–প্রিয়ু রাগে কটমটিয়ে এবার আয়নের দিকে তাকালো।তুমি কি জানো তুমি একটা জঘন্য মানুষ।আমার লাইফের সব থেকে প্যারা তুমি।কেনো এসেছো আমার জীবনে।আমাকে জ্বালানো ছাড়া আর কোনও কাজ নেই তোমার।কি মজা পাও,আমার সাথে এমন করে।আবার বলো আমাকে ভালোবাসো।এটাকে ভালোবাসা বলে না,এটা তোমার জিদ।আমি কেনো তোমাকে ছেড়ে চলে গেলাম।তোমার ইগো হার্ট হয়েছে,আর তারই বদলা আমার থেকে নিয়েছো।আর এখন এসব কে ভালোবাসার নাম দিচ্ছো।তুমি যতোই বলো আমাকে ভালোবাসো,আমি বিশ্বাস করিনা।আর এই জীবনে আমিও তোমাকে আর ভালোবাসবো না।কিছুক্ষণের জন্য তোমার মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছিলাম,কিন্তু সময় থাকতে চোখ খুলে গিয়েছে।আমার সাধ্য থাকলে তোমার চেহারাও দেখতাম না আর কোনও দিন।চলে যাও তুমি এখন এখান থেকে।আমাকে একটু একা ছেড়ে দেও।প্লিজ।”

–“আয়ন নিরলস ভাবে কিছুক্ষন মাথা নিচু করে বসেছিলো।প্রিয়ুর প্রত্যেকটি কথা সত্য ও জানে কিন্তু তার সাথে এটাও সত্য প্রিয়ুর প্রতি ওর ভালোবাসা।যা কোনও ভাবে কমেনা।বরং দিনদিন যেনো প্রিয়ুর আসক্তিতে নিজেকে আরো জড়িয়ে ফেলছে।আয়ন মুখ তুলে এবার প্রিয়ুর দিকে তাকালো,কেঁদে কেঁদে কি হাল করেছে মেয়েটি।এতো ছিঁচকাঁদুনী কেনো এই মেয়ে।একটু কি কম কান্না করা যায় না।ওকে দেখলে মনে হবে আয়ন ওকে কতো অত্যাচার করে।খেতে দেয়না,ভালোবাসা দেয়না,শুধু কষ্ট আর কষ্ট।অথচ এই মেয়েটি প্রতিনিয়ত আমার মনের রাজ্যে রাজ করে আসছে,তবুও নাকি ও জনমদুখিনী।ও নিজেকে জনমদুখিনী বললে আমি নিজেকে কি বলবো,ভালোবাসার কাঙ্গালি।নাকি ভিখারি।”

–“আয়ন একটা দীর্গ শ্বাস ছেড়ে,প্রিয়ুর কোমড়টা ধরে নিজের একদম কাছে টেনে নিলো।প্রিয়ু অবশ্যই আসতে চায়নি,কিন্তু তবুও কিছু করতে পাড়লো না আয়নের শক্তির কাছে।প্রিয়ুর হাত দুটো মুঠোতে নিয়ে কপালে কপাল রেখে বললো”,সত্যি করে বলতো ভালোবাসিস আমায়।”

“এমন সময় এমন কথা শুনে প্রিয়ু কিছুটা বিস্ময় হয়ে আয়নের দিকে তাকালো।কিন্তু বেশিক্ষণ এই চেখের দিকে তাকিয়ে থাকা সম্ভব না প্রিয়ুর।তাহলে এই চোখের গভীরে প্রিয়ু তলিয়ে যাবে আবার।ভুলে যাবে আয়ন কি করেছে ওর সাথে।কিন্তু প্রিয়ু চায় না,কিছু ভুলতে।ও তো চায় আয়নকে শাস্তি দিতে।কড়া শাস্তি।যে শাস্তিতে আয়ন কাঁদবে।হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাচ্চাদের মতো কাঁদবে তাহলে হয়তো প্রিয়ুর মনের প্রশান্তিটা ফিরে পাবে।এবার আর আয়নের কথায় গলবে না,একদম না।
মনকে স্থির করে ফেললো প্রিয়ু।”
–“কি হলো বল।কথা বল সোনা।আমি কিছু জানতে চাইছি।”
‘-প্রিয়ু আয়নকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে, মুখটা ঘুরিয়ে ফেললো অন্য দিকে।না বাসি না!আমি তোমাকে কেনো ভালোবাসবো।ভালোবাসার মতো কিছু করেছো তুমি।শুধু ধোকা ছাড়া কি পেয়েছি।বলো!বলছো না কেনো এখন।

–“আয়ন হঠাৎ প্রিয়ুকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।এই মুহুর্তে আয়নের মুখ দেখে যে কেউ বলতে পাড়বে,প্রিয়ুর জবাবে যে আয়ন সন্তুষ্ট না।মনটা আজ ভেঙ্গে গেলো আবার।আর তা ভাঙ্গতে সাহায্য করেছে প্রিয়ু নিজে।প্রিয়ুকে বোঝানোর মতো আর কোনও কথা নেই আয়নের কাছে।তাই আয়ন অনেক শান্ত কন্ঠে প্রিয়ুর মাথায় হাত রেখে বললো,”শুনেছি স্ত্রীর জন্য করা স্বামীর দোয়া নাকি কবুল হয়,তাই আজ আমিও তোকে দোয়া করে দিলাম,আল্লাহ যাতে তোকে খুব শীঘ্রই বিধবা করে দেয়।আর আমার থেকে তোকে মুক্ত করে দেয় একবারের জন্য।”
এটা বলেই, আয়ন আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালো না, বড় বড় পা ফেলে চলে গেলো এখান থেকে।
–“প্রিয়ু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো,আয়ন এটা কি বলে গেলো।ও কখনো এটা চাওয়া তো দূরে থাক,কল্পনাও করেনি।না চাইতেও প্রিয়ুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।অচেনা ভয়ে বুকের ভেতরে কেমন কুঁকড়ে যেতে লাগলো।সত্যি কি আল্লাহ কবুল করে নিবে এই দোয়া।
………………………………
সেদিন প্রিয়ুকে ঐ বাসায় রেখেই আয়ন চলে আসে নূর ভিলায়।আর এসে সবাইকে জানায় প্রিয়ুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।কারণ টা ছিলো আয়ন সেই অচেনা ব্যক্তিটিকে বুঝাতে চাইছিলো,তার প্লান সাকশেস ফুল হয়েছে।প্রিয়ু আবার আয়নকে ছেড়ে পালিয়েছে।আয়ন আর প্রিয়ুর সম্পর্কে আবার ফাটল ধরেছে।আয়ন খুব ভালো করেই বুঝতে পাড়ছে অচেনা ব্যক্তিটি হয়তো তার আশেপাশেই আছে।কারণ ওর আর দিনেশের মাঝের কথা বাহিরের কেউ শোনা পসিবল না,তার মানে কাছের কেউ তো আছে যে চায়না আয়ন আর প্রিয়ু একসাথে থাকুক।তাই বারবার শুধু ওদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করছে।তাকে সামনে আনার জন্যই আয়ন প্রিয়ুর গায়ব হবার কথা নিজেই ঢোল পাড়িছে।

–‘প্রিয়ুকে ওই বাসায় রেখে গতো কয়েকদিন প্রিয়ুর সাথে কোনও যোগযোগ করেনি।প্রিয়ুকে কিছুটা সময় একলা ছেড়ে দিয়েছে আয়ন ভাবার জন্য।অনেক সময় কাছে থাকার চেয়ে দূরে গিয়ে ভালোবাসার অস্থিত্ব জানানো যায়।আয়ন তাই করছে।তবে প্রতিনিয়ত প্রিয়ুর খবর নিচ্ছে আয়ন।প্রিয়ু না জানলেও আয়ন জানে প্রিয়ু কি করছে,না করছে।”
তাই আজ সকালে যখন প্রিয়ু জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তখন আয়ন আর কিছু না ভেবে প্রিয়ুকে বাসায় নিয়ে আসে।আয়ন জানতো এতে অনেকের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে,কিন্তু আয়নের চিন্তা আপাততো সেদিকে না।সবাইকে ও কিছু না কিছু বলে সামলিয়ে ফেলবে,কিন্তু এই ত্যাড়া মেয়ে জ্ঞান ফিরে যখন আয়নকে সামনে দেখতে পাবে তখন কি করবে, আয়ন তা ভেবেই টেনশন করছে।’

“গরম শেষ হয়ে হালকা শীতের প্রকোপ পড়ছে মাত্র।এসির কারণে রুমটা কেমন হিম শীতল হয়ে গিয়েছে।আয়ন তাই এসিটা বন্ধ করে,রুমের জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে দিলো।পরিবেশ ঠান্ডা বলে,রুমটিতেও হালকা হালকা ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করে,শীতলতা বজায় রাখলো।রুমটি দক্ষিণ এর দিকে মুখ করা বলে,রুমটিতে সহযেই বাতাস চলাচল করতে পারে।আয়ন বালকানিতে দাঁড়িয়ে অনেকদিন পর একটা সিগেরেট ধরালো।আজকাল খাওয়া হয়না তেমন,প্রিয়ুর জন্য।কিন্তু আজ খুব ইচ্ছা জাগলো মনে,তাই চাওয়াটা সাথে সাথে পূর্ণ করে ফেললো।আয়ন জানে প্রিয়ু জেগে থাকলে আরো রাগ করতো এটা নিয়ে,এমনেই আজকাল মেয়েটি রাগ নাকের ডগায় নিয়ে ঘুরে।আজকাল এই মেয়ের রাগকে এতো কেনো ভয় লাগে আমার আল্লাহই জানে।এ কেমন প্রেমে পড়েছি আমি।এমন একটা পিচ্ছি মেয়ের জিদের কাছে বারবার নতো হতে হয় আমাকেই।মানুষ বলে,বিয়ের পর নাকি প্রেমের গতি কমে যায়।আকর্ষণ কমতে থাকে দুজন মানুষের।কিন্তু কিছু প্রেম আছে যা ভুলার না।প্রেমের সাধের তৃপ্তি যেনো সহযে মিটে না।বরং উঠতি বয়সে প্রেমের সাধের জন্য যেমন মনটা মারিয়া হয়ে যায়,তেমনি ইচ্ছা জাগে একসময় প্রৌঢ় বয়সেও।তখন মানুষ আবার নতুন করে প্রেমে পড়ে।প্রেম বরারবই চক্ষুলজ্জাহীন হয়।সমাজ,পরিবার কিছুই যেনো এটি চোখে দেখে না।তাই তো আজকাল দেখা যায় একজন যথেষ্ট বয়স্ক মানুষ তার মেয়ের বয়সি নারীর প্রেমে পড়তেও দ্বিধা করে না।কারণ মানুষ বরাবর তার মন আর শরীর এর চাহিদার কাছে ব্যর্থ।বলে না শরীর বুড়া হয় কিন্তু মন সে তো এখনও যেনো সেই যুবক বয়সের মতো সতেজ।তাইতো ইচ্ছা আর চাহিদা যেকোনও বয়সেও জাগতে পারে।যেমন আমারও জেগে ছিলো,এই মেয়েটিকে দেখে অনেক বছর আগে।তখন হয়তো প্রেমে পড়ার মতো তেমন কিছুই ছিলো না এই মেয়েটির মাঝে,তবুও যেনো এক শক্ত বাঁধনে আমি ওর সাথে জড়িয়ে গিয়েছিলাম।কিন্তু ভুল শুধু এতোটুকুই ছিলো,আমার প্রেমের তাপ আমি ওর উপর পড়তে না দেওয়া।যদি দিতাম তাহলে হয়তো আমাদের জীবন একটু অন্যরকম হতো।লোকে সত্যিই বলে জীবনে কিছু কথা থাকে যা সহযে কাউকে বলা যায় না,বলতে পাড়লে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতো।মনের ভেতরের কষ্টগুলো কাউকে প্রকাশ করা যায়না।লতার মতো বেড়ে উঠা অনুভূতি গুলোও,একসময় যত্নের অভাবে কেমন নুইয়ে যায়।ভালোবাসাটা তেমনি,একে যতো যত্ন করা হবে ততো এর বিস্তৃতি বেড়ে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিবে,কিন্ত একটু অবহেলা আর অযত্ন হাজার বছরের ভালোবাসাও চোখের পলকে যেনো হারিয়ে যায়।আমি হারাতে চাইনা প্রিয়ু।আমি আমার শেষ বয়সেও তোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই।আমি পৌঢ় বয়সেও তোর প্রেমে দ্বিতীয় বার পড়তে চাই।আমাকে হারাতে দিস না প্রিয়ু।আমাকে বাঁচাতে দে একটু।”
………………………………
প্রিয়ুর জ্ঞান ফিরলে নিজেকে আয়নের রুমে আবিষ্কার করে।ওর আর বুঝতে বাকি থাকে না কে ওকে এখানে এনেছে।কিন্ত আয়ন যেমন ভেবেছিলো,প্রিয়ু তেমন কোনও রিয়েকশন করলো না,বরং চোখ বুলিয়ে পুরো রুমটিকে একবার দেখে নিলো।হাজার মুখে যাই বলুক,প্রিয়ু জানে এ কয়েকদিন এই রুমটি আর এই রুমের মানুষটিকে প্রিয়ু খুব মিস করেছে।কখন কিভাবে প্রিয়ু নিজেও জানে না,আয়নের বাঁধনে নিজেকে বাধিয়ে ফেলছে।যা এতো দিন আয়নের কাছে থেকেও বুঝে নি প্রিয়ু।কিন্তু আয়ন থেকে দূরে গিয়ে খুব ভালো করে উপলব্ধি করতে পেরেছে।এই শয়তান,ফাজিল,নির্দয় মানুষটিকে প্রিয়ু মন প্রাণ উজার করে ভালোবেসে ফেলছে।থাকতে পারবে না,এখন আর আয়ন কে ছাড়া।এতোদিন পর নিজের রুমে এসে প্রিয়ু অনেক খুশি,এখানে যেনো একটা প্রশান্তি আছে।রুমের প্রতিটি জিনিসে আয়নের স্পর্শ অনুভোব করছে প্রিয়ু।পুরো রুম জুড়ে যেনো আয়নের শরীরের ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে।রুমে আয়ন নেই,তবুও যেনো সব কিছুতেই আয়নকে খুঁজে পাচ্ছে প্রিয়ু।চোখদুটো বন্ধ করেই বেডে উপর আধো হেলান দিয়েই আয়নের অস্তিত্বের অনুভূতি ফিল করছে।

–“আয়ন বালকানি থেকে এসে দেখে প্রিয়ু জেগে গিয়েছে।প্রিয়ুকে শান্ত দেখে আয়নও একটু রিলেক্স হলো।কিছু না বলেই রুম থেকে চলে গেলো। প্রিয়ুর জন্য কিছু খাবার আনতে।কিন্তু নিচে এসে দেখে আরেক এলাহি কান্ড।মহিনী ফুফুর সাথে তিয়াশের ঝগড়া চলছে।আর ঝগড়ার কারণ হলো নিলীমা।মহিনী ফুফু নিলীমাকে তিয়াশের বউ বানাতে চায়।কিন্তু তিয়াশ এক কথায় না বলে দেয়।কারণ ও দিশাকে ভালোবাসে।”

–দিশার কথা শুনে মহিনী তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে।দিশাকে তার একদম পছন্দ না।এক তো প্রিয়ুর বান্ধবী,তার উপর দিশার বাপ সামান্য একটা কম্পানিতে জব করে মাত্র।তার মানে মেয়ের বাড়ীর লোক ফকির,আর এই ফকিরের মেয়েকে সে কিছুতেই পুত্রবধূ বানাতে রাজি না।তাই সে তিয়াশকে দিশাকে ভুলে যেতে বলে।আর নিলীমাকে বিয়ে করতে বলে।কারণ নিলীমা বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে।তার মানে বিয়ের পর সব তিয়াশেরই হবে এসব।তিয়াশের কপাল খুলে যাবে।তাকে আর আয়নের কম্পানিতে জব করতে হবে না।বরং নিজেই এমন অনেক কম্পানির মালিক হয়ে যাবে।এতো বড় সুবর্ণ অফার কোনও গাধাই মানা করতে পারে,তবে মহিনী এতো পাগল না।সোনার ডিম পাড়া মুরগীকে ছেড়ে ওই ফকিরের মেয়েকে তিয়াশের জীবনে কিছুতেই আসতে দিবে না।তার জন্য যা কিছু করার করবে।তিয়াশ নিজের মাকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করে।কিন্তু মহিনী ফুফু তিয়াশের কোনও কথাই শুনতে রাজি না এই মুহুর্তে ।”

–“আয়নের মাথা কাজ করছে না,মনে মনেই বিরবির করতে লাগলো,কাল পর্যন্ত যে মেয়ে আমার পিছনে ঘুরতো।আজ সেই মেয়েরই প্রস্তাব চলছে আমারই ভাইয়ের সাথে।একদিকে সারা আরেক দিকে নিলীমা।এরা কি আমার ভাইদের ছাড়া আর কাউকে চোখে দেখে না।আয়ন মনে হয়, বুড়ো বয়সে এরা তোর তালাক করেই ছাড়বে।আল্লাহ আমাকে রক্ষা করো এদের হাত থেকে।”এখনো ভালোবাসি”
|৩০|

লন্ডন শহর।এটা যেনো একটা স্বপ্নের মতো।বিশ্বের অন্যতম একটা ব্যস্ত বাণিজ্য নগরীর মধ্যে লন্ডন অন্যতম।এই শহরের সব কিছুই অনেক ব্যববহুল।তবুও এখানকার লোকজন খুব স্বাচ্ছন্দ্যেই এই শহরে বসবাস করছে।প্রতি বছর হাজার লোকের পদধূলি পড়ে এই লন্ডন শহরে,শুধু ভ্রমণের উদ্দেশ্যে।আজ তিতির ও দিনেশও পৌছালো এই স্বপ্নের নগরীতে।ইমিগ্রেশন পার করেই তিতির ও দিনেশ বাহিরে বের হয়ে ওদেরকে নিতে আসা গাড়ীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।কিন্তু এই এতো টুকু সময়ই তিতির পুরো শরীর কেপে উঠলো।

–কারন লন্ডনে এখন হার কাপানো শীত।দিনেশ তিতিরকে আগেই বলে দিয়েছিলো।তাই তিতিরও গরম কাপড় পড়ে আসে।কিন্তু তিতির এই গরম কাপড় লন্ডনের এই শীতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পাড়ছে না।তাই শরীরের তাপমাত্রা কমতে লাগলো হঠাৎ।আর তিতির শরীর এই ঠান্ডা পরিবেশে নিজেকে মানাতে পাড়ছে না।তিতির ফর্সা মুখটি লাল হয়ে গেলো।ঠোঁটগুলো কাপতে লাগলো।মনে হচ্ছে দাঁতেদাঁত লেগে যাবে।হাতের মুজোগুলোতে মুখ দিয়ে ফু দিয়ে বারবার গরম করার বৃথা চেষ্টা করছে।কিন্তু কাজ মনে হয় কিছুই হচ্ছে না।আসলে আগের বছরের তুলনায় এবার শীত বেশি।তাই এখানকার শীতের টেম্পেরেজার আগের তুলনায় অনেক বেশি।তাই হয়তো তিতির এতো কষ্ট হচ্ছে।

“–দিনেশ তার ড্রাইভারের সাথে এতোক্ষণ ফোনে কথা বলছিলো,কতোক্ষণ লাগবে তার আসতে জানতে।ফোন রেখে তিতিরের দিকে তাকিয়েই দিনেশ আতকে উঠলো।কারণ তিতিরকে স্বাভাবিক লাগছে না।তিতির যেনো জমে যাচ্ছে।দিনেশ তিতির কাছে এসেই জিঙ্গেস করলো,”কি হয়েছে তোমার।এমন করছো কেনো?”

তিতির কাপাকাপা কন্ঠ দিনেশকে জিঙ্গেস করলো,”স্যার আমারই কি ঠান্ডা লাগছে, নাকি আসলেই এখানে ঠান্ডা অনেক বেশি।”

–না,এখানকার শীতের মাত্রা বাংলাদেশকে থেকে একটু বেশিই।তবে এবার নাকি গতো কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেছে।এবারের মতো শীত কোনও বার হয়নি।দেখো না চারপাশের লোকজন একদম উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঢেকে বের হয়েছে।দিনেশ একটু চিন্তিত চোখে তিতির দিকে তাকালো এবার।তোমার কি খুব বেশি সমস্যা হচ্ছে তিতির।
“তার মানে আমিও ফকির হলাম,আর দেশেও আকাল এলো।”
–‘মানে!কিসব বলছো তুমি।ঠিক আছো তো।নাকি ঠান্ডায় মাথা গেছে। ‘

‘মানে বুঝেন না,এতো বছর রেকর্ড ভাঙ্গতে মন চায়নি শালা এই শীতের।যেই না শুনছে আমি আসবো,তাতেই বেড়ে গেলো।এতো দরদ আমার জন্য।যতোসব গাঁজাখুরি কারবার।’

দিনেশ তিতির কথায় হাসবে নাকি অবাক হবে বুঝতে পাড়ছে না।ও শুধু বিমুখ হয়ে তিতির দিকে তাকিয়ে আছে।
–‘স্যার, এভাবে ক্যাবলাকান্তের মতো তাকিয়ে না থেকে কিছু একটা করুন।আমার শরীর হঠাৎ করে এতো ঠান্ডা নিতে পাড়ছে না,আমার প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগছে।’

দিনেশ তিতিরের অবস্থা দেখে তারাতারি ব্যাগ থেকে আরো একটা লং কোট বের করে তিতিরকে পড়িয়ে দিয়ে,একহাতে টেনে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরলো।

–“স্যার আপনার ঠান্ডা লাগছে না।তিতিরও দিনেশের বুকে মুখ লুকিয়ে কথাটি বললো।”

না!আমার কোনও সমস্যা নেই,আমার এটা সহ্য করার অভ্যাস আছে।তখনই ওদের নিতে আসা গাড়ীটি এসে দাঁড়ালো সামনে।দিনেশ ড্রাইভার কে ব্যাগগুলো তুলতে ইশারা করে তিতিরকে নিয়ে গাড়ীতে উঠে বসলো।তিতিরকে নিজের সাথে তখনও জড়িয়ে ধরে নিজের শরীরের সব উষ্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করছে দিনেশ।তিতিরও আজ কোনও শব্দ না করে একটা ছোট বিড়াল ছানার মতো দিনেশের বুকের সাথে লেপ্টে আছে।হয়তো শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য ও নিজেও দিনেশকে জড়িয়ে ধরে আছে।

“হোটেল 55তে দিনেশের বুকিং ছিলো।এখানে দুটো রুম আগে থেকেই তাদের জন্য বুকিং করা ছিলো।তাই হোটেলে এসেই চাবি নিয়ে সোজা যে যার রুমে চলে গেলো।দিনেশ তিতিরকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে বলে চলে গেলো।রাতে ডিনারে দেখা হবে বলে।রুমের তাপমাত্রা কিছুটা গরম হবার কারণে কিছুটা হলেও তিতির স্বস্তি ফিরে পেলো।ফ্রেস হয়ে তিতির কোম্বলের ভেতর ডুকে পড়লো।লং জার্ণি আর এতো ঠান্ডা পরিবেশে চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলো তিতির।”

–“রাত আটটায় দিনেশ তিতির রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।কখন ধরে দরজা ধাক্কাচ্ছে অথচ ভেতর থেকে কোনও সারা নেই।ফোন দিবে তারও পথ খোলা রাখেনি,কারণ তিতির ফোন বন্ধ।হোটেলে কর্মরত একজন স্ট্যাপ কে দিয়ে ডুবলিকেট চাবি এনে তিতিরের রুমে প্রবেশ করে দিনেশ।রুমটি এখনো অন্ধকারাচ্ছন্ন।শুধু পর্দাগুলোর ফাঁকেফাঁকে বাহিরের কিছু আবছা আলো ঘরটিতে প্রবেশ করছে।দিনেশ বিছানায় তাকিয়ে দেখে তিতির কোম্বল পেছিয়ে গভীর ঘুমে ডুবে আছে।দিনেশ মনে মনে হেসে দিলো,কি ঘুম কাতুরী মাইরী।এতো ডাকাডাকি করেও ওর ঘুম ভাঙ্গলো না।তিতিরকে এভাবে দেখে হঠাৎ কি যেনো হলো দিনেশের।
তিতির পাশে বসে আলতো করে ওর মুখে পড়ে থাকা চুলোগুলো সরিয়ে দিলো খুব সাবধানে।দিনেশ তিতিরকে দেখেই যাচ্ছিলো।ওর ঘুমের জন্য ফুলে উঠা গোলাপি ঠোঁটগুলো,লাল হয়ে যাওয়া গালদুটো খুব করে যেনো টানছিলো দিনেশকে। মনের মধ্যে তিতিরকে আরো একটু স্পর্শ করার চাহিদা জেগে উঠলো।নিজের ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দিতে টুপ করে তিতির গালে একটা চুমো দিয়ে দিলো দিনেশ।এতে তিতির একটু নড়ে উঠে এবং সোজা হয়ে হাতপা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলো।তিতিরকে বাচ্চাদের মতো ঘুমাতে দেখে দিনেশও মুচকি হেসে ওর পাশে শুয়ে পড়লো।দিনেশ নিজের ইচ্ছাকে আরো একটু প্রশ্রয় দিয়ে,খুব ধীরে তিতির নরম ঠোঁট দুটি বুড়ো আঙ্গুলে স্পর্শ করলো।ওর খুব লোভ হতে লাগলো।তিতির ঠোঁটের উপর ক্রমশ ওর হাতের স্পর্শ বাড়তে লাগলো।তিতির মরার মতো ঘুমাচ্ছে।ওর কোনও হুস নেই।দিনেশ নিজের লোভ টাকে সামলাতে না পেরে আবারও নিজের ইচ্ছাটাকে প্রশ্রয় দিয়ে দিলো।নিজের শরীরটাকে টেনে তিতিরের শরীরের উপর এনে তিতির ঠোঁটগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিলো নিজের ঠোঁট দিয়ে।কিন্তু এতেও তিতির নড়লো না।দিনেশ খুবই অবাক হলো।এই এটা মেয়ে নাকি অন্য কিছু।একে কেউ ঘুমের মধ্যে রেপ করে দিলেও হয়তো বুঝতে পাড়বে না।দিনেশ বুঝতে পাড়লো,ওর অনৈতিক ইচ্ছার সাথে ওর দেহের চাহিদাও বাড়ছে তিতিরকে এভাবে দেখে।যা একদম অশোচনীয়।এভাবে ঘুমে থাকা একটা মেয়ের সুযোগ নেওয়া কাপুরুষের লক্ষণ।
তাই কিছুক্ষণ পর দিনেশ নিজেকে নিজেই থামিয়ে দিলো,”স্টোপ দিনেশ,আর সাহসিকতা দেখাস না।এই মেয়েটি তোর,আর নিজের জিনিসকে চুরি করে আদর করা বেড ম্যানারস।তিতির জানতে পাড়লে কপালে মাইর ঝুটবে।এমনেই এই মেয়ে কয়েকদিন ধরে বাঘিনী রুপ ধরেছে।”

দিনেশ আস্তে করে নিজের শরীরটা সরিয়ে ফেললো তিতির এর উপর থেকে।তিতির পাশে একহাতে ভর দিয়ে শুয়ে তিতিরকে ডাকতে লাগলো দিনেশ।
…………………………………

রাতের ডিনার করতে একটা টার্কিশ হোটেলে এলো ওরা।হোটেলের সব কিছু ভালো লাগলেও এখাকার মেয়ে ওয়েটারসদের পোশাকে কোনও শালিনতা ছিলো না।এই শীতেও হোটেলের ভেতরে গরম পরিবেশ থাকায়,মেয়েরাও অনেকটা খোলামেলা পোষাক পড়েই কাস্টমারদের অর্ডার নিচ্ছে।তিতিরের ব্যাপারটা একদম ভালো লাগলো না।ওর নিজেরই খুব লজ্জা লাগছে,মেয়েগুলোকে দেখে।তাছাড়া মনের মধ্যে একটু খুত হতে লাগলো।এই শর্ট ওয়েস্টার্ন ড্রেস পড়া মেয়েদের দিকে দিনেশ তাকাচ্ছে কিনা তা জানতে বারবার আর চোখে দিনেশের দিকে তাকাচ্ছে তিতির।কিন্তু কিছুই বুঝতে পাড়ছে না।

-“দিনেশ খুব মনোাযোগ দিয়ে ম্যানু দেখছে।তিতিরের মন খুশি হয়ে গেলো।যতোটা খারাপ ভেবেছে দিনেশকে ততোটা না।এই বেশরম মেয়েগুলোর দিকে একবারও তাকায় নিই দিনেশ।যাক বাঁচা গেলো।তিতির খুশি হয়ে টেবিলের উপর থেকে গ্লাশটি হাতে নিয়ে পানি খেতে নিলে,দিনেশের কথায় বিষম খেয়ে পানি সব মাথায় উঠে যায়।দিনেশ তারাতারি ওর কাছে এসে পিঠে হাত বুলিয়ে মাথায় কয়েকটা চাপড় মারে।আর ইউ ওকে তিতির।তিতির কোনও রকম মাথা নেড়ে হা বলে।”

-আসলে দিনেশ তিতির এর সব কিছুই লক্ষ্য করছিলো।মেয়েগুলোকে দেখে যে তিতির অস্বস্তি ফিল করছে সাথে ইনসিকিউর তা দিনেশ খুব ভালো করেই বুঝতে পাড়ছে তাই তিতিরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলো,”এভাবে আর চোখে দেখে লাভ নেই।এসব ছোট পোশাক পড়া মেয়েগুলো আমাকে কোনও ভাবেই আকর্ষণ করতে পাড়বে না।তাছাড়া এরা শুধু ব্রা আর পেন্টি পড়ে আসলেও আমার ভেতর কোনও রিয়েকশন আসে না।শুধু তোমাকে ছাড়া।তুমি যদি পড়ে আসো তাহলে অন্য কথা।তাছাড়া আমি এসব পোশাকে শুধু তোমাকেই কল্পনা করি।অন্যকোনও নারীকে না।”
ব্যাচারী তিতির পানি খাচ্ছিলো,দিনেশের বেলাগাম কথায় বেহুশ হয়ে যেতে মন চাইছিলো ওর।
রাগতো উঠছিলো দিনেশের উপর কিন্তু তার সাথে ভীষণ লজ্জাও ঝেকে ধরলো।এখান থেকে পালাতে পাড়লে হয়তো বেঁচে যেতো।তা না হলে এই লোক তিতিরকে লজ্জা দিয়ে একদিন সত্যিই মেরে ফেলবে।লজ্জাহীন মানুষ বলে কি?এই লোক নাকি আমাকে এসব রুপে কল্পনা করে ছিঃ।

–“পুরো ডিনারের সময় তিতির আর চোখ তুলে তাকাতে পাড়লো না দিনেশের দিকে।ওর ভীষন লজ্জা লাগছিলো আজ দিনেশের সাথে বসে থাকতে।দিনেশও আর কিছু বললো না,বরং তিতির লাল হয়ে যাওয়া গাল দুটো দেখেই বুঝে গেলো সব।ডিনার করেই তিতিরকে সাথে নিয়ে এখানকার কয়েকটা সোপিংমল গুড়ে তিতিরকে শীতের আরো বেশ কিছু পোশাক কিনে দিলো দিনেশ।তিতির অবশ্য কিছুই নিতে চায়নি,কিন্তু দিনেশ ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিলো,কারণ এখানে শীতের প্রকোপ হয়তো আরো বাড়বে।আর তুষার বৃষ্টিপাত হলেতো কথাই নেই।”

সোপিংমল থেকে বের হয়ে দিনেশ তিতিরকে নিয়ে গেলো সোজা টেমস নদী দেখাতে।সন্ধ্যার পর বিভিন্ন আলোক সজ্জায় সজ্জিত হয়ে উঠে এই নদী।এটাকে লন্ডনের হ্রৎপিন্ডও বলা হয়।এই নদীতে ছোটছোট অনেক জাহাজ ভাসে।দিনেশও ছোট একটা জাহাজে তিতিরকে নিয়ে উঠে পড়লো।অপরুপ সৌন্দর্যে ভরপুর টেমস নদী।এর চারপাশে বিরাজ করছে নগরসভ্যতা।পুরো লন্ডন যেনো দেখা যায় টেমস নদী দিয়ে একবার ঘুড়লে।একবার পুরো টেমস নদী চক্কর দিয়ে পুরো লন্ডন শহর দেখে তিতির ও দিনেশ আবার ফিরে এলো হোটেলে।কাল সকাল দশটার মধ্যে তিতিরকে রেডি থাকতে বলে,যে যার রুমে চলে গেলো আবার।
…………………………………………

তিয়াস ও দিশা বসে আছে একটা রেস্টুরেন্টে।দিশা ফ্যাচফ্যাচ করে কান্না করছে।এসব দেখে তিয়াশের বিরক্ত হবার সাথে সাথে মাথা ব্যাথাও করছে।কিন্তু দিশাকে কিছু বলতেও পাড়ছে না,কোন মুখেই বা বলবে।

–“মায়ের উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত তিয়াশ।মা হয়ে ছেলের কষ্ট বুঝতে চায় না।কেমন মা আমার।ছেলের থেকে টাকার মূল্যটা কি খুব বেশি।হয়তো বেশি তা না হলে টাকার লোভে ছেলেকে বেঁচে দিতে একবার হলেও বুক কাঁপতো তার।তিয়াশের মনটাও ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো এসব ভেবে।নাক টানার শব্দে আবার দিশার দিকে তাকালো।মেয়েটি এখনো কেঁদে যাচ্ছে।আর কাঁদবেই না কেনো।আজ সকালে মা নাকি ওদের বাসায় ফোন করে ওর বাবা মাকে যা তা বলেছে।দিশার চরিত্রের উপরও আঙ্গুল তুলেছে।শুধু এতোটুকুতে ক্ষান্ত হয়নি মা,দিশাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেওয়ার তাগিদ করেছে।ছেলে না পেলে নাকি সে দিবে দরকার হলে।তার কাছে নাকি অনেক ভালো ভালো পাত্রও আছে।তাহলে পাত্র হিসেবে আমার কি দোষ।নাকি আমি ভালো না পাত্র না।ঘটকালি করতে মন চাইলে নিজের ছেলের জন্য কর না বাপু,অন্য ছেলের সাথে আমার বউকে ঝুলিয়ে দেওয়ার মানে কি।তিয়াশ মায়ের এমন আচরণে খুবই হতাশ।তার উপর আজকের ঘটনার কারণে দিশার বাবা মা তিয়াশের সাথে দিশাকে নাকি কিছুতেই বিয়ে দিবে না বলে জানিয়েছে।”

দিশার বাবার মতে,”যে ছেলের মা এমন,সে সংসারে দিশা গেলে নাকি কখনো সুখে হবে না।ছেলেও মা আর বউয়ের মধ্যে পিষে যাবে।না নিজে সুখে থাকবে না দিশাকে সুখে রাখতে পাড়বে।তাই তিয়াশের সাথে সব সম্পর্কের ইতি টানাই ভালো।ব্রেকআপ করে দেওয়ার জন্য দিশাকে চাপ দিচ্ছে।তিয়াশ এখন ভাবণায় পড়ে গেছে,আজ দিশা চলে গেলে হয়তো ও আর দিশাকে দেখতে পাবেনা।দিশার বাবা মা যেভাবেই হোক ওকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিবে।এটা ভাবতেই তিয়াশের অস্থিরতা আরো বেড়ে গেলো।”

দিশা চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ালো, চলে যাওয়ার জন্য।আমি আসি তিয়াশ।ভাগ্যে থাকলে আবারও দেখা হবে বলে,তিয়াশের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দিশা চলে যেতে নিলে তিয়াশ একটা হার কাপানো ধমক মারে।তিয়াশের ধমকে দিশাসহ আশেপাশের মানুষও কেপে উঠে।কিন্তু তিয়াশ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে,দিশাকে চুপচাপ বসতে বলে।তিয়াশের মুখের এক্সপ্রেশন মুহুর্তেই বদলি হয়ে যাওয়ায় দিশাও একটু ভয় পেয়ে চুপচাপ বসে পড়ে আগের জায়গায়।কাপাকাপা কন্ঠে তিয়াশকে প্রশ্ন করে,”কি হয়েছে তিয়াশ।কিছু বলবে।”

–তিয়াশ দাঁতেদাঁত চেপে বলে,”আমাকে কি খেলার পুতুল পেয়েছো তোমরা।যখন খুশী খেলবে আবার যখন খুশী বদলে দিবে।।তুমি নিজের বাবা মায়ের দোহাই দেও,আর আমার মা কেবল নিজেটা বুঝে।আর এ দিকে যে আমি জলজ্যান্ত একটা মানুষ ছুটফট করছি সেদিকে কারো কোনও খবর নেই।কেন রে? আমি কি মানুষ না।অনেক শুনেছি সবার কথা আর না।এবার শুধু আমার মর্জি চলবে।”

–“দিশা নির্বাক হয়ে তিয়াশের দিকে তাকিয়ে আছে,আসলে কি বলবে বুঝতে পাড়ছে না।এখানে ওরো যে কিছু করার নেই।”

আর তিয়াশ দিশার এই নির্বাক চাওয়ার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ফোন দিলো আয়নকে।আয়ন ফোন রিসিভ করার সাথেসাথে ভাইকে কিছু বলতে না দিয়ে নিজেই বলতে লাগলো তিয়াশ,”ভাই আমি বিয়ে করবো।আজ এবং এখনই।তুমি সাহায্য করবে নাকি একা একা করে ফেলবো।”
–দিশা তিয়াশের কথা শুনে কি রিয়েকশন দিবে হয়তো এই মুহুর্তে ভুলে গেছে।ব্যাচারী একহাত হা করে তাকিয়ে আছে তিয়াশের দিকে।
“এখনো ভালোবাসি”
|৩১|

আয়ন বসে আছে দিশার বাবার ঠিক সামনে।আর আয়নের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে তিয়াশ ও দিশা।আবির রহমান মানে দিশার পিতা তিয়াশ আর দিশার দিকে একবার তাকিয়ে মুখ গুড়িয়ে ফেললো।তার এক কথা এই বিয়ে সে মানে না।তাই এখানে তামাশা না করে ভদ্রভাবে যাতে সবাই চলে যায়।সাথে দিশাকেও নিয়ে যেতে বললো।যে মেয়ে বাবা মায়ের সম্মানের কথা চিন্তা না করে দুদিনের প্রেমের জন্য এমন কিছু করতে পারে,সে মেয়ে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।আমি মুখ দেখতে চাইনা এদের আর।মারিয়া (দিশার মা)বলে দেও এদের আমার বাসা থেকে চলে যেতে।কথাগুলো বলতে যে আবির রহমানের অনেক কষ্ট হয়েছিলো,তা উপস্থিত আয়ন খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পাড়লো।

–“দিশা বাবার কথা শুনে,ফুফিয়ে কেঁদে উঠলো।সামনে একপা বাড়িয়ে বাবার কাছে যেতে নিলে,তিয়াশ হাত ধরে বাধা দেয়।দিশা করুন চোখে তিয়াশের দিকে তাকালে,ইশারায় কিছু একটা বলে বুঝায় একটু ধৈর্য ধরতে ভাই সব ঠিক করে দিবে।আর তাতে দিশাও চুপ হয়ে যায়।”

–আয়ন দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে একটু নেড়ে চেড়ে বসে।আবির রহমানের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে তার মনে এখন কি চলছে।আবির রহমানকে এমন স্থির থাকতে দেখে আয়ন নিজেই কথা বলার চেষ্টা করে।
“আংকেল আমি বুঝতে পাড়ছি আপনি অনেক কষ্ট পেয়েছেন।সন্তানকে এতো কষ্ট করে বড় করে তুলার পর,সেই সন্তানই যখন বাবা মার অবাধ্য হয়ে এমন একটা কাজ করে,তখন কষ্ট না,আমার মতে বুকের ভেতর থেকে রক্ত খরন হবার কথা।সত্যি বলতে আপনার কষ্ট বুঝার মতো বয়স বা সময় হয়নি এখনো আমাদের।একজন পিতার কষ্ট একজন পিতাই বুঝতে পাড়বে।আমি মনে করি বাবা মা সব সময়ই সন্তানের ভালো চায়,কিন্তু আমরা সন্তানেরা একটু বেশি সার্থপর সব সময়।আমরা নিজের সুখের কথাটা আগেই ভেবে নিই।বাবা মায়ের আমাদের জন্য করা সকল সেক্রিফাইজকে তাদের দায়িত্ব মনে করে ভুলে যাই।আমরা সন্তানরা বরারবই স্বার্থপর হই।তবুও বাবা মা আমাদের নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসে যায়।এটাই তো তাদের মহার্থ।”
এতোটুকু বলে আয়ন থামে,আবির রহমানের সামনে হাটু গেড়ে এমন ভাবে বসে যেনো এই কাজটির জন্য ও নিজেও অনুতপ্ত।আয়ন আবার বলা শুরু করে।”আমি জানি তিয়াশ আর দিশা যা করেছে ভুল করেছে।ওদের এভাবে আপনাদের না জানিয়ে বিয়ে করা উচিত হয়নি। একদমই না!কিন্তু কি করবে বলুন।তিয়াশের দোষ না হওয়া সত্যও সবাই তিয়াশকে শাস্তি দিচ্ছে।মায়ের আচরণের কারণে ছেলেকে কেনো ভুগতে হবে বলুন।আপনাদের কথায় যুক্তি আছে,দিশা ও বাসায় গেলে আমার ফুফু ওকে কোনও দিনও শান্তি দিবে না।কিন্তু তাই বলে দুজন ভালোবাসার মানুষকে আলাদা থাকতে হবে এটা কেমন কথা।আমি আমার ফুফুকে খুব ভালো করেই চিনি,উনি সহযে কিছুতে সন্তুষ্ট হয়না।কিন্তু কি করবো বলুন।উনি আমাদের বড়,তাই মুখের উপর কিছু বলতেও পারিনা।আর তাছাড়া তিয়াশ এমনেও দিশাকে নিয়ে ওর বাসায় যাবে না।ও আলাদাই থাকতে চায় দিশাকে নিয়ে।আর আমার মতে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই সবার জন্য ভালো হবে।হয়তো এতে ফুফুরও কিছুটা শিক্ষা হবে।”

আংকেল আমি জানি আপনি দিশাকে নিয়ে চিন্তিত।আর হবারই কথা।কিন্তু আমি আপনাকে ভরসা দিচ্ছি,দিশা তিয়াশের সাথে অনেক হ্যাপি থাকবে।আমি আমার ভাইয়ের গ্যারান্টি নিচ্চি।তিয়াশ দিশাকে খুব ভালোবাসে আর দিশাও।প্লিজ আংকেল মাপ করে দিন।আপনারই তো সন্তান।আপনার দোয়া ছাড়া তাদের সংসার জীবনে কখনো সুখে থাকতে পাড়বে না।নিজের মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন।দিশা অনেকটা অনুতপ্ত।ওর এই অনুতপ্ত আর বাড়াবেন না।ভাগ্য মনে করে মেনে নিন।জম্ম, মৃতুও আর বিয়ে উপরওয়ালার ইশারায় হয়।আমরা তো শুধু উছিলা।তাই রাগ করে মেয়েকে কষ্ট না দিয়ে,মাপ করে বুকে টেনে নিন।
আয়নের অনেক বুঝানোর পর অবশেষে আবির রহমানের মন গলেছে।দিশা ও তিয়াশের বিয়ে মেনে নিয়েছেন উনি।কিন্তু আয়ন দিশার বাবা মায়ের সামনে দিশা ও তিয়াশের আবার বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
আসলে তখন দিশা আর তিয়াশের বিয়ে হয়নি।আয়ন দিশার বাবার কাছে বিয়ের ব্যাপারটা মিথ্যা বলেছে।কারণ আয়ন জানতো, বিয়ের কথা শুনলে তারা এই সম্পর্ক না মেনে পাড়বে না।আর তাই হলো,আবির রহমান ওদের বিয়েটা মানার পর,তাদের সামনেই দিশা আর তিয়াশের বিয়েটা হলো।
তাছাড়া দিশাও ওর বাবা মায়ের অনুমতি ছাড়া কিছুতেই বিয়ে করতে রাজি ছিলো না।আর আয়নেরও মন সায় দিচ্ছিলো না এই ভাবে বিয়েতে।কারণ এখানে দিশার বাবা মায়ের কোনও দোষ নেই,তাহলে তারা কেনো তাদের মেয়ের বিয়ে থেকে বঞ্চিত হবে।একটা মিথ্যা কথায় আয়নের দুটো কাজই সিদ্ধ হলো,দিশার বাবা মায়ের উপস্থিতে ওদের বিয়ে হলো।এতে দিশা আর ওর বাবা মাও অনেক খুশি হয়।

–এদিকের সব ঝামেলা শেষ করে,দিশা ও তিয়াশকে একটা নতুন সাজানো ফ্ল্যাট গিপ্ট করে আয়ন।ওদের নতুন সংসার শুরু করার জন্য।তিয়াশ প্রচণ্ড খুশি হয়ে আয়নকে জড়িয়ে ধরে।ভাইকে খুশি দেখে আয়ন নিজেও আনন্দিত হয়।বড় ভাই হয়তো একেই বলে।
………………….………………
তিয়াশের বিয়ের খবর শুনার পর থেকেই মহিনী বেগম মরা কান্না ঝুড়ে দিয়েছে।নিজের ভাই ইরফাতের কাছে আয়নের বিচার নিয়ে বসেছে।ভাই হয়ে ভাইয়ের এতোবড় ক্ষতি আয়ন কিভাবে করলো।ওই ফকিরের মেয়েকে আমার সহয সরল ছেলের গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে পাড় পেতে চায় সবাই।আমি তা কিছুতেই হতে দেবো না।ভাই বলে দিলাম তোকে,আজ তোর ছেলের বিচার করবি।আমার এতো বড় ক্ষতি কেমনে করলো তোর ছেলে।
“ইরফাত মাহমুদ নিজের বোনকে সান্তনা দিতে লাগলো।আয়নকে বলার মতো কিছুই নেই তার কাছে,আর বলবেই বা কি করে।যেখানে উনার নিজের ছেলে আয়নই বাবা মাকে না জানিয়ে বিয়ে করে বউ নিয়ে এসে পড়েছিলো।সেখানে অন্যের ছেলের বিয়ে নিয়ে নিজের ছেলের বিচার আর কি বা করবে উনি।আর তাছাড়া ছেলেমেয়েরা বড় হলে তাদের বুঝানো যায়,শাসন করা তখন আর মানায় না।”

–“আয়ন বাড়ীতে এসেই,ফুফুর এসব নাটক দেখেও না দেখার বান করে নিজের রুমে চলে গেলো।কারণ এখানে থাকলেই কথা বাড়বে।আর তাছাড়া বুঝার মানুষকে বুঝানো যায়,অবুঝকে বুঝাতে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে লাভ নেই।আয়নের এসব ন্যাকা কান্নাকাটি একদম ভালো লাগে না।রুমে প্রবেশ করার সাথেসাথে আয়ন প্রিয়ুকে দেখতে পেলো পড়ার টেবিলে।কিছুক্ষণের জন্য দুজনের চোখাচোখিও হয়েছিলো।কিন্তু প্রিয়ু তৎক্ষনিক নিজের চোখ সরিয়ে বইয়ের মধ্যে স্থির করে ফেললো।আয়নও আর কিছু বললো না।এমনেই সেদিনের পর থেকে আয়নও প্রিয়ুর সাথে আর কথা বলে না।কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখে প্রিয়ুর থেকে।আয়নের মতে একটি অপরাধের জন্য ও বারবার ক্ষমা চেয়েছে।কিন্তু আর না,এবার প্রিয়ুর পালা।আয়ন দেখতে চায় প্রিয়ুর মনে কি আছে।কতোদিন রাগ করে থাকতে পারে।আয়ন ফ্রেস হয়ে লেপটপ নিয়ে সোফায় বসে পড়ে, কিছু জরুরি ইমেল চেক করতে লাগলো।এমনেই অফিসে আজ কাজ করার সময় পাইনি,তিয়াশের ঝামেলায়।আর বাড়ীতে আসলে,বারবার প্রিয়ুর কাছে যেতে মন চায়,তাই মনকে কাজে স্থির করার চেষ্টা করছে আয়ন।কিন্তু সারাদিনের দৌড়াদৌড়িতে আয়নের প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে গিয়েছে।লেপটপের স্কিনেও তাকাতে পাড়ছে না।আয়ন বারবার নিজের চোখ টিপে ধরছে।আর তখনই প্রিয়ুও রুম থেকে কোথাও চলে যায়।প্রিয়ুর এমন বিহেভিয়ার আয়নকে কিছুটা হতাশ করে।আয়ন সোফায় শরীরটা এলিয়ে চোখটা বন্ধ করে ভাবতে থাকে।জীবনটা হয়তো এমন হতো না।দুবছর আগে ওসব ঘটনাগুলো না হলে,হয়তো আমাদের জীবনটা আরো মধুময় হতো।প্রিয়ুর সাথে সম্পর্কটা আরো ভালো থাকতো।জীবনের অর্ধেক সময় আমার তোর রাগ ভাঙ্গাতে পাড় করতে হতো না।কখনো কি আমরা সহয হতে পাড়বো না প্রিয়ু।এই ঝামেলাগুলো,রাগ, অভিমানগুলো কবে দূর হবে আমাদের মাঝে থেকে।আমার একলা জীবনে তোকে খুব প্রয়োজন প্রিয়ু।একটু শান্তির জন্য তোকে প্রয়োজন”।
ঠিক এই সময় একজন সার্ভেন্ট এসে,দরজায় টোকা দেয়, আয়ন কিছুটা বিরক্ত হয়ে ভেতরে আসতে বলে।
–সার্ভেন্ট ভেতরে আসতেই আয়ন অনেকটা রেগে বলে,কি সমস্যা? কি চাই?
“স্যার আপনার কফি,আর মেডিসিন।”
–মেডিসিন! আয়ন কিছুটা বিস্মিত হয়ে জিঙ্গেস করে,কিসের মেডিসিন।আর কে পাঠিয়েছে।
“প্রিয়ু ম্যাম।”
–প্রিয়ু!আর ইউ সিউর।আর কি বলেছে তোমাকে।
“আপনার নাকি মাথা ব্যাথা করছে,তাই আমার হাতে কফি আর মেডিসিনটা দিয়ে বললো,আপনাকে দিয়ে আসতে এখনই।”
–ওকে তুমি যাও।সার্ভেন্ট চলে যাবার পর আয়ন মেডিসিনটা খেয়ে নিলো।কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া উঠা কফিটা হাতে নিয়ে মুখে দিতেই,যেনো একটা প্রশান্তি বয়ে গেলো পুরো শরীরে।আয়নের মুখ জুড়ে হাসি ছেয়ে গেলো।সামনে যতোই বলুক আমাকে ঘৃর্ণা করে,অথচ আমার সামান্য কষ্টও সহ্য করতে পারেনা এই মেয়ে।কি অদ্ভুত তুই প্রিয়ু!
তাইতো সার্ভেন্টের হাতে মেডিসিন আর কফি পাঠিয়েছে।মেডিসিন খেয়ে আয়নের মাথা ব্যাথা চলে গেলো।আর কফিটা খাওয়ার পর পুরো শরীরটা আবার চাঙ্গা করে তুললো।আয়ন আবারও মনেযোগ দিলো নিজের কাজে।
………………………………
আজকের মিটিংটার জন্য তিতিরকে আগেই আসতে হলো।আর দিনেশ কিছু জরুরি কাজের জন্য পরে জয়েন হবে বলে দিলো।যে কম্পানির সাথে ওদের আজকের মিটিংটা তার ওনার নিজেও এখনো আসেনি।চারদিকে অচেনা মানুষের সাথে তিতিরও বসে আছে।ওর একটু আনইজি লাগলোও করার কিছু নেই।এই ধরণের মিটিংগুলোতে এমন অচেনা মানুষগুলোরই আগমন থাকে।কিছুক্ষণ পর মিটিংরুমের দরজা খুলে কেউ প্রবেশ করলো।ব্লু কালার শার্ট,ব্লাক ব্লেজার আর ব্লাক প্যান্ট,চুলগুলো জেল দিয়ে খুব সুন্দর করে সেট করা একটা হ্যান্ডসাম পুরুষ প্রবেশ করলো।হ্যান্ডসাম এই পুরুষটিকে তিতির কাছে অনেক লোভনীয় লাগছে।না চাওয়া সত্যেও তিতিরের চোখ বারবার দিনেশকে দেখতে লাগলো।

–“দিনেশ মিস্টায় সুজেত বসের সাথে কথা বলতে বলতে মিটিংরুমে প্রবেশ করলো।দিনেশের জন্য আজকের মিটিংটা খুব ইম্পোর্টেন।পুরো লন্ডনে বসবাসরত সকল বাংলাদেশি,ইন্ডিয়াবাসীদের জন্য ভালো দামী উন্নতমানের পোশাক কেবল সুজেত বোসের শো রুম গুলোতেই পাওয়া যায়।পুরো লন্ডন শহর জুড়ে ওদের শো রুম আছে।আর এসব লন্ডনে বসবাসরত এন.আর.আই দের পোশাকের জন্যই দিনেশের কোম্পানিকে চুজ করা হয়েছে।আর তাই দিনেশ নিজে এসেছে এই মিটিং এটেন্ড করতে।ডিলটা হয়ে গেলে,লন্ডন শহরেও ওর বিজনেস আরো বেড়ে যাবে।”

–পোশাকের ম্যাটেরিয়াল,আর ডিজাইন নিয়ে আলোচনা চলছে।তিতির খুব শান্ত,ধীর অথচ তীক্ষ্ণ কন্ঠে পোশাকের সব বিষয় তুলে ধরলো সবার সামনে।তিতির তীক্ষ্ণ কন্ঠের কারণে মিটিংরুমটায় পিন ড্রপ সাইলেন্ট বিরাজ করছিলো।সবাই মুগ্ধা হয়ে তিতির বলা সব কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো।মিস্টার সুজেত তো তিতির থেকে চোখ ফেরাতেই পাড়ছিলো না।একবারে সুক্ষ্মভাবে তিতিরকে যেনো স্ক্যানিং করতে লাগলো।ফর্সা গায়ের রং,ঠোঁট জুড়ে পিংক লিপস্টিকটা যেনো আরো সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে ওই মুখটিতে।ঘন পাপড়ি ঘেরা চোখগুলোতে আইলাইনার সাথে হালকা কাজল পড়েছে চোখে মেয়েটি।ডানপাশ সিথি করে লম্বা চুলগুলো খোলা রেখেছে।পড়নে একটা হালকা পিংক কালারের শাড়ী।একদম বাঙ্গালি রুপ যেনো ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ছে।
আজ প্রথমবার কারো মহিনী রুপে সুজেত যেনো সম্মোহন হচ্ছে বারংবার।

-ব্যাপারটা তিতিরের চোখ এড়ালো না।সুজেতের চোখের ভাষা তিতির নিমিষেই বুঝে গেলো।না চাওয়া সত্যেও এই দৃষ্টি তিতিরকে কথা বলতে বাধা দিচ্ছে।অনেকটা অস্বস্তিকর জনক পরিবেশ তিতির জন্য।
তিতির যে বিভ্রত হচ্ছে,সুজেত খুব ভালো করেই বুঝতে পাড়লো।কিন্তু তবুও চোখ সরালো না তিতির থেকে।বরং মনে মনে বলতে লাগলো,”এমনেই তো মরেছি তোমার মহিনী রুপে,আর কতো ভাবে আমাকে মারতে চাও রুপসী।তোমার নার্ভাস মুখটাও চাঁদ মুখের মতো জ্বলজ্বল করছে।তোমার চোখের ওই চাওনি তীরের মতো সোজা বুকে গিয়ে লাগছে।আমার তো তোমাকে চাই।চাইই…! চাই!
কে বাঁচাবে তোমায় আমার হাত থেকে।এই সুজেত বোসের হাত থেকে আজ পর্যন্ত কোনও সুন্দরী রেহাই পায়নি।তুমি কি করে পাবে।

চলবে…।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here