তোমাকে ঠিক চেয়ে নিবো পর্ব ২

#তোমাকে ঠিক চেয়ে নিবো
পর্ব ০২
লেখা আশিকা জামান

“আপনি একটা আস্ত খাটাশ।”
মেসেজটা আসতেই প্রহর ভড়কে স্ক্রিণের দিকে তাকায়।
এইটা কখনো কোন ছেলে মেয়ের ফ্রার্স্ট কনভারসেশন হতে পারে! ইনফ্যাক্ট জীবনে কোনদিনো শুনে নি ও। এর কি রিপ্লে হতে পারে ওর মাথায় আসছে না।
” কি ভড়কে গেলেন”
হাসির ইমুজি।
প্রহর নিজেকে সামলে নিয়ে রিপ্লে দিলো,
” না জীবনে কেউ এই উপাধি দেই নাইতো তাই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ব্যাপার নাহ্।”

স্নিগ্ধা হাত দিয়ে চুল পেচাতে পেচাতে রিপ্লে দিলো,
” আমার মত সুন্দরী মেয়েকেও আপনার ফ্রেন্ড লিস্টে যায়গা করে নিতে এক মাস ঝুলতে হলো। হাইরে কপাল!
আপনার খুব ভাব তাইনা।”

প্রহর একটু এড়িয়ে গিয়ে রিপ্লে দিলো,
” আচ্ছা আপনি খুব সুন্দরি বুঝি।”
স্নিগ্ধা কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললো,
” কেনো আপনি আমার পিক দেখেননি। সবাইতো তাই বলে।”

” আচ্ছা সবাই বললো আর আপনি, বিশ্বাস করে নিলেন।”
প্রহর ওপাশ থেকে মুচকি হাসি দিয়ে কথাটা বললো।

স্নিগ্ধা এইবার রেগে গেলো। ওর সুন্দরের প্রশংসা যেই করে ও একদম গদগদ হয়ে যায়। তেমনি কেউ প্রশংসা না করলেও রেগে যায়।
দাতে দাত চেপে রিপ্লে দিলো ও,
” আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আমি সুন্দরি নাহ্।”

” না আমি কিছুই বলতে চাচ্ছি না।
বাই দ্যা ওয়ে আপনার ওই নীল শাড়ী পড়া পিকটায় একটা জিনিস মিসিং।”

স্নিগ্ধা অতি উৎসাহি হয়ে প্রশ্ন করলো,
” কি?”
” তোমার নীল শাড়ী, নীল টিপ সাথে নাক দিয়ে হুয়াইট হুয়াইট পানি পড়তেছে। আহ্ হুয়াট এ কম্বিনেশন নীল আর হুয়াইট। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যাবে।”

মেসেজটা সিন হতেই স্নিগ্ধা চোখ কপালে তুলে ফেললো। এইরকম একটা পিক কল্পনা করতেই ওর সারা শরীর ঘেন্নায় ঘিনঘিন করতে লাগলো।
ইয়াক্ থু। কোন মানুষের কল্পনা শক্তি এতোটা বাজে হতে পারে ভাবতেই ওর আরেক দফা গা ঘিনঘিন করতে লাগলো।

কোন রিপ্লে আসতেছে না দেখে প্রহর আবার টাইপ করে,
” আচ্ছা তোমার সুন্দর নাক দিয়ে কি এখনো সুন্দর সুচারু ভাবে ননস্টপ পানি পড়তে থাকে?”

কি অসভ্য ছেলেরে বাবা!
নেহাৎ আম্মু আব্বু বলেছিলো তাই এর সাথে যেচে কথা বলেছিলো তাই বলে এইরকম অপমান করতে হবে। ওদের মেডিকেলের কত ছেলে ওর পিছে পিছে ঘুরে। দিনে রাতে কত স্মার্ট হ্যান্ডসাম ছেলেইতো ওর প্রশংসা করে। আর সেই যায়গায় প্রহর!
ছিঃ ছিঃ ছিঃ
আগামী ২৪ ঘন্টার আগে ও আর ফেবুতে আসবে না। কি ভেবেছেটা কি? কুয়েটের লেকচারার হয়েছে বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে? আর ওওতো মেডিকেলে পড়ে কম কিসে!

মেয়েটাকে অফলাইনে দেখেই প্রহর নিজের মনেই বলে উঠে মেয়েটা বোধ হয় রেগে গেছে। ওর খুব হাসি পাচ্ছে। মানুষকে রাগিয়ে ও একটা পৈশাচিক আনন্দ পায়।
তাছাড়া ও ভেবেই নিয়েছে ওর দ্বারা এইসব প্রেম ভালোবাসা হবে না। এইসব ন্যাকা, ন্যাকা ডায়লগ, লুতুপুত প্রেম ওর দ্বারা সম্ভব নয়। ও জীবনে কোনদিন কোন মেয়ের রুপের প্রশংসা করেছে কিনা সন্দেহ আছে। ওর মুখ দিয়ে এইগুলা জীবনেও বের হবে না। আচ্ছা সত্যিইকি মেয়েদের কোন জীনিসই প্রহরকে আকর্ষন করে না। বিষয়টা মাথায় আনতেই প্রহরের চোখে ভেসে উঠে প্রিয়মের কিশোরী বোনের দীঘল কালো মেঘের মত কোমড় ছড়িয়ে যাওয়া চুলের বাহার। কি যেন নাম মনে করতে পারছে না, চেহারাটা আবছা আবছা মনে আছে। সেদিন ছিল ঘোর শ্রাবণ মাস। আকাশে মেঘ আর বাতাসের দাপটে ঘরে থাকাই দায় হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু প্রহরের বাতাস যে খুব প্রছন্দ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাতাসের তাণ্ডবলীলায় মুগ্ধ হয়ে মন আর শরীর দুটোই জুড়োনো যে ওর জন্মগত অভ্যাস। সে নিজের বাড়ীই হোক আর বন্ধুর বাড়ী। প্রিয়ম প্রহরের অন্যতম বন্ধু একি সাথে কুয়েটে পড়ার সুবাদে ওদের বাসায় বেশ যাতায়াত ছিলো। কোন এক বিকেলেবেলা প্রহর গিয়েছিলো প্রিয়মের বাড়ী। উদ্দেশ্য ছুটি কাটিয়ে একি সাথে খুলনায় ব্যাক করা। প্রিয়মদের বাড়ীর দক্ষিন পাশে গাছগাছালি আর লতাপাতায় ঘেরা বেশ বড়সড়ো শানবাঁধানো এক পুকুর রয়েছে। পুকুর পাড়ের অদূররেই দুটো পলাশ গাছ পাশাপাশি স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই দুইগাছকেই সাপোর্ট হিসেবে ব্যাবহার করেই মানানসই স্টিলের একটি যুগল দোলনা লাগানো হয়েছে। রক্তিম পলাশ ফুল আর পুকুরের নয়নাভিরাম দৃশ্য সাথে এমন দোলনার দুলুনি সত্যিই যে কারো মনকে ভবঘুরে হতে বাধ্য করবে। প্রিয়মের কিশোরী বোনকে খোলা চুল এলিয়ে দুলনায় দোল খেতে খেতে যখনি দেখতো নিজের মাঝে নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলতো প্রহর। মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতো লম্বা চুলের দিকে। রৌদ্র‍্য যখনি চুলের উপর পড়তো ঝিকমিক করে উঠতো চুলগুলো। সেই প্রথম আর সেই শেষ কোন নারীর কোন অঙ্গের প্রতি মুগ্ধতা। এরপর কি আর কোন মেয়ের কোন কিছু ওকে মুগ্ধ করেছিলো?
হ্য করেছিলোতো অচেনা অপরিচিত এক মেয়ের কন্ঠস্বর ওকে অদ্ভুত সম্মোহনে বার বার টানছিলো। বরাবরই আবেগ ওর কাছে খুবই ঠুনকো বিষয়। তাই এই মুগ্ধতাও কাটিয়ে উঠতে ওর বেশিক্ষণ লাগেনি। কিন্তু কি জানি কি মনে করে পিউ নামের মেয়েটার নাম্বারটা সেভ করে রেখেছিলো। আচ্ছা ও যদি মেয়েটাকে একবার ফোন করে তাহলে কি খুব বেশি অন্যায় হয়ে যাবে? হোক অন্যায় হলেও হোক। কেন যেন আজকে কোন অপিরিচিত মেয়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। যদিও মেয়েটা কিঞ্চিৎ পরিচিত। তুবুও…
স্নিগ্ধা মেয়েটা অনলাইনে এলে তাও একটু সময় কাটানো যেতো। হয়তোবা এই অদ্ভুত ইচ্ছেটাও হতোনা।

” তিথি স্যার এইভাবে চলে গেল কেনরে?” প্রতিক্ষা শান্ত গলায় কথাটা জিজ্ঞাস করলো।

তিথি ভ্রুকুচকে প্রতিক্ষার দিকে তাকায়,
” কেন স্যারের কি এখনো এখানে বসে থাকার কথা। তুই কি কিছুই বুঝিস না প্রতিক্ষা? স্যার তোর কাছে কি চায়? কি আশা করে?”
প্রতিক্ষা বেকুবের মত তিথির দিকে তাকায়।
তিথি প্রতিক্ষার গা ঘেষে বসে পড়ে। তিনদিন ধরে জ্বরে মেয়েটার রুগ্ন চেহারায় এক অদ্ভুত মায়া বিরাজ করছে।
প্রতিক্ষা সবকিছু বুঝে তবুও না বোঝার ভাণ করে বসে থাকে। ও কোন ডিসিশন নিতে পারেনা। তাছাড়া ও চায়না এমন কোন সম্পর্কে নিজেকে জড়াতে।
” প্রতিক্ষা তুই কি এখনো তোর ভাইয়ের বন্ধুর জন্য তীর্থের কাকের মত বসে
আছিস? কবে এসে তোর গলায় মালা পড়াবে সেই আশায়।”
প্রতিক্ষা চমকে তিথির দিকে তাকায়।
আচ্ছা আমি কি সত্যিই এই আশায় বসে আছি।নিজের মনকে নিজেই প্রশ্ন করে প্রতিক্ষা। যদি উত্তর না ই হয় তাহলে রিজভী স্যারের মত এইরকম হ্যান্ডসাম একটা ছেলে আমার মনে কেন দাগ কাটছে না। প্র‍্যাক্টিকেলি চিন্তা করলে রিজভী স্যারের মত মানুষকে যে কেউ জীবনসঙ্গী হিসেবে চাইবে।
কিন্তু ওকে যে সুখে থাকতে ভুতে কিলাই। তাই বয়ঃসন্ধিকালের সেই এক মোহ ও কাটিয়ে উঠতে আজো পারেনি। প্রতিটা আনন্দে, মন খারাপে, কষ্ট, অভিমান সর্বোপরি সুখকর অনুভুতিতে ও শুধু একজনের মুখই কল্পনা করেছে। সেই বয়ঃসন্ধিকাল থেকে যখন থেকেই প্রেম নামের জীনিসটা ও বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই মনে প্রাণে শুধু একজনকেই চেয়েছে। তাই আজো ১৯ তম বসন্তে এসেও সেই মরীচিকাই যে ওর বেচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

প্রতিক্ষা তিথির কাধে মাথা রাখে সাথে সাথে তিথি এক হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে।
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আবার বলে উঠে,
” প্রতিক্ষা তুই বুঝতে পারিস না তোর জন্য আমার কতটা কষ্ট হয়। তোর সমস্ত অনুভুতির একমাত্র সাক্ষী হলাম আমি। সত্যি বলছি বিশ্বাস কর আমি আর এই ভার বইতে পারছি না।”
প্রতিক্ষা ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে উঠলো।
তিথি কিছুটা ধমকের সুরেই বললো,
” এই তুই কান্না ছাড়া আর কি করতে পারিস। দেখ এইভাবে কাঁদলে জীবনে কিচ্ছু পাবিনা।
আচ্ছা তোর বুকে এত ভালবাসা তাহলে এতোদিনেও কেন বলে উঠতে পারিসনি। আরে আমিতো চেষ্টা করেই ছিলাম ফোন ধরিয়েই দিয়েছিলাম সাহস করে। কিন্তু তুমি আসল কথা না বলে ইনিয়ে বিনিয়ে গপ্পো জুড়ে দিলি। তুই একটা ভীতুর ডিম। খালি বারবার এক কথা আচ্ছা যদি ভাইয়াকে বলে দেয়?
যদি রিজেক্ট করে?
উফ প্রতিক্ষা করলে করবে। তার জন্য তো সারাজীবন বসে থাকলে চলবে না।
দেখ আমি তোকে ভালো কথা বলছি তুই ওই কি যেন নাম?
থাক যে নামই হোক তুই ভুলে যা ভালোই ভালোই। আর রিজভী স্যারের ভালবাসাটা বুঝতে শিখ। এইরকম একটা প্রোপাজাল কিছুতেই তোকে আমি হাতছাড়া করতে দিবো না। দাত থাকতে দাতের মর্যাদা বুঝতে শিখরে হতচ্ছারি।
শোন তুই স্যারকে একটা ফোন কর।
প্রতিক্ষা চোখ মুছে তিথির দিকে তাকায়,
” কিরে তাকাই আছিস কেন ফোনটা কর।”
প্রতিক্ষা ফোনটা হাতে তুলে নিলো।
চলবে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here