কাঞ্জি পর্ব -০৯

#কাঞ্জি
#পর্ব-৯

গতরাতে রিমঝিমের কথাটা মাথা থেকে সরাতে পারেনি আবৃতি। ভোর হতেই বিছানা ছেড়ে উঠেছে সে।শাহরিয়ার নামের মানুষটার প্রতি তার মনের লাগাম টানার সময় এসে পড়েছে।বুকের ভিতর একটা জ্বালা অনুভব করলো সে।ওই মানুষটা অন্য কাউকে স্পর্শ করবে, তাকে আগলে রাখবে ভাবতেই ভীষণ বুক ভার হয়ে এলো।চোখ দুটো ভারী হলো বিন্দু বিন্দু জলে।বার কয়েক জোরে শ্বাস নিলো সে।এই বুঝি তার ভীষণ কষ্টের দিনে আরো একটু মন খারাপ যোগ হলো।দূর থেকে ভালোবাসা গুলো কত সুন্দর। এক তরফা কল্পনায় একটা সংসার।যে সংসারটা কেবল তার হবে। প্রিয় মানুষটার পাশে থেকে ভোরের আলোয় ডুব দেওয়া,তাড়াহুড়ো করে সকালের নাস্তাটা বানানো, কখনো খাবারে লবণ বেশি আবার চায়ে চিনি কম। মাঝেমধ্যে মন খারাপ, অভিমান এবং টুকটাক ঝগড়া করা।এরপর? এরপর ভালোবাসাবাসির সীমারেখা অতিক্রম হবে মুহুর্তেই। আবৃতিও এমন কিছুই চেয়েছিল নিজের জন্য। শাহরিয়ার সেই মানুষটা কোনো দিন হবে না তবুও মনের কোনে তাকে কেমন আগলে রেখেছে সে।
আবৃতি জানে শাহিনা বেগম নিজের বোনের মেয়ে ওয়াজিফার সাথে বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন নিজের ছেলের।শাহানারার বিয়ের পর ছেলে বউ ঘরে তুলবেন।দেখতে যেমন রূপবতী, মেয়ের বাবার ও টাকার কম নেই।এই তো গত জন্মদিনে ওয়াজিফা পুরো লাখ খানেক টাকার একটা ঘড়ি উপহার দিয়েছে শাহ কে।অথচ আবৃতি উইশ অবধি করতে পারেনি। শাহিনা বেগম পছন্দ করে না তার ছেলের সাথে কথা বলা।তাই শাহ এর জন্মদিন বড় করে সুফিয়া খাতুন পালন করলেও সেখানে পড়ার অযুহাতে থাকা হয় না আবৃতি কিংবা অদিতির। এত এত কিছুর মাঝে শাহ কি আবৃতির জন্য আকাশের সেই চাঁদের মতো না?যে চাঁদ হাত ইশারায় ডাকে কিন্তু বহুদূরে যাকে ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না কেবল দূর থেকে অনুভব করা যায়।

আবৃতি নিজেই নিজেকে সামলে নিলো।দুই হাতে মুখ ঢেকে বার কয়েক ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। হাতের ক্যানোলাটা আস্তেধীরে খুলে ডাস্টবিনে ফেলল।নিজেকে আর দুর্বল করতে ইচ্ছে করছে না।ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত মুখ পরিষ্কার করে এক মগ কড়া কফি নিয়ে বসলো বাগানের দোলনায়।ভোরের বাতাস গায়ে লাগতেই সে নিজেই নিজেকে বলল,

“পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী মানুষ তারাই যারা কাউকে ভালোবাসে এবং বিনিময়ে তারাও তাকে ভালোবাসে।আর সেই সুখী মানুষের তালিকা নেহাৎ সামান্য।আর তুমি সেই সামান্যদের তালিকাতে নেই।”

গেটের দিকেই নজর পড়তে দেখতে পেল সিজাদ এগিয়ে আসছে।ভ্রু-কুঁচকে গেল মেয়েটার।এই মুহুর্তে এই গোমরা মুখো মানুষ , যার মুখে একটুও রস নেই তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।মাথাটা এমনিতেও ধরে আছে।কিন্তু এদিকেই এগিয়ে আসছে।মাথার কাপড়টা ঠিক করে পা দুটো নামিয়ে বসলো আবৃতি। সিজাদ সামনাসামনি আসতেই বলল,

“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম আস সালাম।এখানে পড়তে বসেছো যে?আর কেউ উঠেছে বলে তো মনে হচ্ছে না।”
“আর কেউ উঠেনি। কোর্স ফাইনাল কয়েক দিন পর।”
“কিছুই মনে থাকছে না?তাই তো?”
“থাকছে তবে গুলিয়ে যাচ্ছে।”
“পড়া বাদেও হবে।উঠে এসো।”
“কোথায় যাবো?”
“মাইন্ড ফ্রেশ প্রয়োজন তোমার।মেদুর বাতাসে মস্তিষ্ক কে শান্তি দিতে হয়।”
“কিন্তু আমার হাটতে ইচ্ছে করছে না।আপনি বরঙ বসুন আমার একটু কাজ আছে।”
“তুমি বোসো আমি আসছি।”

মিনিট দশের পর সিজাদ ফিরে এলো হাতে কিছু একটা নিয়ে। অন্য হাতে ছোট্ট একটা ব্ল্যাংকেট এবং বালিশ। আবৃতির কোলে বালিশ দিয়ে বলল,

“পা তুলে বোসো।এটা নাও গরম লাগলে পেটে ব্যথা কমবে।আর পা ঢেকে বোসো।”

“কিন্তু এসব?”

“গতকাল বিকেলেই কিনে এনেছিলাম।কিন্তু দেওয়ার সুযোগ হয়নি।আর কখনো তুমি গরম পানি করতে যাবে না ছন্দলেখা।”

আবৃতি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে সিজাদের দিকে।ছন্দ লেখা?এই নামটা সিজাদ জানলো কি করে?এটা তো তার ব্যক্তিগত নাম।যে নামটাকে নিজের মাঝে লুকিয়ে রেখেছিল সে।অপ্রস্তুত আবৃতিকে দেখে নিজ অধর স্মিত করে সিজাদ।এক গ্লাস হট চকলেট মিল্কশেক মেয়েটার দিকে এগিয়ে দেয়।
তার মাথায় হাত রেখে বলে,

” কারোর কারোর দায়িত্ব বা ভালোবাসার ভার আমরা নিজেরা কিন্তু নিতে চাই না তবে সেটা হুট করেই আমাদের উপর চলে আসে।আমরা চাইলেও সেই ভালোবাসাটাকে এভোয়েড করতে পারি না।”

নাস্তার টেবিলে বসে শাহ্ খেয়াল করলো আবৃতি কিছুটা অন্যমনস্ক। মায়ের উপস্থিতির কারণে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলো না।নাস্তা শেষ হতেই দেখতে পেল হাসপাতাল থেকে লোক এসেছে আবৃতিকে ইনজেকশন দিতে।শেষ হলে শাহরিয়ার বেরিয়ে গেল ক্লাসের উদ্দেশ্যে। আজ পুরো দিন তার ব্যস্ত সিডিউল।পর পর চারটে ক্লাস এবং মিটিং রয়েছে।
তৃতীয় বর্ষের ক্লাসে প্রবেশ করে ভ্রু-কুঁচকে গেল তার। আবৃতি বসে আছে ক্লাসে।ভীষণ ভীষণ রাগ হচ্ছিলো।এই শরীর খারাপ নিয়ে ক্লাসে আসার অনুমতি তাকে কে দিয়েছে?কিন্তু এতদ্রুত সে এলো কীভাবে?কলেজ বাসে তো আসেনি।পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সে খেয়াল করলো আবৃতিকে।ক্লাস শেষ হতেই পিয়ন এসে জানালো শাহরিয়ার স্যার ডেকেছে আবৃতিকে।ক্লাসের অধিকাংশ জন ভাবলো আবৃতি পর পর চার দিন ক্লাস মিস করেছে বলে স্যার ডেকেছে। কেউ এতোটা পাত্তা দিলো না। টিচার্সরুমটা একটু অন্য রকম। ডিপার্টমেন্ট হেডের রুম সবার সাইডে এরপর সারি করে প্রতিটা লেকচারার এবং প্রফেসরদের নিজস্ব রুম।দরজায় নক করে ভিতরে প্রবেশ করলো আবৃতি।শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে ছিল দরজার সামনেই।হাত ধরে তাকে টেনে দাঁড় করালো চেয়ারের সামনে। দরজা লক করে দিয়ে চেয়ারে বসলো।আবৃতি তখনো দাঁড়িয়ে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাহরিয়ার তাকে কাছে টেনে নিয়ে দু হাতে হাত জড়িয়ে বলল,

“আমার কেন এত ভয় করছে মাই হাইনেস?কেন মনে হচ্ছে ভীষণ বাজে কিছু একটা হয়েছে আমাদের মাঝে যেটা আমি জানি না।আমার কেন ভয় হচ্ছে তৃতীয় কেউ একজন এসে পড়েছে আমি তোমাকে ভালোবাসি বলার পূর্বেই?”

চলবে( এডিট ছাড়া।প্রচন্ড অসুস্থতা নিয়েই লিখছি।চোখের অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছে।যারা পড়ছেন তারা রেসপন্স করবেন।)

#ছবিয়ালঃবিডিছবিঘর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here