চেকমেট পর্ব ১১+১২

#চেকমেট
#পর্ব-১১
প্রতিদিনের মতো সৌরভ খাওয়া শেষ করে কফি হাতে স্টাডিতে বসলো। এই কেসের কোনো কুল কিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ একটার পর একটা দিন চলেই যাচ্ছে। মিডিয়ার লোকজন নিত্য নতুন কাহিনী করছে। প্রতিটি নিউজের শেষে একটা কথাই বলা হয় পুলিশ এখনো জোড়া মার্ডার কেসের কিনারা করতে পারে নি। অথচ পুলিশ যে দিন রাত এক করে ফেলছে সেটা কেউ দেখছেও না। উপর মহল থেকেও চাপ আসছে একের পর এক। সৌরভ হাল ছাড়ে নি। সে প্রতিটি ঘটনাই খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। ও জানে যে অপরাধী কিছু একটা ক্লু নিশ্চয়ই ভুল করে ফেলে রেখেছে কিংবা এখন ভুল করে ফেলবে। কারণ পারফেক্ট ক্রাইম বলে আসলে কিছু হয় না। অপরাধী একদিন না একদিন ধরা পড়েই যায়। সৌরভ তাই চেষ্টা করছে ছোট ছোট সব ব্যাপারগুলো খতিয়ে দেখতে।

সৌরভ ফোন হাতে নিয়ে লাবণীকে ফোন করলো। দুবার রিং হতেই লাবণী ফোন ধরলো। ফোন ধরে বলল,

“হ্যাঁ ভাইয়া বলো। ”

“লাবু কাল তুমি আরও একবার ওই বাসাতে যাবে। আর এটাই লাস্ট। ”

“কিন্তু কেন?”

“কেন সেটা তোমাকে সকালে টেক্সট করে জানাব। কিন্তু তুমি নীরা কে গিয়ে বলবে যে তুমি টাকা নিতে এসেছ। যে ক’দিন তুশলকে আঁকা শিখিয়েছ সে কদিনের টাকা চাইবে। ”

“আচ্ছা। কিন্তু তারপর করব টা কী?”

“সেটা আমি তোমাকে পরে বলে দেব। ”

“ভাইয়া আরেকটা কথা। ”

সৌরভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, প্রিয়ন্তির ব্যাপারে কিছু শুনতে চাচ্ছি না লাবু। প্রিয়ন্তি ইজ নট মাই হেডেক। আপাতত আমি এই কেস টা’র ব্যপারে ভাবতে চাই। ”

লাবণী আর কিছু বলল না।

সৌরভ ফোন রেখে নিজের কাজে মন দিলো। সবার স্টেটমেন্টে চোখ বুলাতে লাগলো। সারা যেদিন খুন হয়েছে সেদিন সরকারি ছুটি ছিলো। সবে বরাতের রাতে বিল্ডিং অন্যান্য দিনের চেয়ে নিরিবিলি ছিলো। সবাই ই প্রায় ইবাদাত বন্দেগী তে ব্যস্ত ছিলো। অপরাধী এই সুযোগ টুকু নিয়েছে। খুব ই স্মার্টলি কাজ টা করেছে। যে এই কাজ করেছে সে জানে এই বিল্ডিং এ কখন কী হয়। সিসিটিভি ফুটেজ যে ওই ফ্লোরের নষ্ট সেটা খুব ভালোভাবেই জানে৷ এই কাজ টা নীরার পক্ষে করা সম্ভব না। কারণ সারার বাসায় নীরার প্রবেশাধিকার একদম ই নিষিদ্ধ ছিলো। তাছাড়া নীরা না হলেও সে অন্য কাউকে দিয়ে করাতে পারে। হতে পারে তার মা’কে দিয়ে ব্যাপার টা করিয়েছে।

সৌরভ নিজের মন কে প্রবোধ দিলো। বয়স্ক একজন মহিলা কী এটা করবে! করতে পারে, হয়তো তার এই মেয়ের জন্য অন্য ছেলে, মেয়েদের জীবন পানসে হয়ে যাচ্ছে সেটা মেনে নিতে না পেরে বাধ্য হয়েছে এটা করতে। কিন্তু নীরার সাথে আর কে থাকতে পারে! মাহিনের স্বশরীরে থাকবার কথা নয়। সে বড়জোর বুদ্ধি দিতে পারে কিংবা পুরো প্ল্যান টা তৈরী করতে পারে৷ কিন্তু প্ল্যান এক্সিকিউট করতে আরও লোকের দরকার হয়েছে। কারা সেই লোকজন।

*****

সৌরভের ঘুম ভাঙলো আজ সকাল সকাল। ঘুম থেকে উঠে দেখলো ৬ টা ৪০ বাজে। সৌরভ কিছু সময়ের জন্য দৌড়াতে গেল বাসা সংলগ্ন বড় মাঠের দিকে। ফিরে আসার সময় দোকান থেকে পরোটা, বুটের ডাল, সবজি কিনে নিয়ে এসেছে। আজ ক’দিন ধরে ওর বাসার মেইড আসছে না। তাই বাধ্য হয়ে রেস্টুরেন্টের খাবার দাবার ই পেটে চালান করছে। এতে যে খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে তেমন না। কিন্তু পেটে সইতে একটু বেগ পোহাতে হচ্ছে।

খাওয়া দাওয়া শেষে সৌরভ কড়া লিকারের এক কাপ কফি খেল। খেতে খেতে আজকের রুটিন টা মোটামুটি গুছিয়ে নিলো। প্রথমে থানায় যাবে, সেখান থেকে যাবে সারার ভাইয়ের ওই ভুতুড়ে বাড়িটায়। আর সবশেষে যাবে চাঁদপুর। জাহাঙ্গীর কবিরের দ্বিতীয় পক্ষের ওই স্ত্রীর দেখা করার জন্য। সোজা সাপ্টা সরল মুখের আড়ালে কোনো রহস্য আছে কী না সেটা খুঁজে বের করতে হবে।

****
লাবণীকে দেখে নীরা অবাক হলো না। স্বাভাবিক ভাবেই বলল, তুশল ওই ঘরে আছে আপনি চলে যান।

লাবণী কী বলবে ভেবে পেল না। ও আজ এখানে তুশলের জন্য ই এসেছে। সৌরভ বলে দিয়েছে যে টাকা চাইবার বাহানায় বাড়িতে ঢুকলেও যে করেই হোক একবার তুশলের সাথে যেন দেখা করে। তাই লাবণী মোটামুটি তৈরী হয়ে এসেছিল যে বলবে, শেষ বারের মতো তুশলের সাথে দেখা করবে। কিন্তু এ যেন মেঘ না চাইতেই জলের মতো ব্যাপার হয়ে গেল। নীরা নিজেই বলল, তুশলের সাথে দেখা করবার কথা।

নীরা বিনয়ী গলায় বলল, লাবণী কালকের ব্যবহারের জন্য সরি৷ আসলে আপনাকে হার্ট করে কথা বলা আমার উদ্দেশ্য ছিলো না। তবুও হার্ট করলে সরি।

লাবণী হাসার চেষ্টা করে বলল, ইটস ওকে।

নীরা হেসে বলল, একচুয়েলি আপনি বাসায় এসে যেভাবে পুলিশের চোখে আমাদের দেখেন তাতে আমরা কিছু টা হলেও বিব্র‍তবোধ করি।

লাবণী কিছু বলল না। নীরা আবারও বলল,

“দেখুন আমরা এতোটা বোকা না মার্ডারের মতো সিলি কোনো কাজ করবো। স্পেশালি আমি তো নই ই। পারসোনালি আমি প্রতিটি ব্যাপারেই পজিটিভ থাকি। সেটা আমাকে দেখলেই হয়তো বুঝবেন। এইসব খুন খারাবির দিকে যাওয়ার তাই কোনো প্রশ্ন ই আসে না। আর একটা ব্যাপার তো সত্যি যে মন্দ হোক, ভালো হোক, শী ইজ মাই সিস্টার। ”

লাবণী ঠোঁটে প্লাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে রাখলো। এসব কথা ওকে শোনানোর মানে কী সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না।

নীরা আবারও বলল, আপনি তুশলের সাথে দেখা করুন। ও যদি আপনাকে আগের মতো পছন্দ করে তাহলে এই বাসায় আপনি নিয়মিত আসবেন। আমার পক্ষ থেকে কোনোরকম সমস্যা নেই। বরং বাচ্চাটার ভালো থাকাটাই ফার্স্ট প্রায়োরিটি।

“ওকে। ”

নীরা লাবণী কে ডেকে শ্লেষের সুরে বলল, বাই দ্য ওয়ে তুশল আপনাকে হঠাৎ এত অপছন্দ কেন করছে?

“সেটা তো জানিনা। আমিও ব্যাপার টা’য় অবাক হইছি খুব। ”

“ও কী এমন কিছু দেখেছে যেটা আপনার কাছ থেকে এক্সপেক্ট করেনি?”

“মানে?”

নীরা বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসলো। বলল, মানে টা খুঁজে বের করার কাজ তো আমার নয়। যার কাজ তাকে বলুন। দেখেন সে পারে কী না।

লাবণী এই হেয়ালি বুঝতে পারলো না। তবে বুঝলো যে নীরা কার উদ্দেশ্য কথাটা বলেছে।

*****
সারার ভাই কে আজও বাসায় পাওয়া গেল। সৌরভ কে দেখে আগের দিনের মতো তার ভ্রু কুচকে গেল। সৌরভ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তিন ভাই বোনের আচরনে এতো অমিল!

সৌরভ বলল,

“সাইফ সাহেব আপনার সঙ্গে আবারও একটু আলাপ করতে আসলাম”

ভদ্রলোক বাধ্য হয়ে বলল,

“আসুন।”

সৌরভ আয়েশ করে সোফায় বসতে বসতে বলল, আপনার স্ত্রী বাসায় নেই।

“জি আছে। ”

“তাহলে তাকে বলুন একটু চা কফির ব্যবস্থা করুন। কথা বলতে বলতে গলা ভিজিয়ে নিলাম। ”

ভদ্রলোক উঠে গেল। সৌরভ মিটিমিটি হাসলো। যারা অল্পেই বিরক্ত হয় তাদের বিরক্ত করতে ভালো ই লাগে।
#চেকমেট
পর্ব-১২

ভদ্রলোক ফিরে এলেন। এবার তার চেহারায় বিরক্ত ভাব কম। এসে বললেন,
“চা আসছে। আগেই চায়ের পানি চাপিয়েছিল। ”

“থ্যাংকস সাইফ সাহেব। ”

সাইফ সাহেব থ্যাংকসের উত্তরে মাথা নাড়লো। কিছু বলল না।

সৌরভ কিছু সময় চুপ থেকে বলল, সেদিন তো আপনার সাথে ভালো করে কথাই হলো না তাই আবার আসতে হলো।

সাইফ সাহেব জোর করে একটু হেসে বলল, কিন্তু আমার তো নতুন করে কিছু বলার নাই। আমি সেদিন যা বলছি আজও তাই বলব। তারচেয়ে বেশী কম বলব না।

সৌরভ হেসে বলল, আপনি আমাকে তাড়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মনে হচ্ছে!

“না না। আপনি থাকুন। চা, নাস্তা খান তাতে আমার আপত্তি নাই। আমার সব আপত্তি ওই সারার ব্যপারেই।”

“বেশ তো তাহলে সারা তাবাসসুম প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আপনার সাথে কথা বলি। ”

সাইফ সাহেব এবার নড়েচড়ে বসলেন। সারা বাদে আর কোন ব্যাপারে কথা থাকতে পারে সেটা মনে মনে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলো।

সৌরভ বলল, আপনার ছোট বোন নীরার ব্যপারে কিছু বলুন।

সাইফ সাহেবের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। বলল, নীরার ব্যাপারে কী বলব?

“নীরার সাথে সারার সম্পর্ক কেমন ছিলো? ”

“লিসেন অফিসার, আমাদের সাথে সারার সম্পর্ক একদম ই ভালো ছিলো না। সেটা আগেও আপনাকে….
সৌরভ মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, আপনার ব্যাপার টা বাদ দিয়ে বলুন। নীরার সাথে সারার সম্পর্ক কেমন ছিলো।

সাইফ সাহেব এই প্রশ্নের উত্তর দিতে একটু বিব্রতবোধ করলেন। আমতা আমতা করে বলল, প্রায় খারাপের মতন ই।

“প্রায় খারাপের মতন ব্যপার টা কী একটু খুলে বলবেন সাইফ সাহেব?”

চা এসে গেল। শুধু চা না, চায়ের সাথে সুন্দর পিরিচে করে পেস্ট্রি, পুডিং ও এসেছে। সৌরভ সেসব কিছু ছুয়েও দেখলো না। চায়ের কাপ তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিতে দিতে বলল,

“বলুন সাইফ সাহেব। ”

সাইফ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,

“নীরা মায়ের সাথে থাকে তাই মা’কে দেখার অজুহাতে হোক কিংবা যে কারনেই হোক সারা চেষ্টা করেছিল নীরার সাথে একটা ভালো সম্পর্ক করতে। কিন্তু নীরার দিক থেকে এবার আর পাত্তা পায় নি। ”

“এবার মানে?”

“এর আগেও ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে নীরার থেকে বড় এমাউন্ট হাত করেছিল পার্লার করার নাম করে। ”

“সেটা কত আগে?”

সাইফ সাহেব একটু ভেবে বলল, এই ধরুন দেড় বছর আগে।

“আচ্ছা। তারপর বলুন?”

কিন্তু টাকা নেয়ার পর শুরু হয় তার ধানাই পানাই। এক পর্যায়ে নীরা টাকা চাইলে আজ না কাল, কাল না পরশু করতে করতে শেষমেস টাকাটা দিলো ই না। এদিকে বেহায়ার মতো আবারও টাকা চাইতে এলে মাহিন বলেছিল পুলিশে যাবে। তারপর নজর দিলো মায়ের সম্পত্তির উপর। মায়ের যেটুকু আছে সেটা নেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগলো যেন!

সৌরভ চায়ে চুমুক দিলো। চা’টা খেতে বেশ হয়েছে। সৌরভ ভেবেছিল সাইফ সাহেব হয়তো অন্যকিছু বলবে যাতে নীরা চরিত্র টা আরেকটু খোলাসা হয়। কিন্তু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তো সেই একই কাহিনী!

সৌরভ বলল, আপনার স্ত্রীকে একবার ডাকুন। তার সাথে একবার কথা বলার দরকার।

ভদ্রলোক বিরক্ত গলায় বলল, আমি বলছি তাতে কী হচ্ছে না?

সৌরভ রুক্ষ গলায় বলল, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আলাদা কথা আছে বলেই তাকে ডাকা হচ্ছে। প্রয়োজনে আপনার বাসায় যারা আছে তাদের সবার সাথে ই আমাদের কথা বলতে হবে। আসলে কী হয়েছে সাইফ সাহেব, আমরা চাইলে এরেস্ট ওয়ারেন্ট দেখিয়ে থানায় তুলে নিয়ে প্রশ্ন করতে পারতাম। জানেন ই তো থানায় প্রশ্নোত্তর পর্ব কীভাবে চলে! তারচেয়ে এখন যেটা হচ্ছে সেটা কী শান্তিপূর্ণ ভাবে হচ্ছে না! আপনাদের এভাবে ভালো না লাগলে আমরা অন্যভাবে ব্যবস্থা নেব।

ভদ্রলোক দমে গেল এই কথায়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভিতরে চলে গেল ভিতরে স্ত্রী কে ডাকতে।

***
সাইফ সাহেবের স্ত্রী ভদ্রমহিলা আর দশজন সাধারণ মহিলার মতোই। মেয়েদের স্বভাব হলো হড়বড় করে কথা বলা। উনিও ঠিক তেমনই। পুলিশের লোক দেখেও একটুও বিচলিত হয় নি। কথায় কথায় জানা গেছে ননদ সারার সাথে এককালে তার সম্পর্ক ভালো ই ছিলো। কিন্তু খারাপ হয়েছে তখন যখন দেখলো যে তার সোনার গহনা পরতে নিয়ে ফেরত দেবার সময় নকল গয়না দিয়েছে। তারপর থেকে এই বাসায় তার এন্ট্রি বন্ধ।

নীরার কথা জিজ্ঞেস করলে ভদ্রমহিলা এক বাক্যে বলল, ভীষণ ভালো মেয়ে। নাহলে এইযুগে কী আর কেউ অসুস্থ স্বামী নিয়ে থাকে বলুন! তার উপর স্বামীটার বাচ্চা হবে না।

সাইফ সাহেবের বাসায় সৌরভ আর একজন কে পেল সে হলো সাইফ সাহেবের শালা। ভদ্রলোক বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। নিতান্তই ভদ্র গোছের লোক। সৌরভ তাকে দুই একটা হালকা, পাতলা প্রশ্ন করে ছেড়ে দিলো।

****
পরদিন ছিলো শুক্রবার। সৌরভ দারোগা সাহেব কে নিয়ে চাঁদপুর গেল জাহাঙ্গীর কবিরের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য।

গাড়িতে বসে দারোগা সাহেব সৌরভ কে জিজ্ঞেস করলো,

“স্যার আপনার কাকে খুনী মনে হয়?”

সৌরভ আনমনে বলল, সবাইকে।

দারোগা সাহেব বলল, স্যার আপনার যদি সমস্যা নাহয় তাহলে বিষয় টা একটু খুলে বলতেন?

সৌরভ কৌতুক করে বলল, কেন? আপনি না অনেক ক্রাইম শো দেখেছেন? তাছাড়া এই লাইনেও তো পাক্কা লোক।

দারোগা সাহেব আমতা আমতা করলো। সৌরভ বলল, আপনাকে যে খাতাটা দিয়েছিলাম সেটার কোনো সুরাহা করতে পেরেছেন?

“জি না স্যার। আমার মনে হয় ওই খাতায় কিচ্ছু নাই। ওটা বাচ্চাটা হাবিজাবি কিছু আঁকছে। ”

“উঁহু। ওই খাতাটার প্রতিটি পাতায় ওই নীল রঙের ফুল। এই জিনিসের মিনিং বের করতে পারলেই খুনী অব্ধি পৌছে যাব। ”

দারোগা সাহেব বলল, কী বলছেন স্যার এসব? একটা বাচ্চা ওইভাবে ক্লু দিচ্ছে?

“এক্সাক্টলি। বাচ্চাটা ওই ফুল আঁকতে শুরু করেছে যেদিন আমি নীরাদের বাসায় গিয়েছিলাম। সে এমন কিছু দেখেছে যেটা বারবার প্রকাশ করতে চাইছে। যেহেতু লেখা বুঝানোর মতো ক্ষমতা ওর নেই তাই ওভাবে বোঝাতে চেষ্টা করছে। ”

“স্যার সেটা কীভাবে বুঝলেন? আমার তো মনে হয় ওই ফুল ও কোথাও দেখেছে। ধরেন ম্যাগাজিন বা পত্রিকায় বাচ্চাদের জন্য অনেকসময়….

সৌরভ মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, আগে আমার কথা মন দিয়ে শুনুন, বাচ্চাটা লাবণীকে দেখে খুব খুশি হয়েছে। কিন্তু যখনই লাবণী ওই ফুল আঁকতে বাধা দিলো তখনই সে ক্ষেপে গেল। এটার কারণ কী হতে পারে! তাছাড়া প্রথমদিন লাবণীর সাথে যে আচরন করেছে পরে সেটা চেঞ্জ হয়েছে। ”

“স্যার হতে পারে ওর খালা মানে নীরা নামের ওই ভদ্রমহিলা হয়তো কিছু শিখিয়ে দিয়েছে। ”

“আমার সেটা মনে হয় না। এই টাইপ বাচ্চারা কারও শেখানো কথায় চলে না। তারা তাদের মতো কাজ করে। বরং আমার মনে হয় যে ও এক্সপেক্ট করেছিল যে ওর ড্রয়িং দেখে লাবণী বুঝতে পারবে ও যা বোঝাতে চায়। কিন্তু যখন দেখলো লাবণী বুঝছে না, তখন ক্ষেপে গেল।

দারোগা সাহেব বিস্মিত হলো সৌরভের এতো গভীর ভাবনা দেখে।

***
চাঁদপুর গিয়ে সৌরভ যেসব তথ্য জানলো সেসব তথ্য কেস টা’কে আরও জটিল করে দিলো। জাহাঙ্গীর কবির লোক টা দেশে ফিরেছে সহায় সম্বল সব হারিয়ে। আত্মীয় স্বজনরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। পূর্বের ব্যড রেকর্ডের কারনে চাকরিতেও সুবিধা করতে পারলো না। তাছাড়া যাদের পোলাও খেয়ে অভ্যাস তাদের ভাতে অভ্যস্ত হতে সময় লাগে। অল্প চাকরির টানাপোড়েনের সংসারে নাজেহাল অবস্থা তখন আইডিয়া পেল নতুন বিজনেসের। লোক ঠকানো বিজনেস। এই বিজনেসের সূত্র ধরেই দ্বিতীয় বিয়েটা করতে বাধ্য হয়েছিল জাহাঙ্গীর কবির। মেয়েটার ভাইকে চাকরি দেবার নাম করে টাকা নিয়েছিল এবং পরবর্তীতে সেই টাকা না দিতে পারায় জোরপূর্বক বিয়ে দেয়। এবং দেনমোহর দশ লাখ টাকার উসুল পাঁচ লাখ টাকা।

এই ব্যাপার টা সারা তাবাসসুম মেনে নিয়েছিল। কোনো কারণ ছাড়া যে এটা করেনি সেটা স্পষ্ট। হয়তো তার নিজেরও দূর্বলতা আছে। আর একটা ব্যাপার জানা গেছে সেটা হলো জাহাঙ্গীর কবির দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, বাচ্চাকে নিয়ে সুখী ছিলো। এই ব্যাপার টা আশেপাশের প্রায় মানুষ ই বলেছে, তেমনি আরও একটা কথা লাবণীদের বিল্ডিং এর লোকেরা বলেছে যে সারার সাথে জাহাঙ্গীর কবিরের সম্পর্ক ভালো ছিলো না।

এখান থেকে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে দুটোই জাত শয়তান ছিলো। আর এই শয়তানির জন্যই ফেসে গেছে।

***
সৌরভ বাড়ি ফিরলো সন্ধ্যেবেলা। ফিরে ঝটপট গোসল সেড়ে নিয়ে একটা বার্গার আর এক কাপ কফি নিয়ে স্টাডিতে গেল। গত কয়েকদিন ধরে কাজের লোক আসছে না। তাই সৌরভ বাইরে থেকে খাবার এনে খায়। আজ কোনো খাবার অর্ডার করে নি কারন লাবণী বলেছে খাবার পাঠাবে।

খাবার এলো রাত ১০ টার দিকে। মুরগীর রোস্ট, রেজালা, পোলাও। এতো এতো জিভে জল আনা খাবার চোখের সামনে থাকা স্বত্তেও সৌরভ খেতে পারলো না। বিস্ফোরিত চোখে খাবারের বক্স টা দেখতে লাগলো। তারপর ফোন হাতে নিয়ে দারোগা সাহেবের নাম্বারে ফোন করে বলল,
“কাল সকালে লাবণী আর প্রিয়ন্তির নামে এরেস্ট ওয়ারেন্ট বের করুন। বাকীটা পরে জানবেন। ”

কিছু সময় আচ্ছন্নের মতো বসে থেকে সৌরভ নিজেকে ধিক্কার জানালো। যেদিন ভিক্টিম খুন হয়েছিল, সেদিন শবে বরাতের সরকারি ছুটি ছিলো। সেদিন কী করে প্রিয়ন্তি অফিস থেকে ফিরলো! শিট! এই ব্যাপার আগে কেন দেখলো না খতিয়ে! চোখের সামনে এতো এতো ক্লু থাকা স্বত্তেও ও আসল অপরাধীকে দেখতে পেল না! ভাগ্যিস এই নীল ফুল ওয়ালা বক্স টা দেখে সব জলের মতন পরিষ্কার হয়ে গেছে।

(আগামী পর্বে সমাপ্ত)
চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here