দ্বিতীয় বসন্ত, পর্ব:২

#দ্বিতীয়_বসন্ত
#পর্বঃ০২
#Arshi_Ayat

রাত দু’টোর ঘন্টা কবলেই বাজলো।প্রিয়তি বিছানায় শুয়ে একদৃষ্টে চেয়ে আছে সিলিংফ্যানে।মনে হচ্ছে চোখের সামনে মায়ের লাশটা ঝুলছে ফ্যানে।কি বিভৎস!
প্রিয়তি চোখ বন্ধ করে ফেললো।চোখের কোণা বেয়ে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো।

মায়ের মৃত্যুর আজ পঞ্চম দিন।পাঁচটা দিন ধরে মা কবরে শুয়ে আছে।পাঁচদিন ধরে দেখা হয় না,কথা হয় না।ভেতরটা খা খা করে প্রিয়তির।মা থাকতে পৃথিবীটা কতো নিরাপদ ছিলো ওর জন্য কিন্তু মা চলে যেতেই পাঁচদিনের মাথায় নিষ্ঠুর পৃথিবী তার ঘৃণ্য আচরণ দেখিয়েই দিলো।পৃথিবীতে কেউই উটকো ঝামেলা চায় না।উটকো ঝামেলা মানেই সংসারে অশান্তি।আর কেউ যেচে তা আনবে না!তাই তো ফুপু কাউকে কিছু না বলে চুপিচুপি প্রিয়তিকে চলে যেতে বললেন কারণটা ওই যে উটকো ঝামেলা কেউই চায় না!

আজানের আগে চোখের পাতায় ঘুম একটুখানি ধরা দিয়েছিলো।কিন্তু তা বেশিক্ষণ টেকে নি।আজান হতেই ঘুম ছুটে গেলো।প্রিয়তি ওজু করে নামাজ আদায় করে ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে দাড়ালো।এখনো আলো তেমন ফোটেনি,তির তির হওয়া বইছে,পাখিরা কিচিরমিচির করছে,আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে।প্রিয়তি মেঘগুলোর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।কি সুন্দর এরা ভেসে বেড়াচ্ছে বিশাল আকাশের বুকে।যেনো এদের চেয়ে স্বাধীন কেউই না।কিছুক্ষণ বারান্দার দেয়ালে হেলান দিয়ে আকাশের পানে চেয়েছিলো প্রিয়তি।হঠাৎই এক প্রবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে চলে এলো।এখনো কেউ ওঠে নি।ঘড়িতে এখন সাড়ে পাঁচটা বাজে।সবাই উঠতে উঠতে সাতটা বাজবে।প্রিয়তি একটা চাদর গায়ে দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়লো।

রাস্তায় তেমন মানুষজন নেই।যারা আছে তারা সবাই মর্নিওয়াক করতে বেরিয়েছে এদের মধ্যে বেশিরভাগই মধ্যবয়সী আর এদের বেশিরভাগেরই ডায়াবেটিস অথবা হাই ব্লাড প্রেশার আছে।আর এটা ডাক্তারের পরামর্শেই প্রতিদিন মর্নিওয়াকে বের হয়।বেঁচে থাকার জন্য মানুষের কতো প্রচেষ্টা আর এদিকে প্রিয়তির এই জীবনটাকে বোঝা মনে হয়।যদি কাউকে জীবন দান করা যেতো তবে সে কোনো এক সুখী মানুষকে তার জীবনটা দিয়ে যেতো।কিন্তু আফসোস দু’টোর একটাও নেই!

রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রিয়তি গঙ্গাধারে এসে পৌঁছালো।নদীর উচ্ছল পানিতে সূর্যের আলো দোল খাচ্ছে।ঘাট থেকে মাত্রই একটা মালবাহী জাহাজ ছেড়েছে।এছাড়া ব্যস্ত নদীর বুকে ছোটো ছোটো নৌকা,স্টিমার তো চলছেই।প্রিয়তি কিছুক্ষণ নদীর পাড়েই ঘোরাঘুরি করলো।তারপর আবার উল্টোপথে বাড়ি ফিরলো।ফিরতে ফিরতে সাতটা বাজলো।প্রায় সবাই উঠে গেছে।প্রিয়তি বাসায় আসতেই ওর ফুপু উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করলো,’কোথায় গিয়েছিলি?’

‘এইতো একটু হাঁটতে।আমি একটু বের হবো ফুপু।’

‘না দুপুরে খেয়ে যাস।’গলায় জোর নেই।বলার জন্যই বলা।

‘না ফুপু যেতে হবে আমায়।আমি ব্যাগটা নিয়ে আসছি।’

প্রিয়তি ঘরে এসে কাল রাতে গোছানো ব্যাগটা বিছানার ওপর রেখে ওখান থেকে একটা স্কার্ফ বের করে বেঁধে নিলো।তারপর ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ডাইনিং রুমে চলে এলো।এখন টেবিলে বসে নাস্তা করছে।প্রিয়তির নাস্তা করতে ইচ্ছে করছে না তবুও সবার সাথে বসলো।কিন্তু বরাবর চোখ যেতেই দেখলো ফয়েজ ওর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।প্রিয়তি আর সেদিকে চাইলো না।নামমাত্র খেয়ে ফুপির থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।

বাসায় এসে সজোরে কড়া নাড়লো প্রিয়তি।কয়েকবার নাড়ার পর ভেতর থেকে কেউ একজন দরজা খুললো।প্রিয়তি সামনে তাকাতেই দেখলো ওই মেয়েটা দাড়িয়ে আছে হাতে খুন্তি।বোধহয় রান্না করছিলো।প্রিয়তিকে দেখে দরজা থেকে চেপে দাড়ালো মেয়েটি।প্রিয়তি দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে হনহনিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।ঘরে এসে সোজা শাওয়ার নিতে চলে গেলো।গোসল করে বেরুতেই দেখলো বোরহান সাহেব ওর খাটের ওপর বসে আছে।ওকে দেখেই তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,’তুমি না বললে এ বাড়িতে আর আসবে না।তাহলে এলে যে?নাকি অন্যকোথায় ঠাই মেলেনি বলে এসেছো।’

এমন জ্বালা ধরানো কথা শুনেও প্রিয়তি কিছু বলল না।যেনো সে কিছু শুনতেই পায় নি।ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাড়িয়ে অতি মনোযোগে মাথা মুচছে।
বোরহান সাহেব কিছুটা অপমানিত বোধ করে উঠে দাড়ালেন।তারপর বললেন,’শোনো এই বাড়িতে থাকতে হলে তোমার নতুন মায়ের কথা শুনে চলতে হবে।বেয়াদবি করলে বাড়ি থেকে বের করে দেবো।বুঝতে পেরেছো?’

‘না বুঝতে পারি নি।বাড়ির অর্ধেক আমার মায়ের নামে।বাকি অর্ধেক আপনার।আমার মা যেহেতু নেই সেহেতু অর্ধেকের মালিক আমি।এখন এই অর্ধেকে আমি যা ইচ্ছে করবো কারো হুকুমের ধার ধরবো না।বুঝতে পারলেন?’

রুঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো বোরহান সাহেব।সে বেরুতেই প্রিয়তি দরজায় খিল তুলে বিছানায় শুয়ে পড়লো।মাথাটা ভার হয়ে আছে।এখন ঘুমাতে পারলে শান্তি লাগতো।খাটে শুতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো।

প্রায় বিকেল হয়ে গেছে।পেটের ক্ষিধেই প্রিয়তিকে জাগিয়ে তুললো তা নাহলে কয়েকযুগ এভাবেই ঘুমিয়ে কাটাতে পারবে সে।আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসলো।দুর্বল পায়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে দরজা খুলতেই প্রথমে চোখ গেলো বসার ঘরের সোফায়!তার বাবা আর নতুন বউ মিলে টিভি দেখছে আর হাসছে।প্রিয়তি আর সেদিকে তাকালো না।রান্নাঘরে গিয়ে একগ্লাস পানি খেয়ে আবার ঘরে আসলো।পার্স থেকে টাকা বের করে সদর দরজা দিয়ে বের হলো মুদি দোকানে যাওয়ার জন্য।এক কেজি চাল আর একহালি ডিম কেনার জন্য।

বাড়ির পাশেই মুদি দোকানের অভাব নেই।প্রিয়তি সদাই কিনে আবার ফিরে এলো।তারপর ভাত রান্না করে আর ডিম ভেজে পেটে ক্ষিধে মিটিয়ে আবার ঘরে চলে আসলো।খাটের ওপর বসে ফোনটা চাল করলো।গত পাঁচদিন ধরে ফোনটা বন্ধ।ফোন অন করতেই দেখলো বন্ধু,বান্ধব আর দূরের আত্মীয় স্বজনের কল এসে ফোন জ্যাম হয়ে গেছে।সেখান থেকে বেছে বেছে দু চার জানের কথা বলে রেডি হয়ে নিলো টিউশনিতে যাওয়ার জন্য।আজ পাঁচদিন ধরে যাওয়া হয় না টিউশনিতে তারা অবশ্য প্রিয়তির মা মারা যাওয়ার ব্যাপারটা জানে।তাই এখনো কিছু বলছে না কিন্তু আর কামাই দেওয়া ঠিক হবে না।রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লো প্রিয়তি।

সন্ধ্যা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত দু’টো ছেলেকে পড়িয়ে তারপর বাসায় আসবে সে।

এভাবেই পনেরোদিন গেলো।প্রাত্যহিক রুটিন মতো নিজের কাজ,পড়াশোনা করে ক্লান্ত চোখে রাতের আধারে মায়ের ছবিটা বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ে প্রিয়তি।মাঝেমধ্যে মনে হয় মায়ের কাছে চলে যেতে কিন্তু সাহসে কুলোয় না।

আজও টিউশনি করিয়ে রাত নয়টার সময় বাড়ি ফিরলো প্রিয়তি।আজ বাড়ি ফিরেই শুয়ে পড়লো।ভিষণ ক্লান্ত লাগছে।পেটে ক্ষিধে থাকলেও চোখ খুলে রাখা বড়ো দায়।তাই ক্ষিধে নিয়েই শুয়ে পড়লো।কাল সকালে আবার বান্দরবানের বাস ধরতে হবে।বান্দরবান প্রিয়তির ছোটো খালার বাসা অনেকদিন ধরে যেতে বলছে ওকে খালা কিন্তু প্রিয়তি ইচ্ছে করেই যায় না।তবে গতকাল সকালে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে বলেছে বলেই কিছুদিনের জন্য সব ছেড়ে বান্দরবানে যেতে রাজি হয়েছে সে।হয়তো সেখানে গেলে ভালো লাগবে।

সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে ব্যাগটা গুছিয়ে নিলো।এখন সবে মাত্র পাঁচটা বাজে।নিজেও রেডি হয়ে রান্নাঘরে গিয়ে একটা ডিম ভেজে খেয়ে নিলো।এখন রুটি বানানোট সময় নেই।একটা ডিম আর একগ্লাস পানি খেয়ে বেরিয়ে পড়লো।সাড়ে ছয়টায় বাস ছাড়বে।যেতে যেতেও একঘন্টার মতো লাগবে।

বাসে উঠে জানালার পাশের সীট’টায় বসলো প্রিয়তি।এমনিতে জানালার পাশের সীটেই বসতে হবে এমন কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম নেই প্রিয়তির।কিন্তু আজ জানালার পাশেই বসতে ইচ্ছে করছে।তাই টিকিট’টাও সেভাবেই কেটেছে।

ভোর সাড়ে ছয়টা।বাস ছেড়ে দিয়েছে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে।প্রিয়তি কানে হেডফোন গুঁজে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো।দুরের গাছপালা,দোকানপাট গুলো সাই সাই করে পিছনে চলে যাচ্ছে।সকালের মোলায়েম হাওয়া প্রিয়তির সারা শরীর স্পর্শ করে যাচ্ছে।এরমধ্যেই ফোন এলো ছোটো খালার।প্রিয়তি রিসিভ করতেই তিনি বললেম,’প্রিয়ু কোথায় তুই?’

‘এইতো আসছি।বাসে উঠেছি।’

‘সাবধানে আসিস মা।এসে আমাকে ফোন দিস।আমি আলভিকে পাঠাবো।’

আলভির কথা শুনে ঠোঁটের শেষ সীমানায় একটুখানি হাসি চিবুকের কাছে এসে হারিয়ে গেলো।আলভিকে প্রিয়তি পছন্দ করে অনেক আগে থেকেই।সেটা অবশ্য মা ছাড়া কেউ জানে না।আলভি আর সে সমবয়সী।মা বলেছিলো ওদের বিষয়ে কথা বলবে কিন্তু…একটা দীর্ঘশ্বাস আবারো ভেতরটা ভারী করে তুললো।ফোনের গ্যালারিতে গিয়ে মায়ের ছবিগুলো দেখতে লাগলো।কখনো মা মেয়ে উচ্ছল হাসিতে মেতে উঠেছে তো কখনো দুজনে আকাশ দেখছে আবার কখনো কখনো ঘুড়ি উড়াচ্ছে।এসব দেখতে দেখতে কখন যে প্রিয়তির চোখ ভিজে উঠেছে সে খেয়াল নেই।হঠাৎ বাস ঝাঁকি খাওয়ায় হুস ফিরলে গ্যালারি থেকে বের হওয়ার সময় একটা ছবিতে চেখ পড়লো।ছবিটা আলভির!আলভি ফুচকা খাচ্ছে।এটা বছর দুয়েক আগের ছবি।সেদিন আলভি,সৈকত,সামির,মৌ আর ও একসাথে ঘুরতে বেরিয়ে ছিলো।সেদিন সবার অগোচরেই আলভির কয়েকটা ছবি তুলে নিয়েছিলো প্রিয়তি।মাঝেমধ্যেই ছবিগুলো দেখতে সে।আজ অনেকদিন পর ছবিগুলো দেখছে।আর কয়েকঘন্টা পর সামনাসামনিই দেখা হবে।ছবিগুলো উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎই দেখলো বাসের মানুষজন চিল্লাচ্ছে অস্বাভাবিক ভাবে।কেউ কেউ তো ড্রাইভারকে গালাগালও দিচ্ছে।প্রিয়তি ব্যাপাটা বোঝার জন্য সামনে তাকাতেই দেখলো…….
————
“বান্দাবান যাওয়ার পথে একযাত্রী বাহী বাস খাদে পড়ে নিহত ১০ এর বেশি গুরুতর আহত হয়েছে ৩০।তাদের সবাইকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।’

প্রত্যেকটা নিউজ চ্যানালে এই খবর দেখাচ্ছে।

চলবে…
(ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।কার্টেসী ছাড়া কপি নিষেধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here