কৃষ্ণবতীর মায়ায় পর্ব -শেষ

#কৃষ্ণবতীর_মায়ায়
#পর্ব_৭
#লেখিকা_সাদিয়া_জান্নাত_সর্মি

তোমার বাবা তোমার মাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো কিন্তু বিয়ের কিছু দিন পর ভালোবাসা নির্যাতনে রুপ নেয়। সবসময় তোমার বাবা তোমার মাকে মারধর করতো, বিয়ের দুই বছর পর যখন তোমার জন্ম হয় তখন তোমার বাবা তোমার মায়ের সাথে একটু একটু ভালো ব্যবহার করে কারণ তুমি ছিলে তোমার বাবার চোখের মণি। তোমার একটু কান্নাও তোমার বাবার সহ্য হতো না, তুমি যখনি একটু কাঁদতে তোমার বাবা কোনো কিছু না জেনেই তোমার মাকে মারতো।যখন তোমার তিন বছর বয়স তখন একদিন তোমার বাবার ব্যবসায় প্রচুর লস হয়, সেই রাগ তিনি তোমার মায়ের উপর ঝারেন, এতো পরিমাণে মারধর করে যে তাকে সেদিনই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। আমি সেদিন তোমাদের বাসায় গিয়েছিলাম তোমাকে দেখতে, বাসায় ঢুকার সময় দেখি তোমার বাবা তোমার মাকে মারছে তখন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তার একটা ছবি তুলি আর এটাই সেই ছবি।জানো সেই যে তোমার মা কে একবার ওই বাসা থেকে বের করে হসপিটালে নেওয়া হয়েছিল তার পর আর বাসায় ফেরার ভাগ্য হয়নি তার। হসপিটালে ভর্তি করার দুই ঘন্টার মধ্যে মারা যায় সে। তোমার মা মারা যাওয়ার পর তোমার বাবা সবাই কে বলে যে তোমার মা অসুস্থতার কারণে মারা গেছে। কিন্তু আমি তো জানতাম সব কিছু তাই একদিন তোমার বাবাকে একটা নিরালা জায়গায় ডেকে নিয়ে বলি সে তোমার মাকে যেই অত্যাচার করেছে তার জন্য আমি ওকে পুলিশে ধরিয়ে দেবো আর তার জন্য প্রমান আছে আমার কাছে। কিন্তু তোমার বাবা উল্টো মিথ্যে মামলায় আমাকেই ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়, আমি ওর হুমকি তে ভয় না পেয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম, গিয়ে শুনি তোমার বাবা আমার নামে ফ্রট কাজ করার জন্য কেস করেছে যে টা সম্পূর্ণ মিথ্যা। গিয়েছিলাম একটা অপরাধিকে শাস্তি দিতে কিন্তু আমি নিজেই মিথ্যে মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেল খাটি পুরো আঠারো টা বছর। তোমার বাবার একটা মিথ্যা মামলার জন্য তোমার ফুপির আর আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যায়,আর তোমার বাবা তোমার সামনে ভালো মানুষ সেজে ঘুরে বেড়ায়।
নীর ফুপার কথা গুলো শুনে মাটিতে বসে পড়লো, দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই তার।যে বাবা কে সে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে সেই বাবা কি না তার মায়ের খুনি এই কথা টা মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। কাঁদতে লাগলো সে,সলিম আহমেদ নীরের পাশে বসে তার মাথায় হাত রেখে বললেন, তোমার বাবা যা করেছে তার জন্য কি তুমি চাওনা যে সে শাস্তি পাক।নীর চোখ মুছে নিয়ে শক্ত গলায় বললো হ্যা চাই।যার জন্য আমি আমার মাকে হারিয়েছি, মায়ের আদর কি বুঝতে পারি নি আমি অবশ্যই চাইবো তার শাস্তি হোক। তসলিম আহমেদ একটু চুপ থেকে বললেন,নীর একটা কথা বলবো আমার উপর রাগ করবে না তো?
নীর জিজ্ঞেস করল, কি কথা ফুপা? বলো রাগ করবো না আমি ‌।
তসলিম আহমেদ কিছুটা আমতা আমতা করে বললেন, আসলে নীর তোমার আর আয়ানের মধ্যে যা কিছু হয়েছে তার সবকিছুই আমার ইচ্ছেমত হয়েছে।
নীর অবাক হয়ে বললো, মানে?
তসলিম আহমেদ নীর কে আয়ানের সাথে আর আমিন চৌধুরীর যা যা কথা হয়েছে সবকিছু বলে তার পর বললেন, কিন্তু আমি যা করেছি তা তোমার বাবাকে মানসিক শাস্তি দেওয়ার জন্য করেছি আর বাস্তবিকে তোমাদের ডির্ভোস হয় নি ওটা জাল পেপার ছিলো।
নীর হা করে তাকিয়ে রইলো,নীরের ওভাবে তাকিয়ে থাকা দেখে তসলিম আহমেদ একটু হেসে বললেন, তুমি হয়তো এমন টা আশা করনি তাই না মামনি?
নীর মাথা নাড়ল শুধু, তসলিম আহমেদ বললেন,,
আমি শুধু শুধু আমার মামনি টা কে কষ্ট দিবো কেন? আয়ান নিজেও জানে না যে ওটা একটা জাল পেপার ছিলো। পরক্ষনেই বললেন মামনি তুমি তোমার শ্বশুর বাড়ির মানুষদের সাথে দেখা করবে?
নীর বললো, শ্বশুর বাড়ির লোকজন মানে? তুমি তো এইমাত্র বললে তুমি না কি ওদের মেরে ফেলেছো।
তসলিম আহমেদ হাসলেন, আমি সত্যি সত্যি ওদের মারিনি, আমি তো শুধু তোমার বাবা কে এমনিতেই বলেছি।চলো ওদের সাথে দেখা করিয়ে দেই।
তসলিম আহমেদ নীর কে নিয়ে একটা রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।নীর ভিতরে ঢুকে দেখল দুজন মহিলা আর একজন পুরুষ মানুষ বসে আছে, ওদের মধ্যে একজন মাঝবয়স্ক মহিলা আর আরেক জন ওর বয়সী। পুরুষ মানুষ টা ওর বাবার বয়সী বলে মনে হচ্ছে, তসলিম আহমেদ নীর কে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। নীর শশুর শাশুড়ির পা ছুঁয়ে সালাম করলো।পাশ থেকে মেয়ে টা বললো, তুমিই তাহলে নীর, আমার আয়ান তোমাকেই বিয়ে করেছে।নীর মেয়েটার কথা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,, তোমার আয়ান মানে? তখন মেয়েটা বললো, আমি আয়ানের হবু বউ মাইশা। তোমার এই বদমাইশ ফুপার জন্য আমার আর আয়ানের বিয়ে টা হলো না।
নীর ওর কথা শুনে চুপ করে রইলো। মাইশা নীর কে চুপ করে থাকতে দেখে মুচকি হেসে বলল, চিন্তা করোনা আমি আয়ান আর তোমার মাঝে আসবো না। আমি তো আর ওকে বিয়ে করি নাই সেইজন্য বেঁচে গেছো না হলে আয়ান কে কেড়ে নিয়ে নিতাম।
নীর ওর দিকে তাকিয়ে রইল কিছু বললো না। তসলিম আহমেদ নীর কে বাইরে আসতে বলে তিনি বাইরে চলে এলেন।নীর বাইরে আসার পর তসলিম আহমেদ নীর কে বললেন, তোমার বাবা কে তুমি পুলিশের হাতে তুলে দিতে চাও নাকি মানসিক শাস্তি দিতে চাও। আমার মনে হয় তোমার বাবা কে মানসিক শাস্তি দেওয়াটাই সবচেয়ে ভালো হবে, পুলিশের হাতে তুলে দিলে পুলিশ মারবে,জেলে ঢুকিয়ে রাখবে তারপর শাস্তি শেষ হয়ে গেলে ছেড়ে দেবে। তোমার বাবা কিন্তু এতটুকুও অনুতপ্ত হবে না তার কর্মকাণ্ডের জন্য। তার চেয়ে বরং তুমি যদি,,
নীর তসলিম আহমেদের কথা শেষ হওয়ার আগেই বললো, আমি আমার বাবার সাথে সমস্ত সম্পর্ক শেষ করে দেবো, একটা খুনি কে আমি আমার বাবা হিসেবে মানতে পারবো না। উনি আমাকে যতই ভালোবাসেন না কেন উনি আমার থেকে আমার মাকে কেড়ে নিয়েছেন তাই আমি ওনাকে ক্ষমা করতে পারবোনা।

________________________________________

কয়েকটি মাস কেটে গেছে। আমিন চৌধুরী এখন সম্পূর্ণ একা মানুষ, কলিজার টুকরা মেয়েটা তাকে বাবা বলে ডাকতে অস্বীকার করেছে। আঠারো বছর আগে করা ভুলের শাস্তি শেষ বয়সে এসে পাচ্ছেন তিনি। অনুতপ্ত এখন তিনি তার কাজের জন্য কিন্তু এখন আর কিছুই করার নেই তার।স্ত্রীর কবরের কাছে গিয়ে ক্ষমা চান এখন।
আর নীর এখন আয়ানের সাথে খুব ভালোই আছে। আয়ান নিজের পায়ে হাঁটতে না পারলেও নিজেকে নিয়ে খুব খুশি সে।নীর কে তার হারাতে হয় নি, এই কয়েক মাসে সে নীর কে খুব ভালবেসে ফেলেছে, খুব বেশি।কৃষ্ণবতীর মায়ায় এমন ভাবে জড়িয়ে গেছে সে এখন কৃষ্ণবতীকে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেনা।মাইশার বিয়ে হয়েছে ইয়াদের সাথে, সবাই সবার জীবন নিয়ে খুশি এখন শুধু আমিন চৌধুরী ছাড়া। নিজের অতীত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে,প্রতি মুহূর্তে নিজের পাপের শাস্তি পাচ্ছেন তিনি,পেয়েও যাবেন পরবর্তী জীবনে।

সমাপ্ত………

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here