ধূসর প্রেমের অনুভূতি পর্ব -৪৩

#ধূসর_প্রেমের_অনুভূতি
#ফারহানা_ছবি
#পর্ব_৪৩
.
.
_________________

মেঘ তার টিম মেম্বারদের নিয়ে হেডকোয়ার্টসে ফিরে গিয়ে সিনিয়র অফিসারকে সবটা জানায়৷ সিনিয়র অফিসার তারেক শেখ মেঘকে এই কেসটা নিয়ে তদন্ত করতে বলে৷ মেঘ অফিসারের কথা শুনে নিজের কেবিনে চলে যায়৷ জ্যাক আসলাম প্রথম থেকে মেঘের দিকে কেবিনে মেঘের জন্য অপেক্ষা করছিলো৷ মেঘ কেবিনে ঢুকতে জ্যাক মেঘ কে বলে উঠলো, ” স্যার ম্যাম কে ট্রেস করতে পেরেছি৷”
জ্যাকের কথা শুনে মেঘের ঠোঁটের কোনে একচিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠলো৷

” কোথায় আছে ফারুপাখি ?”

” স্যার আপনার অতি চেনা শহরে ম্যামকে খুজে পাবেন৷”

” চট্টগ্রাম!”

” ইয়েস স্যার৷ বাট স্যার আপনি কি করে চট্টগ্রামে যাবেন? আপনার উপর তো অন্য দায়িত্ব স্যার দিয়েছে৷” আসলাম মেঘকে কথাটা বলে চুপ হয়ে গেল৷ আসলামের কথা শুনে মেঘ রহস্যময় হাসি দিয়ে আসলামকে বললো,” কে বলেছে আমি চট্টগ্রামে যাচ্ছি?”
” আপনি যাচ্ছেন না? তাহলে ম্যামকে কে খুজে বের করবে?”

” উহু কেউ আমার ফারুপাখিকে খুজে বের করতে পারবে না৷ আমার ফারুপাখি তার সময় মতো তার নিজের শহরে ফিরে আসবে৷ ”

” মানে স্যার! ” আসলামের কথা শুনে মেঘ কিঞ্চিৎ হেসে বলে,” মানেটা পড়ে বুঝতে পারবে আসলাম এখন আপাদতো আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে৷ ”

মেঘ জ্যাক আসলামকে অফিসে রেখে বেড়িয়ে পড়ে৷

(৭৭)

নিজের রুমে এসে পানির বোতল খুজতে লাগলো তনু৷ হাতের কাছে পানির বোতল না পেয়ে রেগে জিনিস পত্র ছুড়ে মারতে নিলে তখনি একটা হাত পানির বোতল নিয়ে তনু সামনে যায়৷ তনু পানির বোতলের মালিকের দিকে তাকাতে চুপশে গেল৷ ফারিহা তনুর দিকে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে৷ ফারহার চোখের ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফারিহারও যেটা হৃদয়ের অন্তস্থলে পৌছে যায়৷ তনু সাথে সাথে নজর সরিয়ে ফেলে ফারিহার হাত থেকে পানির বোতলটা নিয়ে পানি খেতে লাগলো৷ ফারিহা ব্যতিক ব্যস্ত না হয়ে ধীরে সুস্থে সিঙ্গেল সোফায় বসে তনুর দিকে সেই একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে৷ তনু পানি খেয়ে ফারিহার দিকে না তাকিয়ে কাপবোর্ড থেকে ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়৷ কিছুক্ষণ পর তনু ফ্রেস হয়ে বের হওয়ার পরই হঠাৎ ফারিহা হিংস্র বাঘিনীর মতো তনুর উপর ঝাপিয়ে পড়ে তনুর গলা চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,” কি ভেবে ছিলি তনু? আমি বা আমরা তোর আসল রুপটার কথা কিছুই জানতে পারবো না? কিন্তু তুই ভুল তনু তোর এই ভালো মানুষির তোর এই বন্ধুত্বের আড়ালে থাকা তোর নিকৃষ্ট রুপটা আমি দেখে ফেলেছি৷ দেখেছি তুই কি ভাবে হ্যারি লিওকে মেরে ফেলেছিস৷ একবারের জন্য ভাবলি না আপু জানতে পারলে তোর অবস্থা কি হতে পারে? হাহ্!”

তনুর শরীর এমনিতে দূর্বল ছিলো আবার তার উপর মিমি অর্থাৎ সামিরার টর্চার আর এখন ফারিহার আক্রমন৷ সব মিলিয়ে তনুর নিজেকে প্রটেক্ট করার ক্ষমতা অবশিষ্ট নেই৷ তনুর শরীরটা নেতিয়ে পড়তে ফারিহা তনুর গলা ছেড়ে দেয়৷ শ্বাস নিয়ে কাশতে থাকে তনু৷ ফারিহা পানির বোতলটা আবার তনুর দিকে এগিয়ে বলতে লাগলো,” তোকে আমি শেষ করবো না তনু৷ কারণ তুই আপুর দোষি আর আপুই তোকে শেষ করবে তাও তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে যাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ ৷” কথাটা বলে ফারিহা তনুর রুম ত্যাগ করল৷ এদিকে ফারিহার কথা গুলো তনুর কানে বাজছে বার বার৷ ‘আপুই তোকে শেষ করবে তাও তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে৷’ এই কথাটার মানে দাড়ায় ফারহা এখনো বেঁচে আছে৷ কথাটা ধরতে পেরে তনুর হার্টবিট বন্ধ হওয়ার উপক্রম ৷

____________

ফারহা রাগে বাশের উপর ঘুশি মারতে লাগলো৷ লাগতার কয়েকবার ঘুশি মারার পরেই ফারহার হাতের উপর টা বেশ খানিকটা ছিলে যায়৷ তখন আগন্তক ফারহাকে দেখানো ভিডিওটা দেখে ফারহার রাগটা যেন তুঙ্গে উঠে যায়৷ মিমি আর তনুর ঘটা ঘটনা গুলো ফারহা সবটাই দেখে নেয়৷ আর তনু যে ফারহার সাথে বৈইমানি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এটাও জানতে বাকি নেই ফারহার৷ আগন্তক হঠাৎ ফারহার হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো,” আরুপাখি কন্ট্রোল ইউর সেল্ফ৷ তুমি আজ তনুর সত্যিটা জানতে পেরেছো বলে তোমার এতো রাগ হচ্ছে অথচ এই তনু অরফে জেসিকা অনেক গুলো বছর আগে থেকে তোমার পিটপিছে তোমাকে ঠকিয়ে যাচ্ছে তুমি সেটা জানতে বা বুঝতেও পারো নি৷ আর মিমি, সে তো তোমাকে শেষ করে দিয়েছে ভেবে নিয়ে এখন তোমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিতে চাইছে৷”

” ভাই আমার ফেরার ব্যবস্থা করো এবং সেটা আজ৷ ”

” ফিরবে তবে চৌধুরী ম্যানশনে নয় সেটা নিশ্চয়ই জানো?”

” না ভাই আমি চৌধুরী ম্যানশনে ফিরবো তবে ধামাকার সাথে, মিমি এখন যে আমার হবু বড় জা তাকে তো সারপ্রাইজ আমাকে দিতেই হবে ভাই৷”

” কি করতে চাইছো আরপাখি?”

ফারহা রহস্যময় হাসি দিয়ে নূপুরকে বলে,” নূপুর নিজের প্যাকিং করে নেও তুমিও আমার সাথে ফিরবে ৷”

” আমি! কিন্তু আপু…..” বাকিটা বলার পূর্বে ফারহা বলে ওঠে৷

” নো মোর ওয়ার্ড নুপূর৷ আমি যা বলার একবারই বলবো৷”

নূপুর আর কিছু বললো না মাথা নেরে সায় জানিয়ে নিজের প্যাকিং করতে চলে গেল৷

__________

জ্ঞান ফেরার পর পরই সামিরা তান্ডবলীলা চালালো তার ফ্লাটে৷ তনু সামিরাকে অজ্ঞান করে পালিয়ে যাওয়ার পর পর সামিরার গার্ড এসে উপস্তিত হয়৷ তারাই সামিরাকে সামিরার ফ্লাটে না নিয়ে সামিরা বিশালবহুল বাড়িতে নিয়ে যায়৷ শ্রাবণ বা অন্য কারোর যাওয়া নিশেধ৷ বাড়ির সারভেন্টরা ভয়ে জবুথবু হয়ে দাড়িয়ে আছে৷ সামিরা রাগে অন্ধ হয়ে বাড়ির সারভেন্টদের আঘাত করে বসে৷ সামিরা আহত বাঘিনীর মতো রাগে তান্ডবলীলা চালাতে লাগলো৷

” ছাড়বো না জেসিকা৷ তোকে আমি ছাড়বো না৷ আমার জাল ছিড়ে পালানো এতোটা সহজ না৷ তোকে তো আমার জালে আবার ধরা পড়তেই হবে৷ যাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ৷”

সামিরা এবার নিজেকে সামলে নিয়ে চেন্জ করে শ্রাবণকে ফোন করে ৷শ্রাবণ মাত্র চৌধুরী ম্যানশনে প্রবেশ করতে তার ফোনটা বেজে ওঠে ৷ ফোনের স্কিনে সামুপাখি নামটা ভেষে উঠতে দেখে শ্রাবণ কলটা সাথে সাথে কেটে দেয়৷ সামিরার উপর অভিমান থেকে কলটা কেটে দিয়ে নিজের রুমে চলে যায়৷ ফারহা এবং মেঘের মম ড্যাড ফারহা নেই এটা তারা একদমি মানতে নারাজ৷ তাদের বিশ্বাস ফারহা ফিরে আসবে৷ সে কারণে তারা শ্রাবণের বিয়ে নিয়ে ভাবছে৷

শ্রাবণ নিজের রুমে গিয়ে বেডে শুয়ে পড়ে৷ কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে শ্রাবণ৷ এদিকে কল রিসিভ না করায় সামিরা প্রচন্ড রেগে যায়৷ তবুও নিজের রাগ কন্ট্রোলে আনার চেষ্টা করে বলতে লাগলো,” কাম ডাউন সামিরা কাম ডাউন ৷ এখন একদমি রাগলে চলবে না৷ তোকে ওই চৌধুরী পরিবারে সুই হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হতে হবে আর তার জন্য শ্রাবণ হলো তোর ট্রাম কার্ড ৷ ওকে দিয়েই তোকে চৌধুরী এবং খান পরিবারকে শেষ করতে হবে৷”

সামিরা জোড়ে জোড়ে কয়েকবার শ্বাস নিয়ে গার্ড ছাড়াই নিজের গাড়ি নিয়ে চৌধুরী ম্যানশনে যাওয়ার জন্য বেড়িয়ে যায়৷

_____________

(৭৮)

গার্ডেনে বসে মিস্টার এন্ড মিসেস খান এবং মিস্টার চৌধুরী এন্ড মিসেস চৌধুরী বসে শ্রাবণের বিয়ে নিয়ে কথা বলছিলো ঠিক সে সময় সামিরা এসে উপস্থিত হয়৷ সামিরাকে মেহরীমার ভিষণ পছন্দ হয় শ্রাবণের জন্য সে কারণে তিনি তার ছেলের বিয়েটা দ্রুত সারতে চাইছে৷ মেহরীমার বিশ্বাস শ্রাবণের বিয়ের পূর্বে ফারহা তাদের মাঝে ফিরে আসবে৷ তাই ফারহার মম ড্যাডের সাথে কথা বলে শ্রাবণ সামিরার বিয়ের ডেটে আবারও অনুষ্ঠান করে মেঘ ফারহার বিয়ে হবে বলে সবাই একমত প্রশন করে৷ সেটা শুনে সামিরা তাচ্ছিল্যর হাসি দিয়ে মনে মনে বলতে লাগলো,” মরা মানুষ ফিরে আসবে বিয়ে করতে হাহ্! যাকে নিজের লোকের হাতে মেরে দিয়েছি৷ আগুনে ঝলসে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সে নাকি নিজের বিয়ের জন্য ফিরে আসবে হা হা হা৷ ” সামিরাকে মিটমিটিয়ে হাসতে দেখে আইরিন খান বলে উঠলো,” সামিরা তুমি হাসছো যে? ”

” ক,,কই না তো আন্টি৷”

” আচ্ছা শোন তোমার আর শ্রাবণের এঙ্গেজমেন্টের ডেট আগামি দু তারিখ ফিক্সড হয়েছে৷ তোমার কি এই ডেট নিয়ে কোন আপত্তি আছে সামিরা?”

” জ্বি আন্টি এই ডেট নিয়ে আমার আপত্তি আছে ৷” সামিরার কথা শুনে সবাই বেশ অবাক হয়৷ নিজের সামলে মেহরীমা সামিরাকে বলল,” কি সমস্যা সেটা কি আমরা জানতে পারি সামিরা?”

” কেন নয় আন্টি ৷ আসলে আন্টি আপনি তো জানেন আমি অনাথ আমার মম ড্যাড বেঁচে নেই৷ আর আমার চাচুরা আমার সম্পত্তির লোভে আমাকে নিজেদের কাছে রেখে সব প্রপার্টি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার চেষ্টা করে ছিলো৷ প্রথমবার তো বেঁচে গিয়েছিলাম লন্ডন ফিরে গিয়ে কিন্তু এখন যদি আবার তারা আমার উপর এট্যাক করে? তাই আমি ভাবছিলাম যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি আপনাদের কাছে চলে আসবো৷ আমার মম ড্যাডকে হারানোর কষ্টটা না হয় তোমাদের ভালোবাসা পেয়ে না হয় কষ্টটা ভুলার চেষ্টা করবো৷ ”

সামিরার ইমোশনাল কথা শুনে আইরিন খান এবং মেহরীমা চৌধুরীর চোখে পানি৷ সামিরা মিথ্যে কথা গুলো সত্যি ভেবে সামিরার প্রতি মায়া ভালোবাসা আর একটু বৃদ্ধি পেল৷ সবার চোখ মুখ দেখে সামিরা ক্রুর হেসে মনে মনে বলতে লাগলো,” এবার খুব তাড়াতাড়ি আমি এই চৌধুরী বাড়ির বড় বউ হয়ে প্রবেশ করবো ৷ তারপর নাহয় আমার আসল রুপ দেখতে পাবে সবাই! ততোক্ষণ না হয় আনন্দ করে নেও কারণ আমি আশার পর থেকে সবার জীবন থেকে হাসি আনন্দ সুখ সব হাড়িয়ে যাবে৷”

সব শেষে শ্রাবণ-সামিরা, মেঘ-ফারহা, অর্নিল-ফারিহার বিয়ের ডেট ফিক্সড হয় এঙ্গেজমেন্টের দিনটায়৷ অর্নিলের বাবা মায়েরও বিশেষ কোন আপত্তি ছিলো না কারণ ছেলে মেয়ে উভয় নিজেদের পছন্দ করে ভালোবাসে৷ তাই তারাও মত জানায়৷

সামিরা সবটা শুনে বাড়ির ভেতরে ঢুকে শ্রাবণের রুমের সামনে গিয়ে নক করে৷ সে সময় ফারিহা রোজার সাথে গল্প করার জন্য রুম থেকে বের হওয়ার পর পরই সামিরাকে দেখতে পায়৷ সামিরাকে দেখেই ফারিহা এক প্রকার শক্টড হয়ে যায়৷ সামিরাকে (মিমি) এখানে মটেও আশা করেনি ফারিহা৷ শ্রাবণে বাগদত্তা যে সামিরা এটাও জানতো না ফারিহা৷ ফারিহা রুমে ঢুকে দ্রুত দরজা লক করে দেয়৷

“মিমি এখানে কেন? আর এই বাড়ির সাথে মিমির কি সম্পর্ক?” প্রশ্ন গুলো নিজেকে করতে লাগলো ফারিহা৷

এদিকে শ্রাবণ দরজা না খুললে সামিরা রেগে মনে মনে বেশ কয়েকটা বিশ্রি গালি দিলো সামিরা৷ দরজা না খোলায় সামিরা রেগে চৌধুরী ম্যানশন থেকে বেড়িয়ে গেল৷ মিসের মেহরীমা আর আইরিন সামিরাকে পেছন থেকে ডেকেও সারা পায় না৷ সামিরা রেগে বাড়ি থেকে চলে যায়৷

ফারিহা তার রুমের জানালায় দাড়িয়ে সবটা দেখে নিয়ে বুঝতে পারে শ্রাবণের সাথেই মিমি অর্থাৎ সামিরার বিয়ে হবার কথা চলছে৷

এদিকে সামিরার ফুল স্পিডে গাড়ি রাইড করে শহরের বাহিরের অবস্থিত তার ক্যামিক্যাল ফ্যাক্টরিতে যাবে বলে ঠিক করলো৷ তখনি সামিরার ফোনটা বেজে ওঠে ৷ ফোনের স্কিনে সামিরার পার্সোনাল দেহরক্ষীর নাম্বার দেখে লাউড স্পিকারে রেখে কল রিসিভ করে সামিরা৷ তখনি ফোনের ওপাশ থেকে সামিরার দেহরক্ষী যা বললো তা শুনে এক মুহূর্তের জন্য সামিরা এক্সিডেন্ট করার হাত থেকে বেঁচে যায়৷
.
.
#চলবে………..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here