তোমারই আমি আছি পর্ব ২৭

তোমারই আছি আমি
পর্ব-২৭
Sara mehjabin

তুরাগ: নিবিড়? সে তো অদ্বিতীর বয়ফ্রেন্ড। যাকে তুমি পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলে আর সেই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তোমার বোন অদ্বিতী তোমাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। সারার ক্ষতি করতে চেয়েছিল। যে এখন বার্ন ইউনিটে কোমায় ভর্তি। যার ৯৫% অর্গান ডেড। যার চিকিৎসার জন্য তোমার বোন ড্রাগসের ব‍্যবসা করেছে যাতে ভালবাসার মানুষটির তার নিঃশ্বাসটুকু সচল থাকে অন্তত। এইখানে সেই নিবিড়ের নাম আসছে কিভাবে??

আকাশ মৃদু হেসে তুরাগের কাধে হাত রাখে। তারপর অনেকটা চমকে ওঠার ভঙ্গিতে বলে, একি ভাই,,এতো কাঁপছ কেন তুমি? জ্বরটর আসল নাকি? নাহ্, টেম্পারেচার ইজ নরমাল। বাট ঘামছ প্রচুর। একদিকে কাঁপছ আবার আরেকদিকে ঘামছ। বুঝব কিভাবে তোমার গরম লাগছে না শীত? সেইভাবেই তো সব ব‍্যবস্থা নিতে হবে যাতে তোমার শীত বা গরম না লাগে। এতো হেল্প করলে তুমি আমাদের আর আমরা তোমার জন্য এইটুকু কেয়ার করব না,,,তা হতে পারে।

হাসিমুখে কথাগুলো বলতে বলতেই তুরাগের কাঁধ থেকে নামতে নামতে আকাশের হাত আচমকাই তুরাগের কলার খামচে ধরল। তারপর প্রত‍্যেকের চোখের পলকের মাঝেই তুরাগের শরীরে চড়-থাপ্পড়-কিলের ঝড় বয়াতে শুরু করল।

“জা***-এর বাচ্চা আমার বোনকে চিট করিস তুই? আমার বোনের ইমোশন নিয়ে তুই মজা লুটিস? আমার বোনকে নিজের খেলার গুটি সাজাস। তোকে মেরেই ফেলব আজকে কু* শা* জা*-এর বাচ্চা। আসলে পথের কুকুরকে যতই আদরযত্ন করা হোক, যতোই লালন-পালন করা হোক,,,কুকুরের স্বভাব কুকুরের মতোই থাকে। মানুষ আর হয় না। ভাবতেই পারি না আমার পরিবার দুধ-কলা দিয়ে তোর মতো কালসাপকে পেলেছিল। ছিঃ নিবিড়,,,এত্ত জঘন্য তুই কিভাবে হলি?”

তুরাগ: আশ্চর্য! কে নিবিড়? কিসের নিবিড়? আমি তুরাগ। বিজনেস টাইকন আশরাফুল হকের ছেলে। আর নিবিড় সে তো কোমায়।

আকাশ: ওকে,,নিবিড় কোমায় তাই না? আসুন আপনারা।

আকাশ ডাকামাত্র দুইজন মানুষ থানায় প্রবেশ করলেন। মধ‍্যবয়স্ক দুইজন নারী-পুরুষ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। তার সঙ্গে এটাও বোঝা যাচ্ছে খুবই নিম্নবিত্ত মানুষ তারা। আর কোন এক কারণে যেন খুব ভয় পেয়ে আছে। নারীটি পুরুষটির পেছনে মুখ লুকিয়ে থরথর করে কাঁপছেন। আর বারবার তাকাচ্ছেন তুরাগ ওরফে নিবিড়ের দিকে। পুরুষ মানুষটি ভয় পাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু স্ত্রীকে শক্ত রাখার জন্য তার একটা হাত ধরে রেখেছেন।

আকাশ: ভয় পাবেন না। আমি আছি আপনাদের সাথে। বিশ্বাস করুন আমায়। আর আমাকে যা যা বলেছেন সবার কাছে তা খুলে বলুন।

পুরুষ লোকটি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলতে শুরু করলেন, আমার পোলা গার্মেন্টস এ কাম করত। এক বছর আগে এক রাইতে পুরা ফ‍্যাক্টরিত আগুন ধইরা গেল। সব পুইড়া গেল ছাই হইয়া। আমার পোলাডা বাঁইচা গেল ঠিকই কিন্তু ওই বাঁচন আর মরন এক-ই কতা। পুইড়া মুখ চেনার কোন উপায় নাই। গরিব মানুষ আমরা, কোনমতে হাসপাতালে নিলাম। হঠাৎ কইরা মালিকের পোলা ( তুরাগকে নির্দেশ করে) কইল সে চায় আমার পোলার চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে। বড় হাসপাতালে নিয়া আমার পোলার চিকিৎসা করাইব। পোলা ভালো হইয়া যাব। তয় হেতে শর্ত দিল। কইল আমরা যেন এইসকল কতা কাউরে না কই। হে টাকাও দিছে আমগোরে। আর কইছে আমরা যতদিন পোলা সুস্থ না হবো পোলারে দেখতে পারুম না; কোনো খোঁজ-ও রাখবার পারুম না। যখন হে অনুমতি দিব তখনই খালি দেখবার পারুম। বিশ্বাস করেন হে যা কইছে যেমনে কইছে তাই করছি আমরা। একডা বছর হইয়া গেছে আমার পোলা সুস্থ হইয়া ঘরে ফিরে নাই!

দুজন বাবা-মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ ভারী করে তুলল চারপাশটা। আকাশ বলল, অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাদের। চিন্তা করবেন না আমি আপনাদের ছেলের ট্রিটমেন্টের দায়িত্ব নেব। সে খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।

আকাশ: এতোদিন নিবিড় হিসেবে আসলে কে ছিল তা সবাই জানলেন। এইবার আসি মেইন পয়েন্টে। যে ছেলেটি কোমায় সে নিবিড় নয়। আমি বলছি তুরাগ নিবিড়। তাহলে তুরাগ কে? সে কোথায়? আসল সত্যি হচ্ছে তুরাগ নামের কারো অস্তিত্ব-ই নেই।

এবার প্রবেশ করলেন আশরাফুল হক, শিল্পী বেগম এবং মেধা। যে নিজের বিয়ের দিন হুট করে হারিয়ে গিয়েছিল।

আশরাফুল হক: একটা সত্যি কথা সবাইকে জানাতে চাই। আপনারা যাকে ইহসান হক তুরাগ নামে চেনেন সে
,আমার ছেলে নয়। আমার পরিবারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই তার। আমরা জাস্ট তাকে দত্তক নিয়েছিলাম। আজ থেকে সাত বছর আগে,,,আমার বাড়ির মেইনগেটের সামনে পনেরো-ষোল বছরের একটা বাচ্চা ছেলে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। আমি আর আমার স্ত্রী তাকে হসপিটালে ভর্তি করালাম। ডক্টর বললেন ছেলেটির মাথায় চোট পেয়েছে। মেমোরি লস হয়ে গেছে। তারপর থেকে আমি আর আমার স্ত্রী হলাম ওর বাবা-মা।

মেধা: কিন্তু আসল সত্যি হলো, না নিবিড় মাথায় আঘাত পেয়েছে; না ওর মেমোরি লস হয়। সবকিছু আমার-ই প্ল্যান ছিল। আকাশ ওর কোন ক্ষতি চায় নি। ও শুধু চেয়েছিল ওর সারার জীবন থেকে নিবিড়কে সরিয়ে দিতে। তাই নিবিড়কে প্রথমে একটা বোর্ডিং এ দ‍্যান সেখান থেকে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে চায়। কিন্তু তার আগেই আমি নিবিড়কে সরিয়ে নিয়ে আসি। ওর সঙ্গে একত্রে প্ল‍্যান করি।

তুরাগ: ড‍্যাড হোয়াট’স ইওর প্রবলেম? এইসব কি ননসেন্স বলছ তুমি? দি (মেধাকে) প্লিজ স্টপ।

মেধা: নিবিড় আমি আমার সব অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছি। তুমিও স্বীকার করে নাও। সত্যি না হলেও আমরা এতোদিন ভাই-বোন ছিলাম। আমি চাই না তুমি আর এই নোংরা পথে থাকো। ভাই সব ভুল আমার। আমি তোমাকে ব্রেইন ওয়াশ করিয়েছিলাম যাতে আকাশের প্রতি প্রতিশোধে তুমি উন্মাদ হয়ে ওঠো। যাতে আকাশের ওপর শোধ তোলার জন্য তুমি সারাকে যেকোনো মূল্যে নিজের করে নাও। আমি জানতাম আকাশ সারাকে যতোই ঘৃনা করুক, যতোই রাগ করুক ওর সবটুকু ভালবাসা সারার জন্য। ও যদি সারাকে কোনদিন নাও ক্ষমা করে তাও কাউকে জায়গা দেবে না ওর মনে। তাই আমি সারাকেই সরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম সারাকে মেরে ফেলতে। যন্ত্রণা দিয়ে তিলে তিলে মেরে ফেলতে। অন‍্যদিকে নিবিড় চেয়েছিল আকাশকে মারতে। আমরা দুইজন সব প্ল্যান একত্রে করলেও মোটিভ আলাদা ছিল। আমি যে সারাকে মারতে চাই এটা নিবিড় জানত না আবার নিবিড় যে আকাশকে মারতে চায় সেটাও আমি জানতাম না।

সায়ান: তার মানে তুরাগ নিবিড়? দুইবছর কলেজে একত্রে পড়েও কেন বুঝলাম না আমি? শিট,,

মেধা: অফিসার অ্যারেস্ট মি। আমি আর নিবিড় একত্রে ড্রাগ ডিলিং করতাম। এখানে অদ্বিতীর কোন দোষ ছিল না। আর আজকে হসপিটালে আকাশকে খুন করতে যাওয়ার প্ল‍্যান টাও নিবিড়ের। নিবিড় সবসময় অদ্বিতীকে ভুল বোঝাত। নিজে তুরাগ সেজে কোমায় যাওয়া ছেলেটাকে নিবিড় বানিয়ে অদ্বিতীকে বোঝাত আকাশের জন্য ওর নিবিড়ের এই অবস্থা। তাই অদ্বিতীর মনভর্তি আকাশের জন্য শুধু ঘৃনাই তৈরি হয়েছে। আর তুরাগ যা বলেছে তাই করেছে ও।
নিবিড়কে বড্ড ভালবাসে মেয়েটা। এতোই ভালবাসে যে নিবিড়ের জন্য নিজের ভাইয়ের বুকে ছুরি বসাতে গিয়েছে। ছিঃ নিবিড় অদ্বিতীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছ কখনো? ওর চোখদুটো দেখে আমার মতো খারাপ একটা মেয়ের-ও বুকে ধাক্কা লাগত! ভাবতাম কি করে পারো তুমি? তোমার চোখের সামনে নিবিড় ভেবে ঐ পোড়া পচে গলে যাওয়া ছেলেটাক ও দিনরাত সেবাযত্ন করত যার বডি দেখলে যে কারো গা গুলিয়ে যাবে আর তুমি আসল নিবিড় হয়ে ওর চোখের সামনে সুস্থ-সবল দাঁড়িয়ে থাকতে। তোমার সুস্থতার জন্য ও কাঁদতে কাঁদতে চোখে ঘা করে ফেলেছিল আর তুমি সব দাঁড়িয়ে দেখেছ। ওর কষ্টটা উপভোগ করেছ তুমি! এমনকি আকাশকে অদ্বিতী খুন করতে চাইছিল না। তুমি ঐ নিবিড় সাজিয়ে রাখা রোগীটাকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়েছ। আর তাই অদ্বিতীকে বাধ্য হতে হয়েছে। তুমি ভীষণ ভাগ‍্যবান ছিলে নিবিড়। অদ্বিতীর মতো আমি কোনো মেয়েকে দেখি নি। আফসোস হচ্ছে তুমি ওর মূল্য বুঝলে না। ভাগ্য ভালো মেয়েটা অজ্ঞান। জ্ঞান ফিরে এসব শুনলে জানি না কিভাবে সহ‍্য করবে। ও যার জন্য এতকিছু করল সে-ই কিনা ওর ইমোশন নিয়ে গেইম খেলছিল এতদিন।

অদ্বিতীকে অজ্ঞান অবস্থায় কোলে শুইয়ে দিল আকাশ। বাড়ির সবাই উপস্থিত। অথচ কেউ এগোচ্ছে না। এটা দেখে বেশ রেগে যায় আকাশ।

: কি সমস্যা কি তোমাদের? অদ্বিতী অজ্ঞান হয়ে গেছে আর আজব তো সব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছো। তোমাদের কোন সেন্স নাই? এই অদ্বিতী চোখ খোল্,,,তাকা,,,,একটু তাকা। দ‍্যাখ কোন ভয় নেই। তোর দাদার সামনে কার এত বড় সাহস তোকে দোষী বানাবে?? আসল অপরাধীরা ধরা পড়ে গেছে। তোর কোনো চিন্তা নেই।

চোখেমুখে বহুক্ষণ পানি ছিটানোর প্রভাবে অবশেষে ধীরে ধীরে অদ্বিতী চোখ মেলে এবং নিজেকে আকাশের কোলে আবিষ্কার করে। আকাশকে দেখেই শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে। খুব ভয়ে আছে মেয়েটা। আকাশকে ছাড়ছেই না কিছুতে।

নিবিড় আর মেধাকে অ্যারেস্ট করে নেওয়ার সময় মেধা চিৎকার করে বলতে লাগল, আকাশ, আসল সত‍্যিটা তোমার এখনো জানা হয় নি। নিবিড়ের ডায়েরীর প্রত‍্যেকটা লাইন মিথ্যা। বানানো। আর যে ছবিগুলো দেখেছিলে ওগুলো নিবিড় সারাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করে তুলিয়েছে। তবে এসবের মাস্টারমাইন্ড আমি বা নিবিড় কেউ কিন্তু নই। এসবের মাস্টারমাইন্ড হচ্ছে…..

চলবে
( কি গাইস? এখন কেমন হওয়া উচিত আকাশের রিঅ্যাকশন। এতোদিন নীরিহ আমার ওপর নির্মম অত‍্যাচার চালিয়েছে। এইবার আমার পালা,,,হুহু)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here