প্রথম প্রেম পর্ব ১৩+১৪

#প্রথম_প্রেম
১৩ তম পর্ব।

উর্মি বসার ঘরে বসে রয়েছে, তার মা এসে কি বলবেন, এই চিন্তা করে। শাওনের গিফট ড্রয়ারে রেখেছে। সময় করে খুলবে, আপাতত চিন্তায় কিছু ভাল লাগছেনা।

কলিংবেল বাজতেই উর্মির বুক কেঁপে উঠেছে, হয়তো তার মা এসেছেন। উর্মি দরজা খুলতেই দেখে নানু এসেছেন, হাতে মিস্টির প্যাকেট।

আমার নাতনী এস.এস.সি পাশ করেছে অথচ আমাকে সালাম করতে গেল না, তাই নিজেই মিষ্টি খাওতাতে চলে এসেছে।
– আজই যেতাম।

উর্মি তাড়াতাড়ি সালাম করে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে নানুকে। তাছাড়া এই মুহুর্তে শাওন কে কল দেওয়াটা ও খুব দরকার। নানু আসায় এদিকে ও লাভ হলো।

নানু এসেই বললেন রুনা কোথায়?
– পাশের বাসায়।
– উদয়?
– আছে রুমে, টিভি দেখছে।
– আমি তাড়াতাড়ি করে ওয়াশ রুমে যাই, ডায়াবেটিস হয়েছে আর কতক্ষন পর পরেই যেতে হয়।
– ওহ।

নানু ওয়াশ রুমের দরজা লক করতেই কাঁপা হাতে শাওন কে কল দিল, কারণ নানুর বের হতে ৪/৫ মিনিট লাগবেই। চারটা রিং হচ্ছে, শাওন ফোন তুলছেনা, এদিকে উর্মির ভিতরে কাপছে ভয়ে।

হ্যালো।
– ফোন ধর না কেন?
– বাসে, শুনতে পাইনি প্রথমে!
– কোথায় যাচ্ছ?
– বাড়িতে।
– হঠাৎ?
– আমার রুনা ভাবী অতিশয় বুদ্ধিমতী নিশ্চয়ই ভাবীর কাছে যাবেন। তাই তোমাকে বাঁচাতে চলে যাচ্ছি, তাছাড়া মাকে ও দেখিনা মাস খানেক হয় গেল।
– থ্যাংক ইউ সো মাচ।
– নানু কি থাকবেন?
– জানিনা, থাকলে রাতে ম্যাসেজ দিব।
– সাবধানে। আচ্ছা এখন রেখে দাও, পরে কথা বলবো। আর এভাবে চোখে কাজল দিও না, নজর লাগবে।
– কাজল দিল নজর লাগেনা।
– তাই, আচ্ছা দিও। সুন্দর লেগেছিল অনেক, রাখি।
– রাখি।

উর্মির মনে হলো বুক থেকে বড় পাথর নেমে গেল। এই মানুষ টা এতো বুঝে তাকে। এতো ভালো মানুষ টা কি সারাজীবন এভাবেই পাশে থাকবে?

নানু ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে বললেন, তোর মাকে ডেকে নিয়ে আয়৷ আমি বসবো না।
– না৷ আমার ওই বাসায় যেতে ইচ্ছে হয়না।
– কি জন্য?
– জানিনা, আর তুমি আজ থাকবে।
– না, রে। আজ না, অন্য একদিন থাকবো। তুই ভালো রেজাল্ট করেছিস তোর মামারা খুব খুশি হয়েছে। কি চাস বল?
– মোবাইল!
– প্রেম করার জন্যে?
– না, এমনি।
– তোর বাসায় ল্যান্ডফোন আছে, তুই মোবাইল দিয়ে কি করবি!
– এমনি বললাম, কিচ্ছু লাগবেনা।

রুনা খানম এই মাত্র হাসি হাসি চেহারা নিয়ে বাসায় এসেছেন। এসে বললেন কি রে উর্মি আম্মা এসেছেন আমাকে ডাকবি না? তুই কখন এসেছিস?
– আধা ঘন্টা আগে।তুমি কোথায় গিয়েছিলে?
– মুন্নি ভাবীর বাসায়।
– ওহ।
– ঘুরাঘুরি করেছিস?
– হ্যা, অনেক মজা হয়েছে।
– যা, এখন জামা কাপড় চেঞ্জ করে ফ্রেশ হ। আমি আম্মাকে চা দেই। আর এতো মিষ্টি কেন আম্মা?

উর্মির আর কোন কথাই কানে যাচ্ছেনা, এখন দৌড়ে গিয়ে গিফট খুলতে হবে। তাই নিজের রুমে চলে গেল।

উর্মি দরজা বন্ধ করে, গিফট খুললো। খুলতেই দেখলো,
ছোট্ট একটি ডাইরী, ডাইরীর প্রচ্ছদ শাওনের হাতে করা। বড় করে লিখা “উর্মি”।

ডাইরীর প্রথম পৃষ্টায় লেখা।
এটা সুখের ডাইরী। আমাদের যদি বিয়ে হয়, বিয়ের দিন এটা সাথে করে নিয়ে আসবে। কোন দুঃখের কথা লিখবেনা৷

সাথে একটি একটা কার্ড, ও একটা চিরকুট। কার্ডটি ও সুন্দর করে নিজের হাতে বানিয়েছে শাওন। উর্মির মনে হচ্ছে এটা পৃথিবীর শ্রেষ্ট উপহার পেয়েছে আজ। এর চেয়ে প্রিয় কোন উপহার উর্মির নেই। কারণ নিজ হাতে এতো যত্ন করে বানিয়েছে, এটার মূল্য কোটি টাকার চেয়ে ও বেশি।

চিঠি পড়ছে উর্মি।

উর্মিমালা।
আজ অতি আনন্দের দিন, আমি আজ খুব খুশি। আজ তুমি জীবনের প্রথম ধাপ উত্তীর্ণ হয়েছ সফলার সাথে। আমি জানি আমার উর্মি প্রতিটা ধাপে সফলতা পাবে। মনোযোগ দিয়ে পড়বে, যেন কেউ জানলে ও আমাদের সম্পর্ক নিয়ে খারাপ মন্তব্য না করে। তুমি আমার জীবনের সবকিছু, আমার মতো একজন হত দরিদ্র ছেলেকে তুমি ভালবেসেছ, আমার পিছনে অনেক পিছুটান। যেন খুব দ্রুত পাশ করে, ভালো জবে যেতে পারি, সেই দোয়া করবে। এখন তুমি কলেজ ছাত্রী, ধীর স্থির হও, উতলা হওয়া যাবেনা, আমি তোমারই থাকবো।
ভালো থেকো,
ইতি
তোমার প্রিয়জন।

উর্মি বোধহয় কয় বার যে এই চিঠি পড়েছে, হিসেব নাই। শাওন যে কখন সব সময়ের জন্য তার হবে সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করছে উর্মি।

শাওনের ফোন বাজছে, শাওন চিন্তা করছে নিশ্চয়ই তার উর্মিমালা, আবার ফোন দিয়েছে। হ্যা সত্যি, তবে তাদের ল্যান্ডফোন থেকে।

হ্যালো..
আমি রুনা বলছি….

শাওন ভয় পেয়ে গেল, এই মহিলা কেন আবার ফোন দিয়েছেন? না কি তিনি উর্মি কে ধরে ফেলেছেন! চিন্তায় অস্থির লাগছে শাওনের, কোন উদ্দেশ্য আবার ফোন দিলেন তিনি…..
#প্রথম_প্রেম।
১৪তম পর্ব।

শাওন হিম হয়ে আছে রুনার নামটি শুনে, শাওন বললো জি বলুন।
– তুমি কি বাসে?
– জি। বাড়ী যাচ্ছি।
– শাওন, আমার এক কাজিনের একটা ছেলে আছে, তুমি পড়াতে পারবে?
– জি না, সময় নেই এখন।
– না, তোমাকে আসলে ভুল বুঝেছি। এখন খারাপ লাগছে। মায়ের মন কত কিছুই তো ভাবে। আমার মেয়েটা ছোট, তাই এতো চিন্তা, ও তোমার ভাতিজির মতো।
– জি।
– ভাবলাম, তোমার সময় থাকলে পড়ালে, তোমার একটু ভালো হতো, ওদের ও টিচার দরকার।
– বুঝেছি৷ কিন্তু এই মুহুর্তে সময় নেই।আসলে।
– ওহ! বুঝেছি। শোন, তুমি কিন্তু রাগ করে থাকবেনা, আর মিষ্টি খাওয়ার দাওয়াত রইলো।
– জি।
– বাড়ীর সবাইকে আমার সালাম দিও, রাখি।
– জি, আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়ালাইকুম আসসালাম।

শাওন এই মহিলার মতি গতি বুঝেনা, এখন আবার টিউশনির অফার দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই মনে হয়েছে আগে বাড়াবাড়ি রকমের করেছেন তাই।

শাওন মনে মনে বলছে, আর হাসছে, রুনা ভাবী যখন সময় আসবে, মিষ্টি নিয়েই আপনার বাড়ী আসবো।
টিউশনি আরেকটা হলে মন্দ হয়না, তবে উর্মির ফ্যামিলিতে যাওয়ার ইচ্ছে নাই টিউটর হয়ে।

শাওন বাড়ীতে যাওয়ার পর, তার মা দেখে পুরো অবাক হয়ে গিয়েছেন। হঠাৎ এভাবে এসেছে, যদিও সে ফোনে জানিয়েছিল আসবে! কারণ ভাবী কল দিবে। তবুও মা পুরো পুরি অবাক হয়েছেন এবং খুশি হয়েছেন ছেলে দেখে।

শাওনের মা বার বার বলছেন কি রে হঠাৎ কি মনে করে চলে আসলি?
– তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করলো, তাই।
– সজিবের বাসায় যাস না কেন?
– মা, থাক এই প্রসঙ্গ।
– বড় ভাই, তোর ভালো চায়। তাছাড়া বড়লোকের মেয়েকে কি তোর সাথে বিয়া দিব? শুধু শুধু কষ্ট পাবি!
– মা, বাদ দাও প্লিজ। ছোটপু কোথায়?
– রান্নাঘরে৷ কাঁঠাল বিচির ভর্তা বানায়।
– আচ্ছা৷ আমি যাই আপুর কাছে।

শাওন তার ছোট আপুর পাশে পিড়ি নিয়ে বসেছে, বলছে, আমারে কাঁঠাল বিচি দে, ভর্তায় দেওয়ার আগে।
– তুই তো চাইনিজ খাবি, এখন। বড় লোকের জামাই হবি।
– আপু শোন, এরকম কিচ্ছু না। তবে, হে এটা সত্য উর্মিকে আমার পছন্দ।
– বড় লোকের মেয়ে কি এই টিনের বাড়ী পছন্দ করবে?
– দেখা যাবে।
– ছবি আছে?
– ছবি কোথায় পাবো?
– ওমা, প্রেম করছিস, ছবি রাখবিনা।
– এগুলি কি ভাইজান বলেছে?
– না, ভাবী। তুই নাকি মেয়ের সাথে ছাদে ধরা পড়েছিস?
– ফালতু কথা, একদম বলবিনা।
– আমি বলছি নাকি? ভাবী বললো।
– আমি উর্মি কে পছন্দ করি, কিন্তু ভাবী যে রকম রঙ মাখিয়ে বলে এরকম কিচ্ছু করিনি, যে ধরা পরবো।
– আচ্ছা বাদ দেয়, উর্মি নাকি নাম? দেখতে কেমন আমার ভাইয়ের বউ?
– আপু বউ হলো কবে? তাড়াতাড়ি ভর্তা কর, রাত দশটা বাজে ক্ষিদা লেগেছে, তাড়াতাড়ি কর, শুধু উল্টো পালটা কথা।

শাওন আস্তে করে উঠে বারান্দায় বসে ভাবছে, সত্যি তো এই টিনের ঘর কি উর্মি পছন্দ করবে? যদি ভালবাসে করবে, আর ভালো চাকরি হলে মায়ের সুখের জন্য বাড়ীঘর একদিন ঠিক হবে!

রুনা খানম ফোন রেখে ভাবছেন, ছেলেটার স্ট্রং পারসোনালিটি, সহজে ধরা দেয়না। ছেলে ভালো, শুধু যেন তার মেয়ের চেয়ে দূরে থাকে। এই একটাই চাওয়া।

আজ সকালে উর্মি হলিক্রস কলেজে ভর্তি হয়েছে। কারণ তার কম্বাইন্ডে পড়তে ভালো লাগেনা। সাইয়ারা ও ভর্তি হয়েছে একই কলেজে।

উর্মি সকালে নাশতা করছে, তোফায়েল সাহেব বলছেন উর্মি আজ তোর কলেজের প্রথম দিন, তাই কিছু কথা বলি, শোন,
ইন্টারমিডিয়েট সময় টা কম, কিন্তু পড়াটা বেশি। তাই, সময় একদম নষ্ট করবিনা, ইন্টারমিডিয়েট পরে, ভালো জায়গায় চান্স পেয়ে গেলে, জীবন এমনিতেই উপভোগ করতে পারবি। আর অযথা খারাপ কাজে সময় নষ্ট করবিনা।
– হুম। তোমরা কি কলেজেও আমাকে নিয়ে যাবে, আসবে?
– তোমার বয়স ১৮ হয়েছে? তুমি কি বুঝ বলো? এই বয়সে রঙিন চশমায় দুনিয়া রঙিন লাগে। তাই সময় হোক একাই যাবে।
– আমি নানুকে কল দিব ভাবছি, তোমার সেলফোন একটু নিই?
– ল্যান্ড ফোন।দিয়ে কর।
– না, তোমারটাই দাও।
– নাও।

উর্মি, মোবাইল হাতে পেয়েই নানুকে কল দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। এবং ১ মিনিট কথা বলেই, শাওন কে কল দিল। শাওন এক রিং হতেই ধরে ফেললো।
হ্যালো, আজ কলেজের প্রথম দিন। বলো কিছু?
– বেস্ট অব লাক।
– ভালবাসি, কথাটাও বলতে পারনা।
– জানই তো।
– শুনতে ইচ্ছে করে, কবে নুঝবে! আচ্চা রাখছি।
– সাবধানে যেও।
– জি।

উর্মি নাম্বার ডিলিট করে, বাবার ফোন বাবার হাতে দিয়ে দিল। এবং কলেজে যাওয়ার জন্য নেমে গেল।

শাওন আজ উর্মি কে এক নজর দেখবে বলে, তাদের কোয়ার্টারের উল্টো পাশের গলিতে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। উর্মি কে এতো সুন্দর লাগছে নতুন কলেজ ড্রেসে। সারাক্ষণ চঞ্চল থাকে উর্মি, কি যেন কথা বলেই যাচ্ছে বাবাকে।

এই যে এক নজর দেখাতেই যে কি আনন্দ, সেটা কাউকে বুঝানো যাবেনা। এই মেয়েটিকে সারাক্ষণ পাশে বসিয়ে রেখে দিতে ইচ্ছে করে।

শাওন মাথা ঘুরিয়ে দেখে রিয়াজ ভাই, যিনি সজিবের কলিগ, এই কোয়ার্টারে থাকেন। তিনি সামনে এসে বললেন আরে শাওন অনেক দিন পর! কখন আসলে?
– এই তো! কেমন আছেন ভাইয়া?
– ভালো আছি।
– এখানে কি? কারো বাসা এই গলিতে? আমার আপার বাসা, এই দুই তলা বিল্ডিং।
– না, এমনি হাঁটছি।
– তা, এতোদিন কোথায় ছিলে?
– মেসে উঠেছি, ভার্সিটি দূরে হয়।
– আচ্ছা, এসেছো যখন বাসায় আসবে, তোমার ভাবী খুব পছন্দ করে তোমাকে।
– জি ভাইয়া।

শাওনের মেজাজ ধরে গেল, এই লোক কেন এই সাত সকালে আপার বাসায় যাবে। এই নিশ্চয়ই গিয়ে ভাইজান কে বলবে। কি করবে কিছুই ভালো লাগছেনা, ভাইজানের ফ্ল্যাটে যাওয়ার ইচ্ছে একদম নেই, না গেল্রি ঝামেলা হবে, কি এক যন্ত্রণা হলো, কি করবে কিছুই বুঝতে পারছেবা শাওন…..

চলবে….

আন্নামা চৌধুরী।
০৯.০৮.২০২১
চলবে….

আন্নামা চৌধুরী।
০৭.০৮.২০২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here