পাওয়া না পাওয়া সুখ পর্ব -০৪

#পাওয়া_না_পাওয়া_সুখ
#লেখিকাঃজিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা
#পর্ব_০৫

-“আমার লজ্জা করছে বাবা। তুমি একটা বাচ্চার কপাল খা’মছে নিলে?”

অভীকের অভিযোগের সুর শুনে তার বাবা খেঁকিয়ে উঠলো।

-“সর কু’ত্তার পয়দা। তুই আমাকে জ্ঞান দিবি?”

অভীক অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
-“কিন্তু আমরা দু’ভাই তো তোমার পয়দা। তাহলে কু’ত্তার পয়দা বললে কেনো? তারমানে?”

অভীকের বাবা রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে তিরিক্ষি গলায় শুধালেন,

-“জু’তার বাড়ি খাইতে না চাইলে যা এখান থেকে।”

অভীক রাগ করে ঘরে চলে গেলো। রাতে মায়ের এত ডাকাডাকির পরও খেতে গেলোনা। অন্তিক আসলো ডাকতে। অভীক রাগ করেছে তাই কিছুতেই খেতে যাবেনা। বসে বসে ম্যাথ সলভ করছে। তখনই ওর বাবা আসলো ঘরে। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

-“চল আব্বা! খাইতে চলো।”

অভীক ম্যাথে মনযোগ দিয়েছে। এমন একটা ভাব করছে যেনো সে ব্যতীত এখানে আর কেউ নেই।
বাবা এবার খাতার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-“অঙ্কে পাস,
ইজ নট ম্যাটার অফ ঠা’স ঠা’স।
বুঝলা আব্বা, আমি অংকে খুবই ভালা ছাত্র ছিলাম।”

অভীক আর চুপ করে থাকতে পারলোনা। বাবা আসার পরই তার রাগ পড়ে গিয়েছে। অভীক সকৌতুকে বলল,

-“কিন্তু দাদীর কাছে শুনলাম তোমার মুখে বো’ম মা’রলে বো’ম ফিরে আসতো, কিন্তু শতকিয়া মুখ দিয়ে আসতোনা।”

বাবা মুখ কাচুমাচু করে বেরিয়ে যাওয়ার আগে খেতে তাড়া দিয়ে গেলেন।

অভীক, অন্তিক দুইভাই শব্দ করে হাসলো। অন্তিক বলল,

-“বাবা খুবই সহজ সরল মানুষ।”

অভীক লাফিয়ে ওঠে বলল,

-“বাবা হলো মীর-দৌলা। মানুষ তাকে মীর’জাফর মনে করে কিন্তু আমাদের বাবার মধ্যে সিরাজুদ্দৌলার বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তাই দুইটার সংমিশ্রণে বাবাকে মীর-দৌলা উপাধিতে ভূষিত করলাম।”

-“তুই যেমন, বাবা ও তেমন।”
অভীকের পিঠ চা’পড়ে বলল অন্তিক। দুজনেই খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো। একসাথে খাওয়া হলো সবার।

[৮]
ঘরে বিদ্যুৎ নেই। চারপাশে গুমোট অন্ধকার। একটা চার্জার লাইট হাতে ধুরুধুরু বুক নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো নীহা। মনে হচ্ছে পেছন থেকে, চারপাশ থেকে কেউ ওকে খপ করে ধরে নিয়ে যাবে। ভ’য়ে ভ’য়ে চুলায় খাবার বসালো গরম করার উদ্দেশ্যে। সুফিয়ার পরীক্ষা শুরু হয়েছে সে পড়া নিয়ে ব্যস্ত। নীহার শাশুড়ী এশার সালাত আদায় করে তসবিহ নিয়ে বসেছেন আর উঠেননি। নাফিজ অফিস থেকে ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছে। কাল সন্ধ্যা সাতটার পর পাশের বাসার একটা মেয়ে আত্ম’হ’ত্যা করেছে। সকাল নাগাদ আরেকটা বাসার ছোট্ট একটি মেয়ে পানিতে পড়ে মা’রা গিয়েছে। সেই থেকে ভয়ে আছে নীহা।সে কোথাও শুনেছে আজরাইল যদি পরপর দুটো প্রাণ নেয় তাহলে ধরে নিতে হবে সে আরও একটি প্রাণ নিবে। এক ভ’য়’ঙ্কর খচখচানি শব্দে থরথর করে কেঁপে ওঠে নীহা। চিৎকার করে শাশুড়ীকে ডাকে।

-“আম্মা! আমার মনে হয় সময় ঘনিয়ে এসেছে। আজরাইল তিন নাম্বার জান ক’ব’জ করতে চলে এসেছে। আপনারা সবাই আমাকে মাফ করে দিয়েন। আপনার ছেলেকেও বলবেন আমাকে যেনো মাফ করে দেয়।”

কথাগুলো বলেই রান্নাঘরে জ্ঞান হারালো নীহা। নীহার চিৎকারে নাফিজ সহ সবাই দৌঁড়ে রান্নাঘরে ঢুকলো। নীহাকে রান্নাঘরের ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখলো। খচখচানি শব্দ কানে আসতেই নাফিজ সেদিকে লাইট ঘুরিয়ে দেখলো একটা ইঁদুর প্লাস্টিক নিয়ে কাম’ড়াকা’মড়ি করছে বলে শব্দ হচ্ছে। নাফিজের মা বললেন,

-“মেয়েটা কাল থেকেই ভ’য় পেয়ে আছে। ওকে ঘরে নিয়ে আয়।”

নাফিজ কোলে তুলে নিলো নীহাকে। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পানির ছিটা দিলো। বিদ্যুৎ এসে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীহার জ্ঞান ফিরলো। আশেপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখে সে বেঁচে আছে।

নাফিজের মা পাশে বসে নীহার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

-“কি হয়েছে, মা? জ্ঞান হারালে কেনো?”

নীহা ভ’য়ে ভ’য়ে বলল,

-“রান্নাঘর থেকে কিরকম ভ’য়’ঙ্কর শব্দ আসছিলো। আমি ভাবলাম আমার সময় শেষ।”

নাফিজ শান্ত চোখে চেয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,

-“ওটা ভ’য়’ঙ্কর শব্দ নয়। ইঁদুর প্লাস্টিক নাড়াচাড়া করছিলো।”

নাফিজের মা আর সুফিয়া খিলখিল করে হেসে উঠলো। নিজের বোকামিতে লজ্জা পেয়ে মাথানিচু করে নিলো নীহা। ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো নাফিজ। দুর্বোধ্য সে হাসি। যা সবার চোখ এড়িয়ে গেলো। কিছুটা সময় হাসাহাসির মধ্যেই কাটলো। নীহার পুরোপুরি ভ’য় কাটলোনা।
নীহার শাশুড়ী গিয়ে খাবার টেবিলে নিয়ে আসলো। একসাথে খাবার সেরে যে যার ঘরে ফিরলো। নাফিজ লাইট জ্বালিয়ে ব্যাংকের একটা হিসেব মেলাচ্ছে। নীহা চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো। চোখে ঘুম নেই। মনে হচ্ছে মেয়ে দুটো তাকে দুপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। আপাদমস্তক কাঁথা দিয়ে ঢেকে ও স্বস্তি পাচ্ছে না।
নাফিজ কাজ সেরে লাইট বন্ধ করে দিতেই নীহা চিৎকার দিয়ে উঠলো।

-“লাইট নিভাবেন না। তাহলে আজ রাতে আমার ঘুম হবেনা।”

নাফিজ বলল,
-“ভ’য় নেই। ডিম লাইট জ্বালিয়ে দেবো।”

নীহা কিছুক্ষণ গাঁইগুঁই করে থেমে গেলো। ডিম লাইট জ্বালিয়ে নাফিজ পাশে শুয়ে পড়লো। নীহা কিছুক্ষণ পরপর মুখ থেকে কাঁথা সরিয়ে দেখছে মেয়ে দুটো আছে কিনা?

নাফিজ চোখ জোড়া বন্ধ রেখেই বলল,
-“বারবার চেইক করলে দেখবেন সত্যি সত্যি মেয়ে দুটো আপনাকে ঝাপটে ধরবে।”

নীহা এবার লাফ দিয়ে উঠে বসলো। কিছুতেই তার ভ’য় কমছেনা। ভেতরে ভেতরে বিধ্বস্ত অবস্থা। তাই ঠিক করলো সারারাত বসেই কাটিয়ে দেবে। আজ আর ঘুমাবেনা। মেয়ে দুটো আসলে একদৌঁড়ে শাশুড়ীর কাছে চলে যাবে।
নাফিজ আবারও বলল,
-“আসবেনা ওরা। ঘুমিয়ে পড়ুন। মৃ’ত মানুষ কখনো ফিরে আসেনা।”

সেখানে বসে থাকতে থাকতেই ঘুমে তলিয়ে গেলো নীহা। পা জোড়া খাটের বাইরে। দু’হাতে কাঁথা শক্ত করে ধরে রেখেছে। মাঝরাতে নড়তে গিয়ে নাফিজের মনে হলো সে কেমন বেতালে শুয়েছে। চোখ খুলে লাইট ধরিয়ে দেখলো তার বউ ম’রা’র ভ’য়ে এলোমেলো হয়েই ঘুমিয়ে আছে। সন্তর্পণে নীহাকে সোজা করে শুইয়ে দিলো। নড়চড় না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো নাফিজ। ঘুম ভাঙলেই হয়তো মেয়ে দুটো এসেছে বলে চেঁচামেচি করতো।

প্রেমার বাবা জয়নুল আবেদীন এর মুঠোফোন কেঁপে উঠতেই রিসিভ করলেন তিনি। চিটাগং ডাচ্ বাংলা ব্যাংক থেকে কল এসেছে।

-“আসসালামু আলাইকুম। আমরা ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে লোন এর ব্যাপারে কল করেছি। আমরা এখন কুমিল্লায় আছি। দশমিনিট এর ভেতর আপনার বাড়িতে আসছি।”
বলে লাইন কে’টে দিলো।
জয়নুল আবেদীন চিন্তিত হয়ে পড়লেন। একমাস পূর্বে এরকম কল এসে জানিয়েছে উনি দশ লক্ষ টাকা লোন নিয়েছেন। উনি পাত্তা দেননি। আর কল ও আসেনি। আজ আবার হুট করেই কল আসলো।
তিনি অন্তিকের নাম্বারে কল দিয়ে ব্যাপারটা জানালেন। তার নামে মি’থ্যে অভিযোগ টা’নলে অন্তিক নিশ্চয়ই কিছু একটা করতে পারবে।অন্তিক প্রেমাকে নিয়ে আসছে বলে দিলো। এদিকে নাফিজকে ও খবর দিলেন।

দশমিনিট এর ভেতরেই দুজন লোক এসে হাজির। নাফিজ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে শশুর বাড়িতে আসলো। সমস্ত ডকুমেন্টস জয়নুল আবেদীন এর বিরুদ্ধে কাজ করছে। যেখানে প্রমাণ হচ্ছে জয়নুল আবেদীন ব্যাংক থেকে দশ লক্ষ টাকা লোন নিয়েছেন। তিনি একা নন। মোট ছয়জন শেয়ারে ষাট লক্ষ টাকা নিয়েছে।

জয়নুল আবেদীন আশ্চর্য হলেন। উনিতো এরকম কিছুই জানেননা। বিয়ের পর প্রথম দিকে তিনি আবুল কোম্পানিতে ম্যানেজার পদে চাকরী করেছেন। এরপর সেখান থেকে এসে সিঙ্গাপুর চলে গিয়েছেন। একবছর হবে তিনি বাড়ি ফিরে তিনটে বাস নামিয়েছেন। আর বিদেশে যাবেননা ঠিক করেছেন।

নাফিজ প্রশ্ন করলো,
-“আমার শশুরকে যে আপনারা লোন দিয়েছেন, সেটা কিসের ভিত্তিতে? কোন জমির দলিল এর ভিত্তিতে?”

লোক দুটো জানালো,
-“দলিল লাগেনি। উনি যেহেতু ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন তাই তার আর দলিলের প্রয়োজন হয়নি।”

জয়নুল আবেদীন হতবিহ্বল কন্ঠে বললেন,
-“আমি কখন ইসলামী ব্যাংকে চাকরী করলাম? আমি প্রথমে আবুল কোম্পানিতে ছিলাম। সেখান থেকে সিঙ্গাপুর। আর এখন দেশে।”

জয়নুল আবেদীন এর কথা শুনে লোক দুটো বলল,
-“কিন্তু স্যার এটাই সত্যি আপনি লোন নিয়েছেন। পাঁচমাস যাবত লোনের টাকা পরিশোধ করছেননা বলে কে’স ফাইল হয়েছে। এসব নিয়ে কেস চলছে।”

নাফিজ ঠান্ডা মাথায় প্রশ্ন করলো,
-“লোন কবে,কখন নেওয়া হয়েছে? আমিও কিন্তু একজন ব্যাংক কর্মকর্তা।”

উনারা জানালেন,
-“২০২০ সালে লোন নেওয়া হয়েছে।”

জয়নুল আবেদীন সাথে সাথেই উত্তর দিলেন,
-“আমি ২০২১ এ দেশে ফিরেছি। তাহলে আমি কিভাবে লোন নিলাম?”

লোক দুটোর মধ্যে একজন বলল,
-“স্যার এখানে আপনার ছবি, আইডি কার্ড সব দেওয়া আছে। এখন আমরা কি করবো বলুন? আমরা ও তো চাকরী করে খাই। আচ্ছা আপনার কি কাউকে স’ন্দেহ হয়?”

জয়নুল আবেদীন সন্দেহ জনক কাউকেই পেলেন না।

নাফিজ কিছু একটা ভেবে বলল,
-“সমস্ত ডকুমেন্টস দেখান তো।”

নাফিজ একে একে জয়নুল আবেদীনের সব কিছুর মিল পেলো। স্ত্রী এর জায়গায় গিয়ে নাফিজ তার শাশুড়ীর পুরো নাম পেলোনা। সাথে শাশুড়ীর মা বাবার নাম টা ও ভুল। এরপর শশুরের ছবি দেখলো। যা আবুল কোম্পানিতে থাকাকালীন একটা ছবি।
সবকিছুতে মিল না পেয়ে লোক দুটো ছবি আর জয়নুল আবেদীনকে দেখলো। ছবির লোকটি একজন যুবক। আর জয়নুল আবেদীন এর চুল দাঁড়ি পাক ধরেছে। তারা বিস্মিত হয়ে বলল,

-“আপনি তো বুড়ো হয়ে গেছেন। অথচ আপনার ইয়াং বয়সের ছবি দিয়ে লোন নেওয়া হয়েছিলো। দুঃখিত স্যার! আপনাকে এভাবে হে’ন’স্তা করার জন্য। আপনি আমাদের আসল কাল’প্রিটকে ধরার সুযোগ করে দিন। কাকে সন্দেহ হয়, কে আপনাকে ফাঁ’সাতে পারে তার নাম বললে উপকৃত হবো।”

জয়নুল আবেদীন এর স’ন্দেহ লিস্টে কেউ নেই। তখন আবুল কোম্পানিতে থাকাকালীন একজন ড্রাইভার ছিলো। যার সাথে উনার বনা’বনি ছিলোনা। এতটুকুই। লোকদুটো চলে গেলো। কে’স এ কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পরবর্তীতে জানানো হবে বলে গেলো। নাফিজ শশুর বাড়ী থেকে বিদায় নিলো। শাশুড়ীর জো’রা’জো’রিতে এক কাপ চা খেলো শুধু। আবার গিয়ে অফিস ধরতে হবে।

রাতের দিকে প্রেমাকে নিয়ে অন্তিক কুমিল্লায় আসলো। খালুর মুখ থেকে সমস্ত ঘটনা শুনে সা’ব’ধান করে দিলো। যাতে পাসপোর্ট, আইডি কার্ড, জন্ম নিবন্ধন কার্ড কাউকে না দেয়। এগুলো দিয়ে মানুষকে বিভিন্ন দূ’র্নী’তিতে ফাঁ’সি’য়ে দেওয়া হয়। যা মানুষ মোটেও টের পায়না।

রোজ সকালে নিয়ম করে অন্তিকের বাবা হাঁটতে বের হন। আজও বের হয়েছেন। আজ আবার একটা বাচ্চাকে দেখে কাছে ডাকলেন।
বাচ্চাটি চরম শে’য়া’না। সে দুহাত গোল করলো।

-“ছুঁ মান্তার ছুঁ, কালা কু’ত্তার গু।” বলেই ফুঁ দিয়ে অন্তিকের বাবার দিকে উড়িয়ে দিলো।
ক্ষে’পে গেলেন তিনি। চরম বে’য়া’দব বাচ্চা।

#চলবে……

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here