ডুবে ডুবে ভালোবাসি পর্ব -০৬ ও শেষ

#ডুবে_ডুবে_ভালোবাসি
#৬ষ্ঠ_পর্ব(অন্তিম)
#লেখনিতে_সুপ্রিয়া_চক্রবর্তী

ভার্সিটির অনেক স্টুডেন্টের সামনে আজ আবারো শ্রাবন্তীকে প্রপোজ করল আদিল। আগেরবার শ্রাবন্তী মানা করে দিয়েছিল। কিন্তু এবার আর মানা করতে পারল না। কারণ শ্রাবন্তী আদিলকে ভালোবেসে ফেলেছে। তাই আদিল যখন প্রপোজ করল তখন কোন ভনিতা না করেই বলল, আমিও তোমাকে ভালোবাসি।

দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনার সাক্ষী থাকল গৌরব। গৌরবের মন পুরো ভেঙে গেল। শ্রাবন্তীকে তো ভালো বেসেছিল গৌরব। কখনো বলতেও পারল না। তার আগেই আদিল বলে দিল। গৌরব ভাবছে, বললেও বা কি হতো? শ্রাবন্তী তো গৌরবকে সহ্যই করতে পারে না। বললে নিশ্চয়ই তাকে প্রত্যাখ্যান করে দিত। গৌরব চোখ বন্ধ করে সেই মুহুর্তটা মনে করল যখন সে শ্রাবন্তীর আসল রূপ দেখেছি। মেয়েটার গায়ের রং কালো হলেও মুখে ছিল অদ্ভুত মায়াবী ভাব। যা গৌরবকে মুগ্ধ করেছিল। কারণ মেয়েটিকে দেখে গৌরবের তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। গৌরবের মায়ের গায়ের রংও চাপা ছিল। গৌরব যদিও তার বাবার গায়ের রং পেয়েছে।

গৌরব আর দাঁড়াতে পারছিল না সেখানে। শ্রাবন্তী ও আদিলকে একসাথে খুশি দেখে নিজের বুকে পাথর চাপা দিয়ে চলে আসে।

অন্যদিকে, আদিল শ্রাবন্তীকে নিজের গার্লফ্রেন্ড বানাতে পেরে খুব খুশি। অবশেষে বাজি জিতল সে। আদিল খুশিতে আত্মহারা। আজ অব্দি কোন বাজি কারো কাছে হারে নি সে। আজও হারল না। দূরে দাঁড়িয়ে রূপক নিজের বন্ধুকে চিয়ার আপ করে। আদিল শ্রাবন্তীকে বলে, চলো আমরা কোথাও ঘুরতে যাই।

শ্রাবন্তী ও আদিলের রিলেশন শুরু হয়। সব কিছু ভালোই যাচ্ছিল। বিপদ শুরু হয় তখন যখন শ্রাবন্তী জানতে পারে আদিল তাকে বাজি ধরে প্রেমে ফেলেছে। ব্যাপারটা সামনে আসতেই খুব কষ্ট পায় সে। আদিলকে এই ব্যাপারে প্রশ্নও করে। কিন্তু আদিল কোন উত্তর দেয়না শ্রাবন্তীকে। শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। শ্রাবন্তী সেদিন আদিলের সাথে ব্রেকআপ করে নেয়। এরপর আদিল অনেক কষ্ট করে শ্রাবন্তীকে মানিয়ে নিয়ে আবার তার সাথে রিলেশন শুরু করে। এভাবে সবকিছু ঠিকঠাক যাচ্ছিল। তবে বিপদ আসতে বেশি সময় নেয় না।

শ্রাবন্তী একদিন সিদ্ধান্ত নেয় আদিলকে সব বলবে তার ব্যাপারে। তারপর আদিল যদি শ্রাবন্তীর আসল রূপকে মেনে নেয় তাহলে সব ঠিক থাকবে। নাহলে এখানেই সব শেষ।

শ্রাবন্তী নিজের আসল রূপ দেখাতে যাবে তার আগেই ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা। আদিল শ্রাবন্তীকে নিজের চাচাতো ভাইয়ের সাথে দেখা করাতে নিয়ে যায়। শ্রাবন্তী দেখা করতে গিয়ে হতবাক হয়ে যায়। কারণ আদিলের চাচাতো ভাই আর কেউ নয় আরিয়ান। সেই আরিয়ান যাকে শ্রাবন্তী প্রপোজ করেছিল প্রথমদিন। শ্রাবন্তী ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যায়। যদি আদিল সব জানতে পারে তার ফল কি হবে সেটাই শ্রাবন্তী ভাবছিল।

আরিয়ান শ্রাবন্তীকে দেখামাত্রই বলে, তোমাকে খুব চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছি।

আদিল অবাক হয়ে যায় আরিয়ানের কথা শুনে। সে বলে, তুই কোথায় দেখবি ওকে?

একটু মনে করার চেষ্টা করি। হ্যাঁ মনে পড়েছে তুমি সেই মেয়েটা না যে আমাকে প্রপোজ করেছিলে।

কি বলছিস শ্রাবন্তী তোকে প্রপোজ করেছিল?

হ্যাঁ ভাইয়া, শুধু তাই নয়, এই মেয়েটা দেখতে এত সুন্দরী না। ও তো কালো ভূত। নিশ্চয়ই মেকআপ করে নিজের আসল রূপ ঢেকে রেখেছে।

আদিল শ্রাবন্তীর দিকে রাগী চোখে তাকায়। শ্রাবন্তী চোখ নামিয়ে দেয়। আদিল শ্রাবন্তীকে একা রেখে আরিয়ানের সাথে চলে যায়। শ্রাবন্তীর সাথে একটা কথাও বলে না। শ্রাবন্তী সেখানেই বসে কাঁদতে থাকে।

পরের দিন, ভার্সিটিতে নিজের আসল রূপে যায় শ্রাবন্তী। কেউ তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তো কেউ আবার অবাক হয়ে তাকে দেখছিল। শ্রাবন্তীর নামে অনেকে অনেক কিছু বলছিল। ভার্সিটি জুড়ে তার নামও ছড়িয়ে যায় মেকআপ সুন্দরী। শ্রাবন্তীর খারাপ লাগলেও সে মানিয়ে নেয়। কারণ এসবই স্বাভাবিক।

সবার মাঝে এবার গৌরব এসে শ্রাবন্তীর পাশে দাঁড়ায়। গৌরবকে বন্ধু হিসেবে পাশে পেয়ে বদলে যায় শ্রাবন্তীর জীবন।

গৌরব শ্রাবন্তীকে মনোবল দিয়ে বলে, তুমি নিজের রূপ নিয়ে ভেবোনা, নিজের গুণ দিয়ে এমন একটা অবস্থান তৈরি করো যেন সবাই তোমার প্রশংসা করতে বাধ্য হয়। শ্রাবন্তী গৌরবের কথায় সাহস পায়। পড়াশোনায় মন দিয়ে অনেক ভালো রেজাল্ট করতে থাকে। এভাবে নিজের খ্যাতি অর্জন করে।

কয়েক বছর পর,
শ্রাবন্তী এখন একটি ব্যাংকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে জব করে। এখন আর আগের মতো অবস্থা নেই তার। আগে যার বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল গায়ের রঙ এর জন্য, এখন চাকরি পাওয়ার পর তাকে অনেকেই বিয়ের প্রস্তাব দেয়। অনেক সুদর্শন ছেলে। কিন্তু শ্রাবন্তীর কথা সে কোন সুদর্শন ছেলেকে বিয়ে করবে না। তাই তো নিজে পছন্দ করে তার মতো একটি কালো ছেলেকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শ্রাবন্তী।

অন্যদিকে শ্রাবন্তীর বিয়ের কার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গৌরব। এতগুলো দিন ধরে বন্ধু হিসেবে শ্রাবন্তীর পাশে থেকেছে। বিপদে আপদে সবসময় তাকে সাহায্য করেছে। কিন্তু কখনো শ্রাবন্তীকে বলতে পারে নি ভালোবাসার কথা। এতগুলো বছর ধরে ডুবে ডুবে ভালোবেসেই গেল। শ্রাবন্তী সেই ভালোবাসা বুঝতে পারে নি কখনো।

গৌরবের আজ খুব কান্না পাচ্ছে। কিন্তু সে কিছু করতে বা বলতেও পারছে না। অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারার ব্যর্থতা তাকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। নিজের উপরই নিজের খুব রাগ হচ্ছে। গৌরব ভাবল এবার অন্তত শ্রাবন্তীকে নিজের মনের কথা বলবে; কিন্তু কি ভেবে যেন পিছিয়ে আসে।

কয়েক দিন পর,
আজ শ্রাবন্তীর বিয়ে। গৌরবও এসেছে শ্রাবন্তীর বিয়েতে। যদিও তার আসার কোন ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু শ্রাবন্তীর জোরাজুরিতে একপ্রকার বাধ্য হয়ে বুকে পাথর রেখে শ্রাবন্তীর বিয়েতে এসেছে গৌরব।

শ্রাবন্তী গৌরবের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। লাল বেনারসিতে অনেক বেশি মায়াবী লাগছে শ্রাবন্তীকে। গৌরবের কষ্ট আরো বেড়ে যায়। শ্রাবন্তীকে এই রূপে দেখতে চেয়েছিল সে কিন্তু নিজের পাশে। অথচ আজ শ্রাবন্তীর বিয়ে হয়ে যাবে অন্য কারো সাথে। শ্রাবন্তী গৌরবের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, কেমন লাগছে আমায়?

খুব সুন্দর লাগছে।

একটু পরেই শোরগোল শোনা যায় বর এসে গেছে। শ্রাবন্তীকে নিয়ে যাওয়া হয় বিয়ের আসরে। গৌরবের চোখের সামনেই অন্যকারো সাথে বিয়ে হয়ে যায় শ্রাবন্তীর। শ্রাবন্তী গৌরবের সামনেই অন্য একজনের হাত ধরে চলে যায়। গৌরব নিজের চোখেই সব হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়।

বাড়িতে ফিরে কান্নায় ভেঙে পড়ে গৌরব। নিজের কষ্ট কা*টানোর জন্য বেছে নেয় গিটারকে। গিটারে আওয়াজ তুলে গাইতে থাকে,
♪তুমি না ডাকলে আসবোনা
কাছে না এসে ভালোবাসনা
দূরত্ব কি ভালোবাসা বাড়ায়
নাকি চলে যাওয়ার বাহানা বানায়
দূরের আকাশ
নীল থেকে লাল…
গল্পটা পুরোনো
♪ডুবে ডুবে ভালোবাসি♪
তুমি না বাসলেও আমি বাসি।

♪এটা কি ছেলেখেলা
আমার এই স্বপ্ন নিয়ে♪
চাইলে ভেঙে দেবে
গড়ে দেবে ইচ্ছে হলে

♪আমি গোপনে ভালোবেসেছি
বাড়ি ফেরা পিছিয়েছি
তোমায় নিয়ে যাব বলে♪

♪একবার এসে দেখ
এসে বুকে মাথা রেখো
বুলে দেবো চুলে রেখে হাত♪

দূরের আকাশ
নীল থেকে লাল…
গল্পটা পুরোনো
♪ডুবে ডুবে ভালোবাসি♪
তুমি না বাসলেও আমি বাসি।

ডুবে ডুবে ভালোবাসি….

সমাপ্ত
(জানি না কার কি মনে হয়েছে। তবে আমার কাছে এই গল্পের প্রকৃত নায়ক গৌরব। তার জন্যই গল্পের নামকরণ ‘ডুবে ডুবে ভালোবাসি’।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here