তোমাতে করিবো বাস পর্ব -১৬+১৭

তোমাতে করিবো বাস💗
#পর্ব_১৬
লেখনীতে-আফনান লারা
.
ঘোমটার পর্ব শেষ।তটিনি এবার ঘোমটা ছাড়াই ঘুরতে ফিরতে পারবে।সেটা মনে করে সে স্বস্তি পেলো।বাড়িতে এত এত মেহমান যে রুম থেকে বের হওয়ার ইচ্ছাটাই চলে গেছে তটিনির।এদিকে রুমে বসে বসে বাপ্পির মিষ্টি হাসি দেখতেও তার বিরক্তি আসছে।

‘ছেলেটা এমন হাসছে কি জন্যে?কি সমস্যা? এত ঝাড়ি দিই দিনে রাতে তারপরেও দাঁত কেলানো হাসি তার আসে কই থেকে?আজব!&

তটিনি চোখ রাঙাচ্ছে দেখে বাপ্পি মাথা নামিয়ে ল্যাপটপটা টেনে কাছে নিয়ে আসে,এরপর নিজের কাজে মন দিয়ে ফেললো।বাপ্পি অন্যমনস্ক হয়েছে বলে তটিনি বিছানা ছেড়ে নামলো। পুরো রুমে একবার পায়চারি করে এরপর সে দরজাটা ধীরে খুলে বাহিরে উঁকি দেয় সে।এই বাড়ির মানুষদের আচার আচরণ স্বাভাবিক একটা পরিবারের নিয়মকানুন থেকে একটু ভিন্ন।বিয়েতে এত নিয়ম তো সাধারণ পরিবারদের হতে সে দেখেনি।এরা যেন নতুন নতুন নিয়ম বানিয়ে বিষয়টাকে কঠিন করে তুলছে।বাপ্পির রুমের সামনেই একটা ভেসিন আর আয়না এটাচসড্।সোজা দেয়ালের উপর আয়না লাগানো,তার নিচে ভেসিন।অর্থাৎ দরজা খুললেই বাহিরের কারোর মুখোমুখি পড়তে হবেনা।

শাড়ীর কুচিগুলোকে এক হাতে আঁটসাঁট করে ধরে তটিনি রুম থেকে বের হয়।আয়নাতে একবার নিজের দিকে তাকায় তার আগে,,,, সব ঠিক আছে কিনা দেখার জন্য।
ঠিক নেই।লিপস্টিক লেপটে গেছে, এই জন্যই বুঝি বাপ্পি মিটমিট করে হাসছিল তখন থেকে।

‘লিপস্টিক লেপটালো কেন!ওহ হো!চা বিসকিট খেয়েছিলাম সে জন্য হয়ত।’

শাড়ীর কুচি ছেড়ে আঁচল টেনে ঠোঁটটা মুছে নিলো তটিনি এরপর সামনে হাঁটা ধরলো আবার।
বাপ্পির রুমের থেকে বের হলেই ডাইনিং রুমটা পড়ে।সেখানে তখন কেউ ছিল না বলতে একটা চার পাঁচ বছরের ছোট্ট বাচ্চা চেয়ারে বসে দই খাচ্ছিল চামচ দিয়ে।তটিনি ওকে এড়িয়ে অন্য রুমগুলো দেখতে গেলো।এরপরে ডানের রুমটা হচ্ছে বাপ্পির বাবা মায়ের।বামের রুম দাদা দাদির।আর কর্নারেরটাতে আপাতত বকুল আপু আর বুনি থাকছে।ওটা আসলে বুনির রুম।তটিনি বাপ্পির মায়ের রুমে উঁকি দিয়ে দেখতে যেতেই তাদের চোখে পড়ে গেলো।ওখানে ছিল বাপ্পির ফুফু আর ওর মা,দাদি।ওনারা তটিনিকে দেখে হাসিমুখে ভেতরে আসতে বললেন।
তটিনি মনের ভয়টাকে এক পাশ করে ওদের কথায় ভেতরে ঢুকলো।বাপ্পির মা হেসে ফুফুর হাত চেপে বললেন,’দেখলে কেমন লম্বা বউ এনেছি?’

ফুফু হাসি দিয়ে বললেন,’এরকম লম্বাই ঠিক আছে।বেশি লম্বা আবার তালগাছ মনে হয়।আমাদের সীমান্তর বউকে দেখছিলা?ওর বউ তো ওর থেকেও লম্বা’

এই নিয়ে সকলে হাসি শুরু করে দিলেন।তটিনি মনে মনে ভাবছে সামান্য এ কথায় এত জোরে খিক খিক করে হাসার কি আছে!তার তো বিন্দু পরিমাণ ও হাসি আসছেনা।ওনারা এবার সীমান্ত আর তার বউকে রেখে সীমান্তর অবিবাহিত বড় বোন যার বয়স ছাব্বিশ পার হয়ে গেছে,সে এখনও অবিবাহিত কেন সেটা নিয়ে গল্প শুরু করে দিছেন।
তটিনি নিজেকে অতিরিক্ত ব্যাক্তি ভেবে টুপ করে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।ডাইনিংয়ের সেই ছোট বাচ্চাটি তখনও চামচ কেটে কেটে দই খেয়ে যাচ্ছিল আর তটিনিকে দেখে যাচ্ছিল।তটিনির গায়ের রঙের শাড়ীটা আর ঐ বাচ্চাটির মায়ের শাড়ীটা রঙের দিক দিয়ে একি রকম বলে সে বারবার করে তটিনিকে দেখছিল।
তটিনি এবার বুনির রুমের দিকে চললো।সেখানে ছিল বাপ্পির মামাতো বোন আর ভাই।ওরা বসে বসে ফোন টিপছিল।দুজনেই বয়সে তটিনির কাছাকাছি বয়সী।ওরা তটিনি দেখে সালাম দিয়ে ফোন রেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে।তটিনি ওদের ব্যস্ত হতে না বলে ঠিক আছে বলে চলে আসলো ওখান থেকে।
এখানে সবাই নতুন বউ বরকে ঘিরে আসলেও কেউই নতুন বর বউকে খুঁজেনা আর,কথাও বলতে চায়না।যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
আর কি করবে ভেবে তটিনি আবারও বাপ্পির রুমে ফিরে এসেছে।এসে দেখে বাপ্পি নেই।ওয়াশরুম থেকে পানির আওয়াজ আসছিল বলে ওখানে বাপ্পি আছে ভেবে তটিনি বাপ্পির ল্যাপটপটা দেখতে দেখতে ডিভানে বসে যায়।কাজের হিজিবিজি কিছু প্রোজেক্ট দেখে তটিনি আর হাত লাগায়নি।এসবে হাত লাগলে যদি ডিলেট হয়ে যায়।!
সেসময় বাপ্পি বের হয় ওয়াশরুম থেকে।গায়ের পাঞ্জাবি বদলে সে একটা সাধারণ টিশার্ট পরে এসেছে।তটিনিকে ডিভানে দেখে সে বিছানায় এসে বসলো।তটিনি ব্রু কুঁচকে বলে,’আপনি তখন দেখছিলেন আমার লিপস্টিক লেপটে গেছে তার পরেও আপনি বললেন না কেন?উল্টে হাসছিলেন!’

‘বলিনি কারণ তুমি হয়ত ভাববে আমি তোমার ঠোঁটের প্রতি আকর্ষিত বলে তাকিয়েছিলাম।তুমি তো আবার উল্টো বোঝার মানুষ’

‘মোটেও না!এখন থেকে ঠোঁটে কিছু লেগে থাকলে বলবেন।নাহয় অন্য মানুষের সামনে আমি লজ্জা পাবো’

‘আমার সামনে লজ্জা লাগেনা তোমার?”

‘না লাগেনা!এক মাস আগেও লাগতোনা,কারণ আমি জানতাম আপনার সাথে আমার কখনওই বিয়ে হবেনা,আপনাকে ইম্প্রেস করে কি লাভ হতো?’

‘তাই বলেই কি যতবার তোমাকে আর আমাকে একা দেখা করতে দেয়া হতো ততবারই তুমি শুধু মুখ ধুয়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আসতে?বিনা মেকআপে?’

‘ঠিক ধরেছেন!’

‘আর ইচ্ছে করে দাঁত বের করে স্যুপ খাচ্ছিলে?’

‘এটাও ঠিক ধরেছেন’

‘তুমি কি জানো তোমার এইসবেতেই আমি বেশি মুগ্ধ হয়েছিলাম?ভুল করে তুমি নিজেকে আমার সামনে সেটাই তুলে ধরলে যেটা আসলেই তুমি’

তটিনি ঠাস করে কপালে একটা বাড়ি দিয়ে বললো,’আরেহ আমি কি জানতাম আপনার মাথায় এত বুদ্ধি!তবে কি জানেন!স্ত্রী চয়েসের ক্ষেত্রে আপনার ধারণা একেবারে বাজে।আপনি আরও সুন্দরী, আরো শিক্ষিত, আরো বড়লোক ঘরের একটা মেয়েকে আপনার জন্য পেতেন। কিন্তু সেটা না করে আমাকে দেখতে এসে আমাকেই কনফার্ম করে দিলেন, এটা ঠিক করেননি।আমি আপনার জন্য ছিলাম না!’

‘আমার জন্য ছিলেনা?ছিলে বলেই আমার সাথেই তোমার বিয়েটা হলো তটিনি।’

তটিনি দম ফেলে হাতের ভারী সোনার চুড়ি গুলো নাড়িয়ে চাড়িয়ে চুপ করে থাকলো।এরপর যখন সে মাথা তুললো তখন দেখলো বুকে একটা বালিশ রেখে আর মাথার তলায় বালিশ একটা দিয়ে বাপ্পি নিদ্রায় তলিয়ে গেছে।তটিনি কাছে এসে ওকে দেখতে লাগলো।বকুল আপুর গর্ব করার পেছনে কারণ এই যে বাপ্পি এই পরিবারের হীরের টুকরো ছেলে!
সব কিছু ঠিক লাগলো বলেই বাবা এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন তটিনিকে বিয়ে দেয়ার জন্য।এর আগে অনেক পাত্র তটিনির জন্য দেখেছিলেন কিন্তু কাউকেই তার মন মতন হয়নি।কিন্তু বাপ্পিকে দেখে তিনি আর মনকে দাবায় রাখতে পারেননি।রাজি হয়ে গেলেন চট করে!
তটিনির বুকের ভেতর কামড় দিয়েছিল যেদিন সেদিনই সে বাপ্পির ছবিটা হাতে নিয়ে প্রথমবার দেখেছিল।সেই ছবিটাতে বাপ্পিকে এতটা সুন্দর লাগছিল যে বাড়ির যেই মানুষটাই হাতে নিচ্ছিল সেই বলছিল”মাশাল্লাহ”’

তটিনি ভয় পাচ্ছিল প্রথম কারণ বাপ্পির চাকরির কথা শুনে।
সে ভয় পাচ্ছিল কারণ এই ছেলেটা রিজক্ট করার মতন না।তার ভয় টা একটা সময় গিয়ে সত্যি হয়ে গেলো।একদিন সময় নিয়েছিল বাবা। তাও ওদের বাড়ির সবাইকে দাওয়াত দেয়ার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য।তিনি শুরুতেই রাজি ছিলেন।তটিনি কত শত চেষ্টা করেছিল বিয়েটা আটকানোর জন্য।বাপ্পির শরবতে নুন ঢেলে ছিল,বাপ্পিকে ধমকে ধমকে বলেছিল সে আসিফকেই ভালবাসে!

কে জানতো এই উজবুকটাই ওর বর হবে।এমন জানলে নিজের শ্রম খরচ করে বিয়ে ভাঙ্গার পেছনপ সময় নষ্ট করতোনা।

দেখতে ভাল হলে কি হবে!ভেতরে ভেতরে এক নাম্বারের স্বার্থপর!মানে ডুই জানোস তোর হবু বউয়ের অতীত আছে।পাগলের মতন অন্য একটা ছেলেকে ভালবাসে!তোর দরকার ছিল এই মেয়ের পিছনে পড়ে থাকার??
তুই যদি এক মাস ধরে বিয়া বিয়া না করতি তবে এই সময়টা কখনও আসতোই না।আমার বাবাও অসুস্থ হতোনা,আসিফ ভাইয়ার বিয়ের কথাও উঠতোনা।আমিও জেদ করে তোকে বিয়ে করতাম না!সব তোর দোষ!’

‘জানি’

বাপ্পি চোখ বন্ধ করে জানি বলেছে বলে তটিনি থতমত খেয়ে এক দৌড় দিলো ওমনি তার হাতটা ধরে ফেললো বাপ্পি।তটিনি জিভ কামড়ে পেছনে তাকিয়ে হাত টান দিয়ে হটিয়ে বললো,’আমার অনুমতি ছাড়া আমায় টাচ করবেন না’

‘তুমিও আমার অনুমতি ছাড়া আমি ঘুমালে আমায় দেখবেনা!আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে আমায় পছন্দ করোনা,অথচ আমি এদিক সেদিক চোখ সরালেই আমায় দেখো,আমার ফোন দেখো,আমার ল্যাপটপ দেখো।আসলে তুমি ক্রাশ খেয়ে বসে আছো, স্বীকার করতেছো না’

‘আমি ক্রাশ খেয়েছি?ওটা আপনি খেয়েছেন।তাও আমার প্রতি’

‘সোটা তো আমি মেনেছি।মানতেছো না তুমি!’

সেই সময় বাবা আসলেন বাপ্পির রুমে।তটিনি সরে দাঁড়ালো।বাবা কাজের লোকদের দিয়ে বাপ্পির ডিভানটা তুলে নিয়ে গেলেন।নেওয়ার সময় বললেন,’তোর মামাতো ভাই আজ বাড়িতেই থাকবে।জানিস তো কত মানুষ।ওর জন্য ডিভানটা নিচ্ছি’

এই বলে সবাই চলে গেলো,সাথে ডিভানটাও।তটিনি হা করে তাকিয়েই আছে।বাপ্পি তার বুকের উপরের বালিশটা মাঝখানে রেখে বললো,’রাতে এভাবে শুলে হবে?’

‘সকালে উঠে যদি দেখি মাঝখানে বালিশ নাই তবে আপনার মাথায় একটা বালিশের তুলা বের হওয়া অবধি বালিশ দিয়ে পিটাবো’

‘তার মানে বালিশ সরানোর জন্য শাস্তি হিসেবে শুধু একটা বালিশের বাড়ি??ও মাই গড!
আচ্ছা তুমি আমায় বালিশ দিয়ে পিটিও।আমার কোনো সমস্যা নাই’

চলবে♥তোমাতে করিবো বাস💗
#পর্ব_১৭
লেখনীতে-আফনান লারা
.
রিনি যে বাড়ি ছেড়ে ব্যাগপত্র গুছিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে একা একা চলে গিয়েছিল তা কেউই জানতোনা বাড়ির। পরে আসিফকে ফোন দিয়ে রিনির নিরুদ্দেশ হবার কথা জানাতে গিয়ে পাল্টা তারা জানতে পারে রিনি আসিফের কাছেই আছে।কথাটা এরই মধ্য সীমাবদ্ধ থাকার কথা কিন্তু রাত দশটার সময় আসিফ আর রিনিকে ফের এখানে দেখে সকলেই এখন বিচলিত।
আসিফ সবার আগে এসেছে রিনিদের বাসায়।সেখানে রিনির বাবা আসিফ আর রিনিকে দেখে প্রশ্ন করলেন ঠিক কি কারণে এত রাতে তারা এখানে।তাদের তো ঢাকায় থাকার কথা।
আসিফ রিনির ব্যাগ রেখে পুরোনো শর্তর কথা মনে করিয়ে দিয়ে চলে যেতে চাইলো কিন্তু রিনির বাবা ওকে আজ রাতটা এখানেই থাকতে বলে রিনির মাকে আয়োজন শুরু করতে বললেন।রিনির আর আসিফের বিয়ের পরে আজকেই প্রথম আসিফ এই বাড়িতে রাতে থাকবে।
আসিফকে কিছু বলতেই দেয়া হলোনা।ফুফার কথার বাহিরে বিয়ের আগেও যায়নি সে,এখন বা কোন দুঃখে যাবে।চুপচাপ তাকে রিনির রুমটা দেখিয়ে দেয়া হলো।
আসিফ ক্লান্ত শরীর নিয়ে রুমে ঢুকতেই রুমের ভেতরের দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠেছে।দেয়ালে টাঙানো টাইগার স্রোফের ছবি।ছবিটা দেখতে দেখতে সে বিছানায় বসে।মেয়েলি মেয়েলি গন্ধ ভাসছে পুরো রুমে।যেন পাউডার আর শ্যাম্পুর ছড়াছড়ি। রিনি এরইমধ্যে ওখানে পৌঁছে গেলো।দাঁত কেলিয়ে বললো,’যানের আগে আন্নেগো বাইত যাইতেন ন?’
[যাবার আগে আপনাদের বাড়িতে যাবেন না?]

‘তোর তাতে কি?’

‘আঁই ও যাইয়াম’

‘যাইস।কিন্তু এটা ভাবিস না যে তোকে আবার ঢাকাও নিয়ে যাব।যতদিন না আমি চাকরি পাচ্ছি তোকে আর কোনোদিন আমি ঢাকায় নেবোনা,আর তুই ও যাবিনা’

রিনি কিছু না বলে মায়ের কাছে চলে এসেছে।রিনিদের বাড়িটা সম্পূর্ণ টিনের।তাদের রান্নাঘরটা বাড়ির থেকে দশ কদম পেছনে আরেকটা ছোট করে একচালা টিনের ঘরের মতন।সেখানে এসে রিনি দেখে ওর মা মুরগীর মাংসের পাতিল চাপিয়েছেন চুলায়।রিনি মোড়া টেনে পাশে বসতেই ঠাস করে একটা চড় খেলো মায়ের হাতে।চড়টা খাবার পর মায়ের দিকে চেয়ে দেখে মা আবার চামচ নিয়ে মাংস নাড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

‘মাইচ্ছো কা?'[মারছো কেন?]

‘তুই আমাগো কাউরে না কইয়া ঢাকাত দিকে চলি গেছত কা?’
[তুই আমাদের কাউকে না বলে ঢাকার দিকে চলে গেছিলি কেন?]

‘আঁই কিত্তাম আর!এমিগার জরিনা/সখিনা বেজ্ঞুনে জামাই লই ঢং করে হত্তিদিন! আর আঁই কোন কালে বিয়া করিও জামাইর লগে বনের সুযোগ সময় এক্কানাও হাইতাম না।তোমরাও দেও না হেয়াল্লাই আঁই হত্তে হত্তে চলি গেছি’😎

[আমি কি করতাম আর!এদিকের জরিনা/সখিনা সবাই জামাই নিয়ে ঢং করে প্রতিদিন!আর আমি অনেক আগে বিয়ে করেও জামাইর সাথে বসার সুযোগ সময় একটুও পাইতাম না।তোমরাও দিতানা,তাই আমি একা একা চলে গেছি]

‘তোর কি লজ্জাশরম নাই রে রিনি?মানুষ কি কয় জানোস?’

‘আঁই কি প্রেমিকের লগে হলাই গেছিলাম?আঁই তো পলাইছি আঁর জামাইর লগে তাইলে মাইনসে কিছু কয়বো কা?’

‘মাইনসে কি আর জানে তুই তোর জামাইর কাছে গেছোস?’

‘কিল্লাই জানে না?’

‘উফ!তোর সাথে কথা বলা মানে সময় নষ্ট।যা তো!সামনে থেকে যা।আমাকে শান্তিতে রান্না করতে দে।এক কাম কর,আসিফের লাই শরবত আর বিসকুট চানাচুর লই যা’
—–
রিনি সেটা করতে চলে আসলো বাড়িতে।সেই সময় আসিফ রিনির বিছানায় শুতে যেতেই কাঠ ভেঙ্গে ভেতরে চলে গেলো।ভেতরে বলতে একেবারে খাটের তলায়।এতক্ষণ মাথার উপরের ফ্যানটা যতটা উপরে লাগছিল এখন আরও উপরে লাগছে।মাথার পেছনটা প্রচণ্ড আকারে টনটন করছিল।সেটা ঘঁষে ঘঁষে ওঠার জন্য বৃথা চেষ্টা করছিল আসিফ।তাও পারছিলো না।এদিকে চুরমারের আওয়াজ পেয়ে আসিফের ফুফা আর তার ছোট ছেলে কারিম ছুটে এসেছে।এসেই আসিফকে এমন অবস্থায় দেখে তারা দুজনে ওকে তুলে দাঁড় করালো।কারিম হাসি আটকাতেই পারছেনা।খিলখিল করে হেসেই চলেছে।পাশের রুম থেকে রিনি এতক্ষণ খাট ভাঙ্গার আওয়াজ না পেলেও অট্ট হাসির আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে আসলো।এসে এই অবস্থা দেখে সে নিজেও ফিক করে হেসে দিয়েছে।আসিফ কোমড়ে হাত রেখে আ উুঃ করতে করতে রুমের এক কোণায় গিয়ে টিনের বেড়ায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালো।
ফুফা রিনিকে ধমকে বললেন ও যেন হাসি বন্ধ করে, এরপর গরম ছ্যাঁক দেয়ার ব্যবস্থা করতেও বললেন।
———-
ডিভান চলে যাওয়ায় যেন তটিনির মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে।মানে এই অচেনা ছেলেটির সাথে তার একই বিছানায় ঘুমাতে হবে?জীবনে সে কারোর সাথে বেড শেয়ার করে নাই সেখানে আজ করতে হবে!
তটিনি চোখ বড় করে রেখেছে দেখে বাপ্পি টুপ করে বালিশ টালিশ সব রেখে বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লো।এবার তটিনির মনে হলো উজবুক ছেলেটা না জানি বলে বিছানায় সে একাই শোক,সে বরং সারারাত দাঁড়িয়ে থাকবে।ওমনি তটিনি বলে ফেললো ‘আপনি এখানেই শোন,সমস্যা নেই’

বাপ্পি মুচকি একটা হাসি দিয়ে রুম থেকে চলে গেছে।তটিনি ঘড়ি দেখে বাপ্পির রুমে আবারও হাঁটাচলা শুরু করতে করতে ওর আলমারির কাছে এসে থমকে যায়।ডানে বামে তাকিয়ে দরজাটা ধীরে খুলতে গিয়ে আবারও টাস্কি খেলো।কারণ এটাও লক করা।কি আজব!
আলমারির ভেতরটা দেখতে হলে বাপ্পির থেকে চাবি চাইতে হবে তারপর সে লেকচার শুরু করবে—” তুমি হয়ত আমায় লাইক করো তাই না তটিনি!!”’

তটিনি অনেকক্ষণ বসে থাকার পরেও বাপ্পি আসছেনা দেখে সে রুম থেকে বের হতে নিলো ঠিক সেসময় ওর মনে আসলো সে যদি বের হয় বাপ্পি বুঝে যাবে তটিনি ওকেই খুঁজতে বেরিয়েছে তাই সে আর বের হলোনা।

নিজের ফোনটা বিয়ে বাড়িতে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছে।নতুন একটা ফোন দরকার।এদিকে বাবার শরীরের কথা জানার জন্য বাপ্পির কাছে ফোন চাইতে হয় বারবার।
——-
‘বাপ্পি শোনো,তটিনি হয়ত এত জলদি তোমার সাথে আমাদের কাউকেই মানিয়ে নিতে পারবেনা,এর পেছনে অবশ্য কারণ ও আছে।বিয়েটা তাড়াহুড়োতে হয়ে গেছিলো।যে এক মাস সময় লাগলো তাতেও সে কোনোদিন এ বাড়িতে আসেওনি,কারোর সাথে পরিচিত ও হয়নি।বকুল থেকে শুনলাম সে তোমার উপর রেগে আছে।কেন রেগে আছে জানিনা।তবে চেষ্টা করবে ওর রাগটা সারাজীবনের জন্য কমিয়ে ফেলতে।কারণ রাগটা সবসময় ওর মাথাতে রাখলে তুমি ওর কাছে ছোট হয়ে থাকবে সারাক্ষণ।যেটা আমরা সহ্য করতে পারবোনা।আমরা নিশ্চয় চাইবোনা আমাদের ছেলে তারই স্ত্রীর কাছে ছোট হয়ে থাকুক।তাই বলছি সে যে বিষয়ের উপর রেগে আছে সেটাকে একেবারে দূর করে দাও।তোমার মাকে বিয়ে করার পরেও আমি একই কাজ করেছিলাম।তারপর থেকে দেখেছো আমাদের কোনোদিন বড় কোনো ঝগড়া হতে?’

বাপ্পি চুপ করে থেকে বাবার পাশে বসে পা নাড়ছে।বাবা আবার বললেন,’তটিনিকে তুমি অনেক পছন্দ করো এটা আমি ১ম দিনেই বুঝতে পেরেছি।তাই তুমি হয়ত চাইবে ও সব সুখ পাক এখানে।তাই বলে এই না যে তুমি সবসময় ওর সামনে ছোট হয়ে থাকবে।সম্পর্কে তুমি ওর স্বামী হও।দায়িত্ব অধিকার পালন করার আগে তোমার নিজের ও কিছু অধিকার আছে তটিনির থেকে।সেটা আদায় করে নেবে ‘

বাপ্পি মাথা নাড়িয়ে ফেরত চলো আসছিল রুমের দিকে, তখনই ওর মামাতো ভাই ফুয়াদ ছুটে এসে ওর হাতে একটা বক্স দিয়ে বললো,’ভাইয়া ধরো তোমার পার্সেল।আমি গিয়ে নিয়ে এসেছি’

‘থ্যাংক ইউ সো মাচ!’

‘র‍্যাপিং করে এনেছি।ভাবীকে দেবে তাই না?’

‘হ্যাঁ’…’

তটিনি কান পেতে রুমের কোণা থেকে গিফট দেয়ার কথা শুনে দৌড়ে গিয়ে বিছানায় উঠে বসে গেলো।বাপ্পি কিছুক্ষণ পর রুমে ঢুকতেই তটিনি ওকে দেখে বলে উঠলো,’আমার হীরা যহরত কিছু লাগবেনা।এত শখ নাই আমার ওসবের প্রতি’😇

‘আমি ওগুলা দিচ্ছি ও না’

‘তাহলে বক্সে!’

এটা বলেই তটিনি মুখে হাত দিয়ে অন্যদিকে ফিরে গেছে।বাপ্পি ওর কাছে বক্সটা রেখে বললো,’তাহলে সবই শুনেছো।তবে নিশ্চয় এটা শুনোনি যে এটার ভেতরে কি আছে?এটাতে সেই জিনিসটাই আছে যেটা তোমার এখন প্রয়োজন।’

‘ফোন?’
——–
রিমি গরম পানি নিয়ে তাতে তোয়ালে চুবিয়ে পানি চিপে বের করে তোয়ালেটাকে নিয়ে আসিফের কোমড়ে ছ্যাঁক দিচ্ছে আর আসিফ মাথায় হাত দিয়ে অন্যদিকে মুখ করে বসে আছে।অন্যরকম অনুভূতি বিরাজমান সেখানে।রুমে তারা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।
মাঝে মাঝে দরজার পর্দার আড়াল সরিয়ে বাহিরে থেকে রিনির মায়ের ফিসফিসিয়ে আওয়াজ শোনা যায়।তিনি বলছেন,’বেজুইন্না মাইয়া!!!ডক করি ছ্যাঁক দে।’
[বেজুইন্না—এটার মানে আমি নিজেও জানিনা,তবে আমার আম্মু,নানু আমার কাজ সুন্দর না হলে আমাকে এটা বলে🐸🙂]

চলবে♥

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here