ধূসর প্রেমের অনুভূতি পর্ব -০২

#ধূসর_প্রেমের_অনুভূতি
#ফারহানা_ছবি
#পর্ব_০২
.
.
.
অর্নিল ভয়ে থর থর করে কাঁপছে ৷ তারই রুমে ফুলি নামের মেয়েটির মৃত দেহ পড়ে আছে৷ অর্নিল কী করবে ভেবে পাচ্ছে না৷ মেয়েটি কী করে তার ফ্লাটে আবার ফিরে এলো। আর মরে গেল কী করে এটাও অর্নিলের মাথায় ঢুকছে না৷ অর্নিল আরো ভালো করে শিওর হওয়ার জন্য ফুলির হাতের পাল্স চেক করার জন্য হাত স্পর্শ করতে কেঁপে ওঠে অর্নিল কারণ ফুলি নামের মেয়েটির শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে ৷ অর্নিল কি করবে না করবে ভেবে পাচ্ছে না ৷ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে অর্নিল কারণ অর্নিল খুব ভালো করে বুঝতে পারছে সে ফেঁসে গেছে৷

” এখন আমি কি করবো? মেয়েটার লাশ আমি কি করে লুকাবো ? পু-পুলিশ যদি জেনে যায় তাহলে , তাহলে আমাকে তো খুনি ভেবে এরেস্ট করবে! ”

অর্নিলের ভাবনার মাঝে কলিংবেল বেজে ওঠে ৷ অর্নিল আরো ভয় পেয়ে যায়৷ অনবরত কলিংবেল বাজতে লাগলো ৷ এক পর্যায়ে অর্নিল বাধ্য হয়ে দরজা খুলে দেয় ৷ সাথে সাথে পুলিশ এসে হাজির হয়৷ পুলিশ দেখে অর্নিল অবাকের চরম পর্যায়ে চলে গেল৷ এতো তাড়াতাড়ি পুলিশ এখানে চলে আসবে সেটা অর্নিল ভাবতেও পারেনি৷

” আপনি তো অর্নিল?”(পুলিশ অফিসার)

” জ্বী আমি অর্নিল কিন্তু আপনারা এখানে?”

” আমাদের কাছে খবর আছে এখানে একটা মার্ডার হয়েছে ৷”

পুলিশের কথা শুনে ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো অর্নিল৷

” মা-মার্ডার! এখানে আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে অফিসার ৷ এখানে কোন মার্ডার হয়নি৷”

” মার্ডার হয়েছে কি হয়নি তা তো জানা যাবে যখন আমরা আপনার ফ্লাট টা সার্চ করবো৷ অফিসার আপনারা পুরো ফ্লাট সার্চ করুন৷”

” ওকে স্যার ৷ ”

(০৪)

আদিল আর রাফি দুজনে ফারহা আর ফারিহাকে এক মুহূর্তের জন্য একা ছাড়ছে না ৷ এটা দেখে মেঘ চরম বিরক্ত তার থেকেও বেশি বিরক্ত হলো ফারহার উপর জমজ দুই বোন একি রকম চুলে স্টাইল করার কারণে কে ফারহা আর কে ফারিহা বোঝার কোন জো নেই৷

এদিকে আদিল ফারহার হাত ধরে আড়ালে টেনে নিয়ে বলে, ” আপু তুমি দেশে ফিরেছো তাতে আমরা খুব খুশি কিন্তু তুমি এবার মেঘ ভাইয়াকে আর কষ্ট দিও না৷ তুমি তো জানো মেঘ ভাইয়া তোমাকে কতোটা ভালোবাসে?”

” আমি জানি পিচ্চি মেঘরাজ আমাকে ভিষণ ভালোবাসে কিন্তু ট্রাস্ট মি আমি মেঘের ভালো চাই ৷ আর তাই মেঘরাজ কে আমি আমার জীবনের সাথে জরাতে চাই না৷ আর সব চেয়ে বড় কথা ফারিহা মেঘ কে ভালোবাসে ৷ ”

ফারহার কথা শুনে আদিল যেন আকাশ থেকে পড়লো৷ ফারিহা মেঘ কে ভালোবাসে এটা সত্যি আদিলের কাছে বিস্ময়জনক কারণ ফারিহার একাধিক রিলেশন আছে৷ কখণো সাতদিনের বেশি বয়ফ্রেন্ড টিকিয়ে রাখে না৷ প্রত্যেক সপ্তাহে তার বয়ফ্রেন্ড চেন্জ চাই ৷ এটা আদিল লন্ডনে গিয়ে জানতে পেরেছে৷

” আপু তুই জানিস ফারিহা আপু কেমন? তার পছন্দ কখনো একের উপর সীমাবদ্ধ নয় ৷”

” পিচ্চি আমি আমার বোন কে খুব ভালো করে চিনি ,তুই আমাকে ওকে চেনাতে আসিস না ৷ ”

” ঠিক আছে তুই যেটা ভালো মনে করিস কর ৷ আমি তোকে আর কিছু বলতে আসবো না৷”

আদিল মন খারাপ করে চলে যায়৷ এদিকে ফারহা আদিলের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে, ” এই ফারহা তার প্রিয় জিনিস নিজের করে রাখতে জানে পিচ্চি ৷ আর এটাও জানে কি করে নিজের প্রিয় জিনিস অন্যের হাত থেকে রক্ষা করতে হয়৷ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা ৷”

ফারহা বিড়বিড় করে কথা গুলো বলে যেতে নিলে পেছন থেকে মেঘ ফারহার হাত শক্ত করে চেপে ধরে৷ পিলারের আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলে, ” আমার কি অপরাধ ফারুপাখি? আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছো? এতো গুলো বছর তুমি বিহিন এক জীবন্ত লাশের মতো জীবন কাটিয়েছি আর কতো? ”

ফারহা দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে মেঘের দিকে তাকিয়ে বলে, ” আমি ফারহা নই মেঘ ৷ আমি ফারিহা ৷ তুমি ফারহাকে বলা কথা গুলো আমাকে কেন বলছো? ”

ফারহার কথা শুনে মেঘের হাতের বাধন আলগা হতে হতে আরো শক্ত করে চেপে ধরে ফারহার গলায় মুখ গুজে বলে , ” এই শরীরের ঘ্রান আমার চেনা ফারুপাখি ৷ যতোই তুমি নিজেকে ফারিহা বলে দাবি করো ৷ আমি জানি তুমি আমার ফারুপাখি ৷ আমার ফারহা ৷ ”

ফারহা পারে না এখান থেকে পালিয়ে যেতে কিন্তু মেঘের শক্ত বাধনে যে বন্দি তাই চেয়েও এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যেতে পারছে না৷ মেঘের বাবা মেহরাব চৌধুরী আর ফারহার বাবা ফায়েজ খান দুজনে বেস্টফ্রেন্ড হওয়ার সুবাদে খান মন্জিলে মেঘের যাতায়াত ছিলো৷ ফারহা আর ফারিহার জন্মের পর থেকে মেঘ সব সময় ফারহার আশে পাশে থাকতো ৷ ওকে সব সময় বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতো৷ ফারহা ব্যাথা পাওয়ার আগে সে ব্যাথা নিজে বরণ করে নিতো মেঘ ৷ ছোট বেলার অনুভূতি বড় হওয়ার সাথে সাথে ভালোবাসায় রুপান্তর নেয়৷ মেঘ ফারহাকে পাগলের মতো ভালোবাসতে থাকে কিন্তু ফারহা কখনো তার ভালোবাসা মেঘের সামনে প্রকাশ করতো না৷ ফারহার কাছে সব সময় মেঘের ভালোবাসাকে আবছা ধূসর মনে হতো , হয় তো এটাই ফারহার ধূসর প্রেমের অনুভূতি যেটা এখনো মেঘকে জানতে দিতে চায় না ফারহা ৷ কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উওর একমাত্র ফারহা দিতে পারবে৷

ফারহা রাফি আর ফারিহার কাছে আসতে ফারিহা ফারহাকে কিছু একটা ইশারা করতে ফারহা চোখের পলক ফেলে ৷ তা দেখে ফারিহা নিশ্চিন্ত হয়৷

” দি তুমি তো ফারিহা আপু তাই না?” ফারহার দিকে তাকিয়ে রাফি প্রশ্ন করলো ৷ তা শুনে ফারহা ফারিহা দুজনে মিটমিটিয়ে হাসতে লাগলো৷ ফারহার বাবা মা ফায়েজ খান আর আইরিন খান কেউ এখনো তাদের মেয়েদের চিনতে পারে না কে ফারহা আর কে ফারিহা ৷ তবে আদিল এই দুই বোনকে ছোট বেলা থেকে আলাদা করে চিনতে পারে ৷ তবে এই বিষয়টা ফারহা আর ফারিহা ছাড়া কেউ জানে না৷

চৌধুরী পরিবারের সব সদস্য সন্ধ্যায় এসে হাজির হয়৷ তাদের সদরে আপ্যায়ন করতে বিশেষ কিছু কর্মচারী নিয়োগ করা হয় ৷ তারাই তাদের দেখা শুনা করে৷ মেঘের বাবা মা মেহরাব চৌধুরী আর মিসেস মেহরিমা চৌধুরী ফারহা ফারিহা দুজনে দেখে বেশ অবাক হয় ৷ দুজন বোন পুরো এক রকম সাজের কারণে কে ফারহা আর কে ফারিহা সেটা আলাদা করা যাচ্ছে না বিধায় তারা ফারহার বাবা মায়ের সাথে গল্প জুরে দেয়৷

ফারিহা চারিদিক তাকিয়ে মেঘ কে দেখতে না পেয়ে ফারহাকে বিষয়টা জানাতে ফারহা ফারিহাকে পাঠায় মেঘের খোজে আর এদিকে ফারহা সবার চোখের আড়ালে খান মন্জিল থেকে বেড়িয়ে যায়৷

(০৫)

“তুমি আমার রুমে কি করছো মেঘ? “(ফারিহা)

পেছন থেকে কারো গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে ওঠে মেঘ ৷ মেঘ তার ঠোঁটের কোনে মারাত্মক সুন্দর হাসি টা ফুটিয়ে তুলে ফারিহার দিকে তাকিয়ে ধিরে ধিরে ফারিয়ার কাছে এসে একহাত দিয়ে ফারিহার কোমড় চেপে ধরে ফারিহার গলায় আঙ্গুল দিয়ে স্লাইট করতে করতে বলে ওঠে , ” আমি তোমার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি সুইটহার্ট ৷ ”

ফারিহা মেঘের গলা জড়িয়ে ধরে মাতাল করা কন্ঠে বলে,” আমার জন্য অপেক্ষা করছো অথচ আমাকেই ডাকো নি তুমি এটা কেমন কথা মেঘ?”

” তোমায় ডাকি নি কারণ আমি জানি তুমি আমাকে খুজতে ঠিক এখানে এসে হাজির হবে৷”

ফারিহা মেঘকে জড়িয়ে ধরে পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে রহস্যময় হাসি দিলো ৷ যে হাসি রহস্য মেঘের অজানা ৷

হঠাৎ করে মেঘ ফারিহাকে ছেড়ে দিয়ে বলে, ” সুইটহার্ট বাইরে চলো সেখানে সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে৷ ”

ফারিহা মেঘের কথার প্রত্ত্যুতরে কিছু বললো না ৷ মেঘের হাত ধরে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল৷

__________

কিছুক্ষণ আগে অর্নিলকে পুলিশ এরেস্ট করে থানায় নিয়ে চলে গেছে৷ খবরটা মিডিয়ার কাছে পৌছাতে বেশিক্ষণ লাগেনি৷ প্রত্যেকটা টিভি চ্যানেলে এখন অর্নিল কে দেখাচ্ছে তার সাথে সাথে ফুলি নামক প্রস্টিটিউডের সাথে অর্নিলের সম্পর্কে বানানো ভিত্তিহীন নানা খবর প্রচার হচ্ছে৷ ফুলির ডেড বডি পোস্টমোর্টেম এর জন্য পাঠানো হয়েছে৷ অর্নিলে বাবা মা দেশের বাইরে থাকে বিধায় তারা এখুনি কিছু করতে পারছে না ৷ তবে খবরটা শোনা মাত্র দেশে ফেরার জন্য টিকিট কেটেছে৷

অন্যদিকে ফারহা পার্টি থেকে বের হয়ে হঠাৎ করে উধাও হয়ে যায় ৷ মেঘের গার্ড ফারহাকে আর খুজে পায় না৷ ফারহাকে খুজে না পেয়ে মেঘকে ফোন করে জানাতে মেঘ পার্টি ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ে৷ মেঘকে বের হতে দেখে ফারিহা তার ফোন সাথে সাথে কাউকে একটা মেসেজ সেন্ড করে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় ফারিহা৷ লং গাউন টা পড়ে ফারিহার পিঠ গলা চুলকাচ্ছে বিধায় ফারিহা দেরি না করে গাউন টা খুলে ফেলে ৷

মিররের সামনে স্লিভলেস শার্ট আর ট্রাউজার পড়ে দাড়িয়ে আছে৷ শরীরে অসংখ্য কাটা ছেড়ার দাঁগ স্পষ্ট ৷ ফারিহা ড্রয়ার থেকে একটা মলম বের করে নতুন কেটে যাওয়া জায়গায় মলম লাগিয়ে কানে হেডফোন গুজে ব্যালকনিতে গিয়ে দাড়ায় ফারিহা ৷

মেইন গেটের সামনে চারটে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডাকছে ৷ ফারিহা স্থির শান্ত দৃষ্টিতে কুকুর গুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রুমে এসে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা ধাড়ালো ছুড়ি বের করে উল্টে পাল্টে দেখে কোমড়ে গুজে নিলো ফারিহা…….

(০৬)

ডাইনিং টেবিলে মোহনা বেগম, আদিল, রাফি ,ফায়েজ খান ,আইরিন খান, মেঘের বাবা মা মেহরাব চৌধুরী আর মিসেস মেহরীমা চৌধুরী অপেক্ষা করছে ফারহা আর ফারিহার জন্য , কিন্তু ফারিহা বা ফারহাকে আসতে না দেখে আইরিন সারভেন্ট পাঠায় তাদের ডেকে আনার জন্য, ফারিহা শরীরে ওরনা দিয়ে জড়িয়ে দরজা খুলে সারভেন্ট কে জানায় আজ তারা দু বোনের কেউ খাবে না৷ ফারিহার কথা মতো নিচে গিয়ে সারভেন্ট ফারিহার কথা গুলো বলতে ফায়েজ খান বেশ রেগে যায়৷ কিন্তু তার বন্ধু আর তার স্ত্রীর সামনে কোন সিন ক্রিয়েট করতে চাইছে না বিধায় তিনি সবাই কে খেতে শুরু করতে বললেন৷

নির্জন এক ফাঁকা রাস্তায় কালো কোট পরিহিত একজন হেটে চলেছে৷ তার গা ঘেষে হেটে চলেছে একটি কুকুর৷ কালো কোট পরিহিত ব্যক্তির হাতে তার ধাড়ালো ছুড়ি যেটা রাস্তার সোডিয়াম আলোয় চিক চিক করছে ৷ কিছুদুর যেতে একটা কালো গাড়ি এসে ব্যাক্তিটার সামনে এসে দাড়াতে তিনি গাড়িতে উঠে যায়৷ কুকুরটি ওখানে দাড়িয়ে চিৎকার করতে থাকে ৷

রাত তিনটে বেজে দশ মিনিট ৷ খুব সাবধানে খান মন্জিলে মেইন গেটে প্রবেশ করে ফারহা ৷ ফারহা কে দেখে কুকুর গুলো চিৎকার করা বন্ধ করে ফারহার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ে৷ ফারহা তার হাতের মুঠোয় কয়েক পিছ বিস্কুট কুকুরদের সামনে ফেলে দিয়ে ভিতরে ঢুকে যায়৷

রুমে এসে ফারিহাকে এলোমেলো ভাবে শুয়ে থাকতে দেখে ফারহা তার ব্রু-যুগল কুচকে তাকায় ফারিহার দিকে তাকাতে বেডের উপর খালি ইনজেকশন দেখে রেগে দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে তাকিয়ে বলে ….

” এই মেয়েটা আজও আমার কথা শুনলো না ৷ আজও ড্রাগস নিয়েছে ইডিয়েট ৷ ”

ফারহা খালি ইনজেকশন আর নেশা করার সামগ্রী গুলো সরিয়ে ফেলে ফারিহাকে বেডে ঠিক মতো শুইয়ে দিয়ে গায়ে চাদর টেনে দিয়ে নিজের রুমে ঢুকতেই চমকে ওঠে ফারহা…..
.
.
.
#চলবে…….
[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here