প্রয়োজনে প্রিয়জন পর্ব -৪১+৪২

#প্রয়োজনে_প্রিয়জন
#পর্ব_৪১
#তানজিলা_খাতুন_তানু

(নিচের নোটটা সকলে একটু পড়বেন প্লিজ)

অতসী আদৃতদের বাড়িতে যাবে বের হচ্ছিল তখনি নিলয়ের ফোন আসলো ওর কাছে।

– হ্যাঁ, নিলয় দা বলো।
– বোন একটা হেল্প করবি?
– কি হেল্প?

নিলয় কিছু বলাতে অতসীর মুখের কোনে হাসি ফুটে উঠল।

– আচ্ছা তাহলে কাল খাঁন ভিলাতে দেখা হচ্ছে।
– ওকে।

অতসী অন্য একটা বিষয়ের মধ্যে ঢুকে আদৃতের বিষয়টা পুরোই ভুলে গেল।

পরেরদিন..

খাঁন ভিলাতে খুশির আমেজ। অতসীর মা আর ভাবি রান্নার আয়োজন করছে, কিন্তু কেউই জানে না আসলে বাড়িতে কে আসছে।

– মা কে আসবে বলো তো, বাবা এত সব রান্না করতে বলল।
– আমিও তো সেটাই ভাবছি। আর তোমার শশুরকে তো আজকে খুব খুশিই মনে হলো।
– হুমম।

শাশুড়ি-বৌমার কথার‌ মাঝে আকরাম খাঁন রান্নাঘরে প্রবেশ করলেন।

– কি গো, তোমাদের রান্না কতদূর।
– এই তো হয়ে গেছে।
– হুম, তাড়াতাড়ি সব করো ওরা তো প্রায় এলো বলেই।
– কে আসবে?
– সারপ্রাইজ।

তখনি কলিং বেলের শব্দ হলো। আকরাম খাঁন খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,
– ওরা মনে হয় চলে এসেছে।

আকরাম খাঁনের পেছন পেছন ওনার স্ত্রী আর বৌমা আসলো। আকরাম খাঁনকে দরজা খুলতে যেতে দেখে ওনারা দুজনেই খুব অবাক হয়েছে, কারন বিষয়টি এই প্রথম বার। কে সেই স্পেশাল মানুষ, যার জন্য এত আয়োজন!

আকরাম খাঁন মুখে হাসি দরজা খুলে বললেন,

– দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে এসো সবাই, আর দিদিভাই তুমি কোলে আসো আমার।

আকরাম খাঁন আরুকে কোলে তুলে নিয়ে ওনাদের ভেতরে বসিয়ে দিলেন। তারপরে সকলের সাথে অতসীর মায়ের আর ভাবির পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন।

– রুদ্রের মা ওটা হলো আদৃত, ওর মা আর বোন। আর এটা হলো আমাদের দিদিভাই আরু।

আমাদের দিদিভাই বলতে আকরাম খাঁন কার কথা বলেছে সেটা বুঝতে ওনার অসুবিধা হলো না। আরুকে কোলে তুলে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে লাগলেন।

– দাদুভাই এটা কে হয় আমার।
– এটা তোমার আরেকটা দিদুন আর এটা তোমার মামিমা।
– তাই।
– হুমম সোনা।

সকলেই খুশি দেখে আদৃতও খুব খুশি হলো। সবকিছু কি সুন্দর স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। এই বার মিতুটার বিয়ে দিতে পারলেই ওর শান্তি।

– আমরা বিনা নেমন্তন্নে চলে এসেছি।

চেনা কষ্ঠস্বর শুনে সকলে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল নিলয় আর ওর বাবা দাঁড়িয়ে আছে। এতদিনের পুরানো বন্ধুকে অনেকদিন পর নিজের বাড়িতে দেখে আকরাম খান এগিয়ে গেলেন,

– আরে তুই। হোয়াট এ সারপ্রাইজ।
– কেমন লাগল আকরাম।
– দারুন, সত্যি তোরা এসেছিস আমি খুব খুশি হয়েছি।
– সত্যিই হয়েছিস না মুখেই বলছিস।
– হয়েছি রে বাবা। আরে নিলয় ভেতরে এসো।
– ওয়েট আঙ্কেল.. অতসী

অতসী নামটা শুনে সকলেই দরজার দিকে নিজেদের দৃষ্টি স্থির করল। অতসী যখন ধীরে ধীরে ভেতরে আসতে লাগল, তখন অতসীর মা তো কথা বলতেই ভূলে গেছে। নিজের মেয়েকে এতদিন পর বাড়িতে দেখে আকরাম খানও প্রচন্ড রকমের খুশি হয়ে যায়। কান্নাকাটি পর্ব শেষ‌ হবার পর, অতসী ওর ভাবির সাথে পরিচিত হয়।

– ননদিনী তোমার নাম অনেক শুনেছি, তোমাকে দেখার অনেক ইচ্ছা ছিল ফাইনালি সেটা পূরন হলো।
– আমার ভাবি।

কিছুক্ষন পর রুদ্র এসে গোটা পরিবারটাকে পূরন করলো, তবে একজনের শূন্যতা ঠিকই রয়ে গেল। রুহি, হয়তো উপর থেকে দেখছে আর খুশি হচ্ছে কিংবা না থাকতে পারার জন্য আক্ষেপ করছে।

খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষ হবার পর সকলে একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে। অতসী ফোনে টুকটুক করছিল, তখন থেকে নিলয় অতসী কে খোঁচা মেরেই যাচ্ছে। একটা কাজ করার সময়ে যখন কেউ বিরক্ত করে না,তখন মেজাজটা গরম হয়ে যায়। অতসীর ওহ তাই হলো, সহ্য করতে না পেরে চেঁচিয়ে বলে উঠল,

– কি হলো কখন থেকে খোঁচা মে’রেই যাচ্ছো, মে’রেই যাচ্ছো। বলছি তো তোমার আর মিতুর বিয়ের কথাটা বলবো, এত তাড়া কিসের।

রাগের মাথাতে কথাটা বলে জিভ কাটল অতসী। নিলয় লজ্জায় আর দাঁড়াল না, গটগট করে হেঁটে চলে গেল আর সাথে অতসীর নামে গালাগাল করতে ভুলল না। নিলয় চলে যেতে দেখে অতসী বুঝল, ভুল কথাটা ভুল জায়গায় বলে ফেলেছে। ইশ নিলয় দা কি ভাবছে।

আর বাকি সবাই ওদের কান্ডে তাজ্জব বনে বসে রয়েছে। মিতু না পারছে উঠতে আর না পারছে কিছূ বসতে, লজ্জাতে লাল হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে সবার সামনে লজ্জাতে পড়তে হবে,সেটা কখনোই ভাবেনি।

অতসী পরিস্থিতিটাকে সামাল দিতে বললো,
– মিতু তুমি আরুকে নিয়ে ঘরে যাও।

মিতু যেন প্রান ফিরে পেল। তাড়াতাড়ি ওখান থেকে চলে গেল, বলা চলে পালিয়ে গেল।

– আসলে আঙ্কেল,আন্টি।
– তোকে আর কিছুই বলতে হবে না।

নিলয়ের বাবার গম্ভীর কন্ঠ শুনে অতসী একটু ঘাবড়ে গেল। যদি উনি রাজি না হন তো, কিন্তু অতসীর ভাবনাকে ভুল প্রমানিত করে বলে উঠলেন,
– দিদি, আমার কিন্তু আপনার মেয়েকে বেশ পছন্দ। অতসী আর নিলয় আজকে বিষয়টা এইভাবে প্রকাশিত না করলেও আমি নিজে থেকেই বিয়ের কথা বলতাম। আপনার কি আমার ছেলেকে জামাই হিসাবে পছন্দ?

আদৃতের মা ওর দিকে তাকাল। আদৃতের মুখের হাসিটা চওড়া হয়ে গেছে, নিলয়কে ওর ওহ বেশ পছন্দ।

– আঙ্কেল আমাদের ওহ নিলয়কে পছন্দ। মিতু যদি রাজি থাকে তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেয়।

অতসী খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
– আমি এখুনি সেটা জেনে আসছি।

কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অতসী চলে গেল। অতসীর বাচ্চামো দেখে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো, মেয়েটা তাহলে পুরোপুরি কঠিন হয়ে যায়নি। এখনো ওর মাঝে বাচ্চা মানুষটা লুকিয়ে আছে।

– মিতু তোমার সাথে আমার কথা আছে।
– আমি জানি তুমি কি বলবে, দাদাভাই আর মা যা সিদ্ধান্ত নেবে তাতেই আমি রাজি।
– তবুও নিজের সিদ্ধান্তটা দাও। বিয়েটা তুমি করবে, থাকতে হবে তোমাকেই।
– হুমম আমি রাজি।

অতসীর মুখে হাসি ফুটে উঠল। সবকিছুই ঠিকঠাক হয়ে গেল, খুব শীঘ্রই নিলয় আর মিতুর বিয়ের সানাই বাজতে চলেছে।

অতসী নিলয়ের কাছে গেল গুড নিউজটা দেবার জন্য।

– নিলয়’দা।
– কি হলো, কি বললো সবাই।

অতসী কাঁদো কাঁদো ফেস করে দাঁড়িয়ে রইল।

– সব হলো তোর জন্য, ওইভাবে তোকে কে বলেছিল চেঁচিয়ে উঠতে।
– আমি কি করলাম।
– সব তোর জন্য। তোর জন্য আমি বিয়ের আগেই বি’ধবা হয়ে গেলাম।

নিলয়ের কথার ধরন দেখে অতসী হা হা করে হেসে উঠল। নিলয় কিছুই না বুঝে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।

– কি হলো এইভাবে হাসছিস কেন?
– একটা কথা বলবো,
– কি বল।
– সবাই রাজি হয়ে গেছে বিয়ের জন্য।
– সত্যি।
– হুমম।

নিলয় খুশি হয়ে অতসীকে জড়িয়ে ধরল। পছন্দের মানুষটিকে নিজের করে পাওয়ার অনুভূতিটা একদম আলাদা। নিলয় খুব খুশি।

– থ্যাঙ্ক ইউ বোন।
– এখন থ্যাঙ্ক দিচ্ছো,আগে তো কত কথা শোনালে।
– সরি রে।

অতসী গাল ফোলালো, নিলয় অতসীর গাল টেনে নিয়ে মুচকি হাসল।

– পাগলি বোন আমার।

সকলেই খুব খুশি।

– আমি বলছিলাম নিলয় দা আর মিতু যদি নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলে নিত তো, তাহলে আরো ভালো হতো না!

অতসীর কথাতে সকলেই সহমত প্রকাশ করেন। অতসী নিলয়কে নিয়ে যায়,

– মিষ্টি বুড়ি চলো আমার সাথে‌, নিলয় দা কথা বলো তোমরা আমরা গেলাম।

নিলয় আর মিতুকে রেখে অতসী আরুকে নিয়ে চলে যায়। মিতু উশখুশ করে চলেছে, বিয়ের কথা শোনার পর থেকে কিরকম একটা অস্বস্তি হচ্ছে।

– কেমন আছো।
– ভালো আপনি।
– ভালো ছিলাম না, কিন্তু এখন ভালো আছি।

নিলয়ের রসিকতা স্বরে বলা কথাটাই মিতুর লজ্জা যেন আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেল।

– তা আমাকে তোমার পছন্দ তো?

মিতুর লজ্জার মাত্রা বেড়েই চলেছে, মিতু বিরবির করে বলল,

– এই ছেলে কি আমাকে লজ্জা দিয়ে দিয়ে মারবে নাকি?

– কিছু বললে কি?
– না।

নিলয় মুচকি হাসল, মিতুর লজ্জা রাঙ্গা মুখটা দেখতে ওর ভালোই লাগছে, তাই তো ইচ্ছা করে ওকে বারবার লজ্জাতে ফেলছে।

অন্যদিকে..

আরু দৌড়ে গিয়ে আদৃতের কানে কানে বলল,

– বাবা আন্টি তোমাকে ছাদে ডাকছে।

আকরাম খাঁন আরুকে এইভাবে কথা বলতে দেখে বলল,

– কি বলছো বাবাকে দিদিভাই।
– কিছু না।
– আচ্ছা তুমি আমার কোলে আসো তো।

আদৃত একটু উশখুশ করে বলল,
– আমার একটা কল‌ করার আছে, আমি আসছি।

আদৃত উঠে যেতে আকরাম খাঁন সকলকে অন্য কথাতে ব্যস্ত রাখতে লাগলেন। উনি ভালো করেই বুঝতে পেরেছেন, আদৃত কোথায় যাচ্ছে।

অতসী ছাদে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিবিলাসে ব্যস্ত, কতদিন পর নিজের প্রিয় ছাদে দাঁড়িয়ে প্রানভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

– আমাকে ডাকছিলে?
– হুমম।
– বলো।
– আপনার সাথে আমার কথা ছিল।
– তোমাকে থ্যাঙ্ক ইউ।
– কেন?
– মিতুর জন্য আমার চিন্তা ছিল সেটার সমাধান হয়ে গেল। নিলয়কে যতটা চিনেছি ওহ আমার বোনকে ভালোই রাখবে।
– হুমম। শুধু বোনের জন্যই চিন্তা আর নিজের মেয়ের জন্য চিন্তা নেই আপনার?

আদৃত হাসল, অতসী কি বোঝাতে চেয়েছে সেটা ভালো করেই বুঝতে পেরেছে।

– আপনি হাসছেন কেন?
– এমনি। মেয়ের জন্যও চিন্তা হত, কিন্তু এখন আর হয় না।
– কেন?
– ওর দু-দুটো পরিবার আছে। আমার কিছু হয়ে গেলেও ওহ ভালোই থাকবে।

অতসী চমকে উঠল। আদৃত হঠাৎ করেই এই কথাটা বলল কেন?

– এইসব আপনি কি বলছেন?
– আরে প্রতিটা মানুষকেই তো একদিন না একদিন চলে যেতে হয়। তাই বলছিলাম।
– তবুও এইভাবে বলবেন না।
– আচ্ছা। তবে আমার এখন চিন্তা কাকে নিয়ে জানো?
– কাকে?
– তোমাকে।
– কেন?
– এই যে বিয়ে-টিয়ে কবে করবে। বয়স তো বেড়ে যাচ্ছে।
– করতে তো চাইছি, কিন্তু আপনি তো রাজি হচ্ছেন না।

আদৃত উত্তর না দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

– কি হলো বলুন।
– কি বলবো।
– আমাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছেন না কেন?
– দ্যাখো অতসী আমি বিবাহিত আমার একটা মেয়েও আছে। তুমি অল্পবয়সী আমার থেকে কয়েকগুন বেশি ভালো ছেলেকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসাবে পাবে।
– আমার ভালোর দরকার নেয়। রাজি হবেন কিনা বলুন।
– না।
– তাহলে আমিও কিন্তু সারাজীবন বিয়েই করবো না।

অতসীর বাচ্চামো দেখে আদৃত হেসে ফেলল।

– বাচ্চাদের মতো কথা বলো না। নিজের জীবনটাকে নতুন করে শুরু করো।
– বলছি তো‌ করব, আপনি আর আমি।

আদৃত কিছু বলতে যাবে তখনি আদৃতের ফোনে একটা কল আসলো। অতসী তাকিয়ে দেখল, ডক্টর এম লেখা আছে। আদৃত তাড়াতাড়ি ফোনটা উঁচুতে তুলে নিয়ে বলল,
– আমি আসছি।

আদৃত একপ্রকার পালিয়ে গেল। অতসী বিরবির করে বলল,

– কি হলো‌ বিষয়টা? ডক্টর ফোন করেছে, আর আদৃত এইভাবে পালিয়ে গেল কেন?

#চলবে…#প্রয়োজনে_প্রিয়জন
#পর্ব_৪২
#তানজিলা_খাতুন_তানু

দাদাভাই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে, হসপিটালে ভর্তি করানো হয়েছে। প্লিজ অতসী তুমি তাড়াতাড়ি আসো।

অতসীর হাত থেকে ফোন পড়ে গেল। কোনরকমে দৌড়ে বাড়ির ড্রাইভারের কাছ থেকে চাবি নিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। অতসী ড্রাইভ করতে পারে, লাইসেন্সও আছে।

অতসী আদৃতের হসপিটালে গিয়ে দেখল তখনো আদৃতের জ্ঞান ফেরেনি। মিতু করিডরে পাইচারি করছে। আদৃতের মা আর আরু কান্নাকাটি করছিলো, তাই ওরা বাড়িতেই আছে। মিতু একাই এসেছে, নিলয়কে ফোন করেছে ওহ কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে আসবে।

– মিতু।
– তুমি চলে এসেছো।
– হ্যাঁ। ডক্টর দেখছে
– হ্যাঁ।
– কি বলল।
– রিপোর্ট করতে বলেছে।
– জ্ঞান ফিরেছে।
– না।

অতসী চিন্তাতে এদিক ওদিক করতে থাকল। মনটা চঞ্চল হয়ে উঠেছে, সুস্থ মানুষটার হঠাৎ করেই কি হয়ে গেল সেটাই বুঝতে পারছে না।

– মিতু।

নিলয়ের গলা পেয়ে ওরা দুজনেই সেইদিকে তাকাল।
মিতু নিলয়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে কেঁদে দিল।

– কেঁদো না মিতু কিছু হবে না। আদৃতদা ঠিক হয়ে যাবে।

অতসী মিতু আর নিলয়কে দেখে মুচকি হাসল। ভালোবাসা বুঝি এমনি মিতু এতক্ষন সবকিছু শক্ত হাতে সামলাচ্ছি কিন্তু ভালোবাসার মানুষটাকে দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না, কেঁদে দিলো।

এর মাঝেই একজন ডক্টর চলে আসলো, অতসী এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।

– ডক্টর আদৃত কেমন আছে।
– ওনার সেন্স ফিরেছে।
– দেখা করতে পারি।
– হ্যাঁ।

ডক্টর চলে যেতে কথাটা মিতুকে বলল।

– অতসী তুমি যাও দাদাভাইয়ের কাছে যাও। তোমাকে দেখলে ওহ বেশি খুশি হবে।
– আচ্ছা।

অতসী ধীর পায়ে কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে দেখল আদৃতের নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে কি যেন গভীর ভাবনায় ডুবে আছে। অতসী আদৃতের পাশের ঢুলে বসতেই আদৃত ধীর গলাতে বলল,

– তোমার দিদিভাই আমাকে ডাকছে অতসী।

অতসীর বুক কেঁপে উঠল। আদৃত হঠাৎ করেই এইরকম কথা কেন বলছে সেটা বুঝতে পারল না, ধমক দিয়ে বলল,

– কেউ সেন্সলেস হয়ে গেলেই কিছু হয় না। তাই উল্টোপাল্টা কথা বলা বন্ধ করুন।

আদৃত হাসল কিছুই বলল না। অতসীর সবকিছু বিরক্ত লাগছে।আদৃতের কথাটা ওর বুকে গিয়ে লেগেছে।

অতসী রাগ দেখিয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে যায়। অতসী কে এইভাবে বের হয়ে যেতে গেলে মিতু বলল,

– কি হলো এইভাবে চলে আসলে যে।
– তোমার দাদাভাইয়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
– মানে?
– যাও গিয়ে দেখা করে এসো।

মিতু আর নিলয় চলে যেতেই অতসী চেয়ারে বসে হাঁসফাঁস করতে থাকে। তখনি একজন নার্স এসে বলল,

– ডক্টর মিষ্টার আদৃতের বাড়ির লোকদের ডাকছে।

অতসী মিতু দের অপেক্ষা না করেই চলে গেল।

– মে আই কাম ইন।
– ইয়েস।

অতসী ডক্টরের চেম্বারে গিয়ে বসতেই ডক্টর বললেন,

– আপনি উনার কে হন।

অতসী কিছু বলতে পারল না। কি বলবে সেটাই বুঝতে পারল না। অতসী কে চুপ করে থাকতে দেখে ডক্টর ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অতসী কিছু ভেবে বলল,

– আমি ওনার বন্ধু।
– ওহ।
– আপনি কি বলার জন্য ডেকেছিলেন।
– ডক্টর আমাকে বলতে পারেন,
– কিন্তু ওনার বাড়ির লোক হলে ভালো হতো
– আমি ওনার বাড়ির মতোই, আমাকে বলতে পারেন।
– ওকে। তবে ওনার‌ বাড়ির লোক হলে কিছু তথ্য দিতে পারত।
– মানে?
– আমার সন্দেহ হচ্ছে আদৃতের মাথাতে একটা সমস্যা হয়েছে। আর তার কারনেই ওহ সেন্সলেস হয়ে গেছে।
– সমস্যা মানে?
– সেটা এখনি বলতে পারছি না তবে একটা সন্দেহ তো হচ্ছেই।
– কি সন্দেহ।
– পরে বলবো, এখন আপনারা চাইলে আদৃত কে নিয়ে বাড়ি যেতে পারেন। পরশু এসে রির্পোট গুলো পরশুদিন এসে নিয়ে যাবেন।
– ওকে।

অতসী ধীর পায়ে মিতুর সামনে গিয়ে কথাগুলো বলল। মিতু খুব খুশি হলো যে আদৃত কে নিয়ে যেতে পারবে।

আদৃতকে বাড়িতে নিয়ে আসতে আরু জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো।

– বাবা তুমি আমাকে ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলে।
– এই তো মা আছি তো। কান্না করো না তুমি।
– আর ছেড়ে যাবে না তো।

আদৃত কিছু না বলে আরুর কপালে চুমু দিলো। অতসী বুঝল আদৃত বেশি কথা বাড়াতে চাইছে না,তাই পেছন থেকে বলল,
– আরু সোনা বাবাকে রেস্ট নিতে দাও।
– আচ্ছা।

দেখতে দেখতে ২দিন কেটে যায়। আজকে আদৃতের রিপোর্ট দেবার কথা, অতসীর বুক কাঁপছে ঠিক কি হবে কে জানে।

মিতুকে বলে দিয়েছে অতসী নিজেই রিপোর্ট আনবে তাই আর মিতু কিছু বলেনি। অতসী রির্পোট হাতে পাওয়া মাত্রই ডক্টরের কাছে ছুটে গিয়েছে। ডক্টর সবটা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

– এইটা আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম। সরি আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি ওনার হাতে সময় খুবই কম। উনি ঠিক যে কন্ডিশনে আছেন সেখান থেকে রিকোভার করা কখনোই সম্ভব নয় তবুও উপরওয়ালা কে ডাকুন দেখুন কি হয়।

অতসী পার্কে গিয়ে কান্নাতে ভেঙে পড়ল। ওহ ভাবতেই পারছে না সুস্থ সবল মানুষটার ভেতরে ভেতরে এত বড়ো একটা অসুখ দানা বেঁধে রয়েছে আর সেটা কেউই বুঝতে পারলো না।

অতসী বিধ্বংস হয়ে আদৃতের ঘরে গিয়ে আদৃতকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। আদৃত সবটা বুঝে মুচকি হাসল, কোনোকিছুই ওর অজানা নয়।

– আর কত কাঁদবে অতু এখনো যে ম/রে যায়নি।

আদৃতের মুখে অতু ডাক আর ম/রে যাবার কথা শুনে অতসীর কান্না আরো দ্বিগুন হয়ে গেল।

– অনেক কেঁদেছ এইবার একটু চুপ করো প্লিজ।
– হুম।

অতসী শান্ত হয়ে বলল,

– তারমানে আপনি আগেই জানতেন সবকিছু।
– হুমম।
– তাহলে চিকিৎসা করান নি কেন?
– চিকিৎসা করার মতো কোনো জায়গা নেই যে তাই। আমাকে যে আমার রুহির কাছে ফিরতে হবে, ওহ যে একা আছে।

আদৃতের কথার ধরন দেখে অতসীর আবারো কান্না পেয়ে গেল। নিজের কান্না কোনোরকমে আটকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।

কয়েকদিন আগেই আদৃতের প্রচন্ড মাথা যন্ত্রনা করে, যদিও এটা আগে থেকেই হতো কিন্তু আদৃত পাত্তা দেয়নি। বেশি পরিমানে হওয়াতে ডক্টরের কাছে যেতে উনি রিপোর্ট করান আর তখনি আদৃত জানতে পারে ওর ব্রেন টিউমার। যেটা চিকিৎসা কিংবা অপারেশন করার মতো কোনো পজিশন নেই, মৃ’ত্যুর মুখ কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে ওহ। তবুও কারোর কাছেই কিছু বলেনি সবটা লুকিয়ে রেখেছে নিজের মাঝে। কিন্তু এখন আর সেটা থাকল না।

অতসী বাড়ি ফিরে আবারো কাঁদতে লাগল প্রচন্ড কাঁদতে থাকল। বারবার ফিরিয়ে দেবার কারনটা আজকে অতসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ওর বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে মানুষটা আর কয়েকদিনের অতিথি মাত্র। অতসী আর কিছু ভাবতে পারছে না সবকিছু গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে।

কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সেইদিকে খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙলো একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে আদৃত যেন অতসীর থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। অতসী আদৃত বলে চিৎকার করে করে উঠল। এসির মাঝেও মেয়েটা ঘেমে একাকার হয়ে গেছে, মনের ভয়ট আরো তীব্রতর হয়ে উঠেছে। তবে কি আদৃতকে সত্যিই হারিয়ে ফেললো!

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here