তোর নামেই শুরু পর্ব -০১

রিশান ভাইয়া দেখো ছেলেগুলো আমাকে খুব বাজে ইশারা দিচ্ছে।

রিশান নামক ব্যক্তিটির কোন হেলদোল নেই। সে আপন মনে মোবাইলে মগ্ন। কী যেন খুব মনোযোগ সহকারে দেখছে আর হাঁটছে সাথে আমিও। সে আমার কথা কর্ণপাত করলো কিনা জানি না। আমি তার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছি। রাস্তার ওপার থেকে কয়েকটা ছেলেপেলে আমাকে খারাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে। পায়ে হেঁটে সামনে এগোচ্ছি আমরা। আমি মাথা নিচু করে হাঁটছি আর চোখের জল ফেলছি। একের পর এক নোংরা ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে তারা। কিন্তু আশ্চর্য হচ্ছি রিশান ভাইয়া কিছু বলছে না যে? ভাইয়া তো এমন না কোন মেয়েকে কেউ এভাবে টিচ করছে তা কখনো উনি মেনে নেবেন না। তাহলে আমার সাথে কেন এমন করছেন? আমি কি করেছি?
এক পর্যায়ে একটা ছেলে এসে আমার ওড়নায় টান দিলো। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। পিছনে তাকাতেই ছেলেটা বললো, বেবি আই ওয়ান্ট ইউ। কাম ফাস্ট।

আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছি না। আরেকবার রিশান ভাইয়ার দিকে তাকালাম কিন্তু তিনি আমাকে পাত্তাই দিলেন না। রাগ তার সাথে কষ্ট আমাকে চেপে ধরলো। রিশান ভাইয়া আমার কোন কথাই শুনতে পাচ্ছে না।

ভাইয়া দেখো কি বলছে আমাকে।

ভাইয়া চুপ। ছেলেটা আবার বললো, কি বলবে? তুমি আমাদের সাথে এসো, ফাস্ট বেবি।

এতেও ভাইয়া চুপ কিছুই বলছে না। কিন্তু কেন?

রাগ হচ্ছে প্রচুর, প্রচুর রাগে তার গালে বসিয়ে দিলাম এক চড়। সে গালে হাত দিয়ে হা করে দাঁড়িয়ে থাকলো। গালে আমার হাতের পাঁচ আঙুল স্পষ্ট! পিছনে যারা এতোক্ষণ উস্কানি দিচ্ছিল তারাও স্তব্ধ। পিছন থেকে আরেকটা ছেলে এগিয়ে আসলো। সে বললো, হোয়াট হ্যাপেন্ড? বেবি,
তাকেও বসিয়ে দিলাম আরেকটা। সবাই থ, আর কেউ সামনে এগোবার সাহস পেলো না। সবাই চুপ।

সামনে তাকিয়ে দেখলাম রিশান ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর মুচকি হাসছেন। আমার বোধগম্য হলো না। তার হাসি দেখে গা জ্বলছে আমার।

হাসছো কেন? এমন করলে যে?

মেঘা এখন যেই কাজটা করলি এটা আর একটু আগে করলে ওরা তোকে কিছু বলার সাহস পেতো না বুঝলি। শোন তোরা মেয়েরা যদি সাহসী না হস তাহলে কীভাবে হবে? নিজেকে নিজেই সেফ করতে শিখ। মনে রাখবি তুই কারো থেকে কম না। আজ আমি না থাকলে তুই যদি একা হতি তখন কি করতি? এখন চল বাসায় চল।

তার কথায় বিস্মিত। তাহলে ইচ্ছে করেই চুপ ছিলেন উনি?

(আমি মৃত্তিকা মেহুল মেঘা। আমি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। আর যার সাথে কথা বলছিলাম সে ইহনাফ আফসান রিশান। আমার ফুফুর একমাত্র ছেলে আমার ফুফাতো ভাই। এবার অনার্স ফাইনালে পড়ছে। আমার বাবা মা নেই। এক এক্সিডেন্টে মারা গেছেন দুজনেই। এখন ফুফুর বাড়িতে থাকি। ফুফু কোন অংশেই মা থেকে কম না। ফুফা তো আমি বলতেই পাগল। তাদের কোন মেয়ে নেই বলে আমাকে দিয়েই মেয়ের সব শখ আল্লাদ পূরণ হয় তাদের। বাবা মায়ের মৃত্যু হয়েছে দশ বছর আগে আমি তখন ততটা বড় ছিলাম না তখন থেকেই তাদের কাছে থাকি। আমার মা বাবা না থাকলেও কখনো তাদের অভাব বুঝি নি আমি। সবার আদরে বড় হয়েছি আমি। রিশান ভাইয়া আর আমি একই ভার্সিটিতে পড়ি। আজকে বাড়িতে ফেরার সময় গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই পায়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরছিলাম আর পথেই এই ঘটনা‌ ঘটলো।)

আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। সামনে এগোতে পারছি না কেমন যেন লাগছে। রিশান ভাইয়া আমাকে বারবার ডাকছে। আমি কানে নিচ্ছি না। আমি দাঁড়িয়েই আছি। ভয়ে পাথর হয়ে যাচ্ছি গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। চোখের সামনের জিনিসটার দিকে তাকিয়ে আছি আমি। রিশান ভাইয়া এবার আমার দিকে এগিয়ে এলেন। সামনে এসেই বললেন, এই বেয়াদব ডাকছি কানে শুনছিস না? আসছিস না কেন?
এবার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটাই ঘটলো। আমি দৌড়ে রিশান ভাইয়াকে জরিয়ে ধরলাম সাথে জোরে চিৎকার। ভাইয়া বুঝতে পারলেন না কি হয়েছে।

ভাইয়া অস্থির হয়ে উঠলো। মেঘা এই মেঘা কি হয়েছে? বল ভয় পাচ্ছিস কেন? এই মেয়ে কি হয়েছে?

ভাইয়া ভাইয়া তেলাপোকা, দেখো ওটা উড়ছে।

রিশান ভাইয়া এবার রাগি দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।‌

স্টুপিড লেডি! এই সামন্য কারণে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে?

এটা সামান্য বিষয় ভাইয়া? ওটা উড়ছিলো। আমি ভয় পাই।

এই জন্যই তো তুই স্টুপিড। গর্দভ কোথাকার।

ভাইয়া তুমি ভয় পাও না তা ভালো কিন্তু আমাকে এভাবে বলবে না বুঝলে?

এই তুই বাড়ি যাবি নাকি আমি একাই যাবো?

যাও তুমি। আমি তোমার সাথে যাবো না।

সিরিয়াসলি মেঘা?

আমি একাই যেতে পারবো।

ওকে।

ভাইয়া হাঁটা শুরু করে দিলো। আমি দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছি। ভাইয়া কিছুদূর গিয়ে ফিরে এলেন। আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

মেঘা তুই কি সত্যি যাবি না আমার সাথে?

নাহ, নাহ, নাহ,

আচ্ছা তাহলে আবার আরশোলা দেখলে কাকে জরিয়ে ধরবি?

আমি বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে আছি। আমার মুখে আতঙ্কের ছাপ। এমনিতে তেলাপোকা এতোটা ভয় না পেলেও উড়ন্ত তেলাপোকা আমার জন্য যম। আমার মুখের অবস্থা দেখে রিশান ভাইয়া হো হো করে হেসে দিলেন।

বললেন, যাবি?

আমি হাঁটা শুরু করে দিলাম। ভাইয়া হেসে আমার সাথে চলা শুরু করলেন।

আজকে হেঁটেই বাড়ি আসলাম। বাড়িতে প্রবেশ করেই মুখ ফুলিয়ে উপরে যেতে নিলাম। রিশান ভাইয়াকে ফেলেই রাগে গজগজ করতে করতে তার আগেই হেঁটে চলে এসেছি। হঠাৎ ফুফা বলে উঠলো, আমার প্রিন্সেসটা এতো রেগে আছে কেন? কি হয়েছে প্রিন্সেস?

আমি মুখ ফুলিয়ে সোফায় বসে পড়লাম। উদ্দেশ্য আজ রিশান ভাইয়ার নামে বিচার দিবো। আমাকে ভয় দেখানো?

আমি চুপ করে বসে আছি। ফুফা বললেন, কি হয়েছে মামণি? কেউ কিছু বলেছে? আমাকে বলো। রিশান কিছু বলেছে?

আমি তাও মুখ ফুলিয়ে বসে থাকলাম।

এরপর ফুফা ফুফুকে ডাক দিলেন। মণি মণি এদিকে এসো তো।

রান্নাঘর থেকে ফুফু দৌড়ে এলেন।

কি হয়েছে বলো,

ফুফা আমাকে ইশারা করলেন। আমি তো মুখ ফুলিয়েই বসে। একটা কথাও বলছি না।

মোবাইলে কারো সাথে কথা বলতে বলতে রিশান ভাইয়া বাড়িতে প্রবেশ করলো। আমি তাকে দেখে আরো ফুঁসে উঠলাম। ফুফু যেয়ে ভাইয়ার কান ধরলো। ভাইয়া ব্যাথায় আউ শব্দ করছে।

মা কি করছো লাগছে তো,

আমি তো মনে মনে বেজায় খুশি। বেশ হয়েছে, আমাকে ভয় দেখানো।

এবার বলতে শুরু করলাম, ছোট মা (ফুফু) আজ ভাইয়া আমাকে ভয় দেখিয়েছে। উড়ন্ত তেলাপোকা দেখে আমি ভয় পেয়েছিলাম এরপর ভাইয়া আরো ভয় দেখিয়েছে‌।

রিশান ভাইয়া বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

তবে রে, এই তোকে কখন ভয় দেখিয়েছি আমি? দাঁড়া আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।
তার কথার সঙ্গে সঙ্গেই ফুফু তার কান আরো শক্ত করে চেপে ধরল।

তুই আমার সামনেই আমার মেয়েটাকে এতো বড় হুমকি দিচ্ছিস? তোর সাহস তো কম না। আজ তোকে,,

মা লাগছে ছাড়ো প্লিজ।

বেশ হয়েছে, আমার লিটেল প্রিন্সেসের সাথে এমন করে এভাবেই তোমার শাস্তি হবে। ঠিক বলেছি না প্রিন্সেস?

হুম একদম ঠিক বলেছো।

আমি অনেক খুশি হলাম। রিশান ভাইয়া আমাকে চোখ রাঙানি দিচ্ছে তাতে পাত্তা দিলাম না। আমি বেশ মজা নিচ্ছি।

আমি তো তোমাদের ছেলে না তাই না শুধু প্রিন্সেস প্রিন্সেস করো।

কেন তোমার হিংসে হয় বুঝি?

মেঘা তোর খবর আছে।

জিভ কেটে তাকে মুখ ভেংচে আমি রুমে চলে গেলাম। ফ্রেশ হতে হবে দুপুরের টাটকা রোদে অবস্থা নাজেহাল। ওয়াসরুমে চলে গেলাম গোসলের উদ্দেশ্যে।

ওয়াসরুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম রিশান ভাইয়া আমার ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বুঝতে পারলাম সে প্রতিশোধ নিতে এসেছে। এখন কি করবো আমি?

কিরে? তখন খুব খুশি হয়েছিলি।‌ এখন কি করবি?

তু,,তু,, তুমি এখানে কেন?

তোতলামি করছিস কেন? আগে মনে ছিলো না? মাকে দিয়ে বকা খাওয়ালি কেন রে? কানটা দেখেছিস একদম লাল করে দিয়েছে।

খুব হাসি পাচ্ছে তার চেহারার অবস্থা আর কথা শুনে। হি হি করে হেসেই ফেললাম। রিশান‌ ভাইয়া আমার দিকে রক্তিম চোখে চেয়ে।

খুব মজা নিচ্ছিস তাই না? দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।

ভাইয়া আমাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলেন।

ভাইয়া লাগছে।

লাগুক, কি মনে করিস আমাকে?

আমি আবার কি মনে করবো তোমাকে?

মেঘা আমাকে একটুও বুঝিস না তুই?

কি বলছো ভাইয়া?

মেঘা তুই এখন আর ছোট নেই।

বলেই ভাইয়া চলে গেলেন। হঠাৎ কি হলো আমি বুঝতে পারলাম না। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

চলবে….

#তোর_নামেই_শুরু
#তানজিনা_তিহা (লেখনীতে)
#সূচনা_পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here