চারুলতা পর্ব ২

#চারুলতা
#শারমিন আঁচল নিপা
#পর্ব-২

কারণ সামনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়া দেখতে পারলেও শরীর দৃশ্যমান না। ভাবতে লাগলাম মামা নয় তো? ভাবতেই ভয়টা বেড়ে গেল। একে তো নগ্ন শরীর তার উপর অন্ধকারটায় বুঝা যাচ্ছে না কী হচ্ছে। আমি ভয়ে ভয়ে ঢুক গিলতে লাগলাম। এমন সময় একটা উড়না আমার দিকে কেউ ছুড়ে দিয়েছে লক্ষ্য করলাম। উড়না বললেও ভুল হবে বড়োসড় একটা চাদর বলা চলে। আমি চাদরটা কোনোরকম গায়ে জড়িয়ে নিলাম। তীক্ষ্ণ একটা কণ্ঠ এসে কানে বাজলো আমার। কণ্ঠটা আমাকেই উদ্দেশ্য করে বলল

– চারুলতা সামনের দিকে এগিয়ে যাও। একদম পিছু ফিরবে না। পিছু ফিরলে তোমারেই বিপদ। কেউ তোমাকে ডাকলেও পিছু ফিরবে না এমনকি আমি ডাকলেও না। নাহয় এ মায়া বলয় থেকে কখনও বের হতে পারবে না। আর তোমার মামার ভোগের শিকার হবে।

আমি ভয় পেতে লাগলাম। সামনের দিকে তাকাতেই তেমন কারও উপর নজর পড়ল না। অদৃশ্য গায়েবী আওয়াজ কোথায় থেকে আসছে বুঝতে পারছি না। শরীরটা কাঁপতেছে থরথর করে। নতুন করে কোনো বিপদে পতিত হব না তো! শত চিন্তার ডানা বেঁধেছে আমার ভেতর। এর মধ্যেই পুনরায় আওয়াজটা আমার কানে আসলো

– তুমি নিশ্চয় আমাকে বিশ্বাস করতে পারতেছো না। আমি তোমার সামনে দৃশ্যমান কেউ না। তবে আমি তোমার ক্ষতি চাই না। তুমি আমাকে বিশ্বাস না করতে পারলে আপাতত দূরের ঐ নারিকেল গাছটার পেছনে লুকিয়ে থাকো। একটু পরেই বুঝতে পারবে আমি তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী নাকি ক্ষতিকারক কেউ।

এবারও আমি দ্বিধায় রয়েছি। দৌঁড় দিব নাকি নারিকেল গাছটার পেছন দিকটায় যাব সে চিন্তায় মগ্ন। কণ্ঠ স্বরটা পুনরায় বলল

– হাতে সময় বেশি নেই তুমি যাও নারিকেল গাছটার পেছনে এখনই, না হয় এরিক চলে আসবে। আর এরিক আসলে তোমাকে এখানে পেলে আবার তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখবে। কারণ তুমি ব্যতীত সে অসীম শক্তি হাসিল করতে পারবে না। তার শক্তি হাসিলের জন্য তোমাকে প্রয়োজন।

আমি নিজেকে সামলে প্রশ্ন করলাম

– কে তুমি? আর এই এরিকটা কে?

– এরিক হলো তোমার মামা। পিশাচ রাজ্যে সে আজকে এরিক নামে পরিচিত হবে। গতকাল তোমাদের বিয়ে হওয়ায় সে বর পেয়েছে পিশাচ দেবীর কাছ থেকে। এরিক এখানে এসে সামনের কন্টকময় ফলের গাছের নীচে বলি দিবে নবজাতক শিশু এবং ১৬ বছর বয়সী তরুণী। এরিক এখনও টের পায়নি তুমি পালাচ্ছ, টের পেলে তোমারেই ক্ষতি। তুমি দ্রূত যাও নারিকেল গাছটার পেছনে। একমাত্র সে গাছটার পেছনে এরিকের কোনো শক্তি কাজ করবে না। কারণ গাছটার নীচে পুতে রাখা আছে একটি শুভ শক্তির আধার।

এবার কেন জানি না ধেয়ে আসা কণ্ঠস্বরটাকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে। আমি চাদরটা ভালোভাবে জড়িয়ে নিলাম। চাদরটা ভালো করে জড়াতেই চাদরটা এক সজ্জিত পোশাক হয়ে গেল। মনে হচ্ছে মোগল আমলের কোনো রাণীর কারুকাজখচিত পোশাক আমি পরে আছি। আমার বিস্ময় বাড়তে লাগল। বিস্ময়ের রেশ বেশিদূর না নিয়ে নারিকেল গাছটার পেছনে চলে গেলাম দ্রূত।

নারিকেল গাছটার নীচে যেতেই একটা কাঁপুনি অনুভব করলাম। চোখটা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল। পরক্ষণেই চোখ খুললাম। মামা কন্টকময় গাছটার নীচে এসেছে। মামার একহাতে নবজাতক এক শিশু উল্টা করে ধরে রাখা অপর হাতে এক তরুণীর হাত ধরে রাখা। শিশুটা মৃত কিনা বুঝা যাচ্ছে না। আমি চুপ হয়ে বসে রইলাম। ভয়ংকর কিছুর সম্মুখীন হতে যাচ্ছি সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছি।

মামা নবজাতক শিশুটাকে কাপড় কাচার মতো আচড়ে ফেলল একটা পাথর খন্ডের উপর। সাথে সাথে শিশুটির মাথাটা ফেটে মগজ আলাদা হয়ে গেল। আমার কলিজা কাঁপতে লাগল। এত ভয়ংকর মৃত্যু আমি এর আগে কখনও দেখিনি। মামা এবার মগজটাকে একটা পাত্রে নিয়ে সে শিশুকে ধরে গড়িয়ে পড়া রক্তটা পাত্রের মধ্যে দিয়ে পূর্ণ করলো। পাত্রটাকে এক পাশে রেখে দিল। এবার তরুণী মেয়েটাকে শোয়াল। মেয়েটা বেসামাল হয়ে আছে। শুধু গুংগাং করে শব্দ করছে। মেয়েটাকে শুইয়ে দিয়ে প্রথমে গলাটা আলাদা করে দিল ধারাল ছুরি দিয়ে। তারপর মেয়েটার স্তন দুটো কেটে অন্য আরেকটা পাত্রে রাখল। মেয়েটাকে এবার পুড়িয়ে দিল। মেয়েটার শরীর থেকে জ্বলে উঠা আগুনের উপর পাত্র দুটো রাখল। পাত্র দুটোতে রক্ত টগবগ করে ফুটছে। আর মামা হালকা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল

– হে পিশাচ দেবী আমি তোমার তরে উৎসর্গ করলাম। আমি এদের সবচেয়ে করুণ এবং জঘন্য উপায়ে খুন করেছি। তোমার দেওয়া প্রতিটা কাজ আমি করেছি। আমাকে শক্তি দাও।

এমন সময় পুনরায় সে কণ্ঠস্বরটা আমার কানে আসলো।

– চারুলতা দ্রূত চলে যাও এখান থেকে। এরিকের ধ্যান ভাঙলেই তুমি ধরা পড়বে। দ্রূত প্রস্থান নাও এ জায়গা থেকে। পিশাচ দেবী এখানে আসলে আরও বিপদে পড়বে। আমার কথা শুনো। আমি তোমার ক্ষতি চাই না। বরং আমি তোমার ভালো চাই। আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। একমাত্র তোমাকে দিয়েই এরিকের ধ্বংস সম্ভব। অন্যথায় এরিক একবার যদি এ শক্তির মালিক হয়ে যায় তাহলে সব তছনছ হয়ে যাবে। এরিকের হাত থেকে রক্ষা পাবে না কোনো কুমারী নারী কোনো নবজাত শিশু। দয়াকরে তুমি প্রস্থান নাও। মনে রেখো আমি এরপর তোমাকে কিছুই বলার সুযোগ পাব না কারণ এ চার দেয়ালের বাইরে আমার কণ্ঠস্বর তোমার কাছে পৌঁছাবে না। তবে তোমার চিন্তা ভাবনায় আমি বিরাজমান থাকব। তোমার জীবনে বড়ো একটা পরিবর্তন ঘটবে আর সে পরিবর্তন দ্বারায় এরিকের বিনাশ হবে। তুমি এবার যাও। আর মনে রাখবে যত ঝামেলা আর দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হবে ঘাবড়ে না গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় কাজ করবে।

আমি ভাবার আর সুযোগ পেলাম না। দ্রূত দৌঁড় লাগালাম। পেছন থেকে অনেক ডাক ধেয়ে আসছে কানে আমি সেটাকে এড়িয়ে গিয়ে দৌঁড়াতে লাগলাম। বাগান পেরিয়ে দেয়াল টপকে বাইরের দিকে আসলাম। কোথায় থেকে কোন দিকে দৌঁড়ে যাচ্ছি জানি না। শুধু মনে হচ্ছে আমাকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এ পথের শেষ অধ্যায়টা খুঁজে বের করতে হবে। মামাকে বিনাশ করার উপায় বের করতে হবে।

দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেলাম। জঙ্গলে ঢুকার আগে লক্ষ্য করেছিলাম সূর্য টা বেশ আলোকিত হয়ে উঠেছিল। তবে জঙ্গলে ঢুকার পর সব পুনরায় অন্ধকার হয়ে গেল। এ গ্রামে এমন গহীন জঙ্গলের বর্ণণা কারও মুখে শুনিনি। এ দিনের বেলাতেও জঙ্গলটা রাতের মতো অন্ধকারে ছেয়ে আছে। আমার শরীর কাঁপছে। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে অসাড় হয়ে যাচ্ছি আমি। একটা পর্যায়ে গাছের গোড়ার সাথে আটকে থুবরে পড়লাম। বেশ ব্যথা লাগছে। বুঝতে পারছিলাম এ জায়গাটা বেশ নিরাপদ আমার জন্য। মামার ভয় অন্তত এ জায়গায় নেই। এখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে বাকি পথ হাঁটতে হবে। জানি না গন্তব্য কোথায় তবে আমাকে সে গন্তব্যের সন্ধান যে মিলাতেই হবে।

গাছের গোড়াটায় মাথাটা এলিয়ে চোখটা বন্ধ করে রইলাম। এমন সময় প্রকান্ড আওয়াজ আসলো কানে। কোনো হিংস্র প্রাণীর না বরং এক নারীর কণ্ঠ। আমি ভয়ে চুপসে গেলাম। তাহলে কী মামা বুঝে ফেলেছে আমি এখানে? আর সে কী এখানে কাউকে বলি দিতে নিয়ে এসেছে। আমার বুকটা থরথর করে কাঁপছে। আরও বেশি কাঁপতে শুরু করল যখন কোনো হাত এসে আমার মুখ চেপে ধরল। তারপর

কপি করা নিষেধ

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here