তোমাতে করিবো বাস পর্ব -৩৮+৩৯

তোমাতে করিবো বাস💗
#পর্ব_৩৮
লেখনীতে-আফনান লারা
.
আসিফ রিনির মাথায় পানি দিয়েছে তিনবারের মতন।ওর খালা ফুফুরা অবাক হয়ে আসিফের দায়িত্ববোধ দেখছেন ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে।অথচ এতদিন রিনির মায়ের মুখে শুনে এসেছেন আসিফ ছেলেটা অন্যরকম!রিনিকে চোখে হারায় না!রিনিকে পছন্দ করেনা।ওর মুখ দেখলে সবাই বলতো ওদের বিয়েটা জোর করেই হয়েছে!যার কারণে এতগুলো বছর আসিফ কতদূরে ছিল।ছেলে মানুষ বিয়ে করলে একদিন ও অপেক্ষা করেনা।বউকে সাথে নিয়ে যায় আর নয়ত শ্বশুর বাড়ি এসে বউকে দেখে যায় আর সেই আসিফ কিনা এত গুলো বছর বউহীনা থেকে গেলো!!সে যাই হোক!
আজ তার ব্যবহার অন্য কথা বলছে।সকলকে আশ্চর্যের শেষ প্রান্তে নিয়ে ঘুরিয়ে এনেছে সে।রিনির হাত ছাড়ছেনা কিছুতেই।রিনি অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে।কিছু খায়নি এখন অবধি।
কথাটা চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে!রিনির জামাই রিনি পাগল!!
গ্রামের দিকে নতুন বরের এরুপ কার্যালাপ আশানুরূপ হলেও দৃষ্টিকটু!লোকলজ্জার ও একটা ব্যাপার আছে!

ফিসফিস শুনেও আসিফ উপেক্ষা করে রিনির মাথায় হাত বুলাচ্ছিল।
রিনির জ্ঞান ফেরার পর তাদের রুমে চাচাতো বোন রিনতি আর কুয়াশাকে দেখে সে উঠে বসলো তারপর ওদের বললো রুম থেকে যেতে।ওরা তাই চলে আসলো ওখান থেকে।রিনি আসিফের দিকে ফিরে তাকায়,আসিফের মুখ ও শুকিয়ে আছে।

‘আন্নের হরীক্ষা নাই?’

‘এসবের চেয়ে জরুরি না’

‘চলে যান।আঁই ঠিক আছি’

এটা বলেই রিনির বুক ফেটে কান্না এসে যায়।আসিফকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে চিৎকার করে।আসিফ জানে রিনি এখনও নিজেকে সামলে উঠতে পারেনি।রিনির মাথায় হাত রেখে চুপ করে থাকে সে।
আসিফের মা বাবা খাবারের বন্দবস্ত করছেন রিনিদের বাড়ির সকলের জন্য।সকলে না খেয়ে আছে।আজ চুলা চলবেনা!এটা নিয়ম!
——–
বাপ্পি দূর ক্ষেতের আইল দেখতে দেখতে বললো,’একটা কঠিন সময় না আসলে আমরা প্রিয়জনকে প্রিয়জন হিসেবে বুঝতে পারিনা!সেই সময়টা আসলে সহজেই বুঝে যাই মানুষটা আমাদের কত প্রিয়!’

তটিনি বাপ্পির কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে তাকায়।এরপর বাপ্পির ঘামে ভেজা চাপা দাঁড়িতে হাত দিয়ে ঘাম মুছে বলে,’এত রোদে বসে আছি কেন আমরা?’

‘কারণ এরপর পুকুরে নেমে গোসল করবো’

‘আমি সাঁতার জানিনা’

‘আমি জানি!’

এই বলে বাপ্পি উঠে দাঁড়িয়ে তটিনিকে নিয়ে রিনিদের বাড়িতে না গিয়ে আসিফদের বাড়ির দিকে চললো।ঠিকানা একটা ছোট বাচ্চা ছোলেকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছে।
তটিনি ওর হাত ধরে যেতে যেতে বলে,’আমরা ঐ বাড়িতে কেন যাচ্ছি?ওখানে তো এখন কেউ থাকার কথানা।বাড়ি ফাঁকা’

‘ফাঁকা বলেই যাচ্ছি!আসিফদের পুকুরে গোসল করে তারপর চলে আসবো রিনিদের বাড়ি’

‘আমরা একজনের মৃত্যুতে এসেছি!এরকম না করলেও হয়!’

‘এভাবে বলতে হয়না তটিনি!গ্রামে আমরা বারবার আসিনা।’

তটিনি আবারও বললো,’ভিজে জামাকাপড় বদলে পরবোটা কি?’

‘সব ভেবে রেখেছি!আসিফের পাঞ্জাবি পরবো আমি,আর তুমি আসিফের বোনের শাড়ী কিংবা জামা পরে নিবা’

এই বলে দুজনে আসিফদের টিনের গেট সরিয়ে ভেতরে ঢোকে।পুরো বাড়িটা নিশ্চুপ হয়ে আছে।কোথাও কোনো শব্দ নেই।
বাপ্পি মুখে হাসি ফুটিয়ে তটিনিকে নিয়ে সোজা পুকুরপাড়ে চলে আসে।পুকুরটাও ফাঁকা।তটিনি ভয়ে ভয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
বাপ্পি শেষ সিঁড়িতে পা রেখে তটিনিকেও বললো পা রাখতে।তটিনি ধীরে ধীরে পা রাখে এরপর জয়ের হাসি দিয়ে বাপ্পির দিকে তাকায়।

‘শোনো!এখন আমার হাত ধরে এক পা এক পা করে নামবা।ভয় পেও না।নিচে আরও সিঁড়ি আছে!’

এই বলে বাপ্পি তটিনিকে টেনে নিচে নিয়ে আসে।একটু পর তটিনি হঠাৎ বাপ্পির হাত খাঁমছে ধরে দাঁড়িয়ে যায়।

‘কি হলো?ভয় পেলে?’

‘নিচে তো মাটি!সিঁড়ি নাই দেখছি!’

‘মাটি হলো আসল!কাদা মাটিতে পা রাখতে ভীষণ মজা।পা রাখো।কিছু হবেনা’

‘না না!যদি পোকা বের হয় ওটা থেকে?’

‘হবেনা।দেখোইনা ট্রাই করে’

বাপ্পির কথায় তটিনি চোখ বন্ধ করে পুকুরের মাটিতে পা রাখে।তার হাত পা কাঁপছে ভয়ে।বাপ্পি ওকে আরেকটু জ্বালাতে বললো,’সাপ!’

এটা শুনে তটিনি চট করে কাছে এসে বাপ্পির পায়ের উপর পা রেখে ওকে জড়িয়ে ধরলো ভয়ে।

বাপ্পি এটা কল্পনাও করেনি,সে ভাবলো তটিনি হয়ত উঠে চলে যাবে।

বাপ্পির ভেজা জামার উপর দিয়ে মুখ রাখতেই তটিনির শরীরে শিহরণ বয়ে গেলো কিঞ্চিত। এর আগে এমনটা হয়নি।
বাপ্পি নিজেও তটিনিকে আগলে রেখেছে।অনেকক্ষণ এভাবে কেটে যাবার পর বাপ্পি তটিনিকে ধীরে বললো,’দম বন্ধ করো।ডুব দিব একসাথে’

এই বলে সে তটিনির হাত ধরে ১,২,৩ বলে একসাথে দুজনে ডুব দেয়।তটিনি ডুবে পানি খেয়ে নিছে অনেকটা।তার অভ্যাস নেই।তবে বাপ্পির আছে কারণ সে তার নানুর বাড়িতে গেলে গোসল পুকুরেই করতো।
দুই তিনটা ডুব দিয়ে কাশি দিতে দিতে তটিনি বাপ্পির হাত ধরে পুকুর ঘাটের উপরে চলে আসে অবশেষে।দুজনে সোজা আসিফদের বাড়িতে ঢোকে।গ্রামের দিকে এই একটা বিষয়!তারা ভাবে চোরে চুরি করবেনা।তাই শুধু ছিটকিনি দিয়ে আরেক বাড়িতে দৌড় দেয়।বাপ্পি মুচকি হেসে ছিটকিনি খুলে ভেতরে প্রবেশ করে।
অনেক খুঁজে আসিফোর রুম পায় বাপ্পি,তটিনিও আসিফের বোনের রুমটা খুঁজে পেলো।দুজনে দুই রুমে ঢুকে এখন চেঞ্জ করছে।আসিফের বোন ছোট।তারা একটা জামাও তটিনির গায়ে লাগছেনা।মনে হয় জোর করেও পরা যাবেনা, এত টাইট!শেষে ভেজা জামায় সে রুম থেকে বেরিয়ে আসিফের মায়ের রুমে এসে হাজির হয়।উদ্দেশ্য সেখান থেকে একটা শাড়ী নিয়ে পরবে।এসে দেখে খাটের উপরে দড়ি টানানো টিনের চাল বরাবর। সেখানে সব জামাকাপড় টাঙানো।
তটিনি এই ভেজা শরীর নিয়ে খাটে উঠবেই বা কি করে!আর শাড়ী নিবেই বা কি করে!এইসব ভাবছিল আর শীতে কাঁপছিল।

ততক্ষণ বাপ্পির পাঞ্জাবি বদলানো হয়ে গেছিলো।সে তটিনিকে খুঁজতে এসে দেখে সে এই রুমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে।

‘কি হলো তটিনি?এখনও জামা বদলালে না?’

‘কত উপরে শাড়ী।নাগাল পাচ্ছিনা তো!খাটে উঠলে তোষক ভিজে যাবে’

বাপ্পি দ্রুত বিছানায় উঠে দড়ি থেকে শাড়ী, ব্লাউজ সব নামিয়ে দিয়ে বললো,’আসিফের মা মাশাল্লাহ দিলে যে স্বাস্থ্যবান দেখলাম!ওনার ব্লাউজ তোমার গায়ে থাকবে তো?’

তটিনি ব্রু কুঁচকে বললো,’ঠাট্টা না করে আসিফের বোনের রুম থেকে সেফটিপিন খুঁজে আনুন!খুব তো বলছিলেন সব ম্যানেজ হবে!এখন আমি তো কোনো কিছুরই বিহিত দেখছিনা’

বাপ্পি মিটমিট করে হাসতে হাসতে আসিফের বোনের রুম খুঁজে বের করে সেখানে পিন খুঁজতে থাকে।বেশ অনেকক্ষণ পর সে পিন খুঁজে পায়!এরপর ছুটে এসে দেখে তটিনি শাড়ী পরে এখন পিঠে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

‘নিন ম্যাম,আপনার পিন’

‘যান এখন!’

বাপ্পি মুচকি হাসি দিয়ে বের হলো রুম থেকে।ওখান থেকে উঠানের দিকে যাবার পথে তটিনি তাকে ডাক দেয় আবার।সে থেমে আবারও আসলো ওখানে।তটিনি অসহায় মুখ নিয়ে চেয়ে বলে,’আমি পারছিনা পিন লাগাতে’

‘জানতাম!কিন্তু তুমিই তো বের করে দিলে’

এই বলে বাপ্পি কাছে এসে তটিনির পিঠে সেফটিপিনটা ঠিক করে লাগিয়ে দিলো।তটিনির ভেজা চুলগুলো ওর হাতে লাগছিল বারবার।বাপ্পির জন্য কাজটা এত সহজ ছিল না মোটেও।কাঁপা হাতেই কাজটা সারছে সে।এরপর দুজনেই বের হয়ে যায় ঘর থেকে।আগের মতন ছিটকিনি লাগিয়ে গেটের দিকে যাওয়া ধরতেই লিচু গাছটার তলা থেকে একজন বৃদ্ধার গলার আওয়াজ পাওয়া গেলো।

ভয় পেয়ে ওরা দুজন থেমে যায়।ভয়ে ভয়ে বামে তাকায়।লিচু গাছ তলায় আসিফের দাদি বসে আছেন,এর আগেও ছিলেন।কিন্তু ওরা দুজনের একজনেও খেয়াল করেনি।দাদু ওদের হাত দিয়ে কাছে ডাকলেন।
বাপ্পি ভয়ে ভয়ে তটিনিকে সাথে নিয়ে ওনার সামনে এসে দাঁড়ায়।
বাপ্পিকে এতক্ষণ দেখে এবার তিনি তটিনিকে দেখছেন।

‘এই লম্বা করে ধলা হোলারে আঁই চিনি না তবে এই গোলগাল মেয়েটারে চিনছি।তুমি তটিনি না? ‘

‘জ্বী।আমাকে চিনলেন কি করে?’

‘সে অনেক কথা!এই ধলা ছেলেটা কে হয় তোমার?’

‘স্বামী’

‘ওহ তাহলে ঠিক আছে।আমি তো ভাবতাছি যুবক যুবতী দুইটা একা ঘরে ঢুকে এতক্ষণ কি করে!পায়ের ব্যাথা না থাকলে উঁকি দিয়ে দেখতাম।যাই হোক!তোমরা রিনিগো বাড়িত যাও নাই?’

‘গেছিলাম।গোসল করার জন্য এখানে এসেছি’

দাদি চশমা মুছতে মুছতে বললেন,’হ বুঝছি!জামাই বউ একসাথে গোসল করতে এতদূর আসলে!তোমাগোই সময়!এখন কত কি মন চাইবো!
কয়েক বছর পর একসাথে ভাত ও খাইতে মন চাইবোনা!যাই হোক যাও যাও।ঐ বাড়িতে এখন খাবার দিবে।দুপুরের খাবার খাইতে দেরি করিওনা’

চলবে♥তোমাতে করিবো বাস💗
#পর্ব_৩৯
লেখনীতে-আফনান লারা
.
হাতে হাত রেখে সেই পরিচিত মাটির পথটা ধরে তারা দুজন চলছে।গন্তব্য খুব একটা কাছে নয় তাও কেন যেন দুজনে হাঁটার গতি কমিয়েই হাঁটছে।যেন তারা চাইছে আজ দেরি হোক!
পথে কোনো মানুষ নেই।দুপাশে ডোবা নয়ত ক্ষেত।এভাবেই পথটা চলছে।তারা নিশ্চুপ হয়েও বেশ মনে মনে কথা বলছে।তটিনি তার ভেজা চুলগুলোর একটা পাশে হাত রেখে বুলিয়ে বাপ্পির দিকে আড় চোখে তাকাচ্ছিল আর মনে মনে বলছিল ‘কোনো এক কালে যে পাঞ্জাবিওয়ালার প্রেমে হাবুডুবু খেতাম আজ সেই পাঞ্জাবিওয়ালার পাঞ্জাবি পরিহিত সয়ং আমার স্বামী আমার সঙ্গে পথ চলছে!অনুভূতি কিরুপ হওয়া উচিত!’

আর বাপ্পি তটিনির হাতটাকে আরও আগলে ধরে পথ চলতে চলতে মনে মনে বলছিল,’যাকে প্রথমে ভাল লেগেছিল সেই মানুষটার চোখে আজ নিজের প্রতি ভাললাগা দেখতে পাওয়া কতটা সৌভাগ্যের?!”

প্রকৃতি যেন তাদের দুজনের মনের কথা বুঝে গেলো।হালকা বাতাসে গাছগুলোর হলুদ,খয়েরী রঙের পাতা সব দলে দলে ছিঁড়ে হেলেদুলে পড়তে লাগলো ওদের গায়ে!
সামনে তাকালে সেই পাতার ঝরে যাওয়ার দৃশ্য অদ্ভুত সুন্দর লাগে।তাও তারা সেই অদ্ভুত সৌন্দর্য্য দেখছেনা।কারণ তারা দুজনেই সেই অদ্ভুত সৌন্দর্য্য বহন করে চলছে।

সামনে সেই মাটির পথটি শেষ।তারপর পাকা রাস্তার শুরু।মাঝে একটা সাঁকো।দুই হাতের সাঁকো।বেশি তাড়া থাকলে সাঁকোর তলা দিয়ে হেঁটে যাওয়া যাবে।নিচে খুব একটা পানি নেই।পায়ের গোড়ালি ডোবা পানি!
দুজনে তাকিয়ে অনেকক্ষণ ভাবলো!সাঁকো দেখে মনে হয় পা রাখলেই চিটপটাং হয়ে ভেঙ্গেচুরে যাবে।
অনেক ভেবে বাপ্পি বলে,’নাও নিচে নামো।এই সাঁকোর উপর ভরসা করে তোমায় চড়ানো যাবেনা।পরে হাঁড়গোড় সব ভেঙ্গে ফেলবে’

তটিনি মাথা নাড়িয়ে নিচে নামতেই হোচট খেয়ে গিয়ে পড়ে বাপ্পির বুকে।
বাপ্পি দাঁত কেলিয়ে বললো,’কেমন একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ফিলিংস্ হচ্ছে’

তটিনি মাথা তুলে কোমড়ে হাত রেখে বললো,’সিনেমাই যদি হয় তবে কোলে নিন’

‘নিচে দেখেছো?কাদা সব।তোমায় কোলে নিলে লিফটের মতন করে কাদাতে দেবে যাবো।তার চেয়ে বরং হাতটি ধরো আমি তোমায় উড়িয়ে নিয়ে যাই’

এই বলে বাপ্পি তটিনিকে নিয়ে সেই দুইহাতের সাঁকোর তলা পার হয়ে গেলো।
——
রিনির জন্য খাবার নিয়ে আসছে আসিফ।রিনি মাথা টিনের বেড়ায় লাগিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল।এই জানালার দ্বারে বসে মা কত কোরআন শরীফ পড়েছেন!ছোটকালে রিনি ততক্ষণ মায়ের পাশে বসে থাকতো যতক্ষণ মা কোরআন পাঠ করতেন।আর আজ সেই মা নেই।কোরআন শরীফ আছে আগের জায়গায়।চোখ মুছে রিনি বিছানা ছেড়ে গেলো অজু করতে।সে কোরআন শরীফ পড়বে।
অজু করে এসে বসেও গেলো।আসিফ খাবার নিয়ে এসে দেখে রিনি কোরআন শরীফ পড়ছে।তাই আর ডাকেনি।খাবারটা নিয়ে সে বাহিরে গেছে রিনির ভাইকে খুঁজতে।সে এতক্ষণ বাবাকে আগলে রাখলেও হঠাৎ করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।তাকে খুঁজে বের করা জরুরি।এ বয়সের তরুণ!এত বড় ধাক্কা সইতে না পেরে কি না কি করে বসবে!তাছাড়া শুরু থেকেই কেমন আধমরা ছিল।যারা এ সময়ে কাঁদেনা তারাই ভুলভাল কাজ করে বসে।তাদের বিশ্বাস নেই।সেই ভয়ে আসিফ হন্ন হয়ে রিনির ভাইকে খুঁজতে বেরিয়ে গেছে।

কারিম মায়ের কবরের কাছে এসে কাঁদছিল।অথচ এ ছেলেটা শুরু থেকে এক ফোটা চোখের পানিও ফেলেনি।কারিম কখনওই কাঁদেনা।আজ ও কাঁদতোনা কিন্তু কি করবে!আজ যে সে সর্বহারা হয়ে পড়েছে।যার মা হারায় সেই তো আসল সর্বহারা!সে কাঁদবেনা তো আজ কে কাঁদবে!

আসিফ ওর কাছে এসে কাঁধে হাত রাখলো।ছেলেটা সব কিছু ভুলে চিৎকার করে কাঁদছে এখন ।মায়ের কবরের কাছেই মসজিদ।হজুরেরা সেখানে বসে থেকে ওকে দেখছিলেন।
অথচ তারাই এই ছেলেটাকে আজ অবধি হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকতে দেখেছেন।সেই ছেলেটাই এখন চিৎকার করে কাঁদছে।দৃশ্যটা খুবই নতুন এবং বেদনাদায়ক তাদের কাছে।
——-
বাপ্পি আর তটিনি ফিরতেই আসিফের মা ব্যস্ত হয়ে তাদের জন্য প্লেট রেডি করছিলেন।তটিনি কাছে এসে বললো,’এত ব্যস্ত হইয়েন না। আমরা পরে খেতে পারবো’

‘আরেহ না কি বলো!’

এই কথা বলে তিনি তটিনির গায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।তটিনি ভীষণ লজ্জা পেলো।কারণ সে তো উনারই শাড়ী পরে আছে!
বাপ্পি উঠানো হাঁটাচলা করছিল সেসময় আসিফ কারিমকে নিয়ে উঠানে আসতেই থেমে যায়।বাপ্পির গায়ের পেস্ট কালারের পাঞ্জাবিটা তার খুব চেনা মনে হলো।অনেকক্ষণ দেখার পর মনে আসলো এটা তো তারই।গলার কাছে হলুদ দাগ আছে।তার মানে এটা শতভাগ তারই পাঞ্জাবি!
আসিফকে ওরকম করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাপ্পি হেসে বলল,’আসলে হয়েছে কি!’

‘বুঝেছি!সমস্যা নেই।ভালই লাগছে তোমাকে’

এটা বলে আসিফ কারিমকে সঙ্গে করে বাড়ির ভেতর চলে যায়।বাপ্পি জিভ কামড়ে পেছনে মুড়তেই দেখে তটিনি বাড়ির একটা রুম থেকে জানালা দিয়ে ওকে ডাকছে খাওয়ার জন্য।
——-
রিনি কোরআন শরীফ রেখে বিছানা থেকে নামতেই আসিফের গলা শুনে জলদি বাহিরের রুমের দিকে গেলো।আসিফ কারিমকে নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছে সেখানে।রিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
“যে মানুষটাকে এতদিন আমি চিনতাম আর আজ শুরু থেকে যে মানুষটাকে দেখছি তাদের মাঝে কত তফাৎ।!
এই মানুষটাকি আমাকে সবসময় দূরে ঠেলে দিতো!এই মানুষটাকি জোর গলায় বলতো আমি রিনিকে পছন্দ করিনা!আমি বাধ্য হয়ে তাকে বিয়ে করেছি!বাধ্য হয়ে করা বিয়েগুলো কি এভাবে পরিণাম পায়?’

এই ভেবে রিনি ডানের খোলা রুমটার দিকে তাকায়।বাপ্পি তটিনিকে রুই মাছের কাঁটা বেছে দিচ্ছে আর তটিনি এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

“”””আসলেই!কিছু পরিণাম খুব সুন্দর হয়।””””

আসিফ হাত ধুয়ে এসে দেখে রিনি তটিনি আর বাপ্পিকে দেখছে।
তার চোখ মুখ দেখে মনে হয় এখনই পড়ে যাবে।আসিফ দ্রুত ওর হাতটা ধরে বলে,’অনেক হয়েছে।এবার কিছু খাবি।চল”

‘খিধে নেই।আঁর কথা বাদ দেন!আন্নে নিজেও তো কিছু খান ন’

আসিফ কিছু বলেনা।রিনিকে জোর করে রুমে নিয়ে এসে বসিয়ে ওর জন্য খাবার আনতে চলে যায় তার মায়ের কাছে।তিনি সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছিলেন।

‘ বাবা আজ থাকবি?’

‘হ্যাঁ।আরও দুই/তিনদিন থাকবো’

‘তোর পরীক্ষা না?’

‘ওসব পরে হবে।আমার এখানে থাকা জরুরি’

‘রিনির খেয়াল রাখিস!যাবার সময় ওরে নিবি?’

‘না নিলে এখানে থেকে নিজের খেয়াল রাখা ভুলে যাবে।নিয়ে যাব ভাবছি।সে যাবে কিনা এটাও তো কথা’
——
আসিফ প্লেট নিয়ে নিজে লোকমা বানাতে বানাতে বললো,’আমি পরশুদিন চলে যাবো।তুই যাবি নাকি থাকবি এখানে?’

‘বাবা তো একা!কেমনে যাই?’

আসিফ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে লোকমা তুলে ধরে রিনির মুখে।আসিফ চলে যাবার কথা ওঠায় রিনির চোখ ছলছল করে উঠলো।সব রেখে আসিফকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সে।ওর বুকে মাথা ঠেকিয়ে ধীর গলায় বললো,’আঁরে থুই যাইয়েন না।’

আসিফ প্লেট রেখে বাম হাত দিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,’পরীক্ষা যাক!গেলাম না!’
——–
বাপ্পি আর তটিনি রাত হতেই চলে এসেছে ঢাকায়।সকলে বলেছিল একদিন থাকতে কিন্তু সেখানে জায়গার অভাব বলে তারা থাকেনি।এত এত মানুষ তারাই বা থাকবে কই!আসিফদের বাড়িও ভর্তি রিনির ফুফু,মামিদের দিয়ে।
তাই ওরা দুপুরে খাবার খেয়েই রওনা হয়েছিল।আসতে আসতে রাত বারোটা বেজে গেছে।বুশরা জেগে ছিল দরজা খুলে দেবে বলে।ওরা আসায় সে দরজা খুলে হাই তুলতে তুলতে চলে গেছে।

তটিনী রুমে ঢুকা ধরতেই বাপ্পি বলে ওঠে’তটিনি আমার খুব খিধে পেয়েছে!’

তটিনি সঙ্গে সঙ্গে থেমে পেছনে তাকায়।সে কি করবে সেটাই ভাবছিল হঠাৎ মনে হলো ফ্রিজে খাবার থাকতে পারে।তাই ছুটে গিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখে কিছু নাই।বাপ্পি সেসময় চেয়ার টেনে বসে বললো,’আজকে শনিবার!এই দিনে খাবার থাকেনা ফ্রিজে।রাতের শেষ খাবারটা দারোয়ান নিয়ে যায়।তার বউ শনিবার বাপের বাড়িতে থাকে বলে রাতে খাবার পাঠায়না’

তটিনি ফ্রিজ বন্ধ করে কোমড়ে আঁচল গুজে বলে,’কি খাবেন বলুন’

‘শুনলাম তুমি শুধু ম্যাগী নুডুলস বানাতে পারো’

‘এই কথা কে বললো?’

‘আসিফ’

এই বলে বাপ্পি হাসছে মিট মিট করে।তটিনি মুখ বাঁকিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়।বাপ্পি ও সেখানে এসে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বলে,’আমি কিন্তু নুডুলস কম খাই।তবে তুমি বানালে বেশি খেতে পারবো’

‘থাক কষ্ট করতে হবেনা’

‘তাহলে কি বানাচ্ছো?’

‘খুব মজাদার!খেলে খুশির ঠেলায় পাগল হয়ে যাবেন’

চলবে♥

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here