ছুয়ে_দেখো_আমার_শহর পর্ব ৬

#ছুয়ে_দেখো_আমার_শহর
#লেখিকা_হৃদিতা_আহমেদ

পর্ব-৬

বাবা-মায়ের কথা শুনে সূর্য চট করে পুতুলকে কোলে তুলে রুম থেকে বের হয়ে যায়।হঠাৎ কোলে নেওয়ায় পুতুল কান্না থামিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সূর্যের দিকে তাকায়।তারপর হাত-পা ছুড়ে বলল,
– ” কি করছেন? নামান আমাকে, ছাড়ুন বলছি। ”
পুতুলের কথায় সূর্য কটমট চোখে তাকিয়ে জোরে বলল,
-“শাট আপ”
সূর্যের ধমকে পুতুল একদম চুপ হয়ে যায়।

ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে দাড়িয়ে ছিল।সূর্যকে বের হতে দেখে সবাই দৌড়ে আসলেও ততক্ষণে সূর্য পুতুলকে নিজের রুমে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।মি. মাহবুব চিন্তিত ভাবে ছেলেকে ডাকলেন,
-” অবাক,,,,কী করছো তুমি? দরজা খোলো, মেয়ে টা এমনিতেই ভয় পেয়ে আছে তুমি ধমকালে আরো ভয় পেয়ে যাবে।”
প্রতিত্তোরে ভেতর থেকে কোনো শব্দ পাওয়া গেল না।আর তার ছেলে যে দরজা খুলবে না তিনি আগেই জানতেন।কাজের মধ্যে বাধা দেওয়া একদম পছন্দ করে না সূর্য, তাই পুতুলকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।মি. মাহবুব হতাশ হয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালেন। মিসেস মধুমিতা আর ছন্দ বেশ কিছুক্ষণ নক করলেও কোনো লাভ হয়নি ফলাফল শূন্য।আগত্য তারাও রুমে চলে যায়।

এদিকে রুমে এসে সূর্য পুতুলকে বেডে বসিয়ে দিয়ে নিজে বেডের বা দিকে রাখা ডিভানে বসে।বড় আব্বুর গলা শুনে পুতুল সূর্যর দিকে তাকায়, সূর্য হাটুর উপরে দু’হাত রেখে মাথা নিচু করে বসে আছে।কিছুক্ষণ পর ছন্দ আর বড় আম্মুর গলা শুনে পুতুল সাহস করে উঠার চেষ্টা করে।ফ্লোরে পা রাখতেই সূর্য তার দিকে কটমট চোখে তাকায়, সূর্যর চাহনি দেখে পুতুল আবার পা তুলে নিজের জায়গাতে বসে পড়ে।

দরজা নক করা বন্ধ হতেই সূর্য পুতুলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়।পুতুলের কান্না বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু অনেকক্ষণ কাঁদার ফলে মাঝে মাঝে হেঁচকি আর গাঢ়ো নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।সূর্য উঠে সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাস টা নিয়ে পুতুলের সামনে ধরে।পুতুল তার দিকে তাকাতেই গ্লাস টা নেওয়ার ইশারা করে।পুতুল তার কাঁপা কাঁপা হাত বাড়াতেই সূর্য ফোঁত করে একটা নিশ্বাস নেয়।তারপর নিজেই পাশে বসে পুতুলের মুখের কাছে নিয়ে ধরে।পুতুল অবাক হয়ে পানিতে চুমুক দিচ্ছে আর ভাবছে, এই ছেলে টা এমন কেন সবসময় নাকের ডগায় রাগ নিয়ে ঘুরে আবার এখন এতো যত্ন করে পানি খাওয়াচ্ছে। এতো যত্ন করে তাকে তো আগে কেউ পানি খাওয়ায় নি।ভেবেই চোখ ছলছল করে উঠে পুতুলের।

পুতুল মাথা নিচু করে বসে আছে আর তার ঠিক সামনে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে আছে সূর্য।একটু নরম কন্ঠে বলল,
-” এবার বলোতো এই মাফিয়া টা কে? আর ছোট মাকে আটকেই বা রেখেছে কেন? ”
সূর্যের কথায় পুতুল টলটলে চোখে তার দিকে তাকায়।পুতুলের চোখে চোখ পড়তেই সূর্যের বুকটা ছ্যাত করে উঠে।তার মায়াবী পিচ্চিটা এতো কষ্ট চোখে কেন তাকাচ্ছে?ভেবেই অস্থির হয়ে উঠে সূর্যের মন।আলতো করে পুতুলের হাত ধরে বলল,
-” বলো কে?”
সূর্যের ভরসা পূর্ণ হাতের ছোয়া পেতেই পুতুলের চোখ থেকে টুপ করে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।কাপা কাপা গলায় বলল,
-” রিচার্ড ডেনিয়েল, নিউইয়র্ক এর ক্..কুখ্যাত মাফিয়া।ওই মাফিয়া টাই মাম্মাকে আটকে রেখেছে।”
-” কিন্তু ছোট মাকে আটকে রেখেছে কেন?”
-” আ…আমাকে না পেয়ে মাম্মাকে আটকে রেখেছে।”
বলেই পুতুল আবার কাঁদতে শুরু করে।সূর্য বিস্মিত হয়ে বলল,
-“মানে?”
-” ওই মাফিয়া টা আমাকে চাই।আমাকে দু…দুই বার তুলে নিয়ে গেছিল।দুবার ই আমি পালিয়ে আসি।ও..ওই মাফিয়া টার ভয়ে মাম্মা আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে।এখন আমাকে না পেয়ে মাম্মাকে আটকে রেখেছে।”
বলেই ফুপিয়ে কান্না শুরু করে পুতুল সাথে ভীষণ পরিমাণ কাপছে।সূর্য পুতুলের হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলল,
-” ভয় পেও না আমি দেখছি, ছোট মার কিচ্ছু হবে না।”

বাবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে আছে সূর্য।মি. মাহবুব চিন্তিত ভাবে বসে আছেন।সূর্য গমগমে গলায় বলল,
-” বাবা, তুমি রিচার্ড ডেনিয়েল এর ব্যাপারে জানতে?”
-” হুম”
-” তাহলে আমাকে বলোনি কেন? ”
-” আমি যখন জানতে পেরেছি তখন তুমি বাড়িতে ছিলে না।আর তাছাড়া আমি আমার পরিচিত মেজর পিটার পার্কার এর মাধ্যমেই পুতুলকে বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করেছিলাম।তাই আর তোমাকে জানায়নি।”
-” তাহলে ছোট মাকে নিয়ে আসনি কেন?”
-” তুমি তোমার ছোট মায়ের জেদ সম্পর্কে ভালো করেই জানো অবাক, তারপরও আমাকে একথা বলছো!”
বাবার কথায় চুপ হয়ে যায় সূর্য, কিছু একটা ভেবে বলল,
-” পিটার আঙ্কেল কে ফোন করে এখনই ডেনিয়েল এর ব্যবস্থা করতে বলো।আর ছোট মায়ের সেফটি সম্পর্কে ভালো ভাবে বলে দাও।”
কথাটা বলে নিজের ফোন হাতে রুম থেকে বের হয়ে যায় সূর্য।বাইরে এসে নিউইয়র্কে তার পরিচিত অফিসার অ্যালেক্স হেলস কে ফোন করে সূর্য।
-” হেই অ্যালেক্স, আই গাট আ বিগ প্রবলেম। আই নিড ইউর হেল্প।”
-“—–”
-” ইট’স ইমার্জেন্সি,,,,অ্যালেক্স, ইউ হ্যাভ টু ডু ইট রাইট নাউ।”

কথা শেষে সূর্য নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়।রুমের দরজা খুলতে মিসেস মধুমিতা উঠে দাড়ালেন।
-” এসেছিস, ওরা তো ঘুমিয়ে গেছে।তুই বরং আজ গেস্ট রুমেই যা।” বলে হামি তুললেন মিসেস মধুমিতা।
সূর্য হাত ঘড়ি টা খুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
-” হুম যাচ্ছি, মা পুতুল কিছু খেয়েছে?”
-” না, কিছুতেই খাওয়াতে পারলাম না।মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে গেল।”
-” ঠিক আছে, অনেক রাত হয়ে গেছে তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো।” বলে ওয়াশরুমে ঢুকে যায় সূর্য।
মিসেস মধুমিতা ছেলের খাবার টি-টেবিলে উপর রেখে রুম থেকে বের হয়ে যায়।

সূর্য ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখে টেবিলে খাবার রাখা।সূর্য একবার খাবারের দিকে তাকিয়ে পুতুলের দিকে তাকালো। বিছানার বাম পাশে গুটিশুটি হয়ে ঘুমচ্ছে পুতুল আর টুকটুকি তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘুমচ্ছে।কিছু একটা ভেবে নিজের ফোন টা নিয়ে ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে নিল সূর্য।ডিভানে বসে ছবি গুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে তাকালো পুতুলের দিকে।পুতুল তার দেওয়া সাদা জামাটা পড়েছে।দেখে মনে হচ্ছে সাদা রঙটা এই মেয়ের জন্যই তৈরি হয়েছে। মৃদু হেসে পুতুলের মাথার কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে সূর্য।পুতুলকে ভীষণ আদুরে দেখাচ্ছে।সামনের বেবি হেয়ার গুলো কপালে ছড়িয়ে আছে, গুলুগুলু গাল, লাল লাল নাক,নিচের ঠোঁটটা অনেকটা উপরের ঠোঁটের নিচে ঢুকিয়ে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমচ্ছে।সূর্য মৃদু হেসে কিছুটা ঝুকে চুমু দিতে গিয়েও থেমে গেল।কিছু একটা ভেবে ডান হাতের দুই আঙুলে চুমু দিয়ে পুতুলের ঠোঁটে ছুয়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আগে অধিকার টা পায় পিচ্চি, তারপর রাত দিন চুমু আর চুমু।তোমার আমার চুমুময় পৃথিবী।” বলে ফিক করে হেসে দেয়।তারপর উঠেই ধপ করে ডিভানে উবু হয়ে শুয়ে পড়ে সূর্য।

চলবে
এরথেকে বড়ো পর্ব চাইলে একদিন পর পর গল্প দিবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here