কবি বর পর্ব ৭

গল্প : কবি বর | পর্ব : সাত

ঘন অন্ধকার পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আদ্রিতা। সোজা হিমেলের সামনে এসে দাঁড়াল। হিমেল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল শুধু। কথা বলল না। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে হিমেল জানে না। শুধু জানে, গাঢ় নীল শাড়ি পরা এক যুবতী তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভুল, যুবতী নয়, এ-যে আকাশ থেকে নেমে আসা পরী! যার ডানা নেই। আছে অপার সৌন্দর্য। আছে হৃদয় গলানো একজোড়া চোখ। সেই চোখদু’টোর মায়ায় আটকে গেছে হিমেল। আর তাইতো…

আদ্রিতা ছাতাটা নামিয়ে রেখে হাত বাড়িয়ে একজোড়া ঝুমকো এগিয়ে দিলো। হিমেল এক মনে আদ্রিতার হাতের দিকে তাকিয়ে থাকল। একসময় আস্তে করে বলল,

“ফিরিয়ে দিচ্ছেন কেন?”

“এগুলো রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ঝুমকোগুলো আপনার একান্ত ব্যক্তিগত জিনিস। যা আপনি কেবল আপনার ব্যক্তিগত মানুষদেরই দিতে পারেন। তাই ফিরিয়ে দিচ্ছি। তাছাড়া কারোর আপনজনের স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর ইচ্ছে আমার নেই।”

আদ্রিতার গলায় অভিমান স্পষ্ট। কিন্তু অভিমান করার কারণ খুঁজে পাচ্ছে না হিমেল। ততক্ষণে আকমল চাচা সরে পড়েছেন। না হলে তিনি কিছু একটা বলতে পারতেন। এই মুহূর্তে হিমেলের মাথায় কিছু আসছে না। তাই সে বাধ্য ছেলের মতো ঝুমকোজোড়া আদ্রিতার হাত থেকে সতর্কতার সহিত তুলে নিল। এবং এতটাই সতর্কভাবে নিল যে, আদ্রিতার হাতে হিমেলের হাত কিংবা আঙুলের বিন্দুমাত্র স্পর্শ লাগল না।

আদ্রিতা ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে যাচ্ছিল। হিমেল ডাকল,

“শুনুন!”

আদ্রিতা ফিরে তাকাল। কিছু বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। হিমেল বলল,

“আপনি কি কোনো কারণে আমার উপর রেগে আছেন?”

“রেগে থাকব কেন?” মৃদু হেসে বলল, “আমি রেগে নেই। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বিয়ের পর তো আর আপনার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হবে না। আর আপনার দেওয়া ওই ঝুমকোগুলোও ফিরিয়ে দিতে পারব না। তাই আজই দিয়ে গেলাম।”

আদ্রিতার বিয়ের কথা শুনে হিমেল আহত হলো কি? হিমেলের বুকের ভেতরটা হঠাৎ নীরবে হাহাকার করে উঠল কি? কে যেন নিঃশব্দে হিমেলের বুকের ভেতর হাতুড়িপেটা করে চলেছে। হিমেল অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,

“আপনার বিয়ে! কই জানতাম না তো!”

“আমিও জানতাম না। আজই বিয়ের দিন তারিখ সব যাবতীয় কথাবার্তা হলো।” বলে আলতো হেসে মাথা নিচু করল আদ্রিতা। তার হাসি দেখে অজান্তেই হিমেলের ভেতরটা কেঁদে কেঁদে উঠল। কিন্তু কেন?

“ও! তা আপনি রাজি?” হিমেল বিষণ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল।

এ-প্রশ্নের জবাব আদ্রিতা দিলো না। ছাতাটা মাথার উপর ধরে উদাস ভঙ্গিতে বলল,

“আসি।” বলেই হনহন করে হাঁটতে শুরু করল। অনেকটা দূর চলে যাওয়ার পর হিমেল আবার ডাকল,

“শুনুন।” এবার হিমেলের কণ্ঠটা একটু ধরে এল।

আদ্রিতা কয়েক পা ফিরে এসে উৎসুক ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকল। হিমেল ম্লান মুখে বলল,

“কেউ যদি আপনাকে ভালোবাসে? যদি কেউ আপনাকে ভালোবেসে নিজের করে নিতে চায়, তবুও কি আপনি বিয়েটা করবেন? কেউ যদি ভালোবেসে বলে, এ-বিয়ে তুমি করো না। তুমি হারিয়ে গেলে আমি বড্ড একা হয়ে যাব। তবুও কি আপনি বিয়েটা করবেন?”

“এমন কেউ নেই।” দায়সারা ভাবে কথাটা বলে চলে যাচ্ছিল আদ্রিতা। হিমেল আবার বলল,

“যদি সত্যি এমন কেউ থাকে? যদি সত্যি সত্যি কেউ আপনাকে মন থেকে ভালোবাসে?”

“কিন্তু আমি কাউকে ভালোবাসি না।” বলেই মুখ ফিরিয়ে দ্রুত পায়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল আদ্রিতা। হিমেল অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আজ সে নিজের কথা ভেবে অবাক হচ্ছে। আজকের আগে এত এত মেয়ে তার সঙ্গে মিশতে চেয়েছে। সে পাত্তা দেয়নি। অথচ আজ অচেনা অজানা একটি মেয়ের জন্য তার চোখে জল! আজ তার পরিচয় কী? মন্ত্রীর ছেলে? না কি একজন গায়ক? না কি একজন প্রেমিক? যে কিনা কাউকে এতটা ভালোবেসেও মুখ ফুটে বলতে পারছে না!

গভীর রাত পর্যন্ত বিছানায় পড়ে রইল হিমেল। তার দু’চোখে ঘুম নেই। বুকে চিনচিনে ব্যথা। পেট খিদেয় চোঁ-চোঁ করছে। রাতে খায়নি সে। খাবেও না। খিদে আছে, ইচ্ছে নেই। বারবার শুধু আদ্রিতার কথা মনে পড়ছে। যদি সত্যি সত্যি আদ্রিতার বিয়ে হয়ে যায়? সে-কথা ভাবছে আর কেঁপে কেঁপে উঠছে হিমেল।

হঠাৎ কী যেন মনে করে স্মার্টফোন হাতে তুলে নিল হিমেল। কয়েকবার কেটে যাওয়ার পর ফোন রিসিভ করল আদ্রিতা। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,

“এত রাতে কেন ফোন দিয়েছেন?”

হিমেলের গলা ধরে এসেছিল। সে গলা ঝেড়ে বলল,

“একটি কথা বলব বলে ফোন দিলাম।”

“কী কথা?” আদ্রিতার কণ্ঠে বিরক্তি স্পষ্ট।

“আপনি কি সত্যিই বিয়েটা করছেন?”

“সে কথা তো আগেই বলেছি। আবারো জিজ্ঞেস করছেন কেন?”

“আমার জানতে ইচ্ছে করছে তাই জিজ্ঞেস করছি। বলুন।”

“হ্যাঁ, বিয়েটা হচ্ছে।”

“আপনি রাজি?”

“জানি না।”

“কিন্তু কেউ একজন যে আপনাকে ভালোবাসে! আপনার বিয়ে হয়ে গেলে তার কী হবে?”

“কেউ আমাকে ভালোবাসে না। শুধু শুধু বিরক্ত করবেন না তো! ফোন রাখুন।”

হিমেল দম নিয়ে বলল,

“বাসে। অনেক বেশি ভালোবাসে।”

“না, বাসে না।” আদ্রিতা জোর দিয়ে বলল।

“বাসে। আপনি তা জেনে-বুঝেও না বুঝার ভান করছেন। আমি ভাবতাম, পৃথিবীতে বোধহয় আমার ইগো সবার চেয়ে বেশি। এখন দেখছি আপনার ইগোর কাছে আমি কিছুই না।”

“এখানে ইগোর কী সম্পর্ক?”

“সম্পর্ক আছে। কেউ একজন যে আপনাকে ভালোবাসে, সে কথা আপনি ভালো করেই জানেন। ইগোর জন্য কথাটা স্বীকার করছেন না।” হিমেল একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল, “আচ্ছা থাক, আপনি বলতে হবে না। আমিই বলি। কেউ একজন আপনাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে। এখন আপনি ছাড়া সে তার একটি দিন কল্পনা অবধি করতে পারে না।”

“কে সে?” আদ্রিতা সংক্ষেপে প্রশ্ন করল।

হিমেল চুপ করে রইল। আদ্রিতাও কিছু বলল না। হাতের ফোনটা আলতো করে গালের কাছে ধরে রাখল। খানিক বাদে টুট্ টুট্ শব্দ করে ফোন কেটে গেল। হিমেল বিছানায় স্মার্টফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“ভারী অদ্ভুত! আমি অতটা বদলে গেলাম কী করে!”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here