#তোর_নামেই_এই_শহর
#লেখিকা_সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব-১৯
(৫৪)
পরদিন মাঈশার বিয়েতে থাকবে না বলে বেঁকে বসলো হুরায়রা। বাবার কাছে গিয়ে বলেছে যে করেই হোক তাকে এখনি বাড়ি দিয়ে আসতে হবে। নয় তো এক ফোঁটা পানিও সে মুখে তুলবে না। হুরায়রার এমন অনর্থক বেঁকে বসার কারণ খুজে পেলো না কেউ। তুরিনের শ্বশুর শ্বাশুড়ি সহ সকলে অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু হুরায়রা মানতে নারাজ সে এখনি বাড়ি যাবে মানে এখনি যাবে। বাধ্য হয়ে জাফর আহমেদ মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য ইয়াদকে বলবে ভাবলেন। তাছাড়া তিনি তো এই দিকটা সামলাচ্ছেন তাই নিজে যেতে পারবেন না। ঠিক করলেন ইয়াদকে বলে হুরায়রাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিবেন কিন্তু হুরায়রা পুনরায় বেঁকে বসলো। সে কিছুতেই ইয়াদের সঙ্গে যাবে না দরকার পড়লে একা একা হেঁটে চলে যাবে পাঁচ কোশ পথ তবুও সে ইয়াদের সঙ্গে যাবে না।
হুরায়রার এমন ছেলেমানুষি বায়না দেখে হুমায়রা কিছুটা রেগে গেল। বিয়ে বাড়িতে এসে বিয়েতে থাকবে না এ কেমন কথা। তাছাড়া তুরিনের শ্বশুরবাড়ির লোকজন এত করে বলছে তাও মেয়ের জেদ সে বাড়ি যাবে। তিয়াশা কাছেই ছিলো হুরায়রার সঙ্গে সেও চলে যাবে বলতেই মেহেরিমা হতাশ হয়ে বললেন,
“তোরা কি শুরু করেছিস বলতো। বিয়ে বাড়িতে এসে এখন বিয়েতে থাকবি না বাড়ি চলে যাবি।”
“মামিমা হুরায়রা যেহেতু চলে যেতে চাইছে ওকে তো আর একা একা ছেড়ে দেয়া যাবে না তাই ভাবছি আমিও চলে যাই এর সঙ্গে। নাবাদকে বললে আমাদের পৌঁছে দিয়ে আবার ও ফিরে আসবে।”
তিয়াশার যুক্তি শুনে বেশি কিছু বললেন না কেউ। যেহেতু হুরায়রা থাকতে চাচ্ছে না তাকে জোর করে রাখাও যাবে না তাই তিয়াশার কথাটাই সকলে মেনে নিলো।
অবশ্য তিয়াশা আগেই ভেবেছিলো যদি এখান থেকে চলে যাওয়া যেত। সামিরের সামনে থাকতে বেশ অস্বস্তি লাগে তার। এমন অস্বস্তি নিয়ে আর যাই হোক কোথাও দুদণ্ড শান্তি পাওয়া যায় না। ভাগ্যিস হুরায়রা যাওয়ার বায়না করেছিলো তাতেই সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
গ্রামের পিচঢালা সুরু রাস্তা দিয়ে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে। তিয়াশা হুরায়রা গাড়ির পেছনের সিটে বসেছে। দুজন দুদিকে জানালার বাহিরে তাকিয়ে বসে আছে। নাবাদ চুপচাপ ড্রাইভিং করছে। হুরায়রা বাহিরের দিকে তাকিয়ে অনবরত অশ্রু বর্ষণ করছে। ইয়াদের উপর প্রচণ্ড অভিমান তার। তাছাড়া গতরাতের চড়টা বেশ জোরেই লেগেছে গালে। ফুলে লাল হয়ে আছে গালের একপাশ। প্রচণ্ড ব্যাথা। হুরায়রা আনমনে হাত বুলায় গালে অচিরেই তার চোখ ফেটে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। নাক টেনে টেনে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু কান্না থামছেই না। তাকে কান্না করতে দেখে নাবাদ বলল,
“ঠিক কি কারণে এমন জেদ করছিস বলতো হুর। সকলের মনে কষ্ট দিয়ে তোকে বাড়ি যেতেই হচ্ছে।”
হুরায়রা নাবাদের কথা শুনলো কিন্তু জবাব দিতে পারলো না। কান্নার বেগ বেড়ে চলেছে। তিয়াশা হুরায়রার হাতের উপর হাত রাখলো। উষ্ণ হাতের ছোঁয়ায় নীরব শান্তনা দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। গতরাতে কিছু ঘটনার সাক্ষী সেও হয়েছিলো। অথচ তাকে দুজনের কেউ খেয়াল করে নি। হুরায়রার গালে থাপ্পড়ের শব্দ তিয়াশার কান অবধি পৌঁছেছিলো। বারান্দার একটা কোণে দাড়িয়েছিলো সে। হুরায়রার উপর অকারণে চটে যাবার কারণ সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে পায় নি তিয়াশা। শুধু শাড়ি ঠিক ছিলো না বলে হুরায়রার গালে এত জোড়ে থাপ্পড় দেয় নি ইয়াদ। কারণ অন্য ছিলো।
তিয়াশা পুনরায় জানালার বাহিরে দৃষ্টি ফেললো। কি অদ্ভুত মিল তার আর হুরায়রার মাঝে। দুজনি এমন কাউকে ভালোবেসেছে যাদের নিজের করে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। মাঝে মাঝে হুরায়রা ভাবে বিধাতা কেন এত প্রেম দিয়েছে মনে যদি না প্রেমিক পুরুষটিকে নিজের প্রেমের বর্ষণে সিক্তই না করতে পারে। ইয়াদ আর সামির দুজন দুই মেরুর মানুষ। সে না পারবে ইয়াদের সঙ্গে বেইমানী করতে না পারবে ভালোবাসা ভুলে থাকতে। কি দারুণ যন্ত্রণাই না ভোগ করতে হয় তাকে দিনভর রাতভর।
(৫৫)
প্রায় দশ দিন কেটে গেছে হুরায়রা ইয়াদের মুখোমুখি হয় নি। ইয়াদও চেষ্টা করে নি কথা বলার। দুজন দুজনকে একপ্রকার নিজস্ব গন্ডিতে আবদ্ধ করে রেখেছে বলতে গেলে। হুরায়রার পরীক্ষার মাত্র তিনটে দিন বাকি। এই কয়দিন পড়াশুনা নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় কাটছে তার। আর যাই হোক কোন ভাবেই রেজাল্ট খারাপ করা চলবে না যে করেই হোক তাকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। দিনরাত এক করে পড়াশুনা করছে সে।
রাত প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই করছে। বাড়ির সকলে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে। পুরো বাড়িতে মাত্র একটি ঘরে আলো জ্বলছে। রাত জেগে পড়ে হুরায়রা তাই অনেক রাত পর্যন্ত ঘরে আলো জ্বলে। হুরায়রা ঘরের জানালার কবাট মেলে টেবিলে বসে পড়ছে। বাহিরে নিশুতির আধার। মাঝে মাঝে পুবের সমীরণ এসে ঘরে ঢুকছে। দুই একটা জোনাকিপোকা জানালা দিয়ে প্রবেশ করে বইয়ের চারপাশে ঘুর ঘুর করছে। হুরায়রা বই বন্ধ করে কতক্ষণ তাদের দেখলো। বিধাতার কি অপূর্ব সৃষ্টি এই জোনাকিপোকা। এরা নিজের শরীরে আলো নিয়ে দিব্যি চলাফেরা করে। জোনাকিপোকা গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ইয়াদের কথা স্মরণ হয়। সেবার যখন নবম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার পর সবাই তুরিনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলো ইয়াদ মাঝরাতে তাকে ডেকে একটা খোলা বাগানে নিয়ে গিয়েছিলো। শত শত জোনাকিপোকারা সেখানে মিলন মেলায় মেতে উঠেছিলো। ইয়াদ কয়েকটা জোনাকিপোকা কাচের বয়াম ভরে এনে দিয়েছিলো। শীতের রাত উত্তরের হাঁড় কাঁপানো হীমের হাওয়া তার সাথে জোনাকিপোকার ছুটোছুটি কি অপূর্ব ছিলো সময় টা। কাচের বয়ামে জোনাকিপোকা গুলো বেশিদিন বেঁচে ছিলো না তবে মরে গিয়েও তারা নিজেদের শরীরে আলো জ্বেলে রেখেছিলো। ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো হুরায়রা। সেদিন প্রথম ইয়াদের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেছিলো হুরায়রা।
পড়ার টেবিল থেকে উঠে এসে বিছানায় উপর হয়ে শুয়ে পড়লো হুরায়রা। মনটা বড্ড অস্থির হয়ে আছে। একটু কাঁদতে পারলে হয় তো হাল্কা হতো। কিন্তু আজকাল আর সহজে চোখে জল আসে না। ভেতরটা কেমন যেন পাথর পাথর হয়ে গেছে। ইয়াদের কথা মনে করে কয়েক দপা অশ্রু বর্ষণ করলো হুরায়রা। কপালে মাথা ঠেকিয়ে, বালিশে মুখ গুঁজে বিভিন্ন অঙ্গবিন্যাসে অশ্রু বর্ষণ করে শেষে উঠে বসলো। অনেক দিন পর মন খুলে কেঁদেছে সে। বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ কান্না করার দরুণ চোখ মুখ ফুলে রক্তিম হয়ে উঠেছে। পানির পিপাসাও পেয়েছে খুব। গলাটা কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে একটু পানি খেয়ে গলা না ভিজালে আর চলছে না।
বিছানা ছেড়ে উঠে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো হুরায়রা। ইয়াদের ঘর পার হয়ে কিছুটা এগিয়ে এসে থমকে দাঁড়ায় সে। ছাদের সিঁড়ির কাছে কারো অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে অবছা দেখেও অবয়বটিকে চিনতে দেরি করলো না সে। ইয়াদ বাহুতে হাত গুঁজে রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে হুরায়রাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিঞ্চিৎ সময় ব্যয় করে বলল,
“ঘুমোস নি এখনো। এত রাতে বেড়িয়ে এলি যে।”
হুরায়রা সহসা কথা বলতে পারলো না। অনেকদিন পর ইয়াদের গলার স্বর কর্ণকুহর হতেই ভেতরটা কেমন মুচড়ে উঠলো। ইয়াদ হুরায়রার জবাবের আশা না করেই বলল,
“তোকে কিছু বলার আছে হুর। আজ না বললে হয় তো আর কোন দিন বলা হবে না।”
ইয়াদের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর হুরায়রাকে মুহূর্তে দূর্বল করে তুললো। অন্ধকারে অজান্তেই চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। ইয়াদের ক্ষীণ কন্ঠে সহস্র যন্ত্রণা উপচে পড়ছে দেখেও হুরায়রা রা শব্দটি করলো না নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। ইয়াদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“জানিস তো মানুষ কখন সবচেয়ে বেশি অসহায় বোধ করে? যখন সে দেখে তার আশেপাশে সকলেই আছে কিন্তু দুঃক্ষ যন্ত্রণা বুঝার মতো কিংবা ভাগ করে নেয়ার মতো এমন কেউ নেই। বন্ধুহীন জীবন কতটা যন্ত্রণাময় সেটা বোধ করি আমার থেকে কেউ বেশি অনুভব করতে পারে না। জীবনে চলতে গেলে, বাঁচতে গেলে একজন বন্ধুর বড্ড প্রয়োজন। সে হোক প্রেয়সী কিংবা কাছের কেউ। আমি বড্ড হৃদয়হীন। যার জীবনে একজন বন্ধুও কোন দিন জুটেনি। শুধু জুটেনি না কোন দিন কাউকে বন্ধু হয়ে কাছে ঘেঁষতে দেই নি। আর ভালোবাসা সে তো কেবল সুদূরবর্তী কোন শব্দ মাত্র। প্রেমিক পুরুষদের ধর্ম কি জানিস এরা সহজে প্রেম নিবেদন করতে জানে না শুধু গোপনে ঘুমন্ত প্রেয়সীর কপালে উষ্ণ চুম্বন একে দিতে জানে। এরা কখনো কখনো খুব রোমান্টিক হতে জানে আবার কখনো হৃদয়হীন। এরা ভালোবাসা ব্যক্ত করার চেয়ে অব্যক্ত করে ভালোবেসে যাওয়াটাই পছন্দ করে। ভালোবাসলে যে সেটা প্রকাশ করা লাগে সেটা হয় তো তারা জানে না।”
হুরায়রা চোখ দুটো টলমল করছে। ইয়াদ খানিকটা সময় হুরায়রার নিশ্চুপতা অনুভব করলো। মেয়েটা সত্যি অনেক বদলে গেছে হয় তো সে নিজেই বাধ্য করেছে বদলে যেতে। অবশ্য তাতে ইয়াদের আক্ষেপ নেই। মানুষ মাত্রই বদল ঘটা। সেও তো বদলে গেছে তাহলে হুরায়রা বদলে গেলে বা ক্ষতি কি। আজ না হয় কাল কাউকে না কাউকে তো বদলে যেতেই হতো। ভালোই হয়েছে হুরায়রা নিজেকে তার কাছ থেকে গুটিয়ে নিয়েছে নয় তো বেশ বড়সড় কষ্ট পেতে হতো সামনে।
চলবে,,,,।
(এডিট ছাড়া পর্ব। রিচ কমে গছে সবাই রেসপন্স করবেন এবং ঘঠনমুলক মন্তব্য করবেন।)