কোন কাননে ফুটিবে ফুল পর্ব -০৭

#কোন_কাননে_ফুটিবে_ফুল🌸
#Part_07
#Writer_NOVA

পরদিন বিকেলে শুভ একটা বিড়ালের বাচ্চা হাতে নিয়ে বাসায় এলো। তা দেখে বাড়ির সবার কপাল কুঁচকে গেলো। যে ছেলে পশু-পখীর সামনে যায় না, সে বিড়াল বাচ্চা নিয়ে ফিরেছে। বিষয়টা আসলেই আশ্চর্য জনক৷ শুধু তাই নয় বিড়ালের বাচ্চার নামও রেখেছে। পুষি! নাম শুনে ঝুমুর, ফুল তো হাসতে হাসতে পারলে মাটিতে গড়াগড়ি খায়। পুষির গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে শুভ বিরক্তিতে দুজনের দিকে তাকালো। ফুল সেদিকে গর্জ করলো না। হাসতে হাসতে বললো,

‘শুভ ভাই বিড়ালটা একদম তোমার মতো দেখতে।তোমার বাচ্চা নাকি?’

শুভ দাঁত কটমট করে তাকাতেই আরেকদফা হাসির বন্যা বয়ে গেলো। ফুল দমলো না। শুভকে পচানোর জন্য জিজ্ঞেস করলো,

‘এটা ছেলে নাকি মেয়ে গো?’

‘মাইয়া।’

‘তুমি বুঝলে কি করে এটা মেয়ে?’

‘হ্যান্ডসাম পোলা দেখলে মাইয়ারাই হুমড়ি খাইয়া পরে। পোলারা না।’

‘তুমি কোন দিক দিয়ে হ্যান্ডসাম?’

‘সব দিক দিয়া।’

ভাব নিয়ে বললো শুভ৷ ফুল মুখ ভেংচালো। ঝুমুর ঠোঁট চেপে হাসতে ব্যস্ত। মেয়েটা কথা বলার থেকে অন্যের কথায় হাসতে বেশ পটু।

‘এদের উপযুক্ত বয়স না হলে বোঝা যায় না এরা ছেলে নাকি মেয়ে।’

শুভ ফুলের কথায় চোখ সরু করে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

‘উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগে তোরে কেমনে বুঝলো যে তুই মাইয়া?’

শুভর কথার ইঙ্গিত কোনদিকে ছিলো তা বুঝতে পেরে ফুল চোখ বড় বড় করে দাঁত কিড়মিড় করে চেচিয়ে উঠলো,

‘শুভ ভাই!’

শুভ আবার হো হো করে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো। হাতে থাকা পুষির পশমে হাত বুলাতে বুলাতে চোখ নাচালো। ফুল রাগে ডান পায়ে মেঝেতে ধপ করে পা ফেলে হাত দুটোকে মুঠ করে নিলো। শুভ, ফুলের কোন কর্মকাণ্ড বুঝতে না পেরে ঝুমুর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।

মিলন মানুষটা অনেক ধুরান্দাজ। নিজের স্বার্থের জন্য ক্ষণে ক্ষণে রং বদল করতে পারে৷ বাহির থেকে তাকে যতটা সহজ-সরল দেখা যায় ভেতরে ততটাই কুটিল স্বভাবের। বর্তমানে তার উদ্দেশ্য শ্বশুরের থাকা চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসা। কল্লোলপুর ইউনিয়নের অধীনে মিলনের গ্রাম আছে। তাই সে চাইছে নিজেদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হতে।

নির্বাচনের দুই বছর বাকি আছে। কিন্তু সে এখন থেকে তার কার্যক্রম শুরু করতে চাইছে। শ্বশুরের সাথে টক্কর দেওয়ার ইচ্ছে নাই। তাহলে বিপুল ভোটে হেরে যাবে। তাই চিন্তাভাবনা করছে ছলেবলে কৌশলে শ্বশুরকে রাজী করাতে। যাতে পরবর্তীতে আনোয়ার সর্দার চেয়ারম্যানীতে নিজে না দাড়িয়ে মিলনকে দাঁড় করায়। এর জন্য ঘনঘন শ্বশুর বাড়ি যাতায়াত তার। আজও এসেছে সকাল সকাল। বেতের মোড়ায় বসে শাশুড়ীকে জিজ্ঞেস করলো,

‘আম্মা, আব্বা কি বাড়িত না?’

‘তোমার শ্বশুরে কি এই সময়ে বাড়িতে থাকে?’

‘হুম তাও ঠিক।’

‘শালাবাবু কই?’

‘হেরে কি বাড়িতে পাওন যায়? নবাব বেটার কত কাম। বটবটি কিইনা দিছি। হেইডা নিয়া কই ঘুরে কে জানে।’

শালা বাসায় নেই শুনে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো মিলন। ছোট শালাটাকে তার ভীষণ ভয় করে। রগচটা স্বভাবের ছেলেটা যে কাউকে ভয় পায় না।শালা, দুলাভাই এর সম্পর্ক ভালো না। মিলনের ধূর্ত স্বভাব বহু আগেই ধরে ফেলেছে শুভ। যার কারণে মিলন একটু অস্বস্তি ও ভয়ের মধ্যে আছে। বাপ-বেটার সম্পর্ক ভালো না হলেও শুভ চেয়ারম্যানের পরোক্ষ হাতিয়ার। প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে শুভ ত্রাসের নাম। চেয়ারম্যান সাহেবের ক্ষতি করতে চাইলেও মানুষ দুইবার ভাবে৷ যার একমাত্র কারণ শুভ। সামনাসামনি না হলেও পেছন থেকে সাহায্য করে বাবাকে। সেবার নির্বাচন অফিসে এক ছেলে জাল ভোট দেওয়ায় সবার সামনে শুভ ছেলেটাকে সেকি মার। তা দেখে পিলে চমকে গিয়েছিলো উপস্থিত সবার। সেই কথা মনে হতেই দরদর করে ঘেমে উঠলো মিলন। তা দেখে সোহেলী বেগম বললেন,

‘ঘরে গিয়া বহো বাজান। এইহানে তোমার গরম লাগতাছে৷ কেমন ঘামতাছো দেহি।’

‘না, আম্মা! সমস্যা নাই। হেনেই ঠিক আছি।’

দুপুরের পর বাড়িতে ফিরলো শুভ। সোহেলী বেগম তখন হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে মিলনকে জামাই আদর করতে ব্যস্ত।পাশেই সুফিয়া বিবি বেতের মোড়ায় বসে পান সাজাচ্ছিলেন। সাথে নাত জামাইয়ের সাথে এটা সেটা নিয়ে কথা বলছে। শুভ সিঁড়িতে পা ফেলার আগে কথার শব্দ পেয়ে খাবারের কামরায় গেলো। শুভকে দেখে মিলন ম্লান হেসে জিজ্ঞেস করলো,

‘কেমন আছো শালাবাবু?’

শুভ উত্তর দিলো না। শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। যে দৃষ্টিতে মিলনের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। মনে মনে প্রহর গুণতে লাগলো কখন শুভ এখান থেকে বিদায় হবে।

‘ফুল কই মা?’

‘ঐ ছেমরির খবর আমি কইতে পারি না।’

মুখ তেঁতো করে বললো সোহেলী বেগম। মায়ের কথায় শুভর ভাবান্তর হলো না। সুফিয়া বিবি নাতীর দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বললো,

‘কি জাদু করছে ঐ মাইয়া? বাড়িত আইয়াই ওর নাম আগে জপস। বাড়িত কি আর কেউ নাই রে?’

‘কি জাদু করছে তা তোমার জাইনা কাম নাই।’

‘আমার নাই তো কার আছে?’

শুভ উত্তর দিলো না। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ফুলকে ডাকলো। মিনিট খানিকের মধ্যে আলাদীনের দৈত্যের মতো ফুল হাজির। সে যে হন্তদন্ত করে দৌড়ে এসেছে তা হাঁপানো ভঙ্গি দেখে বোঝা গেলো।

‘কিছু বলবে শুভ ভাই।’

সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
‘কিছু কইতেই ডাকছি।’

‘বলো।’

‘কলের থিকা এক মগ ঠান্ডা পানি নিয়া আমার ঘরে আয়। এক মিনিট যেন দেরী না হয়।’

ফুল মাথা নাড়ালো। মিটসেফ থেকে একটা স্টিলের মগ নিয়ে ছুট লাগালো কলপাড়ের দিকে। সোহেলী বেগম তেতে উঠলেন,

‘বোন জামাই আইছে তারে ভালোমন্দ কিছু জিগাইলো না। হেয় জিগাইলো তারও উত্তর দিলো না। আইয়াই নবাবজাদিরে নিয়া পরলো।’

‘আমি এসব জিগানের দরকার মনে করি না।’

সুফিয়া বেগম এক দলা পানের পিক দূরে ফেলে উত্তর দিলেন।

‘দরকার মনে করোস না মানে কি? আমরা কি তোগো এই শিক্ষা দিছি?

শুভ ক্ষীণ শ্বাস ছেড়ে বললো,
‘কেমনে একই পরিবারের দুই সদস্যের লগে বৈষম্য করােন যায় হেই শিক্ষা দিছো।’

শুভ দাঁড়ালো না। দ্রুত সেখান থেকে কেটে পরলো। সোহেলী বেগম মিলনের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘দেখছো কান্ডকারখানা? এমনই করে। একটা কথাও ছাড়বো না। এই মাইয়া আমার পোলাডা খারাপ করলো।’

মিলনের বলতে ইচ্ছে করছিলো আপনার ছেলে ভালো ছিলো কোন জন্মে? কিন্তু মুখের কথা মুখে রেখেই হজম করে নিলো সবটা।

সন্ধ্যার পর চায়ের কাপ হাতে শুভর দরজায় কড়া নাড়লো ফুল। দুপুরের পর থেকে বাসায় আছে সে। বিকেলে পুষির সাথে খেলেছে। অল্প সময় বিড়াল ছানাটার সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছে শুভর। পশু-পাখি বুঝতে পারে তাদের কে ভালোবাসে, কে ঘৃণা করে। ভালোবাসার বিনিময়টা মানুষের থেকে পশু-পাখি ভালো দিতে জানে।

‘তোমার চা।’

‘টেবিলের ওপরে রাখ।’

‘আর কিছু লাগবে?’

‘না!’

‘সত্যি তো? একটু পর আবার চিৎকার করে বলবে না তো কইতরির মা এটা দিয়ে যা, ঐটা কই রাখছিস।’

‘বাহ! আমারে দেহি ভালোই চিইনা গেছিস।’

‘সেই কবে চিনেছি।’

শুভ মুচকি হাসলো। বিছানার এক পাশে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে পুষি। এই নবাবজাদারা ছয় বছর বাচলে চার বছরেই ঘুমিয়ে কাটায়। বিড়াল ভীষণ ঘুম প্রিয়। শুভ এক নজর সেদিকে তাকিয়ে ফুলের দিকে নজর দিলো। ফুল ঠোঁট কামড়ে শুভর মতিগতি বুঝতে চাইছে। শুভ নজর সরিয়ে নিলো।

‘এহনো দাঁড়ায় রইছোত কেন?’

‘তোমাকে বলতে হবে?’

ফুলের ত্যাড়া উত্তরে অসন্তুষ্ট চাহনি দিলো শুভ। তা দেখে ফুল মুখ চেপে হেসে উঠলো। নারীকে বেশি সুন্দর লাগে যখন সে হাসি চেপে রাখে। শুভর কাছে ফুলকে অপরূপ সুন্দরী মনে হচ্ছে। যেনো আধ ঘোমটা টেনে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কোন ফুলপরী। আজকাল ফুলের আশেপাশে থাকলে শুভর কেমন জানি অস্থির অস্থির লাগে। আগে যে লাগতো না বিষয়টা তা নয়। আগেও লাগলেও পাত্তা দিতো না। কিন্তু এখন বিষয়টা শুভকে ভাবায়।

‘এভাবে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছো কেনো?’

‘আমার বইয়াই গেছে তোর দিকে তাকায় থাকতে।’

‘তোমার লক্ষ্মণ ভালো মনে হচ্ছে না।’

শুভ ভ্রু যুগল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
‘কেন?’

‘দেখো শুভ ভাই আমরা মেয়েরা বুঝতে পারি, আমাদের দিকে কোন ছেলে কিভাবে তাকায়।’

সামনে আসা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে ভাব নিয়ে বললো ফুল। শুভ হাই তুলে বললো,

‘বাজারের রফিক পাগলারেও দেহি তোর দিকে হা করে তাকায় থাকতে। তাইলে কি ও তোরে পছন্দ করে?’

শুভর কথায় ফুলের কান গরম হয়ে গেলো। চোখ পাকিয়ে চেচিয়ে উঠলো,

‘অশুভ!’

#চলবে

আজ কিন্তু আমার শুভ ভাইয়ের জন্মদিন😇। আরেকটা কথা আগামীকাল গল্প দিবো না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here