পাপের ক্ষরণ পর্ব -০৩

#ধারাবাহিকগল্প
#ভৌতিক থ্রিলার
#পাপের ক্ষরণ
পর্ব-তিন
মাহবুবা বিথী

জয়া বাগানের দিকে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। ও একটু অবাক হয় এক মূহুর্তে মানুষটা কোথায় হারিয়ে গেলো। জয়া ওসিকে আর কিছু বললো না।নিজেই বোকা বনে গেলো। যাই হোক সব ফর্মালিটিস শেষ করে ওসি চলে গেলেন। সাথে ময়নাতদন্তের জন্য রায়হানের লাশটা নিয়ে গেলেন।
রশ্নি জয়ার কাছে ওর স্বপ্নের কথা থেকে শুরু করে রাতে যেন রায়হান একা বাগানে বের না হয় সব কিছুই শেয়ার করেছে। দুদিন পর তদন্ত রিপোর্ট হাতে এসেছে। রায়হানের তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে পানিতে ডুবে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে। এটা রায়হানের ক্ষেত্রে একদম অবিশ্বাস্য। ও খুব ভালো সাঁতার জানতো। রায়হান প্রায় পুলে সাঁতার কাটতো। সাঁতার ওর ব্যায়ামের অংশ ছিলো।
রশ্নি জয়াকে আরও বললো,
—যে লোক এতো ডানপিটে, ব্যবসার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়িয়েছে,রাত দুপুরে একাই চলাচল করতো সে এই বাংলোবাড়িতে কেন একা বের হতে পারবে না। নিশ্চয় এর পিছনে কোন কারণ আছে।
জয়া বললো,
—–তুই এখন এই শোকের সময়ে এসবের মধ্যে ঢুকিস না। আমি কিছুদিনের ছুটি নিয়ে এখানে এসেছি। রায়হানের মৃত্যুর আসল রহস্য উদঘাটন না করে নড়ছি না। এটা হত্যা না স্বাভাবিক মৃত্যু সেটা অবশ্যই আমাদের বের করতে হবে।

মর্গ থেকে লাশ চলে আসার পর রশ্নিমহলের বাগানেই দাফনের ব্যবস্থা করা হলো। জানাযায় অনেক লোক সমাগম হয়েছে। জয়া দেখলো রায়হানের বাবা ভীতসন্ত্রস্ত চেহারা নিয়ে টলতো টলতে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। জয়ার মনে হলো উনি যতটা শোকাহত ছিলেন তার থেকে ভীতসন্ত্রস্ত বেশী ছিলেন।

জয়া চৌধুরী পেশায় একজন ব্যারিষ্টার। সৌখিনতার বশে মাঝে মাঝে গোয়েন্দগিরি করে। রায়হান আর রশ্নির সাথে ওর বহুদিনের বন্ধুত্ব। জয়া রশ্নির ছোটোবেলার বান্ধবী। রশ্নির বিয়ের পর রায়হানের সাথে জয়ার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। প্রিয় বন্ধুর এমন অকাল মৃত্যুতে জয়া আর বাসায় বসে থাকতে পারেনি। নিজ দায়িত্বে ছোটোবেলার বান্ধবীর এই চরম বিপর্যয়ে বন্ধুর বাড়িতে ছুটে এসেছে।

আজ চারদিন হলো রায়হান মারা গিয়েছে। জয়া বিকালের দিকে হাসান জোয়ার্দারের রুমের দরজায় নক করলো। হাসান জোয়ার্দার দরজা খুলে জয়াকে দেখে ভিতরে আসতে বললো। ওনার দিকে তাকিয়ে জয়ার খুব খারাপ লাগলো। দুচোখের পাপড়ি তখনও ভেজা। জয়া আরও অবাক হলো রুমের জানালাগুলো সব বন্ধ রাখা হয়েছে। ঘরের ভিতরে একটা গুমোট গন্ধ। জয়া উনাকে বললো,
—-আঙ্কেল দরজা জানালা খুলে রাখেন। ঘরে ফ্রেস বাতাস আসবে।
হাসান জোয়ার্দার যেন আঁতকে উঠে বললো,
—–না,না তার দরকার নেই। আমি এভাবেই ভালো আছি।
জয়া একটু অবাক হলো। শোকে মুহ্যমান মানুষটিকে আর কিছু না বলে আসল প্রসঙ্গে চলে এসে বললো,
—-আঙ্কেল আপনার কি রায়হানের মৃত্যুটাকে স্বাভাবিক মৃত্যু মনে হয়।
—–তদন্তে রিপোর্ট তো তাই বলছে। ওর পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। আমাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করো না। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
জয়ার কেন যেন মনে হলো হাসান সাহেব ওকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। ওনার চেহারাটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আছে। জয়া আর কোনো কথা না বলে হাসান জোয়ার্দারের রুম থেকে বের হয়ে আসলো।

রশ্নির বাবা মারও মন খুব খারাপ। মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তায় তারা খুব চিন্তিত। জয়ার চোখে ভুল হওয়ার কথা নয়। সেদিন ঐ অপরিচিত আগুন্তক মূহুর্তে হাওয়া হয়ে গেলো। সে কে ছিলো? জয়া আরও কিছু জানার জন্য রশ্নির বাবা মার রুমে গিয়ে রশ্নির মাকে জিজ্ঞাসা করলো,
—–আন্টি যেদিন এ বাড়িতে আপনারা সবাই আসলেন রায়হানের আচরণে কোন অসঙ্গতি চোখে পড়েছিলো?
রশ্নির মা বললো,
—-আমি তো কোনকিছু অস্বাভাবিক দেখি নাই।
রশ্নির বাবাও বললেন,
—–না তেমন কিছু চোখে পড়ে নাই তবে রায়হান বার বার পুলের কাছে গিয়ে পানির দিকে তাকিয়ে ছিলো। ওর কেন যেন মনে হয়েছে পানিতে কেউ সাঁতার কাটছে। কাছে গিয়ে দেখে কেউ নাই। কয়েকবার এরকম হয়েছে।
জয়া তেমন কোনো ক্লু বার করতে পারলো না। তবে হাল ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে জয়া নয়।

রাত্রে ডিনার শেষ করে সবাই তাড়তাড়ি শুয়ে পড়লো। জয়া রশ্নিকে বললো,
—–তুই কি একা শুতে ভয় পাবি?
—–না আমার কোন সমস্যা নেই।
রশ্নির রুম থেকে বের হয়ে এসে জয়া নিজের রুমে শুয়ে পড়লো। একটু তন্দ্রাভাব এসেছিলো। হঠাৎ নুপুরের রিনিঝিনি শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। ওর মনে হলো করিডোরে কে যেন নুপুর পড়ে হাটঁছে। আর ওর রুমটা হাসনাহেনা ফুলের সুবাসে সুবাসিত হয়ে আছে। হঠাৎ জয়ার রুমের জানালার শার্শিতে বিরাট কালো রঙের আবছায়া জয়ার নজরে আসলো। একটু ভাল করে দেখলো দৈত্যাকৃতির একটা বাদুড় শার্শিতে ঝুলে আছে। অন্ধকারে ওর চোখদুটো অঙ্গারের মতো জ্বলছে। জানালার কাঁচটাতে নখের আঁচড়ের দাগ কাটছে। তীব্র আক্রোশে মুখ দিয়ে ফোঁস ফোঁস শব্দ হচ্ছে। জয়ার ওকে দেখে মনে হলো ও যদি কোনো রক্ত মাংসের কাউকে পেতো মূহুর্তে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলতো। জয়ার শিরঁদাড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। নুপুরের শব্দটা ওর রুমের দরজার কাছে এসে থেমে গেলো। দরজায় কয়েকবার ঠাকা পড়লো। ওর দরজাটা খুলে দেখতে কৌতূহল হলো। দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে কি মনে করে ও খুললো না। জয়া ভাবছে ও কি রশ্নির মতো স্বপ্ন দেখছে।নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখলো না ওতো জেগেই আছে। অতঃপর ও আবার জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলো বাদুরটা হাওয়া হয়ে গিয়েছে। মূহুর্তে কোথায় হারিয়ে গেলো দেখার জন্য জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে উঁকি মারলো। পুলের কাছে সেই দৈত্যাকার বাদুড়টা দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোর সাথে ওর কালো অবয়ব মিশে যাওয়ার ফলে বাইরের প্রকৃতিটা রহস্যেময় হয়ে আছে। হঠাৎ বাদুড়টা বিশাল আকাশ জুড়ে উড়ে চলে গেলো। জানালা দিয়ে ওর দৃষ্টি তখন পুলের উপর পড়লো। চাঁদের আলোতে ও স্পষ্ট দেখতে পারছে কেউ যেন ওখানে সাঁতার কাটছে। জয়া জানালা খুলে ভালো করে পুলের দিকে আবার তাকিয়ে দেখলো। ওর গায়ে ঠান্ডা হীমশীতল হাওয়া ছুঁয়ে দিয়ে গেলো। শরীরের পশম কাঁটা দিয়ে উঠলো। ওর মনে হলো কারো স্পর্শ ও যেন অনুভব করলো।পুলের মানুষটা ওকে হাত ইশারা করে ডাকছে। ওর প্রথমে মনে হলো ও ভুল দেখছে। ও আবার চোখ কচলে ভালো করে তাকিয়ে দেখলো। ওকে সত্যি এক সুদর্শন যুবক ডাকছে। যে দেখতে অনেকটা রায়হানের মতো। জয়ার হিতাহিত জ্ঞান যেন শুন্য হয়ে গিয়েছে। ওই আগুন্তক ওকে এমনভাবে সম্মোহন করলো জয়া দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাইরে বের হয়ে পুলের দিকে হাঁটতে লাগলো।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here